অরূপ জ্যোৎস্না পর্ব -২৯

#অরূপ_জ্যোৎস্না
পর্ব-২৯
লেখনীতে-তানিয়া শেখ

পাশা হকের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। বসে পড়ল চেয়ারে। কোমায় স্থবির ছেলের নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন রক্ষী রেখেছিল। সপ্তাহ কয়েক আগে যে দুজনের নাইট ডিউটি ছিল দিনের আলো ফোটার আগে ওরা হাওয়া। প্রথমে ভেবেছিলেন কোথাও মদ খেয়ে পড়ে আছে। কিন্তু চার পাঁচদিন যাওয়ার পরও যখন খোঁজ পাওয়া গেল না তখন চিন্তায় পড়লেন পাশা হক। ওই দুজন তার বিশ্বস্ত লোক না হলে নয় ভাবত পালিয়ে গেছে। ওরা পালাবার মানুষ না। সেই বাল্য বয়স থেকে তার বাড়িতে খেয়ে-পড়ে মানুষ। হক বাড়ির আশ্রয় ছাড়া ওদের আর যাওয়ার স্থান নেই। খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছিল সে। তাই ই ঘটল। এখান থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরের এক নর্দমায় পঁচে গলে ফুলে জনসম্মুখে ভেসে উঠেছে রক্ষী দুজনের লাশ। শ্বাস রোধ করে মেরেছে। চোখ তুলে নিয়েছে। জিহ্বা কাটা। কাজটা কে এবং কেন করল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না পাশা হক। তার শত্রুর অভাব নেই। কিন্তু এতটা নৃশংসতা দেখানোর মতো সাহস ওদের কারো মধ্যেই নেই এখন। তাছাড়া তেমন কারণও খুঁজে পান না যার কারণে এমন কিছু ঘটতে পারে।

চিন্তায় তার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মতো দশা। দশ বা বিশ বছর আগের সে হলে হুঙ্কার দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। গায়ে তখন জোর ছিল, দাপট তো ছিলোই। এখন দাপট যাই থাক গায়ের জোরটা আর তেমন নেই। মনের জোর ভঙ্গুর। একমাত্র পুত্র কোমায়। স্ত্রী সেই শোকে শয্যাশায়ী। পাশা হকের সবটা ফাঁকা। একা সে।

“আপনার কাওকে সন্দেহ হয়, হক সাহেব?” পুলিশ অফিসার জানতে চাইল।
অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে একে একে সকল শত্রুদের কথা তার মনে পড়ে। সন্দেহ সবাইকে করে কিন্তু উপযুক্ত কারণ খুঁজে পায় না। হঠাৎ তার মনে পড়ে সৈয়দদের কথা। ইকরাম আজাদ ও এহসাস আরমান! এই দুটো নাম কী করে ভুলে গেল সে। মানুষ খুন করার রেকর্ড ইকরাম আজাদের নেই। তার ভাতিজার রেকর্ড আবার অন্য রকম। চাচার মতো শান্ত ও অহিংসামন্ত্র জপে না। ঠান্ডা মাথারও না। পিয়াসকে খুন করতে চেয়েছে। এলাকায় ওর সহিংসতা নিয়ে আলাদা অখ্যাতি রয়েছে। পিয়াসের আগে কোনো মানুষ মারার ইতিহাস না থাকলেও মেরে হাত-পা ভেঙে আধমরা করা ওর জন্য নতুন কিছু না। আড়ালে থেকে খুন দুটো ও করল না তো! হয়তো পিয়াসকে মারতে গিয়েছিল হাসপাতালে। রক্ষী দুজন বাধা দিয়েছে বলে ওদের মেরেছে। অসম্ভব কিছু তো না। ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে এখন আরও শঙ্কিত ও বিচলিত হয়ে গেল পাশা হক। এহসাস আরমানকে খুঁজে বের করার তাগাদা নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো প্রয়োজন হয়ে গেল।

