#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০৬
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥
রাতের শহরটা তখনও জেগে ছিল, কিন্তু সেই জাগরণে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল শুধু চলমান মানুষের ছায়া আর নিঃশব্দ রাস্তাগুলোর ভেতর জমে থাকা এক অদৃশ্য ক্লান্তি। এই শহরেই একদিকে রুপালী নিজের নতুন জীবনের ভিত গড়ে তুলছিল, আর অন্যদিকে ইয়াসিন ও তার পরিবার ধীরে ধীরে সেই পুরোনো পরিচিত নিরাপত্তার মাটি হারিয়ে ফেলছিল, যেটাকে তারা এতদিন অবহেলা করেও নিজের অধিকার মনে করেছিল।
রুপালী তখন তার ছোট্ট ঘরে বসে ছিল, শিশুটি ঘুমিয়ে আছে তার পাশে। ঘরের ভেতর খুব হালকা আলো জ্বলছিল, সেই আলোতে তার মুখে কোনো অস্থিরতা নেই, নেই কোনো দ্বিধা, আছে শুধু এক গভীর শান্তি, যেটা অনেক ভাঙনের পর মানুষ অর্জন করে। তার ফোনটা পাশেই রাখা, কিন্তু এখন আর সেই ফোন তার জীবনের কেন্দ্র নয়, কারণ সে শিখে গেছে, কিছু মানুষ চলে গেলে তাদের বার্তা আর ফিরে আসার ডাক হয়ে আসে না, বরং সেটা হয়ে যায় শুধু অতীতের প্রতিধ্বনি।
তার মনে পড়ছিল সেই রাতের কথা, যখন তাকে দরজার বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছিল, যখন তার প্রসব বেদনার কণ্ঠ কেউ শোনেনি, যখন সে একা লড়াই করেছিল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেই একই নারী এখন আর আগের মতো ভাঙা নেই, সে এখন নিজের ভেতর গড়ে তুলেছে এক নতুন শক্তি, যেটা তাকে আর কখনো কারও দয়ার উপর নির্ভর করতে দেবে না।
অন্যদিকে ইয়াসিনের জীবন ধীরে ধীরে আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। তার কাজের জায়গায় প্রভাব পড়ছিল, ব্যক্তিগত জীবন ভেঙে পড়ছিল, আর সবচেয়ে বড় কথা, সে নিজের ভেতরেই নিজের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ শুরু করেছিল।
সে বুঝতে পারছিল, রুপালী তাকে শাস্তি দেয়নি, সে শুধু তাকে তার নিজের সিদ্ধান্তের ফলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিন সে আবার চেষ্টা করল রুপালীর সাথে যোগাযোগ করতে, কিন্তু এবারও কোনো উত্তর এলো না।
তার পাঠানো প্রতিটি বার্তা পড়া হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই সেখান থেকে ফিরে এসেছিল এক নীরব প্রত্যাখ্যান।
এই নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছিল, কারণ প্রত্যাখ্যানের চেয়ে নীরবতা অনেক বেশি কঠিন, কারণ নীরবতা কোনো দরজা খোলা রাখে না, কোনো আশা দেয় না। রহিমা বেগম তখন নিজের ঘরে একা বসে ছিলেন।
তার চারপাশে এখন আর সেই ক্ষমতার আভা নেই, নেই কোনো মানুষকে নির্দেশ দেওয়ার পরিবেশ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, জীবনে সবচেয়ে বড় পতন তখনই আসে, যখন মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের উপর আর বিশ্বাস রাখতে পারে না।
তিনি বারবার সেই দিনের কথা ভাবছিলেন, যেদিন তিনি খুব সহজভাবে বলেছিলেন, রুপালীকে একা রেখে চলে যেতে।
সেই একটি বাক্য এখন তার জীবনের সবচেয়ে ভারী শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ধীরে ধীরে নিজের ভেতর বললেন, “আমি কি সত্যিই বুঝতে পারিনি, নাকি বুঝতে চাইনি…”
কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না, কারণ কিছু ভুলের উত্তর দেরিতে আসে না, কিছু ভুল শুধু বেঁচে থাকে অনুশোচনার আকারে।
রেসমিকা তখন আর আগের মতো বাইরে যেতে চাইত না।
তার বন্ধুরা তাকে প্রশ্ন করত, তার জীবন নিয়ে আলোচনা করত, কিন্তু সে আর আগের মতো গর্বের সাথে কিছু বলতে পারত না। কারণ সে জানত, যে জীবনকে সে সহজ ভেবেছিল, সেটার ভেতর আসলে ছিল অন্য কারও কষ্টের গভীর ইতিহাস। একদিন দুপুরে হঠাৎ করে ইয়াসিন তার মায়ের ঘরে এসে দাঁড়াল। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিদ্রার ছাপ। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমরা কি কিছুই আর ঠিক করতে পারব না?”
রহিমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব নিচু কণ্ঠে বললেন, “যেটা ভেঙে গেছে, সেটা আগের মতো জোড়া লাগে না, ইয়াসিন।”
এই কথাটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য।
এদিকে রুপালী ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছিল। সে কোনো প্রতিশোধের গল্পে নেই, সে কোনো রাগের গল্পে নেই, সে আছে নিজের অস্তিত্বের গল্পে।
তার সন্তান এখন তার সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেই শক্তিকে কেন্দ্র করেই সে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করছে।
একদিন সে তার পুরনো আইনজীবীর সাথে দেখা করল। সেখানে সে কিছু নতুন কাগজে স্বাক্ষর করল, যেগুলো তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত করছিল।
সে জানত, জীবন কখনো আবার তাকে একই অবস্থানে আনতে পারে, কিন্তু এবার সে প্রস্তুত।
আইনজীবী তাকে বললেন, “আপনি চাইলে এখন সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক শেষ করতে পারেন, সব আইনি বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারেন।” রুপালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না, শুধু এক গভীর স্থিরতা।
সে বলল, “আমি শুধু সম্পর্ক শেষ করতে চাই না, আমি চাই আমার জীবনটা আর কখনো কারও ভুলের উপর নির্ভর না করুক।”লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল।
এই কথাটা কোনো আবেগ ছিল না, এটা ছিল সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন একা হয়ে গেছে। তার চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু সম্পর্ক নেই। সে প্রথমবার বুঝতে পারছে, ক্ষমতা থাকলেই সবকিছু থাকে না, কখনো কখনো মানুষ হারিয়ে গেলে ক্ষমতাও অর্থহীন হয়ে যায়।
এক রাতে সে একা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে তারা জ্বলছিল, কিন্তু তার ভেতরে কোনো আলো ছিল না। সে খুব ধীরে বলল, “আমি যদি সেদিন… দরজাটা না বন্ধ করতাম…”
কিন্তু এই “যদি” শব্দটা তাকে আর কিছু দিতে পারল না, শুধু আরও গভীর এক কষ্ট।
রহিমা বেগমও তখন আর আগের মতো শক্ত ছিলেন না।
তিনি একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। সেখানে শুয়ে শুয়ে তিনি প্রথমবার বুঝতে পারলেন, জীবনে মানুষ যত শক্তই হোক, একা হয়ে গেলে সেই শক্তির কোনো মানে থাকে না।
রেসমিকা তার পাশে বসে ছিল, কিন্তু তার চোখে এখন আর সেই আগের অহংকার নেই। ইয়াসিন দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারা তিনজনই এখন এক ভাঙা সম্পর্কের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, যারা আর জানে না কোথায় ফিরতে হবে।
এদিকে রুপালী তার শিশুকে নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশের দিকে তাকিয়ে সে খুব শান্তভাবে বলল, “আমি আর কারও জীবনের অপেক্ষায় থাকব না।”
তার কণ্ঠে কোনো ঘৃণা নেই, কোনো প্রতিশোধ নেই, আছে শুধু নিজের জীবনের প্রতি এক সম্পূর্ণ দায়িত্ববোধ।
তার জীবন এখন আর কারও গল্পের অংশ নয়, সে নিজেই তার গল্পের লেখক।
চলবে..?





