অনুভূতি,পর্ব-২০+২১

অনুভূতি
পর্ব ২০
মিশু মনি
.
৩২.
দোলনায় বসে গল্প করে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিলো ওরা। মেঘালয় দোলনা থেকে নেমে মিশুকে কোলে তুলে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। বসার ঘরের পাশে করিডোরে এসে দাঁড়ালো।
করিডোরে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। চোখ ধাঁধানো অন্ধকার থেকে বের হয়ে এসে সূর্যের আলো খুবই ভালো লাগছে। মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো, “দাড়াও দুটো চেয়ার নিয়ে আসি।”
মেঘালয় রুমে ঢুকতেই মিশু “ওমাগো” বলে চেঁচিয়ে উঠলো। মেঘালয় ছুটে চলে এলো বারান্দায়। এসে দেখে মিশু পা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মেঘালয় উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে?”
মেঘালয় মিশুর সামনে বসে ওর হাত সরিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে অনেক খানি জায়গা কেটে গেছে। ও উত্তেজিত হয়ে চেঁচাল, “এটা কিভাবে হলো?”
বারান্দার এক কোণে একটা ভাঙা ফুলদানি রাখা। কাঁচের ফুলদানি, সেটা দিয়েই মিশুর পা কেটে গেছে। কেমন যেন কষ্ট হতে লাগলো মেঘালয়ের। বললো, “কেন যে ওসব জিনিস এখানে রাখে? সায়ানকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। যত্তোসব।”
মিশু বললো, “ওরা কি আর জানত আমি এই কোণায় গিয়ে দাঁড়াবো? বাড়িতে কেউ নেই,বারান্দায় কেউ আসার কথা না। রেগে যাচ্ছো কেন?”
– “তাহলে?”
– “আহা! দোষটা তো আমার ই। আমার উচিৎ ছিলো দেখে পা ফেলা।”
-“তোমার পা কেটে গেছে মিশু। এটা আমার জন্য কি পরিমাণ যন্ত্রণার বুঝতে পারছো তুমি? এরচেয়ে যদি আমার গলা কেটে যেতো তবুও এত কষ্ট হতো না।”
মিশু মেঘালয়ের মুখের উপর হাত দিয়ে বললো, “ছি এসব কথা কেন বলো?”
– “তুই আমার কি তোকে কিভাবে বোঝাবো পাগলী?”
মিশু খুব বেশি অবাক হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময় চেপে রেখে বললো, “এসব কখনো বলবা না।”
মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। ওকে সোফার উপর বসিয়ে দিয়ে সায়ানকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করে নিলো ফাস্ট এইড বক্স আছে কিনা। সায়ান জানালো ওর ঘরের প্রথম ড্রয়ারে রাখা আছে। মেঘালয় ফোন রেখে মিশুর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো রক্ত পড়ছে মেঝেতে। ও দ্রুত ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এসে মিশুর পায়ের কাছে বসে খুব যত্নে ওর ক্ষতটা পরিষ্কার করে দিলো। সুন্দর ভাবে মুছে দিয়ে পা তুলে নিয়ে কাটা জায়গার উপর আলতো করে চুমু দিলো। মিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। মেঘালয় বললো, “এবার ঠিক হয়ে যাবে।”
তারপর ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো। মিশু মেঘালয়কে যত দেখছে তত অবাক হয়ে যাচ্ছে। ওর ভালোবাসার ধরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে। মেঘালয় মিশুর পাশে এসে বসলো। দুহাতে মিশুর মুখটা ধরে বললো, “আমার জন্য এই অবস্থা হয়েছে। বিয়ের পর প্রত্যেকটা সেকেন্ড তোমার খেয়াল রাখতে চেয়েছিলাম। পারলাম না, আমি থাকতেও তোমার পা কেটে গেলো। আমাকে মাফ করে দাও, আর কক্ষনো মুহুর্তের জন্যও তোমাকে একা ছাড়বো না। সরি মিশু, সরি।”
মিশুর চোখে পানি এসে গেলো। মেঘালয় এমন কেন! এভাবে ভালোবাসতে হয়? সুখে মরে যেতে ইচ্ছে করবে তো। যত সময় যাচ্ছে, মেঘালয়ের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে মিশুর। এরকম মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে! সত্যিই মিশু অনেক ভাগ্য করে ওকে পেয়েছে।
মেঘালয় মিশুকে বুকে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ওর ভেতরে চরম অস্থিরতা কাজ করছে। মিশু ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করেছে, আর এক বিন্দু পরিমাণ কষ্টকেও মিশুর কাছে ঘেষতে দেবেনা ও। মিশু মনে মনে ভাবল, একটা মজার ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে। এই ব্যাপারটা ভূলিয়ে দিতে হবে মেঘালয়কে। ও মুখ তুলে বললো, “আচ্ছা আমাকে কেমন লাগছে?”
মেঘালয় ওর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে বললো, “মাথা খারাপ হওয়ার মতো সুন্দর।”
– “ইস! আর বলতে হবেনা। আপনাকে আজ দারুণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে।”
– “তুমি কি বলতে চাচ্ছো আমি হ্যান্ডসাম নই?”
