শেষ পাতার তুমি পর্ব ১৫

#শেষ_পাতার_তুমি
#ফারিয়া_আফরিন_ঐশী
#পর্বঃ১৫

শান্ত চেয়ারে বসে পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল–সরি আয়ু!!প্লানে একটু চেন্জ আনলাম!!তুমি রায়ানকে ভালো না বাসলে এটা করতে হতো না!!

বলেই হাসতে লাগল!!

অপরপাশে বসে থাকা আফজাল বললেন–প্লান টা কতদিনের জন্য করছো??দ্রুত ডেলিভারি না দিলে ঝামেলা হয়ে যাবে!!

শান্ত একটু ভাবুক হয়ে বলল–বেশি হলে ২ মাস!!তার বেশি সময় নাই!!

আফজাল–ওকে!!আমি যাচ্ছি!! আমার আজ কিছু ডিল আছে!!১৮ টা মেয়ে ডেলিভারি দিয়েছি,১ জন পালিয়েছে!!

শান্ত–এতো টেনশনের কিছু নেই,পুলিশের মধ্যে ও আমাদের লোক আছে!!

আফজাল–হুমম!!মেয়েটাকে পেলে আবারও দুবাই পাঠাতে হবে!!

শান্ত–ওকে,,ইউ মে গো!!

আফজাল যেতেই শান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের ফোনে!!

অপরদিকে,,

রায়ানের ঘর থেকে কিছু পরার আওয়াজ শুনে রেশমী আর আয়ানা ছুটে আসে দরজার সামনে!!

দরজা ধাক্কাতে শুরু করে!!বারকয়েক ধাক্কা দিয়েও রায়ানের তেমন কোনো সাড়া না পেয়ে ঘাবড়ে যায় দুজনেই!!

রেশমীর চিল্লাচিল্লি তে রেদোয়ান আর রায়ানের দাদি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে!!

রেদোয়ান দরজার কাছে গিয়ে বারবার ছেলেকে ডাকতে শুরু করে!!

রায়ানের সাড়া না পেয়ে রেদোয়ান বাধ্য হয়ে দরজা শাপল দিয়ে বারি দিয়ে ভেঙে ফেলেন!!

ঘরের মেঝেতে সেন্সলেস ছেলেকে দেখে ছুটে যায় রেদোয়ান!!

রেশমি ছেলের পালস চেক করছে!!

আয়ানা চোখে মুখে পানির ছিটা দিচ্ছে!! দাদি বাইরে এ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা করছে!!!

এ্যাম্বুলেন্স আসা মাত্রই দাদি ভেতরে এসে খবর দিলেন!!

রেশমি, রেদোয়ান ছেলেকে নিয়ে রওনা হলেন হাসপাতালে!!!

আয়ানা আর দাদি ঘর তালা মেরে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটল!!

রিক্সাতে আয়ানার হাসফাস দেখে দাদি বলল–চিন্তা করিস না ছুড়ি!!সব ঠিক হইয়া যাইবো!!

আয়ানা শক্ত কন্ঠে বলল–সব ঠিক হতেই হবে দাদি!!এবার তোমার নাতি সুস্থ হয়ে বাড়ি আসুক শুধু!!

আয়ানা আর দাদি হাসপাতালে পৌছে ওয়ার্ডের ভেতরে গিয়ে দেখে রায়ানকে ডাক্তার দেখছে!!

রায়ানের হাতে স্যালাইন পুশ করা হয়েছে!!

আয়ানা আর দাদি রেদোয়ানের সাথে ওয়ার্ডের বাইরে এসে দাঁড়ালো!!

রেদোয়ান চুপ করে বসে আছে!!

ভেতর থেকে ডাক্তার সহ রেশমি বেরিয়ে এলো!!

রেশমি –অতিরিক্ত মেন্টাল প্রেসারের জন্য এমন হয়েছে!!রেস্ট নিলে সুস্থ হয়ে যাবে তুমি চিন্তা করো না!!

কথাগুলো রেদোয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল!!!

রেদোয়ানের তাও কোনো সাড়া শব্দ পেলো না!!

খানিক অপেক্ষার পর,

রায়ানের কিছুটা সেন্স ফিরল!!!রায়ানকে নড়াচড়া করতে দেখে সামনের টুলে বসে থাকা রেদোয়ান উঠে রেশমি কে ডেকে দিয়ে বাইরে চলে গেল!!

ব্যাপারটায় আয়ানা ভ্রু কুটি করে তাকালেও রায়ানের কান্নার আওয়াজে দ্রুত তার দিকে মনোযোগ দিল!!

রায়ান ফুপিয়ে কাঁদছে!!

