সন্ধ্যালয়ের প্রণয় পর্ব -১৪+১৫

#সন্ধ্যালয়ের_প্রণয়
#আফসানা_মিমি
| চোদ্দ তম পর্ব |
❌[কোনোভাবেই কপি করা যাবে না]❌

” তুমি আজকাল আরিফ সরকারের পরিবারে একটু বেশীই মেলামেশা করছো। কারণ কী?”

অপরাধীর ন্যায় মা-মেয়ে নীরব সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনুষ্ঠান শেষে এই মাত্র ফিরেছে তারা। নীরব সরকার তখন দরজার সামনেই বসা ছিল। আজ সে অনুষ্ঠানে যায়নি। স্ত্রী এবং মেয়েকেও নিষেধ করেছিল সেখানে যেতে। তারা নীরবের আদেশ অমান্য করে সেখানে গিয়েছিল। নীরব সরকার রেগে আছেন। স্ত্রী সন্তানের নীরবতা তার রাগকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
” চুপ করে আছো কেন? সন্ধ্যার তো কিছু মনে নেই। তুমি কীভাবে ভুলে গেলে সুমি? তুমি কী ভুলে গিয়েছ আমার এই অবস্থার জন্য ওরা দায়ী?”

সুমি স্বামীর ধমকে কেঁপে উঠে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে রয়েছেন।
” বাবা আর কতো এভাবে একা বন্দি থাকবে। দাদা আর নিলয় ভাইয়া ছাড়া বাকী সবাই তো কোন দোষ করেনি। মাকে কেন তাদের থেকে দূরে রাখছো।”

মুখের উপর কথা বলা নীরব সরকার একদমই পছন্দ করেন না। তার মধ্যে এত কষ্টে গড়ে তোলা মেয়ে যখন তার মুখের উপর কথা বলে তখন রাগ আরো উচ্চ শিখরে উঠে যায়। নীরব সরকার পা অচল হলেও হাত অচল নয়। টেবিলের উপর থাকা ফুলদানি সজোরে মাটিতে আঘাত করে চিৎকার করে উঠে সে।

” যেই মেয়ে আমার মুখের উপর কোনদিনও কথা বলেনি, আমি যা বলেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। আজ সেই মেয়ে আমাকে গলা উঁচু করে কথা বলছে। আমি বুঝেছি, সবকিছুই আরিফ সরকারের পরিকল্পনা। আমার কাছ থেকে আমার পরিবারকে আলাদা করতে চাইছে সে। এত অবনতি সন্ধ্যা! একদিন আমার চোখের আড়াল হয়েছিস বলে তোর এত অবনতি হয়েছে? আজ বুঝলাম আমার পাশে কেউ নেই। আজ অচল বলে সবাই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।”

” বাবা আমি এভাবে বলতে চাইনি। আমি শুধু বলতে চাইছি বড়ো মা আর নীলিমা তো কোন দোষ করেনি। এছাড়া ছোট চাচ্চু এবং চাচীও তো কোন দোষ করেনি। তাদের থেকে কেন আমরা আলাদা থাকবো? কেন তাদের সাথে কথা বলতে পারব না?”

নীরব সরকারের হুইল চেয়ারে এগিয়ে আসেন। নিজের স্ত্রীর গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলেন,

” তোমার জন্য আজকে আমার মেয়ে আমার উপর আঙ্গুল তুলছে। তুমি যদি আজকে অনুষ্ঠানে না যেতে তাহলে আমার মেয়েও যেত না। তুমি তো এটাই চেয়েছিলে। বন্দি জীবন তো তোমার পছন্দ নয়। নিজে যেমন উড়নচণ্ডী মেয়েকেও তেমন বানাতে চেয়েছিলে। এবার খুশি তো? যাও দুজনে বিদায় হও আমার বাড়ি থেকে। আমার কাউকে লাগবে না। আমি একাই যথেষ্ট। পরবর্তী পরিকল্পনা আমি একাই করব।”

