এক ঝাঁক জোনাকির আলো পর্ব ৪১+৪২

#একঝাঁক~জোনাকির~আলো🍁
#writer~হাফসা~আলম 🍂
.
.
৪১.
__________________
রুমে পানি নেই তাই সাফা জগ হাতে রুম থেকে পানি নিতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। সকালে আবার তাদের ঢাকা ব্যাক করতে হবে।রান্না ঘর থেকে পানি নিয়ে সাফা একটা রুম ক্রশ করতেই শুনতে পায় রাফার গলা।রাফা এত রাতে এই রুমে কারনটা সাফা যানে না।বড় দেয়াল ঘড়িতে রাত একখন প্রায় একটা ছুঁই ছুঁই। এত রাতে কি কথা বলছে। রাফা সকালেই এসেছে।কাল তাদের সাথে আবার ঢাকা যাবে।কিন্তু এত রাতে অভ্রর রুমে কি কথা বলছে।সাফা দু’পা পিছিয়ে গিয়ে অভ্রর রুমের একটু পাশে দাঁড়ালো। দরজা খোলা। অভ্র সাদা রংয়ের টি শার্ট পড়ে রাফার দিকে তাকিয়ে আছে।ঘুম জড়ানো চোখ তার।সাফা আবার হাটাঁ শুরু করে। কারো রুমে আড়িপাতা তার স্বভাবে পড়েনা।কিন্তু একটু দূরে যেতেই একটা কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে।রাফা মৃদু চেঁচিয়ে বলছে,
— “ভাইয়া তুমি আমেরিকা চলে যাবে এটা আম্মু যানে??”
অভ্র প্রথমে চমকে তাকায়।তারপর বলে,
— “তুই কিভাবে যানলি আমি আমেরিকা যাবো??”
— “আমি সব জানি ভাইয়া।প্লিজজ সব খুলে বলো??আম্মু এটা যানলে খুব কষ্ট পাবে।ঘুরতে গেলে বিষয়টা একরকম আর একবারে গেলে আরএক রকম। তুমি একেবারে চলে যাবে??”
— “দেখ এসব কথা বলার মানে হয় না।ক্যারিয়ারের জন্য আমাদের অনেক কিছু করতে হয়।সব সময় পরিবারের সাথে থাকা যায় না।আর এর চেয়ে বড় কথা চাকরিটা ভালো।সো যাওয়া উঁচিত। তাই যাচ্ছি। এত কথা না বলে ঘুমাতে যা।নিশান অপেক্ষায় আছে।”
রাফা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে অভ্রর দিকে। তারপর বলে,
— “তুমি তো ক্যারিয়ারের জন্য না নিভ্র ভাইয়ার জন্য চলে যাচ্ছ। একটা বিয়ে কি করে আমাদের এত সুন্দর পরিবার ভেঙে দিতে পারে ভাইয়া??”
অভ্র হতভম্ভ হয়ে রাফার দিকে তাকায়।রাফা এগুলো কি বলছে?ও কি কিছু জানে?নাকি সব যানে? অভ্র কঠিন গলায় বললো,
— “কি যা তা বলছিস।এগুলো সব ফাউ কথা।ওর বিয়ে এর মাঝে আসে কিভাবে?”
রাফা শুধু তাকিয়ে দেখছে।তার ভাই এত কষ্টে থেকেও কতটা কঠিন,শান্ত,মজার,আর ধৈর্যের সাথে থাকছে।যেখানে তার মনের অবস্থা খারাপ।রাফা পিছনের হাত সামনে এনে বলে,
— “আমি সব যানি ভাইয়া।সব পড়েছি।যানি গোপন জিনিস পড়া অন্যায় তবুও পড়েছি।পড়েছি বলেইত যেনেছি।এত কষ্ট কিভাবে লুকিয়ে রাখলে ভাইয়া?কিভাবে?”
অভ্র এবার চোখ বড় করে নিজের কালো মোড়ালে বাঁধা ডায়েরিটা দেখছে।এটা কি ভাবে রাফার কাছে গেলো?সেটাই মাথায় ডুকছে না অভ্রর।অভ্র শুকনো ঢোক গিলে চারপাশে একবার চোখবুলায়।রাফা ঝাঁঝালো গলায় বলে,
—” ভাই তুমি চোরের মত এদিক ওদিক না তাকিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দেও।”
অভ্রর বুক ছিঁড়ে অনায়াসে দীর্ঘনিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসে।বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো,
— “দেখ তুই এভাবে কারো পার্সোনাল জিনিসে হাত দিতে পারোস না।তার উপর এটা একটা ডায়রি!কোথায় পেছিস এটা?এটা তো আমার রুমে ছিলো।আলমারিতে।বলো কোথায় পেলি?”
রাফা আরো রেগে গেলো। একটা প্রশ্ন করছে তার উত্তর না দিয়ে নানা প্রশ্ন করছে।সাফা রাগী গলায় বলে,
—” ভাইয়া!প্রশ্ন যা করেছি তার উত্তর দেও আগে?”
—” কি প্রশ্ন??”
—” ডায়রির সব সত্য?”
অভ্র বিরক্তির সাথে বলল,
—” পড়া হয়েগেছে। তাহলে প্রশ্ন করছিস কেনো?যানোস তো।”
রাফা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। গলা বসে যাচ্ছে তার।কিছু বলতেও পারছে না।অনেক কষ্টে বলল,
—-“একটা মেয়ের জন্য আমাদের পরিবার ভাগ হয়ে যাবে ভাই?”
অভ্র চোখ ছলছল করে উঠে।কি বলবে ভেবে পায় না।নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
—” দেখ রাফা যা যানোস আর যা পড়েছস সব তোর মাঝেই যাতে থাকে।নিভ্র বা অন্য কেউ যাতে না যানে।প্লিজজ বলবি না।”
—” কি বলবো না ভাই?এভাবে তুমি আমাদের ছেড়ে আব্বু আম্মুকে ছেড়ে সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে এটা হয় না।তুমি যেতে পারো না।তাহলে আমিও সবাইকে সব বলে দিবো।”
—” দেখ ফাইজলামি করবি না।এটা আমার মেটার।নাক গলাবি না।আর বিয়ের জন্য বা ওদের জন্য আমি কথাও যাচ্ছি না।নিজের জন্য যাচ্ছি। ”
রাফা ভারী অবাক হওয়া গলায় বলে,
—” তোমার জন্য কিভাবে??বলো??”
—” রাফা বাদ দে।এখন তো যাচ্ছি না।বিয়ের পরে যাবো।এসব ড্রামা বন্ধ করে যা এখন।”
—” বলবে না তো?ঠিক আছে আমিও সবাইকে বলে দিবো।”
কথাটা বলেই রাফা দরজার দিকে পা বাড়ায়।অভ্র রাফার হাত টেনে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।রাফার শাড়ির কাধের পাশ ভিজেঁ উঠে।রাফা অবাক তার ভাইয়ের কান্না দেখে।এতটা কিভাবে হয়েগেলো।তারা একটুও খেয়াল করে নি?ভাইয়ের এত কষ্ট জমা ছিলো?রাফা শান্তনার গলায় বলে,
—” ভাই তুমি কান্না করছো!!”
অভ্র কথা বলে না।চুপ করে শুধু নিঃশব্দে চোখের জ্বল ফেলছে।মনটা ভারি ভারি হয়ে আছে।কলিজায় মনে হয় পাহাড় সমান ভার কেউ তুলে দিয়েছে।অভ্র কখনো কাদেঁ না।কিন্তু তার জীবনটাই হঠাৎ ঝড়ের মত এলোমেলো হয়েগেছে। এতটা কষ্ট কেনো হচ্ছে জানে না সে।রাফা শান্তনার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।অভ্র কান্না জড়িত কন্ঠে বলে,
—” আমি পারি না রাফা।আর পারছিনা।কষ্ট হয় খুব।এত কষ্ট আগে কখনোই হয় নি।এতটা আমি কিভাবে কারোর প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম জানি না।সব কেমন এলোমেলো হয়েগেছে। আমি কি করবো রাফা?বল?ওদের একসাথে দেখলেই কলিজা পুড়ে।জঘন্য ভাবে পুড়ে।দম বন্ধ হয়ে আসে।মনে হয় আর বেশিক্ষণ দেখলেই আমি মারা যাবো।আমি এতটাই অসহায় ওকে চাইতেও পারি না।কিভাবে চাইবো নিভ্রর জীবন হয়েগেছে ও।ওকে চাইলে তো নিভ্র বাঁচবে না।আর এদিকে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।এখনই এসব দেখতে পারছি না।বিয়ের পরে যদি আমি নিজের উপড় কন্ট্রোল করতে না পারি, সব কথা আবেগ,অনুভুতি লুকিয়ে রাখতে না পাড়ি?তখন তো নিভ্র প্রচন্ড কষ্ট পাবে।ওকে কষ্ট দিতে পারবো না। কিছু তেই না।আমি কি করবো বল??”

