অব্যক্ত ভালোবাসা পর্ব -০৩ || আরভি আহিয়াদ তিহু

#অব্যক্ত_ভালোবাসা
#লেখনীঃআরভি_আহিয়াদ_তিহু
#প্রথম_পরিচ্ছেদ
#পর্বঃ3

–“এটাই প্রথম বার না। আয়াশ এর আগেও অনেক বার আমার গায়ে হাত তুলেছে। ওর সাথে রিলেশনে থাকাকালীন সময়ে ‘ও’ ছোট্ট ছোট্ট বিষয় নিয়ে রেগে গিয়ে আমাকে মারধোর করত। ইনফ‍্যাক্ট রাগের বশে একবার আমাকে রেপ করারও চেষ্টা করেছিল। তারপরেই আমি ওর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ করে ফেলি। শুধু তাই না, আয়াশ এর আগেও অনেক মেয়ের সাথে এরকম টা করেছে। ওর শর্ট টেম্পারের জন‍্যে ‘ও’ ওর আগের গার্লফ্রেন্ড গুলোর উপরেও এভাবে টর্চার করত। ওরা আয়াশের টর্চার সহ‍্য করতে না পেরে বাধ‍্য হয়ে ওর সাথে ব্রেকআপ করে ফেলেছে। আমিও বাধ‍্য হয়ে নিজের প্রান বাঁচাতে ওর থেকে দূরে সরে এসেছি।”

কথাগুলো বলতে বলতে জার্নালিস্টদের সামনে দাড়িয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল ইতি। এতক্ষণ ধরে ইতির এসব মিথ‍্যা কথা শুনতে শুনতে আয়াশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। ‘ও’ রাগে বসা থেকে দাড়িয়ে টিভির দিকে এগিয়ে এসে ওটাকে তুলে জোরে ফ্লোরে আছাড় মারল। চোখের পলকের মধ‍্যে টিভির স্কিনের কাচগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। রোহান ভয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলল। আয়াশ চেঁচিয়ে বলল,

–“আজকে হয় ওই মেয়ে বেঁচে থাকবে, নাহলে আমি বেঁচে থাকব। কতবড় সা*হ*স আমার নামে মিথ‍্যা কথা বলে? আজকে তো ওকে আমি জ‍্যা*ন্ত কব*রের মধ‍্যে ঢোকাব।”

কথাটা বলে আয়াশ গটগট করে সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে চলে গেল। রোহান পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বিরবির করে বলল,

–“এক্ষুনি রুশানি ম‍্যামকে কল করতে হবে। নাহলে আবার একটা অনর্থ ঘটে যাবে।”

বলতে বলতে রোহান রুশানির নম্বরে ডায়াল করল। এরমধ‍্যেই রুশানি হন্তদন্ত হয়ে বাসার দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। রোহান ফোনটা কেটে দিয়ে পকেটে রেখে রুশানির দিকে এগিয়ে গেল। রুশানি বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে বলল,

–“আয়াশ কোথায়? ‘ও’ কি ইতির ইন্টারভিউ টা দেখেছে?”

কথাটা বলতে বলতে রুশানির চোখ গেল ফ্লোরে পড়ে থাকা ভাঙ্গা টিভিটার উপর। ওটা দেখেই ওর যা বোঝার ‘ও’ বুঝে গেল। রোহান অসহায় দৃষ্টিতে রুশানির দিকে তাকাল। রুশানি আতঙ্কিত কণ্ঠে আবারও প্রশ্ন করল,

–“আয়াশ কোথায়?”