নীরব সরকার যেন আজ নিজের মধ্যে নেই। হিতাহিতবোধশূন্য হয়ে গেছে সে। একাই চলে যায় নিজের ঘরে। শব্দ করে দরজা আটকে বসে রয় সেখানে। এদিকে মা-মেয়ে দুজনে চোখে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে।

” মা! বাবা এমন কেন? আমি কেন সবার মত হতে পারলাম না মা? কেন আমাকে প্রতিশোধের মতো এত কঠিন কাজের বাহক হতে হলো। এই প্রতিশোধ কবে শেষ হবে মা? আমি আর পারছি না।”

সুমি মেয়েকে বুকে আগলে নেয়। আদর করতে থাকে মেয়েকে।

” সব ঠিক হয়ে যাবে মা। চিন্তা করিস না। যেদিন আমার লাশ এ বাড়িতে পড়বে সেদিনই সব নীরব হয়ে যাবে। তোর বাবা ও নিরব হয়ে যাবে।”

—————–

ধরণীতে আরো একটি নতুন দিনের আগমন ঘটেছে। সকলে ব্যস্ত নিজ কর্মজীবনে। অফিসের সময় হওয়ার আধা ঘন্টা পূর্বেই সন্ধ্যা অফিসে চলে আসে। পুরোনো ফাইল গুলো দেখতে থাকে সে। অফিসের দারোয়ান সন্ধ্যার আগমনটা নিলয়ের কাছে ফোন করে জানিয়ে দেয়। সন্ধ্যার এত দ্রুত অফিসে আসা নিলয়কে ভাবায়। তাই সেও দ্রুত অফিসে চলে আসে।

অফিসে পৌঁছাতেই নিলয়ের সর্বপ্রথম সন্ধ্যার ডেক্সের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা এক মনে কাজ করছে। তার পাশে যে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে সেটার খবর নেই তার।

“আজ এত সকালে অফিসে?বাসার সবকিছু ঠিক আছে তো?”

সন্ধ্যা ভাবে নিলয় সন্ধ্যার মুখের ভাবভঙ্গি কীভাবে বুঝতে পারে? সন্ধ্যার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও হাসি মুখে তাকালো নিলয়ের দিকে এবং বলল,

” সব ঠিক আছে। আমার কিছু কাজ বাকি ছিল তাই তাড়াতাড়ি চলে এসেছি।”

নিলয় সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করে দেখল সন্ধ্যার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে যা সাধারণত কান্না করলে হয়ে থাকে। নিলয় কিছু না বলে নিজের কেবিনে চলে যায়। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সে সন্ধাকে দেখছে। সন্ধ্যা নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করছে ঠিকই কিন্তু কিছুক্ষণ পরপর নাক টানছে। নিলয়ের মন খারাপ হয়ে যায়। অন্তরে ব্যাথা শুরু হয়। মুঠোফোন বের করে সন্ধ্যাকে কল করে সে।

” দুই কাপ কফি নিয়ে আমার কেবিনে আসুন মিস ঐরাবতী। খবরদার! গতবারের মতো উল্টাপাল্টা কোন কাজ করবেন না।”

নিলয়ের ফোন পেয়ে সন্ধ্যা খানিকটা ভয় পায়। আজ অফিসে সে একা। সে ভাবে নিলয় যদি তার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে! পরক্ষণে ভাবে, নিলয় তো এমন না। সে পাশে থাকলে সন্ধ্যার ভয় কম হয়। সন্ধ্যা কখনো প্রকাশ করে না। কিছুক্ষণ পর সে বুকে কিছুটা সহজ সঞ্চয় করে এগিয়ে যায় নিলয়ের আদিশ পালন করতে।

আজ সন্ধ্যার নিলয়ের সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না। এমনকি তার আদেশ পালন করতে ইচ্ছে করছে না। বর্তমানে তার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন যার পাশে সন্ধ্যা শুধু বসে থাকলেই চলবে। তাই তো সন্ধ্যা নিজের জন্য, হ্যাঁ শুধুমাত্র নিজের জন্য নিলয়ের কথা শুনছে।
দুই কাপ কফি বানিয়ে সন্ধ্যা দরজায় করাঘাত না করে, অনুমতি না নিয়েই সন্ধ্যা প্রবেশ করে নিলয়ের কেবিনে। নিলয় তখন ফাইল দেখায় ব্যস্ত। দরজায় খোলার আওয়াজ পেয়ে চোখ তুলে তাকায়। সন্ধ্যার মুখ দেখে বুঝতে পারে সত্যিই তার মন খারা।প তাই বেয়াদবির জন্য শাস্তি না দিয়ে তাকে চেয়ারে বসতে বলে সে।

” চাচ্চু বকেছে?”

