সমাপ্তির প্রহরে সন্ধি পর্ব -২৪+২৫

#সমাপ্তির_প্রহরে_সন্ধি
#সমুদ্রিত_সুমি
পর্ব ২৪

বিষন্নতায় ঘেরা একাকীত্বের বেদনা বড্ড পোড়াচ্ছে নদীকে। আর কত? আর কত তাঁকে নিজেকে সামলে বর্ণকে দূরে সরাতে হবে? সে-ও তো ক্লান্ত এই ভালোবাসা নামক যুদ্ধে। ক্লান্ত শরীরটা অনেকটাই টেনে হিঁচড়ে বাড়িতে নিয়ে এলো সে। সময় তখন পাঁচের ঘরে বিদ্যমান। লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করতে করতে দেরি হ’য়ে গেছে অনেকটা। গোধূলী আলো তখন কিছুটা নিভে আসছে ধরণীর সুদূর পরাহত থেকে। পাখিরাও নিস্তব্ধ হয়ে ফিরে যাচ্ছে তাঁদের বাসভবনে। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশের বুকে। সময়চক্র যেন তাঁর গতি কোথাও থামতে দ্বীধামত পোষন করেছে। নির্লিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে একবার পশ্চিমে ঢ’লে পড়া সূর্যের দিকে আনমনে তাকালো। কোথাও সেও কি ব্যথা পেয়ে ব্যথিত হয়েছে আজ,নদীর মতো। একদম না! যদি সূর্যও ব্যথিত হতো তাহলে অপরাহ্নে কেন ঝলমলে রোদ্দুর্র নিয়ে দুপুরের বেলায় খেলা করলো শুভ্র নির্মল আকাশে। যেখানে সকালের উষ্ণতা শুরু হয়েছিলো গা ছমছমের হস্যময়তা হিমেল হাওয়ার স্পর্শ পেয়ে। নিমগ্ন হয়ে খানিক চেয়ে রইলো ওই কলমা রঙে নিমজ্জিত গগনচুম্বী পালের নিকটে। বক্ষঃপঞ্জর থেকে এক গভীরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জায়গা প্রস্থান করে ওয়াশরুমের নিকট এগিয়ে গেলো সে। বেলা ফুরাবার পথে হাঁটতে রইলেও,এখন গোসল না করলে অসস্থি লাগবে। তাই শরীরটা ঠেলেঠুলে ওয়াশরুমের দিকে পদদ্বয় চালিত করলো। ঠান্ডা শীতল পানি গতরে পড়তেই শিউরে উঠলো সকল শরীর। ঠোঁটে ঠোঁটে সংঘর্ষ হয়ে উভউত্তল শব্দ হলো। কোন রকমে সন্তপর্ণে বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। তোয়ালের ছোট্ট একটু অংশ মাথায় ঘসতে ঘসতেই বিছানার উপর বসে পড়লো সে। চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে অলস ভঙ্গীতে শরীরটা বিছিয়ে দিলো নরম তুলতুলে বিছানায়। হাত প্রসারিত করতেই কোন ফরফর আওয়াজ কর্নকুহুরে পৌঁছালো। অর্ধখোলা পল্লব দু’টো পুরোপুরি মেলে মাথাটা পিছনের দিকে ঠেলে এক নজর বোলালো। বিছানার এক কোণে সবুজ রঙের প্যাকেট দেখে নদী ঈষৎ বিমূঢ় হয়ে উঠে বসলো। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে তরঙ্গিত করার চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ। কিন্তু কোন কিছুই তাঁর বোধগম্য হলো না। হঠাৎ করেই বর্ণের কথা মনে পড়তেই বক্ষঃস্পন্দন কেঁপে উঠলো। তাহলে কি সে এখনো ফিরে যায়নি? কোন বাকবিবেচনা না করে দ্রুত প্যাকেটা সে খুললো। প্যাকেটা খুলতেই সেখানে থেকে টুপ করে একটা নিল রঙের কাগজের টুকরো পড়লো নদীর পায়ের নিকট। কাগজটা তুলতেই বুঝলো এটাকে শুধু কাগজ বলা যায় না, চিরকুটও বলা যা। নজর বোলালো সেই গোটাগোটা অক্ষর আকৃতির বাঁকানো অদ্ভুত সুন্দর শব্দের পানে। যেখানে হয়তো মানুষটার কষ্ট লেখা আছে। কিনবা কিছু না পাবার যন্ত্রণা বিবরণ করে সাজিয়ে গুছিয়ে নদীর নিকট প্রস্থান করেছে সে। মানুষটা প্রতিজ্ঞা করেই এখানে এসেছে! বারংবার নদী ফিরিয়ে দিবে আর সে ফিরে এসে বলবে “ভালোবাসি” ইসস ভালোবাসি শব্দটা মনিকোঠায় গিয়ে কেমন যেন ধাক্কা খেলো। বিদ্রুপের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণায়। স্রোতের নদী নামক জলস্রোতে মরণ বিষের যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে,সেটা কি তবে সে জানে না। তুমি তো বর্ণ শুভ্র নির্মল রোদের মতো! বৃষ্টিকে কেন এতো ভালোবাসো? বৃষ্টি এলেই তোমার অস্তিত্ব বিলীন হলো। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে হুট করেই সেই গোটাগোটা অক্ষরে নদীর নরম ঠোঁটের চুমু বসালো। মানুষটাকে ছুঁয়ে দেওয়ার অধিকার তো তাঁর নেই ! এভাবেই যদি ছুঁয়ে দেখা যায় দোষ কোথায়? ক্রমশ বুকের ধুকপুক বেড়ে গেলো অস্বাভাবিক ভাবে। বক্ষঃস্পন্দনের সাথে কেঁপে উঠলো পুরো শরীর।

