অবহেলিত স্ত্রীর প্রতিশোধ পর্ব-০৫

#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০৫
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥

রাত যত গভীর হচ্ছিল, শহরের আলো ততই দূরের কোনো স্মৃতির মতো মনে হচ্ছিল। সেই আলো আর বাস্তবতার মধ্যে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ একদিকে ছিল রুপালীর নতুন করে গড়ে ওঠা জীবন, আর অন্যদিকে ছিল ইয়াসিনদের ভাঙতে থাকা পরিচিত পৃথিবী, যেটা একসময় তারা নিজেরা খুব গর্ব করে ধরে রেখেছিল।

এই দুই জগত এখন একই শহরে থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা, যেন একে অপরের অস্তিত্বও আর আরেকজনের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।

ইয়াসিন সেই রাতেও ঘুমাতে পারেনি। ঘরের ভেতর সে একা বসে ছিল, চারপাশে নীরবতা, কিন্তু তার ভেতরে ছিল অস্থিরতার এক ভয়ংকর শব্দ, যেটা কোনোভাবেই থামছিল না। সে বারবার মনে করার চেষ্টা করছিল, কোথায় সে ভুল করেছিল, কোন মুহূর্তে তার সিদ্ধান্ত তাকে এই অবস্থায় এনে ফেলল, কিন্তু যতই সে অতীতে ফিরে যেতে চাইছিল, ততই অতীত তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।

সে বুঝতে পারছিল, রুপালী আর সেই মানুষটা নেই যাকে সে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, আর সে নিজেও আর সেই মানুষটা নেই যে নিজের ভুলকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে পারে। এখন তাদের মধ্যে শুধু একটা বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, যেটা খুব নির্দয়ভাবে বলছে, সম্পর্ক শুধু নামের উপর টিকে থাকে না, সম্পর্ক টিকে থাকে সম্মান, দায়িত্ব আর সময়মতো নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর।

অন্যদিকে রহিমা বেগম ঘরের এক কোণে বসে ছিলেন।

তার চারপাশে এখন আর সেই ব্যস্ততা নেই, নেই কোনো নির্দেশ, নেই কোনো মানুষকে ছোট করার সুযোগ।

তার জীবনে যে শক্তি ছিল, সেটাই এখন ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। তিনি প্রথমবার অনুভব করছিলেন, ক্ষমতা হারানো মানে শুধু বাহ্যিক কিছু হারানো নয়, বরং নিজের ভেতরের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া।

তিনি বারবার চোখ বন্ধ করছিলেন, আর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই দরজার দৃশ্য, যেখানে তিনি খুব সহজভাবে বলেছিলেন, তাকে একা রেখে যেতে।

সেই মুহূর্তে তিনি ভেবেছিলেন, এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু আজ সেই ছোট সিদ্ধান্তটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেসমিকা এখন আর আগের মতো কথা বলছিল না।

তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস ভেঙে গেছে। সে বুঝতে পারছে, সে যে জীবনটাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছিল, সেটা আসলে অন্য কারও কষ্টের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। এখন সেই ভিত্তি সরে যাওয়ায় সবকিছুই নড়বড়ে হয়ে গেছে।

দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল, কিন্তু পরিস্থিতি সহজ হলো না। ইয়াসিন একবার রুপালীর সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে।

কোথাও তার নাম লেখা ছিল না, কোথাও তার প্রবেশাধিকার ছিল না, আর সবচেয়ে কঠিন সত্যটা ছিল, কোথাও তার জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না।

সে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল, ক্ষমা পাওয়া আর সম্পর্ক ফিরে পাওয়া এক জিনিস নয়। ক্ষমা চাওয়া সহজ, কিন্তু যে বিশ্বাস একবার ভেঙে যায়, সেটা আর আগের মতো হয় না।

