বৃষ্টিপ্রিয়া পর্ব ৩

"এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে। আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার। আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন "

#বৃষ্টিপ্রিয়া
পর্ব- ০৩।
লেখা- জাহান লিমু।

যখন আমি স্বপ্ন আর বাস্তবতার চরম অবস্থায় উপনীত হয়েছিলাম,তখন আমার জীবনে দারুণ মিরাক্কেল ঘটেছিল।
সবার সেটা মিরাক্কেল নাও মনে হতে পারে। তবে আমি আবার অল্পতেই বেশ তৃপ্ত থাকতে শিখে গিয়েছিলাম সেই ছোট্ট থেকেই। কোনকিছু নিয়ে প্রশ্ন করতাম না। যতটুকু পেতাম,ভাবতাম সেটাই আমার প্রাপ্য। জীবনে খুব বেশি আক্ষেপ না রাখাই ভালো। তাহলে আফসোসও কম হয়।
এইচএসসি পাস করার সাথে সাথে সবাই যেখানে ভর্তিযুদ্ধে লেগে পড়ে,আমি সেখানে অন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম।
অবশ্য সেখানে আমার মায়ের বেশ আপত্তি ছিলো। কারন পড়াশোনা শেষ না করে কোন চাকুরিতে প্রবেশ উনি মানতে চাইছিলেন না। কিন্তু আমার আবার ঐ ডিপার্টমেন্টের চাকুরির প্রতি বরাবরই বেশি ঝোঁক ছিলো। আমি লম্বাও ছিলাম প্রায় ছয় ফিট প্লাস। তাই এটা একটা বাড়তি সুবিধা ছিলো। অবশ্য সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট এর জন্য এসব ম্যাটার করে না। সেখানে মেধাটাই আসল। আর সৌভাগ্যক্রমে সারাদেশে সাতজনের মধ্যে আমি টিকে গেলাম। যেখানে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলো প্রায় হাজারের বেশি। কিন্তু মা কে রাজি করানোটা যুদ্ধসম ছিলো। তবে সে যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছিলাম বটে।

যখন চাকুরীর ট্রেনিং এ চলে যায়, তখন বেশ ভয় লাগতো। কারন প্রীতিকে ওর এক ফুপাতো ভাই নাকি ছোট থেকেই পছন্দ করতো। কিন্তু প্রীতি কেন জানি তাকে সহ্য করতে পারতনা। তবে সে ছেলে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল প্রীতির মা বাবাকে পটানোর। অবশ্য আমার জন্য প্লাস পয়েন্ট এটা ছিলো যে,প্রীতির মা বাবা সন্তানের মতামতের অনেক গুরুত্ব দিতেন। এছাড়া পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে প্রীতির বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা এক পার্সেন্টও ছিলো না। সেটা ভেবে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকলাম৷ তবুও মনে সবসময় একটা কুঁ ডেকেই যেতো। অনেকসময় ট্রেনিং এ মনোযোগ হারিয়ে ফেলতাম। সেজন্য অবশ্য বাড়তি শাস্তি ভোগ করতে হতো।
আমার সবচেয়ে বেশি ভয়টা এ কারনে ছিলো,কারন আমি তখনো প্রীতিকে কিছু জানায়নি। আমি শুধু এটা অনুমান করে নিয়েছিলাম,হয়তো প্রীতিও আমাকে একটু একটু পছন্দ করে। কিন্তু এভাবে শুধু নিজের ভাবনার উপর দাঁড়িয়ে কাউকে পাওয়ার আশা করাটা যে কতবড় বোকামি, সেটা আমি পরে বুঝতে পেরেছিলাম। সেটার খেসারত বেশ ভালোভাবেই দিতে হয়েছিল আমাকে। হয়তো অল্পের জন্য আমি আমার বৃষ্টিপ্রিয়াকে হারিয়ে ফেলছিলাম। সেটা ভাবতেই এখন গা শিউড়ে উঠে। ঐ মুহুর্তটার কথা ভাবতেও চায় না আর।

