মেঘের আড়ালে বৃষ্টি পর্ব -২৩

#মেঘের_আড়ালে_বৃষ্টি
#তেইশ
#প্রজ্ঞা_জামান_দৃঢ়তা

রোদ রাহার কাছে চলে এসেছে। রাহাকে পার্লার থেকে সাজিয়ে এনেছে।

রোদ বলল, “আপু তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। দুলাভাই দেখলে বিয়ে করার আগেই বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাবে।”

“তাই না! খুব পাজি হয়েছিস তুই। দাঁড়া ভাইয়াকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি।”

“জি না, আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করছি না। আমি এখনো ছোট মানুষ।”

“আচ্ছা তাই! দেখা যাবে।”

বাইরে থেকে শব্দ আসছে বর এসে গেছে। তাই রোদকে সবাই ডাকছে। বরের গলায় শালিকারা মালা পরাবে। কিন্তু রোদের একটুও ইচ্ছে নেই। এত ভিড়ের মাঝে যাওয়ার। তাছাড়া প্রয়াস এখানে কার কি হয়। সেটা নিয়ে ও বেশ চিন্তিত সে। প্রয়াসের সাথে কথা বলা দরকার। প্র‍য়াসকে কল দিবে এমন সময় মেঘলা রোদের হাত থেকে চো মেরে ফোন নিয়ে নেয়।

“আপু চল সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।তোমার জন্য রাহা আপির বরকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।”

রোদ চিন্তিত মুখে মালার ট্রে হাতে নিল।
মেঘলার হাতেও একটা। মেঘলা বরের সাথে যে থাকবে তাকে পরাবে, আর রোদ বরকে। রাহার ছোট বোন রাত্রি প্রয়াসকে ডাকছে,আর ভাইয়া বলে সম্মোধন করছে শুনে রোদের বুকের মাঝে এক অজানা অস্থিরতা কাজ করছে। প্রয়াস রোদকে এক নজর দেখে নিল। তারপর রাত্রিকে বলল, ” চল রাত্রি আমি তোদের পাহারা দিচ্ছি। যাতে তোদের বর পক্ষের কেউ ডিস্টার্ব না করে।”

মেঘলা বলল, “রাত্রি উনি কে আর তুই উনাকে ভাইয়া বলে কেন ডাকছিস?”

রাত্রি বলল, “উনি আমাদের বড় জেঠুর ছেলে। প্রয়াস ভাইয়া। তুমি তো দেখনি কখনো আপু। আজ দেখে নাও।”

এই একটা বাক্য যেন রোদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু করে দিয়েছে। প্রয়াস তার আপন চাচাতো ভাই। আর এটা সে কখনো বুঝতে পারেনি।যেই পরিবারের কথা উচ্চারণ করা মানা। সেই পরিবারের ছেলেকে নিজের থেকে বেশী ভালবেসে ফেলেছে সে। এক অজানা আশঙ্কায় মন অস্থির হয়ে ওঠে রোদের।
হঠাৎ একটু হেলে পড়ে যেতে নিলে প্রয়াস দুহাতে ধরে ফেলে রোদকে। এমন অবস্থায় ফটোগ্রাফার একটা ছবি ক্লিক করে ফেলে।

রাত্রি রোদকে বলে, “কী হয়েছে রোদেলা আপু?তোমার শরীর ঠিক আছে?”

“আমি ঠিক আছি রাত্রি।”

রাত্রি প্রয়াসকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ভাইয়া এই হচ্ছে মেজো জেঠুর বড় মেয়ে রোদেলা। তুমি নিশ্চয়ই এর আগে আপুকে দেখনি? কী অদ্ভুত পরিবার আমাদের। আমরা কাজিন হয়েও একজন একজনকে চিনি না। যেখানে আমাদের সবার একসাথে বেড়ে উঠার কথা সেখানে আমরা কেউ ২৬ কেউ ২০বছর পার করে ফেলেছি কিন্তু একে অপরকে দেখিনি পর্যন্ত।”

প্রয়াস রাত্রিকে বলল, “হুম ঠিক। চল রাত্রি বর পক্ষ অপেক্ষা করছে আমারা এসব নিয়ে পরে কথা বলি।”

রাত্রি বলল, “চল মেঘলা, চলো রোদ আপু।”

মেঘলা জানে রোদের এমন আচমকা পড়ে যাওয়ার কারণ। প্রয়াসকে মেঘলা এর আগে দেখেছে। যে ভয় রোদের হচ্ছে সেই একই ভয় মেঘলার হচ্ছে। কী হবে তাদের ভালোবাসা। এই দুই পরিবারের টানাপোড়েনে পূর্ণতা পাবে কী রোদ প্রয়াসের ভালোবাসা?

