গোধূলি বেলায় পর্ব ১৬

#গোধূলি_বেলায়
#পর্ব_16

এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।
সকাল বেলা আমির, রে ভাই (ও ভাই)
ফকির, সন্ধ্যাবেলা॥
সেই নদীর ধারে কোন ভরসায়
বাঁধলি বাসা, ওরে বেভুল, বাঁধলি বাসা,
কিসের আশায়?
যখন ধরলো ভাঙন পেলি নে তুই পারে যাবার ভেলা।
এই তো বিধির খেলা রে ভাই এই তো বিধির খেলা॥
কাজী নুজরুল ইসলাম
{নাটক: সিরাজ-উদ-দৌলা}

বিধির এই খেলা পাল্টানোর ক্ষমতা কারও নেয়। কারও সংসার ভেঙ্গে সে সংসার নিজের করে নিলেও সেই সংসারে কেউ সুখি হতে পারে না। পারে নি সমাপ্ত আর টিয়াও। যারা অন্যের সংসার ভাঙ্গে তারা শুধু ভাঙ্গতেই জানে গড়ার ক্ষমতা তাদের থাকে না।
আর অন্যের সাজানো সংসার যখন দুদিন পরই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় তখন সেই সব মানুষদের আর অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না । এটাই হয়তো প্রকৃতির নিয়ম।

প্রকৃতির এই চির নির্ধারিত নিয়মের কাছে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় সমাপ্ত আর টিয়ার সংসারও। কিছুদিন পর থেকেই নানা ঝামেলায় অবশেষে বিচ্ছেদের দিকে পা বাড়ায় তাদের সম্পর্কটা।
এতে অবশ্য দুজনেরই সায় ছিল। কারন সংসারটা বেশী দিনের না হলেও এর তিক্ততার পরিমাণ এতো বেশী ছিল যে কারও আর পেছন ফিরে দেখার ইচ্ছে হয় নি।

টিয়ার সাথে বিচ্ছেদের পরই সমাপ্ত জীবনটা উপলব্ধি করতে পারে। আসলে ও এতোদিন যেভাবে জীবন যাপন করছিল সেটাকে কোন সুস্থ জীবন যাপন বলে না। এতোদিন ও একটা মোহের মধ্যে ছিল যা এখন কেটে গেছে আর কঠিন বাস্তবতা টাও চোখের সামনে এসে হানা দিচ্ছে।

দিন শেষে সমাপ্ত উপলব্ধি করে ও অনেক বেশী একা হয়ে পড়েছে। আর এগুলো তার নিজের ভুলেই হয়েছে। সমাপ্তর বাবা মাও সমাপ্তর পাশে নেই।
আনন্দিকে ডিভোর্স দেওয়ার সময় ওর বাবা মা ওকে অনেকভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু তখন মোহের মধ্যে থাকায় ও কারও কোন কথা শোনে নি। তাই তারা সিধান্ত নিয়েছিলেন এমন ছেলের সাথে থাকার চেয়ে না থাকা ভাল।

সেই সময়েই সাহিলের শহরের বাইরে পোস্টিং হয়। ফলে সবাই চলে যায় ও সাথে। আর সেই বিশাল বড় বাড়িটাতে একা রয়ে যায় সমাপ্ত। এতোদিন ওর একা লাগে নি তবে আজ টিয়ার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার পর থেকে ওর প্রচন্ড একা লাগছে। বিসন্নতা আর একাকীত্ব যেন ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে এই বিশাল বাড়িটাতে।

টিয়ার সাথে সব সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটিয়ে সমাপ্ত প্রথমেই যায় ওর বাবা মার কাছে। ক্ষমা চায় নিজের করা ভুলের জন্য। মনোয়ারা বেগম আর আনিসুর হক আর দুরে থাকতে পারে নি। সন্তান যতো বড় অপরাধ করুক না কেন বাবা মা তাকে দুরে রাখতে পারে না একসময় ঠিক ক্ষমা করে দিয়ে কাছে টেনে নেয়। মনোয়ারা বেগম আর আনিসুর হক ফিরে আসে ছেলের সাথে। এবার আরও একজনের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বাকি সমাপ্তর। তবে জানে না সে আদৌ তাকে কোনদিন ক্ষমা করবে কি না।