– “আহা! আপনি সবসময় ই হ্যান্ডসাম। আজকে আপনার ভাষায় বিপজ্জনক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে।”
মেঘালয় হেসে বললো, “তাই নাকি! বিপদ ঘটাচ্ছো না কেন?”
মিশু ভ্রু কুঁচকে বললো, “বিপদ ঘটাবো মানে!”
মেঘালয় দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বললো, “না কিছুনা।”
মিশু ওর গলার দিকে তাকিয়ে বললো, “শাস্ত্র পালন করতে হবে? সেটা আমি পারবো না আগেই বলেছি। আপনার গলায় কত্তগুলো আচড়ের দাগ। আর দাগ করে দিতে পারবো না আমি।”
মেঘালয় বললো, “সে আর বলোনা। আজকে মার্কেটে গিয়েছি, যে মেয়েটা আমাদের জিনিসপত্র দেখাচ্ছিলো সে বারবার হা করে আমার গলার দিকে তাকাচ্ছিলো। কি লজ্জার ব্যাপার। পরে একটা মাফলার কিনে নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শপিং করেছি।”
– “হা হা হা, এই গরমে মাফলার?”
– “হ্যা। পূর্ব আর আরাফ খুবই জ্বালাচ্ছিলো এগুলো নিয়ে। দাগগুলো দেখে বারবার বলছিলো আমি নাকি অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেছিলাম যার জন্য এই অবস্থা হয়েছে।”
মিশু হেসে বললো, “অন্যায়ভাবে কিনা জানিনা তবে সাংঘাতিক ভাবে। আমি কান্না করে ফেলেছিলাম।”
– “এই চোখের জলের দাম দিতেই তো বিয়েটা করলাম। তুমি কাঁদছিলে বলে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেজন্যই এত তাড়াতাড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম।নয়ত আরো কিছুদিন সময় দিতাম তোমাকে।”
মিশু বলল, “বিয়েটা করা উচিৎ কাজ হয়েছে। এত সুন্দর একটা ছেলেকে সারাক্ষণ সামনে বসিয়ে রেখে দেখতে পাচ্ছি,এরচেয়ে সুখকর ব্যাপার আর কি আছে? কাউকে দেখার মাঝেও যে এত সুখ থাকতে পারে আমার জানা ছিলোনা।”
মেঘালয় হাসলো। ওর নিজের ও মনেহচ্ছে বিয়েটা করে ভালো হয়েছে। মিশুকে দূরে রাখা অনেক কষ্টকর একটা ব্যাপার। মিষ্টি খুকিটার গাল টেনে দিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। পাগলী একটা।
মিশু মেঘালয়ের কোলে মাথা রেখে সোফার উপর শুয়ে রইলো। মেঘালয় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সারারাত ট্রেনে ঘুম হয়নি। ঘুম এসে যাচ্ছে মিশুর। কথা বলতে বলতে ঘুমিয়েও পড়লো। মেঘালয় ওকে কোলে নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুইয়ে দিলো। তারপর ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইলো অনেক্ষণ। পবিত্র একটা মুখ মেয়েটার! বড্ড সুন্দর দেখাচ্ছে।
মিশুর ঘুম ভাংলো বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। ও ঘুম থেকে উঠে চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো মেঘালয় নেই। ও অনেক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে রইলো তারপর উঠে এলো বিছানা থেকে। বাইরের ঘরে আসতেই দেখলো মেঘালয় খাবার টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে। ও এসে সামনে দাঁড়ালো। মেঘালয় ওকে দেখে বললো, “ঘুম হলো মহারাণী’র?”
– “হুম,এত সুখের ঘুম কক্ষনো হয়নি আমার। কিন্তু আপনি নাস্তা বানাচ্ছেন কেন?”
– “মহারাণী ঘুম থেকে উঠে কি খাবে তাহলে? ভাবলাম কিছু কিনে নিয়ে এসে রাখি। কিন্তু ফ্রিজে ফ্রুটস পেয়ে গেলাম, স্যান্ডুইচ পেলাম। মাত্র তিনটা আইটেম বানিয়েছি। কফি করেছি, কফি খাবে নাকি চা?”
– “উম, চুমু খাবো।”
মেঘালয় মাথা নিচু করে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলো। কথাটা শুনে চমকে তাকালো মিশুর দিকে। সে ভূল শোনেনি তো? ভূত দেখার মত চোখ বড়বড় করে চেয়ে রইলো মিশুর দিকে। ঘুম থেকে উঠে মিশুকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। কণ্ঠটাও আবেগ মিশ্রিত। মেঘালয় হেসে বললো, “কি খাবা?”
মিশু মুচকি হেসে বললো, “কিচ্ছু না।”
বলেই একটা দৌড় দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না,পায়ে ব্যথা পেয়ে আহ বলে বসে পড়লো। মেঘালয় এসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “হাঁটতেই পারছো না ঠিকমত। দৌড় দিতে যাও কেন হুম?”
