হৃদয়ে লুকানো প্রেম পর্ব -২৮+২৯

#হৃদয়ে_লুকানো_প্রেম
#নুুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_২৮
দুইদিন ধরে আয়ানরা খাগড়াছড়ি শহরে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে চলেছে। কোথাও পিহু বা তার বন্ধুদের পাচ্ছে না। প্রায় অনেকগুলো পার্ক খুঁজেছে। কলেজে খুঁজে লাভ নেই কারণ এইচএসসির জন্য ক্লাস হচ্ছে না। আজকে তৃতীয় দিন খুঁজছে। না পেলে ফিরে যাবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। রাস্তার কিনারে পথচারী চলার স্থান দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে হাঁটছে আয়ান। আর ওর দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোক খাচ্ছে। আশেপাশে অনেক স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা হাঁটাহাঁটি করছে। কিছু ছেলে-মেয়েরা ফুচকা, আইসক্রিম, ক্যান্ডি ফ্লসের দোকানে ভীড় জমিয়েছে। কোথাও পিহুকে খুঁজে পায়নি। অদূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। আজান শোনে আয়ান সাদদের কাছে আসতে নিলে একটা মেয়ের গলার স্বরে থমকে দাঁড়ায়। পেছোনে ঘুরে দেখে হিজাব পরা মেয়ে। মেয়েটির পেছোন সাইড দেখা যাচ্ছে কিন্তু তার বন্ধুদের চেহারা ঠিক দেখা যাচ্ছে। আয়ানের মনে হচ্ছে সবটা তার ভ্রম। সে চোখ কঁচলে আবার তাকালো। আরেকটু এগিয়ে গেলো। মেয়েটি বলছে,

“কীরে ভাই! একটা রিকশাও কি পাবো না? সবগুলোই নাকি বুকিং করা। আজান পরে গেছে।”

আয়ানের ওষ্ঠকোণে নিজের অজান্তেই হাসি ফুটলো। সে থমকে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটির পেছোনে ফেরার অপেক্ষায়। আকাশে এখনও অন্ধকার পুরোপুরি নামেনি। পিহু বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে পেছোনে ঘুরে। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্ব*লে উঠেছে এখন। পিহু এখনও আয়ানকে লক্ষ্য করেনি। পিহুর ছেলে বন্ধু দুজনের মধ্যে একজন বলে উঠলো,

“আমরা নামাজ পড়ে আসি। তোরা দাঁড়িয়ে ফুচকা খা নাহয়। রিকশা পেলে উঠে যাস।”

ওরা দুজন চলে গেলো। আয়ান কি করবে করবে ভেবে সেও নামাজে যাওয়ার জন্য তার দুই বন্ধুকে একটু জোরেই ডাক দিলো। এদিকে পিহু আয়ানের মতো কন্ঠ শোনে হকচকিয়ে চমকে উঠে। প্রায় তিন মাস পর কন্ঠস্বর শুনছে। যখন পরিচিত কন্ঠস্বর আমাদের সামনে আসলে ঠিক মস্তিস্কে ক্যা*চ করে। পিহুরও হয়েছে তাই। তবে আমরা মাঝে মাঝে মনে করতে না পারলেও মনের মাঝে খুব করে খচখচ করে। আর পিহু তো তার স্বপ্নে এই কন্ঠস্বরের মালিককে ভাবে। পিহু পেছোনে ঘোরাতে আয়ানের সাথে দেখা হলো। দুইজন দুটো ল্যাম্পপোস্টের নিচে। মাঝের দূরত্ব কয়েক হাত মাত্র। আয়ান মুচকি হেসে সাদ ও রাদকে নিয়ে মসজিদের দিকে গেলো। আর পিহু অবাক হয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে সেই গমন পথের দিকে চেয়ে আছে। স্বপ্ন না বাস্তব তা সে পার্থক্য করতে পারছে না। অন্য কাউকে আয়ান কল্পনা করছে কিনা ভেবে পাচ্ছে না। স্বপ্নও বুঝি এতো সুন্দর হয়! একদম নিজের কল্পনা করা একটা মূহুর্তের মতো। গৌধূলি সন্ধ্যায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে তার সাথে আবার দেখা হওয়ার ইচ্ছে মনে পোষণ করেছিল পিহু। তেমনটাই হলো। কিন্তু কবে কখন কল্পনার আবির্ভাব হয়েছিল তা মনে করতে পারছে না।
______________
রাত পোহালে নতুন ভোর সাথে উৎসব মুখর দিনের সূচনা। মুন্নি নিজের ঘর অন্ধকার করে বসে আছে। রান্নাঘরে মালা খালা দুইজনের জন্য খাবার গরম করছে। আগামীকাল ও পরশু মুন্নির পরীক্ষা নেই বলে সে নির্বিঘ্নে পড়াশোনা ছাড়া রুম আঁধার করে বসে আছে। রাদিফ ডাইনিংয়ে এসে মুন্নির ঘরের বন্ধ দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রুমে ফিরে গেছে। মুন্নি খোলা জানালা দিয়ে আঁধার অম্বরপানে চেয়ে নিজে নিজেই স্বগোতক্তি করে,