_ বন্ধুরা বলতো ভালোবাসার রঙ নীল। নীল নাকি ব্যথার রঙ। তাই আমি তোকে আমার লেখা প্রথম ভালোবাসার নীল রঙের চিরকুট দিলাম। কারণ আমাদের পরিস্থিতি ঠিক নীল রঙের কাগজের মতো। তখন তুই তাড়িয়ে দিলেও কেন জানি আমি যেতে পারিনি। আজ না-হয় থেকে গেলাম তোদের বাড়িতে ভালোবাসার ভিক্ষারি হয়ে। তোর কি খুব কষ্ট হবে একদিন যদি তোর কাছাকাছি থাকি? তখন যদি চলে যেতাম আমার এই বক্ষঃস্থলে ভিষণ ব্যথা হতো! হয়তো সেই ব্যথা সইতে না পেরে আমার মৃত্যুও হয়ে যেত। আমার তো বড্ড স্বাধ তোকে নিয়ে হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকার। বড্ড লোভ তোকে দেখে কয়েকটা যুগ পাড় করার। আর এই অবাধ্য মনের কথা কি’বা বলবো বল। আজকাল অদ্ভুত এক স্বপ্ন আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। যে স্বপ্নের প্রণয়ী নারী তুই। স্বপ্নটা যখন ভেঙে যায়, আমি তখন নিভন্ত চোখ জোড়া খুলে তোকে খুঁজি। খেয়াল ফিরতেই নিজের উপর ভিষণ হাসি পায়! বিদ্রুপের হাসি। পাংশুটে ম্রিয়মাণ হয়ে যায় তখন আমার মন। কী এমন স্বপ্ন আমি দেখি সেটাই ভাবছিস তাই না? তাহলে শোন–

মৃদু হাওয়ায় দুলছে তোর শাড়ির আঁচল, কপালের কৃষ্ণ গৌড় রঙের ছোট্ট টিপ,হাতে সাদা-কালো রেশমি চুড়ির ঝংকার,কর্ণের সেই ছোট্ট ছিদ্রে একজোড়া শুভ্র নির্মল সাদা রঙের দুল,ঠোঁট গাড়ো রঙের লাল টুকটুকে রক্তে মাখামাখি, ডাগর আঁখি জোড়ায় কাজলের সাথে টলটলে নিশ্বাপাপ এক ফোঁটা জল,গতরে সিলভার রঙের শাড়ি,আঁচলে এক টুকরো আকাশ উড়বে! পাশে আমি দাঁড়িয়ে প্রেমের আলাপে ব্যস্ত। হঠাৎ প্রেম আলাপের সূত্র ধরে আনমনে তোর হাতটা ধরছি। তুই লজ্জা পেয়ে ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে লজ্জা মিশ্রণ হাসি ফুটিয়ে তুলে হাত সরিয়ে নিচ্ছিস। এমন স্বপ্ন আমি রোজ দেখি! কিন্তু সেটা তন্দ্রাঘোরে। একবুক আফসোস নিয়ে রোজ বালিশে মাথা গুঁজি। ঘুমকে বলি,আজ অন্তত এই স্বপ্নে আমায় বিভোর করিস না। কিন্তু ঘুম আমার কোন কথাই শুনতে নারাজ। ওরা তো জানে না তোর মনের খবর? তাই সকল দ্বিধা অনতিদূরে রেখে তোর কাছে আবদার করলাম। হ্রদের মতোই কঠিন হৃদয় ছুঁয়ে দিতে চাওয়ার একটু প্রচেষ্টা কে করতে চায় না বল? তা-ও সেই মানুষটা যদি ভালোবাসার মানুষ হয় তবে? লোভটাকে আজ প্রশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছে হলো তাই দিলাম। যদি তুই তোর হৃদয়কে একটু নরম করতে পারিস তাহলে না-হয় একটু আমার মনের মতো সেজেগুজে বাহিরে আসিস। আমি অপেক্ষায় আছি। আমি তোকে পাবো না এটা জেনে গেছি। এই রূপে নাহয় আমার সামনে একটু এলি। কথা দিলাম ছুঁয়ে দেখবো না,দূর থেকেই তৃষ্ণা অনুর্বরতা হবে আমার। কারণ চাঁদ ছোঁয়া বামুনের কাজ নয়। একদিন না-হয় সকল শেকল ভেঙে অবাধ্য হলি। কারো কিচ্ছু হবে না,কেউ অনশন ডাকবে না,কেউ অনাহারেও মরবে না,ফুলেরা সৌরভ ছড়াতেও ভুলবে না,নদী নিজের গতিবিধি পাল্টে ফেলবে না,পাখিরা গান গাইতে ভুলবে না। আজ না-হয় একটু বুনোফুল হয়ে আমায় ব্যকুল করলি,কিনবা অচেনা রূপে সামনে এসে একটু মুগ্ধ করলি।