– “তুমি যদি আবার হামলা করে বসো।”
– “পায়ে কি খুব ব্যথা? আমি তোমাকে একা রেখে বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম না। ওদেরকে বলে দিয়েছি, ফেরার সময় ওষুধ নিয়ে আসবে।”
– “ইস! আমার খুব বেশি কিছু হয়নি যে ওষুধ খেতে হবে। আমি ঠিক আছি।”
– “সেজন্যই তো হাটতে পারছো না। অবশ্য ভালোই হয়েছে, তোমাকে এখন কোলে নিয়ে সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো। পুতুলের মত একটা বাচ্চা, তাকে কি হাটতে দেয়া যায়?”
মিশু দুহাতে মেঘালয়ের গলা চেপে ধরে বললো, “এখন কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
– “স্বর্গে…”
– “হেঁটে হেঁটে বুঝি স্বর্গে যাওয়া যায়?”
মেঘালয় মিশুকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলো। শক্ত করে চেপে ধরে গভীর আবেশে চুমু খেলো ওর ঠোঁটে। মিশু সমানতালে দুই পা ছোড়াছুঁড়ি করছে, কিন্তু মেঘালয় শক্ত করে ওর একহাতে কোমর ধরে রেখেছে, আরেক হাতে ওর মুখ। মিশু দুহাতে মেঘালয়ের গলা খামচি দিয়ে ধরলো। অনেক্ষণ পর মেঘালয় ওকে ছেড়ে দিয়ে বললো, “শাস্ত্র পালন করে ফেলেছো।”
– “সরি।”
মিশু লজ্জায় মুখ লুকোচ্ছে মেঘালয়ের বুকে। মেঘালয় একটু সময় পর ওকে ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে গেলো। মিশু হা করে চেয়ে রইলো ওর চলে যাওয়ার দিকে। ভেবেছে মেঘালয় বুঝি রাগ করেছে। কিন্তু মেঘালয় টেবিল থেকে ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এসে হাজির হলো। হাসি ফুটলো মিশুর মুখে। দুজনে একসাথে বসে নাস্তা খেতে খেতে গল্প করলো। মিশুর শাড়ি এলোমেলো হয়ে গেছে। কফি খাওয়ার পর মেঘালয় ওর শাড়ি ঠিক করে দিলো।
আট টার পরেই ফিরলো ওরা। মিশুর জন্য ওষুধ এনেছে, খাবার এনেছে। সবাই মিলে একসাথে বসে খাবার খেলো। তারপর আড্ডায় বসলো। মেঘালয় বারবার তাকাচ্ছে মিশুর দিকে। ওর ইচ্ছে করছে একান্তই মিশুর সাথে সময় কাটাতে। কিন্তু বন্ধুদের কাছ থেকে মেয়েটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়াও যায় না। বড্ড লজ্জাকর হয়ে যাবে ব্যাপার টা। মেঘালয় মাথা নিচু করে এসব ভাবছে।
পূর্ব জিজ্ঞেস করলো, “ভাবিজী বাসর দিন কেমন কাটলো?”
– “খুব ভালো। এতবেশি ভালো যে আমার কিচ্ছু মনে নেই। কারণ, আমি আড়াইটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিলাম।”
সায়ান হেসে বলল, “মেঘু দোস্ত কি করছে একা একা? ফেসবুকিং?”
– “না, ও নাস্তা বানিয়েছে আমার জন্য।”
– “পূর্ব, তাহলে ওদের ছেড়ে দে। আমরা বরং নাচানাচি করি।”
মিশু বললো, “নাচানাচি করবেন? আমিও করবো।”
সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। মেঘালয় চোখ বড়বড় করে তাকালো মিশুর দিকে। তারপর বললো, “তুমি নাচতে পারো?”
– “হ্যা, খুব পারি।”
– “রুমে গিয়ে নাচাবো।”
-“না, আমি ওদের নাচ দেখবো।”
মেঘালয় উঠে দাঁড়িয়ে মিশুর হাত ধরে টানছে ওকে রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মিশু নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই রুমে যাবে না। এখানে বসে বসে সবার সাথে আড্ডা দেবে আর নাচ দেখবে। মেঘালয় মুখটা কাচুমাচু করে সায়ানের কানেকানে বললো, “যা করবি তাড়াতাড়ি কর না ভাই। নাচলে এখনি নাচ,আমার বউটাকে ছেড়ে দে।”
– “আমি কি তোর বউকে ধরে রাখছি?”
– “ভাই, তোর দোহাই লাগে একটু নাচ দেখা। আমি আমার বউটাকে নিয়ে যাই।”
সায়ান হাসতে হাসতে বললো, “ওটা তো একটা অবুঝ শিশু। ওকে নিয়ে গিয়ে কি করবি? সে নাচ দেখতে চাচ্ছে, দেখা। তোর দেখতে মন না চাইলে তুই গিয়ে ঘুমা।”
– “হারামি, আমি গিয়ে ঘুমাবো?”