“আমার জীবনে কেউ আসুক। যে আমার আঁধার জীবনের আলোর দিশারী হবে। যার পদার্পণে আমি অতীতের টান ছাড়তে পারব।”

দীর্ঘশ্বাসে সব দুঃখ বের করার প্রয়াস করলো। মুন্নির মা গোছগাছ করছে। বিয়ে আর তিনদিন পর। তাকে ও তার স্বামীকে জারিফের বাবা অনেক অনুরোধ করে রাজী করিয়েছেন। তাই ভাইয়ের বিশেষ অনুরোধে যাচ্ছেন তারা। মুন্নির বাবা তার স্ত্রীর কাছে একটা স্বর্ণের আংটি দেখিয়ে বললেন,

“দেখো তো। এটা জারিফের বউয়ের জন্য নিলাম। কেমন হলো?”

জমিলা বেগম স্বামীকে হাসি দিয়ে বলেন,
“ভালোই। ভাই যদি ওমন অনুরোধ না করতো তবে শুধু আংটিটা কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতাম নয়তো কখনও গেলে দিয়ে দিতাম। নিজের মেয়ের কস্টের থেকে এসব গুরুত্বপূর্ণ না। নেহাত মুন্নিও বারবার করে যেতে বলেছে। মালাকে তো বললাম, তিনদিন থাকতে। এতো বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে। ওকেই রেখে গেলাম।”

“হ্যাঁ। যাই হোক। রাদিফও আগামীকাল চলে যাবে। ওর সাথেও কথা বলতে হবে। বাস তো রাত দশটায়। তোমার গোছানো শেষ করো দ্রুত।”

মুন্নির বাবা গেলেন রাদিফের সাথে দেখা করতে। মুন্নির মা চটজলদি গোছগাছ করে মেয়ের ঘরে যাবেন।

__________

নামাজ পড়ে আয়ানরা সেই স্থানে এসে দাঁড়ায়। রাহাত, সাইফরাও সাথে আছে। মসজিদে নামাজের পর ওদের দেখা হয়েছে। রাহাত ও সাইফ তো আয়ানকে প্রথমে ঠিকভাবে চিনতে না পারলেও আয়ান নাম বলার পর চিনে ফেলেছে। ওরা আয়ানকে শুধু পিহুকে খা*দ থেকে তোলার সময় দেখেছিল তারপর পিহুর মুখে আয়ান নাম শুনেই এসেছে। দুজনে আয়ানকে দেখে খুশি হয়। পিহুকে ঝ*টকা দিবে বলে ওরাও উৎসুক।

পিহু এতক্ষণ ধরে অস্থীর ভাবে হাঁটাচলা করছিল। আরেকবার চোখের সন্তুষ্টির জন্য আয়ানকে দেখতে চায়। কাছে গিয়ে কথা বলতে চায়। অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি ঘটিয়ে সাইফদের সাথে আয়ানকে আসতে দেখে স্থীর হয়ে যায়। রাহাত এসে পিহুর চোখের সামনে চুটকি বা*জিয়ে বলে,

“কীরে? দেখ তো চিনিস কী না?”