ইতি,
তোর হতে না পারা
ব্যর্থ প্রেমিক

—————-

কি গো তোমাদের গোছানো হলো? মাগরিবের আজান পড়েছে প্রায় আধ ঘন্টা। আমি নামাজ পড়ে চলে এলাম আর তোমরা এখনো সব সাজাচ্ছো। মেয়েটা সারাদিন বাহিরে ছিলো। কিছু না খেয়ে গোটা একটা দিন পার করে দিলো। আর তোমরা ঘরে বসেও একটু ওর জন্য রান্না করে শেষ করতে পারলে না সময় মতো। এক্ষুণি তো ঘর থেকে বের হয়ে চলে আসবে।

ব্যস্তভঙ্গিতে কথা গুলো বললেন মান্নান সাবেহ। মান্নান সাহেবের কথা শুনে মুচকি হাসলো মিম আর ঝর্ণা। তারা খাবার টেবিলে পানির জগ,গ্লাস,খাবারের প্লেট সাজিয়ে রাখছে। ছোট বোনের জন্য বাবা-র উতলা হওয়ার ব্যপারটা ভিষণ উপভোগ করে ঝর্ণা। যেখানে অন্য সকল প্রতিবন্ধীদের পরিবার থেকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয়,সেখানে নদী খুব লাকী। নদী একটা পরিপূর্ণ পরিবার পেয়েছে, এবার একজন পরিপূর্ণ আদর্শবান জীবন সঙ্গী পেলেই সব সুন্দর হবে তাঁর আদরের ছোট বোনের। কিন্তু একটু অভিমানী ভাব ধরে বাবা-র নিকট অভিযোগ পেশ করলো ঝর্ণা।

_ তুমি নদীকে একটু বেশি ভালোবাসো,আমায় একটুও ভালোবাসো না।

বড় মেয়ের এমন আহ্লাদী প্রশ্নে মান্নান সাহেব মুচকি হাসলেন। ঠোঁটের হাসি প্রসারিত করেই মেয়ের উদ্দেশ্য বললো।

_ তাই বুঝি,আচ্ছা তাহলে আমি সবাইকে বলে দেই মেয়ের পাগলামি দেখে এখনো আমাকে মাঝরাতে বড় মেয়ের আবদার জন্য ছুটতে হয় দোকানে আইসক্রিম কিনতে। তাঁর শখ পূরণ করতে আমাকে এখনো মাঝে মাঝেই তাঁকে রান্না শেখাতে রান্নাঘরের খুন্তি নাড়তে হয়। যখন তাঁর খুব কষ্ট হয়,তখন আমার এই পেকে যাওয়া লোমের মাঝে তাঁকে টেনে নিয়ে আদর করতে হয় আর বলতে হয়– ” বাবা আছি তো ভয় কিসের”?

_ না না, না আব্বু। আমার মানসম্মান তুমি ফালুদা করো না! দেখা যাবে শ্বশুর বাড়ির লোকও আমায় নিয়ে মজা করছে। ঠিক আছে তুমি তোমার ছোট মেয়েকে বেশি ভালোবাসো আমি কিচ্ছু বলবো না,তবুও আমার মানইজ্জত প্লাস্টিক বানিও না।

কথা শেষ করেই ঝর্ণা নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। আর সবাই ঝর্ণার কথায় হেঁসে পেট ব্যথা করছে। হঠাৎ মিম বলে উঠলো–

_ আপু তুমি রাগ করো না,আসলে নদী তো প্রতিবন্ধী তাই বড় চাচ্চু ওকে বেশি ভালোবাসে। বড় চাচ্চু তোমায়ও ভালোবাসে কিন্তু প্রকাশ করে কম! কিন্তু নদী যেন নিজের অক্ষমতার জন্য কষ্ট না পায় তাই সবার সামনেই ওকে বেশি ভালোবাসে। সমাজের লোকেরা তো ওকে পছন্দ করে না,প্রতিবন্ধী কিনা?

