মেঘমিশ্রিত পূর্ণিমা পর্ব -২৩+২৪

#মেঘমিশ্রিত_পূর্ণিমা 🤎
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব: ২৩

“চড়ুই ভোর হয়েছে, উঠ। আমরা এসে পড়েছি।”

কর্ণদ্বয়ে পৌঁছাতেই হন্তদন্ত হয়ে উঠলাম। বাইরে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে শুধালাম, “এখনও ভোর হয়নি, ডাকলেন কেন?”

“আমরা এসে গেছি।”
টনক নড়ল। কাল মাঝরাতে রওনা হয়েছি শহরের উদ্দেশ্য। বেমালুম ভুলে গিয়েছি কথাটা। কাঁচের ফাক দিয়ে মাথা বাইরে বের করে দিতেই মস্ত বাড়িটা নজরে এলো। লজ্জা পেলাম। তড়িগড়ি করে বের হতে নিলেই ধ্রুব বললেন, “থামো। আস্তে নামো। পায়ে ব্যথা।”

মুহুর্তেই ‘পায়ের ব্যথা’ কথাটা চাড়া দিয়ে উঠল। কালরাতে ধ্রুব হঠাৎ বলে উঠে, ভার্সিটি থেকে ফোন এসেছে। হাতে মেহেদী দেওয়া। রঙ হয়নি। দেওয়ার সাথে সাথে ধুয়ে ফেলেছি। তাকে অতিদ্রুত সেখানে থাকতে হবে। উপায়হীন হয়ে রাতেই রওনা হলেন তিনি। রাহাত স্যারও যেহুতু একই ভার্সিটির শিক্ষক, তাই তাকেও আসতে হবে। চড়ুইয়ের পরীক্ষা, আমার পরীক্ষা। তাই চলে এলাম।

ধ্রুব অতি যত্নে সিট বেল্ট খুলে দিলেন। আমি দ্রুত নামলাম। তিনি অকস্মাৎ বলে উঠেন, “নিজের খেয়াল রেখে চড়ুই। কালকে এসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”

প্রত্যুত্তরে বললাম, “জি, আপনিও খেয়াল রাখবেন। আসি, আল্লাহ হাফেজ।”

বাবুইয়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। পেছন থেকে ধ্রুবের মুখশ্রী দেখা যাচ্ছিল, তিনি নিশ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
_______

চড়ুই পাখিকে পানি দিয়ে ঘরে বসলাম। বাবুই বিছানা জুড়ে ঘুমাচ্ছে। জামা কাপড় না পাল্টেই ঘুমাচ্ছে। শরীরে চুলকানি হচ্ছে। মাত্র বাইরে থেকে ফিরলাম। আমার বের হবো। মূলত পায়ের জন ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলাম। ব্যাগ থেকে জামা কামড় বের করলাম। ধুতে হবে। আপাতত ভিজিয়ে রাখব। মামুনি প্রবেশ করলেন। বললেন,

“এত তাড়াতাড়ি আসার কোনো দরকার ছিল তোদের। কালকে আসতে পারতি। বিয়েতে গেলি অথচ অনুষ্ঠানে না থেকে পা ভেঙে চলে এলি।”

এক চিলতে হেসে বললাম,
“সেটা কি আমার উপরে আছে মামুনি? তাছাড়া পা ভাঙেনি। একটু মচকে গেছে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।”

“তা বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলিস?”

ফিচেল হেসে বললাম, “না, মামুনি। ইচ্ছে করেনি।”

“এতগুলো বছর পর গ্ৰামে গেলি, অথচ বাবা মায়ের কবরের কাছে গেলি না।”

“না, মামুনি। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছি আর ভাঙতে চাইনা। তাছাড়া বাবা মা সবসময় আমার মনে বিরাজ করে, তাদের মনে রাখতে হলে স্মরণ করতে হয়।”
_______

নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামী দশ তারিখ থেকে পরীক্ষা শুরু। আজ সাত তারিখ। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আগে পরীক্ষা হবে। কিছু নোটস নেওয়া দরকার। তাই ভার্সিটিতে গেলাম। সবকিছু আগের মতই আছে, মাঝখানে আমাদের সম্পর্কটাই আগের মত নেই। আগে ছিল টিচার স্টুডেন্ট, এখন স্বামী স্ত্রী।

লাল রঙের থ্রী পিছ পড়েছি। চুলগুলো ওড়না দিয়ে ঢাকা। ভাঙাচোরা ফোনটায় জ্বলজ্বল করছে ‘১০:৫৭’। ধ্রুব কিংবা রাহাত স্যারকে দেখতে পাইনি কোথাও। পরীক্ষার দরুন ব্যস্ত তারা। ক্লাসরুমের দিকে অগ্ৰসর হলাম। সেখানে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা পেলাম। হাসি ফুটে উঠল মুখে। পরক্ষণেই পিছিয়ে গেলাম। দশটা পঞ্চাশে ধ্রুব স্যারের ক্লাস শুরু হয়। কতদিন পর ধ্রুব স্যার বললাম। ভার্সিটিতে আসলে শুধু ধ্রুব স্যার উচ্চারিত হয়।

ধ্রুব বোর্ডে কিছু ইমপ্রটেন্ট চপিট লিখছেন এবং ক্লাসে অবস্থানরত সকলেই সেগুলো খাতায় তুলছে। দরজার কাছ থেকে সরে এলাম। সেদিন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ক্লাসে ঢুকার অনুমতি দেয়নি ধ্রুব, আজ বড্ড বেশিই দেরী।
দরজার কাছ থেকে সরে আসতে চাইলে ভেসে এলো বিরক্তমাখা কণ্ঠস্বর,
“ভেতরে এসো।”

ধ্রুব পূর্বের ভঙ্গিতেই লিখে চলেছেন। মাঝে মাঝে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে দেখে আবার লিখছেন। আমার ভাবাবেগ না পেয়ে বললেন, “এসেছ যখন তাড়াতাড়ি ভেতরে এসে লিখ।”

“আসলে সেদিন ঢুকতে দেননি..

“সেদিন চলে গেছে, সামনে পরীক্ষা। এতদিন ছিলাম না। তোমাদের পরীক্ষা যাতে ভালো হয়, তাই বাড়িতে ফিরেই বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজেছি।
সারারাত জার্নি করে এখন অবধি নির্ঘুম।”

মায়া লাগল বড্ড। চোখজোড়া লাল হয়ে এসেছে। খুস্কো চুলগুলো এলোমেলো। দ্রুতি স্বরে বললাম,
“মানে কী? ঘুমান নি কেন? দেখেছেন চোখ মুখের অবস্থা?”

“আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো ঢোকা পছন্দ নয়। ভেতরে এসো।”

গায়ে লাগল আমার। কাঁধের ব্যাগটা খামচে ধরে বেঞ্চিতে বসলাম। পেছনে প্রিয়া আঁখি নিরব তারিফ বসেছে। পূর্ণ মনোযোগ লেখায় স্থির করলাম।
ধ্রুব লেখা শেষ করলেন। বেঞ্চির মাঝের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পদচারণা করছেন পুরো ক্লাস। পর্যবেক্ষণ করলেন হাতের লেখা এবং বানান। মাহির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার মুখপানে। মাহি মুখ লুকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“সামনে পরীক্ষা তাই আপনার ক্লাসে এসেছি।”

“আমি কি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছি?”

“না, তবুও।”

“বাদ দাও, তোমার খাতার ভেতরে একটা স্ক্যাচ দেখেছি। মেভি আমাকে এঁকেছ, দেখতে পারি?”

