হৃদপিন্ড ২ পর্ব ১৭+১৮+১৯

#হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_১
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে সোজা সায়রীর স্কুলে চলে যায় মুসকান৷ সায়রীর স্কুলে সামনে সপ্তাহে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে৷ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই মুসকানের। তার মাথা ব্যথা হলো এই অনুষ্ঠানে যেসব মেয়েরা নৃত্য পরিদর্শন করবে তাদের নিয়ে। এর পিছনে কারণ হলো যারা নৃত্য পরিদর্শন করবে তাদের নৃত্য শিক্ষিকাদের মধ্যে যে ক’জন রয়েছে তাদের মধ্যে সে নিজেও একজন। তাই এ বিষয়ে তার প্রচুর মাথা ব্যথা। স্কুলে থাকাকালীন প্রতি সপ্তাহে একদিন করে নৃত্য শিখতো মুসকান৷ ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি তার ভীষণ ঝোঁক। সে ঝোঁক থেকেই আজ সে বিশ্বাস করে “Dance is a great way to relax our mind”।
কলেজে ওঠার পরও নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে একদিন স্কুলে এসেছে সে। নাচের প্রতি প্রগাঢ় টান অনুভব করে বলেই স্কুলের সকল টিচার্স এবং স্টুডেন্টস’দের মধ্যে আলাদা এক সম্পর্ক তৈরী হয় তার৷ এক পর্যায়ে নৃত্য উপদেষ্টা মুসকানের নৃত্য দেখে এমন মুগ্ধ হলো যে একদিন আবদার করে বসলো স্টুডেন্ট হিসেবে নয় বরং টিচার হিসেবে তার সাথে প্রতি সপ্তাহে একদিন স্কুলে সময় দিতে। যেহেতু সায়রী এই স্কুলেরই শিক্ষিকা তাই মুসকান বা তার পরিবারের কারো এ বিষয়ে আপত্তি ছিলো না। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাবেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে মুসকান। সেসব মাধ্যমের একটি মাধ্যম হলো এই ডান্স।
.
স্কুলের দক্ষিণ পাশের কর্ণারের ক্লাসরুমেই নৃত্য পরিচর্যা করছে ছাত্র-ছাত্রীরা। মুসকান প্রায় এক ঘন্টা সময় নিয়ে তাদের নৃত্য পরিচর্যা দেখছে। এমন সময় সায়রী ক্লাসরুমের সামনে গিয়ে ভিতরের দিকে উঁকি দিলো। খয়েরি রঙের সূতি গাউন পরিহিত মুসকান স্টুডেন্টসদের সম্মুখীন হয়ে বিমর্ষ মনে বসে আছে। খয়েরি রঙের জর্জেট ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা দেওয়া থাকলেও কেশবতী কন্যার বিনানো কেশ ডান কাঁধের সামনে পড়ে কোল অবদি ছুঁয়ে আছে। ডাগর ডাগর আঁখিদ্বয় দ্বারা পলকহীন তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। কাঁধ ব্যাগটি কোলের ওপর রেখে দু’হাতের আঙুলের ফাঁকে আঙুল গুঁজে দিয়ে অদ্ভুত এক ভণিতায় বসে আছে মেয়েটি। সদ্য আঠারোতে পা দেওয়া এই তরুণী’কে দেখলে ভারী অবাক লাগে সায়রীর৷ পনেরো বছয় বয়সী এক কিশোরীর আচমকাই পরিণত নারী হয়ে ওঠার গল্পটি সবার কাছে অতি সাধারণ হলেও তার কাছে আশ্চর্য রকমের অসাধারণ লাগে। আচমকাই যেনো বিলীন হয়ে গেলো তাদের সকলের ছোট্ট আদরের মুসুপাখি।মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ছোট্ট এই কিশোরীর সকল চাঞ্চল্যতা যেনো গ্রাস করে নিলো প্রকৃতি। সত্যি প্রকৃতি? নাকি প্রকৃতি’তে বিরাজ করা কোন এক হৃদয়হীন মানবরাজ ? হ্যাঁ মুসকানের ভাষায় মানুষ’টা আজ তার কাছে হৃদয়হীন। ছোট্ট একটি প্রাণ, কোমল এক হৃদয়ে আঘাত কেবল এক হৃদয়হীন দ্বারাই সম্ভব। সে হৃদয়হীন পুরুষ’টি যে খুব শিঘ্রই আসছে। সে খবর কি সামনের এই বিমর্ষমুখীনি জানে?

“মুসু” বলেই ডাকতেই ডান দিকে তাকালো মুসকান। সায়রী’কে দেখে মিষ্টি এক হাসি আঁকলো ওষ্ঠকোণে।সায়রীও মিষ্টি হেসে প্রশ্ন করলো,

“আসতে পারি ম্যাম?”

সায়রী’কে দেখে ছাত্র-ছাত্রী’রা তাকে সালাম দিয়ে আবারো নাচে মনোযোগ দিলো। সায়রী সালাম ফিরিয়ে মুসকানের দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে রইলো। বসা থেকে অত্যন্ত নমনীয় ভঙ্গিতে ওঠে দাঁড়ালো মুসকান। মুখশ্রী’তে কিঞ্চিৎ অভিমান ফুটিয়ে তুলে দরজা অবদি এগিয়ে গিয়ে বললো,

“তুমি এমন কেন? স্কুল তোমার স্টুডেন্টস তোমার বোনটাও তোমারি। তাহলে ক্লাসে ঢুকতে অনুমতি কেন চাইছো? ”

ভিতরে ঢুকে মুসকানের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো সায়রী। বললো,

“আহারে পাগলী’টা অভিমান করছে! অভিমান করতে হবে না এইতো ঢুকে গেছি। ক্লাস করাচ্ছিস অনুমতি না নিয়ে হুটহাট ঢুকে পড়া মন্দ দেখায়। হাজার হোক এ’স্কুলের শিক্ষিকা আমি তোর আমার সম্পর্ক যাইহোক স্টুডেন্টসদের সামনে এটুকু ম্যানার্স দেখাতেই হয়’রে। ”

