#আলো_আঁধারের_লুকোচুরি
#Part_02_03
#Writer_NOVA
গাড়ি থামতেই রুহানি শাড়ি উঁচিয়ে কষিয়ে একটা লাথি মারলো তার পাশের জনকে। একদলা থুথু বাইরে ফেলে মুখ তেঁতো করে বললো,
‘তুই আরেকটু হলে আমাকে কেস খাইয়ে দিতি। শালা, ঠিকমতো ক্যারেক্টারে ঢুকতে পারিস না এখনো।’
মাসুম বাবরি পরচুলা খুলে কুইকুই করে উঠলো।
‘কোথায় ইয়াসফি, কোথায় আমি? আমার সাথে কি ঐ মন্ত্রীর যায়? তবুও আমি আমার সর্বস্ব চেষ্টা করেছি। আমি তো ইয়াসফির কন্ঠ নকল করতেই পারি। গলাটা ভেঙে তো বিপত্তি বাঁধলো।’
‘আরো খাইস চকবার আইসক্রিম।’
মাসুম লোভাতুর চোখে নিজের জিহ্বা চেটে উত্তর দিলো,
‘কিনে দিস।’
‘উ’স্টা দিবো।’
থেমে ফের বললো,
‘আরো ভালো অভিনয় করা উচিত ছিলো।’
‘একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না রুহানি? ইয়াসফি জানতে পারলে ইনকাউন্টার করবে।’
‘ধূর, এসব ছোটখাটো বিষয়ে নজর দেওয়ার সময় আছে নাকি ওর। আর জানবেই বা কি করে?’
রুহানি কি মনে করে আবারো মাসুমের মাথায় চাটি মারলো। মাসুম চেচিয়ে উঠলো,
‘আবার কি করছি?’
রুহানি সাংঘাতিক একটা গালি দিয়ে বললো,
‘তোকে এতো ফুটানি করতে বলছিলাম? এতোগুলা গার্ড, গাড়ি, নকল বন্দুকের কি দরকার ছিলো? আমার সারা মাসের মাইনে তো বরবাদ করে দিলি।’
মাসুম ছোট করে ঢোক গিললো।
‘আসলে মন্ত্রী-মিনিস্টার মানেই বুঝোসই তো। গার্ড, বন্দুক, গাড়ি, পাওয়ার। এসব না দেখলে আসল ভাবতো নাকি? তোর ঐ চোগলখোর এক্স আমাকে ধরে প্যাদানি দিতো।’
‘তাই বলে আমার সব টাকা শেষ করে দিবি? সারা মাস চলবো কি করে?’
রুহানি অস্থির চিত্তে হাসফাস করতে লাগলো৷ টাকার মায়ায় তার এখন গাড়ি থেকে লাফ দিতে মন চাইছে। এই বেআক্কল ছেলেকে নিয়ে তার যত যন্ত্রণা!
‘ছেলেগুলোকে কি করবো?’
‘জলদী বিদায় কর।’
মাসুম গাড়ি থেকে নেমে সাঙ্গপাঙ্গদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে বিদায় করে দিলো। গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। মাসুম সিগারেট বের করে ধরাতে নিলে তা ছোঁ মেরে রুহানি নিয়ে গেলো।
‘মেয়ে মানুষের সিগারেট খাওয়া আমার পছন্দ না।’
রুহানি গ্যাস লাইট দিয়ে সিগারেটের মাথায় আগুন ধরিয়ে ধীরে টান দিলো।
‘তাতে আমার কি?’
মাসুম চুপ মেরে গেলো। এই মেয়েটাকে কিছু বলাও বৃথা। রুহানি সিগারেটে টান দিতে দিতে শাড়ি ঝাড়া মেরে হাসফাস করে উঠলো।
‘বুঝিনা বাপু, বাকি মেয়েরা ঘন্টার পর ঘন্টা শাড়ি পরে থাকে কি করে? আমার তো একটুতেই ফাপর লাগছে। এর থেকে জিন্স, টপস হাজারগুণ ভালো।’
‘তোর মধ্যে মেয়েলি কোন বৈশিষ্ট্য আছে যে এসব ভালো লাগবে?’
