অনিন্দিতা পর্ব -০৯

#অনিন্দিতা
#৯ম_পর্ব
#স্নিগ্ধতা_প্রিয়তা

–“রান্না কি খুব বেশি খারাপ হয়েছে?”

আফিয়ার কথা শুনে ওর স্বামী আবরার কিছুটা ইতস্তত করে বলল,

–“আরে না, আমি তা বলিনি। আমাকে কখনো কারো রান্নার বদ*নাম করতে শুনেছো? কেউ একজন তার সর্বোচ্চটা দিয়েই রান্না করে, তাই তা যেমনি হোক না কেন খারাপতো আর বলা যাবে না। রান্না ঠিকঠাক আছে। মায়ের রান্নার মতো অতোটা স্বাদ না হলেও খারাপ বলা যাবে না। আমিতো লুচির সাইজগুলো দেখে জিজ্ঞেস করলাম৷ মায়ের হাতের লুচিগুলো পুরো গোলগাল হয়, এটা একটু এবড়োথেবড়ো তাই জিজ্ঞেস করলাম আর কি!”

আড়াল থেকে কথাগুলো শুনে অনি একটু স্বস্তিবোধ করলো৷ যাই-হোক রান্নাটা তাহলে এতটাও বাজে হয়নি!

তারপর আফিয়া একটু হেসে আবরারকে বলল,

–“আসলে আজকে সব রান্না ভাবি করেছে। মা কিছুই করে নি। ”

–“ওহ আচ্ছা।”

বলে আবরার খাওয়া শেষ করলো৷ তারপর অনিরাও খেয়ে নিলো৷ সবাই অনির রান্নার প্রশংসা করতে লাগলো। যদিও অনির রান্নাটা ততটাও আহামরি হয়নি!

তাজ অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো। অনি ঘরের সব ঠিকঠাক করছিলো। এমন সময় অনির চোখে পড়ে তাজের একটা ডায়েরি। অনি ডায়েরিটা হাতে নিতেই তাজের সেদিকে চোখ যায়৷ ও তাড়াতাড়ি অনির হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় ছিনিয়ে নেয়। তারপর আমতা-আমতা করে বলে,

–“পরের জিনিসে হাত দিতে হয় না। জানো না বুঝি!”

–“তুমি আবার আমার পর হলে কবে থেকে? আগেতো ভালো বন্ধু ছিলে, আর এখনতো….”

এটুকু বলেই থেমে যায় অনি। তারপর তাজের হাত থেকে ডায়েরিটা নিতে গেলে তাজ হাত সরিয়ে অনিকে বলে,

–“এখন কি?”

–“এত ঢং করছো কেন! তুমি মনে হয় জানো না এখন কি?”

–“তবুও তোমার মুখ থেকে একটু শুনতে মন চাচ্ছে। বলো না গো, এখন কি?”

–“কিছু না। যাও! আমি তোমার কেউ না৷ তুমি তোমার অন্তরার কাছে যাও! বেচারী তোমার জন্য অফিসে অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই ওই ডায়েরিতে তোমার এক্সদের কথা লেখা আছে। তাইতো ভয় পাচ্ছো! যদি আমি তাদের সম্পর্কে জেনে যাই।”

বলেই একরাশ অভিমান নিয়ে বিছানার চাদর ঠিক করতে লাগলো অনি। তাজ ওর পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই অনি ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

–“যাও, যাও, আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না! আমাকে তুমি এখনো আপন ভাবতে পারো নি! আমি কেন শুধু-শুধু আপন ভেবে কষ্ট পাবো!”

–“আমার বউটা বুঝি কষ্ট পাচ্ছে? তা কেন কষ্ট পাচ্ছে? কারণটা কি জানতে পারি? ডায়েরি পড়তে না পারার জন্য কষ্ট পাচ্ছে? নাকি আমার জীবনে অন্যকেউ আছে কিনা তা ভেবে কষ্ট পাচ্ছে?”

–“কিছুর জন্যই না। তুমি যাও৷ অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে!”

তাজ তখন ডায়েরিটা অনির হাতে দিয়ে বলল,

–“এই নাও আমার রাগিনী! এটা এখন তোমার। তবুও আমার উপরে রাগ করে থেকো না। তবে আমার সামনে পড়বে না। আমি চলে গেলে তখন পড়বে৷ আর ডায়েরি পড়ার সময় একদম হাসবে না। আমার সব সিক্রেট এখানে আছে। আজ থেকে আমার সবকিছু তোমার জন্য ওপেন সিক্রেট! এবার খুশি?”

