অনুভূতি,পর্ব-২২+২৩

অনুভূতি
পর্ব ২২
মিশু মনি
.
৩৪.
রৌদ্রময়ীকে নাস্তা এনে দিয়ে নিখিল বললো, “এখন যাবি কোথায়?”
– “জানিনা রে।”
নিখিল একটু কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, “দুটো দিন এখানে থাক। তারপর দেখা যাবে।”
রোদ বেশ অবাক হয়ে গেলো। নিখিলের বুকের ভেতর কেমন দহন চলছে সেটা ও বেশ ভালো করেই জানে। বুঝতে পারছে সবই। ছেলেটার চেহারা একরাতেই কেমন করুণ হয়ে গেছে। তবুও কত সুন্দর ভাবে বলছে থেকে যেতে।
নিখিল বললো, “কি ভাবছিস? খেয়ে নে।”
– “তুই খেয়েছিস?”
– “আমি খাবো না,রুচি নেই খাওয়ার।”
রোদ জানে নিখিল কেন খেতে চাইছে না। নিখিল কে জোর করে খাওয়াতে পারলে হয়। যদিও ওর নিজের ও খেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও নিখিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো, “খেয়ে নে প্লিজ।”
– “বাদ দে।আমি খাবো না,ভালো লাগছে না খেতে।”
– “নিখিল প্লিজ,তুই না খেলে আমিও খাবো না।”
নিখিল একবার রাগত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললো, “ঢং আমার একদম ই ভালো লাগেনা। চুপচাপ খেয়ে নে।”
রোদ আরো জোরালো গলায় বললো, “তুই না খেলে আমি খাবো না একবার বলেছি।”
– “আমার উপর কিসের অধিকার খাটাচ্ছিস তুই?”
– “কোনো অধিকার খাটাচ্ছি না, মানবতার খাতিরে খেতে বলছি।”
– “যে বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে ছোট বোনের লাইফটা শেষ করে দেয় তার আবার মানবতা।”
কথাটা খুব খারাপ লাগলো রোদের। তবুও কিছু মনে করলো না। এখন এই কথাটা বারবার শুনতে হবে ওকে। তবুও মুখ বন্ধ রাখতে হবে। এখন কিছুতেই মুখ খোলা যাবেনা, কিছুদিন যাক তারপর নিখিলকে সব বলে দিবে ও।
নিখিল দেখলো রোদ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তারমানে এই মেয়ে খাবেনা। প্রচুর জেদি একটা মেয়ে। কি যেন ভেবে নিখিল নিজেও এক প্লেট খাবার নিয়ে এসে ওর পাশে বসে খেতে শুরু করলো। ওর খাওয়া দেখে রোদ হেসে খেতে শুরু করলো।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুই বন্ধু মিলে টুকটাক কথাকাটি আর ঝগড়াও হলো। অনেক কিছু নিয়ে যুক্তি তর্কও হলো। নিখিল বারবার করে শুনতে চাইছে কেন বাড়ি থেকে পালালো রোদ? কিন্তু রোদ কিছুতেই সেটা বলতে চাইছে না। কটা দিন সময় নিয়ে তারপর বলবে বলছে। বাধ্য হয়েই আশা ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো নিখিল।
রোদ একাই বসে রইলো বিছানার উপর। এখানে কয়টা দিন আপাতত নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, তারপর ঢাকায় চলে গেলে ভালো হবে। কিন্তু কি করবে সে গিয়ে? চাকরী পেতেও তো সময় লাগে,সুযোগ লাগে।
বসে বসে এসব চিন্তা করতে লাগলো।
৩৫.
নাস্তার পর্ব শেষ করেই মেঘালয় মিশুকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লো। ওর বন্ধুরাও ব্যাগ গুছানোর জন্য যে যার বাড়িতে চলে গেলো। বিকেল অব্দি ঘুমিয়ে সবাই সন্ধ্যায় চলে আসবে ব্যাগ নিয়ে। কিন্তু মেঘালয় মিশুকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে এটা কাউকেই জানালো না। এমনকি মিশুকেও জানালো না। মিশু খুব কৌতুহলী হয়ে উঠছে। মেঘালয় নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে আর ও পাশে বসে আছে।
গাড়ি এসে থামলো একটা চমৎকার বাড়ির সামনে। মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে মিশুকে নামতে বললো। গাড়ি থেকে নেমে অনেক্ষণ মিশু চেয়ে রইলো বাড়িটার দিকে। ডিজাইন, রং, গ্লাস সবমিলিয়ে অন্যরকম সুন্দর একটা বাড়ি! এটা আবার কার বাড়িতে নিয়ে এলো মেঘ? বাড়িটার সৌন্দর্য দেখেই তো মিশু নির্বাক হয়ে যাচ্ছে। মুগ্ধতা চেপে রাখতে পারছে না।
মেঘালয় ওর হাত ধরে বাড়ির প্রধান দরজায় আসলো। দরজায় এসে চাবি দিয়ে লক খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। পুরো বাড়ির সৌন্দর্য চোখে পড়ার মত। সাজসজ্জা অনেক আকর্ষণীয়! কিন্তু বাড়িটা কার কিছুতেই বুঝতে পারছে না মিশু। মেঘালয়ের বাড়ি তো মোহম্মদপুরে, আর মিশু নিজেই ওর বাড়ি চেনে। একদিন ওর বাড়ির সামনে দিয়েই বাইকে করে মেঘালয় মিশুকে বাসায় পৌছে দিয়ে এসেছে। তাহলে এটা আবার কার বাড়ি!
