স্বীকৃতি পর্ব ১৪

#স্বীকৃতি
#পর্ব_১৪
#Saji_Afroz
.
.
.
ব্যাগ হাতে খুশবুকে দেখে খালেদা শারমিন বলে উঠলেন-
সে কি! কিছু না বলে তুই হঠাৎ?
.
সত্যটা লুকিয়ে সে জবাব দিলো-
তোমাদের মনে পড়ছিলো ভীষণ।
.
মেয়েকে সাথে নিয়ে সোফার উপরে বসতে বসতে খালেদা শারমিন বললেন-
জামাইকে নিয়ে আসলি না কেনো?
-ছুটি তো অনেকবারই নিলো, তাই আর পেলোনা ছুটি। অফিসে অনেক কাজের চাপ।
-তা তোর শ্বশুরবাড়ির সবাই ভালো আছে?
-হ্যা আছে। বাবা আর খুশি কোথায়?
-তোর বাবা তো কুমিল্লার বাইরে আছে। তোর ফুফুর বাসায়। খুশি আছে তার রুমে।
-ওহ! মা এক গ্লাস শরবত করে দিবে? গলাটা ধরে আসছে। ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত খেতে পারলে মনেহয় শান্তি পাবো।
-হ্যাঁ তুই বস।
.
খুশি রুম থেকে বেরিয়ে এসে বোনকে দেখে চমকে গেলো। দৌড়ে এসে খুশবুকে জড়িয়ে ধরে বললো-
সবে মাত্র তোদের প্রেম শুরু হলো, ভাইয়াকে ছেড়ে এলি কেনো?
-প্রেম? কবে?
-বারে! তুই তো সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলি, দ্বিতীয়বার ভালোবাসা যায় কিনা।
-প্রেম করছি তো বলিনি।
-ভালো তো বেসেছিস?
.
খুশির প্রশ্নের জবাব খুশবু দিলোনা। না বলতে কেনো যেনো ইচ্ছেই করছেনা তার। অন্য সময় হলে না বলতো সে? তবে আজ কেনো উত্তর দিতে পারছেনা সে!
.
.
.
-চুলগুলো আঁচড়াতে পারোনা? এমন অগোছালো থাকো কেনো?
.
আরহামের প্রশ্নে খুশবু জবাব দিলো-
বাসায় তো আছি! এতো গোছালো থাকার কি দরকার!
-স্বামীর জন্য থাকতে হয়। এতো টাকা খরচ করে বিয়ে কেনো করলাম! যদি বউ এর সৌন্দর্য্যই দেখতে না পারি?
.
আরহামের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো খুশবু।
আরহাম মুগ্ধ নয়নে সে হাসি দেখতে লাগলো।
.
আগের স্মৃতি চারণ করে আরহামের চোখ বেয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। এই রুমের প্রতিটা আনাচে-কানাচেতে খুশবুর ছোঁয়া রয়েছে। খুশবুকে ছাড়া বড্ড ফাঁকা লাগছে রুমটা, ঘরটা আর তার হৃদয় টা! মন এতো বেহায়া কেনো?
.
-কি হয়েছে আরহাম?
.
বকুল জান্নাতের কথা শুনে নড়েচড়ে উঠলো আরহাম।
মায়ের উদ্দেশ্যে বললো-
কিছুনা মা! আমার ভাগ্যটা খারাপ হয়েছে।
-মানে! ঝগড়া হয়েছে বউ মা এর সাথে? তাই বুঝি চলে গিয়েছে সে?
.
নিশ্চুপ আরহাম। তার পাশে বসে বকুল জান্নাত বললেন-
সংসার জীবনে একটু আধটু ঝামেলা হয়েই থাকে। এসব ঠিকও হয়ে যায়। ঘুরে আসুক বাবার বাড়ি থেকে কটা দিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।
.
মায়ের কোলে মাথাটা রাখলো আরহাম।
বকুল জান্নাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন-
পাগল ছেলে আমার।
.
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে আরহাম নিজের মনে বললো-
সে আসবেনা আর! ফিরবেনা এই ঘরে। তাকে আটকানোর অধিকার হয়তো আমার আছে কিন্তু তা প্রয়োগ করার অধিকার আমার নেই!
.
.
.
কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভাঙলো খুশবুর। বাবার বাড়িতে এসেছে বেশকিছুদিন হলো। এই কয়েকটা দিন আরহাম কে তার অনেক বেশিই মনে পড়েছে। তার কথা মনে পড়লেই বুকের মাঝে চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হয়। তাকে যেনো হারাতে চায়না খুশবু! কেনো সে আরহামের জন্য চোখের পানি ফেলছে? ফারাজের কথা কি ভুলে যাচ্ছে সে!
চোখের পানি মুছে উঠে পড়লো খুশবু। এগিয়ে গেলো বাইরের দিকে।
উঠোনে এসেই দেখা পেলো অনন্তের। অনন্ত কে এই সময়ে এখানে পাওয়া যাবে জানে সে।
খুশবুকে দেখে হাতে থাকা সিগারেট টা ফেলে দিলো অনন্ত।
খুশবু বললো-
তোমার আগের গফ কিন্তু সিগারেট খাওয়া পছন্দ করতো বেশ! খুশি কি করে?
.