অনি ডায়েরি হাতে পেয়ে সত্যিই ভীষণ খুশি। তাজের সব সিক্রেটগুলো ও আজ জানতে পারবে। নিশ্চয়ই ওকে নিয়েই কিছু লেখা আছে! নইলে এইভাবে কেড়ে নিয়ে আবার ওর হাতে দিতো না! কিন্তু তাজকে তা বুঝতে না দিয়ে ডায়েরিটা বিছানায় নামিয়ে রেখে বলল,

–“আচ্ছা ঠিক আছে। রাগ করিনি আমি৷ তুমি ভুল বুঝছো! ”

–“আরে সমস্যা নেই। আমার উপরে রাগ করার অধিকার তোমার আছে৷ তবে ডায়েরি পড়ে আর যেন রাগ না থাকে! আমি এবার আসি!”

বলেই মুখে একটা হাসি নিয়ে তাজ রুম থেকে বের হয়ে গেলো। অনি রুম থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তাজ বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। এটা দেখেই একবুক আশা নিয়ে অনি বিছানায় শুয়ে পড়লো৷ তারপর কিছুটা ভয় আর শঙ্কা নিয়েই ডায়েরিটা হাতে নিলো। ডায়েরিটা খুলবে নাকি খুলবে না এসব ভাবছিলো ঠিক তখনি আফিয়া রুমে প্রবেশ করে বলল,

–“আমারতো ভাবতেই অবাক লাগছে যে, তুমি আমার ভাবি! আমিতো কল্পনাও করতে পারিনি ভাইয়া তোমাকে বিয়ে করতে পারবে! তোমার বিয়ে শুনে আমার খুব খারাপ লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো যে, আমার ভাইটা বুঝি এইবার দেবদাস হয়ে যাবে! কিন্তু আল্লাহ যে, তোমাকেই আমার ভাইয়ার জন্য বরাদ্দ করে রেখেছিলেন তা ভাবতেই পারিনি!”

একথা বলতে-বলতে আফিয়া অনিকে জড়িয়ে ধরে। অনি ওর হাসিমুখ দেখে হেসে ফেলে। কালকের রেশ আজকেও কাটেনি৷ ওর খুশির পরিমাণটা বুঝতে পেরে অনিও নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে। এমন একটা পরিবার পেয়ে ও ভীষণ খুশি! তারপর দুজনে আবার গল্প শুরু করে দেয়।

তাজ অফিসে যেতেই সবাই ওকে ঘিরে ধরে। আর সবাই কেমন-কেমন করে যেন ওর দিকে তাকাচ্ছে। ও কিছু বুঝতে পারে না। ও নিজের ডেস্কে বসতে যাবে তখন সবাই একসাথে বলে উঠে,

–“কংগ্রাচুলেশনস!”

ও কিছু বুঝে উঠার আগেই তানভীর বলে উঠল,

–” কি মিস্টার তাজ! আমাদের দাওয়াত দেওয়ার ভয়ে এভাবে বিয়ে করে ফেললে! তবে সে যেভাবেই বিয়ে করো না কেন আমাদের জন্যতো পার্টির ব্যবস্থা করতেই হবে। আমরা কত আশা করেছিলাম তোমার বিয়ে নিয়ে। আর তুমি আমাদের সে আশায় পানি ঢেলে দিলে ভাই! ভাবিকে দেখার জন্যতো আর তর সইছে না! ”

তাজ তখন বুঝতে পারলো যে ওর বিয়ের ব্যাপারে সবাই জেনে গেছে৷ জেনে যাওয়ারই কথা। কাল তানভীরের বউয়ের সাথেইতো তাজদের দেখা হয়েছিলো। আর উনিই তানভীরকে বলেছে, আর তানভীর পুরো অফিসের লোককে৷ তাজ কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,

–“আসলে বিয়েটা হুট করেই হয়ে গেছে৷ তাই কাউকে জানাতে পারিনি৷ সমস্যা নেই, আপনাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে ট্রিট থাকবে৷ একটু সময় লাগবে….”