মিশু দুবার জিজ্ঞেস করলো মেঘালয়কে। কিন্তু মেঘালয় কোনো উত্তর দিলো না। মিশুকে কোলে তুলে নিয়ে একটা রুমে এসে দরজা আটকিয়ে দিলো। মিশুকে বিছানার উপর বসিয়ে দিতেই অনেক দূর নিচে তলিয়ে গেলো ও। অবাক হয়ে বললো, “এত সফট বিছানা!”
মেঘালয় ঝাঁপিয়ে পড়লো মিশুর উপর। অনেক্ষণ ধরে দুজনের খুনসুটি চলতে লাগলো। একে অপরকে বালিশ দিয়ে মারামারি করছে, একটা বালিশের তুলো ইতিমধ্যে পুরো ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। বালিশের তুলো উড়িয়ে মারামারি করতে এত ভালো লাগে আগে জানতো না মিশু। ও তুলা গুলো দুহাতে তুলে মেঘালয়ের মাথার উপর দিয়ে দিলো। মেঘালয়ের মাথা,চুল,মুখ শার্ট সব তুলা দিয়ে একাকার হয়ে গেছে।
মিশু এগিয়ে এসে মেঘালয়ের কলার টেনে ধরে ওকে কাছে নিয়ে বললো, ” এটা কার বাড়ি বলছো না যে? বাড়ির লোকজন সবাই কোথায়?”
– “ওহ হো, দাড়াও একটা ফোন করে আসি।”
মেঘালয় বাইরে গিয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। কি এমন কথা যা মিশুর সামনে বলা যায়না! কৌতুহল চেপে গেলো মিশু। মেঘালয় এসে বললো, “বাইরে যাবো।”
মিশুর জানতে ইচ্ছে করছে কোথায় যাবে কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলো না। মেঘালয় আলমারি খুলে একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার এনে দিয়ে বললো, “পড়ে নাও দ্রুত।”
– “এগুলো তো তোমার মনেহচ্ছে। আমি কেন পড়বো?”
– “উফফ পড়ো তো। তাড়াতাড়ি।”
মিশু থতমত খেয়ে গেছে। গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে দেখলো অনেক ঢোলা ঢোলা লাগছে। আর প্যান্ট টা হচ্ছে না কিছুতেই। সেটা পড়ে খুবই হাস্যকর দেখাচ্ছে মিশুকে।
মিশু মুখটা কাচুমাচু করে বললো, “কিরকম বাজে দেখাচ্ছে! ছি, তুমি কেন পড়তে দিলা এটা?”
মেঘালয় মিশুকে দেখে হেসেই খুন। মেঘালয়ের গেঞ্জির ভিতর ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা ওর, এত বেশি ঢোলা আর লম্বা। প্যান্ট পড়ে আরো হাস্যকর লাগছে। মিশু মুখটা বিকৃত করছে দেখে মেঘালয় হো হো করে হাসছে। মেঘালয় বললো, “খারাপ লাগছে?”
– “রাগ লাগছে।”
– “তাহলে খুলে ফেলে দাও। খালি গায়ে আসো।”
– “ছি,…”
মিশুর মুখ দেখে আবারো হেসে উঠলো মেঘালয়। তারপর ওকে কোলে তুলে নিয়ে হাটতে শুরু করলো। মিশুকে বললো চোখ বন্ধ করে রাখো। একদম খুলবা না। মিশু দুহাতে চোখ চেপে ধরে আছে। খুব হাসি পাচ্ছে,রাগও হচ্ছে। এই টি শার্ট পড়া অবস্থায় কারো সাথে দেখা হয়ে গেলে সে নির্ঘাত হাসবে। বলবে মেঘালয়ের বউটা খুব বাজে দেখতে। এসব ভেবে ভেবে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে মিশুর। কিন্তু মেঘালয় কি করতে চাইছে সেটা এখনো বুঝতে পারছে না।
মেঘালয় মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো, “এবার চোখ খোলো।”
মিশু চোখ খোলামাত্রই বিস্ময়ে ওর চোখ বড়বড় হয়ে গেলো! সুইমিংপুল! একদম নীল রঙের পানি, তরঙ্গ খেলা করছে উপরে, চারিদিকে সবুজ গাছপালায় ঘেরা! উফফ এত্ত সুন্দর কেন!
মিশু খুশিতে মেঘালয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “পুল! আমি জীবনেও কখনো এরকম পুল সামনাসামনি দেখিও নি। এত সুন্দর সুইমিংপুল কিভাবে হয়? ন্যাচারাল লাগছে, চারদিকে এত ঘন গাছ!”
