অসময়ের বৃষ্টি পর্ব-০২

#অসময়ের_বৃষ্টি
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_২

২.

ছায়াবাজি।

মানুষের মন বড়ই আজব। সে হাজারটা দরকারী জিনিস ভুলে বসে থাকে ব্যাংকের পাসওয়ার্ড, বাজারের ফর্দ, কিংবা ড্রয়ারের চাবি। অথচ সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় কিছু স্মৃতি সে এমনভাবে মনের ভেতর যত্ন করে রেখে দেয়, যেন ওটা কোনো বহুমূল্য রত্ন।

আজিমপুরের সেই ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যার পর কেটে গেছে পুরো একটা সপ্তাহ। ইশতিয়াক তার মগবাজারের চিলেকোঠার ঘরের টেবিলটায় বসে ল্যাপটপে কোডিং করছিল। ঘড়িতে রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। ঢাকা শহর এখন নিঝুম। ঘরের খোলা জানালা দিয়ে একটা হালকা ঠান্ডা বাতাস আসছে। ইশতিয়াকের ল্যাপটপের পাশে এক কাপ চা জুড়িয়ে পানি হয়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার খেয়াল আসলে অন্য জায়গায়। সেদিন রেনুর প্লাস্টিকের ফাইলটা যখন সে নিজের ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ঢুকিয়েছিল, তখন ফাইলের ওপরের স্বচ্ছ পকেটে একটা ছোট সাদা কাগজ গোঁজা ছিল। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ছিল, রেনুকা রহমান, আজিমপুর। আর নিচে একটা মোবাইল নম্বর। ইশতিয়াক কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে নম্বরটা দেখেনি, গল্পলেখকদের চোখ সাধারণত চারপাশের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে পছন্দ করে, এটাও ছিল সেই অভ্যাসের অংশ। কিন্তু মুশকিল হলো, নম্বরটা তার মাথায় গেঁথে গেছে। সে চাইলেও ওটা মন থেকে মুছতে পারছে না।

ইশতিয়াক ল্যাপটপ বন্ধ করল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে নম্বরটা টাইপ করল। আঙুলটা ‘কল’ বাটনের ওপর গিয়ে থমকে রইল। এত রাতে একটা মেয়েকে ফোন করা কি ভদ্রতা? সে যদি রাগ করে? কিংবা যদি ভাবে ছেলেটা কোনো মস্ত বড় লম্পট, যে বৃষ্টির দিনের সামান্য পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে বিরক্ত করছে? ইশতিয়াক একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল। নিজেকে নিজে বলল, “ইশতিয়াক সাহেব, বাউন্ডুলেপনা ভালো, কিন্তু জ্যাঠামো ভালো না। ঘুমাতে যাও।”

পরদিন সকালের আকাশটা ছিল একদম পরিষ্কার, তামাটে রঙের কড়া রোদ উঠেছে। নীলক্ষেতের মোড়ে আগের দিনের সেই জলজটের চিহ্নও নেই। ইশতিয়াক তার এক বন্ধুর প্রকাশনা সংস্থায় এসেছিল একটা অনুবাদের কাজের সিলসিলা নিয়ে। কাজ শেষ করে বের হতেই তার হুট করে মনে হলো, আজিমপুর গার্লস স্কুলের ওদিকের রাস্তাটা কেমন যেন তাকে ডাকছে। মানুষ যখন কোনো একটা অবাস্তব অজুহাত খোঁজে, তখন প্রকৃতিও তাকে হাজারটা উছিলা এনে দেয়। ইশতিয়াক ইদানীং একটা ছোট আইটি ফার্মের ওয়েবসাইট বানানোর কাজ করছে। সেই ফার্মের মালিক আজমল সাহেব ইশতিয়াককে খুব পছন্দ করেন। ভদ্রলোক কালই তাকে বলছিলেন, “হেলাল সাহেব, আমার অফিসের জন্য একজন ভালো রিসেপশনিস্ট কাম অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার। চেনা-শোনার মধ্যে ভালো কোনো শান্ত-শিষ্ট মেয়ে থাকলে বলবেন তো। অনার্স পাস হলেই হবে। কথাবার্তায় একটু ভদ্রতা থাকা চাই।”

ইশতিয়াক আজিমপুর গার্লস স্কুলের সামনের একটা চায়ের দোকানে এসে দাঁড়াল। মামার কাছ থেকে একটা ওয়ান-টাইম কাপে চা নিয়ে সে মোবাইলটা বের করল। এবার আর সে দ্বিধা করল না। নম্বরটা চেপে কানে দিল। তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে একটা শান্ত গলা ভেসে এল, “হ্যালো?”

” আসসালামু আলাইকুম। আমি ইশতিয়াক। চিনতে পারছেন? ওই যে নীলক্ষেতের এক কাঠি ভাঙা ছাতা…” ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নিটোল নীরবতা। তারপর রেনুর গলাটা চট করে বদলে গেল, যেন সে আকাশ থেকে পড়েছে। “ওহ, ইশতিয়াক সাহেব! হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। কেমন আছেন আপনি?”

