#অসময়ের_বৃষ্টি
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_১
১.
এক পশলা মেঘ।
মাঝেমধ্যে কিছু মানুষের কপালে অলক্ষুণে ভাগ্য লেখা থাকে। তারা যেখানেই যায়, তাদের সাথে করে এক ব্যাগ মেঘ আর এক আকাশ বৃষ্টিও সাথে সাথে ঘোরে। ইশতিয়াকের ধারণা, সে নিজেও এই বিশেষ দলভুক্ত একজন মানুষ। যখনই তার পকেটে একটা মাত্র খড়কে কাঠি মার্কা সিগারেট অবশিষ্ঠ থাকে আর দেশলাইয়ের বারুদ কমে আসে, তখনই প্রকৃতির খেয়াল চাপে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামানোর। সেদিন বিকেলে যখন ঢাকার আকাশ ভেঙে মরণ-কামড় দেওয়া বৃষ্টি নামল, ইশতিয়াক তখন নীলক্ষেতের একটা পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে বইয়ের দোকানের ভেতর দাঁড়িয়ে। দোকানের চালটা টিনের। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো যখন সেই টিনের চালে এসে ধপাধপ আছাড় খেতে লাগল, তখন মনে হচ্ছিল কোনো আনাড়ি, উন্মাদের মতো ড্রামার মনের সুখে ড্রাম বাজাচ্ছে। কানের পোকা নড়ে ওঠার মতো অবস্থা। দোকানের ভেতরটা পুরোনো কাগজের সোঁদা গন্ধে ম ম করছে। ইশতিয়াক একটা ছাতা ছাড়া দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো মানুষ, অথচ তার স্বভাব হলো এই ধুলোবালি আর হলদেটে হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতা ওল্টানো। সে একটা পুরোনো রোমাঁ রোলাঁর বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানি বয়োবৃদ্ধ লোক, চোখে মোটা লেন্সের চশমা। সে নাকের ওপর চশমাটা একটু ঠেলে দিয়ে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, “মামা, বৃষ্টি তো সহজে থামব না। মেঘের ডাক শুনছেন? আকাশ ফুইটা পানি নামতাছে।”
ইশতিয়াক বইটা সাবধানে তাকে রেখে বলল, “হুম। ছাতাও আনি নাই। আপনার এখানে চা পাওয়া যাবে?”
“চায়ের দোকান তো মোড়ে, মামা। এই বৃষ্টিতে পোলাপান চুলা জ্বালাইয়া রাখব না। তয় আমার কাছে একখান পান আছে, খাবেন? জর্দা কড়া।”
“না, থাক। জর্দা খেলে আমার মাথা ঘোরে।”
ইশতিয়াক দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাতের কংক্রিটের শেডের নিচে এসে দাঁড়াল। নীলক্ষেতের মোড়ে তখন এক এলাহী কাণ্ড। রাস্তায় চটজলদি হাঁটু পানি জমে যাচ্ছে। ময়লা পানি, তার ওপর ভাসছে চিপসের প্যাকেট আর প্লাস্টিকের বোতল। রিকশাওয়ালারা হুড তুলে দিয়ে মনমরা হয়ে সিটের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছে। দু-একটা বাস হর্ন দিচ্ছে তীব্র কর্কশ শব্দে, যেন হর্ন দিলেই সামনের জলজট নিমেষে উবে যাবে। ঠিক এই নারকীয় ওলটপালটের মাঝেই মেয়েটার আগমন ঘটল। মেয়েটা রাস্তা পার হওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ছুটছিল। এক হাতে শাড়ির কুঁচি ধরা, অন্য হাতে একটা প্লাস্টিকের বড় ফাইল। কিন্তু ঠিক মাঝরাস্তায় এসে একটা দ্রুতগতির বেপরোয়া সিএনজি এমনভাবে নোংরা পানি ছিটাল যে তার আকাশী রঙের সুতি শাড়িটার একপাশ একদম কাদা-পানিতে মাখামাখি হয়ে গেল। মেয়েটা বিরক্তিতে আর অপমানে চোখ-মুখ কুঁচকে ফুটপাতের এই শেডটার নিচে এসেই আশ্রয় নিল। সে ইশতিয়াকের থেকে ঠিক হাতদুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। ইশতিয়াক আড়চোখে তাকাল। মেয়েটার বয়স বড়জোড় তেইশ-চব্বিশ। গায়ের রঙ ফর্সা, তবে এই মুহূর্তে তার মুখে রাজ্যের ক্লান্তি, হতাশা আর চাপা জেদ। চুলগুলো বাতাসে আর বৃষ্টিতে কিছুটা ভিজে কপালে-গালে লেপ্টে আছে। তার বুকের কাছে চেপে ধরা ফাইলটা