মেঘালয় মিশুকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, “বউ নিয়ে রোমাঞ্চ করবো তো, সেজন্য এত ঘন করে গাছ লাগানো হয়েছে।”
– “তুমি খুব খারাপ! বাজে বাজে খুব বাজে একটা লোক।”
মেঘালয় হাসতে হাসতে দুইপা পিছিয়ে গেলো। মিশু অবাক হয়ে সবকিছুর সৌন্দর্য দেখছে। সত্যিই পানিগুলো একদম নীল, মাথার উপরে নীলাকাশ দেখা যাচ্ছে। আকাশে তুলোর মত মেঘ উড়ছে। খুব ভালো লাগছে মিশুর। এমন সময় মেঘালয় পানিতে লাফিয়ে পড়লো। ঝাপ দিয়েই একদম সাঁতরানো আরম্ভ করে দিয়েছে। মিশু হা করে চেয়ে চেয়ে দেখছে। নীল পানির ভেতরে মেঘালয়ের মুখটা যখনি উকি দিচ্ছে,অন্যরকম ভালো লাগা ছেয়ে যায় ভেতরে। মেঘালয় কিছুক্ষণ সাতরিয়ে মিশুর সামনে এসে ওকে নামতে বললো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকছে ওকে। কিন্তু মিশু চেয়ে আছে মেঘালয়ের রোমশ বুকের দিকে। ছেলেটা কখন খালি গা হয়ে লাফ দিয়েছে খেয়াল ই করেনি মিশু। কিন্তু ওর খোলা বুকে লোমগুলো ভিজে ভয়ংকর সুন্দর দেখাচ্ছে। চুলগুলো ভিজে গেছে, চুল থেকে গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। হাতের লোমগুলোও ভিজে হাতের সাথে লেপ্টে গেছে। এত সুন্দর কেন মেঘালয়! মিশু মুগ্ধতা লুকিয়ে রাখতে পারছে না।
মেঘালয় ওর হাত টেনে ধরে কোলে তুলে নিয়ে সুইমিংপুলে নামালো। মিশু ওর কোলেই দুহাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে দেখছে মেঘালয়কে। ঘোর লেগে যাচ্ছে ওর। মেঘালয় সত্যিই অনেক সুন্দর! মেঘালয়ের শরীরে বিন্দু বিন্দু লেগে লাগা সমস্ত জল গুলো খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
মিশু বললো, “আমার হিংসে হচ্ছে মেঘ।”
– “কেন?”
– “এই পানিগুলোর কত সৌভাগ্য, তারা তোমার চোখে, গালে, মুখে, ঠোঁটে সবখানে লেগে আছে। আমি পারছি না।”
মেঘালয় একদম অবাক হয়ে গেলো মিশুর কথায়। ওর চোখের মায়ায় তলিয়ে যাচ্ছে মেঘালয়। চোখে চোখ রেখে বললো, “এত ঘোর কেন তোমার চোখে?”
– “আমার এত ঘোর ঘোর লাগে ক্যান মেঘ?”
– “তোমার ও কি পানির মত আমার চোখে,গালে ঠোঁটে সবখানে লেগে থাকতে ইচ্ছে করে?”
– “হুম।”
মেঘালয় মিশুকে নিয়ে পানির ভেতর তলিয়ে গেলো। মিশু ওর কোলে,মনেহচ্ছে শূন্যে ভেসে আছে ও। মেঘালয়ের স্পর্শ অনুভব করছে তীব্রভাবে। আর সুখের অন্য এক রাজ্যে প্রবেশ করছে দুজনে। আবেশে চোখ বুজে আসে মিশুর। হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আসে। মেঘালয় ওকে জড়িয়ে রেখেছে, আটকে রেখেছে দুহাতে আর ঠোঁটের কোমল বাঁধনে। মিশুর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, মেঘালয় ওকে আবার ভাসিয়ে তুললো পানির উপরে। মেঘালয়ের গায়ের উপর ভর দিয়েই মাথাটা উপরে তুলে হাফাতে লাগলো মিশু। ঘনঘন নিশ্বাস নিতে লাগলো। মিশু চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। এতক্ষণ মেঘালয় ঠিক কি কি করেছে বুঝতে পারেনি ও। কিন্তু কেবলই মনেহচ্ছে, এত সুখ সুখ লাগে কেন!
মেঘালয় মিশুর মুখের উপর নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললো, “ঠিক আছো?”
মিশু কথা বলতে পারলো না। মেঘালয় তীরে এনে ওকে পুলের শানের সাথে ঠেস দিয়ে দাড় করিয়ে দিয়ে মিশুর দুই পা নিজের দুই কাঁধের উপর তুলে নিলো। মেঘালয়ের কাঁধের উপর পা তুলে দিয়ে দুহাতে ওকে হালকা করে ধরে রইলো মিশু। মাথাটা ভেসে আছে পানির উপরে। মিশু চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে সাদা মেঘের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে আর প্রাণভরে নিশ্বাস নিচ্ছে। মেঘালয় দুহাতে ওকে আকড়ে ধরে আছে, আর ও দুইপা মেঘালয়ের কাঁধের উপর তুলে দিয়ে আরামে পানির উপর শুয়ে আছে।
স্বাভাবিক হওয়ার পর মেঘালয় বললো, “কেমন লাগছে মেঘবতী?”