অনন্ত হেসে বললো-
এই বিষয়ে খুশি আমাকে কিছু বলেনি। তবে আমি খুব একটা খাইনা। মনেহয় না এতে খুশির সমস্যা হবে।
.
অনন্তের পাশে বসে শান্ত গলায় খুশবু বললো-
ভালোবাসা বড় অদ্ভুত তাইনা? কখন কাকে কিভাবে আমরা ভালোবেসে ফেলি বুঝতেই পারিনা।
-যেমনটা আমি খুশিকে ভালোবেসে ফেলেছি! কখনো ভাবিনি দ্বিতীয়বার ভালোবাসতে পারবো কাউকে।
-আমিও।
.
খুশবুর দিকে তাকালো অনন্ত। মৃদু হেসে বললো-
আমিও মানে? আরহামকে ভালোবাসো তুমি?
-তার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। তাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এটা কি ভালোবাসা?
-অবশ্যই। এতোদিন উপলব্ধি করোনি?
-নাহ!
-সাথে ছিলো তাই হয়তো। কখনো কখনো দূরে থাকলেই ভালোবাসার গভীরতা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারি আমরা। কাছে থাকলে মূল্য বুঝিনা।
-কিন্তু আমার ফারাজের জন্যও কষ্ট হয়। মনেহয় সে…
-এটা শুধুই কষ্ট। এর কোনো সমাধান নেই। ফারাজ তোমার অতীত আর আরহাম তোমার বর্তমান। যাকে চায়লেই তুমি ভবিষ্যৎ ও বানাতে পারো। ছেলেটাকে কষ্ট না দিয়ে নতুনভাবে সব শুরু করো খুশবু।
জীবনটা অনেক সুন্দর!
.
অনন্তের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনলো খুশবু।
অনন্ত যা বলছে চায়লেই কি তা সম্ভব? আরহাম যে তাকে চরিত্রহীনা ভাবে। একটা বারো সে সত্যিটা জানতে চায়নি। বুঝতে পারেনি, চোখের দেখাও ভুল প্রমাণিত হয় কখনো!
.
.
.
সকালের নাস্তা সেরে নিজের রুমে এসে চুল আঁচড়াতে থাকলো খুশবু।
-এখন তো দেখছি আগোছালো থাকোনা! ফারাজের জন্য?
.
আরহামকে দেখে চমকে গেলেও তার কথা শুনে হতাশ হলো খুশবু।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো-
এখানে ফারাজ নেই।
-তা তুমি এখনো এখানে! ফারাজের কাছে যাওনি কেনো?
-আপনি বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি।
-আমি চা খেতে আসিনি! আমি জানি তুমি কেনো ফারাজের কাছে যেতে পারছোনা।
-কেনো?
-আমাদের ডিভোর্স হয়নি তাই। তোমার সুবিধের জন্য ডিভোর্স পেপার নিয়ে এলাম।
.
ডিভোর্স পেপারটি বিছানার উপরে ছুড়ে মেরে আরহাম বললো-
সাইন করে পাঠিয়ে দিও।
.
আরহাম চলে গেলো।
পেপারটি হাতে নিয়ে দেখতে থাকলো খুশবু।
যে সম্পর্কে সে খুশি ছিলোনা, সেই সম্পর্ক টা শেষ হতে চলেছে। তাহলে সে কেনো কষ্ট পাচ্ছে? তাহলে কি সে সত্যিই আরহামকে নিজের মনে জায়গা দিয়ে দিয়েছে? কিন্তু কিভাবে, কখন আর কেনো!
এসব ভেবে ছলছল করে উঠলো খুশবুর দু’চোখ। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কিছুই দেখছেনা সে!
.
খুশবুর রুমে এসে, তার হাতে থাকা ডিভোর্স পেপারটি হাতে নিয়ে খুশি বললো-
এটা কি দেখি।
.
পেপারটি দেখে খুশির মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এ কারণেই আরহাম এখানে এসেছে!
-আপু? তোকে ভাইয়া ডিভোর্স পেপার দিলো কেনো?
.
কয়েকবার একই প্রশ্ন করার পর খুশবু জবাব দিলো-
আমি ওর যোগ্য নয় তাই হয়তো। এখন বাসায় কিছু বলিস না খুশি।
-কিন্তু…
-অনুরোধ করছি তোকে।
.
.
খুশির মুখে সবটা শুনে অনন্ত বললো-
আরহাম ভাই এর সাথে আমরা কথা বলবো। কিচ্ছু হবেনা।
.
কান্নাজড়িত কণ্ঠে খুশি বললো-
আপুতো কাউকে কিছু না জানাতে বলে দিলো।
-না জানাতে বললো মানে! এভাবে বসে থাকলে হবে! খুশবুর মাথা কি খারাপ হয়ে গিয়েছে! ঝামেলা কোন দম্পতির মাঝে হয়না? তাই বলে ডিভোর্স!
-ভাইয়া কি কোনোভাবে ফারাজ ভাইয়ার কথা জেনেছে!
-ফারাজ খুশবুর অতীত তাছাড়া…
-সেই যাই হোক, অতীতও কজন মেনে নিতে পারে!
.
খুশির কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেলো অনন্ত। তার অতীত জানতে পারলে খুশি কি করবে!
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here