“এহসাস আরমানকে আমার সন্দেহ হয়। আমার ছেলেকে মারতে ব্যর্থ হয়ে সেই খুন দুটো করেছে। ওর নামে হুলিয়া জারি করা হোক। ঘোষণা দাও, যে ওকে জীবিত বা মৃত খুঁজে বের করবে তাকে লক্ষ টাকায় পুরস্কৃত করবে এই পাশা হক।

জুয়েলারি শপে দাঁড়িয়ে আছে দুর্জয়। সামনে এই শপের নজরকাড়া দামী সুন্দর সুন্দর ডায়মন্ডের রিংগুলো। মারিয়া একটার পর একটা দেখছে এবং ওকে দেখাচ্ছে। দুর্জয় দেখছে আবার দেখছে না। কেন যেন অসহ্য লাগছে সবকিছু।

“এটা কেমন দেখো তো?” গোলাপি একটা হীরের আংটি দেখাল মারিয়া। দুর্জয় উদাস চোখে দেখল। ছোট্ট করে বলল,

“ভালোই।”

“আর এটা?” আরেকটা তুললো মারিয়া। দুর্জয় আবারও এক জবাব দিলো,

“ভালো।” পরপর আরও কয়েকটা দেখালো। প্রতিবারই দুর্জয়ের গা ছাড়া জবাব। মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে ওকে দেখল। রাগল? ওর জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো রেগে যেত। মারিয়া বিচক্ষণ, শান্ত ও ধৈর্যশীলা। রাগটা ওর সহজে আসে না। ওর ওই স্থির দৃষ্টিতে দুর্জয় বিব্রতবোধ করল। যেন ভেতর পর্যন্ত উঁকি দিতে চাইছে। এই মুহূর্তে আর যা হোক, নিজের ভেতরের গোলযোগ কাওকে বুঝতে দিতে বা দেখাতে রাজি নয় দুর্জয়। অন্তত মারিয়াকে তো নয়।

“এই অনীহার কারণ কি শুধুই বিয়ে নামক সম্পর্কে জড়াতে না চাওয়া না কি অন্য কিছু?”

“জানি না।” শীতল ও নিচু গলায় বলল দুর্জয়। সত্যি ও জানে না। মারিয়া হাঁপ ছাড়ল। একটু চুপ করে একটা ডায়মন্ডের আংটি নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,

“এভাবেই চলবে?”

এর জবাবে চুপ রইল দুর্জয়। মারিয়ার ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে একটা কাঠিন্য এলো। গম্ভীর গলায় বলল,

“ফর গডস সেক দুর্জয় ডোন্ট রুইন মাই লাইফ। আই’ল ইনভলভ মাই ইমোশন ইন দিস ম্যারেজ ইভেন উই ডোন্ট লাভ ইচ আদার। তোমার কোনো অধিকার নেই আমার ফিলিংস নিয়ে খেলা। নাউ বি অ্যা ম্যান অ্যান্ড টেল মি ওয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট, কনফিডেন্টলি অ্যান্ড ক্লিয়ারলি।”

দোকানদার হা করে তাকিয়ে রইল। কতটা বুঝেছে কে জানে! মারিয়ার মুখে রাগের ছাপ নেই, কিন্তু নাখোশ দেখাচ্ছে।

“আই টোল্ড ইউ ইন দ্য বিগিনিন দ্যাট আই’ম নট এনি ইন্টারেস্ট ইন ম্যারেজ।” দোকানদারের কাছ থেকে একটু সরে আস্তে আস্তে বলল দুর্জয়,

“কিন্তু আমি চেষ্টা করছি মারিয়া। এর বেশি এত তাড়াতাড়ি আর কী করার আছে? জোর করে ইন্টারেস্ট দেখাতে পারব না।”

মারিয়া হাসল তাচ্ছিল্যে,

“জার্ক! জোর করে অনুভূতি গোপন করতে পারছ বেশ ভালোভাবে আর ইন্টারেস্ট দেখাতে পারছ না?”

“কী বলতে চাইছ?”

“তুমি কাওকে ভালোবাসো, দুর্জয়।”

“হোয়াট! নো!”