মিশু এগিয়ে এসে মেঘালয়কে জড়িয়ে ধরে ওর রোমশ বুকে নাক ডুবিয়ে বললো, “আগে জানতাম দম বন্ধ হয়ে আসলে মানুষের কষ্ট হয়। কিন্তু দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতিটাও সুখের হতে পারে এটা আজ প্রথম জানলাম। এত সুখ সুখ লাগে কেন মেঘ?”
মেঘালয় শক্ত করে মিশুকে জড়িয়ে ধরে রইলো। মিশুকে পিঠের উপর নিয়ে পুরো পুল সাতরিয়ে আসলো একবার। মিশু পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারো ওকে নিয়ে জলের ভেতর ডুব দিলো মেঘালয়। মিশু সমস্ত শরীর ছেড়ে দিয়ে আলগা হয়ে পুরো ভরটাই মেঘালয়ের উপর দিয়ে দিয়েছে। মেঘালয় ওর কোমল দেহটাকে নতুন নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করে দিয়েছে। মিশুর কেবলই মনেহচ্ছে সে স্বপ্নের রাজ্যে ভাসছে।
এভাবে কতক্ষণ চলে গেলো কেউই বলতে পারেনা। মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে যখন তীরের দিকে আসলো তখন ও মিশুর চোখ বন্ধ। মেঘালয় মিশুর মুখটা একহাতে ধরে বললো, “মিশু, আমি কি অন্যায় করে ফেলেছি?”
মিশু মেঘালয়কে জাপটে ধরে বললো, “আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না বলে দিচ্ছি। তুমি আমাকে ফেলে কক্ষনো মুহুর্তের জন্যও দূরে যাবেনা।”
মেঘালয় হেসে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। বললো, “যাবো না রে পাগলী। ছেড়ে গিয়ে এত ভালোবাসবো কাকে?”
মিশু আস্তে আস্তে চোখ মেললো। এখনো ওর চোখে ঘোর, মায়া! ওর চোখের দিকে তাকালেই তো খুন হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয় মেঘালয়ের।
মিশু একা উঠতে পারলো না। মেঘালয় টেনে তুললো ওকে। তারপর আবারো ওকে কোলে নিয়ে বাসার ভিতরে গিয়ে ঢুকলো। বাথরুমে মিশুকে ঢুকিয়ে দিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে দিলো।
মিশু ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে দেখে মেঘালয় একটা ব্লাক শার্ট ও প্যান্ট পরে বডি স্প্রে দিয়ে একদম জেন্টলম্যান সেজে বসে আছে। কে বলবে এই ছেলেটা একটু আগে কি পরিমাণ ভালোবাসার অত্যাচার চালিয়েছে ওর উপর? মিশু এসে বিছানার উপর বসতেই অনেক দূর তলিয়ে গেলো। এত সফট বিছানায় কিভাবে কেউ ঘুমায় ভাবতে পারেনা ও।
মেঘালয় একটা শাড়ি ও ব্লাউজ এনে দিয়ে বললো, “এটা পড়ে নাও।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “কোথায় পেলে এটা? কার শাড়ি?”
মেঘালয় প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ওকে যত্ন করে শাড়ি পড়িয়ে দিলো। মিশু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা সাজুগুজু করে নিলো। ব্লাউজটা একদম ফিট হয়ে গেছে। ও বারবার জানতে চাইছে এটা কার বাড়ি? বাড়িতে কোনো লোকজন নেই কেন? মেঘালয় কোনো প্রশ্নের উত্তর ই দিলোনা। শুধু হাসলো।
মিশু সাজুগুজু করে সোফার উপর বসে রইল চুপ করে। মেঘালয় আলমারি খুলে কি যেন দেখছে। বিছানার উপরে অনেক গুলো টাকা রাখলো। মিশু হা করে চেয়ে আছে সেদিকে। মেঘালয় একটা রুমালের মত মাফলার জাতীয় কিছু গলায় বেধে বললো, “দাগ গুলো দেখা যাচ্ছে?”
– “না।”
মেঘালয় একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। এমন সময় দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। মেঘালয় মিশুকে রুমেই বসতে বলে দরজা খুলতে চলে গেলো। মিশু একাই বসে রইলো চুপচাপ। রুমটা অনেক সুন্দর, শুভ্রতা ছেয়ে আছে পুরো রুমে। কার বাড়ি এটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না ও।
মেঘালয় এসে মিশুর হাত ধরে ওকে বসার ঘরে নিয়ে আসলো। বসার ঘরে একজন মধ্যবয়স্ক লোক ও মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। ওনারা এইমাত্র অফিস থেকে ফিরলেন সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মেঘালয় মিশুকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, “তোমাদের পুত্রবধূ।”
মিশুর চোখ কপালে উঠে গেলো কথাটা শুনে। তারমানে এনারা মেঘালয়ের বাবা মা! আর এত বিশাল আর সুন্দর বাড়িটা মেঘালয়ের নিজের! অবিশ্বাস্য লাগছে সবকিছু। মেঘালয় তো বলেছিলো এখনি বাসায় বিয়ের কথা জানাবেই না। তাছাড়া এটা কিভাবে ওর বাড়ি হতে পারে! সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
চলবে..