মিমের এহেন কথায় হাসোজ্জল পরিবেশটা ঘন-কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। মেঘে মেঘে সংঘর্ষে বজ্রপাত সৃষ্টি হলো যেন? পরিবেশটা থমথমে হতেই মিমের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ জানান দিলো মুখ ফস্কে কতোবড় একটা কথা সে বলে ফেলেছে। নিজের ভুল স্বীকার করতে যাবে তাঁর আগেই সাগর ছুটে এসে ঈষৎ রেগে মিমের হাত চেপে ধরে ফিসফিস আওয়াজে বললো–

_ কি বলছো মিম মাথা ঠিক আছে তোমার? বাবা সশরীরে এখানে উপস্থিত আর তুমি কিনা?

_ না মানে–

_ ভাবির হাত ছেড়ে দাও ভাইয়া। নিশ্চয়ই সে ভুল বলেনি। প্রতিবন্ধীকে প্রতিবন্ধী বলবে এটাই স্বাভাবিক। সত্যিটা শুনলে তোমারা যে কেন এতো রেগে যা-ও বুঝি না?

নদীর কন্ঠ স্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সকলে পিছন ঘুরে তাকালো। সকলের সাথে বর্ণও তাকালো একবুক আশা নিয়ে। রোজ দেখা স্বপ্নটা বুঝি আজ পূরণ হলো। কিন্তু সে যেটা দেখলো তা যেন বিশ্বাস হলো না তাঁর। নদী তাঁর দেওয়া শাড়ি তো দূর একটা চুড়িও নিজের হাতে জড়ায়নি! তাহলে কী নদী তাঁর কথা রাখলো না। ব্যথিত পল্লব জোড়ায় নেমে এলো বিষাদের ছাপ। উষ্ণতা পেতেই যেমন বরফ শীতল জলে পরিণত হয়,ঠিক তেমনি বর্ণের কষ্টটের বরফটা জল হয়ে গড়িয়ে পড়লো তাঁর পল্লব জোড়া বেয়ে। সকলের অগোচরে নেমে আসা চোখের জলটুকু মুছে নিলো সে। অন্য দিকে ফিরলো নিজেকে একটু সামলে নিতে।

যাঁর নাম ধরে ডাকা বারণ, তাঁর নামের অর্থ জানতে চাওয়ায় থাকতে নেই বিষেস কোন কারণ। যতোবারই ভাবি ভুলে যাবো সব আঘাতের ক্ষত! ততোবারই তুমি নতুন করে আমাকে ব্যথা দিয়ে ব্যথিত করো। কথাগুলো মনে মনে আওড়ালো নদী। বর্ণের লুকিয়ে রাখা জলটা কারো চোখে পরুক আর না পরুক,নদীর চোখে ঠিক পড়েছে। নিজেকে ধাতস্থ করে নদী তাঁর মায়ের নিকটে গিয়ে বললো–

_ মা খিদে পেয়েছে খেতে দাও।

মেয়ের কথার উপর কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। নদীর মোহগ্রস্ত চেহারায় আজ যেন বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট। কেন এই বিষন্নতা তা কেউ জানে না? সবাই মনে করলো হয়তো মিমের কথায় তাঁর খারাপ লেগেছে। কিন্তু সত্যি তো অন্য কিছু, তা কারো আর জানা হলো না। সবাই মিলে খেতে বসে পড়লো একসাথে। টেবিলে এলাহি আয়োজন করেছে মিনা বেগম। বেগুন ভাজা থেকে শুরু করে গরুর গোস,পাবদা মাছ, রুই মাছের মুড়িঘন্ট,চিংড়ি মাছ ভুনা, ডাল,পোলাও সাথে চপ। সব নদীর পছন্দের খাবার। খাবারের এমন এলাহী আয়োজন দেখে নদী বিমূঢ়তা ধরে রাখতে না পেরে বলেই ফেললো–

_ আমাকে কি আজই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো মা, যে এতো আয়োজন। আর এই চপ কে তৈরি করেছে,একদম ভিন্ন রঙের।

মেয়ের কথায় মিনা বেগম নিরবে হাসলেন। মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন —

_ সব কিছু থেকে একটু একটু খাবি। রান্না ছাড়া তো কোন আয়োজন করতে দিস না এই দিনে তুই তাই আরকি। আর চপ মিম বানিয়েছেন নিজের হাতে। বললো তাঁর পক্ষ থেকে তোর জন্য এই চপটা।

_ মৃত্যুর নিকট আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম মা। তাই এই দিন নিয়ে আয়োজন না করাই ভালো। চপটা খুল লোভনীয় দেখাচ্ছে মা, আগে এটাই খাবো। আর এতো এতো খাবার এই সন্ধ্যা সাতটায় খাওয়া সম্ভব বলো তো ? আমি রাক্ষসী অথবা হাতি নই যে এতো খাবার এক সাথে খাবো।

_ একা খেতে না পারলে আমায় সাথে নিয়ে খেও নদী! আমি কিন্তু খুব খাদ্য রসিক মানুষ। তুমি বসে থাকবে আমি খাবো,বেস মিলবে আমাদের। নিজেরটা খাবো সাথে তোমারটাও।