মাহি ঘাবড়ে গেল। ধ্রুব স্যারের আদেশ রাখতে খাতাটা বের করল। ধ্রুব স্যার মনোযোগ সহকারে দেখে হাসলেন। জোরে পড়ে শোনালেন, “স্বপ্নের রাজকুমার।
খুব সুন্দর। দেখতে কিছুটা আমার মত। কিন্তু পুরোপুরি নয়। পৃথিবীতে সাতজন দেখতে অবিকল একই রকমের। হয়ত তারা কেউ।”

প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, “আমার অনুপস্থিতিতে কে তোমাদের ক্লাস নিয়েছিল?”

“তিথি ম্যাম।” মৃদু শব্দে।

“কী কী করিয়েছেন তিনি, আমাকে দেখিও একটু বাকিটা ম্যামের সাথে আলোচনা করে..
থেমে গেল তৎক্ষণাৎ। ভার্সিটির মেইন লিড উপস্থিত হলেন। সবাই একদমে উঠে দাঁড়ালেন। বসতে বললেন। ধ্রুবকে একটা খাম দিয়ে বললেন,

“রাগ করো না, তোমার ভালোর জন্যই ইমার্জেন্সিতে এনেছি।”

“তা তো দেখতেই পারছি, আমার বউকে নিয়ে বিয়েতে গেলাম। সুস্থ হয়ে বরযাত্রীতে যাবো, তার আগেই বাড়িতে নিয়ে এলেন।”

স্যার আমার পানে চেয়ে বললেন, “অনেকেই জানেনা, আগামী পরশু অর্থাৎ ৯ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায় অনুষ্ঠিত হবে। ধ্রুব জার্মানে ছিল, একটু ভালো বুঝবে। তাই ইমার্জেন্সিতে তোমাদের এনেছি। পরীক্ষার পর যত খুশি যেও‌।”

ধ্রুব বিদ্রুপ করে বললেন, “ততদিন কি ভাইয়ের বিয়ে আমাদের জন্য আঁটকে রাখবে, না-কি আবার বিয়ে হবে?”

ধ্রুব হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন ক্লাস থেকে। সামনেই অনুষ্ঠান, এরজন্যই ধ্রুবকে ফোন করে এনেছে। কিন্তু সেদিকে মন আমার স্থির নয়, আমার মনে পড়ল সেদিনের ফোনের কথাগুলো। সেই কণ্ঠ। স্যারের মেয়ের জন্মদিনের ঘটনা। কে ফোন করে হুমকি দিয়েছিল আমায়। তারপরেই বা কেন দেয়নি?

ভার্সিটি ছুটি হয়েছে, সবাই নিজনিজ বাড়িতে যাচ্ছে। ছুটি হওয়ার পরে অহেতুক, অকারণে থাকা যাবেনা। উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি আর ফোনে নাম্বারটা খুঁজছি। সেভ করা হয়নি। নাম্বরটা চেনা লাগতেই কল করলাম। অপরিচিত কণ্ঠ। তবে বেশ গম্ভীর,

“জানতাম ফোন করবে। গ্ৰামে গিয়েছিলে শুনেছি তোমার বাড়িতে ফোন করে। বিয়ে খেতে গেছ, তাই ডিস্টার্ব করিনি।”

ফিচেল হেসে বললাম, “বিয়ে নিয়ে এত মাথা ব্যথা, ডিস্টার্ব করেননি। অথচ বাকিও রাখেননি। অন্যের ভিডিও করে আবার ভালো সাজার চেষ্টা।
আচ্ছা, আপনি আমাকে জ্বালাতে এমন বলছেন নাতো? কোনো প্রুভ তো পেলাম না।”

কল কে’টে গেল। মিনিট খানেকের ভেতরে একটা ভিডিও এলো। চেক করতেই থমকে গেলাম। দেখার সাহস হলনা। চোখজোড়া টলটল করে উঠল। হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়ল। বিরবির করে বললাম, “এটা হতে পারেনা।”

হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম নিচে। পুনরায় ফোন বেজে উঠল। আমি নাম্বার চেক না করেই ফোন তুললাম,
“আপনি আদোও মানুষ? একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে এইসব করতে বিবেকে বাঁধল না। আমি কখনো ক্ষমা করব না আপনাকে।”