সরু চোখে চেয়ে রুহানি জিজ্ঞেস করলো,
‘কি বলতে চাইছিস তুই?’
‘কিছু না।’
খানিক সময় থেমে মাসুম কিছুটা ভয়ার্ত গলায় বললো,
‘হ্যাঁ রে রুহ! ইরফানকে যে ইনভিটেশন কার্ড দিয়ে এলি দুই সপ্তাহ পর হাজির হলে কি করবি? সব তো মিথ্যে!’
রুহানি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেললো। ছেলেটা বড্ড বেশি ভীতু। সবকিছুতে ভয় পায়। রুহানি মেয়ে হয়ে এখনো কত স্ট্রং। অথচ তার সাথে থেকেও মাসুম ভীতুর ডিম।
‘বল না রুহ।’
রুহানির চেহারা হঠাৎ করে বদলে গেলো। মুখ টিপে হেসে উঠলো। মাসুম চোখ সরু করে রুহানির মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছে। মেয়েটাকে সে বুঝে উঠতে পারে না। এই নরম তো এই গরম। রুহানি চোখ নাচিয়ে উত্তর দিলো।
‘কোথায় যাবে বাছাধনেরা? আমি তো কার্ডে কোন ঠিকানায় লিখিনি।’
মাসুম আৎকে উঠেলো,
‘তুই একটা চিজ মাইরি!’
পূর্ব দিগন্তে রক্তিম আভা মিলিয়ে গেছে বহু আগে। ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা তার খোলস থেকে বের হয়ে উদ্দীপ্ত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ধরার বুকে। ব্যস্ত পরিবেশ, কোলাহলে মেতে উঠছে শহর। যানবাহনের শব্দে বিছানায় শুয়ে থাকা দুষ্কর। ইচ্ছে না করলেও বিরক্তি নিয়ে উঠে যেতে হবে৷ তবুও এর মধ্যে উপুড় হয়ে বিছানায় ঘুমাচ্ছে চৌত্রিশ বছরের এক তেজী পুরুষ। রাত করে ফেরায় তার ঘুম এখনো ভাঙেনি। নয়তো এতখনে চা বলে চেচিয়ে উঠতো।
দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো ওমর। ইয়াসফি এখনো উঠেনি দেখে ছোট করে শ্বাস ফেললো। ডাকবে কি ডাকবে না ভেবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পরে গেলো৷ কোন এক অজানা কারণে ওমরের ভীষণ ভয় করে ইয়াসফিকে। না, ইয়াসফি কখনো ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। সচরাচর কারো সাথে করেও না। গৌড় বর্ণের এই মানুষটার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। চোখের দিকে তাকিয়ে তো কথাই বলা যায় না। কি তেজ! গম্ভীর্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক সত্ত্বা। এই যে বয়স তো কম হয়নি। তবুও দেখতে মনে হয় ছাব্বিশ বা সাতাশ বছরের যুবক। ব্যক্তিগতভাবে যতটা হাসিখুশি, রাজনৈতিকভাবে ঠিক ততটাই গম্ভীর, অটল, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান। কোন পদক্ষেপ কোথায় নিতে হবে সেই বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা আছে। রাজনীতি যেনো রন্ধ্রে রন্ধ্রে মেশা। হবেই না কেন? এমপি মামার ভাগ্নে বলে কথা! মামার মান রাখতে হবে না?