রাফা বাক রূদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এতটা ভালোবাসা তার ভাইয়ের মনে সাথে এতটা বিরহের কষ্ট।কি বলবে বুঝেই উঠতে পারছে না।অভ্র বিছানায় বসে।চশমাটা খুলে বিছানায় ছুঁড়ে দেয়।রাফা পাশে বসে।অভ্রর চোখ শূন্যে ভাসছে।কিছুসময় থেমে আবার বললো,
—” আমি জানি সবাই কষ্ট পাবে।কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।আমি থাকলে কিছু ঠিক হবে না।তাই বিয়ের পরের দিনই চলে যাবো।”
রাফার কেনো যেনো রাগ হলো।ভাইয়ের কষ্ট তাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে। তাই কঠিন গলায় বলে,
—” ও না আসলেই ভালো হত আমাদের জীবনে।মন চাচ্ছে পিছনে গিয়ে ওকে বাদ দিয়ে আমরা আবার আগের মত থাকতাম।”
—” রাফা কিসব বলছিস।ওর কি দোষ।প্রেম ভালোবাসা হঠাৎ হয়।আর একজনকে শুধু একজনই ভালোবাসতে পারে এটা তো না।ওকে দুজনেই ভালোবাসে এখন এতে ওর কি দোষ।ও তো বলেনি।আর ও যাকে ভালোবাসে তার সাথেই থাকতে চাইবে এটা স্বাভাবিক। আমরটা একতরফা। আর একতরফা ভালোবাস দিয়ে কি হবে বল?”