রোহান চোখ দিয়ে উপরের দিকে দেখিয়ে দিল। রুশানি এক মিনিটও সময় নষ্ট না করে ছুটে গেল উপরের দিকে। ওর পিছনে পিছনে রোহানও গেল। ওরা গিয়ে আয়াশের রুমের সামনে দাড়াতেই আয়াশ হাতে একটা রিভলবার নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুশানি গিয়ে খপ করে আয়াশের হাত ধরে বলল,

–“এটা নিয়ে তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

আয়াশ অগ্নি দৃষ্টিতে রুশানির দিকে তাকিয়ে বলল,
–“তোকে জানতে হবে না। আমার হাত ছাড়।”

রুশানি শক্ত কণ্ঠে বলল,
–“না ছাড়ব না। তুই আগে মাথা ঠাণ্ডা করে আমার কথা শোন। তারপর যা করার করিস।”

আয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“হাতটা ছাড় রুশ, নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

রুশানি ত‍্যাড়া কণ্ঠে বলল,
–“না ছাড়ব না। আমি হাত ছেড়ে দিলে তুই রাগের বশে আবারও একটা ভুল করে ফেলবি। আর আমি সেটা কিছুতেই হতে দিব না।”

আয়াশ রাগে ফুশতে ফুশতে বলল,
–“শেষ বারের মতো বলছি রুশ, আমার হাতটা ছাড়। আমাকে যেতে দে।”

–“ছাড়ব না। তুই এখান থেকে কোথাও যেতে পারবি না।”

রুশার ত‍্যাড়া কথা শুনে আয়াশ এবার গায়ের জোরে ঝাড়া মেরে রুশানির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। আকষ্মিক ঘটনায় রুশানি টাল সামলাতে না পেরে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে গেল। ওর পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে আয়াশ ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাল। রুশানিকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে ‘ও’ নিজেও বেক্কল হয়ে গেল। ধাক্কাটা এতটা জোরে লাগবে সেটা আয়াশ একদমই বুঝতে পারেনি।
_________________________
বিকাল 4:25

পার্কের বেঞ্চের উপরে মুখ ভার করে বসে আছে রুশানি। আয়াশ সেই কখন থেকে ওকে বারবার সরি বলে যাচ্ছে। কিন্তু রুশানি ভুলেও আয়াশের দিকে তাকাচ্ছে না। ওই সময় পড়ে গিয়ে রুশানির কপাল ফেটে গিয়েছিল। সেটা দেখে আয়াশ তড়িঘড়ি করে ওকে নিয়ে হসপিটালে আসে। ডাক্তার জানায় তেমন কিছু না, সামান‍্যই কেটেছে। এটা ব‍লে কাটা জায়গায় ছোট্ট একটা অনটাইম ব‍্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়। তখন থেকেই রুশানি আয়াশের সাথে কথা বলছে না। কথা বলা তো দূরে থাক, একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না। তাই ওর রাগ ভাঙানোর জন‍্যে আয়াশ ওকে এখানে নিয়ে এসেছে।

আয়াশ একটু সময় চুপ থেকে কিছু একটা ভাবল। তারপর হুট করেই বলে উঠল,

–“রুশ ফুচকা খাবি? তুই না রোড সাইডেড ফুচকা ভিষন পছন্দ করিস? চল ফুচকা খাই।”

আয়াশের কথা শুনে রুশা সরু দৃষ্টিতে আয়াশের দিকে তাকাল। যে ছেলে এতদিন ফুচকার নাম শুনলেই নাক-মুখ কুচকে ফেলত, সে কিনা আজকে সেধে সেধে ফুচকা খেতে চাচ্ছে? এটাও সম্ভব? রুশানি কিছু বলছে না দেখে আয়াশ নিজেই বলল,

–“আচ্ছা তুই বস। আমি এক্ষুনি যাব, এক্ষুনি আসব।”

বলেই আয়াশ উঠে চলে গেল। ওরা যে জায়গাটায় বসে ছিল সেখান থেকে কিছুটা দূরেই এক লোক ফুচকা, ঝালমুড়ি, চটপটি এসব বিক্রি করছে। আয়াশ হাঁটতে হাঁটতে সেই লোকটার স্টলের কাছে গিয়ে দাড়াল। তারপর লোকটাকে দুই প্লেট ফুচকা বানাতে বলে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফোন টিপতে লাগল। কিছু সময় অতিক্রম হতেই আয়াশের ফোনে একটা আন-নন নম্বর থেকে কল আসলো। আয়াশ বেশি কিছু না ভেবেই ফোনটা রিসিভ করল। রিসিভ করে কানে ধরার সাথে সাথে কেউ বলে উঠল,

–“হাই ব্রো, কি খবর?”