সন্ধ্যা নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। রাগ, অহংকার সব ভুলে কান্না করে দেয় সে। নিলয় চমকে তাকায় সন্ধ্যার কাছে যেতে নিয়েও কিছু ভেবে বসে থাকে সে।
” কি হয়েছে বলো আমাকে।”
পাঁচ মিনিট পর সন্ধ্যা মুখ খুলে। চোখের পানি মুছে প্রতুত্তুরে বলে,

” কিছু হয়নি। পুরোনো মানুষের কথা স্বরণে এসেছে।”

নিলয় খুব বুঝতে পারে পুরোনো মানুষটা কে। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সন্ধ্যার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে।
” অতীত ভুলে যাওয়াই ভালো। অতীত যত মনে করবে তত কষ্ট পাবে। বর্তমান নিয়ে ভাবো! ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করো। তোমার সামনে যে আছে তার দিকে মনোনিবেশ করো।”

সন্ধ্যা চোখ তুলে নিলয়ের দিকে তাকায়। এক কাপ কফি নিলয়ের দিকে এগিয়ে ধরে।
” আজ আমার জন্য যে কফি বানিয়েছ সেটা তুমি খাবে এবং তোমারটা আমি খাব। আমার কেন যেন তোমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না।”

সন্ধ্যা কিছু না বলে তাই করে। নিজের জন্য বানানো কফিটা নিলয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে নিলয়ের জন্য বানানো কফিতে চুমুক বসায়।

কক্ষজুড়ে পীনপতন নীরবতা। শুধু দুজন মানুষের নিশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কফি খাওয়ার মাঝেই সন্ধ্যার ফোনে একটি মেসেজ আসে।
মেসেজ ওপেন করতে সন্ধ্যার হাত থেকে কফির কাপ নিচে পড়ে যায়। নিলয় কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ বনে যায় চেয়ার থেকে উঠে সন্ধ্যার কাছে গিয়ে সন্ধ্যাকে আগলে নেয় সে।

” কি হয়েছে সন্ধ্যাবতী?”

সন্ধ্যা কাঁপছে। তার দ্বারা এত বড়ো ভুল হয়েছে ভেবে আফসোস করছে। কাঁপা কন্ঠস্বরে সে নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলে,

” আপনি ভুল ছিলেন না। সে বেঁচে আছে। আমাদের ধোঁকা দিয়েছে সে। আমাদের নিয়ে খেলছে।”

নিলয়ের মাথায় সন্ধ্যার কথার আগামাথা কিছুই ঢোকেনি। সন্ধ্যাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই সন্ধ্যা চেয়ার থেকে উঠে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। নিলয়ের সন্ধ্যার পিছু নিতেই দেখতে পায় সন্ধ্যা অঠিস থেকে বের হয়ে গেছে।

নিলয় হতাশ হয়ে যায়। মুঠোফোন বের করে সন্ধ্যাকে কয়েকবার ফোন করে। ফোন বন্ধ। নিলয়ের চিন্তা হয়। আপনমনে বলে,

” কি হয়েছে তোমার?”