অভ্রর চোখ আবার ভরে উঠে।ভালোবাসা তো ভালোবাসাই হয়। একতরফা যেমন দুইতরফাও তেমন।সবার অনুভুতই একই।বিরহে সবারই একুই কষ্ট হয়।রাফা বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে।তবুও ভাইয়ের দুহাত নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে বলে,
—” তুমি এতটা ভালো কিভাবে বাসতে পারলে ভাই??”

অভ্র অশ্রুসিক্ত চোখে হেঁসে ফেলে।অনমনেই উদাসীন ভাবে বললো,
—” জানি না।তবে ও এমনই যে সবারই ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে।তুই নিজেও তো কত ভালোবাসোস আদর করছ।এতটা কিন্তু আগে কারো জন্য আমি দেখিনি।”
রাফাও হাঁসে। ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
—” আসলেই ও এমন।শুধু ভালোই বসতে মন চায়।একটু টক,একটু ঝাঁল,আবার একটু মিষ্টি।”
—” হুম।প্রথম দিন আমার কোমড় ভেঙেছে।সরি বলে আবার হুমকি ধামকি দিয়ে বলে যাতে প্রতিশোধ না নি।”
কথাটা বলেই হো হো করে হেঁসে দেয় অভ্র।তারপর বলে,
—” আর কেমন বোকা বোকা কথা বলে।ইংলিশ একদম পছন্দ না তার।এটা যে আবিষ্কার করেছে তাকে হাতের কাছে পেলে খুন করবে।আরো কত কি?ক্লাসে গেলে আমার শুধু ওর হি হি করে হাসা মুখটা দেখতে ইচ্ছে করে।আর আমাদের বাসায় আসার পরে থেকে তো আমাকে মোটেও ভয় পায় না।ক্লাসে চোখ মারে মাঝে মাঝে।তখন আমার কি অবস্থা হয় যানোস না।হাসবো না রাগবো বুঝিইনা।কখনো এত হাঁসে মনে হবে হাসির রানী,কখনো এত কান্না করে মনে হয় কান্না দেবি।আর রাগ গুলোও সুন্দর।সবই সুন্দরওর কথা গুলো তো আরো সুন্দর। বোকামি গুলো দেখে মজা পাওয়ার মত।”
রাফা আগ্রহের সাথে সব শুনছে।এতটা মনোযোগ দিয়ে সাফাকে তার ভাই পর্যবেক্ষন করতো এটা তো সে কখনোই দেখে নি।ইশশশ্ কত নিখুঁত ভাবে সব তুলে ধরছে।রাফা কিছুক্ষণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।মেয়েটার কথা বলতেই মুখটা চকচক করে উঠে।রাফা এবার প্রশ্ন করে বলে,
—” কবে থেকে ভালোবাসতে বলো তো??”
অভ্র রাফার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে বলে,
—” যানি না।নিভ্রর সাথে দেখেই খুব কষ্ট হত। তখন থেকেই ফিলিংসটা আঁকড়ে ধরেছে।যানোস ও যখন হুমড়ি খেয়ে বুকে পড়েছিলো অদ্ভুত এক অনুভুতি হয়েছে।মনে হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবী অন্যরকম হয়ে গেছে।সাদা দুনিয়া রঙ্গিন লাগতে শুরু করেছে।আর ওর চোখ বুজে সরি বলা ইশশশ্।বুক ছিঁড়ে ফেলার মত অবস্থা।কিছু মুহূর্তের জন্য সব থমকে গেছে।সব।সেই পাঞ্জাবিটা আমি এখনও একুই ভাবে রেখে দিয়েছি।পানিও লাগতে দি নাই।ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধ লেগে আছে।ওটা রেখে দিবো।ওর হাতের ছাপ ও আছে।সেদিন চুলগুলোও উপছে আমার বুকে পড়েছিলো।হৃদয় হরন করার মত সেই দৃশ্য। প্রথম দিন ও নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো।আমাকে তুলে বলে কি না অনেক ভারী।টিচার হিসেবেও পাত্তা দেয় নাই।”