পিহু যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। পিহুর বান্ধুবীরাও অবাক হয়ে গেছে। সাইফ, রাহাত, রাদ, সাদ মুখ চেপে হাসছে। আয়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে পিহুর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,

“হাই। মাইসেল্ফ আয়ান মাহমুদ। নাইস টু মিট ইউ এগেইন। ”

পিহু হা করে তাকিয়ে আছে। পিহুর বান্ধুবী রাখি পিহুকে আলতো ধা*ক্কা দিলে পিহু হকচকিয়ে নড়েচড়ে দাঁড়ায়। নিজের হাত কাঁপা কাঁপা ভাবে এগোয়। আয়ান পিহুর হাতটা ধরতেই পিহু নিজের হাত টান দিয়ে ছুটিয়ে নেয়। আয়ান পিহুর চোখে ও ব্যাবহারে এতোটা বিহ্বলতা দেখে হেসে ফেলে।

“এই মিস ছটফটে। এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? তোমার জন্য তিন দিন ধরে খাগড়াছড়ির রাস্তাঘাটে ঘুরছি আর তুমি কীনা এখন শ*ক*ড হয়ে দাঁড়িয়ে আছো! দ্যাটস নট ফেয়ার ইয়ার।”

আয়ানের কথাগুলো পিহুর কানে ঝংকার তুললো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

“আপনি আমার জন্য এসেছেন? সত্যি?”

“হ্যাঁ। চলো কোথাও বসি।”

পিহু ঘোরের মধ্যে আয়ানের কথায় চলতে থাকে। ওরা রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে পথচারী হাঁটার স্থানে বসে। সেখানে অনেকেই বসে থাকে।

_______

সকাল থেকে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনদের ভীড় হতে দেখে প্রিয়া নিজের ফোনটাও পাচ্ছে না। আবারও ওর ইফা আপু এসে ওকে নানারকমের রূপচর্চাতে শামিল করছে। এদিকে জারিফ কয়েকবার প্রিয়াকে ফোন করে পায়নি। প্রতিবার যেকোনো কাজিন ফোন ধরে বলে প্রিয়া এটা করে ওটা করে। ব্যাস কথা আর বলতে দেয় না।
রাতে প্রিয়া কাউকে না জানিয়ে ছাদে উঠে। তারপর জারিফকে কল করে। জারিফ রিসিভ করার পর প্রিয়া সালাম দিয়েই বলে,

“সো সরি। ওরা আমাকে ফোন ধরতেই দিচ্ছিলো না। ”

“ইটস অকে। তা এখন কেউ নেই?”

প্রিয়া হেসে বলে,
“নাহ্। আমি ছাদে চলে এসেছি কাউকে না বলে।”

জারিফ অবাক হয়ে যায়। দ্রুততার সাথে বলে,

“জলদি ছাদ থেকে নামো। তোমার সাথে কথা বলাটা এখন অতোটাও মেন্ডেটরি না। দাদী বলতো, বিয়ের কনেকে একা একা সন্ধ্যার পর ছাদে উঠতে হয় না। অ্যাই ডোন্ট নো, কতটা সত্য। কিন্তু রিস্ক নেওয়ার দরকারটা কী বলো। পরশু তো হলুদের অনুষ্ঠানে দেখা হচ্ছেই।”

প্রিয়া জারিফের কথাগুলো ভাবলো। তারও এখন গা ছমছম করছে তাই বলে,
“তাহলে বারোটার পর কথা হবে। ওদের ঘুম পারাতে দরকার পরলে চায়ের সাথে স্লি*পিং পি*ল দিবো।”

জারিফ খানিক শব্দ করই হাসে। তারপর বলে,
“তা দরকার নেই। এই দুইদিন কাজিনদের সাথে সুন্দর টাইম স্পেন্ড করো। তারপর তুমি সারাজীবনের জন্য আমার সাথে নিজের বাকি জীবন কা*টাবে। কিছু কথা জমে থাকুক।”

প্রিয়া লাজরাঙা হলো। ওদের টুকটাক কথা হচ্ছিলো প্রিয়া ঘরের সদর দরজায় যাওয়া পর্যন্ত। তারপর কল কে*টে প্রিয়া ওর মায়ের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। মাকে ছেড়ে চলে যাবে ভাবতেই বিষণ্ণতা ভর করছে মনে। আগের মতো যেকোনো সময় মায়ের ব*কাব*কি, আদর, জড়িয়ে ধরা হবে না। প্রিয়ার মাও মেয়েকে জড়িয়ে কপালে চু*মু খেলেন। মেয়ে বিদায় দিবেন ভেবে তারও ক*লিজা ছিঁ*ড়ে যাচ্ছে। মেয়েকে কাছে পেয়ে শান্তি লাগছে।
#হৃদয়ে_লুকানো_প্রেম
#নুুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_২৯
আয়ানরা পিহুদের সাথে গিয়ে বসলো। আয়ান বলে,