তখন পাশ থেকে আরেকজন বলল,

–“শুধু ট্রিট দিলে হবে। ভাবিকে দেখতে হবে না। আপাতত ভাবির ছবি দেখালেও চলবে৷ আমাদের গ্রুপে ভাবির একটা ছবি দিয়ে দাও, আমরা সবাই দেখি। ”

এইবার তাজ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে৷ ওর মা ওকে বারবার বারণ করেছে অনির কোনো ছবি যেন কাউকে না দেয়৷ আগে অনি যা করেছে, করেছে! এখন যেন ওর ছবি আর কাউকে না দেখানো হয়! অনিও কাল বোরখা পড়েছিলো! ও কি করবে বুঝতে পারে না৷ তারপর একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,

–“আচ্ছা ছবি দিতে হবে না৷ আপনারা সরাসরিই দেখবেন৷ আমি বাসায় কথা বলে আপনাদের জানাবো!”

একথা শুনে কেউ আর জোর করে না। সবাই নিজেদের কাজে লেগে পড়ে৷ অন্তরা তাজের পাশের ডেস্কেই কাজ করে৷ সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে অন্তরা মনটা কিছুটা খারাপ করে বলে,

–“কাল রাতে প্রথমে কল ভাবি রিসিভ করেছিলো, তাইনা?”

অন্তরার কথা শুনে তাজ কিছুটা অবাক হয়ে যায়৷ তারপর বলে,

–“তুমি জানলে কি করে? অনি কথা বলেছিলো তোমার সাথে?”

অন্তরা এবার একটা হাসি দিয়ে বলে,

–“আমি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে বুঝতে পারবো না তাই কখনো হয় নাকি! উনি কোনো কথা বলেনি৷ তবে কল কেটে দেওয়ায় আমার সন্দেহ হচ্ছিলো। আর আপনিও একটু অস্বস্তি নিয়ে কথা বলছিলেন৷ আর আজ যখন অফিসে এসে জানতে পারলাম যে, আপনি বিয়ে করেছেন তখন আমার সন্দেহটা সত্যি হলো। তারমানে সত্যিই কাল রাতে ভাবি কল রিসিভ করেছিলো?”

তাজ মাথাটা নিচু করে বলল,

–“তুমিতো সবটা বুঝেই ফেলেছো! তোমার মতো ট্যালেন্টেড মেয়ের থেকে আমি কি কিছু লুকাতে পারি!”

–“তা ভাবি কিছু মনে করে নিতো? আমি অতোরাতে ফোন করেছিলাম! আসলে আমি জানতাম না আপনার বিয়ের ব্যাপারটা। তাহলে কখনো অতোরাতে ফোন করতাম না! আপনি চাইলে আমি ভাবির সাথে কথা বলতে পারি!”

–“আরে না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। ওকে বলেছি আমি। ”

–“তারপরেও, মেয়েদের মনে একবার সন্দেহের বীজ বপিত হলে তা যে দিনে-দিনে বাড়তে থাকে! আর সেটা ডালপালা বিস্তার করলে যে, সেই সম্পর্ক ভাঙতে শুরু করে! আমি চাইনা আমাকে নিয়ে ভাবির মনে কোনো সন্দেহ থাকুক!”

অন্তরার এমন উপস্থিত বুদ্ধি দেখে তাজের মাথায় একটা আইডিয়া আসে। ও যেহেতু একটা মেয়ে, তাই মেয়েদের সম্পর্কে ও ভালো জানে। তাই অনিকে নিজের করে পাওয়ার জন্য ও অন্তরার থেকে সাহায্য নেবে! যেই ভাবা সেই কাজ! ও অন্তরার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

–“আমাকে একটা হেল্প করবে অন্তরা?”

–“জ্বি ভাইয়া বলেন। আমি পারলে অবশ্যই হেল্প করবো। আপনি আমাকে এতো হেল্প করেন, আর আমি আপনার হেল্প করবো না তাই কখনো হয় নাকি! বলে ফেলুন।”

–“আমি চাইনা এই ব্যাপারটা অন্যকেউ জানুক। শুধু তোমাকেই বলতে চাই।”

–“আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন।”

–“আচ্ছা এখানে না। লাঞ্চ আওয়ারে ক্যান্টিনে ফ্রি থাকলে তখন বলব।”

–“আচ্ছা ঠিক আছে। ”