আমি চাকুরীতে যোগদানের পূর্বে মোট দুইবার প্রীতির সাথে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও একা নয়,সেরকম সুযোগ তখনো তৈরিই হয় নি। হয়তো সেটাই ভালো ছিলো।যদিও তখন বয়সটা নেহাত কমই ছিলো। মাঝে মাঝে ভাবতাম,সেটা আমার কম বয়সের আবেগ নয়তো?
কিন্তু যখন দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি তার জন্য অপেক্ষা করলাম,তখন বুঝতে পারলাম, না সেটা আমার আবেগ ছিলো না। আবেগের স্থায়িত্ব এতো দীর্ঘ হয় না। আর যদি সত্যিই আবেগ হতো,তবে এরমধ্যে আমার চোখে অন্য কাউকে ভালো লাগতো। কিন্তু আমি কেন জানি অন্য কোন মেয়েকে নিয়ে ভাববার মত রুচিবোধও করিনি। হ্যাঁ,আমার ভালোবাসার কোন নিশ্চয়তা ছিলো না। সেটা আমি নিজেই জানি। তবে কোথায় যেন একটা গভীর বিশ্বাস ছিলো। সেই বিশ্বাসের ভিত্তি ঠিক কি ছিলো তা আমার জানা নেই। হয়তো ট্রেনিং এ যাওয়ার আগে শেষবার যখন প্রীতির সাথে দেখা হয়েছিল, তখন সে বিষাদ নয়নে তাকিয়ে আমি কিছু একটা অনুভব করেছিলাম। হয়তো অনেক না বলা কথা সে চোখে লুকিয়ে ছিলো। তবে আমি ঠিকই সে কথা পড়ে নিয়েছিলাম। কারণ আমি পুরোপুরি বৃষ্টিপ্রিয়াতে নিমজ্জিত ছিলাম তখন। আমার মনের গহীনে ততদিনে সে নিজের কোটর তৈরি করে নিয়েছিলো। এরপর পাঁচটা বছর আমার ভীষণ কষ্টে গেছে। চাকুরী হওয়ার আগের কষ্টটা ছিলো একরকম,পরেরটা অন্যরকম। চাকুরী পেয়েই বিয়ে করার মত কোন সুযোগ ছিলো না। তাছাড়া তখন আমার বয়স মাত্র ঊনিশ। আইনতও বয়স হয়নি বিয়ের,মানসিকভাবেও নয়। সেটা আবেগে ভাসারই বয়স ছিলো। তবে আমরা দুই ভাইবোন ছোট বয়স থেকেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গিয়েছিলাম। আমার মা সবকিছু আমাদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতেন। যেন আমরা যেকোন পরিস্থিতিতে কোন ভুল না করি। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা মায়ের থেকেই শিখেছিলাম। যেখানে আটার-ঊনিশ বছরে ছেলেমেয়েরা অনেক ভুল করে বসে। কিন্তু আমাদের ছোট থেকেই সবার থেকে আলাদাভাবে বড় করা হয়েছে। ছোট থেকেই আমরা নিজেদের কাজ নিজেরা করতাম। মা যেহেতু চাকুরী করতো,তাই মা আমাদের টুকটাক কাজ সব শিখিয়েছিলেন। আমার বোন মায়া যে কাজগুলো পারে,আমিও সেসব পারি। মা কোন কাজ ভেদাভেদ করে শিখাননি। সেই সুবাদে আমিও বেশ ভালো রান্না করতে পারি। কখনো মা অসুস্থ থাকলে,আমরা দুই ভাইবোন মিলেই রান্না করে তারপর স্কুলে যেতাম। আমাদের কোন কাজের লোক ছিলো না। সবাই নিজের কাজ নিজে করতাম। ঘরমুছা থেকে শুরু করে ঘর ঝাড়ু দেয়া সব আমরা পালাক্রমে করতাম। একদিন আমি, একদিন বোন,মা, বাবা সবাই এভাবে করতাম। অনেকসময় অনেকে আমাদের বাসায় এসে আমাকে বা কখনো বাবাকে ঘরের কাজ করতে দেখলে ভ্রু কুঁচকে তাকাতো।
তবে সামনা সামনি কেউ কিছু বলার সাহস পেতো না অবশ্য। হয়তো আড়ালে নানান কথা বলতো। তাতে কি আসে যায়?
আমাদের পরিবারের বিষয়,একান্তই আমাদের নিজের। আমাদের যদি তাতে কোন সমস্যা না হয়,তাহলে অন্যের কথা শুনে কি লাভ?
অন্যরা কথা বলবে কেবল পেছন থেকে,কখনো সামনে এসে কাজ করে দিবেনা। কিংবা সাহায্য করতে আসবেনা। তাহলে তাদের কথায় বা ভয়ে আমরা কেন চুপসে যাবো?
আমরা কিভাবে চললে,থাকলে ভালো থাকবো,সেটা একান্তই আমাদের বিষয়। বাহিরের মানুষের কথায় কান দিয়ে,বা বাহিরের মানুষকে দেখাতে গিয়ে আমরা কোন কিছু করতাম না। আমরা তাই করতাম,যেটা করলে আমরা ভালো থাকবো,খুশি থাকবো। সবাইকে খুশি করার জন্য নিজের খুশি বিসর্জন দিতে পৃথিবীতে আসিনি। হ্যাঁ,সবাইকে খুশি করার অন্য ক্ষেত্র আছে। সেটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বাইরের দুইটা লোক কি বলবে,সেটা ভেবে আমরা আমাদের সিস্টেম কেন বদলাবো?
আমি নিজেও ভাবি,পরিবারের কাজগুলো কেন মা বা বোনদেরই করতে হবে? সবাই মিলে করলে কোন ক্ষতি তো নেই। একটা রুটিন করে নিলেই হয়। সবার সুবিধামত সবাই টুকটাক কাজ করবে। তাহলে আর কোনকিছুই বোঝা মনে হবে না।