উচ্চারণ কণ্ঠে বললেন, “আমি বুঝি তোমাকে ক্ষমা করতে বলেছি? ক্ষমা দিয়ে কী করব? এটা আপলোড করলে কত ভিউ হবে ভাবতে পারছ? তোমার বোনকে সবাই চিনবে।”

নত হল কণ্ঠস্বর। “প্লীজ, ভিডিওটা ডিলেট করে দিন। আমার বোনের জীবনের প্রশ্ন। প্লীজ।”

“তাতে আমার কী? আমার শর্ত মানলে, আমি রাজি হবো।”

“কী শর্ত, আমি রাজি।”

“দেখা করতে হবে। আমি ঠিক সময়ে একটা পাঠিয়ে দিবো। কোথায়, কখন, কীভাবে? আপাতত বাই।!”

কল রেখে দিল। আমি বসে রইলাম। কী করা উচিত ভুলে গেলাম। পুনরায় ফোন বাজল। রিসিভ করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললাম,

“বলেছি তো, আপনার শর্ত মানব। যাবো দেখা করতে..

“চড়ুই কীসের শর্ত?”

ধ্রুবের বিচলিত কণ্ঠস্বর শ্রবণপথে যেতেই শান্ত হয়ে গেলাম। স্ক্রিনে তার নাম্বারটা জ্বলজ্বল করছে। বাচ্চাদের মত কাঁদতে ইচ্ছে করল। কাদলাম না, নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম। তিনি কঠোর গলায় বললেন,
“আমি লাইব্রেরীর দিকে আসছি, তুমি জলদি এসো। নো লেট।”

আমি পড়লাম মস্ত বিপদে। এই অবস্থায় ধ্রুবের সামনে গেলে তিনি সবটা বুঝে যাবেন। কী করব এখন?

[চলবে.. ইন শা আল্লাহ]#মেঘমিশ্রিত_পূর্ণিমা 🤎
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব: ২৪

“কী হয়েছিল চড়ুই, কাঁদছিলে কেন? কীসব বলছিলে শর্ত মানবে, দেখা করব?”

একেরপর এক প্রশ্ন করেও যেন শান্ত হতে পারলেন না ধ্রুব। অশান্ত হয়ে উত্তরের প্রতিক্ষায় চেয়ে আছেন। উপায়হীন আমি। কী জবাব বা প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত বুঝতে ব্যর্থ। অব্যক্ত কণ্ঠে বললাম,

“কোথায় কাঁদছিলাম?”

“কাঁদো নি বলছ? তোমার গলা মলিন কেন ছিল? শর্তই বা কীসের?”

অস্পষ্ট স্বরে বললাম, “আমি বাবুইকে শর্তের কথা বলছিলাম। আপনি ফোন করেছেন নাম্বার না দেখেই।”

ধ্রুব সন্দিহান গলায় বললেন, “সত্যি বলছ তো?”

তৎক্ষণাৎ ক্লাস রুমের কথা মনে পড়ল। ধ্রুবের ঘুমের কথাটা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, তার ব্যক্তিগত কথা। অভিমানে জর্জরিত হয়ে প্রত্যুত্তর দিলাম,
“এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যার, আপনাকে বলতে বাধ্য নই। অথচ সেই বোধটুকুও নেই আপনার।”

ধ্রুব মাথা নিচু করলেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন মৃদু। প্রসারিত হল মুখশ্রী। আমার অভিমান বুঝতে তিনি সফল। হাতটা নিজের আয়ত্তে নিলেন। জিন্সের পকেট থেকে মেহেদি বের করলেন। ডিজাইন করে দিলেন সন্তর্পণে। হাতে আর্দ্র স্পর্শ পেয়ে অবলোকন করলাম আমি। নড়ালাম না হাত, পাথরের ন্যায় বসে রইলাম স্থির হয়ে। এক হাতে মেহেদী পড়িয়ে অন্যহাতেও শুরু করলেন। আমি মুখ ভার করে রাখলাম। পুরো হাতে মেহেদী দেওয়া শেষ করে বললেন,
“তুমি কী তুলো খাও চড়ুই? চড়ুই পাখির শরীর নরম হয় জানতাম। কিন্তু চড়ুইয়ের শরীরও নরম। জিম করে এত নরম শরীর হয় কী করে? [ব্যঙ্গ করে বললেন] ললিপপ খেলে এত নরম থাকে বুঝি?”