– “হ্যা ঘুমা, আমাদের নাচানাচি শেষ হলে তোর বউকে সহী সালামতে তোর কাছে রেখে আসবো।”
– “আমার আজ বাসর রাত রে ভাই, আমারে একটু ওরে নিয়ে যাইতে দে।”
– “আমরা তো নাবালক শিশু, আমরা কি কিছু করছি আপনার বউকে? আপনার বউই তো যাইতে চাচ্ছে না।”
– “প্লিজ একটু নাচ দেখা না।”
মেঘালয়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো সায়ান। উঠে সাউন্ড বক্সে গান দিতে গেলো। মিশুকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। রাতে আবার কি পাগলামি করে সেটা ভেবে চিন্তা হচ্ছে মেঘালয়ের। সে নাচ না দেখে কিছুতেই এখান থেকে যাবে না। যদি বলে সারারাত ওদের সাথে বসে পার্টি করবে তাহলেই সেরেছে। এত সাধের বাসর রাত এ জন্মের মত ঘুচে যাবে।
মেঘালয় মিশুর দিকে চেয়ে আছে। মিশু ওর বন্ধুদের কাজকর্ম দেখছে। ওরা এখন কেক কাটবে, পার্টি স্প্রে দিচ্ছে বারবার। বেলুন ফুলিয়ে সাজিয়ে রাখছে আবার হাত দিয়ে ফাটাচ্ছে। তিনজন মিলে হাসাহাসি করছে, কোক খাচ্ছে। মিশু ও যোগ দিলো ওদের সাথে। এদিকে মেঘালয়ের মাথায় হাত। যা ভেবেছে তাই হতে যাচ্ছে। একবার যদি ও মেয়ে বলে, সে এখন এদের সাথে পার্টি করবে তবে আজ আর মিশুকে সে পাচ্ছে না। গালে হাত দিয়ে ওদের বাচ্চামো কাণ্ডকারখানা দেখছে মেঘালয়।
মিশু হাঁটতে পারছে না তবুও দিব্যি এনজয় করছে ওদের সাথে। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে,
“Kabhi joo badal, barse na dekhu tujhe akhe…”
মিশু বললো, “এসব গানের সাথে কি নাচা যায়? আমি গান দিচ্ছি, সায়ান ভাইয়া নাচের জন্য রেডি হও।”
সায়ান সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মিশু পা খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে হেটে গান বদলাতে গেলো। মেঘালয় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। কান্না করতে ইচ্ছে করছে ওর। বউটা এত অবুঝ কেন! এদিকে রাত বেড়ে যাচ্ছে। মিশু গান ছেড়ে দিলো, ” দিলবার দিলবার.. দিলবার দিলবার..”
সবাই অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। সায়ান মিশুর দিকে হাত বাড়িয়ে সিনেম্যাটিক স্টাইলে তাকালো। মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তাকালো ও না। ও সায়ানের হাত ধরে কাছে এগিয়ে এলো। রিমিক্স বাজছে, বাকি তিনজন একদম হতভম্ব! মিশু শাড়ি পড়েই সায়ানের হাত ধরতে নাচতে আরম্ভ করলো,
“Ab toh hosh na khabar hai
Yeh kaisa asar hai
Hosh na khabar hai
Yeh kaisa asar hai
Tumse milne ke baad dilbar..
Tumse milne ke baad dilbar…
Dilbar dilbar.. Dilbar dilbar..”
মিশু এমন দক্ষ ভাবে সায়ানের হাত ধরে নাচছে যে মনেহচ্ছে দুজনেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ড্যান্সার। সবাই হা করে চেয়ে আছে। পূর্ব উঠে গিয়ে মিশুকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে নাচতে শুরু করলো। মিশু পূর্ব’র মুখটা ধরে কাঁধে হাত রেখে তাল মিলাচ্ছে,
“Tu mera khaab hai
Tu mere dil ka qaraar
Dekh le jann-e-mann
Dekh le bas ek baar..”
মেঘালয় আর বসে থাকতে পারলো না। উঠে গিয়ে সবার সামনেই মিশুকে কোলে তুলে নিলো। মিশু রীতিমত অবাক! ও বারবার বলতে লাগলো, “নাচবো আমি,নাচবো আমি..”
বাকি দুই বন্ধু হাসছে আর নেচেই চলেছে। মেঘালয় ওদেরকে বললো, “তোরা একেকটা ভিলেন”
ওরা হাসতে হাসতে বললো, “হ্যাপি ফুলশয্যা, হ্যাপি জার্নি।”
বলতে বলতে নাচতেই লাগলো। মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে এসে রুমে ঢুকে দরজা আটকিয়ে দিলো। তারপর মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই মিশু বললো, “আমি নাচ দেখতাম।”
মেঘালয় আচমকা গায়ের সমস্ত জোড় দিয়ে কষিয়ে থাপ্পড় দিলো মিশুর গালে। মিশু গাল ধরে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। মেঘালয় কিছুতেই রাগ সামলাতে না পেরে বললো, “ওদের সাথে যা খুশি বলো কিছু মনে করতাম না। দুজনের সাথে হাত ধরে নাচবে আর আমি সেটা সহ্য করবো এটা ভাবলে কি করে?”
মিশুর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মেঘালয়ের এমন আচরণ ওর কাছে দুঃস্বপ্নের মত লাগছে। ও বললো, “বিয়ে করতে না করতেই বিহ্যাভ চেঞ্জ হয়ে গেলো!”
মেঘালয়ের খুব খারাপ লাগলো কথাটা শুনতে। ও এগিয়ে এসে মিশুর মুখটা ধরে চোখ মুছে দিয়ে বললো, “সরি মিশু, সরি ”
মিশু এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দিলো। মেঘালয় বারবার সরি বলছে তবুও মিশু কান্না করেই চলেছে। মেঘালয় মিশুর পায়ে হাত রেখে সরি বলতেই মিশু চমকে উঠে ওর হাত ধরে বললো, “কি করছো তুমি এটা?”