সে এমনভাবে ধরে আছে, যেন ওটা কোনো ফাইল নয়, তার বুকের পাঁজর। ধোঁয়া ছাড়ার তীব্র নেশায় ইশতিয়াক পকেটে হাত দিল। শেষ সিগারেটটা বের করল। কিন্তু এই ঝড়ো বাতাসে দেশলাই জ্বালানো এক মহা যুদ্ধ। সে পিঠ ঘুরিয়ে প্রথম কাঠিটা জ্বালানোর চেষ্টা করতেই মেয়েটা তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, “দয়া করে ধোঁয়াটা ওদিকে ছাড়বেন? আমার ডাস্ট অ্যালার্জি আর অ্যাজমার সমস্যা আছে।” ইশতিয়াক চমকে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠিটা ফু দিয়ে নিভিয়ে ফেলল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকে বলল, “দুঃখিত। আমি সত্যি খেয়াল করিনি। আপনি চাইলে আমি ওপাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।” মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না। সে বাইরের অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো কেমন যেন শূন্য।
ইশতিয়াক খেয়াল করল, মেয়েটার নিচের ঠোঁটটা হালকা কাঁপছে। ঠান্ডায় নাকি অন্য কোনো কারণে, কে জানে? ঢাকা শহরের মানুষের কান্না লুকানোর বড় তাড়া থাকে। এই শহরে এত এত মানুষ, এত বড় বড় দালান, অথচ কারোর একটু শান্তিতে কাঁদার মতো নির্জন জায়গা নেই। সবাইকে ফুটপাতে, বাসে কিংবা ট্রাফিক জ্যামে মাথা নিচু করেই চোখ মুছতে হয়। “আপনার ফাইলটা কিন্তু ভিজে যাচ্ছে,” ইশতিয়াক একটু গলা নামিয়ে বলল। মেয়েটা যেন ঘোর থেকে জাগল। নিজের ফাইলের দিকে তাকাল। আসলেই, ফাইলের নিচের অংশটা চুয়ে চুয়ে পানি পড়ছে। ভেতরের কাগজগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নিশ্চিত। সে কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বলল, “আমার একটা ইন্টারভিউ ছিল আজ। আজিমপুরের একটা গার্লস স্কুলে। চাকরিটা আমার খুব দরকার ছিল।”
“হয়নি?”
“না। আমি যখন স্কুলের গেটে পৌঁছালাম, তার ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই তারা মেইন গেট লক করে দিয়েছে। এই বৃষ্টির মধ্যে কোনো রিকশাওয়ালা আসতে চাইল না, একটা সিএনজি ডেকেছিলাম, সে চাইল তিনশ টাকা ভাড়া। অত টাকা আমার ব্যাগে ছিল না।” মেয়েটার গলার আওয়াজ কেমন যেন বুজে এল। সে আর কথা বাড়াল না, রাস্তাটার দিকে চেয়ে রইল। ইশতিয়াক তার কাঁধের ওয়াটারপ্রুফ ঝোলা ব্যাগটা সামনে এনে চেইন খুলল। পকেট থেকে একটা ধোয়া, পরিষ্কার সুতি রুমাল বের করে বাড়িয়ে দিল। বলল, “নিন, মুখ আর হাতটা মুছে ফেলুন। আর ফাইলটা চাইলে আমার ব্যাগে রাখতে পারেন। এটা ভেতরে পানি ঢোকে না। কাগজগুলো বেঁচে যাবে।”
মেয়েটা থমকে গেল। সে কিছুক্ষণ স্থির চোখে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ঢাকা শহরে অপরিচিত কোনো পুরুষ হুট করে রুমাল বাড়িয়ে দিলে বা ব্যাগ এগিয়ে দিলে অবধারিতভাবে ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু ইশতিয়াকের চোখ দুটো এতই নির্বিকার, শান্ত আর মায়াময় যে মেয়েটার ভেতরের জড়তা আর ভয়টা বোধহয় কেটে গেল। সে রুমালটা নিল না, তবে ফাইলটা বাড়িয়ে দিল। “থ্যাংক ইউ। ফাইলটা রাখুন প্লিজ। আমার সব সার্টিফিকেট আছে ওটায়। নষ্ট হলে আমি শেষ।”
ইশতিয়াক ফাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে চেইন আটকে বলল, “আমি ইশতিয়াক। ফ্রিল্যান্সিং করি, আর মাঝে মাঝে আজেবাজে গল্প লেখার চেষ্টা করি।” মেয়েটা সামান্য হাসল। সে বলল, “আমি রেনু। গল্প লেখার মানুষরা তো সাধারণত অনেক বুদ্ধিমান হয়, আপনি ছাতা ছাড়া ঘোরেন কেন?”