ট্রেনিং শেষ করে যখন ছুটিতে আসলাম,তখন আমার জন্য কতবড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিলো,তা আমার ধারণারও বাইরে।
সেই ধাক্কা সামলাতে আমাকে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর দুইবছর ধরে যেটা মনে চেপে রেখেছিলাম,সেটা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। প্রথমে অবশ্য সোহাগ বেশ চমকে গিয়েছিলো। কারণ আমি যথেষ্ট চুপচাপ স্বভাবের ছেলে ছিলাম। তাই আমার কথা শুনে সে অমন রিয়েক্ট করেছিলো। সে তখন ময়মনসিংহ কৃষি ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে গেছে। মেডিকেলে পরীক্ষা দিয়েছিলো,আসেনি। আমি ভর্তি পরীক্ষা ছেড়ে চাকুরীতে যাওয়াতে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলো সোহাগ। কারণ তার কথা অনুযায়ী, এতো ভালো স্টুডেন্ট হওয়া স্বত্তেও কেন এই বয়সেই চাকুরীর পেছনে ছুটছি?
চাকুরী করার কোন তাগিদ ছিলো না আমার। তাই সোহাগ কিছু ভেবে পাচ্ছিলো না। আমাকে অনেক বুঝিয়েছিলো যে,পড়াশোনা শেষ করে চাকুরী করলে আমি আরো বেটার পজিশনে যেতে পারবো। হয়তো স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ যাওয়ার সুযোগও পেতে পারি। কিন্তু আমি তো তখন অন্য চিন্তায় নিমগ্ন। তাই যখন সোহাগকে প্রীতির কথা বলে দিলাম,তখন সোহাগ বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়েছিলো। শুধু একটা কথায় বলেছিলো,
” রূপক,এ কারণে তুই চাকুরীটা হাতছাড়া করতে চাস নি?”
আমি তখন কিছু বলিনি। চুপ করে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হয়তো আমার নীরবতাই সোহাগ ওর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলো।