– “আমাকে মাফ করে দাও। আমি তোমাকে আঘাত করে ফেললাম।”
– “ছি, তাই বলে পা ধরবা?”
মিশু মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেললো।মেঘালয় নিজেও কেঁদে ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আমি রাগ সামলাতে পারিনি। তুমিই বলো, আমাকে কোনো মেয়ের হাত ধরে নাচতে দেখলে তোমার কেমন লাগতো? তার উপর তুমি একজন মেয়ে। আমার এসব পছন্দ না।”
মিশু আরো জোরে কাঁদতে লাগলো। মেঘালয়ের গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেঘালয় বললো, “তোমাকে আর কারো সাথে দেখলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। শোনো,তোমার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ আমার। আর কারো না।”
মিশু দুহাতে খামচে ধরলো মেঘালয়ের পাঞ্জাবি। মেঘালয় ওকে বুকের সাথে শক্ত করে ধরে বললো, “আমি জানি তুমি এখনো অনেক বাচ্চা স্বভাবের। ছেলেমানুষি ভাবটা এখনো যায় নি, সেজন্যই ওভাবে নাচছিলে। কিন্তু আমি পারিনা রে মানতে, আর কেউ তোর আঙুল স্পর্শ করুক আমি সহ্য করতে পারবো না। মরে যাবো।”
মিশু বললো, “আমিই সরি। আর কক্ষনো এমন হবেনা।”
– “আমাকে মাফ করে দিয়েছো তো? প্রথম দিনেই আঘাত করলাম তোমায়। আমি আসলে রেগে গেলে ভয়ংকর হয়ে যাই মিশু। সরি।”
– “না মাফ করবো না। একটা কাজ করলে মাফ করবো ”
– “কি কাজ?”
মিশু ওর বুকে মুখ লুকাতে লুকাতে বললো, “ট্রেনে যেটা করেছিলে সেটা করতে হবে। তুমি না বলছিলে বিয়ের পরে ওসব করতে হয়।”
মেঘালয় মিশুকে ছেড়ে দিয়ে হাসার চেষ্টা করলো, “আচ্ছা, মাফ করে দিও।”
বলামাত্রই যেই চোখ ঘুরিয়েছে দেখলো পেটের উপর থেকে মিশুর শাড়ি সরে গেছে। নাভীতে চোখ যাওয়া মাত্রই মেঘালয়ের সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। ঘোর লেগে গেলো চোখে। অনেক্ষণ ধরে চেয়ে রইলো। তারপর মিশুকে এক হাতে শুইয়ে দিয়ে আরেক হাতে ওর শাড়িটা সরালো। মিশু বুঝতে পারছে না মেঘালয় কি করতে চাইছে। মেঘালয় নিচু হয়ে ওর নাভীর উপর ঠোঁট স্পর্শ করলো। শিহরিত হয়ে উঠলো মিশু। এক অন্যরকম সুখের স্পর্শে মিশে যেতে লাগলো। মেঘালয়ের চুল খামচে ধরলো দুহাতে। গায়ের জোরে ওর চুল টানতে লাগলো। মেঘালয় মাথাটা ডুবিয়ে দিয়ে গভীর আবেশে চুম্বন করতে লাগলো। কেঁপে কেঁপে উঠছে মিশু।
চলবে..

অনুভূতি
পর্ব ২১
মিশু মনি
.
৩৩.
সূর্যের সোনালী আলো মুখের উপর এসে পড়ায় ঘুম ভেঙে গেলো মিশুর। বুঝতে পারলো মেঘালয়ের উষ্ণ বুকের সাথে মিশে আছে ও। বুকের ঢিপঢিপ শব্দ কানে আসছে। মিশু উঠতে যেতেই মেঘালয় ওকে টেনে কাছে নিলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো, “কখনো আমাকে বিছানায় রেখে উঠবা না। আমার আগে ঘুম ভাংলেও শুয়ে থাকবা পাশে।”
মিশু হেসে বললো, “কেন?”
– “উম, ঘুম থেকে উঠেই তোমাকে পাশে চাই।”
– “আমিতো সবসময় ই পাশে আছি।”
– “উম,কাছে চাই রে।”
বলেই মিশুকে জাপটে ধরলো। ওর প্রশস্ত বুকের ভেতর লুকোতে লুকোতে মিশুর কেবলই সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছিলো। রাতটা এতবেশি সুখকর ছিলো যার কোনো বর্ণনা দিয়ে হয়ত বোঝানো সম্ভব না। মিশু বারবার মেঘালয়ের দিকে তাকাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। গত রাতে মেঘালয় এক অন্যরকম পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছে ওকে। ঘুরিয়ে এনেছে ভালোবাসার সুখের এক অন্যরকম রাজ্য থেকে। যে রাজ্যে শুধু সুখ আর সুখ! মেঘালয় বলেছে প্রতিটা দিন নতুন ভাবে শুরু হবে আর প্রত্যেকটা রাতে নতুন নতুন কিছু রাজ্য থেকে ঘুরিয়ে আনবে ওকে। মিশু মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব ভেবে মুচকি হাসছিলো।
মেঘালয় চোখ বুজে ছিলো এতক্ষণ। চোখ মেলতেই মিশুর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। মিশু হাসলো মিষ্টি করে। মেঘালয় জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন?”