“তুমি আবার আমায় পাগলী বলছো আপু।”

মুখশ্রী’তে দৃঢ়তা বজায় রেখে প্রশ্ন করলো মুসকান৷ সায়রী জিব কেটে বললো,

“সরি সরি বনু। তা আবির স্যার’কে দেখছিনা যে কোথায় ওনি? ”

“স্যারের মা অসুস্থ তাই আসতে পারেনি। ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে আমায়। ”

“ভালোই হয়েছে স্যারের তোকে পেয়ে তাইনা। হুটহাট যে কোন সমস্যায় তোর ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। প্রতি সপ্তাহে একটা দিন আসতে হয় তবুও ওনার শুধু সমস্যা আর সমস্যা। বেলী ম্যাডামের বিয়ে হওয়ার পর কাজটা ছেড়ে দিলো আর তোর ওপর সব চাপ আসলো তাইনা?”

মুসকান ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললো আজ এ পর্যন্তই। আজ সোমবার সামনে সপ্তাহের শনিবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তাই শুক্রবার বিকেল চারটায় এক ঘন্টা নৃত্য পরিচর্যা করতে হবে বলেই স্টুডেন্টসদের থেকে বিদায় নিয়ে সায়রীকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে। রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দু’জন। সামনের মোড় থেকেই রিকশা নেবে। সায়রী আবির স্যার’কে কিছু গালি দিচ্ছে। কারণ সে প্রায় সব সময়ই মুসকানের ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিজে গা বাঁচিয়ে চলে। সায়রী’কে থামাতে মুসকান বললো,

“ছাড়োনা আপু ওনার মা অসুস্থ। এটা জানার পর মানবিকতা দেখিয়েই এই অল্পস্বল্প দায়িত্ব আমি পালন করি। ভালোই লাগে আমার। ”

“হুম বুঝলাম তা ইরা আন্টি যে গত কয়েকমাস ধরে এতো অসুস্থ তার প্রতি একটু মানবিকতা কি দেখাতে পারিস না? ”

“তারা বড়োলোক মানুষ অসুস্থ হলে হাজারটা কাজের লোক থাকে তাদের সেবা যত্ন করার। তাছাড়া তাদের আত্মীয় স্বজনের অভাব নাকি? শুধু শুধু আগবাড়িয়ে আমি কেন যাব? ”

“আগবাড়িয়ে না মুসু ইরা আন্টি তোর সাথে অসংখ্যবার দেখা করতে চেয়েছে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আরো বেশী দেখা করতে চায়। তুই একটাবার অন্তত যেতে পারতিস? ”

নিশ্চুপ হয়ে গেলো মুসকান। সামনে রিকশা পেতেই চুপচাপ রিকশায় ওঠে বসলো। সায়রী তার পাশে বসে রিকশাওয়ালাকে হুডি তুলে দিতে বলে মুসকানের দিকে তাকালো। বললো,

” আর মাত্র চারটা দিন মুসু ইমন ফিরছে। তোর সব অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটতে চলেছে এবার অন্তত একটা বার দেখা করে আয় ইরা আন্টির সাথে। ”

তাচ্ছিল্য সহকারে হাসলো মুসকান। রিকশা চলছে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। রাস্তার ধারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ছাড়লো সে। এক ঢোক গিলে অদ্ভুত স্বরে বলে ওঠলো,

” অপেক্ষা শব্দ’টি ভীষণ মিষ্টি,ভীষণ সুন্দর। অপেক্ষা শব্দ’টায় মিশে থাকে অজস্র অনুভূতি। আর এই অনুভূতি’টা ভীষণ দামীও। লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকার বিনিময়েও এই অনুভূতি’কে জব্দ করা যায় না। আমার এই অনুভূতি এতোটা সস্তা নয় আপু। আমার আত্মমর্যাদা সম্পর্কে হয়তো এখনো তোমরা জ্ঞাত হওনি। আমার ব্যক্তিত্ব এতোটা সস্তা নয় যে ইমন চৌধুরীর জন্য অপেক্ষায় থাকবো!”
______________________

রাত প্রায় দু’টো ছুঁই ছুঁই দশটা থেকে বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে মুসকান। তবুও ঘুম তার চোখে ধরা দেয়নি৷ যতো দিন এগোচ্ছে পরিস্থিতি ততোই খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনটা বছর যাবৎ একটু একটু করে নিজেকে তৈরী করেছে মুসকান৷ অথচ মাত্র দু’দিনেই তার সমস্ত মনোবল প্রায় ভেঙে চুরমারই হয়ে গেছে। দু’দিন হয়ে এলো হৃদয় নামক স্থানটি বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে তাকে। স্নায়ুবিক অবস্থা প্রচন্ড রকমের খারাপ আছে। বক্ষঃস্থলের ভিতরে হৃৎপিণ্ড নামক যে জিনিসটি রয়েছে সেটিতে পচন ধরেছে তিন বছর আগেই৷ এখন বুঝি পচা আবর্জনার মতোনই হৃৎপিণ্ড টুকু বের করে ডাস্টবিনে ফেলার সময় হয়ে এলো। বড্ড অশান্তি করছে হৃৎপিণ্ড নামক এই আবর্জনা’টা। শোয়া থেকে ওঠে বসলো মুসকান। এক ঢোক গিলে শুকনো গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বার কয়েক শ্বাস ছাড়লো। তারপর নিজ বক্ষঃস্থলের বাম পাশে তাকিয়ে ডানহাতটা চেপে ধরলো বক্ষে। আমাদের হৃদ্‌যন্ত্র একটি নির্দিষ্ট ছন্দে স্পন্দিত হয়। এর নাম হার্ট বিট বা হৃৎস্পন্দন। একজন সুস্থ মানুষের মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার হার্ট বিট হয়। কিন্তু মুসকান ফিল করছে তার হার্ট মিনিটে ১০০ নয় বরং হাজার বার বিট হচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন তার। তার কি হৃদরোগ হলো? হৃদরোগ হয় কি করে ফুলে পচন ধরলে সে ফুল কি সুভাস ছড়ায়? ছড়ান না তো। তবে দুর্গন্ধ ছড়ায়৷ তাহলে যে হৃদয়ে পচন ধরে সে হৃদয়ে আবার রোগ বাসা বাঁধে কি করে? নিশ্চিয়ই দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে? কিন্তু সে কেনো পাচ্ছে না সে দুর্গন্ধ। তার ভিতরে সব দুর্গন্ধ গুমোট হয়েই কি এই অশান্তির সৃষ্টি করছে?