অভ্র আবার হাঁসে। চোখে পানি গড়াগড়ি করছে।রাফা অভ্রর পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
—” এক কাজ করলে কেমন হয়??ওকে তুমি বিয়ে করে ফেলো!!”
অভ্র হেঁসে ফেলে উচ্চশব্দে। তারপর বলে,
—” ও কিছুদিনের ভালোবাসা।কিন্তু নিভ্র!ও তো আমার সব চেয়ে প্রিয় মানুষ।কত কিছু করেছে আমার জন্য।ছোট বেলায় যে মারামারি হয়েছে সেটা আমি করেছি।নিভ্র বরাবরি শান্ত ছেলে।ও মারামারি ঝগড়া এগুলো আগে পছন্দ করতো না।এখনোও করে না।তবে মারতে শুরু করলে সব শেষ করে ফেলে।সেদিন আমিই ছেলেটার মাথা ফাটিয়েছি। ভয়ে বাড়ি যেতে চাচ্ছিলাম না।আম্মু ছোট বেলায় খুব বকা ঝকা করতো তো তাই।নিভ্র নিজের কাধে দোষ নিয়ে হোস্টেলে চলেগেলো।আর আমাকে প্রমিস করালো যাতে কাউকে না বলি।আজ ভেঙে দিলাম প্রমিস।ও দেখিয়ে ভালোবাসে না।লুকিয়ে বাসে।তবে ওরটা সেরা।ওর জন্য সব করতে পারি।প্রথম ভালোবাসটাও ছাড়তে পারি।”

রাফা মুগ্ধ হয়ে দেখছে অভ্রকে। কতটা ভালোবাসা এদের মাঝে।রাফা যানে নিভ্র আগে যানলে কখনোই সাফাকে মনের কথা বলতো না।নিভ্রও যে ভাইয়ের জন্য সব পারে।রাফার খুব ভালো লাগছে।এত কষ্টের মাঝেও ভাইয়েদের মাঝে মিল দেখে।রাফা অনুরোধের সুরে বলে,
—” ভাইয়া থেকে যা না।কি হবে বল?তুই চলেগেছে পরিবারটা কেমন যেনো হয়ে যাবে।আম্মু তো কাঁন্না করতে করতেই শেষ হয়ে যাবে।সব এলোমেলো হয়ে যাবে।থেকে যা ভাইয়া!”
—” আরে বোকা আমি কি একবারেই চলে যাচ্ছি নাকি??নিজেকে একটু সামলে নিতে যাচ্ছি। ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখার মত কষ্টের আর কিছে নেই আমার মনে হয়।আমার ভিসন কষ্ট হয় বুঝলি ওদের একসাথে দেখতে।মাঝে মাঝে ভাবি ও দুইজন কেনো হলো না।বা আমরা আলাদা ভাবে কেনো আলাদা মেয়ের প্রেমে পরলাম না।তাহলে কত ভালো হতো বল।এত কষ্ট হতো না।অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করি।যদি ভুল ভাবে কিছু বলে দি তবে নিভ্র খুব কষ্ট পাবে।ওদের বিয়ের কথা শুনেই আমি রাতে ঘুমাতে পারছিনা।পরে তো আরো ভয়ংকর অবস্থা হবে।আমি চাইনা এমন কিছু হক।আর আম্মু তো ক্যারিয়ারের কথা ভেবে নিজেকে সামলে নিতে পারবে।সবই ঠিক আছে এত চিন্তা করার কিছু নেই বুঝলি।সব ঠিক হয়ে যাবে।এখন যা তো।”

রাফা ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।তারপর বলে,
—” তুমিও জীবনে বেস্ট কিছু পাবে ভাই।তুমিও পাবে।দেখে নিয়ো!!”

