#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০৭(শেষ)
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥
সকালের আলোটা ধীরে ধীরে শহরের উপর নেমে আসছিল, কিন্তু সেই আলোতে আর আগের মতো উষ্ণতা ছিল না, ছিল শুধু এক ধরনের নিরপেক্ষতা, যেন প্রকৃতিও এখন এই পরিবারের ভাঙনকে দূর থেকে দেখছে, কোনো পক্ষ নিচ্ছে না, কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না। এই শহরেরই এক প্রান্তে রুপালী তার শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর অন্য প্রান্তে ইয়াসিন ও তার পরিবার নিজেদের শেষ ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে আর কোনো ফিরতি পথ অবশিষ্ট নেই।
রুপালীর চোখ জানালার বাইরে। সে আজ আর অতীতের দিকে তাকাচ্ছে না, কারণ সে জানে অতীতকে যত বেশি দেখা হয়, বর্তমান তত বেশি দুর্বল হয়ে যায়। তার কোলে শিশুটি শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন সে কোনো যুদ্ধের সাক্ষী নয়, বরং এক নতুন শান্ত পৃথিবীর শুরুতে আছে। রুপালী ধীরে ধীরে তার হাত শিশুটির গায়ে বুলিয়ে বলল, “তোমার জীবন আমি আমার মতো করে গড়ব, যেখানে কেউ তোমাকে দরজার বাইরে রেখে যাবে না।”
এই কথাটা সে খুব নিচু কণ্ঠে বলেছিল, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক চূড়ান্ত প্রতিজ্ঞা, যেটা আর কোনো পরিস্থিতিতে ভাঙবে না।
ঠিক সেই সময় তার ফোনে একটি কল এলো। ইয়াসিন। এই নামটা এখন তার কাছে আর কোনো আবেগ বহন করে না, শুধু একটি অতীতের পরিচয়।
সে ফোনটা কিছুক্ষণ দেখল, তারপর পাশে রেখে দিল। এইবার আর কোনো দ্বিধা নেই, কোনো কষ্ট নেই, শুধু এক সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা।
অন্যদিকে ইয়াসিন দাঁড়িয়ে ছিল পুরোনো বাড়ির সামনে। আজ এই বাড়িটা আর তাদের নেই, এটা এখন শুধু একটি দখলকৃত বাস্তবতা, যেখানে তারা আর প্রবেশ করতে পারে না। তার পাশে রহিমা বেগম বসে আছেন গাড়ির ভেতরে, চোখে ক্লান্তি আর মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। রেসমিকা নীরবে বাইরে তাকিয়ে আছে, তার জীবনের সেই সহজ গর্ব এখন আর কোথাও নেই।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এইবার তার হাতে কোনো আত্মবিশ্বাস নেই, কোনো অধিকার নেই, শুধু একটি শেষ চেষ্টা।
আইনজীবী আবার সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে সেই আগের মতোই শান্ত দৃঢ়তা।
তিনি বললেন, “আপনারা আবারও এখানে এসেছেন কেন?”
ইয়াসিন খুব নিচু কণ্ঠে বলল, “আমরা শুধু একবার ওর সাথে কথা বলতে চাই।”
আইনজীবী কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “কথা বলার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
এই কথাটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে ছিল সমস্ত সম্পর্কের চূড়ান্ত সমাপ্তি।
ঠিক তখনই রুপালী গাড়ি নিয়ে সেখানে এসে থামল।
সবাই থেমে গেল।
রুপালী ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। তার হাতে শিশুটি। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো কষ্ট নেই, শুধু এক গভীর শান্তি।
ইয়াসিন তাকে দেখে সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখে এখন আর অহংকার নেই, আছে শুধু ভাঙা অনুরোধ।
সে বলল, “রুপালী… আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমি সব বুঝেছি।”
রুপালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “তুমি শুধু ভুল করোনি, তুমি একজন মানুষকে তার সবচেয়ে দুর্বল সময়ে একা করে দিয়েছো।”
এই কথাটা শোনার পর ইয়াসিন আর কিছু বলতে পারল না।
কারণ এখানে আর কোনো যুক্তি কাজ করে না, কোনো ব্যাখ্যা অর্থ বহন করে না।
রহিমা বেগম গাড়ি থেকে নেমে এলেন। তার পা একটু কাঁপছিল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমাকে ক্ষমা করো, আমি বুঝতে পারিনি…”
রুপালী তার দিকে তাকাল।
তার চোখে কোনো ঘৃণা নেই, কিন্তু কোনো নরমতাও নেই।
সে বলল, “আপনি বুঝতে চাননি।”
এই এক বাক্যেই যেন পুরো অতীতটা শেষ হয়ে গেল।
রেসমিকা নিচে তাকিয়ে ছিল, তার মুখে কোনো শব্দ নেই।
রুপালী ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ়।
সে বলল, “আমি তোমাদের বিরুদ্ধে কিছু করিনি। আমি শুধু আমার জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচতে শিখেছি।”
তারপর একটু থেমে আবার বলল, “আর সেই জীবনে তোমাদের আর কোনো জায়গা নেই।”
এই কথাটা কোনো চিৎকার ছিল না, কোনো প্রতিশোধ ছিল না, এটা ছিল একটি চূড়ান্ত সীমারেখা।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জল কোনো পরিবর্তন আনতে পারল না।
কারণ কিছু সিদ্ধান্ত একবার নিলে, সেটা আর ফেরত নেওয়া যায় না।
রুপালী ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল। তার কোলে শিশু।
তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো এই মুহূর্ত থেকেই।
সে আর পেছনে তাকাল না।
কারণ সে জানে, যে মানুষ একবার নিজের জীবন নিজের হাতে তৈরি করতে শিখে যায়, তাকে আর কোনো অতীত থামাতে পারে না।
গাড়ি ধীরে ধীরে চলে গেল।
পেছনে রয়ে গেল ইয়াসিন, রহিমা বেগম আর রেসমিকা।
তিনজন মানুষ, যাদের জীবন একসময় একসাথে ছিল, কিন্তু এখন তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা অপরিচিত মুখ।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
তার মুখে কোনো শব্দ নেই।
শুধু একটি নীরব স্বীকারোক্তি, যে সে হেরে গেছে।
রহিমা বেগম আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখে কোনো স্বপ্ন নেই, শুধু এক দীর্ঘ ক্লান্তি।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমরা কি সব হারালাম?”
কিন্তু তার প্রশ্নের কোনো উত্তর এলো না।
কারণ কিছু হারানো কখনো গণনা করা যায় না।
কিছু হারানো শুধু অনুভব করা যায়।
রেসমিকা ধীরে ধীরে বলল, “আমরা ওকে হারাইনি… আমরা নিজেদের হারিয়েছি।”
এই কথাটা বাতাসে মিশে গেল।
কেউ আর কিছু বলল না।
শহর আবার চলতে শুরু করল।
কিন্তু তাদের জন্য জীবন থেমে গেছে অনেক আগেই।
রুপালী দূরে চলে যাচ্ছিল। তার চোখ সামনে।
তার ভেতরে কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো অশান্তি নেই।
শুধু একটি শান্ত, নতুন শুরু।
তার শিশুটি নড়ে উঠল হালকা করে।
সে হেসে ফেলল।
আর সেই হাসিতেই যেন পুরো একটি নতুন জীবন লেখা হয়ে গেল।
সমাপ্ত…….