আমি প্রত্যুত্তর না দিয়ে হাতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। করতলের মাঝ বরাবর ছোট সাইজে ‘D’ লেখা। লুকানো, খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ডিজাইন বেশ চমৎকার। আর কী কী গুনে মিশ্রিত তিনি।
মুচকি হেসে বললেন, “প্রথমত, আজ বিয়েতে থাকার কথা ছিল। অবশ্যই তোমার হাতজোড়া রাঙা থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার জন্য সম্ভব হয়নি, তাই আমিই রাঙিয়ে দিলাম। দ্বিতীয়ত, তুমি আমার ব্যক্তিগত। তাই ব্যক্তিগত রাখাই শ্রেয়। ব্যক্তিগত আর পেশা জিনিস দু’টো একসাথে মেশাতে চাইছি না। এতে আমার লাইফেও যেমন প্রভাব পড়বে, তারচেয়ে বেশি তোমার লাইফে। এবার বলো, তুমি কী চাও?”

তার দেওয়া যুক্তি যথার্থ। আমি ভুল! শুধু ভুলই নয়, চরম ভুল। আমিও চাই একটা দূরত্ব রাখতে।

গলা চুলকাচ্ছে। কানের ভেতরেও চুলকাচ্ছে, পিঠও ছাড়ছে না। একমাত্র এই কারণে দুই হাতে দেই না। মুচড়া-মুচড়ি করা শুরু করে দিলাম। ধ্রুব দাঁড়ালেন পেছনে এসে। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তৎক্ষণাৎ হিম স্পর্শ পেলাম পিঠে। চেইন খুলে জায়গায় চুলকিয়ে দিচ্ছেন‌। পলক থেমে গেল চোখের। কম্পন ছড়িয়ে পড়ল সর্বাঙ্গে। দ্রুত কণ্ঠে বললাম, “কী করছেন?”

“তোমাকে সাহায্য করলাম।” চেইন টেনে বললেন।

“আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে বলেছি? ছিঃ! ছিঃ!”
ভ্রু কুঁচকালেন তিনি। গালের কোণায় স্লাইড করতে করতে বললেন, “আমি অন্য মেয়েকে স্পর্শ করেছি বুঝি? নিজের বিবাহিত বউকে স্পর্শ করেছি।
আমি চাইলে এই মুহূর্তে বাসরটাও করতে পারি, কে আটকাবে শুনি?”

লজ্জায় চোখ কুঁচকে এলো। ক্ষুদ্র হল মুখশ্রী। দৃষ্টি সরিয়ে ফেললাম। মাথা ধরে উঠল। মনে পড়ল, সেই দিনের কথা! আমার জ্বর আসার কারণে লাইব্রেরীতে ধ্রুব জ্বর পট্টি দিচ্ছিলেন। স্বপ্নটা সত্যি হল বলে। প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, “আপনি বাসর ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না?”

“পারি। ওমা! পারব না কেন? শুধু এই বাসরটাই করা হয়নি। দেখতে চাইছিলাম পারি কি-না?”

“সরুন, সরুন।”
তৎক্ষণাৎ শব্দ করে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হলেন রাহাত স্যার। কর্ণপথে মুঠোফোন ধরা। আমি সরে এলাম। রাহাত স্যার ফোনটা নামিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তুমি এখানে কী করছ? বাড়িতে যাও। তৈরি হও। আজ মা তোমাকে দেখতে যাবে।”

অব্যক্ত স্বরে বললাম, “মা দেখতে আসবে মানে? কার মা, কীসের মা, কাকে দেখতে আসবে?”