সমাপ্ত আনন্দিকে খুজে বের করে ওর সাথে দেখা করতে যায়। কিন্তু আনন্দি সমাপ্তর সাথে কোন কথা বলে না। বেশ কিছুদিন সমাপ্ত অনেক চেষ্টা করে আনন্দির সাথে একবার কথা বলার কিন্তু তার কোন সুযোগ আনন্দি সমাপ্তকে দেয় না।

আনন্দি নিজের অতীতে আর ফিরে যেতে চায় না। জীবনে একবার যে ভুল করেছিল তার জন্য এখনও ভুগতে হচ্ছে ওকে। আর দ্বিতীয় বার আবেগের বসে ওই ভুলটা করতে চায় না আনন্দি। কারন এবারও যদি আগের বারের মতো ধোকা দেয় তাহলে আর নিজেকে সামলে নিয়ে বেঁচে থাকাটা হবে না আনন্দির।

আর কোন উপায় না পেয়ে সমাপ্ত আবারও আনুসমির কার্সটেডির জন্য কোর্টে কেস করে। কারন সব কিছু হারিয়ে সমাপ্ত প্রচন্ড একা হয়ে গেছে আর ওর এই একা জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অন্ততঃ একটা অবলম্বন দরকার। অন্যদিকে আনন্দি আনুসমিকে নিয়ে অনেক দুরে চলে যাওয়ার প্লান করে যাতে সমাপ্ত ওদের আর কোনদিনও খুজে না পায়। তাই একটা বিদেশী কম্পানিতে আনন্দি চাকরির জন্য আবেদন করে। চাকরিটা হয়ে গেলে ও আনুসমিকে নিয়ে পাড়ি দেবে বিদেশে।

আনুসমির কার্সটেডির কেসের নোটিশ আনন্দির কাছে আসে। আনন্দি যেন এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ও ভাবতেও পারে নি সমাপ্ত আবার নতুন করে এভাবে আইনের পথে যাবে আনুসমিকে ফিরে পাবার জন্য।
এবার আনন্দি চুপ করে বসে থাকে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাপ্তর টাকার কাছে হেরে যেতে হয় আনন্দিকে। প্রচুর টাকা খরচ করে সমাপ্ত আনুসমির কার্সটেডি নিজের ফরে করে নেয়। আনন্দির তখন আর কিছু করার থাকে না। কারন সমাপ্তর মতো কাড়ি কাড়ি টাকা ওর নেয়।

আনুসমি চলে যাওয়ার কয়েকদিনে পরে আনন্দির সেই চাকরির আবেদনের উত্তর আসে। ওরা আনন্দিকে সিলেক্ট করেছে। আনন্দি আর দ্বিতীয় বার ভাবে না। আনুসমি হীন এই শহরে বড্ড একা একা লাগে ওর। তাই বিদেশের মাটিতে পা দেয় আনন্দি।

তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ দশ বছর। এই দশ বছরে আনন্দি একবারও কারও সাথে যোগাযোগ করে নি আর না কারও যোগাযোগ করার কোন সুযোগ রেখেছিল। তারপর হঠাৎ করে আবার দেশে আসা। উদ্দেশ্য নিজের একমাত্র মেয়ের সাথে দেখা করা।

বর্তমান ~~~~~~~~~~~~

আনন্দি সবটা বলার পর নিজের চোখের পানিটা মুছে ফেলে আড়ালে। আজও ওর অতীত নিয়ে ভাবলে চোখের কোনে পানিরা জমা হয়। খুব একটা সুখকর তো ছিল না সেই অতীত।

আনন্দি নিজের চোখের পানি মুছে আনুসমির দিকে তাকাতেই দেখন আনুসমিরও দুই চোখ ভর্তি পানি। ওর টলমল চোখে আনন্দির দিকে তাকিয়ে আছে। আনন্দি ফিরে তাকাতেই ও ছুটে এসে আনন্দিকে জড়িয়ে ধরল। মায়ের বুকে মুখ গুজে কেদে দিল।