——————

অন্ধকার ঘরে দুজন মানুষ বসে আছে। তাদের পাশেই দেয়ালে সরকার বাড়ির প্রতিটি সদস্যের ছবি টাঙানো। অর্নব সরকারের ছবির উপর ক্রস চিহ্ন দেওয়া। দুজন লোক হাসছে। একে অপরকে বলছে,

” সরকার বাড়ির বিনাশ পনেরো বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। শা’লা অর্নব সরকার ম’রা’র আগে আমাদের এমনভাবে ফা’সি’য়ে’ছি’ল। ছোটটাকেও মে’রে ফেলতে চাইছিলাম কিন্তু পারিনি। অর্নব বাঁচিয়ে নিজে ম’রে’ছে। তবে যাই হোক এখন আমরা আবার ফিরে এসেছি। এবার আমাদের সাথে করা প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবো।”

” তুমি একা নয়। এবার আমিও আছি তোমার সাথে। আমাদের প্রথম টার্গেট হবে সরকার বাড়ির বিশ্বস্ত মেয়ের উপর। মিস সন্ধ্যা। যে শেষ হলে, সরকার বাড়ি অর্ধেক আমাদের হাতে চলে আসবে।

দুজন লোক উচ্চস্বরে হাসছে। সরকার বাড়ির সদস্যদের উপর তাদের নজর পড়েছে। নিলয় কী বাঁচাতে পারবে নিজের পরিবারকে?

চলবে……..

[আজ বানান ভুল থাকতে পারে। ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন। আমি সংশোধন করে নিব। ছোট পর্ব হয়েছে। আর আগাতে পারিনি। দুঃখিত]#সন্ধ্যালয়ের_প্রণয়
#আফসানা_মিমি
| পনেরো তম পর্ব |
❌[কোনোভাবেই কপি করা যাবে না]❌

কর্মজীবনে সবাই ব্যস্ত সাথে ব্যস্ত নগরীও। দুপুরের উত্তপ্ত রোদে ঘেমে একাকার হয়ে কাজ করছে কর্মজীবী মানুষেরা।
নিলয় গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে। মুখশ্রীতে চিন্তার ভাজ স্পষ্টত বিদ্যমান। ড্রাইভ করতে করতে আশপাশ নজরে রাখছে। সন্ধ্যাবতীকে যদি দেখতে পায়!
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যার খোঁজ নেই। নিলয় এই কয়েকঘণ্টায় পাগলের মতো সন্ধ্যাকে খুঁজছে। সন্ধ্যা লগনে আর কিছু সময় বাকি। সারাদিনের অনাহারে এবং চিন্তায় নিলয় হাঁপিয়ে উঠেছে সে। অবশেষে হতাশ হয়ে নিলয় গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ির পথে ফিরে আসে।

ব্যস্ত শহরের মাঝে পরিত্যক্ত পুকুর রয়েছে। বছর খানেক আগে যা পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ ছিল। ছোট বেলায় সন্ধ্যার মন খারাপ হলে অর্নব সরকার এখানেই নিয়ে আসতো। নিলয়ের কেন যেন মনে হচ্ছে সন্ধ্যা এখানে আছে। সন্ধ্যা লগনে সন্ধ্যাবতীর একাকিত্ব নির্জন স্থানে অবস্থান করা ভেবে নিলয়ের ভয় হচ্ছে। গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে নিলয় পুকুরের কাছে যায়। নিলয়ের ধারণাই সঠিক। কাঠ দিয়ে তৈরী পুকুরের আশপাশের রাস্তায়। রাস্তাটা অনেক পুরোনো। হেঁটে গেলে করাত করাত শব্দ হয়। নিলয় সেই পথেই এগিয়ে যায়।
ঘোলাটে পানির দিকে সন্ধ্যা একমনে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা নড়ছে না, শরীরের অঙ্গভঙ্গি ও পরিবর্তন হচ্ছে না। সন্ধ্যার পাশে এইটুকুনি খালি জায়গায় নিলয় খুব সতর্কতার সাথে বসে পড়ে। সন্ধ্যা তখনও স্থির নয়নে অদূরে পুকুরের পানি দেখছে। নিলয় নিশ্চুপ হয়ে সন্ধ্যার দৃষ্টি অনুসরণ করে পুকুরে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যা আগের অবস্থান পরিবর্তন না করেই বলে,

” আমার কাছে পৌঁছতে এত দেরি করলেন যে?