ওমর পা দুটোকে কোনরকম চালিয়ে বিছানার সামনে এলো। ছেলেটা কি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। অথচ পুরো নেট পাড়ায় এখন তাকে নিয়ে জল্পনা, কল্পনায় মশগুল। জানতে পারলে রিয়াকশন কেমন হবে তা জানে না ওমর। তবে ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। ইয়াসফিকে বলার সুযোগ পাচ্ছে না। এতো ব্যস্ত ছেলেটা যে দম ছাড়ানোর ফুসরত নেই। তার মধ্যে নতুন মুসিবত! রাতের পর অনলাইনে ঢুঁ মারেনি ওমর।তার ইচ্ছে করছে না। এতশত আলোচনা ভালো লাগে না তার। নিজের মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। নয়তো উপর মহলের ফোনের জ্বালায় টেকা যেতো না। বিপক্ষ দল ইয়াসফি চরিত্রে চুন কালি মাখতে ব্যস্ত৷ অথচ ইয়াসফি একবার জানলে সেই চুনকালিতে তাদের ডুবাবে৷
মৃদুস্বরে একবার ডাকতেই আড়মোড়া ভেঙে ইয়াসফি তাকালো। কপালের দুই পাশে আঙুল চেপে পিটপিট করে তাকালো৷
‘কয়টা বাজে ওমর?’
‘সাড়ে সাতটা।’
লাফ দিয়ে উঠে বসলো ইয়াসফি।
‘বলো কি? আমাকে ডাকবে না? আজ ঢাকায় যেতে হবে। নির্ঘাত যামে পরবো।’
‘আপনাকে ডাকতেই এসেছিলাম। আপনাকে ঘুমোতে দেখে ডাকতে ইচ্ছে হলো না। সকাল সাড়ে চারটায় ঘুমিয়েছেন।’
‘তাই বলে ডাকবে না?’
ওমর উত্তর দিতে পারলো না। ইয়াসফি ততক্ষণে বালিশের কাছে রাখা টি-শার্ট পরে নিয়েছে। হাতড়ে মোবাইলটাকে খুঁজলো।
‘আমার মোবাইলটা কোথায়?’
‘চার্জে।’
‘সেই যে সুইচড অফ করেছিলাম আর খুলিনি। মোবাইলটা দাও দেখি।’
ওমর দ্রুত গতিতে চার্জ থেকে মোবাইল নিয়ে আসতে গেলে ইয়াসফির কথায় থেমে গেলো।
‘থাক, দরকার নেই। ঢাকায় গিয়ে একেবারে সুইচড অন করবো৷ নয়তে দেখা যাবে পার্টি নতুন অযুহাত দাড় করিয়ে দিবে। ইন্ফারেন্সটাই হবে না।’
বিছানায় কিছু সময় ঝিম মেরে বসে রইলো ইয়াসফি। শখের বর্শবর্তী হয়ে রাজনীতিতে ঢুকলেও এখন এতো দৌড়াদৌড়ি ভালো লাগে না। এই তো মাত্র তিন ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার দৌড়াতে হবে ঢাকায়। ওমর গতকালের ভিডিওটা নিয়ে ইয়াসফিকে বলবে কি বলবে না ভেবে খুশখুশ করতে লাগলো। সেটা লক্ষ্য করে ইয়াসফি প্রথম বলে উঠলো,
‘কিছু বলবে?’
‘জ্বি স্যার।’
‘আমাকে স্যার বলতে মানা করেছি। ভাই বলবে।’
‘ঠিক আছে।’
‘আসলে…..
ইয়াসফি ছোট টেবিল ঘড়িটার দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাড়া দিয়ে উঠলো।
‘নো মোর ওয়ার্ড। আমাকে এক কাপ চা দেওয়ার ব্যবস্থা করো। এখুনি বেরুতে হবে।’
ভ্যাপসা গরমে জান যায় যায় অবস্থা। ঘরের ভেতর ফ্যানের নিচে বসা দায় হয়ে পরছে সেখানে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানে শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটতে সাহায্য করা। মাথার ক্যাপটা ঠিক করে রুহানির দিকে নজর দিলো মাসুম। মেয়েটার মাথায় নিশ্চয়ই সমস্যা আছে। নয়তো এই কাঠফাটা রোদে কেউ সং সাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে? বিরক্তি নিয়ে রুহানির দিকে তাকালো মাসুম। রুহানি তখন ক্লিনিক্যাল মাস্কের ভেতর দিয়ে স্ট্র দিয়ে জুসে চুমুক দিতে মগ্ন। মাস্কের মাঝ বরাবর কাটা আছে। সেখান দিয়ে স্ট্র টেনে নীরবে জুস পান করছে। মাসুম একটা ছোট ইটের টুকরো তুলে রুহানির দিকে ছুঁড়ে মারলো। রুহানি ততক্ষণাৎ সরে যাওয়ায় রক্ষা। চোখ গরম করে তাকালো।
‘কি হয়েছে?’