এদিকে অনির আফিয়ার সাথে গল্প করতে বিরক্ত লাগছে কিছুটা। ও তাজের ডায়েরিট পড়বে! অথচ সেই তখন থেকে আফিয়া গল্প শুরু করেছে থামার নাম নেই৷ এমন সময় অহির ফোন পেয়ে চমকে উঠে অনি৷ তারপর আফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,

–“অহি কল করেছে।”

–“আচ্ছা, তুমি কথা বলো। আমি আবার পরে আসবনে।”

বলেই আফিয়া রুম থেকে বের হয়ে যায়। অনি তাড়াতাড়ি অহির ফোন রিসিভ করে। অহি ওপাশ থেকে বলে উঠে,

–“কি ব্যাপার আপু! কল রিসিভ করতে এতক্ষণ লাগে! কি করছিলে এতক্ষণ? ”

–“বিয়ে হোক! শ্বশুরবাড়ি যা, তখন বুঝবি কি কাজ থাকে!”

–“আচ্ছা হয়েছে, তোমার এইসব জ্ঞান নেওয়ার জন্য ফোন করিনি৷ তুমিতো বিয়ে হতে না হতেই আমাদের ভুলে গেছো! আমরাতো আর তোমায় ভুলতে পারিনি!”

–“বাবা কেমন আছে? ভালই আছেতো?”

–“হুম, ভালই আছে। বাবা বাজারে গেছে। আজ থেকে আমাকে রান্না করতে হবে! বড়মা অবশ্য ওখানে খেতে বলছিলো! কিন্তু এভাবে আর কয়দিন! তাই বাবাকে বললাম বাজার করে আনতে! ভালো করিনি?”

–“হ্যাঁ ভালো করেছো! তবে রান্না-বান্না কিছু কি শিখেছো? নাকি শুধু বাজার-ই করতে বলেছো! শেষে দেখা যাবে বাবাকে দিয়েই রান্না করাচ্ছিস! তোকে আমি চিনি না!”

–“আরে না, চাচির কাছ থেকে ডিম রান্নাটা শিখেছি, তাই বাবাকে ডিম আনতে বলেছি। আর আমার আর বাবারতো ডিম রান্না প্রিয়! তুই থাকলে ঝামেলা হতো!”

–“হ্যাঁ, তোমরাতো এখন ঝামেলামুক্ত!”

ইমতিয়াজ আর পিহুর কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায় অনি। যতই ইমতিয়াজকে ভুলে থাকতে চায়, ততই আরো বেশি মনে পড়ে। কেউ পাশে থাকলে ততটা মনে পড়ে না৷ বিশেষ করে তাজ পাশে থাকলে ইমতিয়াজ এর কথা একদম ভুলে যায় অনি৷ একথা ভাবতেই ওর তাজের ডায়েরিটার কথা মনে পড়ে যায়।

–“জানিস আপু, পিহু আপু আর ইমতিয়াজ ভাইয়ার মধ্যে না ঝামেলা চলছে!”

ইমতিয়াজ এর নাম শুনতেই অনির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠে। ও পিহুর সাথে সুখে নেই? ভাবতেই একটা অজানা কষ্ট মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। ও আস্তে করে বলে,

–“কি হয়েছে?”

–“আমি আর ইমা সকালের দিকে দেখলাম যে পিহু আপু রেগে রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে! একটু পরে ইমতিয়াজ ভাইয়াও অফিসে চলে গেলো! তাদের হাবভাব দেখে বুঝলাম যে, দুজনের মধ্যে কোনো ঝামেলা চলছে! আর ঝামেলা হবে নাই বা কেন! ওই পিহু আপুর কম ছেলের সাথে রিলেশন ছিলো! ইমতিয়াজ ভাইয়াতো রূপ দেখেই গলে গেছে! এবার বুঝবে মজা!”

–“কারো দুঃসময়ে মজা নিতে হয়না অহি! বাদ দে ওসব৷ দোয়া কর যেন, ওদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়। ”

–“তোমাকে এসব বলাই ভুল হয়েছে! তুমিতো দয়াবতী! আমি এটা কি করে ভুলে গিয়েছিলাম! তুমি বসে-বসে দোয়া করো! আমিতো বদ-দোয়াই করবো! হুহ! দুঃসময় না ছাই!”

বলেই রাগে গজগজ করতে-করতে কল কেটে দেয় অহি। অনি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাজের ডায়েরিটা হাতে নেয়৷ অবশেষে ও তাজের সব সিক্রেট জানতে পারবে!

চলবে…?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here