আজকে শহর তোমার আমার পর্ব ১০

#গল্পঃআজকে_শহর_তোমার_আমার
#লেখিকাঃজিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
#পর্ব_১০

মনযোগ সহকারে বইয়ে চোখ বুলিয়ে চলেছে রুপ্সিতা।বিয়ের ঝামেলায় মাঝখানে পড়াশোনায় অনেক গ্যাপ দিয়েছে।এই কয়দিনে পড়া অনেকগুলো গিলে হজম ও হয়ে গেছে।এখন পৃষ্ঠা উল্টালেই সব নতুন লাগে।টপিক দেখলে মনে হয় এটাতো স্যার পড়াইছে এটা পারবো।কিন্তু বিস্তারিত পড়তে গেলে দেখা যায় কিছুই মনে নেই।বিরক্তি আসছে পড়ালেখার উপর।রুপ্সিতার এখন পড়ালেখা বাদ দিতেও ইচ্ছে করেনা আবার পড়ালেখা করতেও ইচ্ছে করে না।কি একটা মহা জ্বালায় আছে।

পাঁচদিন হলো চট্টগ্রাম থেকে ফিরেছে আলিফ আর রুপ্সিতা।এইকটা দিন ও পড়তে বসেনি।আজকে আলিফ হুমকি ধমকি দিয়ে অফিসে গেছে।বলেছে,পড়ালেখা না করলে বইপত্র আনার কি দরকার ছিলো?মা বাবাকে কত কষ্ট করে তোমার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করিয়েছি তুমি জানো?পড়ালেখায় গাফিলতি করলে বাসা থেকে বের করে এমন জায়গায় দিয়ে আসবো যেখান থেকে ফিরতে পারবেনা আর না কোনো মানুষজন পাবে সাহায্যের জন্য।গভীর জঙ্গলে ফেলে আসবো সেখানে হিংস্র প্রাণীদের সাথে বসবাস করবা।হিংস্র প্রাণীগুলো খুব ভালো তোমাকে কিছুই করবেনা তারা।
আলিফের ধমকে এখন একটু পড়তে বসেছে।
বেশিরভাগ সময় রুপ্সিতা দুপুরে ঘুমায়না।তাই এখন ভাতঘুম দেওয়ার বদলে বই নিয়ে বসেছে।

ইরিন বিকালের দিকে রুপ্সিতার রুমে এসেছে কিছুক্ষণ গল্প করবে বলে।এসে দেখলো রুপ্সিতা পড়ার টেবিলে দাঁত দিয়ে কলমের ক্যাপ কামড়াচ্ছে আর একবার এক বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে।তিনচারটা বই একেবারে খুলে রেখেছে।
ইরিন হালকা গলা ঝেড়ে বলল,রুপা পড়তেছো?
রুপ্সিতা মাথা কাত করে পেছন ঘুরে কাঁদো কাঁদো হয়ে ইরিনকে বলে,আর বলো না ভাবি যেটাতে চোখ বুলাই মনে হয় এসব পড়া জীবনেও পড়িনাই।একেকটা সাবজেক্ট কি হার্ড।তারপর বিরবির করে বলল,কেন যে উনাকে বললাম আমি পড়তে চাই।এখন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম।

ইরিন হেসে দিয়ে বলে,আমি ছিলাম এক নাম্বারের পড়াচোর।যখন আরিফের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয় তখন কি খুশিটাই না হয়েছিলাম।কিন্তু বাসর রাতে আরিফ বলল,সে আমাকে পড়াতে চায়।কত আকুতি-মিনতি করে কেঁদে কেটে ওকে আটকালাম।পড়ালেখা করবোনা বলে বিয়েতে রাজি হলাম এখন বিয়ের পর নাকি আমি পড়ালেখা করবো।আরিফ এখনো আমাকে পড়াচোর বলে ক্ষেপায়।
ইরিনের কথা শুনে রুপ্সিতা হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে।তখনই রুমে আলিফের প্রবেশ ঘটে।ঘরের দরজায় পা রাখতেই রুপ্সিতার হাসির ঝংকার শুনতে পায়।