অনুভূতি
পর্ব ২৩
মিশু মনি
.
৩৬.
মেঘালয় বলল, “ইনি হচ্ছেন আকাশ আহমেদ, আমার একমাত্র বাবা, আর ইনি হচ্ছে মিসেস আহমেদ,আমার গর্ভধারিণী মা।”
বলেই বাবা মায়ের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর বললো, “আর আমি হচ্ছি তাদের একমাত্র ছেলে,মেঘালয় আহমেদ।”
মিশু মেঘালয়ের বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। মেঘালয়ের মা অবাক হয়ে একবার মিশুর দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার তাকাচ্ছেন ওনার স্বামীর দিকে। মেঘ কি বলছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না। উনি মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই বিয়ে করে ফেলেছিস? সত্যি বিয়ে করেছিস? আমাদের না জানিয়ে?”
মেঘালয় হেসে জবাব দিলো, “আম্মু, তোমার জন্য এই পুতুলটাকে পছন্দ করে এনেছি। দেখো তো ভালো লাগে কিনা? তোমার ভালো লাগলে তবেই না বিয়ে পর্যন্ত আগাবো তাইনা? কি করে ভাবলে তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলবো?”
আম্মু মেঘালয়ের কান টেনে ধরে বললেন, “পাজি ছেলেটা। এভাবে বললে ভয় লাগে না? এই মেয়েটাকে দেখার জন্যই রোজ রোজ সুপার শপে যাওয়া হতো তাইনা?”
– “উম আম্মু। কানটা ছাড়ো, লাগছে তো।”
– “লাগুক, সুপার শপে এত সুন্দর পুতুল পাওয়া যায় আমার তো জানা ছিলোনা।”
মিশু হাসলো। মেঘালয় কত সুন্দর সবকিছু সামাল দিলো। এখন যদি মিশুকে ওনাদের পছন্দ হয় তাহলে তো বিয়ের ব্যবস্থা ওনারাই করবেন। মিশু তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। যদি বিয়ের কথাটা সরাসরি বলতো তাহলে মা অনেক কষ্ট পাবেন সেটা ওনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তখন ওনাদের আচরণ এরকম নাও হতে পারতো।
ওর বাবা মিশুকে কাছে টেনে নিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। মিশুকে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম কি তোমার মা?”
– “মিশু মনি।”
-“দেখতেও খুকি খুকি,নামটাও খুকি খুকি।”
মেঘালয় বললো, “আব্বু ওর স্বভাব,আচরণ সবই বাচ্চা স্বভাবের। ছেলেমানুষি ভাবটা এখনো যায়নি।”
মিশু লজ্জা পেলো খুব। মেঘালয় মাকে জাপটে ধরে বললো, “আমি কি তোমাকে না জানিয়ে বিয়ে করতে পারি বলো? আমিতো জানি, আমি বিয়ে করতে চাইলে তুমি নিজেই বিয়ে পড়িয়ে দিবে।”
মা ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “হুম আমার লক্ষী ছেলেটা। বউ তো পছন্দ হয়েছে,এবার তবে বিয়ের আয়োজন করি?”
মেঘালয় অবাক হয়ে বললো, “সেকি! এত তাড়াতাড়ি কেন?”
– “তোকে পর্বত থেকে দূরে রাখার এই একটাই উপায়।”
মেঘালয় মায়ের কোলে মাথা রেখে বললো, “সেজন্য এই বাচ্চা ছেলেটাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাইছো? বিয়ে হলেই তো আমি পর হয়ে যাবো। তখন মিশু আমাকে তোমার কাছে ঘেষতেই দেবেনা।”
মিশু ক্ষেপে বললো, “আমি দিবো না? এখন কি দিচ্ছি না? আমার উপর একদম দোষ চাপাবেন না বলে দিচ্ছি।”
মিশু গিয়ে মেঘালয়ের মায়ের পাশে বসলো।বললো, “আপনার ছেলেটা আমাকে মিছেমিছি দোষ দিচ্ছে। আমাকে দেখে কি আপনার ডাইনি মনেহয়? রাক্ষসী রানী কটকটির মত আমার চেহারা?”
মা মিশুর এমন সরলতা দেখে মুগ্ধ হলেন। উনি মিশুর গাল টেনে দিয়ে বললেন, “গালদুটো কি গোলাপি! বাচ্চাদের মতন। এই পুতুলটাকে পেলি কই মেঘ?”
বলেই উনি মিশুকে আদর করে দিলেন। মিশুও ওনার আদর পেয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। ভাগ্যিস মেঘালয় বাসায় বিয়ের কথাটা জানায় নি। জানালে হয়ত এখন যেমন মিশুকে আদর করে বুকে টেনে নিয়েছেন, তখন সেটা করতেন না। বরং খুব আঘাত পেয়ে দূরে সরিয়েও দিতে পারতেন। মেঘালয়ের বুদ্ধি আছে বলতে হবে। কিভাবে সবকিছু সামলে নিলো!
মেঘালয় উঠে গিয়ে ওর বাবার পাশে বসলো। বাবা ওর কানে কানে বললেন , “রাতে কি এখানেই ছিলি নাকি?”