অনেকটা সময় ধরে আনুসমি কাঁদছে। কান্নার বেগে বারে বারে কেপে কেপে উঠছে আনুসমি। আর সাথে ফিস ফিস করে কিছু বলছে। সবটা বোঝা না গেলেও কিছুটা বোঝা যাচ্ছে।
আনুসমি অনবরত বলে চলেছে , আমাকে ক্ষমা করে দেও মা। আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি এতোগুলো দিন তোমাকে ভুল বুঝে। এতোগুলো দিন তোমাকে ভুল বুঝে তোমার সাথে যোগাযোগ না করে আমি অনেক বড় ভুল করেছি মা। আমাকে ক্ষমা করে দেও।
আরও কিছু হয়তো বলছে কিন্তু কান্নার বেগে তা আর বোঝা যাচ্ছে না।

আনন্দি আনুসমিকে কিছু বলল না শুধু বুকে মধ্যে আরও জোরে চেপে ধরল তার পিচ্চি পরীটাকে। আজ কতোগুলো দিন পর এভাবে ওকে কাছে পেয়েছে। বুকে মধ্যে যেন এক পশলা দক্ষিণা বাতাস বয়ে গিয়ে পুরো বুকটা ঠান্ডা করে দিল।

হঠাৎ টেবিলের উপর থাকা আনুসমির ফোনটা বেজে উঠল। আনুসমি ওর মাকে ছেড়ে চোখদুটো মুছে ফোনটা হাতে নিল। একটা অাননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। কলটা রিসিভ করে কথা বলছিল আনুসমি। আনন্দি একদৃষ্টিতে আনুসমির দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছু সময় পর আবারও চোখটা ভিজে উঠল আনুসমির। আনন্দি কিছুতেই বুঝতে পারছে না কি হয়েছে ফোনে ওপাশে।

ফোনটা রেখে আনুসমি আবারও আনন্দির বুকে ঝাপিয়ে পড়ল আর হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কান্নার মাঝে ও যেটুকু বলল আর আনন্দি যেটুকু বুঝল তা হল, সমাপ্ত অফিসে মিটিং চলাকালে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পরেছিল। পরে ওর কলিগরা ওকে হাসপাতালে আনে। ডাক্তার বলেছে একটা মাইনোর হার্ট এটাক করেছে সমাপ্ত।

আনন্দি আর দেরী করল না। তাড়াতাড়ি ড্রাইভারকে ফোন করে গাড়ি বের করতে বলল। তারপর আনুসমিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। বেশ রাত হয়ে গেছে বাইরে। এতোক্ষন গল্পের মধ্যে বুঝতেই পারে নি ওরা।

হাসপাতালে পৌছে আন্দিরা দেখন সমাপ্তকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। ওর খুব বেশী কিছু হয় নি তবে রেস্টে থাকতে বলেছে ডাক্তার। আর কোন টেনশান থেকে ওর এই অবস্থা হয়েছে তাই সবসময় টেনশান ফ্রি থাকতে হবে না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু হতে পারে।

আনুসমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে সমাপ্তর কেবিনের দিকে গেল। তবে একা যায় নি। সাথে করে জোর করে আনন্দিকেও নিয়ে যায়। আনন্দির সমাপ্তর মুখোমুখি হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না কিন্তু হাসপাতাল দেখে কোন প্রকার রিয়াক্ট করল না ও।

কেবিনে ঢুকে দেখন সমাপ্ত চিৎ হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। দরজাটা খোলা শব্দে চোখ মেলে তাকালো সমাপ্ত। তবে আনুসমির পিছনে আনন্দিকে দেথে বেশ অবাক হয়েছে। ও ভাবে নি আনন্দি ওকে দেখতে হাসপাতালে আসবে।

আনুসমি কেবিনে ঢুকেই সমাপ্তর কাছে ছুটে যায় তারপর সমাপ্তকে জড়িয়ে ধরে। সমাপ্ত সস্তির নিশ্বাস ফেলে যাক আনন্দি এমন কিছু হয়তো বলে নি যাতে করে মেয়েটা ওর থেকে দুরে চলে যাবে। এই চিন্তাতেই তো আজ ওর এই অবস্থা। সব কিছু জানার পর যদি আনুসমি ওকে ভুল বোঝে, আর থাকতে না চায় ওর সাথে তাহলে কি নিয়ে বাচত ও। তবে আনুসমির এভাবে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরাতে বুঝল আর যাই হোক আনুসমি ওকে ছেড়ে চলে যাবে না।