একদিন দুপুরে ইয়াসিন একা রাস্তায় হাঁটছিল। চারপাশে মানুষ চলাচল করছে, জীবন আগের মতোই চলছে, কিন্তু তার কাছে সবকিছু যেন থেমে আছে।

সে হঠাৎ বুঝতে পারল, সে আর সেই জীবনের অংশ নয় যেখানে সে আগে ছিল, সে এখন শুধু একজন দর্শক, যে নিজের জীবনের ভেতরেই পরাজিত।
ঠিক সেই সময় তার ফোনে একটি পুরনো ছবি ভেসে উঠল।

রুপালীর সাথে তার বিয়ের ছবি। সেই ছবিতে হাসি ছিল, আশা ছিল, আর ছিল এক ধরনের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু এখন সেই ছবি তার কাছে শুধুই একটি স্মৃতি, যেটা আর কোনো বাস্তবতা বহন করে না।

সে ফোনটা বন্ধ করে দিল। কারণ কিছু স্মৃতি বারবার দেখলে শুধু যন্ত্রণা বাড়ে, কোনো সমাধান আসে না।

রহিমা বেগম তখন বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলেন। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু আকাশে কোনো উত্তর ছিল না। তার জীবনে প্রথমবার তিনি বুঝতে পারছিলেন, মানুষকে অবহেলা করা যত সহজ, তার ফল ভোগ করা ততটাই কঠিন। একদিন তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমি যদি সেদিন তাকে একা না রেখে যেতাম…”
কিন্তু বাকিটা তিনি আর বলতে পারলেন না। কারণ “যদি” শব্দটা জীবনে কোনো পরিবর্তন আনে না, “যদি” শুধু আফসোস বাড়ায়।

এদিকে রুপালী তার জীবনে ধীরে ধীরে স্থিরতা ফিরিয়ে আনছিল। সে এখন আর অতীত নিয়ে ভাবছিল না, কারণ সে জানত, অতীতকে বদলানো যায় না, কিন্তু ভবিষ্যত তৈরি করা যায়। তার সন্তান তার কাছে এখন শুধু দায়িত্ব নয়, বরং নতুন জীবনের প্রতীক।

সে নতুন করে কাজ শুরু করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, সে আর কারও অনুমতির অপেক্ষা করছে না।

এক সন্ধ্যায় সে তার শিশুকে নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, আর সেই আলোতে তার মুখে এক ধরনের শান্তি দেখা যাচ্ছিল, যেটা দীর্ঘ যুদ্ধের পর আসে। সে খুব ধীরে বলল, “আমি আর কারও অপেক্ষায় থাকব না।” এই কথাটা কোনো প্রতিশোধের ঘোষণা ছিল না, এটা ছিল নিজের জীবনের নতুন সংজ্ঞা।

অন্যদিকে ইয়াসিন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, সে যেটা হারিয়েছে, সেটা শুধু একজন স্ত্রী নয়, বরং একজন মানুষ, যে তার জীবনে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু সেই বিশ্বাস সে নিজের হাতেই ভেঙে দিয়েছে।
এক রাতে সে শেষবারের মতো রুপালীর বাড়ির সামনে গিয়েছিল। দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিল, ভিতরে ঢোকার সাহস তার ছিল না। সে শুধু আলোটা দেখছিল, যেটা এখন আর তার জীবনের অংশ নয়।

তার চোখে জল ছিল, কিন্তু সেই জল কোনো পরিবর্তন আনতে পারল না। কারণ কিছু গল্পে দেরি হয়ে গেলে, চোখের জলও শুধু একটি সাক্ষী হয়ে যায়, সমাধান নয়।

রুপালী সেই রাতে ঘুমানোর আগে জানালার পর্দা টেনে দিল। বাইরে পৃথিবী চলছে, কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবী এখন শান্ত। তার ফোনে কোনো নতুন বার্তা ছিল না, কোনো পুরনো ডাক ছিল না। শুধু একটি সম্পূর্ণ নতুন জীবন।

চলবে..?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here