নিলয় হতবাক হয়ে যায়। তার মানে কী সন্ধ্যা তার জন্য অপেক্ষা করছিল? প্রশ্নটা মনে আসে। মুচকি হেসে সে প্রত্যুত্তরে বলে,

“অপেক্ষা করছিলে বুঝি?”
সন্ধ্যা মলিন হাসে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলয়ে দিকে তাকায় সে, এরপর বলে,

” অপেক্ষা বলা ঠিক হবে না। আমি জানি আপনি আসবেন, আমাকে খুঁজবেন। পৃথিবীতে একমাত্র আপনি আছেন যে আমার খবর নিবেন।”
“আজ ঝগড়া করবে না?”
” মুড নেই। আপনার ইচ্ছে করছে?”
” অনেক কিছুই তো করতে ইচ্ছে করে। সবকিছু করা যায় বুঝি?”
” বাদ দেন। সারাদিন কিছু খেয়েছেন?”

আজকে নিলয়ের অবাক হওয়ার দিন। সন্ধ্যাবতীর একেক কথায় অবাকের উপর অবাক হচ্ছে সে। নিজেকে সামলে সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে উত্তর দেয়,

” কাজের চাপে খাওয়া হয়নি। তুমি খেয়েছ?”
” খাইনি।”
“এখন কি করবে?”
“সারারাত এখানে বসে থাকব। আর জীব জন্তুদের পাহারা দেব।”
“মশকরা হচ্ছে?”
“একদমই না।”
“চলো ফিরে যাই।”
” আচার খাবেন? চালতার আচার। মরিচের গুড়া দিয়ে মাখিয়ে ঝাল করে চালতার আচার।”
” আমি ওসব খাই না। তুমিও খেয়ো না। পেট খারাপ করবে।”

সন্ধ্যাবতী বিস্তৃত হাসে। পুকুরপাড় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত বাড়িয়ে দেয় নিলয়ের দিকে। সন্ধ্যার হাসি মাখা মুখ দেখে নিলয় চমকায়। কী হয়েছে সন্ধ্যার যে, সে এমন ব্যবহার করছে? নিলয় ভাবছে, সন্ধ্যা হয়তো কোন বিষয় জেনেছে। যা হওয়ার কথা ছিল না তাই হয়েছে। নিজের ভুলের মাশুল দিচ্ছে সে।

সন্ধ্যাযর হাত না ধরেই নিলয় গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
” অস্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়াই ভালো। চলো কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে যাই, খেয়ে আসি।”

সন্ধ্যা প্রত্যুত্তরে কিছু বলে না। নিলয়ের হাঁটা অনুসরণ করে সে সামনে আগাচ্ছে। আবারো দুজন নিশ্চুপ নিলয় আড়চোখে সন্ধ্যাকে দেখছে। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যাই মুখ খুলে,
” আপনি আমার বয়সে অনেক বড়ো। তবু আপনার নিকট একটি অমান্য আবদার। রাখবেন কী?
” রাখা যায়। তবে আজকে তোমাকে অন্যরকম লাগছে। আমি আগের ঐরাবতীকে মিস করছি।”
” ইরাবতীকে মিস করেন না বুঝি?”
” যার অস্তিত্ব এই জগত সংসারে নেই, যাকে ছুঁয়ে দেওয়ার আমার কোন অধিকার নেই। যার ছায়া কখনো মাড়াতে পারব না। তাকে কীভাবে মনে করি।”
” মানে?”
” সে নেই সন্ধ্যা। মনের অনুভূতি জানানোর পূর্বেই অন্য কারোর হয়ে যায়। বছর পাড় হতেই উপর ওয়ালার প্রিয় হয়ে যায়।”
সন্ধ্যার খারাপ লাগা কাজ করছে। প্রসঙ্গ পাল্টাতে সে বলে,

“আপনাকে অন্যরকম লাগছে।”
“কেমন।”
” এই যে আজ আমাকে আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে আপনি উলটপালট সম্বোধন করছেন না। সেই কখন থেকে তুমি ডেকে যাচ্ছেন। মন যখন ভালো থাকলে তখন তুমি ডাকেন, আর যখন মাথা গরম করে ফেলি তখন আপনি ডাকেন তাই না?”

