অবেলায় তুমি পর্ব -০৯

#অবেলায়_তুমি (পর্ব-৯)
#লেখক_আকাশ_মাহমুদ

–‘আসলেই তুই একটা নিচু মনের মানুষ। ঐরকমটা করার আগে তোর দশ বার ভাবা উচিত ছিল। আর কি বললি আমি মিথ্যা বলেছি? শুন আমি কোনো মিথ্যা বলিনি। আর সোহান আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড না। সে শুধু মাত্র আমার ফ্রেন্ড।’

আকাশ তনুর কথা শুনে ভুত দেখার মতন চোখ বড় বড় করে তনুর দিকে তাকিয়ে থাকে। তনুর মুখে আকাশ এই কথাটা শুনার জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিল না। আকাশ পুরো নিশ্চুপ হয়ে যায়। মনে হচ্ছে যেনো আকাশ কোনো টাইম জোনে আঁটকে গেছে। যেখানে সব কিছু এক জায়গায় বিদ্যমান হয়ে আছে। না কোনো কিছু সামনে এগোচ্ছে না পিছনে যাচ্ছে। আকাশ বড়সড় রকমের শকট খায়। কিছুটা সময় বিস্মিত অবস্থায় কেটে যায় আকাশের। কিছুক্ষণ পর আকাশ স্বাভাবিক হয়। আর একে একে আকাশের ভিতরে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। তবে সে এখনো সাইলেন্ট। অপরিদকে তনু আকাশকে চুপ করে থাকতে দেখে সজোড়ে নাড়িয়ে বলে,

–‘কিরে কথা বলছিস না কেন এখন? স্টেজে তো আমার মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস। কিন্তু এখন চুপ করে আছিস কেন? সোহানের কথা শুনে কি আশ্চর্য হয়েছিস নাকি?’

–‘জ্বি আশ্চর্য তো হয়েছি। তবে আমি জানি আপনি একটু আগে যেই কথাটা বলেছেন সেটা পুরোটাই মিথ্যা। সোহান আপনার কোনো ফ্রেন্ড নয়। সে আপনার বয়ফ্রেন্ড। আপনি অযথা আমাকে গোমরাহ করার চেষ্টা করিয়েন না।’

–‘আকাশ আমার মাথা কিন্তু প্রচন্ড খারাপ হচ্ছে। এবার তোকে কিন্তু গলা টি’পে মে’রে ফেলবো বলে দিলাম। এই অসভ্য আমার কাছে তোর কথা গুলো কি কারণে মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে?’

–‘কারণ সেই শুরু থেকেই দেখে আসছি আপনাদের কান্ডকারখানা। এবং আপনি নিজেও বলেছেন সোহান আপনার বয়ফ্রেন্ড হয়। কিন্তু আজ এসে বলছেন সে আপনার ফ্রেন্ড। ম্যাডাম আপনি এক মুখে কয় ধরনের কথা বলেন?’

–‘আমি এক মুখে হাজার ধরনের কথা বলি। তবে সত্যি এটাই সে আমার ফ্রেন্ড। কোনো বয়ফ্রেন্ড না।’

–‘তাহলে আজ এসব কি ছিলো? সোহান পার্টিতে আসলে আপনি ওকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন। এবং সেই সঙ্গে নিজেদের বিয়ের ডেট এনাউন্সমেন্ট করবেন। কিন্তু কোনো কারণে সোহান না আসায় এখন কথার মোড় ঘুরলো কেন?’

–‘সে আমার বয়ফ্রেন্ড হলে তবেই তো পার্টিতে আসবে। কিন্তু সে তো আমার বয়ফ্রেন্ড না। আর সে এই পার্টি সম্পর্কে কোনো কিছুই জানে না। আর না তাকে আমি কিছু বলেছি। সে যদি সত্যিই আমার বয়ফ্রেন্ড হতো তাহলে সে এতো সময়ে এই পার্টিতে থাকতো। কিন্তু সে আমার ঐরূপ কেউ লাগে না দেখেই আজ পার্টিতে আসেনি।’

–‘মানে কি? সে যদি না আসার হয় তাহলে আপনি আমাকে গেইটের সামনে গিয়ে সোহান আসছে কিনা সেটা দেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন কেন?’