বক্ষঃস্থল থেকে হাত সরিয়ে বিছানা থেকে ওঠে সেন্টার টেবিল থেকে গ্লাসে পানি ভরে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিলো। ফোন কোথায় মনে হতেই বেজে ওঠলো ফোন৷ বুকের ভিতরটা কেমন ছেদ করে ওঠলো। ধীর পায়ে বিছানায় গিয়ে বসে বালিশের পাশ থেকে ফোন ওঠাতেই থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো হাত৷ এর কারণ একটাই নাম্বারটি বাংলাদেশী নয়। প্রায় ছুঁড়েই বিছানায় ফেললো ফোনটি৷ নিমিষেই চোখদুটো জলে ভরে ওঠলো। শুধু বক্ষঃস্থল নয় সারা অঙ্গেই অদ্ভুত ভাবে কম্পন ধরে গেলো তার। চোখ মুখ খিঁচে বসে দু’হাতে মুখ চেপে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলো। অভিমানের পাল্লা কতোখানি ভারী হয়েছে তা হয়তো মুসকান নিজেও জানে না৷ তবে জানে সে মানুষ’টি যাকে কেন্দ্র করে এই অভিমান৷ মুসকান হয়তো এটাও জানে না তিনটে বছরে ইমন চৌধুরী’কে ঠিক কত-শত আঘাত সে করেছে। আর মাত্র একটি দিন এবং একটি রাতের অপেক্ষা তারপর ইমন চৌধুরী পইপই করে সব হিসাব বরাবর করবে।
#হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_২
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
চোখের নিমিষেই কেটে গেলো আরো দু’টো দিন৷ ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে একটু লাইব্রেরি গিয়েছিল মুসকান। পছন্দ সই দুটো উপন্যাস বই কিনে ব্যাগে ঢুকিয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রিকশা নেবে এমন সময় পেছন থেকে ডেকে ওঠলো মিতুল। মুসকান রিকশায় না ওঠে পিছন ঘুরে দাঁড়ালো। হাস্যজ্জ্বল চেহেরাটি মেলে ধরে এগিয়ে এলো মিতুল। মুসকান ঈষৎ হেসে প্রশ্ন করলো,

“আপনি এখানে? ”

“এইতো ভাগ্নির জন্য সৈয়দ আবদাল আহমদ সংকলিত চিরকালের ছড়া কবিতা বইটি কিনে নিলাম। সামনে ওর বার্থডে কি গিফট করবো কি গিফট করবো ভাবতে ভাবতে এটাই মাথায় এলো।”

মৃদু হাসলো মুসকান নম্র সুরে বললো,

” ওও আচ্ছা। ”

“তুমি বই কিনলে বুঝি? ”

“দেখেছেন নিশ্চয়ই ”

ধাতস্থ হয়ে উত্তর দিলো মিতুল,

” হ্যাঁ দেখেছি। বলছিলাম মুসকান মুন্নি তোমায় সেদিন কিছু বলেছে? ”

মুখো ভঙ্গি একেবারেই পাল্টে গেলো মুসকানের। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা। গত সপ্তাহে ডান্স ক্লাসে মুন্নি তাকে বলেছিলো মিতুল অর্থাৎ মুন্নির মামা তাকে পছন্দ করে ফাইনাল এক্সাম টা হয়ে গেলেই জবে ঢুকবে এবং বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে তার বাসায়। বিষয়’টা নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথা ছিলো না৷ মিতুল আর সে একি ভার্সিটির স্টুডেন্ট। সিনিয়র বড় ভাই। বাসা পাশের উপজেলা’তেই। একটা ছেলে একটা মেয়েকে পছন্দ করতেই পারে। পছন্দের ভিত্তি’তে বাসায় বিয়ের প্রপোজালও পাঠাতে পারে। এসব ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। তাই এ বিষয় নিয়ে বিন্দু পরিমাণ সমস্যা তার নেই। কিন্তু সমস্যা টা ঘটেছে অন্য জায়গায়। মিতুল’কে যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানীবান মানুষও ভেবেছিলো মুসকান৷ অত্যাধিক লম্বা মানুষের বুদ্ধি যে হাঁটুর নিচে পড়ে থাকে তার প্রমাণ বহুবার পেয়েছে সে। নতুন করে আবারো পেলো মিতুলের মাধ্যমে। তাই ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে মিতুলের দিকে দৃঢ় দৃষ্টি’তে তাকালো মুসকান। অত্যন্ত নম্রতা বজায় রেখে বললো,

“যুগ’টা অনেক বেশীই আপডেট এবং ইউনিক হয়ে গেছে তাইনা? মা,চাচীদের বলতে শুনেছি বিয়ের প্রপোজাল নাকি ছেলের পরিবারের মুরুব্বি’রা মেয়ের পরিবারের মুরুব্বি’দের দেয়। কিন্তু মামার হয়ে ক্লাস টু’তে পড়া ভাগ্নি যে বিয়ের প্রপোজাল দিতে আসে সিরিয়াসলি এমন ঘটনা কখনো শুনিনি বা দেখিনি। ”

প্রচন্ড লজ্জা পেলো মিতুল। লজ্জায় কপাল ঘেমে ওঠলো তার৷ কপালের সে ঘাম গুলো চোয়াল বেয়ে পড়ছিলো। মুসকান এক ঝলক মিতুলের অবস্থা দেখে নিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