“হুমায়ূন আহমেদ এক জায়গায় লিখেছেন, ছাতা হলো মানুষের তৈরি সবচেয়ে অহংকারী বস্তু। সে ভাবে সে আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টিকে আটকে দেবে। প্রকৃতির ওপর এই অহংকার আমার ভালো লাগে না। তাই ছাতা নিই না।” ইশতিয়াক গম্ভীর মুখে বলল।
রেনু এবার বেশ শব্দ করেই হেসে ফেলল। বলল, “বানিয়ে বললেন তো?”
“ধরা পড়ে গেলাম? আসলে সত্যিটা হলো, আমার ব্যাগে একটা ছাতা আছে। তবে ওটা একটু লজ্জাবতী টাইপের। তিন তালি জোড়াতালি দেওয়া, এক পাশের কাঠি ভাঙা। ওটা খুললে লোকে হাসবে, তাই সহজে বের করি না।” বৃষ্টির বেগ তখন কিছুটা কমে এসেছে, তবে আকাশের মেঘ কমেনি। ঝিরঝিরে একটা হাওয়া দিচ্ছে, যা শরীরের ভেতর কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।
ইশতিয়াক বলল, “এই অবস্থায় আপনি বাড়ি ফিরবেন কীভাবে? রাস্তা তো পুরো ডুবে গেছে।”
“হাঁটব। আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের ওদিকেই তো যাব। বেশি দূর না।”
“আমিও ওদিকেই যাব, নীলক্ষেতের ওপাশটায় একটা কাজে। চলুন, একসাথে হাঁটা যাক। আমার ওই এক কাঠি ভাঙা লজ্জাবতী ছাতাটা এবার বের করাই যায়। দুজনে শেয়ার করলে অন্তত মাথাটা বাঁচবে।”
রেনু একটু ইতস্তত করল, তারপর মাথা নাড়ল। তারা যখন শেড থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে পা রাখল, তখন চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। সেই আলো পানির ওপর পড়ে ছায়ার সৃষ্টি করছে। ভাঙা ছাতাটার নিচে দুজনে খুব কাছাকাছি হেঁটে চলেছে। ইশতিয়াক ছাতাটা রেনুর দিকে একটু বেশি বাড়িয়ে ধরে রেখেছে, যার ফলে তার নিজের ডান কাঁধটা পুরোপুরি ভিজে যাচ্ছে। রেনু সেটা খেয়াল করে বলল, “আপনার কাঁধ তো ভিজে যাচ্ছে। ছাতাটা মাঝখানে রাখুন।”
“আরে না, আমার তো মেঘ-বৃষ্টির সাথে পুরনো সখ্যতা। ভিজলে সমস্যা নেই। আপনার আবার ঠান্ডা লেগে অ্যাজমা বেড়ে যাবে।”
রেনু আর কিছু বলল না। তবে সে অলক্ষ্যে ইশতিয়াকের আরেকটু কাছে সরে এল। মানুষের জীবনে কিছু মানুষের আগমন এতই আকস্মিক আর নিঃশব্দে হয় যে, মন কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগই পায় না। না চাইতেই তারা জীবনের অংশ হয়ে যায়। রেনু নামের এই সাধারণ, হিসেবি মেয়েটা যে ইশতিয়াকের ছন্নছাড়া জীবনে একটা মস্ত বড় ঝড় তুলতে যাচ্ছে, কিংবা ইশতিয়াক নামের এই বাউন্ডুলে ছেলেটা যে রেনুর চেনা পৃথিবীর সমীকরণগুলো ওলটপালট করে দেবে তা তারা দুজনে এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় তখনো বিন্দুমাত্র টের পায়নি। আজিমপুর গোরস্তানের মোড়ে এসে রেনু দাঁড়াল। বলল, “আমি এবার চলে যেতে পারব। থ্যাংক ইউ, ইশতিয়াক সাহেব।”
“সাহেব বলার দরকার নেই। শুধু ইশতিয়াক বললেই চলবে। আপনার ফাইলটা?” ইশতিয়াক ব্যাগ থেকে ফাইলটা বের করে দিল।
“আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ,” ফাইলটা বুকে জড়িয়ে রেনু বলল।
“ধন্যবাদ দিতে হলে ওই সিএনজি ওয়ালাকে দিন, যে কাদা ছিটিয়ে আপনাকে আমার দোকানের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল,” ইশতিয়াক চোখ টিপে হাসল।
রেনু আরেকবার হাসল, তারপর মায়াবী সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ইশতিয়াক চাদরের মতো জড়িয়ে থাকা কুয়াশা আর বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে রইল। তার পকেটের সেই একমাত্র ভিজে যাওয়া সিগারেটটা বের করে সে এবার সত্যি সত্যি দেশলাই জ্বালানোর চেষ্টা করতে লাগল। এবার কাঠিটা জ্বলল।
চলবে?