মেঘালয় ফিসফিস করে জবাব দিলো, “না, সায়ানের বাসায় ছিলাম। বলেছি তো।”
বাবা আবারো ফিসফিস করে বললেন , “আমাদেরকে হুট করেই এখানে আসতে বললি তাই ভাবলাম, হয়ত ওকে নিয়ে এখানেই থাকিস। তা, বিয়ে টিয়ে করে ফেলিস নি তো?”
– “ধুর আব্বু, কি যে বলোনা।”
– “বিয়ে ছাড়াই একসাথে থাকিস? কিভাবে সম্ভব?”
মেঘালয় অবাক হয়ে বললো, “মানে! একসাথে থাকবো কেন?”
বাবা ফিসফিস করে বললেন, “গলায় দাগ দেখতে পাচ্ছি। মাফলার সরে গিয়ে কামড়ের দাগ উঁকি দিচ্ছে।”
মেঘালয় কাশি দিয়ে উঠলো। গলার মাফলারটা ঠিক করে কাশতেই লাগলো। বাবার হাতে ধরা খেয়ে গেলো একদম। কি লজ্জার ব্যাপার! লজ্জায় মাথা তুলতে পারলো না ও। বাবার কানেকানে বললো, “একটু আধটু তো এমন হয়ই আব্বু। বোঝো না?”
– “হা হা হা, সবই বুঝি। ঠোঁট দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
মেঘালয়ের ইচ্ছে করলো লজ্জায় এক ছুটে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পালিয়ে যায়। বাবার সাথে সবসময়ই ও খুব ফ্রি। তাই বলে এভাবে লজ্জায় পড়তে হবে ভাবেনি কখনো। বাবা বললেন , “লিভ টুগেদারের চিন্তা ভাবনা ভূলেও করিস না। বিয়ের ইচ্ছে হলে বলিস। মেয়ে পছন্দ হয়েছে খুব, আমাদের এনাফ সেবা যত্ন করতে পারবে। অনেক ভালো একটা মেয়ে।”
মেঘালয় বাবার কানেকানে বললো, “তোমাদের সেবা যত্ন করতে পারলেই হলো? আমার পারবে কিনা সেটাও দেখতে হবে তো।”
বাবা মেঘালয়ের মাথায় একটা চাটি মেরে বললেন, “আপনার চেহারায় যে পরিমাণ আলো ঝিকমিক করছে, তাতে আমাদের কিছু বুঝতে বাকি নেই।”
– “আব্বু, প্লিজ আর লজ্জা দিওনা। আমার পছন্দ কেমন সেটা বলো?”
– “তোর পছন্দের উপর আমার ষোলআনা নির্ভরতা আছে। যেটা খাটি তুই সেটাই নিবি আমি জানি। তবে ভেবেছিলাম মেকাপ আর লিপস্টিক মাখা কোনো হাই লেভেলের মডার্ন মেয়েকে দেখবো,কিন্তু এ তো দেখছি একেবারে ন্যাচারাল বাঙালী মেয়ে।”
– “আমার পছন্দ বাবা।”
এতক্ষণ দুই বাবা ছেলে ফিসফিস করে কথা বলছিলো। মিশু আর ওর মায়ের মধ্যে ইতিমধ্যে ভাব জমে গেছে। মেঘালয় সেদিকে তাকিয়ে ওর বাবাকে বললো, “আব্বু মিশুর একটা থাকার জায়গা লাগবে। এ শহরে ওর থাকার কোনো জায়গা নেই। এখন দায়িত্ব তোমার কাছে ট্রান্সফার করলাম, তুমি কি করবা করো।”
– “তোর প্রেমিকা কোথায় থাকবে সেই চিন্তা আমার কেন? সিস্টেমে বিয়ের কথা বলছিস সেটা বুঝতেই পারছি।”
বলেই বাবা হেসে উঠলেন। মেঘালয় ও হাসতে হাসতে বললো, “আব্বু, খুব মজা নিচ্ছো? সিরিয়াসলি শোনো,আমরা তো কেউ এ বাড়িতে থাকিনা। আমাদের এখানে আসতে আরো মাস ছয়েক দেরি হবে। এতদিন ও এখানেই থাকুক না।”
বাবা একটু কি যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, “থাকতে পারে। কিন্তু একা একা এখানে কিভাবে থাকবে? ওর ফ্যামিলি কোথায়?”
– “কেউ নেই ওর। এখন আমি আর তোমরাই ওর সব।”
– “ওহ আচ্ছা, তাহলে এখানেই থাকুক। একটা কাজের লোকের ব্যবস্থা করে দিস। সে দেখাশোনা করবে।”
মেঘালয় বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “উফফ আব্বু, ভালোবাসি তোমাকে। আম্মুকে বুঝিয়ে বলো ব্যাপার টা।”
– “সে না হয় বলবো। এখন লাঞ্চ করবো কি বাইরে? নাকি খাবার নিয়ে আসবি?”
– “বাইরে লাঞ্চ করবো। লাঞ্চ করে আমরা একটু বের হবো। আর আজকে রাতে আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেল মিলে সিলেট যাচ্ছি। কয়েকটা দিন থেকে আসবো, তুমি একটু সবকিছু সামলে নিও আব্বু প্লিজ।”
বাবা আবারো মেঘালয়ের কানের কাছে এসে বললেন , “বন্ধু বান্ধব মিলে যাচ্ছো? নাকি হানিমুনে যাচ্ছো?”