হঠাৎ অপরিচিত কন্ঠে নদী কিয়ৎপরিমাণ অবাক হলো। পিছন ফিরতেই দেখতে পেলো একজন সুদর্শন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো মানুষটাকে চিনতে। ফোনের স্কিনে দেখা যুবককে এভাবে হঠাৎ নিজের চোখের সান্নিধ্যে পাবে তা যেন নদী ভাবতেও পারেনি। নিজের নিমগ্ন খানিক দূরে ঠেলে বিমূঢ় দৃষ্টিতে বর্ণের দিকে তাকালো। অভিধানের সকল ব্যথা আজ একসাথেই কি এই মানুষটার পাওয়ার কথা ছিলো? সকালে তাঁর রুষ্ট আচরণ, তাঁর ইচ্ছেকে অগ্রাহ্য করা,এখন এই মানুষটার উপস্থিতি। সব যেন আজ দাউদাউ আগুনের শিখা।
#সমাপ্তির_প্রহরে_সন্ধি
#সমুদ্রিত_সুমি
পর্ব ২৫

ওভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছো কেন? তোমার জন্মদিন উপলক্ষে যে খাবারের আয়োজন আন্টি করেছে,সেখান থেকে আমাকে ভাগ দিবে না। আচ্ছা না দিলে সমস্যা নেই আমি না-হয় অন্য একদিন খাবো, কী বলো? সেদিন তুমি ভাগ না দিলে-ও চলবে।

শাওনের কথায় আমি কি রিয়াকশন দিবো জানি না। আমি আবারও একটু আঁড়চোখে বর্ণ ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তাঁর চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। আমি চোখ সরিয়ে শাওনকে প্রশ্ন করলাম।

_ কবে আসলেন? আর আসবেন আমায় তো জানাননি।

_ তোমায় সারপ্রাইজ দিতে চলে এলাম। কেমন লাগলো আমার সারপ্রাইজ? আর জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আজকের দিনের জন্য আল্লাহকে অনেক ধন্যবাদ। কারণ তিনি তোমায় এই পৃথিবীর বুকে না পাঠালে আমি কোথায় খুঁজতাম তোমায়। আর এমন হাজারটা জন্মদিন তোমার জীবনে আসুক, সাথে আমি যেন থাকি। এবারের জন্মদিনটা একাই আছো! পরের বছর আমি সাথে থাকবো।

_ আগে থেকেই কোন কিছু বলা যায় না ভাই। সময়ের চক্র কোথায় ঘুরে যাবে কে বলতে পারো বলো? আর নদী তো,কখনো কোথায় স্থীর হয়ে স্থান নেয় না। কোন মোহনায় গিয়ে সে মিলিত হবে এখনো বলা যাচ্ছে না। তাই এখনি এতো আশা করো না। পরে সেই আশার জন্য কষ্ট পেতে হলে সহ্য করতে পারবে না। আমার কথায় মাইন্ড করো না যেন?

কথাগুলো বলেই শাওনের কাঁধে বর্ণ হাত বোলালো। শাওন তখন বর্ণের বলা কথাগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাঁর মনোক্ষুণ্ণ কথাগুলোর অর্থ বুঝাতে ব্যর্থ হলো। সাথে শাওন বর্ণকে চেনার চেষ্টা করছে। শাওনের কৌতুহল হয়তো মান্নান সাহেব বুঝতে পারলেন। তাই তিনি এগিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

_ ও হচ্ছে আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে বর্ণ। নদীর কাজিন।

এবার শাওনের কৌতুহল কমলো। সে-ও হেঁসে বর্ণকে বুকে জড়িয়ে নিলো আর বললো–

_ আশায় বাঁচে চাষা। আমিও করি আশা,পূরণ করার মালিক আল্লাহ। স্বপ্ন দেখাতে মানা হলেও দেখতে মানা নেই! তাই আমি দেখি। অন্তত এমন একটা মেয়েকে পাবার আশা আমি সারাজীবনই করেছি।

শাওনের কথায় বর্ণের ভেতরে কি চললো কে জানে? যদি শাওন তখন বর্ণের মনের অস্থিরতা একটু অনুভব করতে পারতো,তাহলে শাওন কখনো তাঁর বুক বারিয়ে জড়িয়ে নিতো না বর্ণ ভাইয়াকে। বর্ণ ভাইয়ের ইঙ্গিত আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক আমি ঠিকই বুঝলাম। আমি আর কোন কথা না বলে খেতে বসে পড়লাম। সবাই একসাথে খেতে বসলাম। খাবারের টেবিলে টুকটাক কথা বললো বাবা আর শাওন। পাশে বসে সাগর ভাইয়া মা-ও কিছু উত্তর দিলো। কিন্তু পুরোটা সময় বর্ণ ভাইয়া নিরবচ্ছিন্ন ভাবে খেয়ে গেলো। আমি সব কিছু থেকে একটু একটু খেলাম। গলা দিয়ে যেন খাবার নামতে চাইছে না। পানি খেয়ে উঠতে নিলেই হঠাৎ মিম ভাবি আমার হাত টেনে ধরলো।