রাফা বেড়িয়ে যেতেই।অভ্র চোখমুখ মুছে।বেড়িয়ে পরে।তার এখন ঘরে থাকতে দম বন্ধ দম বন্ধ লাগছে।সব মনে পরছে গভীর ভাবে।একটু ফ্রেশ হওয়া উঁচিত। বাইরে যাওয়া উঁচিত। তাই বাড়ির বাইরে চলেগেছে।
______________________
সাফা ফ্লোরে বসে মুখে উড়না চেঁপে কাঁদছে। সে সব শুনে স্তব্ধ।তার নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। তার জন্য এত সুন্দর পরিবারের এমন অবস্থা?কিভাবে সে এটা পারলো।সাফা উঠে দাঁড়ায়। রুমে ডুকে উঁকি দিতেই বিছানায় ডায়রিটা দেখতে পায়।সাফার দম বন্ধ হয়ে আসছে।চোখের পানি যেনো থামছেই না।বড্ড অপরাধী লাগছে নিজেকে।তার জন্য শুধু মাত্র তার জন্য অভ্র দেশ ছেড়ে পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সাফার সব ঘুড়ছে।স্বপ্নেও সে এমন কিছু ভাবেনি।কি করবে না করবে কিছু মাথায় আসছে না।এত সুন্দর পরিবার যারা কিনা তাকে এত ভালোবাসা দিয়েছে তাদের সে কিভাবে এতটা কষ্ট দিতে পারে।পরিবার কি জিনিস সাফা এতদিনে এদের দেখে শিখেছে। এদের পরিবারই এখন ভেঙে যাবে তার জন্য??সাফা ফুফিঁয়ে কেঁদে উঠে।মেয়েরা তো ঘর, পরিবার তৈরি করে,সাজিয়ে রাখে,যত্নে রাখে তাদের মাধ্যমেই পরিবার তৈরি হয় তাহলে সে কিভাবে সব ভাঙ্গবে?এটা সে কিভাবে করবে?পরিবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। সাফা চোখের পানিতে তার জামার গলার অংশ ভিঁজে গেছে।সাফা ডায়রিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে।কিন্তু খোলার সাহস পাচ্ছে না।তার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে।কাঁদতে কাঁদতে সাফা ফ্লোরে বসে পরে।ডায়রির কয়েক পাতা এলোমেলো করে উল্টায়।আবার বন্ধ করে ফেলে।পড়ার ইচ্ছা, সাহস, দুটোই নেই। প্রচণ্ড ভয়ও লাগছে তার।সাফা ডায়রি কাত করতে গিয়েই একটা ছবি পরে যায়।সাফা হাতে নিয়ে নিজের চোখের সামনে ধরতেই সে নিজেকে দেখতে পায়।তার কান্নার বেগ বাড়ে।ছবিটা দেখেই তার আরো বেশি খারাপ লাগছে।সাফার সেদিনের লাইব্রেরিতে টেবিলে হাত দিয়ে ঘুমানোর ছবি এটা।সাফা চারপাশে দেখে।ছবির পিছনে ছোট অক্ষরে কিছু লেখা আছে।সাফা পড়ে,,,,,,,,
বলা হয়নি তোমায়
ছোঁয়া হয়নি তোমায়
ভিঁজানো হয়নি একপশলা বৃষ্টিতে আমার।
তুমি তো আকাশ।আকাশ শুধু দেখা যায়।তোমার মতই।ছোঁয়া যায় না।হাত বাড়িয়ে ব্যর্থ হতে হয়।আমিও তেমন ব্যর্থ।
তবুও কিছু করার নেই।
মনের কাছে আমি বাদ্ধ। এর উপড়ে জোড় নেই।তাই না চাইতেও, না পেলেও, না ছুঁয়ে দেখলেও
আমার মন তোমাকে ভালোবাসে।

সাফা আর দাঁড়ালো না।সে কিছুতেই তার এত সুন্দর পরিবার ভাঙ্গতে দিবে না।মা থেকে ছেলেকে দূরে সরাতে পারবে না।ভাই থেকে ভাইকে আলাদা করতে পারবে না।কিছুতেই না।নিভ্রর কথা মনে হতে সাফার কান্না আরো বেড়ে যায়।নিভ্রকে সে সত্যই খুব ভালোবেসে ফেলেছে।প্রথমে তো এতটা কষ্ট হয়নি তবে এখন কেনো হচ্ছে?মনে হচ্ছে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিভ্র এই কয়েক দিনে এতটাই ভালোবাসা দিয়েছে যে নিভ্রর ভালোবাসায় ডুবে সাফা এখন দেওয়ানা হয়েগেছে। নিভ্রর ভালোবাসার নেশা লেগে গেছে।আসক্ত হয়েগেছে সাফা।তার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তার আর নিভ্রর বিয়ে হলে অভ্র চলে যাবে।তাই তাকেই সব ছেড়ে চলে যেতে হবে।এদের মাঝে থাকা মানে পরিবার ভেঙে দেওয়া।এদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করা।যা সাফা করতে পারবে না।
সারা রাত সাফা কেঁদেছে। বাবাকে সব বলেছে।তার সাথেই বেরিয়ে এসেছে।ছেঁড়ে এসেছে ভালোবাসা।পরিবারের জন্য নিজেকে ত্যাগ করেছে।নিভ্রকে ছেঁড়েছে।
___________________