“সেদিন তোমাকে বলে যাওয়া উচিত ছিল।”

পিহু অভিমানী কন্ঠে বলে উঠে,
“হ্যাঁ। আপনি একটুও ভালো না। জানেন কতো খুঁজেছি আপনাকে? পুরো রিসোর্ট তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাইনি। তারপরে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করাতে বলল আপনি চলে গেছেন। আপনি আগের রাতেও কথা বলার সময় বলেননি চলে যাবেন।”

আয়ান মাথা নিচু করে হাসলো অতঃপর বলল,
“তাই তো বলতে এলাম। এবার বলেই যাবো।”

পিহুর হুট করে অনেক লজ্জা লাগতে শুরু করলো। পিহুর বান্ধুবীরা মিটিমিটি হাসছে। আয়ান রাদ ও সাদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করে পিহুকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“একটা কথা বলো তো? তুমি আমায় খুঁজছিলে কেনো? হোটেল ম্যানেজার আমাকে সবটা জানিয়েছে।”

পিহু থতমত খেয়ে যায়। একবার রাখি, তনিমাদের দিকে তাকায়। থম মে*রে বসে থাকে সে। আয়ান কোনো জবাব না পেয়ে বলে,

“একদিনের পরিচয়ে তাও আবার বি*রক্তিকর সাক্ষাত! তারপরেরদিন নিশ্চয়ই তোমার আমার চলে যাওয়াতে খুশি হওয়ার কথা।”

আয়ান পিহুর দিকে তাকালো কিন্তু জবাব পেলো না। পিহুর দৃষ্টি নিচের দিকে নামানো। তাই বলল,

“আগামীকাল সকালের বাসে আমরা ফিরে যাবো। দুইদিন পর বান্ধুবীর বিয়ে। আমার প্রিয় একজন মানুষের বিয়ে।”

পিহু বিমর্ষ ভাবে চাইলো। এদিকে পিহুর বন্ধুরা বুদ্ধি করে আয়ানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট জেনে নিয়েছে। আয়ানরা ওদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে হোটেলে। পথিমধ্যে সাদ বলে,

“মেয়েটাকে দেখে মনে হলো তোকে ভালোবাসে।”

“জানি আমি। তবে আমি কি তাকে ভালোবাসি? তা জানিনা। প্রিয়াকে হ্যাপি দেখলে খুব ভালো লাগে। আগের মতো কস্ট হয় না।”

রাদ কাঁধে হাত রেখে মুচকি হেসে বলে,
“পিহু মেয়েটাকে সুযোগ দিতে পারিস। খুব সাফ মনের মনে হলো। লাইফ থেমে থাকবে না। যে যার মতো আগাবে। প্রিয়ার বিয়েতে আমরা খুব খুব ইঞ্জয় করব এটা মনে রাখিস।”

আয়ান বিপরীতে হাসলো। সে তার মনকে সুযোগ দিবে আবারও ভালোবাসার।

___________

সকাল থেকে মেহেন্দির অনুষ্ঠানের তোড়জোড় চলছে। আগামীকাল গায়ে হলুদ। মেহেন্দির অনুষ্ঠান হবে সন্ধ্যার পর কিন্তু বাড়িতে অর্গানিক কোণ মেহেদী টিউব বানানোর হিরিক পরে গেছে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রিয়ার বিবাহিতা কাজিন বোনেরা। প্রিয়া গানের কলি খেলছে ওর অন্য কাজিনদের সাথে। দিনটা আড্ডা আনন্দেই কেটে যাচ্ছে। রাহা প্রিয়ার কাছে এসে বলে,

“আপুইগো! তোমার বিয়েতে কি তোমার হ্যান্ডসাম কোন দেবর আসবেনা? জীবনে একটা প্রেম হলো না! খুব শখ ছিল বোনের দেবরের সাথে প্রেম করবো! এদিকে বোনের কোনো দেবরই নাই!”

রাহার কথায় প্রিয়া সহ অন্য কাজিনদের মাঝে হাসির রোল পরে গেলো। প্রিয়া রাহার কাঁধে কনুই রেখে বলে,

“আমার কিছু হ্যান্ডসাম বন্ধু আছে। চাইলে সেটআপ করে দিতে পারি।”

“না। তোমার বন্ধু নিবো না। আমার তো তোমার দেবরই লাগবে। কোনো কাজিন দেবর তো থাকবেই তোমার। দেখো, ঠিক তার সাথে ভাব করে তোমার সাথে চলে যাবো।”

এক কাজিন রাহার কথার প্রতিউত্তরে বলে উঠে,
“রাহারে, প্রিয়ুর তো কাজিন দেবর দুটো অবিবাহিত আছে। চাইলে লাইন লাগাতে পারিস!”