_ কি করছো নদী,উঠে যাচ্ছো কেন? আমি যে তোমার জন্য এতো কষ্ট করে চপ তৈরি করলাম খাবে না।

ভাবির কথায় খেয়াল হলো একটু আগে তো আমিই চপের বিষয়ে কত কথা বললাম। আমি হাসিমুখে আবারও বসে চপ হাতে নিলাম। চপ নিয়ে মুখে দিতেই অনেক স্বাদ অনুভব করলাম। তিনটা চপ খেয়ে ফেললাম কয়েক মিনিটের মাঝেই। পানি খেয়ে উঠতে নিলে বাবা ইশারা করলেন বসতে। বুঝতে পারলাম জরুরি কিছু বলবেন হয়তো। কিছুক্ষণ পর বাবা নিজের কথা শুরু করলেন।

_ শাওন দুই মাসের ছুটিতে এসেছে। তারপর আবার ফিরে যাবে। চারমাসের মাথায় ওর ফাইনাল এক্সাম। তাই ওদের পরিবারের সবাই চাচ্ছে কিছু দিনের মাঝেই বিয়েটা সম্পূর্ণ করতে। আমি তাঁদের তেমন কিছু বলিনি। তোমার সাথে কথা না বলে তো কোন কথাও দিতে পারছি না। আমি ভাবছি,যেহেতু ঝর্ণাকে শ্বশুর বাড়িতে উঠিয়ে দেইনি,তাই শাওনের পরিবারকে বলবো অল্প আয়োজনে না-হয় তোমার আর শাওনের আকদটা এখন করে রাখি। পরে না-হয় বড় আয়োজন করা যাবে,তুমি কি বলো?

আমি বাবা-র কথায় ঈষৎ কেঁপে উঠলাম। নিচু চোখে একবার পরক করে নিলাম বর্ণ ভাইয়ের মতিগতি। তিনি কেমন জানি নিভন্ত চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো। আমি চোখ সরিয়ে বাবাকে বললাম।

_ তোমার ইচ্ছে আব্বু,আমার মতামত নেই।

_ তবুও মা,হুট করেই আমি তোমার বিয়ে ঠিক করলাম! তাই এই বিষয়ে তোমার মতামত নেওয়াটা আমার প্রয়োজন। আর তোমার কি হয়েছে তুমি এতো ঘামছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে কি?

বাবা-র কথায় আমি কপালে হাত দিলাম, হ্যা আমার শরীর অস্বাভাবিক ভাবে ঘামছে। কিন্তু কেন? হঠাৎ করেই আমার সারা শরীরে জ্বলতে শুরু করলো সাথে অসস্থি। কয়েক মুহূর্তের মাঝেই বুঝতে পারলাম আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছে। অস্বাভাবিক ভাবে আমার সারা শরীরে গোটাগোটা কি যেন উঠেছে। হাত লাল হয়ে গেছে অসম্ভব পরিমাণে। যা বোঝার আমি বুঝে গেলাম।

_ ঝর্ণা আপু আমার ইনহেলারটা নিয়ে আয়। ওটা ড্রেসিংটেবিলের ডান ড্রয়ারে রয়েছে। তাড়াতাড়ি যা।

সবে ঝর্ণা আপু মুখে একটা চপের কিছু অংশ দিয়েছে। আমার কথায় মুখ তুলে চাইলো। আমার অবস্থা খারাপ দেখেই সেটা প্লেটে রেখে উঠে দাঁড়ালো। সাথে সবাই নিজের চেয়ার ছেড়ে আমার নিকট দৌড়ে এলো। খেয়াল করলাম বর্ণ ভাইয়াও ছুটে আসছে। কিন্তু তিনি ছুটে আসার আগেই শাওন আর বাবা আমায় ঘিরে ধরলেন। মা আর ভাবি ভয়ে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করলেন।

_ মা কি হয়েছে তোমার? হঠাৎ করেই শ্বাসকষ্ট কেন শুরু হলো?

_ আব্বু খুব কষ্ট হচ্ছে, প্লিজ ইনহেলারটা নিয়ে আসো। আমার সারা শরীর অসম্ভব জ্বালা করছে। উফপ ঝর্ণা আপু যা।

আমার চিৎকারে যেন ঝর্ণা আপুর বোধগম্য হলো। সে দৌড় দিলো ইনহেলার আনতে। আমি চেয়ারের এক অংশ চেপে ধরলাম। মাথা নিচু করতে নিলেই বাঁধ সাধলো শাওন।

_ না নদী, মাথা নিচু করো না। উঠে দাঁড়াও। আমি সাহায্য করছি। তুমি এলার্জির কিছু খেয়েছো,তাই এভাবে সারা শরীর অসম্ভব জ্বলছে। উঠে দাঁড়াও নদী,উঠে দাঁড়াও। আর চুল ভেজা কেন তোমার? তুমি কি ভরসন্ধ্যায় গোসল করেছো? এটা ঠিক না নদী। নিজের প্রতি এতো অভিচার কেন তোমার? এগুলো কিন্তু আমি একদম মেনে নিবো না।