“রিয়েলি? দেন সিলেক্ট মাই রিং। প্রুফ ইট।”

সহজ ব্যাপার। তবুও কঠিন লাগল দুর্জয়ের কাছে। কিন্তু মারিয়াকে ভুল প্রমাণ করতে রিং দেখতে লাগল। শুধু মারিয়া নয় নিজেকেও তো বিশ্বাস করাতে হবে ভালোবাসা টালোবাসা কিছু হয়নি ওর। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কের এলোমেলো ভাবনাগুলো দুর দুর করে একটা রিং পছন্দ করল। পছন্দ! পছন্দের সংজ্ঞা ও মনে করতে চাইল না।

“এটা সুন্দর। তোমার হাতে মানাবে বোধহয়।” একটু ম্লান হাসল। মারিয়া বা হাত বাড়িয়ে দেয়।

“পরিয়ে দেখো তাহলে।”

আংটিটা ধরে রইল দুর্জয়। মারিয়া তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি।

“কী হলো দাও!”

অনামিকায় আংটিটি পরিয়ে দিলো। মারিয়া একটু দূরে গিয়ে বসল। দুর্জয়কে ডাকল পাশে বসতে। দোকানদার অন্য ক্রেতাদের নিয়ে ব্যস্ত। মারিয়া আংটি পরা হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে একটু হাসল।

“কেমন অনুভব করছ এখন?”

“হুঁ?”

“আমাকে আংটি পরিয়ে কেমন ফিল করছ?”

“ডোন্ট প্রিটেনড টু বি সাইকোলজিস্ট নাউ ম্যারি।” দাঁত কামড়ে বলল দুর্জয়। মারিয়া শব্দ করে হাসল।

“হুয়াই নট? আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে একজনকে হৃদয়ে রেখে আরেকজনকে আংটি পরালে কেমন লাগে? কেমন লাগে দুর্জয়?”

দুর্জয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। মারিয়া চাইছেটা কী? বলেছিল বিয়ে করতে। এই সেই নানান বেনিফিট দেখাল দুজনের। দুর্জয়ের রাজি হওয়ার যদিও সেটা প্রধান কারণ নয়, কিন্তু ও রাজি হয়েছে। এখন হৃদয়ে কী আছে না আছে কেন জানতে চায়?

“আমার হৃদয়ে কেউ নেই ম্যারি। কাওকে ভালোবাসি না আমি।”

“এই প্রবোধ আমাকে বিশ্বাস করাতে চাইছ না নিজেকে? গত কয়েকদিনে তোমার আচার-আচরণ স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, ইউ আর ইন লাভ সামওয়ান, মাই ডিয়ার ফিয়োন্সে। কিন্তু আমি এই সত্যি জেনেও আংটি খুলে তোমার মুখে মারব না? কেন জানো? কারণ তুমি আমার বন্ধু। আমি জানি কতটা জেদি আর আত্মঅহং তোমার ভেতর। আবার সহজ বাংলা তোমাকে বলা যায়, বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না টাইপ মানুষ। তুমি যতক্ষণ মুখ ফুটে বলবে না ততক্ষণ আমিও এই বিয়ে হতে দেবো। তারপরেও যদি না প্রকাশ করো এবং বিয়ে হয়ে যায়…. ” মারিয়া দুর্জয়ের কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে,

“দেন আই’ল মেক ইউর লাইফ হেল।”

পরমুহূর্তে সর্ব সমক্ষে ওর ডানে গালে চুমু দিলো। অস্বস্তি আর বিস্ময়ে থ হয়ে বসে রইল সেখানে দুর্জয়। মারিয়ার হুমকিতে নয় চুমুতে। মারিয়া হেসে উঠে দাঁড়ায়। দুর্জয়ের ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখ দেখে কোনোরকমে অট্টহাসি সংবরণ করল। মারিয়া দূরে যেতে দুর্জয় মৃদু কেশে সলজ্জে এদিকে ওদিক তাকায়। বিরূপ মুখে ডান গালটা টিস্যুতে মুছে নিলো।

দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা দুর্জয়ের ফ্লাটে এলো। এলো বলতে মারিয়া জোর করে নিয়ে এলো। মেয়ে বন্ধু হিসেবেই ভালো ছিল মারিয়া। ভবিষ্যৎ স্ত্রী নয় যেন দশ নম্বর মহা বিপদশংকেত হতে চলছে দুর্জয়ের জন্য। বিয়েতে মত দিয়ে পস্তাচ্ছে। বাবা-মায়ের মুখ চেয়ে না করতেও পারছে না।

“কী ভাবছো বিয়ে ক্যান্সেল করবে?”

“তাই কি ভাবা স্বাভাবিক না? এখনই জ্বালিয়ে মারছ বিয়ের.. বিয়ের পর মেরে ফেলবে না গ্যারান্টি কী?”

দুর্জয় শক্ত মুখে বলল। মারিয়া হাসল। পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,

“তাহলে বলো কাকে ভালোবাসো? বলামাত্রই বিয়ে ক্যান্সেল। সুবর্ণ সুযোগ তোমার জন্য।”

“উফ! ইউ আর বিকামিং আনবেয়ারেবল নাউ।”

নিজের রুমের দিকে চলে গেল দুর্জয়। মারিয়া লিভিং রুমের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসল। মুখে হাসি। দুর্জয়কে জ্বালাতে ওর ভালো লাগে। লিভিং রুমটাতে চোখ বুলিয়ে নিলো। বন্ধুত্বের সুবাদে এই বাসায় বহুবার এসেছে। আজ প্রথমবার এলো নতুন সম্পর্ক ধরে। কিছু কি ফিল করছে মারিয়া। কিছুই না। কলিং বেল বেজে উঠতে উঠল। খাবার অর্ডার করেছিল। দরজা খুলে দেখল সেখান থেকেই লোক এসেছে। পার্সেল নিতে দুর্জয় পেছনে এসে দাঁড়ায়। বিলটা ওই দেবে। মারিয়া না করল না আজ। পার্সেল নিয়ে ভেতরে চলে গেল। বিল মিটিয়ে ছেলেটাকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগাতে যাবে তখনই লিফটে চোখ পড়ল। ঈপ্সা দাঁড়িয়ে। কি এক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছে ওর মুখ। চোখে জল।

“ঈপ্সা!” দুর্জয়ের চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়। অজান্তেই পা বাড়াল। কিন্তু লিফটের দরজা ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেল। ঈপ্সা কোনোদিন ওর ফ্লাটে আসেনি। ওর ফ্লাটেই কি এসেছিল। কেন? দুর্জয় দাঁড়িয়েই রইল লিফটের সামনে। মারিয়া ভেতর থেকে ডাকছে। দুর্জয় সাড়া দিলো না। লিফটের দরজা খুলে নিচে নেমে গেল। ঈপ্সা কোথাও নেই। তবে কি মনের ভুল ছিল? ঈপ্সাকে নিয়েই কেন এই ভুল হবে? মারিয়ার কথা কি ঠিক? ভালোবাসে ও? কাকে? ঈপ্সাকে! এক দু বছর নয় তেরো বছরের ছোটো ঈপ্সা ওর। হাফ প্যান্ট পরে ঘুরতে দেখেছে এই চোখে। সেই চোখ ওকে নিয়ে রোমান্টিকভাবে কী করে কল্পনা করতে পারবে? এ যে ঘোর পাপ! ইকরাম আজাদ, এহসাস, আদরূপ ওকে মেরেই ফেলবে। ধ্বংস হবে ওর কেরিয়ার, মান সম্মান সব। বাবা-মায়ের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না। তা স্বত্বেও ঈপ্সাকে মন থেকে সরাতে পারছে না। ওর ওই সজল দৃষ্টি স্মরণে আসতে দুর্জয়ের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফ্লাটের বাইরের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসল। তবু ওর অস্থিরতা কমল না। কী করবে আর দুর্জয়? মরবে?

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here