প্রীতি তখন ইন্টার পরীক্ষা দিবে। তখন ওর ফুফাত ভাই বড় একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী পেয়ে যায়। আর প্রায় সাথে সাথেই ঘটা করে প্রীতিকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে চলে আসে। প্রীতির যখন দশবছর বয়স,তখন থেকে নাকি সে প্রীতিকে পছন্দ করে। এটা অবশ্য প্রীতিই আমাকে বলেছিলো।
প্রীতির সেদিন জানি কি হলো। যাকে দু’চোখে দেখতে পারতোনা,হুঁট করে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল। আর সেটা শুনে আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এটাই হয়তো স্বাভাবিক, আমিই হয়তো ভুল ছিলাম। এভাবে দূর থেকে ভালোবেসে কাউকে পাওয়ার আশা করা,সে যে মরীচিকা। প্রীতিও তো কখনো মুখ ফুটে আমাকে কিছু বলেনি,বা তেমন কোন ইশারা করেনি। আমিই হয়তো বেশি বুঝে নিয়েছিলাম। যেটা আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যখন ট্রেনিং থেকে এসে শুনতে পেলাম,প্রীতির এংগেজমেন্ট, আমি স্তব্দ হয়ে গিয়েছিলাম। সোহাগের মুখে সবটা শুনে,তখন কোন কথা বলতে পারিনি। কেমন পাথরের মত শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো আমার পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো ক্ষণিকের জন্য। সব কিছু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলো। কয়দিন আমি ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করিনি,কারো সাথে কথা বলিনি। যেটা মায়া বুঝতে পেরেছিলো। কারণ মায়া জানতো,আমি প্রীতিকে ভালোবাসি। সে আমাকে তখন বলেছিলো,

” ভালোবাসলে সাহস করে তা প্রকাশ করতে হয়। তুমি তার জন্য গোপনে ত্যাগ করলে বিশেষ কোন লাভ নেই। হয়তো সে জানবেই না,তুমি তার জন্য কি করেছো। আড়াল থেকে ভালোবেসে কোন লাভ নেই। সামনা-সামনি বলে দেয়াই ভালো। তারপর যা হয় হবে। নেগেটিভ হলেও সেটা মানতে হবে। কারণ বাস্তবতা তো আমাদের মানতেই হবে। আর সমবয়সী সম্পর্কে তো এমনিতেই সবাই নাক উঁচু করে রাখে। তবুও চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? মনের ভেতর ভালোবাসার পাহাড় গড়ে তোলার চেয়ে,আগ্নেয়গিরির লাভার মত ভালোবাসা উগড়ে দেয়াই ভালো। তাতে অন্তত নিজেও স্বস্তি পাবে, আর যাকে ভালোবাসো সেও জানবে। তারপর ভাগ্যে যা আছে সেটা মেনেই জীবন পথে চলতে হবে। কারো জন্য জীবন থেমে থাকেনা। ভালোবাসাও বন্দি হয়ে থাকেনা। যদি থাকতো, তবে অনেক মানুষ ভালোবাসাহীন হয়ে মারা যেতে তীলে তীলে। ভালোবাসাটা অনেকটা পাথরকুচি গাছের মত। পাথরকুচি গাছ যেখানেই পাতা পড়ে, সেখানেই নতুন গাছ গজায়। ভালোবাসাও তেমন। ভালোবাসা পেলেই,ভালোবাসা নতুন করে গজিয়ে উঠে। হয়তো কিছুদিন থেমে থাকে,কিন্তু সেটা ক্ষণিকের জন্য। মানুষ ভালোবাসা না পেলে মরে না,কিন্তু ভালোবাসাহীন বেঁচে থাকাটাকেও বেঁচে থাকা বলে না।
মানুষ মাত্রই ভালোবাসা চায়। কেউ সেটা প্রকাশ করে,কেউ করে না।”

#চলবে…
#জাহান_লিমু।

"এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে। আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার। আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন "

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments

মোহাম্মদ মোহাইমিনুল ইসলাম আল আমিন on তোমাকে ঠিক চেয়ে নিবো পর্ব ৪
error: Alert: Content is protected !!