রেশমি চোখের পানি মুছে দিচ্ছে!!

আয়ানা ধীরে টুলে বসে পড়ল!!রায়ানের দিকে হালকা ঝুকে বলল–এভাবে কাঁদলে শরীর আরও খারাপ করবে!!!

রায়ান অন্য দিকে ঘুরে গেল!!!

আয়ানা শাশুড়ীকে খাওয়ার জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে রায়ানের দিকে ফিরে দেখে রায়ান জোর করে চোখ বুজে আছে!!

আয়ানা বিরক্ত না করে আবার ও পূর্বের জায়গায় বসে পড়ল!!

ওয়ার্ডে নানা ধরনের রোগীদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে!!

কেউ বা গল্প করছে!!আয়ানা ভেবে পায়না হাসপাতালে বসে কীভাবে এরা গল্প করতে পারে!!

এসব ভাবনার মাঝেই সামনের বেডে থাকা একজন মাঝবয়সী লোক আয়ানার ঠিক আয়ানার পায়ের ধারে পানের পিক ফেললো!!!

আয়ানা চমকে উঠে তাকাতেই লোকটা বলল–ভুল হয়েছে মা!!ঐ বালতিতে ফেলতে গিয়ে তোমার পায়ের কাছে চলে গিয়েছে!!

আয়ানা কোনো কথা ছাড়া বেডের অপরপাশে গিয়ে বসে টিস্যু দিয়ে পায়ে পানের পিকের কিছু ছিটা মুছতে লাগল!!!

পা ক্লিন করলেও আয়ানার কেমন যেন লাগছে!!হাসপাতালের বিদঘুটে গন্ধে গা গোলাচ্ছে!!

কিছুক্ষণ পর,রেশমি এলো!!

রেশমি–মা রে,,তুই যা কিছু খেয়ে আয়!!তোর বাবা বাইরে আছে!!

আয়ানা–বাবা আসবে না মামনি!!

রেশমি–মনে হয় না!!তুই যা!! তোকেই বসে থাকতে হবে এখানে!!আমার তো আবার ঘন্টাখানিক পর ডিউটি আছে!!

আয়ানা–আচ্ছা!

বলে বেরিয়ে গেল!!

খেয়ে আয়ানা আর দাদি এলো!!রেদোয়ান বাইরে বসে রইল!!আয়ানা বহুবার বোঝালেও সে ভেতরে এলো না!!

রায়ান বেডে বসে আছে,,চোখ মুখ ভার করে!!

রেশমি ওষুধ চেক করছে!!

আয়ানা দাঁড়াতেই রেশমি বলল–এসেছিস!!বাবুকে বাড়ি নিয়ে যাবো বুঝলি!!বাবু থাকতে চাইছে না!!তুই তোর বাবাকে বলল অটো ঠিক করতে!!

আয়ানা মাথা দুলিয়ে বাইরে গেল!!

দাদি টুলে এসে বসলেও রায়ানের সাথে কোনোরকম কথা বলছে না!!

রেশমি–মা,,আপনি আর আয়ু একটা অটোতে আসুন আমি আর আপনার ছেলে বাবুকে নিয়ে যাচ্ছি!!

দাদি পান আঁচল থেকে খুলে বললেন–না গো বৌমা!!আমি তোমার আর তোমার পোলার লগে যামু!!আমার পোলা আর নাত বৌ এক গাড়িতে আয়ুক!!

রেশমি আর কিছু না বলে ওষুধ আর পানির বোতল ব্যাগে নিয়ে রায়ানকে বললেন–এইযে জুতো আছে!!পায়ে দিয়ে নে!!বেরোবো!!

রায়ান ধীর পায়ে নেমে জুতো পরে মায়ের হাত ধরে বাইরে চলে এলো!!পেছনে দাদি!!

রায়ান,রেশমি আর দাদি এক অটোতে উঠলেন!!

পেছনে রিকশাতে উঠল রেদোয়ান আর আয়ানা!!

রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল!!অটো একটু দ্রুতগতির হওয়ায় তাড়াতাড়ি এগোচ্ছে!!

পা চালিত রিকশাতে আয়ানা আর রেদোয়ান বসে আছে!!দুজনের স্হির দৃষ্টি একটু দূরে থাকা রায়ানদের অটোতে!!

নীরবতা খন্ডন করে রেদোয়ান বলল,,–আমায় ক্ষমা করিস মা!!

আয়ানা–এমন কেন বলছো বাবা??

রেদোয়ান –আমি তোদের সবার সাথে অন্যায় করেছি!!

আয়ানা–নাহ বাবা!!