– “তোমার শরীরটা খুব উষ্ণ।”
– “সেজন্য হাসছো?”
মিশু মাথাটা দুপাশে নেড়ে বললো, “উহু। আগে জানতাম ভালোবাসা শুধু দুটো হৃদয়ের ব্যাপার। এখন মনেহচ্ছে, শরীর ও বিশেষ প্রয়োজন। স্পর্শ একটা বিশাল প্রাপ্তি।”
মেঘালয় হেসে বললো, “পাগলি, যেখানে ভালোবাসা থাকবে সেখানে শরীর ও থাকবেই। হৃদয় তো শরীরের ই অংশ।”
– “তুমি খুব ভালো মেঘালয়, খুব ভালো।”
মেঘালয় মিশুর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, “এই প্রথম বউটা আমার নাম ধরে ডেকেছে। এজন্য একটা মিষ্টি পাওনা।”
মিশু মেঘালয়ের কপালে আলতো চুমু এঁকে দিলো। মেঘালয় মিশুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “পাগলী একটা বউ আমার। সারাজীবন এভাবেই ভালোবাসবি হ্যা?”
– “না বাসবো না, এরচেয়ে বেশি বেশি বাসবো।”
মেঘালয় হেসে ফেললো। তারপর বিছানায় উঠে বসলো। মিশুকে টেনে তুলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “পায়ের অবস্থা কেমন? ব্যথা সেরেছে?”
– “হুম একদম। একটু ব্যথা আছে, সেরে যাবে।”
মেঘালয় মিশুকে কাছে টেনে নিয়ে ওর চুলগুলো খোঁপা বেঁধে দিলো। মিশু মিটিমিটি হাসছে। মনেহচ্ছে ছেলেটা এখন থেকে ওকে আর কোনো কাজই করতে দেবেনা। সবই সে করিয়ে দেবে। এত সুখ কি কপালে সইবে! বড্ড ভয় হয় যে।
মেঘালয় চুলগুলো খোঁপা বেঁধে দিতে দিতে বললো, “একটা গল্প আছে তোমার চুলের। পরে শোনাবো।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “আমার চুলের গল্প মানে! এক্ষুনি শোনাও না।”
– “নাহ, পরে শোনাবো বউসোনা। এখন ওঠো, ফ্রেশ হবা।”
মেঘালয় বিছানা ছেড়ে নামলো। মিশুকে কোলে নিয়ে বাথরুমে এসে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে মিশুর হাতে দিয়ে বললো, “নাও ব্রাশ করো।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, ” এটা কার ব্রাশ?”
– “তোমার। নতুন ব্রাশ কিনে এনেছি কাল।”
মিশুর বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো। ও বিস্ময় লুকাতে পারলো না। অবাক হয়ে বললো, “সামান্য একটা ব্রাশের কথাও তোমার মনে থাকে! ছোটছোট জিনিস গুলোকেও তুমি খুব গুরুত্ব দাও।”
মেঘালয় দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “কাল যখন ঘুমাচ্ছিলে, তোমার কি কি জিনিস লাগবে সব লিস্ট করে পূর্বকে মেসেজ করে পাঠিয়েছিলাম। ওই নিয়ে এসেছে। তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে, আমি বসে বসে এসব ই ভাবছিলাম।”
মিশুর ইচ্ছে করলো মেঘালয়কে জড়িয়ে ধরতে। ছেলেটা এত্ত ভালো কেন!
ও ব্রাশ করতে করতে বললো, “আর কি কি এনেছে?”
– “স্যান্ডেল, টিস্যু পেপার, হেয়ার ব্যান্ড, চিরুনি, সাবান, শ্যাম্পু,তোমার জন্য আলাদা টাওয়েল।”
– “আমার জন্য আলাদা টাওয়েল কেন?”
– “বারে, আমার বউ সায়ানের টাওয়েল ইউজ করবে নাকি?”
– “ওহ আচ্ছা।”
মিশু মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ব্রাশ করতে লাগলো। মেঘালয় চেয়ে আছে ওর দিকে। মিশুর ব্রাশ করা হতেই মেঘালয় ব্রাশটা নিয়ে নিজে দাঁত মাজতে আরম্ভ করলো। মিশু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো, “আমার টা দিয়েই ব্রাশ করবা?”
মেঘালয় কিছু না বলে দ্রুত ব্রাশ করে নিলো। তারপর বাথরুমের দরজা আটকিয়ে দিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিলো। মিশুকে শাওয়ারের নিচে দাড় করিয়ে দিয়ে ওর হাতে সাবান লাগাতে লাগাতে বললো, “টি শার্ট টা কি খুলবা নাকি লজ্জা পাবা?”
মিশু লাজুক গলায় বললো, “খুব লজ্জা পাবো।”
মেঘালয় একটা টাওয়েল ওর হাতে দিয়ে পিছন ফিরে বললো, “শার্ট খুলে এটা পড়ে নাও।”
– “কেন?”