রাহা লাজুক কন্ঠে এক্সাইটেড হয়ে বলে,
“প্রিয়ুপুর বিয়ের দিন আমি তবে শাড়িই পড়বো। মাকে যেভাবেই হোক রাজি করাবোই।”

সকলের হাসির তেজ আরও বাড়লো। আরেক কাজিন বলে,
“তোর কপালে দুঃখ আছেরে রাহা। কান্নাকা*টি করে গাউন কিনেছিস। এখন পড়বি শাড়ি! তোর মা তোকে জু**তা না মা**রলেই হয়।”

কাঁদো কাঁদো কন্ঠে রাহা বলল,
“এভাবে বলো কেন আপু? আমার ভয় করে তো। মাকে বলব রিশেপশনের ড্রেসটা যেটা কিনিনি সেটাতে গাউন পড়ব। আমার তো শপিং একটু বাকি। বিকেলে যেতাম। এখন আর যাবো না। আম্মুর টাকাও বাঁচবে। আম্মুর একটা লাল-বেগুনী কাঞ্জিভরম শাড়ি আছে। ওটা সে পড়বে না। ওটাই পড়ব আমি।”

প্রিয়া হাসতে হাসতে বলে,
“আচ্ছা বাবা পরিস। এখন আমার দেবর মহোদয়রা সিঙ্গেল থাকলেই হয়!”

আরেকদফা হাসির ধ*ম*কা বয়ে গেলো কিন্তু রাহা ঠোঁট উলটিয়ে সবাইকে দেখে চলেছে। দিনটা এভাবেই কেটে যাচ্ছে ওদের। রাতের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে।

________

জারিফের কাজিনরাও জারিফকে ঝেঁকে ধরেছে ব্যাচলর পার্টি করবে বলে। জারিফ এসবে উৎসাহ প্রকাশ করছে না। সে বলেছে,

“এসব পার্টি ভ্যালুলেস। বিয়ের সাথে এসব কেনো? ব্যাচলর পার্টিতে ড্রিং*কস করা হয়। বি*য়া*র তো মাস্ট। অ্যাই ডোন্ট ওয়ান্ট ইট।”

জারিফের ইউনিভার্সটি পড়ুয়া এক কাজিন বলে,

“হেই ব্রো, ব্যাচলর পার্টিতে বি*য়ার আনা হয় ঠিক তবে ওটা তো একদিনই তাই না? অন্যান্য জুসও থাকবে।”

“নো মিনস নো। তোদের বিয়ের সময় তোরা এসব ব্যাচলর পার্টি করিস। আর তোদের যদি বি*য়ার খেতে ইচ্ছে হয় তবে নিজেদের মতো খা কিন্তু আমার বিয়ের দোহাই দিয়ে না। বাড়ির কারও যেনো কোনো অসুবিধা না হয়। আব্বু জানলে তোদের রক্ষে নাই। সো বি কেয়ারফুল।”

আরেক কাজিন বলে,
“খালু তো এসব বাড়িতে ঢোকাতেই দিবে না। তোমার সাপোর্ট পেলে দারোয়ানকে মেনেজ করতে ইজি হতো।”

“আমি এসবে নেই। আমার কাজ আছে। ইউ গাইস ক্যারি অন।”

জারিফ তার ল্যাপটপ নিয়ে ডিভানে গিয়ে বসে। আগামীকাল গায়ে হলুদ। প্রিয়াদের বাড়িতে আজ মেহেন্দির অনুষ্ঠান তাই রাতে প্রিয়াকে ফোন করবে। মেহেদীর ছবিও তো দেখবে।

_________
রাদিফ সকালে চলে গেছে। যাওয়ার সময় মুন্নির সাথে দেখা করতে চেয়েছিল কিন্তু মুন্নির ঘরের দরজা লক ছিল। মালা খালাও কয়েকবার ডেকেও মুন্নির কোনো সাড়া শব্দ পায়নি। এদিকে রাদিফের অফিস টাইম হয়ে যাচ্ছিল আবার মেসে ব্যাগ ও জিনিসপাতি রেখে অফিসে যাবে। কালকে অবশ্য মুন্নির বাবা তাকে বলেছে, চাইলে তাদের বাসায় থাকতে পারে। মেসে উঠতে হবে না। কিন্তু রাদিফের নিজের কাছে ব্যাপারটা শোভনীয় লাগেনি। এক মাস ছিল এইতো অনেক। তাই সে বলে দিয়েছে মেসেই উঠবে। মাঝেমধ্যে এসে দেখা করে যাবে।