“আমি ভালো। আপনি সাহেব বলাটা এখনো বন্ধ করেননি দেখছি। যাই হোক, একটা দরকারী কথা ছিল। আপনি কি এখনো চাকরি খুঁজছেন?”

“হ্যাঁ, খুঁজছি। কেন বলুন তো?” রেনুর গলায় একটা চাপা উত্তেজনা আর কৌতূহল।

“আমার এক পরিচিত বড় ভাইয়ের অফিসে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লাগবে। ধানমন্ডিতে অফিস। বেতন খুব বেশি না হলেও কাজের পরিবেশ চমৎকার। আপনি যদি চান, আমি ওনাকে আপনার সিভিটা মেইল করে দিতে পারি।”

রেনু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওপাশ থেকে হালকা বাসের হর্নের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল, সম্ভবত সে তখনো কোনো দরকারে বাইরে। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আপনি আমার জন্য এত কিছু ভাবছেন কেন? আমাদের তো মাত্র একদিনের পরিচয়।”

ইশতিয়াক হাসল। বলল, “কারণ ওই যে বললাম, আমার ভাঙা ছাতাটা খুব লজ্জাবতী। সে সহজে মানুষের উপকারে আসে না। সেদিন যখন এসেছে, তখন ভাবলাম উপকারটা একটু পুরোই করা যাক। আপনি আজ বিকেলের মধ্যে আপনার সিভিটা আমার মেইলে পাঠিয়ে দেবেন? মেইল অ্যাড্রেসটা আমি টেক্সট করে দিচ্ছি।”

“ঠিক আছে। আমি দেব। থ্যাংক ইউ, ইশতিয়াক।” এবার সে ‘সাহেব’ শব্দটা আর উচ্চারণ করল না।

বিকেলের মধ্যেই রেনুর সিভি চলে এল। ইশতিয়াক সেটা আজমল সাহেবকে ফরোয়ার্ড করে দিল এবং একটু বাড়িয়েই সুপারিশ করল। আজমল সাহেব ইশতিয়াকের কথার ওপর ভরসা করে পরদিনই রেনুকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকে পাঠালেন।

তার তিন দিন পর রেনুর আবার ফোন এল। তখন ভর দুপুর বেলা। ইশতিয়াক ঘুম থেকে সবে উঠেছে, চোখে তখনো জড়তা। “ইশতিয়াক! আমার চাকরিটা হয়ে গেছে!” রেনুর গলার আওয়াজ এতটাই চড়া আর আনন্দিত যে ইশতিয়াককে কান থেকে ফোনটা একটু দূরে সরাতে হলো।

“অভিনন্দন। আজমল সাহেব মানুষ ভালো, খাটুনি একটু বেশি নেবে, তবে মাস শেষে টাকাটা ঠিকঠাক দেবে।”

“আমি খুব খুশি ইশতিয়াক। আপনাকে কীভাবে যে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না। আপনি আজ বিকেলে ফ্রি আছেন? আপনাকে আমি চা খাওয়াব। কোনো বাহানা শুনব না।”

“ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবরের ওপাশে একটা চায়ের দোকান আছে, যেখানে খুব ভালো মালাই চা পাওয়া যায়। আমি বিকেল পাঁচটায় ওখানে থাকব। চা কিন্তু আপনার খরচে।”

“অবশ্যই আমার খরচে!” রেনু হেসে বলল।

বিকেল পাঁচটায় রবীন্দ্র সরোবরের সেই নির্দিষ্ট কাঠের বেঞ্চিটায় বসে ছিল ইশতিয়াক। লেকের পানিতে বিকালের মরা রোদ এসে পড়েছে, ঝিকমিক করছে পানি। চারিদিকে মানুষের ভিড়, কেউ বাদাম খাচ্ছে, কেউ চটপটি। ইশতিয়াক একাকী মানুষ, সে একা একাই প্রকৃতির মেলা দেখছিল আর ভাবছিল মানুষের জীবনটা কত দ্রুত বদলে যায়। ঠিক পাঁচটা বেজে দশ মিনিটে রেনু এল। আজ তার পরনে একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতি সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো সুন্দর করে বিনুনি করা, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ। সে ইশতিয়াকের পাশে এসে বসল। বলল, “অনেকক্ষণ ধরে বসে আছেন?”

“নাহ, এই মাত্র এলাম। গল্পলেখকদের একটা গুণ আছে, তারা কখনো বেশিক্ষণ অপেক্ষা করে না, আবার কখনো চিরকাল অপেক্ষা করতে পারে।”

রেনু হাসল। সে ব্যাগ থেকে একটা ছোট চারকোণা প্যাকেট বের করে ইশতিয়াকের দিকে বাড়িয়ে দিল।

“এটা কী?” ইশতিয়াক ভুরু কুঁচকাল।

“আপনার জন্য একটা উপহার। আমার প্রথম চাকরির প্রথম খণ্ড খ্যাপ বলতে পারেন।” ইশতিয়াক প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে একটা চমৎকার গাঢ় নীল রঙের ফোল্ডিং ছাতা। একদম নতুন, হাতলটায় একটা মসৃণ কালো চামড়ার ফিনিশিং।

ইশতিয়াক অবাক হয়ে বলল, “ছাতা?”