– “তোমার উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের ময়লা সাফ করার দায়িত্ব নিয়েছি না?”
বলেই হো হো করে হেসে উঠলো। মিশু লজ্জা পেয়ে বললো, “কি খারাপ!”
টাওয়েল পড়ে নিয়ে মেঘালকে ফিরতে বললো। মেঘালয় ওর দিকে ফিরে একবার আপাদমস্তক তাকালো। মিষ্টি করে হাসি দিয়ে মিশুর গায়ে সাবান লাগাতে শুরু করলো। ভালোমতো শ্যাম্পুও করে দিলো চুলে। মিশু হাসতে হাসতে বললো, “আমি আমার জীবনে কক্ষনো এত ভালোমতো গোসল ই করিনি বোধহয়। আমিতো চুলে শ্যাম্পুও করতে পারিনা।”
– “পারতে হবেনা, আমি আছি কি করতে?”
মিশুর শ্যাম্পু করা হয়ে গেলে ওকে শাওয়ারের নিচে দাড় করিয়ে দিয়ে নিজে শ্যাম্পু করতে লাগলো। মিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয়ের উন্মুক্ত বুকে ঘন লোমগুলো ভিজতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন কেমন যেন করছে। হা করে সেদিকে চেয়ে রইলো অনেক্ষণ। মেঘালয়ের গোসল শেষ করতে মাত্র আড়াই মিনিট সময় লাগলো। মিশু একদম অবাক! একটা ছেলে এত তাড়াতাড়ি কিভাবে গোসল করতে পারে!
মেঘালয় প্যান্ট বদলে টাওয়েল পড়ে নিলো। তারপর মিশুকে কোলে নিয়ে রুমে এলো। মিশু মেঘালয়ের ভেজা পায়ের দিকে চেয়ে আছে হা করে। এত সুন্দর কারো পা হতে পারে! পা ভিজে লোমগুলো পায়ের সাথে আটকে আছে। দারুণ রকমের সুন্দর লাগছে। একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
মেঘালয় লাগেজ খুলে একটা শাড়ি বের করে বিছানার উপর রাখলো। মিশুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ভেজা চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগছে ওর। ভেজা চুলে মিশুর চেহারাটাই বদলে গেছে একদম। স্নিগ্ধতা ছেয়ে গেছে চেহারায়। মেঘালয় অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলো। তারপর গভীর আবেশে ঠোঁটে চুমু খেলো একটা। শাড়িটা মিশুকে পড়িয়ে দিয়ে তোয়ালে দিয়ে ওর চুলগুলো পেঁচিয়ে মাথার উপরে তুলে দিয়ে বললো, “ভেজা চুল কিছুক্ষণ এভাবে পেঁচিয়ে রাখবা তোয়ালে দিয়ে।”
– “কেন?”
– “এটা চুলের জন্য উপকারী। আর ভূলেও কখনো ভেজা চুল আচড়াবা না। মনে থাকবে?”
– “হুম থাকবে।”
মেঘালয় মিশুকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে কাজল নিয়ে ওর হাতে দিয়ে বললো, “জাস্ট কাজল, আর একটা ছোট্ট কালো টিপ। ওকে?”
– “ওকে।”
– “কখনো মেকাপ করবা না, যখন লাগবে আমিই বলবো। ওকে?”
– “ওকে।”
মেঘালয় নিজে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বডি স্প্রে করলো। মিশু চেয়ে চেয়ে দেখছে। মিশুর শাড়ির কালারের সাথে ম্যাচিং করে একটা টি শার্ট ও জিন্স পড়লো। এখন বেশ দেখাচ্ছে মেঘালয়কে। ভেজা চুলগুলো আচড়ে নিলো। তারপর দুবার মুখটা ভালোমতো দেখে বললো, “দাড়ি বড় হয়ে গেছে।”
মিশু বললো, “ওটাতেই তোমাকে সুন্দর লাগছে। ক্লিন সেভে ছেলেদের ছিলা মুরগির মতো লাগে।”
মেঘালয় মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “কি বললা! কি মুরগি?”
মিশু ফিক করে হেসে ফেললো, “সরি, কিছু বলিনি। তোমাকে না এখন বিপজ্জনক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে।”
– “খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে?”
– “হ্যা।”
মেঘালয় হেসে উঠলো। তারপর মিশুর সামনে এসে বসলো। মিশুর মাথা থেকে টাওয়েল খুলে নিয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিলো। তারপর বললো, “নাস্তা তো করতে হবে। কিন্তু তোমাকে এখন যে পরিমাণ সুন্দর লাগছে, চাইনা আমার বন্ধুরা আমার মিষ্টি বউটাকে দেখুক। তোমাকে শুধু আমি দেখবো।”
বলেই এগিয়ে এসে মিশুর মাথার পিছনে হাত দিয়ে এগিয়ে এসে ঠোঁট দুটো আরেকবার স্পর্শ করলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মিশুর হাত ধরে বললো, “আসো, হাটতে পারবা তো?”