‘আমি তোর মতিগতি বুঝতে পারছি না। কখন থেকে রোদে দাঁড় করে রেখেছিস।’
‘চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক।’
মাসুম এগিয়ে এলো। তার ফর্সা মুখটা লাল রঙ ধারণ করেছে। নাকের আগা গরমে ঘাম মুছতে মুছতে লাল হয়ে আসছে।
‘যেই ইরফানকে তুই ভালো বাসিস না তাকে দেখাতে এতকিছু কেন করলি বলতো?’
মাসুমের চোখে প্রশ্নের ফুলঝুরি। রুহানি জুস শেষ করে প্যাকেটটা দুমড়েমুচড়ে ফুটপাতে ফেলে মুখ মুছলো।
‘তোর জেনে কাজ নেই।’
মাসুম ক্ষীণ শ্বাস ফেললো। মেয়েটা আগেভাগে ওকে কিচ্ছু জানায় না। এরপর বিপদে পরে হাত-পা ধরে বলবে “দোস্ত আমাকে বাঁচা”।
‘তোর মোবাইলটা দে তো রুহ।’
‘কেনো?’
‘আমার মোবাইলে এমবি নেই, দে না।’
‘আমরটাও নেই।’
‘মিথ্যে কথা!’
রুহানি হঠাৎ চাপা স্বরে হিসহিস করে উঠলো,
‘হুশ!’
‘কি?’
রুহানির দৃষ্টি অনুসরণ করে মাসুম রাস্তার অপরপাশে তাকালো। স্যুট, কোর্ট পরিহিত এক মধ্য বয়স্ক লোক জেন্টস পার্লার থেকে বেরিয়েছে। দেখা বোঝাই যাচ্ছে এই বয়সে সে তার স্টাইল নিয়ে বেশ সচেতন। মাসুম বেশি কিছু জল্পনা করতে পারলো না। এর আগেই রুহানি শক্ত কন্ঠ শোনা গেলো।
‘ফলো হিম।’
#চলবে
#আলো_আঁধারের_লুকোচুরি
#Part_03
#Writer_NOVA
ইন্টারনেটে যেখানে ইয়াসফির টপিক রাত থেকে রাতারাতি ভাইরাল সেখানে তার টনক নড়লো দুপুরের পর। মন্ত্রীসভা থেকে বের হওয়ার পর পার্শ্ববর্তী জেলার নেতা তুলন সাহেব ঘেরা দিয়ে কথাটা না জানালে ইয়াসফি বোধহয় তখনও জানতো না। কন্ফারেন্স থেকে বের হতেই সামনে পরলো তুলন শেইখ। কোন নির্দিষ্ট একটা কারণে লোকটাকে ইয়াসফি সহ্য করতে পারে না। তাই তাকে এড়িয়ে সরে যাচ্ছিলো।
‘কি মাহবুব সাহেব, বিয়েসাদী করবেন দাওয়াত দিবেন না?’
ইয়াসফির পা থেমে গেলো। ভ্রু কুঁচকে সামনের দিকে ঘুরলো। বিয়েসাদী! কি বলে লোকটা? দিনদুপুরে মাথা-টাথা খারাপ হয়েছে নাকি?
‘মানে? কি বলতে চাইছেন তুলন সাহেব?’