” আপনার থেকে এমন কিছু আশা করিনি মিতুল ভাই। বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়ে এসব আপনি না বলালেও পারতেন। আপনি আমায় পছন্দ করেন তা সোজাসাপ্টা আমাকে বললেই পারতেন। সে যাইহোক পছন্দের কথা আমি জেনে গেছি। বাট আই হেভ নাথিং টু ডু। আপনি যেহেতু ভেবে রেখেছেন জবে ঢুকে বাসায় বিয়ের প্রপোজাল দেবেন সো সে পথেই থাকুন৷ আসি আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে ভালো থাকবেন। ”

কথাগুলো বলেই রিকশায় ওঠে বসলো মুসকান। মিতুল সিরিয়াস ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে বিদায় জানালো মুসকানকে। রিকশায় বসেই চোখেমুখে বিরক্তি ফুটিয়ে তুললো মুসকান। দু’হাত সমান তালে কচলাতে কচলাতে বিরবির করে কিসব বলতে শুরু করলো। মেজাজ তার প্রচন্ড খিঁচে গেছে। তার সাথে আজ যাই ঘটুক না কেন সব কিছুর পিছনে শুধুমাত্র একটি মানুষ’ই দায়ী। আজ তার হাজারটা বিয়ের প্রস্তাব আসুক বা প্রেমের প্রস্তাব আসুক অন্যান্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক বিষয় হলেও তার ক্ষেত্রে এটি প্রচন্ড অস্বাভাবিক বিষয়। কারণ এসবের পিছনে দায়ী শুধু একটি মানুষই আর সে হলো মি.ইমন চৌধুরী। ঐ মানুষ’টার জন্য তার কৈশোর ধ্বংস হয়ে গেছে আর যৌবনের শুরুটা প্রায় নরকেই পরিণত হয়ে গেছে।
.
বাড়ি ফিরে গোসল সেরে খেতে বসেছে মুসকান। এমন সময় মুরাদ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো। বেশ উদ্ভাসিত মুখে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বললো,

“কিরে তিনটা বাজে আর খাবার এখন খাচ্ছিস? কতোবার বলতে হবে খাবারে অনিয়ম করিস না। সকাল বিকাল গ্যাসট্রিকের ওষুধ না খেলেই তো বুকে ব্যথায় অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। নিজের প্রতি এটুকু যত্নশীল তো হওয়াই উচিত মুসু।”

শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কথাগুলো বলে সোফায় বসলো মুরাদ। গলা উঁচিয়ে রিমি বলে ডাকতেই ভেজা চুলে গামছা বাঁধা অবস্থায় রুম থেকে বেরিয়ে এলো রিমি। গ্লাসে পানি ভরে মুরাদ’কে দিয়ে ফ্যানের পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। তারপর এসে বসলো মুসকানের পাশে৷ মুসকান চুপচাপ খেয়েই যাচ্ছে। ভাই এতোগুলো কথা বললো অথচ সে টুঁশব্দটিও করলো না। একটা সময় তার মুখে খই ফুটতো আর আজ কতো চেঞ্জ। মুরাদ গায়ের শার্ট খুলে সোফার একপাশে রেখে রিমির উদ্দেশ্যে বললো,

” আজ রাতে আম্মার সাথে বা মুসুর সাথে ঘুমাস। ”

রিমি মুরাদের দিকে তাকাতেই মুরাদ ইশারা করলো কিছু বলতে। রিমি চোখ বোজার ভঙ্গি করে হ্যাঁ সূচক ইশারা করে আড় চোখে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বললো,

” হ্যাঁ হ্যাঁ তা তোমাদের আসতে ক’টা বাজবে? ”

“সন্ধ্যার পরই আমি আর দিহান বেরিয়ে যাবো। এই ধর মাঝরাত বা ভোর রাত হবে৷ ইমন কিন্তু বলে দিয়েছে ফার্স্ট এ বাড়িতেই আসবে। ইরা আন্টিও এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেনি। ”

গলায় খাবার আঁটকে গেলো মুসকানের। তবুও মুরাদ এবং রিমিকে কিছু বুঝতে দিলো না। বাম হাত বাড়িয়ে গ্লাসে পানি ভরে খেয়ে নিলো। তারপর অর্ধেক প্লেট ভাতেই পানি ঢেলে হাত ধুয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। রিমি হতভম্ব হয়ে মুখ দিয়ে শুধু উচ্চারণ করলো ‘মুসু!’ মুরাদ উদবিগ্ন হয়ে কয়েকবার মুসকানের নাম ধরে ডাকলো। তারপর রিমিকে বললো,

” ধুর খাওয়াটাই নষ্ট করে দিলাম। খাওয়া কমপ্লিট হলেই বলা উচিত ছিলো। তুই কেন আমার সাথে তাল মিলালি ইশারায় বলতে পারতিস খেয়ে নিক”

কপট রাগ দেখিয়ে বসা থেকে ওঠে নিজ রুমে চলে গেলো মুরাদ। রিমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো ভাই বোনের কাণ্ড দেখে। দু’হাত কোমড়ে রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,

