হিয়ার মাঝে পর্ব – ২৭

#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ২৭
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি

৬০,
ঝর্ণার পানিতে ভিজে নৌকায় কাপড় পাল্টে নিচ্ছে হিয়া। নৌকাতেই সব ব্যবস্থা করা আছে। রায়া অনুমতি দিয়েছিলো ভেজার জন্য। তবে বেশি নয় ১৫মিনিটের জন্য। কিন্তু হিয়া তো নেমে পানিতে লা”ফালাফি শুরু করেছিলো। ১৫মিনিটের জায়গায় পাক্কা ৪৫মিনিট ভিজে উঠে এসেছে। এখন তো শীতে ঠকঠকিয়ে কাপছে। হালকা ঠান্ডাতেই সর্দি, মাথা ব্যাথা সব এসে হাজির হয় হিয়া। বোনের অবাধ্য হয়ে ভিজলো তো! কিন্তু এখন ঠান্ডা লাগলে বকা দিয়ে কান ঝালাপালা করে দেবে তার। হিয়া নিজের ব্যাগ থেকে থ্রিপিস বের করে পরে নেয়। তার উপরে একটা জ্যাকেট চাপিয়ে দেয়। সে জানে তার ঠান্ডার বাতিক আছে৷ আর ওয়েদারও এখন সকাল সন্ধ্যায় ঠান্ডা ঠান্ডা। সেজন্য নিজের ব্যাগপ্যাকে সব তুলে এনেছে। হিয়া ড্রেস পাল্টে বাইরে বের হতেই ইহসাসের মুখোমুখি হয়। ইহসাস এখনও ভেজা কাপড়ে। সে জানতো না হিয়া ভেতরে আছে। সে হিয়ার দিকে তাকাতেই থমকে যায়। নীল থ্রিপিস পরহিত হিয়াকে দেখে চোখে মুগ্ধতা বিরাজ করছে ইহসাসের৷ অন্য রকম হিয়াকে দেখলো সে। লেহেঙ্গা, জিন্স, টপস, স্কার্ফ, স্কার্ট, শার্টের বদলে সে থ্রিপিস পরিহিত একজন পরিপূর্ণা বাঙালি কিশোরীকে দেখলো সে। যদিও বা হিয়ার কিশোরী বয়স পেরিয়ে গেছপ, তবুও হিয়াকে এই সময়টা ১৬বছরের কিশোরীই মনে হচ্ছে ইহসাসের কাছে। ইশ হিয়া যদি কিশোরী হতো! তার কিশোরীর মনের আঙিনায় ভালো লাগা ছড়িয়ে দেওয়া যেতো। কিন্তু হিয়া তো ২০বছরের একজন যুবতী নারী। হিয়া ইহসাসকে তার দিকে একনাগারে তাকিয়ে থাকতে দেখে অসস্তিতে গাঁট হয়ে দাড়িয়ে আছে। হাতের নখ খুঁটতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ইহসাস হিয়ার অসস্তি বুঝতে পেরে বলে,

“ড্রেস পাল্টানো হলে একটু সরে দাড়ান। আমি কাপড় বদলে নিতাম।”

হিয়া চট করে ইহসাসের পাশ কাটিয়ে সরে যায়। হিয়া মাথা চুলকে ভেতরে ঢুকে পরে।

নাতাশা নৌকার দাড়ঘেষে দাড়িয়ে আছে। ভেজা চুলগুলো হাওয়াই মৃদু মন্দ উড়ছে। তার জার্মানি ব্যাক করার সময় হয়েছে। ঘুরতে বসে তার রিটার্ন টিকেটের টাইমই ভুলে বসেছে সে। মন খারাপের মেঘ জমেছে তার মনে। সবাইকে ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করেনা তার। সেই মন খারাপের বিষাদিনীকে ফোনের অপর পাশ থেকে ক্যামেরায় ভিডিও কলে দেখছে একজন৷ দেখাচ্ছে হিয়া নামক মানুষটি। সে ফোনের সামনের ক্যামেরায় সুইচ করে ভ্রু নাচিয়ে বলে,

“কেমন লাগলো?”