‘ওমা, এমন ভান করছেন যেনো কিছুই জানেন না। সকালে আপনার ভিডিওটা তো দেখলাম। ভাবীকে নিয়ে তার এক্সের সাথে রাতে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আপনি তো মিয়া পুরো ভাইরাল। কতশত সমালোচনা হচ্ছে আপনাকে নিয়ে।’
লোকটা কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো। ইয়াসফি ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলো। গতকাল রাতে, ভাবী, এক্স! না, কোন কিছু মিলাতে পারছে না। পারবে কি করে সে কি এসব জানে নাকি? তবে খেয়াল করেছে আশেপাশের নেতারা আজ তাকে দেখে কেমন কানাঘুষা করেছে। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। ইয়াসফি এসব পাত্তা দেয়নি। তুলন শেইখ ইয়াসফির কাঁধে চাপর মেরে বললো,
‘ইয়াং ম্যান, এভাবে বিয়ে মানবো না। বর্তমান তরুণদের আদর্শ ইয়াসফি মাহবুবের বিয়ে আমরা কব্জি ডুবিয়ে খেতে চাই।’
‘আমি আপনার কথা এখনো বুঝতে পারছি না।’
‘অনলাইনে একবার ঢু্ মারেন সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
ইয়াসফির কাঁধে ফের চাপর মেরে তুলন শেইখ মাথা হেলিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো। ইয়াসফি দ্রুত পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল বের করে সুইচড অন করলো। অনলাইনে যেতেই চক্ষু চড়কগাছ। তার নিজস্ব একটা ব্লু টিক পাওয়া ফেসবুক পেইজ আছে। সেখানে সে নানা উন্নয়ন মূলক কাজের ভিডিও প্রকাশ করে। ফ্যান, ফলোয়ার অনেক। এই পর্যন্ত তার পেজেকে ট্যাগ করে একই ভিডিও হাজারটা পোস্ট হয়েছে। তাই ভিডিওটা খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। গলা হাঁকিয়ে ডাকলো,
‘ওমর!’
পড়ন্ত বিকেলে সোনালী আলো জ্বলজ্বল করছে। নীল রঙ করা দোতলা বাড়িটা এই সময় অদ্ভুত সুন্দর লাগে। অদ্ভুত বলার কারণ হলো কেমন সুন্দর তার সঠিক সঙ্গাটা দিতে না পারা। ঘন গাছগাছালি ঘেরা বাড়িটা দূর থেকে তত নজরে পরে না। আশেপাশে কয়েক মাইল জুড়ে ঘনবসতি নেই। একটা,দুটো টিনশেডের বাড়ি। জায়গাটা ভীষণ পছন্দের আজিম সারোয়ার। লোকালয় থেকে দূরে। ভোর সকালে পাখির গান। প্রকৃতির সন্নিধি পাওয়ার মতো পরিবেশ। সারাজীবন শহরে কাটিয়ে তিক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাই অবসরেরে আগে ছায়া নিবিড় পরিবেশে বাড়ি তৈরি করেছেন। যেখানে নেই কোন যানবাহনে উচ্চ শব্দ, ইট পাথরের দালান, ঘুণে ধরা মানুষের সঙ্গ।
বারান্দায় বসে সংবাদপত্র খুলে বসেছেন। গরম গরম এক কাপ চায়ের সাথে সংবাদপত্রে ডুবে যাওয়ার আনন্দই আলাদা। এমপি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন দেড় বছর আগে। নিজের বদলে দাঁড় করিয়েছেন ভাগ্নেকে। বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। নিজের কোন ছেলে না থাকায় ভাগ্নে যেনো সব। রাজনৈতিক পাতা উল্টে রেখে দিলো। এখন আর এসব ভালো লাগে না। তবুও মাঝে মধ্যে কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে উঁকি ঝুঁকি মারেন। ভাগ্নে মন্ত্রী, খবর না চাইলেও রাখতে হয়।
‘তুমি কি একটু খোঁজ নিয়ে দেখবে না?’
স্ত্রীর কান্নাভেজা কন্ঠ শুনে আজিম সারোয়ারের হঠাৎ করে চায়ের স্বাদটা বিস্বাদময় হয়ে উঠলো। চায়ের কাপ রেখে সংবাদপত্র ভাজ করে পাশের বেতের চেয়ারে রাখলো। বিরক্তির আভা সারা মুখে ছড়িয়ে পরেছে।
‘তুমি বুঝেও অবুঝের মতো কেনো করো?’