বাহ!পড়ালেখা বাদ দিয়ে হাসাহাসি করা হচ্ছে দেখি।তা কতক্ষণ ধরে এসব হচ্ছে?সারাদিনে কিছু পড়েছো?নাকি হাসাহাসি নিয়েই ব্যস্ত ছিলে।
রুপ্সিতা চরম বিরক্ত হলো আলিফের কথায়।তাই মুখ ভঙ্গি না পাল্টে একইরেখে বলল,মানুষ কি সারাদিন পড়ালেখা করে নাকি?একটু নিজের মন আর মস্তিষ্ককে ও রিফ্রেশ করা লাগে।

আলিফ কটাক্ষ করে বলল,তা বিয়ের এতোদিন হওয়ার পরেও তোমার মন মস্তিষ্ক ফ্রেশ হয়নি?

ওদের দুজনের ঝগড়া দেখে ইরিন নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
রুপ্সিতা বলল,এতদিনতো ভালোই ছিলেন তাহলে এখন এরকম পড়া পড়া করে জীবন দিয়ে দিচ্ছেন কেন?

আলিফ শান্ত কন্ঠে বলল,এতদিন তোমাকে আমি সবার সাথে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সময় দিয়েছি।এখন আর সেই সময় নেই।মন দিয়ে পড়ালেখা করো।
আলিফ একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
রুপ্সিতা সেইদিকে অগ্নিচোখে তাকিয়ে থাকে।

আলিফ সারাদিন অফিস করেছে ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তাই শাওয়ার নিয়ে নিলো।উদম গায়ে ঝর্ণা ছেড়ে দেওয়ালে একহাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।পিঠে পানি পড়তেই ছ্যাত করে জ্বলে উঠলো।ঘাড় বেঁকিয়ে আয়নায় নিজের পিঠ দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু আলিফ ব্যর্থ।কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।আজকে অফিস থেকে ফেরার সময় রিকশার সাথে বাড়ি লেগে পিঠে ব্যথা পায়।তখন ব্যথা পেলেও এতো গুরুত্ব দেয়নি।এখন সেই জায়গাটায় পানি লাগায় ভীষণ জ্বালা করছে।শাওয়ার নিয়ে খালি গায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে আলিফ।উদ্দেশ্য ব্যথা পাওয়া স্থানে মলম লাগানো হাত দিয়ে যা পারে আন্দাজে লাগিয়ে নেবে।

আলিফকে খালি গায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরুতে দেখে রুপ্সিতা চমকে উঠে।উনিতো সব সময় ওয়াশরুম থেকেই টিশার্ট পড়ে বের হয়।তাহলে আজকে কেন খালি গায়ে বের হলো?
রুপ্সিতা কাছে এখন লজ্জা লাগছে আলিফের খালি গায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে তবুও বেহায়া চোখ দুটো ঘুরে ঘুরে আলিফের দিকেই নিবদ্ধ হয়।আড়চোখে বারবার আলিফের দিকে তাকায়।

আলিফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওয়েনমেন্ট হাতে নিয়ে পিঠে লাগানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই কাটা স্থান ঠাওর করতে পারছেনা।
এতক্ষণে রুপ্সিতার নজর পড়লো আলিফের পিঠে।
চমকে উঠে উদ্ধিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো,একি!আপনার পিঠ এরকম বাজেভাবে ছিলে গেছে কিভাবে?
আলিফ কিছু না বলে ওয়েনমেন্ট লাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।রুপ্সিতা পড়ার টেবিল ছেড়ে এসে বলল,আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।
আলিফ বলল,লাগবেনা।আমি নিজেই পারবো তুমি তোমার পড়া পড়ো।
রুপ্সিতা রেগে গিয়ে আলিফের হাত থেকে ওয়েনমেন্ট কেঁড়ে নিয়ে বলল,কতটা পারবেন সেটা আমার দেখা হয়ে গেছে।