আয়াশ চওড়া কণ্ঠে বলল,
–“হু আর ইউ?”

আয়াশের প্রশ্ন শুনে ওপাশের লোকটা শব্দ করে খানিক হাসল। তারপর কিছুটা বিদ্রুপের স্বরে বলল,

–“নিজের চির শত্রুর গলার স্বরটা এভাবে ভুলে গেলেন মিঃ আয়াশ? আপনার জায়গায় আমি থাকলে তো ফোনের ওপাশ থেকে গন্ধ শুকে চিনে ফেলতাম নিজের শত্রুকে।”

লোকটার কথায় আয়াশ বিরক্ত হলো। কপালে ভাজ ফেলে বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলল,

–“হেয়ালি না করে বলুন আপনি কে? আর নাহলে ফোন রাখুন।”

ওপাশের ব‍্যাক্তির কণ্ঠস্বরটা এবার ভারি হয়ে গেল। সে গম্ভীর স্বরে বলল,

–“চিনতে যখন পারলেন-ই না, তখন পরিচয় দিয়ে আর লাভ নেই। শুধু জেনে রাখুন আপনার পাখি এখন আমার খাঁচায় বন্ধি। আপনি চাইলেও কখনো আর সেটা ফেরত পাবেন না।”

আয়াশ কিছু বুঝতে না পেরে বলল,
–“মানেহ?”

ফোনের ওপাশের ব‍্যাক্তিটা স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
–“মানে আপনার প্রান প্রিয় বেস্ট ফ্রেন্ড রুশানি এখন আমার কাছে আছে। তাকে আমি সারা জীবনের জন‍্যে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলাম।”

ব‍্যাক্তিটার কথা শুনে আয়াশের বুকের মধ‍্যে ধুক করে উঠল। ‘ও’ ছুটে গেল রুশানি যেখানে বসে ছিল সেই বেঞ্চটার দিকে। কিন্তু গিয়ে দেখল সেখানে রুশানি নেই। আয়াশ ব‍্যস্ত চোখে আশেপাশে তাকাল। রুশানি তো দূরের কথা, কোথাও রুশানির ছায়াটাও নেই। আয়াশ চেঁচিয়ে উঠল। রাতে কিড়মিড় করতে করতে বলল,

–“আমার রুশের যদি কিছু হয়েছে তাহলে তোর প্রান বের করে আমি ফুটবল খেলব।”

আয়াশের কথা শুনে ওপাশের ব‍্যাক্তিটি হো হো করে হেঁসে দিল। হাঁসতে হাঁসতে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল,

–“আমাকে কিছু করার যোগ‍্যতা এখনোও আপনার হয়নি আয়াশ। তাই এসব হুমকি দিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। আপনি আপনার রুশকে আর কখনোই ফেরত পাবেন না। আপনি যেভাবে আমার থেকে আমার ভালোবাসা, আমার খুশী কেড়ে নিয়েছেন। তেমনই আমিও আপনার থেকে আপনার সব কেড়ে নিব। প্রথমে রুশানিকে দিয়ে শুরু করলাম। এরপর আপনার ক‍্যারিয়ার, আপনার নাম, আপনার পাবলিসি, আপনার সবকিছু মাটির সাথে মিশিয়ে দিব। তারপর আপনি বুঝবেন পছন্দের জিনিসগুলো হারিয়ে গেলে কেমন লাগে।”

কথাটা বলে ওপাশের ব‍্যাক্তিটি ফোনটা কেটে দিল। আয়াশ কিছুক্ষণ হ‍্যালো হ‍্যালো করে ধপ করে বেঞ্চের উপর বসে পড়ল। ‘ও’ বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে এটা কার কাজ। রাগে আয়াশের সারা শরীর রি রি করছে। ‘ও’ রাগের বশে মাথায় থাকা ক‍্যাপ আর মুখে থাকা মাক্সটা খুলে মাটিতে ছুড়ে মারল। তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