“তোর সবকিছুতেই বারাবাড়ি হিয়া।”

বললো ফোনের অপরপাশে থাকা হিয়ার ভাই অন্তর। হিয়া ঠোঁট বাকিয়ে বলে,

“হ্যাঁ সেই তো। আমার তো বারাবাড়ি। কিন্তু এতো দেখছিলি তো ড্যাব ড্যাব করে।”

“ফোন রাখ ফা”জিল।”

বলার সাথেই ঠা”স করে মুখের উপর ফোন কে’টে দেয় অন্তর। হিয়া ফোন দিয়েছিলো ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য। অন্তরকে বাসায় নেওয়া হয়েছে, এরপর হোয়াটসঅ্যাপে ভাইয়ের মেসেজ পেয়ে সে সরাসরি ভিডিও কল দেয়। কল দিয়েই বলে, ‘ভাই ভাবীকে পেয়ে গেছি।’ এরপর অন্তর উত্তরে বলেছিলো, ‘কই দেখি?’ তখনই হিয়া নাতাশাকে দেখায় কিছু টা দূর থেকে। অন্তর ফোন কে”টে দেওয়ার সাথেই হিয়া নাতাশার কাছে গিয়ে দাড়ায়। নাতাশা হিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দৃষ্টিটা আবার জলরাশির উপর ফেলে। হিয়া বললো,

“তোমার মন খারাপ?”

“কি করে বুঝলে?”

নাতাশা না তাকিয়েই প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করেই বসে। হিয়া বলে,

“নাম টা তো এমনি এমনি হিয়া নয়। কার হিয়ার মাঝে কি চলে একটু হলেও বুঝি।”

তখনই ইহসাস হিয়াদের পিছনে এসে দাড়ায়। হিয়ার কথা তার কানে যেতেই বলে,

“বুঝেন না শুধু আমার হিয়ার মাঝে কি চলে মিস হিয়া ম্যাম।”

হিয়া পিছন দিকে তাকায়। ইহসাসকে দেখে মুখ ভেঙচিয়ে বললো,

“পাগলের প্রলাপ বুঝে লাভ নেই।”

“সকল প্রেমিকই সব প্রেমিকার কাছে পাগল হয়ে থাকে। তারা ভালোবেসে প্রেমিক পুরুষকে পাগল বলে সম্মোধন করে৷”

“আসছে প্রেমের উপর পিএইচডি করা লোক।”

৬১,
“হ্যাঁ আসছিই তো।”

নাতাশা চুপ করে ওদের ঝ”গড়া দেখছিলো। মনে তপমন আনন্দ আগ্রহ নেই বলে সে কথা বলছিলো না। কিন্তু এবার বিরক্ত হয়ে বললো,

“ভাইয়া তুই সর তো। ভালো লাগছে না এখন।”

ইহসাস এবার সিরিয়াস হয়। বোনকে নিয়ে সবসময় সে সেনসিটিভ। বোনের কিছু হয়েছে বুঝলে তার অবস্থা পা’গল প্রায় হয়ে যায়। সে এটাও জানে এখন নাতাশাকে কিছু জিগাসা করলে বলবেনা। নিজে থেকেই এসে পরে বলে। সেজন্য ইহসাস নাতাশাকে ছেড়ে সরে নৌকার অন্য মাথায় চলে যায়। যেখানে রাদ আর রায়া দাড়িয়ে আছে। ইহসাস যেতেই রাদ বলে,

” কাপ্তাই লেকে জুমঘর রেস্তোরার নাম বেশ জনপ্রিয়। নৌকা সেখানে থামিয়ে কিছু খাওয়া যাক। এরপর ঝুলন্ত ব্রিজে থামিয়ে ঘুরে হোটেলে ফেরা যাক।”

“যেটা ভালো মনে হয় ভাইয়া।”

“শুধু তোমার ভাইয়ার ভালো মনে হলেই হবে? তোমাদেরও তো ভালো লাগতে হবে।”

বললো রায়া। ইহসাস মুচকি হেসে নৌকার দার ঘেষে বসে বললো,

“সেটা তো অবশ্যই ভাবী।”

এরপর সবার মাঝে পিনপিন নিরবতা। শুধু পানির কলকাকলীতে চারপাশ মুখরিত। ওরা রাদের কথা অনুযায়ী জুমঘর রেস্তোরার পাহাড়ে থামলো। এরপর পাহাড়ের চূড়ায় রেস্তোরায় গিয়ে একটা টেবিলে বলে। রাদ সবাইকে জিগাসা করে,

“কি খাবে তোমরা?”