মুন্নি এখন ব্যালকনিতে বসে চা পান করছে। সময়টা বিকেল। প্রতিদিন এই সময়টা তার ছাদে কা*টে কিন্তু আজকে এই দুই মাসের মধ্যে অন্যথা হলো। আজ তার ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে না। সে আজ ব্যালকনিতে বসে থাকবে। আকাশে মেঘ করেছে। মাঝে মাঝে মেঘের গ*র্জন শোনা যাচ্ছে। প্রকৃতিতে অন্যরকম শীতলতা। দেখে মনে হচ্ছে ঝড় হবে। ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। শীতল বাতাস বইছে। মালা খালা এসে বলেন,

“জানলা, দরজা বন্ধ কইরা ঘরে আহো খালা। তুফান আইব।”

মুন্নি হেসে বলে,
“তুমি অন্য ঘরের গুলো বন্ধ করো। আমারটা পরে করব নে। বাতাসটা ভালো লাগছে।”

মালা খালা কথা বাড়ালো না। মুন্নিও সন্ধ্যা অবধি বসে রইল। তার মা সকালে ফোন করেছিল। পৌঁছেছে জানিয়েছে। রাদিফ যাওয়ার পর সকালে একটা চিরকুট পেয়েছে দরজার নিচ দিয়ে। সকালে সে ইচ্ছে করেই দরজা খুলেনি। চিরকুটে লিখা ছিল,

“দুঃখবিলাসিনী,
আপনার কোনো দুঃখের কারণ হতে চাই না আমি। চেয়েছিলাম বন্ধু হতে। সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতে। বুঝিনি আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলব। পারলে মাফ করবেন।
ইতি
সুখের অন্বেষক পথিক”

মুন্নি কয়েকবার চিরকুটটা পড়েছে। কয়েকটা পঙক্তি হৃদয়স্পর্শী। পিহু চোখ বন্ধ করে আকাশপানে মুখ উুঁচিয়ে রাখলো।

________

“আমার হাত চু*লকা*চ্ছে প্রচুর!”

“উফ প্রিয়ু! একটু সহ্য কর। মেহেদী দিলে এমনই লাগে।”

প্রিয়া উদগ্রীব হয়ে বলে,
“না না। তোমরা এগুলো বানানোর সময় কী কম বেশি দিয়েছ বলো। আমার হাতের যদি কিছু হয় তবে আমার বর তোমাদের আস্ত রাখবে না মিলিয়ে নিও।”

ইফা টি*ট*কারি করে বলে,
“ইশ! এখনি বরের ক্ষমতার বড়াই করছে দেখো। হাতের উপর গর্জিয়াস করে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছি তাই এমন লাগছে। শুকোলো ঠিক হয়ে যাবে।”

রাহাও মেহেদী দিচ্ছে তবে প্রিয়ার মতো গর্জিয়াস করে না। রাহা বলে,
“এই প্রিয়ুপু, আমার হাত কিন্তু অতো চু*লকা*চ্ছে না। ফাঁকা স্থানগুলো একটু চু*লকা*চ্ছে। ওটা তো সবসময় হয়।”

প্রিয়া এক হাতে ফুঁ দিচ্ছে আর নিজে নিজেই বলছে,

“জলদি শুকিয়ে যা। আমি হাত চু*লকা*বো।”

প্রিয়া কান্ডে ওরা মিটিমিটি হেসে যে যার কাজ করছে। প্রিয়ার মা এসে প্রিয়াকে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিয়ে গেছে। খাবারের পর একটা এ*লার্জির ঔ*ষধ খেয়ে নিয়েছে। এখন সে ঘুমাবে। এমনিতেও এ*লার্জির ঔ*ষধ খেলে ঘুম আসে। এদিকে বেচারা জারিফ বউয়ের মেহেদী ডিজাইন দেখবে বলে রাত বারোটার অপেক্ষায় আছে কিন্তু বউ তার আগেই ঘুমিয়ে কাদা!

চলবে ইনশাআল্লাহ্‌,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here