নদীর হাত আগলেই শাওন নদীকে দাঁড় করালো। মান্নান সাহেবের বুকের সাথে ঠেক দিয়ে দাঁড় করালো নদীকে শাওন।

_ আঙ্কেল আপনি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকুন। ওকে বসানো যাবে না,তাতে ওর শ্বাসকষ্ট বাড়বে। নদী অস্থির হয়ো না,শান্ত থাকো। ঠিক হয়ে যাবে সব, চিন্তা করো না। আপু গেছে ইনহেলার আনতে এক্ষনি চলে আসবে।

নদী তাঁর বাবাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পাশেই নদীকে আগলে ধরে রেখেছে শাওন। সবটাই নীরবে পরিদর্শন করলো বর্ণ। নিজেকে আজ ধিক্কার জানানোর ইচ্ছে হলো। কই কখনো তো সে এভাবে নদীকে আগলে রাখেনি। আসলেই নদী কেন তাঁকে ভালোবাসবে? যে মোহ আছে তা হয়তো নদী কাটিয়ে উঠবে একদিন শাওনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শক্তির জন্য। সে আজ পর্যন্ত নদীর জন্য কি করতে পেরেছে। দিনের পর দিন তাঁর মায়ের থেকে নদী আঘাত পেয়ে গেছে! অথচ বর্ণ জানতেই পারেনি। সেখানে শাওন কতো সুন্দর করে নদীর ভালো খারাপের খোঁজ রেখেছে সাথে রাখছে। আসলেই সে নদীর যোগ্য নয়। তাঁকে ফিরে যেতে হবে। সে’কে নদীর এমন সুখ কেঁড়ে নেওয়ার? তাঁর কোন অধিকার নেই নদীর উপর। সকল অধিকার অন্য কারো। শাওন অধিকার অর্জন করে নিয়েছে নদীর কাছ থেকে সাথে ওর পরিবার। পুরো শরীর নিঃসাড় হয়ে গেছে এমন পরিস্থিতির নিরসনের জন্য । আর কোথাও ভেঙে যাওয়ার মতো কিছু নেই। যা অবশিষ্ট ছিলো সেটাও হয়তো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। আজ হৃদয় ভেঙে কতো টুকরো হলো যেন? গুনতে গেলে হয়তো কোন কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। বক্ষঃপঞ্জরে শুরু হলো সেই পুরাতন ব্যথা। ভাগ্যিস এই ব্যথার কোন ঔষধ নেই! তাহলে হয়তো সবাই এই ব্যথার খবর পেয়ে যেত। একবুক কষ্ট নিয়ে বর্ণ বের হয়ে গেলো। ওর যে এখানে কোন কাজ নেই। তাঁর ভালোবাসাকে ভালো রাখার জন্য অন্য কারো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা রয়েছে। এখানে তাঁর ঝামেলা বারিয়ে লাভ নেই। যে দু’দিন পরেই অন্য কারো দলিলে লিখিত হবে,তাঁর প্রতি তাঁর কোন অধিকার থাকতে নেই। বর্ণ বেরিয়ে গেছে। তাঁর অশান্ত মন হয়তো খেয়াল করলো না তাঁর চলে যাওয়ার পথে কেউ তাকাতেই তাঁর কষ্টটা হুট করেই বহুগুণ বেড়ে গেছে। শ্বাসরুদ্ধকর কষ্ট ঝাপিয়ে বক্ষঃপঞ্জরে গিয়ে ঠেকলো। চোখের কোণা বেয়ে অধর ছুয়ে আরো একফোঁটা জল গড়িয়ে ফ্লোরে পড়লো। সে-ই জলটা হয়তো জানে কতোটা কষ্টে কেউ তাঁকে ঝাড়িয়েছে। নদী ব্যঙ্গার্থ করলো নিজের মনকে। হায়’রে মন তুই কার উপর রোষাগ্নি হচ্ছিস,যে নিজের উপরেই রোষানল হয়ে আছে। ওরে মন তুই তাঁকে কাছে রাখার ইচ্ছে পোষণ করিস না। যে থাকতে চায় না,তাঁকে যে রাখতে নেই। যে অধিকার থেকে পালিয়ে যেতে চায়,তাঁকে কেউ ধরে রাখতে পারে না। অদৃশ্য এক হাসি ফুটে উঠলো নদীর ঠোঁটের কোণায়। মানুষটা আজ-ও অবুঝের মতো আচরণ করলো। সে চাইলেই নিজের অধিকার খাঁটিয়ে শাওনের হাত সরিয়ে নিজের বাধঁন শক্ত করে নদীকে জড়িয়ে নিতেই পারতো। কিন্তু সে একবুক অভিমান নিয়েই চলে গেলো তাঁর গন্তব্য শহরের নিকটতমে। ফের নতুন করে চোখের জল গড়িয়ে পড়লো নদীর।