হিয়া বললো,

“যা ইচ্ছে হয় অর্ডার করুন দুলাভাই।”

“হ্যাঁ ভাইয়া, তোর মনমতো অর্ডার করে দাও।”

নাতাশা হিয়ার পরেই কথাটা বলে। রাদ ওদের কথায় পাহাড়িদের বিশেষ খাবার, বাঁশ কোড়ল, কাঁচকি ফ্রাই, কেবাং, কোলার মোচা দিয়ে তৈরি খাবারগুলো অর্ডার দেয়। খাবার সার্ভ হতেই ওরা নিশ্চপে খেয়ে নেয়। নাতাশার নিরবতায় সব যেনো নিরব হয়ে গেছে। ইহসাস এবার নাতাশার সাথে কোনো রকম খুনশুটি করলো না। ওরা খাওয়া শেষে বিল মিটিয়ে ফের নৌকায় করে ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে রওনা দেয়। কিছু সময়ের মাঝে ওরা ঝুলন্ত ব্রিজে এসে নামে। হিয়া ঝুলন্ত ব্রিজের সামনে দাড়িয়ে এক পা ব্রিজে দেয় আবার ভয়ে পিছিয়ে আসে। ইহসাস তো ততক্ষণে ব্রিজে উঠে হাটা শুরু করেছে। ঝুলন্ত ব্রিজ যেহেতু, মানুষ চলাচল করলে ব্রিজ একটু নড়ে। নাতাশাও ভাইয়ের পিছু পিছু খুনশুটি করতে করতে চলে গেছে রায়া আর রাদও পাশাপাশি হাটছে ব্রিজে। জনসমাগম বেশি না থাকলেও মোটামুটি ভালোই লোকজন নজরে পরছে তাদের৷ রাঙামাটির বিশেষ আর্কষণই এই ঝুলন্ত ব্রিজ। রাঙামাটিকে ঘিরে আছে কাপ্তাই লেক যেটি একটি কৃত্রিম লেক। ১৯৬০সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে লেকটি নির্মিত হয়। রাঙামাটির চারদিকে যে পানি আর পাহাড়গুলো আছে সব এই লেকেই আটকা পরে৷ আর এই কাপ্তাই লেকেই রাঙামাটির সকল দর্শনীয় স্থান। হিয়া সাহস করে যখন ব্রিজে পা দিয়েই ফেলে, ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। তখনই বিষয় টা ইহসাস খেয়াল করে সে হিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। রায়া বিষয়টা খেয়াল করলেও মনোযোগ দিতে চায় না। ইহসাস একটু বেশিই হিয়ার আশোপাশে ঘেষছে। এবং কেনো এতো ঘুরঘুর করা রায়ার বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু এসবে হিয়ার সম্মতি থাকলে সে কিছু বলবেনা। ইহসাস হিয়ার কাছে দাড়িয়ে বলে,

“বিয়াইন সাহেবা? ভয় পাচ্ছেন নাকি?”

হিয়া ইহসাসের কন্ঠস্বর শুনে চোখ খুলে। এরপর ভয় নিয়েই বলে,

“একটু একটু।”

ইহসাস হিয়ার কথা শুনে নিজের হাত বারিয়ে দেয়। হিয়া একবার ইহসাসের মুখের দিকে একবার হাতের দিকে তাকায়। হিয়া হাত টা ধরছেনা দেখে ইহসাস চোখ দিয়ে ইশারা করে হাত ধরার জন্য। হিয়া একবার বোনের দিকে তাকায়। রাদ, রায়া আর নাতাশা প্রায় ব্রিজের অপর মাথায় পৌছে গেছে। হিয়া সাহস করে ইহসাসের হাতে হাতটা দিয়েই দেয়। এরপর দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। মুহুর্ত টা দারুণ লাগছে হিয়ার কাছে। ইহসাসের মনেও আনন্দের ঢেউ। কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হিয়া হাতটা ছেড়ে দেয়। ইহসাস একটু হিয়ার দিকে সরে এসে কানের মুখ নিয়ে বলে,

“আজ ছেড়ে দিলেন কিছু বললাম না, কিন্তু এমন এক দিন আসবে, আপনি ছাড়লেও আমি ধরেই রাখবো।”

হিয়া একবার ইহসাসের এই কথায় তার মুখের দিকে তাকায় । এরপর চোখ নামিয়ে নেয়। ইহসাসের চোখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনা। তার চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা ঘোর লেগে আসে। কি একটা য”ন্ত্রণা। তবে কি হিয়া একটু একটু করে ইহসাসের প্রেমেই ডু”বে যাচ্ছে!

চলবে?

ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। আজ একটু ছোটোই হয়ে গেলো। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু ঠান্ডায় আমার হাত চলছেনা। ইনশা আল্লাহ আগামী পর্ব বড়ো করে দেবো। আসসালামু আলাইকুম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here