আজকের সকালটা নিভ্রর কাছে কেমন যেনো বিষন্ন বিষন্ন লাগছে।ঘুমটাও ভালো হয় নি।আকাশও মেঘলা।সব কেমন নিস্তব্ধ। নিভ্র ফ্রেশ হয়ে আসে।সকাল দশটায় তাদের বের হতে হবে।সাফার সাথে সকাল থেকেই দেখা হয়নি।একবার দেখা করলে ভালো হয় ভেবে নিভ্র রুম থেকে বাহিরে আসে।সাফার রুম তার কয়েক রুম পরেই।রুমে ডুকেই সাফাকে পেলো না।সারা রুম খুঁজলো।তারপর নিচে ছাঁদে সব ঘুড়ে নিভ্রর মাথায় হাত।ভয়ে হাত পা কাঁপছে।গেলো কই?নিভ্র আবার বাড়ির প্রতিটা রুম, পিছনে আগে সব খুজে ফেলেছে।কিন্তু কোথাও সাফাকে বা তার বাবাকে খুজে পাচ্ছে না।নিভ্রর বুক কাপঁছে।কেমন যেনো অজানা ভয় তাকে আঁকড়ে ধরেছে।নিভ্র ফোন বের করে কল করে বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞেস করে।সবার এক কথা কেউ দেখে নি।নিভ্রর অবস্থা খারাপ।পাগলের মত চুল টানছে।অভ্র ঘরে নেই।সবাই টেনশনে আছে।নিভ্রর রাগ ভয়ংকর সবাই যানে। নিভ্র আবার সাফার রুমে যায়।চারপাশে ভালো করে দেখে।কিছুই পেলো না।নিভ্রর প্রচন্ড ভয় করছে।সাথে রাগ।মাহি আর তার বাবাকে আলরেডি হুমকি দিয়ে দিয়েছে।কয়েকবার তেড়েও গেছে।অনেক সময় পরে নিভ্রর মনে পরে টেবিলের উপরের সাদা খাতাটা।নিভ্র আবার রুমে যায় খাতা খোলে।তাতে কালো কালিতে লেখা,
——-আমাদের পথ আলাদা।তাই আগেই আলাদা হওয়া উঁচিত। তাই আলাদা হয়েগেলাম।আর খুঁজবেন না।কারন কেউ নিজ থেকে হারিয়ে যেতে চাইলে তাকে খুজে পাওয়া যায় না।
——সাফা……
নিভ্রর যেনো মাথা আকাশ ভেঙে পরেছে।হৃৎপিন্ডের ভয়ংকর ভাবে লাফাচ্ছে।নিভ্রর সব কিছু অন্ধ করার মনে হচ্ছে। সাফা কেনো এমন লিখলো?কোথায় গেলো?কখন ফিরবে?আদো আসবে তো?খুজে পাবে তো?নানা কথা নিভ্রর মাথায় ঘুড়পাক খাচ্ছে।রাগে কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসছে।এটা সাফার হাতের লেখা। এটা নিভ্রকে আরো রাগিয়ে দিচ্ছে। রাগে হাত পা থরথর করে কাপঁছে। এরপরই শুরু ভাঙ্গচুর।নিভ্র আশেপাশের সবই ভাঙ্গছে।টেবিল ছুঁড়ে মারছে তো ঘরের আয়না ভাঙ্গছে।তাকে আঁটকে রাখা দায়। এটা সবাই যানে।কিন্তু আটকানোর চেষ্টও কেউ করছে না।শুধু অভ্রকে কল করছে।অভ্র ছাড়া সব অসম্ভব। নিভ্রর আশেপাশে কেউ নেই।সবাই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। কিছুই বুঝতে পারছে না কি হয়েছে।অভ্র দ্রুত রুমে ডুকে পরে।নিভ্রর দুহাত কেটেঁ গেছে।গড়গড় করে রক্ত প্রবাহ হচ্ছে। অভ্র উত্তেজিত গলায় বলছে,
—” ভাই ভাই হলো কি??এগুলো করার মানে কি??নিভ্র পাগল হয়েছিস নাকি?”
নিভ্র কিছুই বলছে না।তার রাগ যেনো আরো বেড়ে গেছে।কি করবে বুঝতে পারছে না।অভ্র হুট করেই জড়িয়ে ধরে।নিভ্র মুহূর্তেই শান্ত বাচ্চার মত বুকে আছড়ে পরে।অভ্র টাল সামলাতে না পেরে বসে।সাথে নিভ্রও।অভ্র নিজেরই ভয় লাগছে। নিভ্রর চোখমুখ দেখে।লাল হয়ে আছে।তবুও শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
—” কি হয়েছে?সকাল সকাল পাগলামি করছিস কেনো??”
নিভ্র চুপ।অভ্র নিভ্রর সামনের চুল সরিয়ে দেয়।তারপর কয়েকবার একুই প্রশ্ন করে।নিভ্র রেসপন্স করে না।হঠাৎই সেন্সলেস হয়ে পরে।বাড়ির সবাই হা হয়েগেছে এমন অদ্ভুত কান্ডে।কারো কিছু বলার নেই।কিছু বুঝতেই পারছে না আসলে হলো কি??সাফা চলে গেছে শুনে সবার মনে একুই প্রশ্ন ঘুড়ছে.. কেনো চলে গেছে??কেনো??কোথায় গেলো??কখন আসবে?আদো আসবে তো???
.