আজ ছেলে হয়েও সন্ধ্যার কথা শুনে নিলয় লজ্জা পাচ্ছে। মাথা চুলকে হেসে বলে,

” বুঝতে যেহেতু পেরেছ। পাল্টা প্রশ্ন করছো কেন?”
“আপনাকে লজ্জায় ফেলতে।”

তাদের মাঝে আর কোনো কথা হয় না। গাড়ির কাছে আসতেই দুজনে উঠে যায়।
——————–

সময় কীভাবে অতিবাহিত হয় তা কারো জানা নেই। বলা হয়, “সময় এবং স্রোত করা জন্য অপেক্ষা করে না।” কথাটা সত্যি। দেখতে দেখতে অনেকদিন কে’টে গিয়েছে। সন্ধ্যা এবং নিলয়ের মাঝে এখন ঝগড়া কম, বন্ধুত্ব বেশি হয়। এখন তারা একে অপরের খুব কাছের। একে অপরের এত কাছাকাছি আসা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র সন্ধ্যার জন্য। সন্ধ্যা নিলয়ের কাছাকাছি থাকলে কথার ঝুড়ি নিয়ে বসে আর নিলয় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তা শুনে। সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরেও বেশ রাত পর্যন্ত ছাদে বসে আড্ডা দেয় দুজনে।

অফিসে আজ কাজের খুব চাপ। নিলয় সকাল বেলায় নাস্তা না করেই বের হয়ে গেছে। সন্ধ্যাকে গতকাল রাতেই জানিয়ে দিয়েছিল সে আগে চলে যাবে।

সন্ধ্যা তৈরি হয়ে নিজেকে আয়নায় দেখে নেয়। আজ নীল শাড়িতে নিজেকে আবৃত করেছে। হাতে নীল কাঁচের চুড়ি, কানে এক জোড়া ঝুমকো, কপালে ছোট টিপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে চিন্তা করে প্রিয় মানুষটি তাকে এই অবস্থায় দেখলে কী করবে। হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে? নাকি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তির উপর ঢলে পড়বে।
সন্ধ্যা লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলে। এই লাজ একজনের জন্যই হচ্ছে। হাতের বন্ধনীতে সময় দেখে সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
বাবা-মেয়ের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। নিলয়ের জন্মদিনের পর থেকে দুজনের মধ্যে কথা খুব কম হয়। সন্ধ্যার সাজগোজ দেখে নীরব সরকার প্রশ্ন করতে চেয়েও করেনি। মেয়ে চলে যেতেই মুঠোফোনে কাউকে ফোন করে সে।

” তোমার উপর ভরসা করেই এতদিন চুপ ছিলাম। আজ তার বাড়াবাড়ি একটু বেশি পর্যায়ে চলে গেছে। কিছু করো, নয়তো সব ধ্বংস হয়ে যাবে।”
—————

রাফসান এবং হ্যারি আজ প্রথম একটি জরুরী মিটিংয়ের উপর ভিত্তি করে নিলয়দের অফিসে এসেছে। নিলয় নিজেই তাদের স্বাগতম জানিয়েছে। মিটিং রুমে বর্তমানে তিনজন ব্যক্তির আলাপ আলোচনা চলছে। সন্ধ্যা অনুপস্থিত, নিলয় তিন চার বার সন্ধ্যাকে ফোন করেছে। তার আফসোস হচ্ছে কেন সে সন্ধ্যাকে সাথে করে নিয়ে আসেনি। হয়তো জ্যামে আটকে পড়েছে তাই দেরী হচ্ছে। নিলয় একবার হাতের বন্ধনীতে তো একবার দরজার দিকে দৃষ্টি ঘুরাচ্ছে। নিলয়ের ভাবভঙ্গি রাফসান এত সময় ধরে লক্ষ্য করছিল। তাই সে নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
” কোন সমস্যা মিস্টার নিলয়? আপনি কী কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”

রাফসানের কথা শেষ হতেই মিটিং রুমের দরজা দিয়ে সন্ধ্যা প্রবেশ করে তা দেখে নিলয়ের মুখে মিষ্টি হাসির রেখা ফুটে উঠে। আনমনে রাফসানকে উত্তর দেয়,
” একজন নীল পরীর জন্য ছটফট করছিলাম।”