–“কাজটা আপনি ভালো করলেন না মিঃ রায়জাদা। আমাদের শত্রুতার মধ‍্যে আপনার রুশকে টানা একদমই উচিৎ হয়নি। আপনাকে এরজন‍্যে পস্তাতে হবে। আপনি জানেন না, আপনি কতো বড় ভুল করে ফেলেছেন।”
_________________________

রাত 10:00

রুমের আবছা ড্রিম লাইটের আলোতে রুশানিকে বেশ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে কেউ একজন। আস্তে আস্তে রুশানির জ্ঞান ফিরতেই ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল কারো গরম নিঃশ্বাস ওর ঘাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তের মধ‍্যেই যেন রুশানির হৃদস্পদনের গতি বেড়ে গেল। ‘ও’ বহু কষ্টে পিটপিট করে চোখ খুলল। চোখ খুলে পাশে তাকাতেই দেখল ওর ডান পাশে একটা ছেলে কাৎ হয়ে শুয়ে আছে। ছেলেটা রুশানির দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছে। লাল ড্রিম লাইটের আলোতে ছেলেটার এই হাঁসিটা বড্ড বিদঘুটে দেখাচ্ছে। ছেলেটা এক হাত রুশানির গালের উপরে রাখতে নিতেই রুশানি ছিটকে ওর থেকে দূরে সরে গেল। কিন্তু ‘ও’ বেডের একটা সাইডে থাকায় পিছনে সরতে গিয়ে ধপ করে ফ্লোরে পড়ে গেল। মাথার পিছনের অংশটা ফ্লোরের সাথে বারি খেতেই ব‍্যাথায় আর্তনাদ করে উঠল। রুশানির এমন অবস্থা দেখে ছেলেটা হা হা করে হাঁসতে লাগল। রুশানি কোনো রকম নিজেকে সামলে নিয়ে ফ্লোর থেকে উঠে দাড়াল। তারপর নিজের ভয়টাকে চেপে রেখে রাগি কণ্ঠে ছেলেটাকে উদ্দ‍্যেশে করে জিজ্ঞেস করল,

—“কে আপনি? আর এখানে কি করছেন?”

ছেলেটা শোয়া থেকে উঠে লাফিয়ে বেড থেকে নেমে পড়ল। তারপর রুশানির সামনে এসে আবারও দাঁত বের করে হেঁসে বলল,

–“আমি শুভ। তুমি রুশানি, রাইট?”

ছেলেটার প্রশ্নে রুশানি কোনো অ‍্যান্সার দিল না। উল্টে তেজি গলায় বলল,
–“আমাকে এখানে কেনো নিয়ে এসেছেন? আমি এক্ষুনি আমার বাসায় যাব।”

কথাটা বলে রুশানি শুভকে সাইড কাটিয়ে দরজার দিকে যেতে নিলেই শুভ এসে খপ করে ওর হাত ধরে ফেলল। রুশানি অগ্নি দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকাল। শুভ ওর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

–“এখান থেকে তুমি আর কোথাও যেতে পারবে না। তোমাকে তো সারা জীবন এখানেই থাকতে হবে। আমার বউ হয়ে। আমি ভাইকে বলব তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমার তোমাকে চাই।”

রুশানি শুভর হাত থেকে ঝাড়া মেরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর চেঁচিয়ে বলল,

–“এসব ফালতু কথা না বলে আমাকে এখান থেকে যেতে দিন বলছি। নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

শুভ আবারও রুশানির দিকে এগিয়ে এসে বলল,
–“তোমাকে বললাম না, তুমি এখান থেকে কোথাও যাবে না? তুমি আমার সাথে থাকবে। বুঝেছো?”