#একঝাঁক~জোনাকির~আলো🍁
#writer~হাফসা~আলম 🍂
.
.
৪২
বর্তমান_________________
ঠান্ডা ভিজাঁ বালিতে সাফা বসে আছে।তার সামনে বিশাল হৃদয়ের সমুদ্র।যার এক একটা ঢেউ এসে ভিঁজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে পা জোড়া।আকাশে বিশাল চাঁদ।থালার মত লাগছে সে চাঁদকে।সাফার দৃষ্টি চাঁদ থেকে সমুদ্রে নামে।আবার চাঁদে যায়।সমুদ্রের এক একটা ঢেউ তার মনের শূন্যতায় এসে বারি খাচ্ছে। উত্তাপ ঢেউয়ের শব্দে মনের ক্ষত জেগে উঠে হু হু করে।মনের বিষাদময় কষ্টে আবার কাঁপে বুকের বাঁ পাশের হৃৎপিন্ডটা।সাফার হাতে পায়েল আর আংটি।আজ নিয়ে শতখানেক বারের উপর সে এগুলো ফেলে দিতে চেয়েছে।কখনো নদীতে কখনো পুকুরে কখনো রাস্তায়।কিন্তু দিতে পারলো না।মুঠোয় ভর্তি করে বসে রইলো প্রতিবারের মত।একটা ঢেউ যেমন ভিঁজিয়ে দিয়ে রূপ পরিবর্তন করে এই বালির ঠিক একুই ভাবে একটা বছর তার রূপের কত পরিবর্তন করে দিয়েছে।ভেবেই সাফা তাছিল্যের হাসি হাসে।জীবন কত বিচিত্র।বিচিত্র এর রূপ রং।আর সবচাইতে বিচিত্র এর ভালোবাসা নামক যন্ত্রনা।একবছর আগেও যে ভালোবাসা ছিলো আবেগের আজ তা কতটা গভীর কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে তা বুঝা দায়।এই ভালোবাসা চঞ্চল সাফারানী থেকে বুঝদ্বার, কঠিন মুখের সাফার জন্ম দিয়েছে।ভালোবাসা এক জীবন্ত প্রান।তা না হলে এত পরিবর্তনের ক্ষমতা এর থাকতো না।প্রেম আর ভালোবাসার মাঝেও সাফা বিস্তর ভিন্নতা খুঁজে পেয়েছে।প্রেম যখন গভীর হবে তবে তা আর প্রেম থাকে না।নাম নেয় ভালোবাসার।সেই রাতে যতটা সাহস নিয়ে প্রেম ছাড়তে পেরেছে আজও ততটা সাহস নিয়ে ভালোবাসা বুলতে পাড়েনি। এটাই পার্থক্য।সাফার হেজাবের এক অংশ উড়ছে বাতাসের তালে।এই বাতাস হৃদয়কে ঠান্ডা না করে আরো উত্তেজিত কেনো করে তা সাফার জানা নেই।শরীরের উড়নাটা উড়ে এসে একবার মুখে পরে আবার তা সরে যায়।সাফা নিজের দু হাত পিছনের বালির উপড় দিয়ে রেখেছে।চোখ তার শূন্যে এবার।কত পুরোনো আবেগ আবার জেগে উঠেছে মনে। কত তিব্র এর ক্ষত।বাস্তবতার কাছে ভালোবাসা নামক ভয়ংকর কথাটাও হার মেনে নেয়।সাফার চোখের দুই কোনা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অসংখ্য পানির কনা।এটা নতুন না পুরানো ক্ষতর পুরোনো পানি।যা প্রতি রাতে এই সমুদ্রের পাড়ে,বা নদীর তীরে কখনো বালিশের বুকে নিজেদের জায়গা করে নেয়।সাফা কান খাড়া করে,সমুদ্রের সাঁ সাঁ শব্দ কানে এসে ধাক্কা খায় প্রবল ভাবে।হৃদয়ের কোনে কোনে টুকরো টুকরো ভালোবাসারা জেগে উঠে সাথে তার ক্ষত।

—” আর কত সময় বসে বসে চোখের পানি ফেলবি মোহারানী??”
ঝুমার এমন কথায় সাফা কপাট রাগ নিয়ে তার দিকে তাকায়।ঝাঁঝালো গলায় বলল,
—” ঝুমা কতবার বলেছি আমাকে এই শব্দে ডাকবি না??তারপরও একুই ভুল করতে তোর ভালো লাগে??আমার কিন্তু শুনতে ভালো লাগে না।”
ঝুমা বুঝতে পেরে বাসে বসে।সাফার মত সামনে তাকিয়ে বলল,
—” এতটা ভালোবাসলে ছেড়ে কেনো এলি?? সবার উপড়ে ভালোবাস। তাই তোরও ছেঁড়ে আসা উচিঁত ছিলো না।”
সাফা ঝুমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।তারপর বলল,
—” কে বলেছে সবার উপড়ে ভালোবাসা??আমি যদি বলি সবার উপরে ভালোবাসার মানুষ গুলো!! ”
—” ওই একুই ব্যাপার।”
—” মোটেও না।দুটি দুই রকম।যেটা ছেড়ে এসেছি সেটা আমার ভালোবাসা।আর যাদের জন্য ছেড়ে এসেছি তারা ভালোবাসার মানুষ।তাই দুইটাই ভিন্ন।”
ঝুমা বিরক্তির সাথে শ্বাস নেয়।তারপর দাঁড়িয়ে সাফার হাত টানতে টানতে বলে,
—” হইছে তোর জ্ঞান দেওয়া। তাহলে চল। সবাই ও দিকে।আর তুই এদিকে একা একা বসে কি সব চিন্তা করছ।চল।”
—” যাবো কিছুক্ষণ পরে।তার আগে বল তুই তোর ভালোবাসা ছেঁড়ে আমার কাছে কেনো পরে আছিস?”
—” অভি তোকেও অনেক ভালোবাসে।তোর কাছে থাকলেই ও বেশি খুশি হবে।আর তুই নিজেই আমার ভালোবাসা।ওই দিন যদি তোর সাথে বাসে হুট করে দেখা না হত তাহলে তো তোকে কখনই খুঁজে পাইতাম না।আল্লাহ বাঁচাইছে। আর এতে অভি কষ্টে থাকলেও খুশি।”
—” এটা বুঝাতে চেয়েছি।এই কারনেই ছেড়ে এসেছি।”
ঝুমা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভাবে।তারপর বলে,
—” ভাই এবারো বুঝলাম না।”
—” নিজ দায়িত্ব বুঝে নে।ইডিয়ট।এসব ছাড়া।তুই প্রতিদিন বাড়ির ছেলেমেয়ে গুলোরে আমার পিছনে পিছনে নিয়ে আসছ কা বলতো??”

