আলো_আঁধার পর্ব ২০

#আলো_আঁধার_২০
#জেরিন_আক্তার_নিপা

আলো ভাড়া বাড়িতে উঠেছে আজ এক সপ্তাহ। যাবার সময় মিসেস আমিনাকে চলে যাবার কারণ হিসেবে বলেছে,

-“অনেকদিন আপনাদেরকে উপর বোঝা হয়ে ছিলাম। আপনার দয়াতেই একটা কাজেরও যোগাড় হয়ে গেল। এখন আমি নিজে উপার্জন করি। জীবনটাকে আমি নিজের মত গুছিয়ে নিতে চাই খালাম্মা। তাই ভাড়া বাড়িতে উঠার সিদ্ধান্তটাই ঠিক মনে হলো।’

মিসেস আমিনা আলোকে বাধা দেননি। নিজের মত করে স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার সবার আছে। আলো চলে যাওয়ায় শুভ্র সবটা দোষ নিজের ঘাড়েই নিয়েছে। আলো তার জন্যেই চলে গেছে। শুভ্রর এখন আর কিচ্ছু আগের মতো ভালো লাগে না। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আসতে ইচ্ছে করে না। মা শপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আলোকে ছাড়া ইদানিং বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আজকাল ছাদে যাওয়া ছেড়েই দিয়েছে শুভ্র। আলোর সাথে তার যেটুকু সময় কাটত বেশিরভাগ ছাদেই কাটত। দু’জন পাশাপাশি হেঁটে কত গল্প করেছে।
মিসেস আমিনাও ছেলের উদাসীন ভাব কিছু দিন ধরে লক্ষ করছেন। জিজ্ঞেস করবেন ভেবেও করা হচ্ছে না। আলো বাড়ি থেকে চলে যাবার পরই শুভ্রর চরিত্রে এতটা পরিবর্তন এসেছে। তার মানে কি ছেলেটা আলোকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল! যদি করেও থাকে তাহলে ছেলেটাকেই কষ্ট পেতে হবে। আলোর মত কঠিন ধাঁচের মেয়ের মন শুভ্র অত সহজে গলাতে পারবে না। শুধু শুভ্র কেন? আলো হয়তো তার জীবনে আর কোন পুরুষকেই আশা করে না।

-“শুভ্র!’

-“হ্যাঁ মা বলো।’

-“কোথায় যাচ্ছ এখন? হাতে কাজ আছে তোমার? তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’

মা তার সাথে কী কথা বলবে শুভ্র ভেবে পেল না। তার হাতে এখন কোন কাজ নেই। তাই মা’র কথা শোনা যাক।

-“এখন কোথাও যাচ্ছি না। কী বলবে, বলো।’

-“আমি সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পছন্দ করি। এটা জানো তো? পেঁচালো কথা আমি বলি না। শুনতেও চাই না। তুমি কি আলোকে পছন্দ করো? হ্যাঁ বা না’তে উত্তর দিবে।’

শুভ্র মা’র মুখের দিকে চেয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। মা তাহলে তার মনের কথা জেনে গেছে। মায়ের কাছে শুভ্রর কোন লজ্জা নেই। দ্বিধাও নেই। সে মাথা নেড়ে সহজ ভাবেই স্বীকার করে নিল।

-“হ্যাঁ।’

মিসেস আমিনার চেহারার ভাব সামান্য বদলে গেছে। ছেলের জন্য সত্যিই চিন্তিত তিনি।

-“আলোকে এই কথা বলেছ? আলো জানে তুমি যে ওকে পছন্দ করো?’

-“হুম। আলোকে বলার পরই তো ও এই বাড়ি থেকে চলে গেল।’

-“আলো তোমার জন্য বাড়ি ছেড়েছে! ‘

-“হ্যাঁ। আলো আমাকে একজন ভালো বন্ধু ভেবেছিল। আমি বন্ধু হিসেবে ওর বিশ্বাস রাখতে পারিনি।’

-“কাউকে পছন্দ করা অন্যায় না। মনের উপর কারো কথা চলে না। তুমি ওকে পছন্দ করেছ এতে তোমার দোষ নেই। ভালোলাগা, ভালোবাসা আপনাআপনি হয়ে যায়। জোর করে বা জেনে-বুঝে হয়না।’

-“আলো ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না।’

-“এজন্য করে না কারণ সে ভালোবেসে জীবনে অনেকবার ঠকেছে। তাই বলে ভালোবাসা শব্দটা তো মিথ্যে হয়ে যায়নি। আমি ওর সাথে কথা বলব।’

-“না মা। তুমি আমার ব্যাপারে আলোর সাথে কোন কথা বলো না।’

-“কেন?’