নিলয়ের কথা রাফসানের কানে যায়নি। সন্ধ্যাকে দেখা মাত্রই সে দাঁড়িয়ে যায়। আওয়াজ করে বলে,
” সো লাভলী।”

তিনজনের স্থির চাহনিতে সন্ধ্যা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। কপোলের উপরে আসে অবাধ্য চুলগুলো কানের পিছনে নিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
” আমি খুবই দুঃখিত। আমরা চাইলে এখন মিটিং শুরু করতে পারি।”

নিলয়ের পাশের চেয়ারটায় সন্ধ্যা বসে পড়ে। আড়চোখে নিলয়ের দিকে তাকাতেই নিলয়ের রক্তিম চোখ চোখে ভাসে। সন্ধ্যা শুকনো ঢোক গিলে। এক হাতে কান ধরে আওয়াজ না করে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
” এবারের মতো সরি। আর হবে না।”

সন্ধ্যার সরি বলাতেও নিলয়ের কোন পরিবর্তন হলো না। সে সন্ধ্যার দিকে কঠিন দৃষ্টিপাত করে আছে। সন্ধ্যা ভাবছে তার দেরী করে আসার কারণে নিলয় রেগে কিন্তু আমাদের বোকা সন্ধ্যাবতী তো আর জানে না। নিলয়ের সামনে অন্য একজন সন্ধ্যার প্রশংসা করেছে বিধায় নিলয় রেগে আছে।

যথারীতি মিটিং শুরু হয়ে যায়। রাফসান সর্বপ্রথম কথা বলা শুরু করে।
” আমরা চাইছি আমাদের রানিং প্রজেক্টটা আরো সফল হোক। তারজন্য আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন।”

নিলয়ের ভ্রু যুগল কুঁচকে আসে। প্রজেক্ট ভালো এগোচ্ছে। রাফসানের কথার প্রত্যুত্তরে বলে,
” তার জন্য আমাদের কী করণীয়?”

” আভাদের এই প্রজেক্টটি আরো বঢ়ো করতে হবে তার জন্য অনেক টাকাও ইনভেস্ট করতে হবে।”

” আমরা অলরেডি আমাদের কোম্পানি থেকে সত্তর পার্সেন্ট টাকা ইনভেস্ট করেছি। এখন যদি আরো বাড়াতে চান তাহলে আমাদের দ্বারা সম্ভব না।”

রাফসান একটুও চমকায় না। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে নেয় সে।

” বর্তমানে পুঁজি নিয়ে মাঠে নামাটাই বোকামি। ব্যাংক ব্যালেন্সে আদান প্রদানের হাত লম্বা করতে হয়। আমরাও আপনাদের মতো ইনভেস্ট করেছি। জ্ঞানীদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। আপনি ভেবে দেখুন নয়তো এই প্রজেক্টটি অসফল হয়ে যাবে।”

সন্ধ্যা গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। রাফসানের কথাটা তার কাছে মন্দ মনে হয়নি। সে রাফসানের উদ্দেশ্যে বলে,
” আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু আলাপচারিতাকরে নিয়ে চাই।”
” অবশ্যই সুন্দরী। আপনার জন্য আঘাত সময় রয়েছে।”

রাফসানের লোভতুর দৃষ্টি সন্ধ্যার চোখে এড়ায় না। সে নিজেকে পরিপাটি করে নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
” একটু কেবিনে আসুন তো?”

রাগের বশে নিলয় এতক্ষণ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছিল। সন্ধ্যার মিষ্টি স্বর শুনে রাগ যেন হাওয়ায় মিশে গেল। রাফসানদের থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে যায় কেবিনে।

সন্ধ্যা সিরিয়াস ভঙ্গিতে নিলয়ের সাথে কথা বলতে নিতেই নিলয়ের গাম্ভীর্য মুখশ্রী দেখতে পায়।
” এভাবে ফেলে আছেন কেন? আমি কী করেছি।”

সন্ধ্যার কথা বলাটাই ভুল ছিল। নিলয় সন্ধ্যার নিকট এগিয়ে এসে তার হাত মুচরে ধরে।
” শাড়ি পরে আসতে বলেছে কে আপনাকে, মিস ঐরাবতী?”