রোদ বরের গলায় মালা পরিয়ে দেয়। রোদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়াস। অনেক মানুষ থাকায় রোদকে প্রয়াস আড়াল করে রেখেছে, যাতে কেউ ভিড়ের মাঝে রোদকে ধাক্কা দিতে না পারে।

কেউ একজন প্রয়াসকে ধাক্কা দেয়ায় রোদের গায়ের সাথে লেগে যায়। প্রয়াসের হঠাৎ স্পর্শে একটু ভড়কে যায় রোদ। এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে রোদের মনে। একটু আগের সেই ভয়টা যেন মুহূর্তে উবে গেল। মনে হচ্ছে এই মানুষটা এইভাবেই তাকে আগলে রাখবে সবসময়। রোদ খুব তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে আসে।

রাহাদের বাড়ির পেছনে বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান করা। সেখানে নানা রকম গাছ রয়েছে একটা দোলনা।রোদের মন ভীষণ খারাপ। তাই সে চুপচাপ বসে আছে বাগানের রাখা দোলনায়। বিয়ে বাড়ির মানুষের কোলাহল যেন অসহ্য লাগছে রোদের। নিজের অজান্তেই যাকে ভালোবেসেছে। সেই তার বাবার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষের ছেলে। জীবন কোন প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে তাদের! তারা কী পারবে এই দুই পরিবারকে মিলিয়ে নিজেদের ভালোবাসার জয় করতে!

রোদ ভাবল কেন সে প্রয়াসকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল না? কেন করল না?এসব ভেবে ভেবে রাগে দুঃখে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে রোদের। হঠাৎ কেউ সেই জল গড়িয়ে পড়ার আগে হাতে তুলে নিল। গভীর মমতায় জড়িয়ে নিল। ” কাঁদছো কেন পাগলি? আমি আছি না।”

আস্কারা পেয়ে রোদের কান্নার দমক আরও বেড়ে যায়। প্রয়াসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে। কোনো সংকোচ কোনো দ্বিধাই আজ কাজ করছে না। রোদের মনে হচ্ছে, এই বুকে এইভাবে যদি কাটিয়ে দেয়া যেত সারাটা জীবন। ভরসা আস্থা সব যেন রদলবল নিয়ে আসে রোদের মনে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো ভয় তার কাছে আসতে পারবে না। কারণ তার পৃথিবীর বুকে এখন সে পরম শান্তিতে আছে। এই শান্তিটুকু থাকলে সব ভেদাভেদ সে ভেঙে দিতে পারে।

“রোদ এই রোদ?” প্রয়াস মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকছে। রোদ চুপ।

প্রয়াস কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “দেখো রোদ আমরা জানতাম না আমাদের মাঝে যে রক্তের সম্পর্ক আছে। আমরা একই পরিবারের। অথচ আমরা ছিলাম যোজন যোজন দূরে। এই দোষ আমাদের না।আমরা কোনো অন্যায় করিনি যা হয়েছে তা শুধু আমাদের পরিবারের জন্য হয়েছে। আমি জানিনা কেন আমাদের বাবা আর চাচার মাঝে এতো দুরত্ব। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। তারা দুজন একই মায়ের সন্তান। তাই তাদের ভেতরকার যে টান সম্পর্ক আছে সেটা তারা কখনো উপেক্ষা করতে পারবে না।তাদের মনে কোথাও না কোথাও সেই রক্তের টান রয়ে গেছে। যা তাদের একদিন কাছে আনতে বাধ্য করবে। সেই সুযোগ টা হয়তো আল্লাহ আমাদের মধ্যে দিয়ে করতে চাইছেন। তুমি চিন্তা করোনা আমরা আমাদের পরিবারকে এক করব। আর ভালোবাসাকেও জয় করব। কিন্তু এর আগে আমাদের সাবধান থাকতে হবে যাতে কেউ আপাতত না জানে আমাদের সম্পর্কের কথা। সময় করে আমরা জানাব।

রোদ অস্ফুটে বলে,
“আমাকে ছেড়ে তুমি যেওনা প্লিজ।”

প্রয়াস আরও শক্ত করে রোদকে ধরে বলে, “আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না রোদ। তুমি চাইলেও আমি তোমাকে ছাড়ব না। ”

রোদের মুখটা আলতো হাতে ধরে প্রয়াস কপালে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দেয়। রোদ হঠাৎ শিহরে উঠে। প্রয়াসকে জড়িয়ে ধরে।

দুজনের ঘোর কাটে মেঘলার ডাকে। মেঘলা নিচের দিকে তাকিয়ে রোদকে ডাকছে, ” আপু ভাইয়া তোকে খুজছে অনেকক্ষণ। হয়তো এদিকে চলে আসবে। তুই তাড়াতাড়ি আয়। “বলে চলে যায় মেঘলা।

প্রয়াস একটু ঘাবড়ে যায় রোদ ইশারায় জানায় কোনো সমস্যা নেই। মেঘলা কাউকে কিছু বলবে না। তবে একটু লজ্জা লাগছে রোদের এতক্ষণ ঘোরে থাকলেও এখন এক আকাশ লজ্জা ভর করেছে রোদের সুন্দর মুখে। যার আভা রোদের সৌন্দর্য যেন আরও শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রয়াস বলে, “এই লজ্জাটা তো আরও বেশী মারাত্বক। আমি কিন্তু সাধুসন্ত নই। যদি ভুল হয়ে যায় আমার কোনো দোষ নেই।”

রোদ প্রয়াসের কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
কে বলেছে সাধুসন্ত হতে। তাছাড়া আমার সাধুসন্ত একেবারেই পছন্দ নয়। তবে সবকিছু বিয়ের পরে।
বলেই রোদ দেয় ভোঁদোড়।

প্রয়াসের পুরো শরীরের এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে। রোদ কাছে থাকলে হয়তো সে ভুলটা করেই ফেলতো। ভালো করেছে রোদ চলে গেছে।নাহলে সত্যিই ভুল হয়ে যেত।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here