‘তুমি তো পাষাণ, তোমার মন কাদে না। আমার ভেতরটা পুড়ে যায়।’
আঁচলে মুখ ঢাকলেন নাসিমা বেগম। আজিম সারোয়ার তখন সামনের দেয়ালে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চুপটি মেরে আছেন।
‘একটা কল করে আসতে বলো না।’
স্ত্রীর কন্ঠে স্পষ্ট অনুনয়। আজিম সারোয়ার চোখ তুলে তাকালেন ঠান্ডা দৃষ্টি। যার মানে সে কিছু বলতে পারবে না। তেতে উঠলেন নাসিমা বেগম।
‘দরকার নেই। এখন তো আমি কেউ না। আমার কথা কেন মনে পরবে?’
‘পাগলামি করছো কেনো? ও অনেক ব্যস্ত।’
‘ব্যস্ততা বলতে কিছু নেই। এটা একটা অযুহাত। ইচ্ছে থাকলে হাজার কাজও কাউকে আটকে রাখতে পারে না। লাগবে না কারো আসতে। আমি মরে গেলেও যেনো না আসে।’
নাসিমা বেগম নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আজিম সারোয়ার তপ্ত শ্বাস ফেলে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তার কিছু বলার নেই। নিজের মনকে প্রশ্ন করলেন আসলেই কি ব্যস্ততা একটা অযুহাত?
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ওমর। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। সামনেই ইয়াসফি চুপ করে মেঝেতে দৃষ্টি দিয়ে চেয়ারে বসে আছে। তার ভাবভঙ্গি ঠাওর করা যাচ্ছে না। হাতে থাকা মোবাইলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একসময় শান্ত হয়ে গেলো।
‘ভাই আসলে…..
ইয়াসফি আঙুল উঁচু করে থামতে বললো। ওমর ভীতু চোখে আশেপাশে চোখ বুলালো।
‘কখন ঘটেছে?’
ওমর আমতা আমতা করে বললো,
‘গতকাল রাতে।’
‘আমাকে জানাওনি কেনো?’
‘সুযোগ পাইনি। আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি আমার কথাই শুনেননি।’
ইয়াসফির দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। জানালা দিয়ে সন্ধ্যার আকাশে নজর দিলো। ওর এমন শান্ত ভঙ্গিতে ওমরের বুক দুরুদুরু করছে। বাবরি চুলগুলো পেছনে ঠেলে ইয়াসফি বললো,
‘ফেসবুক লাইভের ব্যবস্থা করো। যা বলার আমি পেইজের লাইভে বলবো।’
ওমর মাথা হেলিয়ে দ্রুত তার ব্যবস্থা করতে লেগে পরলো। ইয়াসফি আবারো হলুদাভ আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলো।
‘আফা নেন চা।’
মোবাইলে হিসাব কষছিলো রুহানি। সেখান থেকে চোখ উঠিয়ে সামনের দশ বছরের বালকের দিকে নজর দিলো। বাম হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বললো,
‘আজ স্কুলে গিয়েছিলি টুকু?’
‘হো আফা।’
‘কেমন লাগে?’