ঝর্ণা ছুটতে ছুটতে ইনহেলার নিয়ে বোনের হাতে দিলো। সন্তপর্ণে নদী ইনহেলার তিনবার হা করে স্প্রে করলো। কিছুক্ষণ যেতেই নদী শান্ত হলো। চেয়ার টেনে ওকে বসানো হলো। নদী বসতেই ঝর্ণা ওর হাতে লেবুর রস মাখাতে রইলো।

_ কি এমন খেলি তুই, যে হঠাৎ এই অবস্থা হলো? সব কিছুই তো মা রান্না করেছে। আর মা তো তোর এলার্জির কোন খাবার রান্না করেনি। আর বেগুন,বেগুনে তো তোর এলার্জি নেই।

_ আমার মনে হয় এই চপে কোন সমস্যা আপু।

শাওনের কথায় সবাই তখন ভাবির দিকে তাকালো। ভাবি মাথা নিচু করে আছে। সাগর ভাইয়া ছুটে ভাবির মুখোমুখি দাঁড়ালো।

_ কি করেছো তুমি,আর চপ কি দিয়ে তৈরি করেছো?

_ সাধারণ উপকরণ দিয়েই চপটা তৈরি করেছি বিশ্বাস করো আমি কিছু করিনি।

_ যদি কিছু না করেই থাকো তাহলে আমার বোনের এমন হলো কেন? তুমিই তো নিজের চোখে দেখলে চপটা খাওয়ার ফলস্বরূপ আমার বোন কীভাবে কষ্ট পেলো।

_ আমি–

_ ভাইয়া ভাবির কোন দোষ নেই। ভাবি হয়তো ছোট চাচির কাছে জিজ্ঞেস করেছিলো আজ আমার জন্মদিন, সে আমাকে কি রান্না করে খাওয়াতে পারে। তখন চাচিই হয়তো ভাবিকে চপের কথা বলেছে। আর চপে মাশরুম দিতে বলেছে। ভাবি হয়তো জানে না আমার মাশরুমে এলার্জি আছে। কিন্তু চাচি জানে। বোকা চাচি আমায় কষ্ট দিতে গিয়ে নিজের মেয়েকে সবার সামনে ছোট করলো। আল্লাহ মানুষ এতো খারাপ কি করে হয়। আমি ঘরে যাচ্ছি। ভাবিকে আর কিছু বলিস না। ভুলটা আমারি, আমার দেখে বুঝে খাওয়া উচিত ছিলো। আসলে আগে-পরে কখনো মাশরুমের চপ খাওয়া হয়নি,তাই বুঝতে পারিনি খাওয়ার সময়। অবশ্য এই বিষয়টা পুরোই আমি আন্দাজে বললাম। ভাবি আমি যা বললাম সত্যি কি তাই? চাচিই তোমায় মাশরুমের চপ বানাতে চলেছে।

আমার কথায় ভাবি কেঁদে উঠলো। কান্নারচোটে সে কিছু বলতে পারলো না। আমাদের যা বোঝার আমরা সবটাই বুঝে নিলাম। আমি কাউকে কিছু না বলেই ওখান থেকে নিজের ঘরে চলে এলাম। মানুষের রূপ বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়,যেমন মিম ভাবির রূপ বদলে গেলো। মায়ের অপমান কোন মেয়েই সহ্য করতে পারে না। তাই হয়তো মিম ভাবিও পারেনি। সবার সামনে তাঁকে ছোট করার ইচ্ছে হলো না,তাই সত্যিটা লুকিয়ে গেলাম। তাঁকে কথার ফাঁকে একদিন আমি বলেছি আমার মাশরুমে এলার্জি আছে। সবটা জেনেও যখন সে এটা করেছে তাঁর মানে ইচ্ছে করেই করেছে। কিন্তু এভাবে সকলের সামনে চাচির নামটা নিলাম ইচ্ছে করে। চাচি আমায় অপছন্দ করে সেটা সবাই কমবেশি জানে! তাই এটা বেশি আমার পরিবারে ইফেক্ট পড়বে না। কিন্তু ভাবি ইচ্ছে করে এমনটা করেছে জানলে সবাই খুব কষ্ট পেতো। বিষেস করে ভাইয়া। চাচির কথায় তেমন কিছু হবে না, হ্যা হয়তো মা রাগারাগি করবে ফোনে কিন্তু মিম ভাবিকে কেউ ভুল বুঝবে না। মায়ের অন্যায়ের জন্য মেয়েকে অপছন্দ করা বাবা-মা আমার নয়। আমার জন্য আব্বু- আম্মু মিম ভাবিকে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে রাখুক,সেটা আমি চাই না। আমি আজ আছি কাল থাকবো না,ভাবি তো সারাজীবন থাকবে ওদের সাথে।

ইনশাআল্লাহ চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here