” যাহ বাবা আমি আবার কি করলাম!”
.
সন্ধ্যা থেকেই বাড়িতে রান্নাবান্নার তোড়-জোড় চলছে। বাড়ির পরিস্থিতি দেখে প্রচন্ড ডিপ্রেশনে চলে গেলো মুসকান৷ দীর্ঘদিন যাবৎ তার মা অসুস্থ। ডায়বেটিস প্লাস হাই প্রেশারের রোগী৷ ইমন আসছে এবং তাদের বাড়িতেই প্রথম আসবে। তা শুনে মুসকানের মা মরিয়ম আক্তার কতোটা খুশি হয়েছে তা কেবল আজ তার মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাবে৷ মায়ের এমন দীপ্তিমান মুখশ্রী দেখে শান্তি লাগছে মুসকানের। কোনভাবেই সে শান্তি এবং মায়ের মুখের হাসিটুকু নষ্ট করতে মন চাইছে না৷ সে যদি রাগ দেখিয়ে কিছু বলতে যায় তাহলে হয়তো মায়ের হাসিটা বিলীন হয়ে যাবে। সেই সাথে দুশ্চিন্তায় দ্বিগুণ অসুস্থও হয়ে পড়বে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মুসকান। মাথা যন্ত্রণা করছে খুব সেই সাথে বুকের ভিতর বড্ড অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে। রাত তখন আটটা বাজে। সন্ধ্যায় খিদে পেলেও বাড়িতে এলাহী আয়োজন দেখে কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির আগমনি গানের সুরে খিদে জিনিসটার কথাই ভুলে গেলো মুসকান৷ বসার ঘরে গিয়ে গ্লাসে পানি ভরে নিজ রুমে গিয়ে একটা স্লিপিং পিল খেয়ে নিলো। গত ক’বছরে ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যায় ঠিক তখনি এই অস্ত্রটির মাধ্যমেই ঘুমকে বসে আনে সে। আজ যদি ঘুমকে সে বসে না আনে উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে হয়তো মরেই যাবে। সেই সাথে বাড়ির সকলের অত্যাধিক বাড়াবাড়ি দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাও কষ্টকর হয়ে যাবে। আবার দেখা যাবে সেরা অভিনেতার অভিনয় দেখে তার ছোট্ট হৃদয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়ে যাবে৷ এতো এতো সমস্যা মোকাবিলা করার ক্ষমতা তার নেই৷ তাই এসব সমস্যা যুক্ত পরিবেশ থেকে নিজেকে শত হাত দূরে রাখারই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করলো মুসকান।
.
চারদিকে ভেসে আসছে ফজরের আজান ধ্বনি। রাতের বিদঘুটে অন্ধকারে প্রচন্ড ভয় হয় মুসকানের। রাতের আকাশে চন্দ্রের বিস্তৃত আলোটুকু কখনো একা উপভোগ করেনি সে। বাইরে যতোই সকলের সম্মুখে নিজেকে শক্তিশালী মানবী রূপে প্রকাশ করুক না কেন ভেতরে সে একেবারে মাখনের মতোন। হার্ট তার ভীষণ দুর্বল। টুকটাক কিছু বিষয়ে প্রচন্ড রকমের ভয় পায় সে। তবে সবচেয়ে বেশী যে বিষয়ে ভয় পায় সেটি হলো ভূত। অজানা বিষয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা যেমন বেশী তেমন অজানা বিষয়ে মানুষের ভয়টাও বেশী। আদেও পৃথিবীতে ভূত আছে কিনা সেটা দেখার বিষয় নয়৷ রাতের অন্ধকারে ভূত নামক অহেতুক এই জিনিসটাকে স্মরণ করেই যতোশতো ভয় তার। অন্ধকারে তার ভীষণ ভয়। বিষয় টা সোজাসাপ্টা বলতে গেলে সে ভূতে ভয় পায়। তাই সারা রাত রুমে লাইট অন করে অত্যাধিক গরমেও ফ্যান জুরে পাতলা একটা কাঁথা গায়ে চেপে ঘুমায় সে। বরাবরের মতো আজো তেমন ভাবেই ঘুমিয়েছিলো। আজান ধ্বনি শুনতেই চোখ বোজা অবস্থায় আশেপাশে হাতড়িয়ে ফোন খোঁজার চেষ্টা করে যখন পেলো না ঠিক তখনি চোখজোড়া মেলে তাকালো। বিদঘুটে অন্ধকার কিচ্ছু দেখতে না পেয়ে আচমকাই চোখ বুজে ফেললো। বক্ষঃস্থলে শুরু হয়ে গেলো তীব্র ঝড়। এক ঢোক গিলে আবারো ফোন খুঁজতে শুরু করলো কিন্তু পেলো না। ঠিক তখনি ফিল করলো কারো রুমে সে ব্যতিত অন্যকারো অস্তিত্ব। ভয়ে পুরো শরীর শিউরে ওঠলো মুসকানের। চোখ,মুখ খিঁচে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে কাঁথা দিয়ে পা থেকে মাথা অবদি ঢেকে ফেললো। মনে মনে দোয়া দরূদ পড়ে জোর পূর্বক ঘুমানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘুম কিছুতেই হলো না। কারো তীব্র নিঃশ্বাসের শব্দে পুরো রুম গমগম করছে। ভয়ে ভয়ে এবার মুসকান কাঁথার নিচ থেকেই আম্মু এবং ভাইয়া বলে মৃদু চিৎকার দিলো। সঙ্গে সঙ্গেই রুমে বাতি জ্বলে ওঠলো৷ মুসকান স্পষ্ট সুইচ টেপার শব্দ পেলো। অর্থাৎ তার রুমে কেউ এসেছে দুরুদুরু বুকে মুখের ওপর থেকে কাঁথা সরাতেই হতভম্ব হয়ে গেলো। বুকের ভিতর টা আচমকাই ধড়াস করে ওঠলো। অস্ফুটে স্বরে বলে ওঠলো,

“নানাভাই!”

সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মুখটা চেপে ধরলো। চোখ বুজে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলো। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝতে পেরে ইমন বড়ো বড়ো পা ফেলে মুসকানের সম্মুখে বসে তার বলিষ্ঠ হাতজোড়া দ্বারা কাছে টেনে নিলো মুসকানকে। মুসকান চোখ মুখ খিঁচে বিছানার চাদর খামচে ধরলো। ইমন চোখ দু’টো বদ্ধ করে মুসকানকে প্রচন্ড শক্ত করে জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে। দু’চোখ বেয়ে অঝরে অশ্রু ঝড়তে শুরু করলো মুসকানের। দীর্ঘসময় সেভাবেই স্থির ছিলো দু’জন। কিন্তু ইমন যখন দু’হাতে মুসকানের চোয়াল ছুঁয়ে কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো ঠিক তখনি ছিটকে দূরে সরে গেলো মুসকান। অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্রুদ্ধ গলায় বললো,