‘ভালাই, কত নতুন নতুন জিনিস শিখন যায়।’
‘মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে কিন্তু।’
‘জে আফা করমু।’
রুহানি মিষ্টি হেসে টুকুর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। পাশে থাকা টুকুর মা মিনালির মুখে প্রশান্তির হাসি। ঝুলন্ত বিস্কিটের প্যাকেট থেকে দুটো বড় বিস্কিট এনে রুহানির দিকে বাড়িয়ে দিলো।
‘একি দিদি, আমি তো বিস্কুট চাইনি।’
‘নতুন উডাইছি, বিস্কিটগুলান অনেক মজা। তুমি একটু ট্যাশ করো।’
‘না না লাগবে না।’
মিনালি এক পলক তার ছেলের দিকে তাকালো। টুকু বই খাতা নিয়ে পাশের নিয়ন বাতির আলোয় চটের বস্তার ওপর পড়তে বসেছে। সেদিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে বললো,
‘কথা কইয়ো না তো। তুমি আমগো লিগা যা করছো এইডা হেই তুলনায় অনেক কম।’
মাসুম খোপ করে একটা বিস্কুট নিয়ে পাশের বেঞ্চে বসে পরলো। রুহানির চোখ গরম করে তাকানো কে পাত্তাই দিলো না। চায়ের কাপে বিস্কুট চুবিয়ে চিবোতে চিবতে বললো,
‘আসলেই তো দিদি, খেতে অনেক মজা।’
মিনালি খুশি হলো। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রুহানি বিস্কুট নিলো। আশা নিয়ে দিয়েছে, ভঙ্গ করা উচিত নয়। কিন্তু এই বিস্কিটের টাকা মিনালি রাখবে না। যার দরুন রুহানি বিস্কুট নিতে চাইনি। মাসুম মোবাইল বের করে অনলাইনে উঁকি মারলো। টুংটাং ম্যাসেজের শব্দ পেতেই রুহানি ওর পাশ ঘেঁষে বসলো।
‘কি হয়েছে? এমন ঘেঁষাঘেঁষি করছিস কেন?’
রুহানি দাঁত কেলালো। যা দেখে তার উদ্দেশ্য বুঝে গেছে মাসুম।
‘হটস্পট দিতে পারবো না।’
‘একটু দে না। এমন করিস কেন?’
‘এ্যাহ, কত ধারদেনা করে এমবি কিনলাম কি তোকে দেওয়ার জন্য?’
‘তুই না আমার বেস্টফ্রেন্ড?’
‘তুই মানিস?’
‘না মেনে যাবো কই?’
‘তোর মিষ্টি কথায় ভুলছি না, সর।’
রুহানি চোখ সরু করে মাসুমের বাহুতে দুম করে এক ঘুষি দিয়ে সরে গেলো। মাসুম বাহু ধরে আহ্ করে চেচিয়ে উঠলো। লাথি মারতে গেলে রুহানি সরে দাঁড়ালো। ওদের কান্ড দেখে টুকু বই পড়া রেখে কিছু সময় হেসে নিলো৷ রুহানি সরে গেলো। আবার তার পুরনো হিসাব কষতে আরম্ভ করলো। মিনিটের মধ্যে গতকাল রাতের ভাইরাল ভিডিও মাসুমের নিউজফিডে হানা দিলো। চোখ মুখ শুকিয়ে উঠলো। আৎকে উঠলো।
‘রুহানি সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
রুহানি জায়গা থেকে নরলো না। চোখ তীক্ষ্ণ করে জিজ্ঞেস করলো,
‘কি?’
‘আমাদের গতকালের ঘটনা তো সেই ভাইরাল।’
‘কই দেখি।’
হুরমুর করে এসে মাসুমের ঘাড়ের ওপর পরলো রুহানি। অস্থির চিত্তে প্রশ্ন করলো,
‘আমাকে কি দেখা যায়?’
‘না, তুই সাইডে বলে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাকে দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, রে রুহানি! এই কাজ করলো কে?’
মাসুমের গলা শুকিয়ে আসছে। আচানক মনে হচ্ছে তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে মরে যাবে। ভয়ে শরীর জমে যাচ্ছে। অথচ রুহানির ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক। এমন গা ছাড়া ভাব দেখে মাসুমের রাগ হলো।
‘তুই এমন স্বাভাবিক আছিস কি করে? এটা ইয়াসফি দেখলে কি হবে ভাবতে পারছিস?’
‘ধরলে তোকে ধরবে আমার কি?’
‘এই তোর বন্ধুত্ব?’
‘হটস্পট দেস নাই মনে আছে আমার।’
মাসুম অসহায় চোখে রুহানির দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা সিরিয়াস কেসে সামান্য বিষয় ধরে বসে আছে। রুহানি মাসুমের অবস্থা বুঝে মনে মনে হেসে উঠলো। গালে মৃদু থাপ্পড় দিতে দিতে বললো,
‘বাচ্চি তু তো গেয়া।’
#চলবে