শুভ কথা বলতে বলতে বারবার রুশানিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে দেখে রুশানি রেগে গেল। ‘ও’ কোনো কিছু না ভেবেই ঠাটিয়ে শুভর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। শুভ গালে হাত দিয়ে হিংস্র দৃষ্টিতে রুশানির দিকে তাকাল। রুশানি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

–“আর একবার যদি আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিস তাহলে আমি তোর ফেইসের স্টাকচার চেইঞ্জ করে ফেলব।”

কথাটা শেষ করতে না করতেই শুভ রুশানীর চুলের মুঠি চেপে ধরল। মেয়েদের বডির সবচেয়ে উইক পয়েন্ট হচ্ছে চুল। একবার যদি কেউ শক্ত করে তাদের চুলের মুঠি চেপে ধরে, তাহলে তাদের সব শক্তি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। রুশানির বেলায়ও তার ব‍্যাতিক্রম হলো না। শুভ ওর চুল চেপে ধরতেই ‘ও’ ব‍্যাথায় কুকিয়ে উঠে দু-হাত দিয়ে নিজের চুলের গোড়া চেপে ধরল। শুভ ওর চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ওর মাথাটাকে জোরে দেড়ালের সাথে বারি মারল। সাথে সাথে রুশানি চিৎকার দিয়ে উঠল। মাথা ফেটে র*ক্ত বের হয়ে ওর ফেসের এক সাইড ভিজে গেছে ইতিমধ‍্যেই। শুভ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে রুশানিকে বেডের উপর ছুড়ে মারল। তারপর নিজেও ঝাপিয়ে পড়ল ওর উপর। রুশানি কোনো উপায় না পেয়ে জোরে কামড় বসিয়ে দিল শুভর হাতে। আকষ্মিক আক্রমণের জন‍্যে শুভ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাই ব‍্যাথা পেয়ে দ্রুত রুশানির উপর থেকে সরে গেল। সেই সুযোগে রুশানি বেড থেকে উঠে দৌড়ে দরজার কাছে গেল। কাঁপাকাঁপা হাতে দরজার লক খুলে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুশানিকে বের হয়ে যেতে দেখে শুভও ছুট লাগল ওর পিছনে।

রুশানি কড়িডোর দিয়ে প্রানপনে ছুটছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে নিজেও জানে না। পুরো বাড়িটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে রয়েছে। কোথায় কি আছে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ দৌড়াতে দৌড়াতে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে ‘ও’ ছিটকে ফ্লোরে পড়ে গেল। সামনের ব‍্যাক্তিটা উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বলল,

–“এতগুলো মানুষ বাইরে দাড়িয়ে আছে অথচ বাসার মধ‍্যের লাইট জ্বালানোর যোগ‍্যতা টুকু কারোর নেই? কোথায় থাকো সবাই? এই সামান‍্য কাজটাও কি এখন আমার বলে করাতে হবে?”

ছেলেটার আওয়াজে পুরো বাড়িটা যেন নড়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই বাসার সব জায়গার লাইট জ্বলে উঠল। রুশানি মাথা উঠিয়ে সামনে তাকাল। ওর সামনে লম্বা একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে। ছেলেটার গায়ে সাদা হুডিওয়ালা জ‍্যাকেট পড়া। মাথায় এত বড় হুডিটা পড়ে থাকার কারনে রুশানি ছেলেটার চেহারা দেখতে পেল না। ছেলেটা রেলিংয়ের উপর দু-হাত রেখে নিচের দিকে তাকিয়ে রাগি কণ্ঠে বলল,

–“কোথায় থাকো সবাই? কোনো কাজ তোমাদের দিয়ে পারফেক্টলি হয় না কেন?”

ছেলেটার কথা শুনে নিচে দাড়িয়ে থাকা লোকদের মধ‍্যে একজন বলে উঠল,

–“আমাদের কোনো দোষ নেই বস। শুভ স‍্যারই আমাদেরকে বলেছে বাসার সব জায়গার লাইট নিভিয়ে দিতে। আর বাসার মধ‍্যে কাউকে আসতে না দিতে।”

লোকটার কথা শেষ হতে না হতেই শুভ দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হঠাৎ ছেলেটাকে দেখে দাড়িয়ে গেল। ছেলেটা একবার রুশার দিকে তাকাল, আরেক বার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকাল। তারপরেই ওর যা বোঝার ‘ও’ বুঝে গেল। শুভ মাথাটা নিচু করে শুকনো ঢোক গিলতে লাগল। ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে শুভর সামনে সটান হয়ে দাড়ল। শুভ ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেল। ছেলেটা শুভকে কিছু বলতে না দিয়েই ঠাসসস করে ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। তারপর দাঁতে দাঁতে চেপে বলল,