রেদোয়ান –আমার একটা কথা রাখবি মা!!??

আয়ানা–বলো!!

রেদোয়ান –তুই চলে যা!!নিজের মতো ভালো থাক!!

আয়ানা একটু ভেবে বলল–ঠিক আছে!!যে দিন সময় হবে ঠিক চলে যাবো!!

তারপর আবারও গহীন নীরবতা!!!

বাড়ি পৌঁছে আয়ানা ভেতরে গেলে রেদোয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে–তোর বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম নাহ রে মা!!!

তারপর ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে চলে যায়!!

রায়ান বিছানাতে বসে আছে!!ফোনের স্ক্রিনে স্হির নজর!!ফোনে নাবিলার একখানা ছবি!!

আয়ানা দরজার ধারে আসতেই শুনল রায়ান চাপা গলাতে বলছে–আম সরি নাবিলা!!আমি যদি ঐ দিন একটু সাহস করে বাবাকে বলতাম যে আমি তোমাকেই বিয়ে করবো তাহলে আজ তুমি আমার কাছে থাকতে!!

আয়ানা খাবার হাতে এসেছিল!!রায়ানের কথা শুনে চোখের কোণে পানি জমে এলো!!

আয়ানা ধীরে ভেতরে এসে রায়ানের সামনে খাবার ট্রে রাখল!!

আয়ানা কে দেখে রায়ান চোখের পানি মুছে নিল!!

আয়ানা বিছানাতে বসে বলল–সুস্হ হতে হলে খাবার খেতে হবে!!

রায়ান কড়া আওয়াজে বলল–তুমি যাও এখান থেকে!!

আয়ানা–বাহ!!আপনি আমায় তুমি করে বলছেন!!বেশ তো!!খাবারটা খাবেন তারপর যাবো!!

রায়ান–প্লিজ যাও!!

আয়ানা–নো!!

রায়ান রেগে খাবার ট্রে টা ধরে আছাড় মারলো!!

আয়ানা আঁতকে উঠল!!

রায়ান কোনোরকমে বেড থেকে নেমে আয়ানা ডান হাতের বাহু চেপে ধরে বলল–কথা কানে যায় না তোমার??বের হও এখান থেকে!!এসব ফালতু কেয়ার আমাকে দেখাবে না!!!

বাহুর ব্যাথাতে আয়ানার চোখে পানি জমে গিয়েছে!!!

রেশমি আওয়াজ শুনে ছুটে এসে এমন অবস্থা দেখে দ্রুত আয়ানাকে ছাড়িয়ে রায়ানকে বললেন–বেয়াদবির একটা সীমা আছে!!মানছি তুমি নাবিলার জন্য কষ্ট পাচ্ছো তার মানে এটা না সবার সাথে বেয়াদবি করবে!!

বলেই আয়ানাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন!!

দাদি ঘরের বাইরে থেকে সবটা দেখে আবারও চলে গেলেন!!

রেদোয়ান আওয়াজ শুনেও বাইরে আসে নি!!

তিনি ঠিক করেছেন আর রায়ানের সামনে যাবেন না!!নিজের সন্তানের মন না বুঝে এতো বড় অপরাধ করে ফেলেছেন তাই নিজের মুখ আর ছেলেকে দেখাবেন না!!!

সবাই চলে যেতেই রায়ান বিছানাতে বসে পড়ল!!ফোন হাতড়ে নাবিলার ছবিটা বের করে বুকের মধ্যে নিয়ে শুয়ে পড়ল!!!

ওষুধের কারণে দ্রুত ঘুমিয়ে গেল,,,

আয়ানা শাশুড়ীকে বলে একটা কাপড় আর বালতি হাতে ঘরে এসে সব পরিষ্কার করতে শুরু করে!!

ঘন্টাখানিক ধরে পুরো ঘর পরিষ্কার করে মেঝেতেই বসে পড়ল সে!!!এতো কঠিন কাজ কখনো করা হয়ে ওঠেনি তার!!

মেঝেতে বসে ঘুমন্ত রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল–জানি খুব কষ্ট পাচ্ছেন,,আমিও যে নিরুপায়,ভালোবাসি খুব আপনাকে!আপনি নাবিলাপুকে ভালোবাসুন,,কোনো আপত্তি নেই আমার!!তবে আপনার মনের এককোণে আমাকেও একটু জায়গা দেন!!যদি দেখি আপনি আমার ভালোবাসা শত চেষ্টার পরেও গ্রহণ করছেন না কথা দিলাম চলে যাবো আপনার জীবন থেকে!!

কথা গুলো আওড়ে নিয়ে বাইরে চলে গেল সে!!

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here