মেঘালয় ক্ষেপে গিয়ে বললো, “খুব মজা নিচ্ছো। দেখো, নিরীহ পেয়ে আমার সাথে এভাবে মজা নিবা না।”
– “নিরীহ? হা হা হা।”
বাবা হাসতে লাগলেন। মেঘালয় ও হাসছে মুখ টিপে। এদিকে মিশু আর মা কিসব ব্যাপার নিয়ে যেন আলাপ করছে। হয়ত মিশুর ফ্যামিলি আর পড়াশোনা এসব ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছেন। মেঘালয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। বাবা মায়ের উপর ওর ভরসা ছিলো যে তারা ওর পছন্দকে গুরুত্ব দিবেন। আর নিজের উপর এতটুকু ভরসা ছিলো যে,সবকিছু ঠাণ্ডা মাথায় সামলাতে পারবে। মিশুকে যে কেউ পছন্দ করবে সেটার জন্য ওর প্রতি ষোলআনা ভরসা করা যায়। সবাইকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পারে ও। ফাইনালি, বাসার ঝামেলাটা মিটে গেলো কোনোরকম জটিলতা ছাড়াই! উফফ!
বাবা উঠে করিডোর দিয়ে হাটতে হাঁটতে অন্যদিকে গেলেন। আম্মুকেও সাথে নিয়ে গেলেন। মেঘালয় এই সুযোগে একটু এগিয়ে এসে মিশুর কাঁধে মুখ গুঁজে বললো, “এখন থেকে এই বাড়িটা তোমার।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “আমার মানে!”
– “তুমি এখানেই থাকবা।”
– “এটা কার বাড়ি?”
মেঘালয় মিশুকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, “আমি ভার্সিটিতে উঠেই আব্বুর সাথে একটা বিজনেস শুরু করেছিলাম। যদিও আব্বুই সব সামলায়, আমার শুধু শেয়ার ছিলো। ওই বিজনেস থেকে একটা পয়সাও কখনো নেইনি,সবটাই জমিয়ে রেখেছিলো। সেটার টাকায় এই বাড়িটা কিনেছি। আমার বোন তো ইউল্যাবে পড়ে,ওর ক্যাম্পাস ওই বাসা থেকে কাছে। সেজন্যই এখানে থাকা হয়না।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “কত্ত বুদ্ধি তোমার! সবকিছু সামলাও কিভাবে?”
মেঘালয় মাথায় আঙুল দিয়ে বললো, “এই মগজের খেলা সব। আজকে বাবার এতদূর আসার পিছনে আব্বুর ব্রেইনটাই কাজ করেছে। আব্বুর ফ্যামিলি’র অবস্থা ভালো ছিলোনা।”
– “আমি কি একাই থাকবো এখানে?”
– “ভেবেচিন্তে কাউকে ঠিক করে দেবো, সে বাসার কাজ করতে তোমাকে হেল্প করবে। আর আমিতো প্রায়ই আসবো।”
– “তুমি যখন আসবা, যাবা, পাবলিক তখন দেখবে না?”
– “নাহ। আমিতো রাতের অন্ধকারে আসবো আমার বউয়ের কাছে।”
বলেই মিশুর গলায় মুখ গুঁজে দিলো। মিশু বললো, “তুমি আসলেই খুব খারাপ। তোমার মাথায় খুব শয়তানি বুদ্ধি কিলবিল কিলবিল করে।”
মেঘালয় হো হো করে হেসে উঠলো। মিশুকে জাপটে ধরে বললো, “কয়েকটা দিন যাক, আব্বু আম্মু নিজে থেকেই আমাকে তোমাকে বিয়ে করতে বলবে। সেজন্যই সিস্টেমে ওদের সাথে দেখা করিয়ে দিলাম। আমাদের ওই বাড়িতে দেখা করালে আব্বু আম্মুর কাছে স্বাভাবিক লাগতো সবকিছু। যেহেতু তাদেরকে এখানে ডেকে এনেছি, এখন ওনারা চিন্তা ভাবনা করবেন আমাদেরকে নিয়ে।”
– “কি বুদ্ধি! তুমি চাইছো ওনারা নিজে থেকে বিয়ের ব্যবস্থা করুক? তুমি তাদেরকে বলবা না?”
– “এইতো বুঝেছো। আমি চাচ্ছি আব্বু আম্মু নিজে থেকে আমাকে বলুক বিয়েটা করে ফেলতে। আর তারা যেন নিজে থেকে তোমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে রাখে। এখানে একা একা ফেলে রাখবে না কখনো, আব্বু দায়িত্ববোধ ব্যাপার টা খুব মেনে চলে।”
মিশু মেঘালয়ের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো, “তোমার মাথায় খুব কুটনি বুদ্ধি। কুটনি বুড়া একটা।”
– “হা হা হা। আর তুমি কুটনি বুড়ি।”
– “তুমি বাবা মায়ের সাথে দেখা করাবে বলোনি কেন?”