–“ভেবেছিলাম একবার আমার হাতের মার খাওয়ার পর একেবারে সুধরে গেছিস। তাই ভরসা করে তোকে একটা কাজ করতে দিয়েছিলাম। কিন্তু তুই প্রমান করে দিলি, কুকুরের লেজ যেমন সোজা হয় না, তেমনই চরিত্রহীন, লম্পটরাও কখনো চেইঞ্জ হতে পারে না।”

ছেলেটার কথা শুনে শুভ বোঝানোর ভঙ্গিতে ছেলেটাকে উদ্দ‍্যেশ‍্য করে বলল,

–“আসলে ভাই তুমি যেমনটা ভাবছো তেমন কিছুই হয়নি। আমি আসলে ওকে……”

শুভকে পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ছেলেটা কঠিন স্বরে বলে উঠল,

–“এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা শুভ। নাহলে কিন্তু আমি ভুলে যাব তুই আমার কাজিন ব্রাদার। আর যদি একবার সেটা ভুলে যাই, তাহলে তোর সাথে ঠিক কী কী হবে সেটা নিশ্চয়ই তুই ভালো করেই বুঝতে পারছিস।”

ছেলেটার কথা শুনে শুভ আর কিছু বলার সাহস পেল না। চোরের মতো মাথা নিচু করে ওখান থেকে চলে গেল। ছেলেটা ফোশ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে রুশানির কাছে এগিয়ে এসে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। রুশানি এতক্ষণ ড‍্যাবড‍্যাব করে তাকিয়ে থেকে সবার কথা শুনছিল। ছেলেটা ওর সামনে আসতেই ‘ও’ ভয়ে খানিকটা নিজেকে গুটিয়ে নিল। রুশানিকে এরকম ভয় পেতে দেখে ছেলেটা হাটু গেড়ে ওর সামনে বসল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,

–“আর ইউ ওকে?”

ছেলেটার কথা শুনে রুশানি চোখ ছোট ছোট করে ছেলেটার দিকে তাকাল। তারপর কিছুটা রাগি স্বরে বলল,

–“দেখছেন মাথা ফেটে গেছে। তারপরেও জিজ্ঞেস করছেন, ঠিক আছি কিনা? আপনার চোখের পাওয়ার লুজ হয়ে গেছে না-কি জন্মগত ভাবেই আপনি রাতকানা?”

রুশানির কথা শুনে ছেলেটা মাথা থেকে হুডিটা সরিয়ে ফেলল। তারপর দুষ্টুমির ছলে বলল,
–“আপনি আর ঠিক হলেন না ডাক্তার সাহেবা। আগের মতোই বিশ্ব ঘাড় ত‍্যাড়া রয়ে গেলেন।”

রুশানি অবাক দৃস্টিতে সামনে বসে থাকা ছেলেটার দিকে তাকাল। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল,

–“মিঃ শান রায়জাদা?”

শান হালকা হেঁসে বলল,
–“যাক এতদিন পরেও আমাকে চিনতে পেরেছেন, এটা ভেবেই ভালো লাগছে।”

রুশানি গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আমাকে এভাবে কিডন‍্যাপ করার কারনটা জানতে পারি মি. রায়জাদা?”

রুশানির প্রশ্নে শান নিজেও গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
–“পুরনো হিসেব নিকেশ এখনো বাকি আছে ডাক্তার সাহেবা। সেগুলো চোকানোর জন‍্যেই আপনাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে ডোন্ট ওয়ারি, আপনি আমার কথা মতো সব কাজ করলে আমি আপনার কোনো ক্ষতি করব না। তবে আমার কথায় যদি আপনি রাজি না হন তাহলে আপনাকে যে আমি শান্তিতে বাঁচতে দিব না, সেটা নিয়ে আপনি 100% সিওর থাকতে পারেন।”

#চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here