“আপনার সাহস কি করে হয় আমাকে টাচ করার? ”

বিস্ময়ান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইমন। তবে দৃষ্টিজোড়ায় মিশে ছিলো শীতলতা। রূদ্ধশ্বাস ছেড়ে কোনমতে উত্তর দিলো,

“আমি অনেক টায়ার্ড মুসু। যতো অভিমান যতো রাগ সব কাল থেকে দেখাবে এখন একটু কাছে এসো। বড়ো হয়ে গেছো তুমি বাচ্চাদের মতো আচরণ করো না। ”

” চুপ করুন! বেরিয়ে যান রুম থেকে নয়তো ভয়ানক কিছু ঘটে যাবে। ”

” তুমি কাছে না এলে আমিই ভয়ানক কিছু ঘটাবো!”
#হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_৩
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
ইমন’কে অবাক করে দিয়ে ভয়ানক এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো মুসকান। ইমন চৌধুরী’কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বিছানা থেকে নেমে বড়ো বড়ো পা ফেলে রুম ত্যাগ করলো সে। এমন ভয়ানক ঘটনার শাক্ষি হয়ে অপমানে চোয়াল জোড়া দৃঢ় হয়ে গেলো ইমনের। দু’হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে দুমড়েমুচড়ে দিতে শুরু করলো। কঠোর এবং স্থির দৃষ্টি জোড়া বদ্ধ করে রুদ্ধশ্বাস ত্যাগ করে যেই বিছানা থেকে ওঠতে যাবে ঠিক তখনি নজর পড়লো মুসকানের এন্ড্রয়েড মোবাইলের ওপর। তৎক্ষনাৎ নিচের ওষ্ঠে কামড়ে ধরে তার লম্বা বলিষ্ঠ হাতটি বাড়িয়ে মোবাইলটি নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। সাইট বাটনে ক্লিক করতেই বুকের ভিতরটা ধক করে ওঠলো। মস্তিষ্ক মনকে খুবই তীক্ষ্ণ ভাবে জানান দিলো, মুসকান আর সেই ছোট্ট অবুঝটি নেই। সে এখন বড়ো হয়ে গেছে৷ কিশোরী তকমা অতিবাহিত করে যুবতী তকমা পেয়েছে, যে ছোট্ট মুসকানকে সে ভালোবাসা শিখিয়ে ছিলো সেই ছোট্ট মুসকানকে সে ভালোবাসার মাঝে দূরত্ব তৈরী করাও শিখিয়েছে। একদিকে যেমন সম্পর্কে গভীরতা ছিলো অতি নগণ্য অপরদিকে সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে আকাশ সমান। তাদের সম্পর্কের দূরত্ব’টা ঠিক এখানেই মাপা যায় আজ মুসকান তাকে তুমি ছেড়ে আপনিতে আঁটকে গেছে আর সে তুই থেকে তুমিতে। সামান্য দু’টো ওয়ার্ড আপনি এবং তুমি আজ তাদের সম্পর্কের দূরত্ব নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয় কি?
.
মুসকান প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে মরিয়ম আক্তারের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। দশ মিনিটের ব্যবধানে তার চোখে ঘুমও নেমে এলো। রাতে যেহেতু স্লিপিং পিল খেয়েছে সেহেতু পুরো বারো ঘণ্টা না ঘুমালে তার চলবেই না। বাইরে থেকে মুসকানের এহেন কাণ্ড দেখে দিহান গ্লাসে পানি ভরে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো৷ রিমি চুপচাপ সোফায় বসে আছে। একদিকে বাসার পরিস্থিতি অপরদিকে ঘুম এরা দুদিক থেকেই তাকে টানাটানি করছে। মুরাদ রিমির অবস্থা দেখে তাকে বললো রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে নিতে। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, সেও যেনো রিমির সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর ইশারা করলো দিহান কে। দিহান মাথা ঝাঁকিয়ে পা বাড়ালো মুসকানের রুমে। দিহান যখন মুসকানের রুমের দরজার সম্মুখে দাঁড়ায় ঠিক সে সময়ই ইমন মুসকানের ফোনটা গায়ের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে মেঝেতে আছড়ে ফেলে। মূহুর্তেই ফোনটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। দিহান ভয়ে ডান হাত মুঠ করে মুখে চেপে ধরে। শঙ্কিত গলায় প্রশ্ন করে,

“ভাই রে ভাই এটা তুই কি করলি! মুসু জানলে… ”

বাকিটুকু বলার পূর্বেই ইমনের রক্তিম চোখ দু’টো নজরে পড়লো দিহানের। সঙ্গে সঙ্গে ভয় জড়ানো মুখে জোর পূর্বক হাসি টেনে বললো,

” না না যা করেছিস একদম ঠিক করেছিস। ” বলেই বোকা বোকা হাসতে শুরু করলো।

ইমন দৃঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“ইয়েস একদম ঠিক করেছি। যে মোবাইল ফোনে আমার কল রিসিভ হয় না যে মোবাইল ফোন ইমন চৌধুরীকে অগ্রাহ্য করে তার পরিণতি এর থেকে ভালো হতে পারে না। ”

হেঁচকি ওঠে গেলো দিহানের গুটিগুটি পায়ে রুমের ভিতরে ঢুকে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভঙ্গিতে ইমনকে কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর বললো,

“দোস্ত মুরাদের এতোগুলা টাকা তুই এমন নির্দয় ভাবে নষ্ট করলি! মোবাইলের দোষ কি বল আসল দোষী তো তুই নিজে। কাজ টা ঠিক করলি না মুসকান এবার আরো ক্ষেপে যাবে। ”

“কেন ওর ক্ষেপার মতো কি হয়েছে এখানে? রাগ কি এমনি এমনি ফোনের ওপর খাটালাম নাকি। যদি ক্ষেপেই যায় অযথা ফোন ভাঙলাম কেন ওকেই ভেঙে দেই!”