–‘কারণ এটা একটা প্ল্যান ছিল তোকে হতাশ করার।’

আকাশ তনুর কথার আগামাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কেমন যেনো পেঁচানো লাগছে তনুর কথা গুলো তার কাছে। তাই সে তনুকে বলে,

–‘ম্যাডাম আমি আপনার কোনো কথাই বুঝে উঠতে পারছি না। প্রথমে বললেন সোহান আপনার বয়ফ্রেন্ড না। আবার বললেন সোহান পার্টির সম্পর্কে জানেই না। কিন্তু আপনি আমাকে ওর খোঁজে গেইটে পাঠিয়েছেন। আবার পরিশেষে বলছেন তার খোঁজে পাঠানোর কারণ ছিল আমাকে হতাশ করা। ম্যাডাম এই সমস্ত কথা শুরু থেকে আমাকে আবার একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?’

–‘ঠিক আছে শুন। এতোদিন সোহান সম্পর্কে যা শুনেছিস সব মিথ্যা। আর যা দেখেছিস সব আমাদের সাজানো নাটক ছিল। আর এসব কিছু করার পিছনে কারণ ছিল তোকে কষ্ট দেওয়া। কারণ তুই আমাকে পাঁচ বছর আগে কষ্ট দিয়েছিস। তাই তোর উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমনটা করেছি সোহানের সাথে মিলে। তোর উপরে আমার অনেক অভিমান। আমি তোকে বিয়ে করেছি নিজের কাছে রেখে কষ্ট দেওয়ার জন্য। তবে সব কিছুর ভিড়ে আমার মন তোকে এখনো ভালোবাসে। আর আমার সাথে তোর বিয়েটা যেভাবেই হোক না কেন, আমি জানি আমি অন্য পুরুষের সাথে মিশলে তোর খারাপ লাগবে। আমি সেজন্য সোহানের সাথে মিলে এমনটা করেছি। আর আজকে এই পার্টিতে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কে জানানোটা আমার অনেক প্রয়োজন ছিল। কারণ আসাদ সাহেব আমাকে পছন্দ করেন। কিন্তু উনাকে আমি পছন্দ করি না। তাই উনি আমাকে পছন্দ করেন এই বিষয়টা আমাকে জানানোর পর আমি বলেছিলাম আমি সিরিয়াস একটা রিলেশনে আছি। তাই আমার একজনকে নিজের বয়ফ্রেন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা আবশ্যক ছিল। আমি চাইলে সোহানকে সবার সামনে বয়ফ্রেন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু কেন জানি অমনটা করতে আমার মন মানছি না। আর তাছাড়া এটা নিয়ে পরবর্তীতে সমস্যাও হতে পারে। কিন্তু তোর বিষয়টা নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধাবোধ কাজ করছিল না। কারণ তোকে আমি ভালোবাসি। আর তোর সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। তার উপরে তুই আমার হাসবেন্ড। মোট কথা সব কিছু মিলিয়ে মনের মধ্যে একটা আস্থা হচ্ছিল। সেজন্য আজ আমি তোকে এখানে এনে সবার সামনে নিজের বয়ফ্রেন্ড বলে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তুই আমার মানসম্মান এক মুহূর্তের মধ্যেই সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস।’

–‘তার মানে এতোদিন যা দেখেছি সব কিছুই সাজানো নাটক ছিল? আর আজকে সোহানের বিষয়টা নিয়ে মিথ্যা বলার কারণ ছিল আমাকে কষ্ট দেওয়া?’

–‘হুমম।’

তনুর কথাবার্তা শুনে আকাশ কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মাথায় কিছু কাজ করছে না আকাশের। সব কিছুই আকাশের কাছে স্বপ্নের মতন লাগছে৷ আকাশ এতোদিন ভেবে বসেছিল তনু তাকে অনেক বেশি ঘৃণা করে। কিন্তু আজ দেখছে সব কিছুর আড়ালে তনু তাকে এখনো ভালোবাসে। আকাশের ভিতরটা খুশীতে ফেটে যাচ্ছে। আকাশ তনুর দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এমন সময় তনুর কাছে সোহানের ফোন আসে। তনু আকাশের কলার ছেড়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে আকাশকে বলে,

–‘দ্যাখ আমার কথা গুলো কতোটা সত্য সেটার আরো প্রমাণ দিচ্ছি তোকে।’

তনু সোহানের ফোন রিসিভ করে লাউডস্পিকারে দেয় সোহানের কথাবার্তা গুলো আকাশকে শুনার জন্য। তনু ফোন রিসিভ করতেই অপরপাশ থেকে সোহান তনুকে বলে,

–‘দোস্ত কোথায় রে তুই?’

–‘এই তো আছি দোস্ত গাড়িতে। কিন্তু কেন?’