-“আমি চাই না আলো কোনোরকম দায়বদ্ধতা থেকে আমাকে স্বীকার করুক। তুমি বললে হয়তো আলো না করবে না। কিন্তু মন থেকেও সে আমাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারবে না। আমি জোর করে কাউকে পেতে চাই না।’
____________________________
নতুন ফ্ল্যাটে উঠে এক সপ্তাহেই আলো অনেকটা গুছিয়ে নিতে পেরেছে। একটা সংসারে যা যা লাগে সবই কেনা হয়ে গেছে। বাজার, রান্নাটাও সে নিজেই করে। বাইরে থেকে ফিরে ঘরের কাজ করতে করতেই সময়টা যে কখন চলে যায়! মাঝে মাঝে শুভ্রর কথা মনে পড়ে আলোর। মনে পড়লেও মনকে সে কড়া করে ধমকে দেয়। কত ভালো বন্ধু ছিল ওরা। শুভ্রটা যে কেন প্রেম ভালোবাসার মধ্যে পড়তে গেল! ওর মনে ওসব না এলে আজও তারা ভালো বন্ধু থাকত।
আলো রাতের জন্য গ্যাসে ভাত বসিয়ে দিয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ ধরে কলিংবেল বাজছে। কে আসবে এই সময়? ভেবে পায় না আলো। তার এই নতুন ঠিকানা মিসেস আমিনা ছাড়া হয়তো শুভ্রও জানে না। অথচ সন্ধ্যার সময় কে এসে কলিংবেল নষ্ট করে ফেলার উপক্রম করছে। যে-ই আসুক মানুষটার ধৈর্য নেই মোটেও। আলো বিরক্তি নিয়ে বলল,

-“আসছি তো। এসেছেন যখন একটু অপেক্ষা করুন না। দরজা তো খুলবেই। কলিংবেল ভেঙে ফেলে লাভ কী?’

বলতে বলতে দরজা খুলে দিয়ে আলো সামনে যে মানুষটাকে দেখতে পেল, তাকে দেখে আলোর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে কল্পনাও করেনি দীপ্ত আজ তার কাছে আসবে। দীপ্ত তাকে কীভাবে খুঁজে পেল! তার এই নতুন ঠিকানাই বা কার কাছে পেল! এই পর্যন্ত কীভাবে এলো সে। আলোর মুখে কোন কথা নেই। তার চোখে রাগ আর আতঙ্কের মিশ্রণ। দীপ্তর মত ছোটলোক অমানুষকে চোখের সামনে দেখতেও ঘৃণা লাগে। আলো কী করবে ভেবে না পেয়ে ওভাবেই দরজার সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। তার কি এখন দরজা বন্ধ করে দেওয়া উচিত? দীপ্তই আগে কথা বলল,

-“কেমন আছো আলো? সেদিন আমাকে না জানিয়ে হাসপাতাল থেকে কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি? তারপর কতগুলো মাস কেটে গেল। তোমাকে কত খুঁজেছি আমি। কিন্তু তোমার দেখা পেলামই না।’

দীপ্তর চোখ আলোর পেটের দিকে গেল। তার চোখ চকচক করছে। খুশি খুশি গলায় দীপ্ত বলল,

-“বাবু কোথায়? কবে এসেছে ও? কতটুকু বড় হয়েছে? বাবা এসেছে নাকি সোনামণি?’

আলো দীপ্তর সত্য জানে। দীপ্তকে আগের মতই স্বাভাবিক দেখে আলো বিস্মিত, হতভম্ব। একটা মানুষ এতটা নিখুঁত অভিনয় কীভাবে করতে পারে? এর কাছে তো গিরগিটিও হার মানবে।
নিজের রাগকে বাইরে প্রকাশ না করে কিড়মিড় করে আলো বলল,

-“তুমি এখানে কী চাও?’

-“আমার চাওয়ার জিনিস তো একটাই।’

আলো আর পারল না। দীপ্তর গালে সে শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। জানোয়ারটা এখনো বুক ফুলিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

-“এক্ষুনি তুই এখান থেকে চলে যাবি। নইলে আমি পুলিশে কমপ্লেন করব। তুই যা করেছিস তা এখনো ভুলিনি আমি৷ তোর মত জানোয়ারের জন্য জেলই আসল ঠিকানা।’

থাপ্পড় খেয়েও দীপ্ত শান্ত। কোনো ভাবান্তর হলো না তার। আলোর কোনো কথাই তার কাছে অপমান বলে মন হয় না। আলো একটা কেন? তাকে একশোটা চড়ও মারতে পারবে। সেই অধিকার আলোর আছে।

-“অনেক খুঁজে তোমাকে পেয়েছি আলো। আজ এখান থেকে চলে গেলেও তোমার জীবন থেকে চলে যাচ্ছি না। আমি আবার আসব। তোমাকে নিতে আসব। সেদিন তুমি আমার সাথে যাবে।’