– “হুম পারবো ”
মেঘালয়ের হাত ধরে মিশু ড্রয়িংরুমে এলো। খাবার টেবিলে তিনবন্ধু নাস্তা নিয়ে বসে আছে ওদের জন্য। ওদেরকে একসাথে দেখে ওরা একবার মুগ্ধ হলো। দুটিকে সত্যিই বেশ মানিয়েছে। শাড়িতে মিশুকে বেশ বড়বড় লাগছে।মনেহচ্ছে মেয়েটা হুট করেই অনেক বড় হয়ে গেছে।
পূর্ব বললো, “গুড মর্নিং ভাবি।”
মিশুও হেসে গুড মর্নিং জানালো। মিশু বসামাত্র ওরা নাস্তা খেতে আরম্ভ করলো। মেঘালয় বললো, “আমাদের জন্য বসে আছিস কেন? তোরা খেয়ে নিতি।”
– “অতটাও স্বার্থপর ভাবিস না আমাদের। তোদেরকে রেখে খেয়ে নিবো?”
মিশু হাসলো। মেঘালয়ের বন্ধুরাও অনেক ভালো। কত হেল্পফুল, দায়িত্ববান, আর অনেক দুষ্টুও।
নাস্তা খেতে খেতে আরাফ বললো, “মেঘালয় একটা অফার আছে তোদের জন্য। তুই একসেপ্ট করবি কিনা তোর ব্যাপার। তবে করতে পারিস।”
– “বলে ফেল।”
আরাফ বললো, “আব্বু একটা চা বাগানের ব্যাপারে কথা বলছে তো, রাতে ফোন দিয়ে আমাকে দেখে আসতে বললো। আমিও বললাম, ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে গিয়ে দুটো দিন ঘুরে আসি। আব্বু হোটেলে দুটো রুম বুকিং এর টাকা দিয়েছে। আমরা ভাবছি, প্রথম দিন হোটেলে থাকবো আর দ্বিতীয় দিন চা বাগানের বাংলোয়। শীত প্রায় এসে গেছে, চা বাগানের ভিতরে তোর মধুচন্দ্রিমা দারুণ কাটবে, আগামী দুদিনের মধ্যেই আবার পূর্ণিমা আছে।”
মেঘালয় একবার মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “যাবা?”
মিশু আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললো, “সত্যি! আমি কক্ষনো চা বাগানে যাইনি। মজা হবে অনেক। কিন্তু তুমি না বললা সাজেকে যাবা? সাজেকে গেলে অনেক খরচ হবে, এমনিতেও অনেক খরচা হলো। আবার সিলেট যাবো? না থাক।”
মেঘালয় একটু ঝুঁকে এসে বললো, “খরচ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা। যেতে চাও কিনা সেটা বলো?”
মিশু চুপ করে রইলো। মেঘালয় বেশ বুঝতে পারছে সে যেতে কি পরিমাণ আগ্রহী। মেয়েটা নেভারল্যান্ডে গিয়েই যে খুশি হয়েছিলো, একবার ওকে ডাউকির মেঘালয় দেখিয়ে আনতে হবে। বিছানাকান্দির শীতল জলে একবার ডুব দিলেই সুখে মরে যেতে চাইবে। রাতারগুল দেখলে তো বোধহয় বিস্ময়ে কথাই বলতে পারবে না। এসব ভেবে মেঘালয় হাসলো।
মিশু বললো, “হাসছো কেন?”
– “এমনি। আমরা তাহলে কবে যাচ্ছি?”
আরাফ বললো, “কালকে সকালে বের হই?”
সায়ান খাবার চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করল, “আজকে রাতে বের হলে কি হয়?”
– “দূর ব্যাটা, রাত্রে জার্নি করে গিয়ে সারাদিন ভাবি ঘুমাবে নাকি ঘুরবে? তাছাড়া ওদের নতুন বিয়ে হইছে, বিয়ের পরের প্রত্যেকটা রাত অনেক দামী, চাইনা সেটা গাড়িতে নষ্ট হোক।”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “নাহ, আজকে রাতেই বের হবো। তিনদিনের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে রে। আমার আবার প্রোগ্রাম আছে টিএসসি তে।”
ওরা একটু ভেবে বললো, “আচ্ছা ঠিকাছে। তবে তাই হোক। আজকে রাতেই যাচ্ছি আমরা। গাড়ি কার টা নেবো?”
মেঘালয় বললো, “আমার টাই নিস। তেল ভরবে পূর্ব।”
পূর্ব লাফিয়ে উঠে বলল, “আমি ক্যান?”
– “থাকার দায়িত্ব আরাফের,গাড়ি আমার, তেল তোর।”
– ” আর খাওয়া?”
– “খাওয়া সায়ানের।”
সায়ান চেঁচিয়ে উঠলো, “সবচেয়ে বেশি খরচ হয় খাওয়া দাওয়ায়। সেটাই আমার?”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “আমাদের সদ্য বিয়ে হইছে ভাই। আমাদের জন্য তোদের একটু ছাড় দেয়া উচিৎ না বল? নতুন সংসার পাততে চলেছি।”
সায়ান মুখ কাচুমাচু করে বললো, “অগত্যা.. কি আর করার? বন্ধু মানুষ, ভাবি আছে তো কিছু বললাম না।”
হাসাহাসি করতে করতে ওরা নাস্তা করার পর্ব শেষ করলো।
চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here