“কাকে আবার তোমাকে। আমার মা আর ধ্রুবের মা।”

ধ্রুব অবাকের সুরে বললেন, “মা তো গ্ৰামে।”

“আন্টির সাথে কথা হয়েছে, তিনি অনুষ্ঠান শেষেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।”

_____
আঁধারে নিমজ্জিত আকাশ। মিটিমিটি তারারা জুড়ে রয়েছে বুক। ভাসমান বড় চাঁদের এক খণ্ড অনুপস্থিত। লুকিয়ে আছে অন্ধকারে। ঠিক তেমনি ঘোমটার আড়ালে লুকানো আমার লজ্জামিশ্রিত মুখশ্রী। রাহাত স্যারের বমা এসেছে, সাথে এসেছেন ধ্রুব এবং তার মা রমিলা আন্টি। টি টেবিলের উপর হরেক রকমের খাবার সাজানো। সকলে একটু খেলেও ধ্রুব স্পর্শ অবধি করেনি। গম্ভীর তার মুখমণ্ডল। নিজের মা যখন ঘটক সেজে ছেলের সামনে তার বউকে বন্ধুর হাতে তুলে দেয়। হাসব না-কি কাঁদব বুঝতে পারলাম না। এদিকে বাবুইয়ের চিন্তায় মশগুল। উপায় খুঁজে পাইনি। আমার ভাবনার ইতি টেনে রমিলা আন্টি বললেন,
“আমার বউমা বলে বলছিনা, লক্ষ্মী মন্ত্র মেয়ে।”

রাহাত স্যারের মা ফিচেল হেসে বললেন, “তা বুঝলাম, ভার্জিন মেয়ে তো!”

ধ্রুব এবার তেড়ে উঠলেন। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন, “কেন? ভার্জিন না হলে ছেলের বিয়ে দিবেন না বুঝি, তাহলে আসতে পারেন।
রাহাত তোর মাকে নিয়ে যা..

সবাই মুখ টিপে হাসলেন। রাহাত স্যার তার মাকে বললেন, “মা, কীসব বলছ? তোমাকে যার জন্য এনেছি সেটা দেখো।”

বলেই পাশে ইশারা করলেন। বাবুই আমার পাশেই বসা। রাহাতের মা হাত বাড়িয়ে বাবুইকে একবার ডাকলেন। বাবুই তার পাশে বসতেই সোজাসাপ্টা বললেন,
“তোমরা দুইজন ঐ ঘরটাতে গিয়ে কথা বলে এসো। আমি বরং বাবুইয়ের সাথে কথা বলি।”

মামুনির দিকে তাকাতে তিনিও সায় দিয়ে যেতে বললেন। আমি দ্রুত পা চালিয়ে ঘরে ঢুকলাম।

__
“রাহাত স্যার, আপনি তো জানেন আমার আর ধ্রুব স্যারের ব্যাপারটা। তবুও কেন এইসব করছেন?”

রাহাত স্যার জানালা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। পাঞ্জাবির কলার উঁচু করে হাওয়া করছেন। খোলা জানালার হাওয়াতে লেপ্টে আসা চুলগুলো পেছনে স্তরে স্তরে গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন, “দুইজনের মধ্যবর্তী দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে হলে, তৃতীয় ব্যক্তির প্রয়োজন পড়ে।”

আমি কথাগুলো ধীর সুস্থে আওড়ালাম।
দরজা খোলা। তবে একটু ভেড়ানো। কড়া নাড়ল কেউ। আমি দরজার কাছে গেলাম। মামুনি চা দিয়ে গেলেন দুইকাপ। আমি টেবিলের উপর ট্রে রেখে চা ভর্তি কাপটা এগিয়ে দিলাম। রাহাত স্যারের হাতে তখন আমার ফোন। আমি দ্রুত কেড়ে নিলাম। চায়ের কাপ জোরপূর্বক হাতে ধরিয়ে দিলাম। অন্যপাশে এসে দাঁড়ালাম। আমার ফোন বিছানায় ছিল। মেসেজের টোন শুনে তিনি ধরেছেন। আমি ফোনে স্ক্রিন লক করে রাখা পছন্দ করিনা। কিন্তু একটু তো সাবধান হওয়ার প্রয়োজন ছিল।