” আরে ব্রাদার না না এমন করিস না বাচ্চা মানুষ তো। ”

আচমকাই গম্ভীর হয়ে গেলো ইমন। বললো,

“হুম সেজন্যই বেঁচে গেছে নয়তো মেরে বস্তা ভরে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসতাম। ”

“তুই কি ওর রাগ ফোনের ওপর ঝারলি এটা শুনলে তো অনেক রেগে যাবে। ”

” কি করে শুনবে? এখানে যা হলো আমি আর তুই ছাড়া কেউ জানবে না। যদি জানে তো… ”

বলেই দিহানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইমন। দিহান এক ঢোক গিলে বললো,

“আরে আরে আমি তো জানিই না মুসুর মোবাইল কে ভাঙলো আমি কিছু দেখিইনি। ইমন চৌধুরীর মতো খাস হিটলার বন্ধু যার আছে সে তো অন্ধ আর বোবা হয়েই থাকবে তাইনা!”
.
দুপুর এগারোটায় ঘুম ভাঙলো মুসকানের। ঘুম থেকে ওঠতে না ওঠতেই মায়ের বকুনি শুনে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম৷ মরিয়ম আক্তার প্রচন্ড চেঁচিয়ে বলছেন,

“টাকা কি গাছে ধরে? নাকি আমি আর তোর ভাই টাকার গাছ যে যখন খুশি মেজাজ দেখিয়ে ওটা সেটা ভাঙবি আবার প্রয়োজনে গাছে ঝাঁকি দিয়ে টাকা ফেলবি আর ভাঙবি? ”

মায়ের কথার প্রতুত্তরে একটি বাক্যও ব্যয় করলো না মুসকান। নিঃশব্দে বসার ঘর থেকে নিজের ঘরে চলে গেলো। মুসকানের এমন ভাবলেশহীন আচরণ দেখে মরিয়ম আক্তার তাজ্জব বনে গেলেন। তার মেয়েটা দিনকে দিন এমন অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়ছে কেন? এতোগুলা বকা শুনেও একটি উত্তর দিলো না? কি নিয়ে বকা হচ্ছে সেটুকু তো জানতে চাইবে নাকি ফোন ভাঙার জন্য বকছে বুঝতে পেরেছে? তাই হবে নিজে ফোন ভেঙেছে অথচ বুঝবে না কেন বকা হচ্ছে? ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মরিয়ম আক্তার। এদিকে মুসকান রুমে ঢুকে টেবিলের ওপর ভাঙাচোরা মোবাইল টা দেখে আঁতকে ওঠলো। পায়ের স্পীড বাড়িয়ে মোবাইল টা ধরতে গিয়েও ধরলো না। সুক্ষ্ম কাচ বিঁধে যাওয়ার ভয়ে। কয়েক পল নির্নিমেষ দৃষ্টিতে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে মৃদু হেসে ওয়ারড্রব থেকে জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে রুমের পাশে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

তিনটা নাগাদ স্টুডেন্টসরা নৃত্য অনুশীলন করতে আসবে। কিন্তু মুসকান নিজের জমানো হাজার পাঁচেক টাকা থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে দুপুর একটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। ইমনদের বাড়িতে আজ সকলের দাওয়াত রয়েছে। জুম্মার নামাজ পড়েই মুরাদ মরিয়ম আক্তার রিমি আর মুসকানকে নিয়ে বের হবে ঠিক করেছিলো। কিন্তু মুসকান যে এতো আগেই বেরিয়ে যাবে ভাবতে পারেনি কেউ৷ মেয়ের আচরণে হতবাক হয়ে মরিয়ম আক্তার বসার ঘরে চোখে মুখে বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে তুলে বসে আছেন।
.
ছোট্ট একটি রেষ্টুরেন্ট নাম ফুড ভিলেজ সেখানেই বসে আছে মুসকান৷ ভেবেছিলো পনেরোশো, ষোলশো টাকার মধ্যে একটা বাটন ফোন কিনবে৷ শুক্রবার তারওপর নামাজের টাইম তাই আর কেনা হলো না৷ রাগের মাথায় টাকা নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে এসেছে ঠিকি কিন্তু বারের দিকে, সময়ের দিকে একদমই খেয়াল ছিলো না। রাতে খায়নি সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেলো এখনো এক ফোঁটা পানি পরেনি পেটে শরীরটা কেমন অসাড় হয়ে আসছিলো তাই কিছু খাওয়ার জন্যই ফুড ভিলেজে এসে বসেছে।

চিকেন উইংস, পাস্তা, সাথে একটা কোল্ড ড্রিংক খেয়ে বিল মিটিয়ে স্কুলে চলে যায় মুসকান। স্কুলে প্রায় তিন ঘন্টা সময় কাটায় সে৷ এই তিন ঘন্টার মধ্যে মাত্র এক ঘন্টা ক্লাস নিয়েছে সে৷ ক্লাস শেষে সকলকে নিয়ে একসঙ্গেই স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে ৷ গেটের বাইরে পা ফেলতেই চোখ আঁটকে যায় কয়েক কদম সামনে সাদা চকচকে গাড়িটার দিকে। আচমকাই বক্ষঃস্থলে কম্পন ধরে। গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ অবস্থা। কোন রকমে এক ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে বাম দিকের রাস্তায় পা বাড়ায় যদিও তার বাসা ডানদিকে। কিন্তু ইমনের উপস্থিতিতে তার অবস্থা এতোটাই আশঙ্কা যুক্ত হয়ে পরেছে যে বাসা কোনদিকে সেটাই ভুলে গেছে। লক্ষ্য কেবল একটাই তাকে এগোতে হবে। ইমনের চোখের আড়ালে যেতে হবে। তার আশেপাশে ইমনের অস্তিত্ব থাকা মানেই তার জীবন সর্বনাশময় হয়ে যাওয়া। বেচারী এতোটাই হতবুদ্ধি হয়ে গেছে যে একটা রিকশা অবদি নিতেও ভুলে গেছে। এদিকে ইমন বড়ো বড়ো পা ফেলে সমান তালে ‘মুসকান, মুসকান’ ডেকেই চলেছে। এক পর্যায়ে ইমন ধরে ফেলে মুসকান কে। হাত টেনে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে ধমকে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে,

“এটা কি ধরনের বেয়াদবি মুসকান!”