” আহ অসভ্য দুর্লয়। শক্তি মানবদের মতো কাজ করলে আপনাকে মানায় না। হাত ছাড়ুন বলছি নয়তো আমি আগের রূপে ফিরে যাবো।”

নিলয় হাত ছেড়ে দেয়। মুখশ্রী অন্য দিকে ফিরিয়ে বলে,
” বলো কেন ডেকেছো।”
” আমাদের মিস্টার রাফসানের কথায় সায় দেওয়া উচিত।”
” কোম্পানির ক্ষতি হবে।”
” হবে না। আমরা দুজন সব সামলে নিব।”
” বলছো তো?”
” হুম। আপনি চাইলে আরিফ সরকারের সাথে আলোচনা করে নিতে পারেন।”
” উনি তোমার দাদা হয়।”
” আমি বাবার আদর্শে বড়ো হয়েছি।”
” এই আদর্শ একদিন তোমার কাল হয়ে দাঁড়াবে।”

নিলয় চলে নিতেই সন্ধ্যা আবারো ডেকে উঠে,
” আমাকে কেমন লাগছে?”
নিলয় থেমে যায়। মুচকি হেসে বলে,

” হাতিনীকে আবার কেমন লাগবে। পেট মোটা আনারস লাগছে।”
———————-

দুই কোম্পানির প্রজেক্টের নতুন করে মিটিং ফাইনাল হওয়ায় রাফসান এবার নিলয় এবং সন্ধ্যাকে রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার একসাথে খাওয়ার আমন্ত্রণ করেন। সন্ধ্যা এবং নিলয়ও অমত করেনি। নামীদামি রেস্টুরেন্টে এসে উপস্থিত হয় সে। তারা বর্তমানে যেই রেস্টুরেন্টে অবস্থান করছে সেখানে একটা অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। এই রেস্টুরেন্টের সকল কর্মচারী মেয়ে।
আলাপচারিতার মাঝেই খাবার চলে আসে। হাসি মজায় রাতের খাবার সম্পন্ন করে সবাই। সন্ধ্যার পায়েস খুব পছন্দের। ডেজার্টের সে পায়েস বেছে নেয়। কর্মচারীরা পায়েস পরিবেশন করার সময় অসাবধানতাবশত সন্ধ্যার শাড়িতে ফেলে দেয়। রাফসান এতে রেগে যায়। কর্মচারীকে বকা ঝকা করে ইচ্ছেমত। নিলয়ের এই বিষয়টি পছন্দ হয়নি। রাফসানকে থামিয়ে সন্ধ্যাকে বলে পরিষ্কার করে নিয়ে আসার জন্য।

শাড়ি পরিষ্কার করে সন্ধ্যা চলে আসতে নিতেই থমকে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার শাড়ির আঁচলে কিছু বাঁধা আছে। সে আঁচলের গিট খুলে দেখে একটা চিরকুট। কৌতূহল বশত সন্ধ্যা চিরকুট খানা চোখের সামনে খুলে ধরে যেখানে লিখা,

” প্রিয় উষসী,
এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? আমি তো তোমায় ভুলতে পারি না! প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছি। তুমিও তাদের সাথে শামিল হলে! ক্ষমা নেই, তোমার, নিলয়ের কারোর ক্ষমা নেই আমি ফিরে এসেছি। তোমার আশাপাশেই আছি। আর কিছুদিন তারপর……

সন্ধ্যা ভয় পেয়ে যায়। চিঠি ফেলে দৌড়ে বের হয়ে যায় সেখান থেকে। নিলয় এদিকেই আসছিল। রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে। সন্ধ্যাকে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে থেমে যায় সে। সন্ধ্যা নিলয়কে দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ভয়ে নিলয়কে জড়িয়ে ধরে বলে,

” সে আমাদের বাঁচতে দিবে না নিলয়, একদম বাঁচতে দিবে না।”

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here