দীপ্ত চলে গেলে আলো দরজা ধরে ওখানেই বসে পড়ল। পায়ে জোর পাচ্ছে না। দীপ্তর সামনে সাহস দেখালেও, পুলিশের ভয় দেখালেও আলো নিজেই এখন সাহস পাচ্ছে না।
তার দু’দিন পরেই শুভ্র আলোর সাথে দেখা করতে এলো। শুভ্র আলোর শুকনো মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে, আলোর কিছু তো হয়েছে। ওকে আগের মত প্রাণবন্ত লাগছে না। মনে মনে কোন চিন্তা তাকে তাড়া করছে।
দরজা খুলে দিয়ে নিরস মুখে আলো বলল,

-“এসো।’

শুভ্রকে ভেতরে আসতে দিয়ে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে শুভ্রর উপস্থিতিতে সে খুশি হয়েছে নাকি বিরক্ত তা আলোর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না। শুভ্র ভেতরে এসে চোখ ঘুরিয়ে আলোর ছোট্ট সংসার দেখছে। সাজানো গুছানো ঠিকই আছে।

-“কেমন আছো?’

-“ভালো। তুমি?’

-“দিন কেটে যাচ্ছে। খালাম্মা কেমন আছেন?’

-“ভালো।’

-“বসো তুমি।’

আলো রান্নাঘরে গিয়ে শুভ্রর জন্য চা বানিয়ে আনল। শুভ্র যেমন চা খেতে পছন্দ করে তেমনই বানাল। নিজের জন্যও এক কাপ নিল। শুভ্রর সামনে চায়ের কাপ রেখে আলোও পাশের চেয়ারটায় বসল। দু’জন চুপচাপ কয়েকবার চায়ে চুমুক দিল। শুভ্রই আগে বলল,

-“একা এদিকটা সামলে নিতে কষ্ট হচ্ছে না তো?’

-“না৷ কষ্ট আর কী? আমার অভ্যেস আছে। তুমি বলো তোমার কী খবর।’

শুভ্রর কোন খবরটা আলো শুনতে চায়? আলো চলে এসেছে পরে শুভ্র কেমন আছে, এটা জানতে চায়? আলোকে ছাড়া তার দিন কেমন কাটছে এটা কি আলোকে বলে দিতে হবে? আলো শুভ্রর সাথে কথা বললেও ওর অন্যমনস্ক ভাব শুভ্রর চোখ এড়াল না।

-“কিছু হয়েছে আলো? তোমাকে অন্যরকম লাগছে।’

আলো জোর করে হাসল। শুভ্র কীভাবে তার মনের অবস্থা বুঝে যায়! ওদের পরিচয়ের এই অল্প দিনে শুভ্র তাকে কত ভালো বুঝে গেছে। আলো যেটা বলে সেটা তো বুঝেই, যেটা না বলে সেটাও বুঝে নেয়। শুভ্রর কোন দোষ আলোর চোখে পড়ে না। এমন চরিত্রের ছেলে বরং আলো খুব কমই দেখেছে। এতদিনে শুধু শুভ্র একটা ভুলই করেছে। বাকি সবার মত আলোর উপর দয়া, সহানুভূতি দেখাচ্ছে। আলো কারো দয়ায় বাঁচতে চায় না। কারো সহানুভূতি ওর লাগবে না।

-“তুমি আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবো। তাই তোমার এরকম মনে হচ্ছে। এদিকে সব ঠিকই আছে। আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না।’

শুভ্র খুব সাবধানে দীর্ঘশ্বাস চাপল। আলোর মিথ্যা সে খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারে। আলো তার কাছে সত্যি কথাটা বলছে না। কিছু লোকাচ্ছে।
আলো মুখে শুভ্রকে কিছু হয়নি বললেও মনে মনে বলল,

-“শুভ্র আমার অতীতের কালো ছায়া আবার আমার বর্তমানে এসে পড়েছে। এই কথাটা কীভাবে বলব তোমাকে? তুমি তো এমনিতেই আমাকে নিয়ে কম ভাবো না। আমি তোমার টেনশন আরও বাড়াতে চাই না। তোমার ফিলিংসের সম্মান করি আমি। তাই বলে সেটার সুযোগ নিতে পারব না আমি। আমার সমস্যা আমাকে একাই সমাধান করতে হবে। দীপ্ত ভয়ংকর লোক। ও তোমারও ক্ষতি করে দিতে পারে। আমি চাই না আমার জন্য তোমার কিছু হোক। তোমার কিছু হলে তোমার মা’কে দেখবে কে? উনার তো তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। আর সবথেকে বড় কথা, তুমি আমাকে ভালোবাসো না। আমার পরিস্থিতির উপর তোমার দয়া হচ্ছে। আমাকে সাহায্য করার মনোভাব থেকে তুমি ভাবছ, তুমি আমাকে ভালোবাসো। এটাকে ভালোবাসা বলে না শুভ্র। ভালোবাসায় দয়ার স্থান নেই।’

চলবে___

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here