মেয়েটা আলিফের সব কিছুতে বাড়াবাড়ি করে হলেও নিজের অধিকার বজায় রাখার চেষ্টা করে।কথাটা ভাবতেই আলিফের ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসির রেশ দেখা দিলো।
রুপ্সিতা আঙ্গুলের ডগায় ওয়েনমেন্ট নিয়ে নরম হাত দিয়ে আলিফের পিঠ স্পর্শ করে।আলিফ আবেশে চোখ বুঝে নেয়।কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে ওর যা প্রশান্তির।

রুপ্সিতার নিজেরো কেমন একটা লাগছে।নিজের লজ্জাকে দূরে ঠেলে ওয়েনমেন্ট লাগিয়ে আস্তে হাত সরিয়ে নেয়।রুপ্সিতা হাত সরাতেই আলিফ চট করে চোখ মেলে তাকায়।
আলিফের হঠাৎ মনে হলো ইশ এই মুহূর্তটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হলো কেন?মুহুর্তটা এখানে থেমে গেলেই পারতো।পরে আবার নিজেই চমকে ওঠে মনে মনে বলে আমি কেন এসব ভাবছি?তাহলে কি আমি মায়ার স্মৃতি গুলো থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছি?কিন্তু আমিতো এটাই চাই মায়ার স্মৃতিগুলো ভুলে নতুন করে পথ চলতে।

ওয়েনমেন্ট লাগানো শেষ হওয়ার পরেও আলিফকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুপ্সিতা গলা ঝেড়ে বলল,কি ব্যাপার আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
রুপ্সিতার কথায় আলিফ ভাবনায় ইতি টেনে দিয়ে খাটের উপর বসলো।
রুপ্সিতা সরু চোখে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,টিশার্ট পড়ছেন না কেন?

আলিফ ভ্রু নাচিয়ে বলল,তোমার সমস্যা?

রুপ্সিতা বলল,আমার আবার কি সমস্যা হবে।আমিতো এমনিই বলেছি।আপনি টিশার্ট পড়ুন নয়তো সারাজীবন উদম গায়ে থাকেন তাতে আমার কি?

আলিফ দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল,আমাকে সারাজীবন উদম গায়ে রাখার প্ল্যান করছো।তোমার কি আমাকে এভাবেই ভালো লাগে নাকি?তাহলে বলো আমি সারাজীবন এভাবেই থাকবো।
রুপ্সিতা নাক মুখ কুচকে বলে,ছিঃ!আমি এটা কখন বললাম?অসভ্য লোক একটা।এরপর বইপত্র ঘুছিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।আলিফকে এক কাপ কফি দিয়ে অন্যকাপ নিয়ে ছাদে চলে যায়।বিকেলে একা একা ছাদে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা,কফি খেতে আলাদা একটা আনন্দ আছে।এই সময়টা একান্তই নিজের।প্রত্যেক মানুষেরই আলাদা একটা স্পেস দরকার।তখন শুধু সময়টা নিজের মতো করে কাটাবে।এই একা সময় কাটানোতেও এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে।এটা শুধুমাত্র তারাই বুঝে যারা একা সময় কাটাতে ভালোবাসে।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে অতিতের কিছু স্মৃতি স্মরণ করে রুপ্সিতা।যখন ফ্রি থাকতো দুবোন মিলে এরকম দুকাপ কফি হাতে নিয়ে কতশত আড্ডায় মেতে উঠতো।এখন আর সেসব সম্ভব না।বিয়ে হলেও ওদের দুবোনের সম্পর্কটা ঠিক থাকলে সবকিছুই সম্ভব ছিলো।
চট্রগ্রাম থেকে ফিরে একদিন রুপ্সিতা আর আলিফ রুপ্সিতার বাবার বাসায় গিয়েছিলো।উনারা অনেকবার করে বলেছেন যাওয়ার জন্য।হয়তো এখন না যেতে বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে রুপ্সিতার শশুর বাড়ির লোকেদের কাছে ছোট হয়ে যাবে।তাই সমাজ রক্ষা করার জন্য ওর বাবা মা যেতে বলেছে এটাই রুপ্সিতার ধারনা।সেদিন বিকালেই আবার দুজনে ফেরত এসেছে পরেরদিন আলিফের অফিস যেতে হবে তাই আর থাকে নি।রুপ্সিতা ও আর জোর করেনি।বরং চলে এসে ভালোই হয়েছে।থেকে গেলে অপবাদ নিয়ে বারবার বাবা মায়ের মুখোমুখি হতে হতো।যেটা রুপ্সিতার জন্য চরম অস্বস্তিকর ব্যাপার।

ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা নামলো।চারদিকে মুয়াজ্জিনের মুখে আজানের ধ্বনি মুখরিত হচ্ছে।রুপ্সিতা আর দেরি না করে তড়িঘড়ি করে ছাঁদ থেকে নেমে আসে।এমনিতে এই সময় ছাদে থাকা ঠিকনা নতুন বউদের তো একদমই না।

রুমে এসে ওযু করে আগে মাগরিবের নামায আদায় করে নিলো।আলিফকে মসজিদে পাঠিয়ে দিয়েছে।আলিফ আগে নামাযে গ্যাপ দিলেও এখন রুপ্সিতার সাথে সাথে প্রতি ওয়াক্ত নামায আদায় করে।আলিফ মাঝে মাঝে ভাবে রুপ্সিতা ওর জীবনে এসে অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে।আগে প্রতিরাতে মায়ার কথা মনে পড়তো।রাত হলে মায়ার ছবি দেখে ঘুমাতে যেতো।এখন সেসবের তেমন একটা প্রয়োজন হয়না।রাতে এখন ঘুম ভাঙলে রুপ্সিতার মায়াভরা মুখটি দেখতে পায়।

আজকে রুপ্সিতা নিজে রান্না করবে।এতদিনে মোটামুটি রান্না নিয়ে একটা ধারনা হয়ে গেছে।বিরিয়ানি রান্না হবে রাতের জন্য।রুপ্সিতা শাশুড়ী আর ইরিনকে বলে দিয়েছে তারা যেন রান্নাঘরে না আসে।আজ সে নিজে নিজেই সব করবে।সব ঠিকঠাক করে এবার পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি।একেতো পেঁয়াজের ঝাঁঝ তার উপর রুপ্সিতার এলার্জি আছে।এলার্জি থাকলে সহজেই চোখে পানি চলে আসে।
আলিফ ডাইনিং এ পানি খেতে এসে রান্নাঘরে উঁকি দিলো।দেখলো রুপ্সিতা কিছু কাটছে আর কাঁদছে।আলিফ রান্নাঘরে গিয়ে রুপ্সিতার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,তোমাকে কি কেউ রান্না করতে বলেছে?তাহলে কাঁদছো কেন?চলো রান্না করতে হবেনা ভাবি করে নেবে।

রুপ্সিতা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ নাক মুছে বলল,যানতো এখান থেকে।পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে উনি আসছে আমাকে কাঁদার জন্য শান্তনা দিতে।

আলিফ রুপ্সিতার হাত থেকে পেঁয়াজ আর ছুরি টেনে নিয়ে বলল,তুমি দেখো আমি কাটি।
আলিফের হাত কাঁপছে।কোনোদিন রান্না করেনি।করেনি বলতে প্রয়োজন পড়েনি।
রুপ্সিতা বুকে দুহাত গুজে দাঁড়িয়ে আলিফের তামাশা দেখছে।
হঠাৎ আলিফ মা বলে চিৎকার করে উঠে আঙ্গুল ঝাঁকাতে থাকে।আঙ্গুল কেটে বসে আছে।রুপ্সিতা ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।না পেরে খিলখিল করে হেসে উঠে আলিফের হাত নিয়ে ট্যাপের নিচে ধরলো।পিঞ্চ মেরে বলল,আসছে আমার হিরো পেঁয়াজ কাটতে।আলিফ অসহায়ের মতো রুপ্সিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
#চলবে……..।

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here