সমাপ্ত কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে আনন্দির দিকে তাকাল। আনন্দি বেড থেকে কিছুটা দুরে দাড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষন অসস্থিতে আছে। হয়তো আসতে চায় নি আনুসমি জোর করে ধরে এনেছে।
আনুসমি তখনও কিছু বলে চলেছে কিন্তু সমাপ্ত তার একটাও শোনে নি। সমাপ্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এতো ব্যস্ত হতে হবে না মা। আমি ঠিক আছি তো।

– হ্যা কেমন ঠিক আছো তা তো দেখতে পাচ্ছি। কতো করে বলেছি এতো কাজের প্রেসার নিবে না। কে শোনে কার কথা, আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেত তাহলে আমার কি হতো বলতো।

সমাপ্ত মৃদু হেসে আনুসমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আর করব না মা। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও।

– আচ্ছা করলাম। তা তোমার কি কি ঔষধ খেতে হবে দেখি।

আনুসমি বেডের পাশে থাকা ছোট্ট টেবিলটাতে ঔষধ খুজল কিন্তু কোন ঔষধ পেল না।
তারপর চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, একি বাবা কোন ঔষধ তো নেই।

– ওহ্ হ্যা দোকান থেকে আনতে হবে। আনা হয় নি এখনো।

আনুসমি বেশ রাগী রাগী দৃষ্টিতে তাকাল তারপর বলল, ঠিক আছে আমি দেখছি। তারপর বেড়িয়ে গেল কেবিন থেকে। উদ্দেশ্য নার্সের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করা।

আনন্দি তখন থেকে একই জায়গায় দাড়িয়ে আছে যেন ওর পাটা ওই যায়গাটাতে জমে গেছে। এতোটা সময় ধরে একটুও নড়ে নি। আনুসমি বেড়িয়ে যেতে সমাপ্ত আবারও আনন্দির দিকে তাকাল। দীর্ঘ দশ বছর পর দেখল আনন্দিকে। এতোগুলো দিন ওকে দেখার জন্য ছটপট করে গেছে। আর কোনদিনও ভাবে নি আনন্দিকে দেখতে পাবে। আজ সেই তার চোখের সামনে দাড়িয়ে আছে।

সমাপ্ত মৃদুস্বরে ডাকল আনন্দিকে, আনন্দি

আনন্দি হুম বলে ঘুরে দাড়াল। সমাপ্ত তখনও আনন্দির দিকে তাকিয়ে আছে। আনন্দিকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে সমাপ্তর চোখদুটি। আনন্দির মধ্যে অনেক পরির্বতন এসেছে তবে সেগুলো শারীরিক না। শারীরিক পরির্বতন বলতে শুধু একটু মুটিয়ে গেছে আর ঘন কাচা চুলের মধ্যে বেশ কটা পাকা চুল উকি দিচ্ছে এই যা।

তবে পরির্বতন যা হয়েছে তা মনের দিক থেকে। অাগে সমাপ্তকে দেখলে ওর সেই উচ্ছলতাটা আর নেই, চোখের মধ্যে হাসির ঝিলিকটা নেয়। অবশ্য তখন থেকে আনন্দি মুখটা নিচের দিকে নামিয়ে রেখেছে তাই চোখগুলো ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। এটাও একটা পরিবর্তন আগে আনন্দি সমাপ্তর চোখের দিকে তাকাতে কথা বলত আর এখন মুখ তুলে একবার দেখছেও না।
আচ্ছা সমাপ্ত যেমন এতোদিন পর আনন্দিকে দেখে ওকে এভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আনন্দি কেন তেমনটা করছে না। ওর প্রতি সব ভালবাসা কি আনন্দি একেবারে মেরে ফেলেছে এই দশ বছরে।

সমাপ্ত আনন্দির দিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল তারপর বলল, বস।
আনন্দি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। বেডের পাশে রাখা টুলটায় আলতো করে বসল আনন্দি।

সমাপ্ত বলল, কেমন আছ আনন্দি?

চলবে,,,

জাকিয়া সুলতানা

বি দ্রঃ ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here