“হ্যাঁ। আপনার সেই লজ্জাবতী ছাতাটার এবার রিটায়ারমেন্ট দরকার। এটা ওয়াটারপ্রুফ আর ভীষণ মজবুত। এবার হুট করে বৃষ্টি আসলে এটা ব্যবহার করবেন।” রেনু চোখ টিপে বলল। ইশতিয়াক ছাতাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অচেনা, ওলটপালট করে দেওয়া ভালোলাগা মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিচু গলায় বলল, “ছাতাটা সুন্দর। কিন্তু এই ছাতাটা দেখলে তো প্রতিবার আপনার কথা মনে পড়বে।” রেনু একটু থমকে গেল। সে সরাসরি ইশতিয়াকের চোখের দিকে তাকাল না, লেকের পানির দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে পড়লে ক্ষতি কী? মানুষ তো মানুষকে মনে রাখার জন্যই জন্মায়।” তারা দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। মালাই চা এল, তারা ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক দিল। চারপাশের কোলাহল, বাদামওয়ালার ডাক, দূর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ সব কিছু যেন তাদের স্পর্শ করতে পারছিল না। ইশতিয়াক খেয়াল করল, রেনুর সাথে থাকলে চারপাশের একঘেয়ে শহরটাকেও কেমন যেন নতুন আর মায়াময় মনে হয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত জীবনের একটা বড় সমস্যা হলো, সেখানে সুখের মুহূর্তগুলো খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে চায় না। একটা বড় আনন্দের খবর এলেই তার পেছনে এক বস্তা অদৃশ্য দুশ্চিন্তা এসে হাজির হয়।

চা শেষ করে রেনু হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখটা আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে গেছে। “কী হয়েছে, রেনু? চাকরি পাওয়ার পরেও মুখটা এমন থমথমে কেন? আজমল সাহেব কি বেশি খাটানোর ভয় দেখিয়েছে?” ইশতিয়াক হালকা করার জন্য জিজ্ঞেস করল।

রেনু মাটির দিকে তাকিয়ে রইল, নখ দিয়ে বেঞ্চের কাঠটা খুঁটতে খুঁটতে বলল, “বাসায় কাল মেহমান আসবে। বাবা আমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখছেন।”
ইশতিয়াকের হাতের চায়ের কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে সেটা রেনুকে বুঝতে দিল না। সে কাপটা নিচে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “তা তো ভালো কথা। পাত্র কী করে? দেখতে কেমন?”

“বাবার বন্ধুর ছেলে। নাম রেহান। কানাডা থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে এখন একটা ব্যাংকে বড় পোস্টে আছে। গুলশানে নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে, গাড়ি আছে। বাবা-মা পাত্রের প্রোফাইল দেখে ভীষণ পছন্দ করেছেন। কাল তারা পাকা কথা বলতে আসতে পারে।”

“আর আপনার? আপনার পছন্দ হয়েছে?” ইশতিয়াক রেনুর মুখের দিকে তাকাল। রেনু এবার ইশতিয়াকের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে বলল, “আমার পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে কী আসে যায়, ইশতিয়াক? আমি আমার পরিবারের বড় মেয়ে। বাবার রিটায়ারমেন্টের পর সংসারটা একরকম টানাপোড়েনের মধ্যে চলছে। ছোট ভাইটার পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি। রেহানের মতো পাত্র পাওয়া আমাদের মতো পরিবারের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। জীবন তো আর আপনার গল্পের পৃষ্ঠা নয় যে শেষটা আমি আমার মতো করে লিখে দেব। এখানে অংক মেলাতে হয়। রেহান সেই অংকের একদম সঠিক উত্তর।” ইশতিয়াক কিছু বলল না। সে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে রইল। সূর্যটা তখন প্রায় ডুবে গেছে, আকাশের এক কোণে সিঁদুরে মেঘ দেখা যাচ্ছে।

সেদিন সন্ধ্যায় যখন তারা বিদায় নিল, তখন ইশতিয়াকের ডান হাতে রেনুর দেওয়া সেই নতুন নীল ছাতাটা। আকাশটা পরিষ্কার, এক ফোঁটা বৃষ্টিরও সম্ভাবনা নেই, অথচ ইশতিয়াকের মনে হলো তার বুকের ভেতর একটা অসময়ের মেঘ এসে জমা হয়েছে। যে মেঘে বৃষ্টি হয় না, শুধু একটা চাপা একাকীত্ব চারিদিকটা অন্ধকার করে দেয়। না চাইতেই রেনু তার জীবনে এসেছিল এক পশলা বৃষ্টির মতো, আর এখন সে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে একটা গোছানো সমীকরণের খেরোখাতা বগলদাবা করে। ইশতিয়াক বুঝতে পারল, সে এই সমীকরণের কোথাও নেই। সে কেবলই খাতার মার্জিনে ফেলে রাখা একটা অপ্রয়োজনীয় হিজিবিজি দাগ।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here