কেঁপে ওঠে মুসকান হাত মোচড়াতে মোচড়াতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ইমনের দিকে৷ মূহুর্তেই তার দৃষ্টি ম্লান হয়ে যায়। মাথা নত করে কেবল হাত মোচড়াতে মোচড়াতে বলে,

“হাত ছাড়ুন রাস্তা ঘাটে মেয়ে দেখলেই হাত ধরে বসে থাকেন বুঝি ”

আশেপাশে নজর বুলিয়ে হাত ছেড়ে দিলো ইমন। সমস্ত রাগ ধামাচাপা দিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিবিড় ভঙ্গিতে বললো,

” আমার সঙ্গে আমার বাড়ি চলো সবাই ওয়েট করছে।”

ইমনকে দ্বিতীয় দফায় অবাক করে দিয়ে মুসকান পায়ের গতি বাড়িয়ে সামনের দিকে আগাতে লাগলো। ইমনও সঙ্গে সঙ্গেই মুসকানের সঙ্গে পায়ে পা মিলাতে শুরু করলো। ব্যস্ত পায়ে চলতে শুরু করলো দু’জনই। এরই মাঝে ইমন বললো,

” এদিকে কোথায় যাচ্ছো? ”

মুসকান এক পলক ইমনের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। ইমনের ঐ প্রগাঢ় দৃষ্টি’তে দৃষ্টি মিলানোর সাহস তার হয়ে ওঠলো না। তবে এতোগুলো দিন পর ইমনকে দেখতে পেয়ে বুকটা প্রশান্তি’তে ভরে ওঠলো৷ সেই সাথে আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করলো ইমন আগের চেয়েও দ্বিগুন সুদর্শন হয়েছে। গায়ের রঙটাও বেশ চড়া হয়ে গেছে৷ তার সাথে বুঝি আরো বেশী বেমানান লাগছে ইমনকে ভাবতেই বুকের ভিতর চিনচিন করে ওঠলো। আড় চোখে আরেক পলক ইমনকে দেখে নিয়ে লম্বা এক শ্বাস ছাড়লো। শুনেছিলো বয়সের সাথে সাথে মানুষের শারীরিক পরিবর্তনও ঘটে। কিন্তু ইমনের পরিবর্তন টা তার খুব একটা পছন্দ হলো না। হবে কি করে এই পরিবর্তন যে তাকে সময়ে অসময়ে জ্বালিয়ে খাক করে দেবে৷ তার বেশ সন্দেহ হলো মানুষ টা কি শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির ওপর পিএইচডি করতে গিয়েছিলো? নাকি বয়স কমানোর ওপর?

মুসকানের ভাবনায় ছেদ পড়লো গুড়িগুড়ি বৃষ্টির ফোঁটায়। ইমন তখনো তার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে তার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে হাঁটছিলো। কিন্তু হঠাৎই যে বৃষ্টির আগমণ ঘটবে বুঝতে পারেনি। সকাল থেকে অবশ্য আকাশের অবস্থা বেশ খারাপ। আকাশ খারাপ পজিশনে আছে আর বৃষ্টি আসবে না তাই কখনো হয়!

“মুসু বৃষ্টি পড়ছে থামো কোথায় যাচ্ছো এভাবে? ”

কিছুই বললো না মুসকান সে হেঁটেই চলেছে। এদিকে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেলো। উপায় না পেয়ে ইমন ধমকে ওঠলো। বললো,

“তুই হাঁটা থামাবি নাকি আমার অন্য ব্যবস্থা করতে হবে? ”

“আপনি কেন আসছেন? চলে যান আমি আমার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় জায়গায় যাচ্ছি। ”

ঝড়ঝড়িয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। দু’জনেরই পুরো শরীর ভিজে একাকার অবস্থা। কাঁধের ব্যগটা মাথায় চেপে কোনমতে বৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করছে মুসকান। রাগে ইমন এবার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো। আশেপাশে নজর বুলিয়ে দু’একটা দোকানের সামনে অল্পসংখ্যক লোকজন দেখতে পেলো। রাস্তা ঘাটে তেমন মানুষ নেই বললেই চলে। থেকে থেকে দু’একটা বাস,ট্রাক চলছে। সব কিছু দেখে এবং বুঝে নিয়ে মুসকানের বাহু টেনে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“বৃষ্টি’তে ভিজছিস কেন? ঠান্ডা লাগিয়ে চৌদ্দ গুষ্টি শুদ্ধো লোককে ভোগাবি ইডিয়ট! ”

বলেই পাঁজা কোল করে পিছন ঘুরে দ্রুত পা বাড়ালো স্কুলের সামনের উদ্দেশ্যে। কারণ সেখানেই তার গাড়ি রয়েছে। ইমনের বলিষ্ঠ দেহের শক্তির সামনে মুসকান ক্ষুদ্র এক পীপিলিকাই বটে। সামান্য পা নাড়ানোর উপায়ও পেলো না। একদিকে ইমন তাকে জড়োসড়ো করে নিজের সঙ্গে চিপকে রেখেছে। অন্যদিকে ভেজা শরীরে ইমনের পুরুষালী দেহের সঙ্গে লেপ্টে থেকে পুরো শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে কিছু তিক্ত বুলি উচ্চারণ করতে গিয়ে অনুভব করলো তার গলার স্বরও থমকে গেছে। উপায় না পেয়ে ওভাবেই ইমনের বক্ষস্থলে চিপকে রইলো। এগুতে এগুতে এক পর্যায় ইমন নিজের মাথা টা মুসকানের দিকে ঝুঁকিয়ে দিলো। যেনো বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মুসকানের মাথায় না পড়ে। তবুও রক্ষা হলো না তার চিবুক বেয়ে পানি টপটপিয়ে মুসকানের কপালে পড়তে লাগলো।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here