– “হুট করেই তাদের সামনে দাড় করালে তোমাকে কতটা নার্ভাস লাগে,সেটা দেখার জন্য। মজা লাগছিলো।”
মিশু মেঘালয়ের বুকে দুটো কিল বসিয়ে দিয়ে বললো, “সাধে কি বলি তুমি খুব খারাপ? আমি নার্ভাস হচ্ছিলাম আর তুমি মজা পাচ্ছিলে সেটা দেখে। অবশ্য আমি একদম সারপ্রাইজড! এই বাড়ি, তোমার রুমের সৌন্দর্য, সুইমিংপুল, ফাইনালি বাবা মায়ের সাথে দেখা করা, সবটাই আমার জন্য গ্রেট সারপ্রাইজ ছিলো। যদিও প্রথম থেকেই তুমি আমাকে সারপ্রাইজড করে দিচ্ছো।”
মেঘালয় হাসলো। মিশুর মুগ্ধ চোখ দেখতে ওর খুবই ভালো লাগে। সেজন্যই সারপ্রাইজ দিতে চেষ্টা করে ও। মুগ্ধ হলে মিশুর চেহারায় একটা পবিত্র ভাব চলে আসে যেটা মেঘালয়কেও মুগ্ধ করে দেয়। সেজন্যই তো এতকিছু করা!
মিশু বললো, “সেই কবে থেকেই শুধু সারপ্রাইজ দিচ্ছো। একজন সেলিব্রেটি এত সহজে কারো সাথে মিশতে পারে সেটা জানতাম না। আর তুমি আবার আমার মত সরল একটা মেয়ের প্রেমে পড়লে। এ সবই সারপ্রাইজ! তুমি গান গাও সেটা জানতাম না, তুমি বিজনেস করো সেটাও জানতাম না। সত্যি আমি এতবার অবাক হই যে অবাক হতে হতে একবার দুম করেই হয়ত হার্ট এটাক হয়ে যাবে আমার।”
মেঘালয় হেসে বললো, “তোমার মুগ্ধতা আমাকে মুগ্ধ করে মিশু পাগলী, তোমার সরলতা আমাকে আকৃষ্ট করে।”
– “এখন ছাড়ো, আব্বু আম্মু এসে পড়বে। তুমি না বলেছিলে আমার চুলের একটা গল্প আছে। সেটা বলো।”
– “সেটা আরেকদিন বলবো।”
মেঘালয় মিশুকে ছেড়ে দিয়ে ভদ্রছেলের মতন সোজা হয়ে বসলো। আব্বু আম্মু চলে আসলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। মিশুর সাথে বসে অনেক্ষণ গল্প করলেন ওনারা। তারপর সবাই একসাথে বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। রেস্টুরেন্টে একসাথে দুপুরের খাবার খেয়ে বাবা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিলো মেঘালয়। গাড়িটা সিলেটে নিয়ে যাবে, কিছুদিন থাকতে হবে এছাড়াও অনেক ব্যাপার নিয়ে কথা হলো। বাবার কাছে চাওয়ার আগেই তিনি বেশ কিছু টাকা দিয়ে দিলেন মেঘালয়ের হাতে। মেঘালয় আব্বুকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলো।
মিশুকে নিয়ে মার্কেটে এসে দুটো ড্রেস কিনলো ওর জন্য। একটা শাড়ি,দুটো কামিজ,গেঞ্জি, প্যান্ট এসব কিনে নিয়ে সায়ানদের বাসায় ফিরলো। মিশু একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর এখন চিন্তা হচ্ছে মেঘালয়কে নিয়ে। ছেলেটাকে যত সময় যাচ্ছে,ততই ওর রহস্যময় লাগছে। মেঘালয়ের চোখেও রহস্য খেলা করে। মিশু ভেবেছিলো মেঘালয় ধনী পরিবারের সন্তান,কিন্তু এতটা ধনী সেটা কল্পনাও করেনি। এতকিছু থাকার পরও সে নেভারল্যান্ডে যাওয়ার সময় সিএনজিতে কেন নিয়ে গেলো? তার নিজেরই তো গাড়ি আছে। সবসময় পলওয়েল কারনেশনের মত শপিং কমপ্লেক্সে সে কেনাকাটা করে, বড়বড় মার্কেট গুলোতেও দেখি সবাই ওকে চেনে। সে কেনই বা মিশুর শপে রোজ রোজ গিয়ে হাজির হতো? মাঝরাতে স্টেশনে হাটাহাটি করা, দুম করেই ট্রেনে গিয়ে ওঠা এগুলো তো বাচ্চাদের কাজ। মেঘালয় কেন এসব করে! রহস্য রহস্য! ছেলেটাকে এখন বড্ড রহস্যজনক লাগছে। মিশু গালে হাত দিয়ে ভাবছে মেঘালয়কে নিয়ে। যে বাড়িতে নিয়ে গেলো সেটা তো ফাঁকাই ছিলো, তবুও সায়ানদের বাসায় বিয়ে পড়ালো। এত এত প্রশ্ন মিশুর মাথায় জড়ো হচ্ছে যার কূলকিনারা কিছুই খুঁজে পাচ্ছেনা ও।
চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here