চায়ের কাপটা তীক্ষ্ণ শব্দে টেবিলের উপর রাখলেন। ছিটকে পড়ল তরল চা। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, “এইসব কী চড়ুই? তোমাকে এই ধরনের মেসেজ কে পাঠিয়েছে? তুমি রিপ্লাই করছ আবার।
পুরোটা আমি পড়তে চাই, ফোন দাও।”

আমি ফোনটা শাড়ির নিচে লুকিয়ে তড়িগড়ি করে বললাম, “প্লীজ কাউকে বলবেন না, আমার অনুরোধ।
আমি আপনাকেও বলতে চাইছি না।”

“চড়ুই আমাকে বলো, আমি জানতে চাই। তুমি বলা না অবধি কাউকে বলব না। প্লীজ!”

চোখজোড়া ছলছলিয়ে উঠল। ঘনঘন পলক ফেলে সামলে নিলাম। ধীরে ধীরে খুলে বললাম সবটা। সেদিনের ঘটনা থেকে আজ অবধি। তিনি বিস্মিত হলেন। হতবাক হয়ে বললেন,
“তুমি আগে কেন বলো নি আমায়?”

“জানালে সমস্যা হতে পারে, তাছাড়া আমি চাইছি না কেউ জানুক।”

রাহাত স্যার ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলেন ক্রমাগত। ড্রেসিং টেবিলের উপর সাজানো জিনিসগুলো ছুঁড়লেন। দৃঢ় করে চুল চেপে ধরে টেনে টেনে বললেন, “এই জা’নোয়া’রের বাচ্চাদের আমি ছাড়ব না। আমার বাবুইয়ের ভিডিও তো দূরে থাক, ওর দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকালেও চোখ তুলে নিবো।”

আমি হতবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম রাহাত স্যারের পানে। সেই একই ক্ষোভ, একই রাগ, এক কথা বলার ভঙ্গি। শুধু গায়ের রঙ একটু চাপা, উজ্জ্বল শ্যামলা। বাদবাকি সব একই।

দরজায় নক পড়ল। আমি চোখ মুছতে অন্যদিকে ফিরলাম, রাহাত স্যার তিনিও উল্টো ঘুরে দাঁড়ালেন।
নিঃশব্দে প্রবেশ করলেন কেউ। শব্দ নেই হাঁটায়। এত বিচক্ষণ চিন্তাশক্তি কেবল ধ্রুবের। আমার ধারণা সঠিক প্রমাণ করে ধ্রুব বললেন, “তোরা দুজন দুইদিকে ফিরে আছিস কেন আর ঘরের অবস্থা এমন কেন?”

আমি ফিরলাম না। রাহাত স্যার সরল ভাষায় বললেন, “কী লুকাব? বস!”

“তা বসব। কিন্তু চড়ুই মুখ লুকিয়ে আছো কেন?”
বলেই এগিয়ে এলেন আমার দিকে। মুখ তুলে চোখ রাখলেন চোখে। আমার দৃষ্টি বরাবরের মতো নিচু। তিনি হা হুতাশ করে বললেন, “চড়ুই কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?”

“কিছু না, এমনিতেই!”

রাহাত স্যার বললেন, “তোর বউ কেন কাঁদছে, আমি কীভাবে বলব? আশ্চর্য!”

“সেই তো! তোরা কীভাবে বলবি? তবে আমিও ধ্রুব। ইরফান মাহতাব ধ্রুব। তোদের লুকোচুরিও খুঁজে বের করব। [আমার দিকে ফিরে] আমি হয়ত তোমার যোগ্য নয়, তাই জানার অধিকারও নেই।”

[চলবে.. ইন শা আল্লাহ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here