–‘আরেহ দোস্ত বাসা থেকে বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছে। কিন্তু তুই তো জানিস আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। কারণ বিয়ে করলে খাঁচায় বন্দী হতে হবে। এছাড়া সব কিছু একটা লিমিটে থাকতে হবে। যেটা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি নিজের স্বাধীন মতো আরো কিছুদিন কাটাতে চাই। কিন্তু মা এবার অনেক জোরাজোরি শুরু করেছে। দোস্ত তুই পারলে আমার এই বিষয়ে কোনো একটা সাহায্য কর।’

–‘আচ্ছা শুন আমি এখন গাড়িতে আছি। পরে ফ্রি কি ভাবে কি করা যায় সেই বিষয় নিয়ে আলাপ করবো নে তোর সাথে।’

–‘আচ্ছা।’

তনু ফোন কেটে দেয়। এরপর আকাশকে বলে,

–‘শুনলি তো সব কথা? এবার বিশ্বাস হয়েছে তো সে আমার বয়ফ্রেন্ড না?’

আকাশ কিছু না বলে তনুকে খপ করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে। তনু আকাশের আচরণে কিছুটা চমকে উঠে। সেই সঙ্গে জড়িয়ে ধরার বিষয়টা তনুর ও বেশ ভালো লাগে। কিছু সময় তনু নিজেও আকাশের জড়িয়ে ধরার বিষয়টা উপভোগ করে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হুট করেই তনু জোরপূর্বক আকাশ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আকাশকে বলে,

–‘এখন আদিখ্যেতা দেখিয়ে কোন লাভ নেই। তুই সারাজীবন আমাকে অপমান করেই যাবি। পাঁচ বছর আগে একবার করেছিলি বান্ধবীদের সামনে। আর আজ আবারো করলি আমার বিজনেস পার্টনারদের সামনে। তোর প্রতি আমার আর কোনো ফিলিংস নেই। সব কিছু শেষ করে দিয়েছিস তুই।’

–‘তনু তুমি শেষ করলেও এবার আমি শুরু করবো।’

–‘কথার লেহাজ ঠিক কর। আমি তোর ম্যাডাম। আমাকে তুমি ডাকার সাহস কি করে হয়?’

–‘সাহসের তো এখনো কিছুই দেখো নি। সবে মাত্র শুরু। আগামীতে দেখে থাকো আরো কি কি হয়। আর তুমি আমার ওয়াইফ লাগো সম্পর্কে। তোমাকে আপনি ডাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। হ্যাঁ অফিসে তোমাকে তোমার যথারীতি সম্মান আমি দিব। কিন্তু অফিসের বাহিরে তোমাকে আমি তুমি করেই ডাকবো।’

–‘আকাশ অতিরিক্ত করিস না। অতিরিক্ত করা কিন্তু ভালো নয়। তোর জন্য মনে যেই টুকু জায়গা ছিল সেসব তুই নিজেই শেষ করে দিয়েছিস। তাই এখন আর ভনিতা করিস না। আর আজ থেকে তোকে নিয়ে আমার মনে আর কোনো ভালোবাসা নেই। আমি আমার জীবনে নতুন কাউকে টেনে নিব। দরকার হয় সোহানের সাথে সম্পর্কে জুড়বো, তবে তোর সাথে আর নয়। আজ থেকে তোর আর আমার পথ আলাদা। এবার তুই গাড়ি থেকে নাম। তোর সঙ্গে একসাথে আমি সফর করবো না।’

আকাশ তনুর কথা মতন চুপ করে গাড়ি থেকে নেমে যায়। তবে নামার আগে সে তনুকে বলে,

–‘ঠিক আছে আমিও দেখবো তুমি দু’জনের পথ আলাদা করো কি ভাবে।’

তনু আকাশের কথার প্রত্যুত্তরে আর কিছু না বলে গাড়ি টেনে চলে যায়। আর আকাশ গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবে, তনু
যতোই তাকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করুক, আর যতোই তার উপরে প্রতিশোধ নিক, আকাশ ততোই তনুকে আগলে নিব। কারণ শুরুটা গত পাঁচ বছর আগে আকাশ নিজেই করেছে। গত পাঁচ বছর আগে সে তনুর সাথে ঐরকমটা না করলে তনু কখনোই তার সাথে এমনটা করতো না। এছাড়া আজ যেহেতু তনু নিজেই ভালোবাসার কথা বলেছে, তাই আজ থেকে আকাশ তনুকে নিজের করে নেওয়ার সংগ্রামে নামবে। যতো ঝড়ঝাপটা আসবে আসুক, কিন্তু তনুকে সে অন্য কারোর হতে দিবে না। তনুকে যেভাবেই হোক সে নিজের প্রিয়তমা বানিয়ে ছাড়বে। আকাশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে তনুকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজায়। এরপর একটা রিক্সা থামিয়ে সেটাতে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়ে…

চলবে….?

(ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here