ঝুমা বলে না।হাঁসে শুধু।সেদিন সাফার বাবা আর সাফার সাথে হুট করেই বাসে দেখা হয়ে যায় ঝুমার।ঝুমা সাফার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু।তাই সব কথা গুলো শুনে সাফার সাথে সেও পারি জমায় লুকুচুরি খেলায়।একসাথেই থাকে তারা।তারা কক্সবাজারে থাকে এখন।তবে বিগত একমাস এখানে থাকছে।সাফা একজায়গায় থাকে না।নানা সময় নানা জায়গায় থাকে।লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু পরীক্ষা দেয় ভার্সিটি যেয়ে।তাছাড়া সে তার এলোমেলো জীবন নিয়েই থাকে।

সাফা ঝুমা বাচ্চারের পাশে বসে।বাচ্চা গুলো তাদের বাড়িওয়ালার।সমুদ্রের একটু দূরেই তাদের বাড়ি।সাফা এখানে কিছু ছেলেমেয়েকে পড়ায়।সারা দিন নিজেকে ব্যস্ত রাখে। আর এই একমাস ধরেই সমুদ্রের সাথে তার বেশ ভাব হয়েছে।তাই এখানে এসে বসে।

সাফারা বসে আছে।সবাই গল্প করছে।সাফা উদাসীন হয়ে বসে আছে।তার চোখ সমুদ্রে।তাদের একটু পাশেই কিছু তরুণ তরুণী বসে গান বাজনা করছে।তারা এখানে ঘুরতে এসেছে বুঝাই যাচ্ছে।গল্পও করছে তারা।গল্পের বিষয় ভালোবাসা।সাফা কান পেতে সেসব শুনছে আর মনের অজান্তেই হাসছে।যে বিষয়টা থেকে সে পালিয়ে বেড়ায় সেটাই তার আশেপাশে আলোচনা হয়।এমনকি সে ভালোবাসার জায়গায় বসে আছে।সমুদ্রে তো ভালোবাসার একটা নিদর্শন। তার কাছেই সে প্রতিরাতে নিজের বিচ্ছদের গল্প শুনাতে আসে।সাফা মনে মনে ভাবে সমুদ্র নিশ্চুই তাকে নিয়ে হাসে।হাঁসারই কথা।সাফা নিজেই হাঁসে।একটা মেয়ে বলে উঠে,
—” তোর চিরকুটে লেখা প্রেম ভালোবাসা কি এবং বিচ্ছদ কি।ভয়ংকরতা ব্যাখা করো?? বল এবার।”
বলেই সবাই হেঁসে উঠে।ছেলেটা করুন সুরে বলল,
—” ভাই প্রেম তো প্রেম আর ভালোবাসা তো ভালোবাসা এটা বুঝানের কি আছে?বাদদে আর একটা তোল!!”
—” হবে না।তোরে এটাই বুঝাতে হবে।তুই জীবনে কম প্রেম তো করস নাই।এখন বলতে পারস না কা??
—” ভাই প্রেম করি ভালো কথা এত ডিটেল্স জানমু কেমনে??ছাড় না।”
—“না না”
এবার আশেপাশে সবাই চেঁচিয়ে উঠেছে।আর বেচারা চিন্তায় মগ্ন।সাফা কান পেতে সব শুনছে আর হাসছে।তার ভালো লাগছে অনেক দিন পরে এদের কথা শুনে।সাফা উঠে ওদের পাশে বসে।সবাই অবাক।সাফাকে দেখে।সাফা গভীর গলায় বলে,
—” পিকনিকে এসেছ বুঝি??”
—” হুম।”একটা মেয়ে বলে।
—” কোন ক্লাস??”
—” এবার অনার্স ফার্স্ট এয়ার।”
সাফা আবার হাঁসে। এই বয়সেই তো.. আর ভাবে না।পুরোনো স্মিতি। সবই পুরাতন।তার কাছেও হয় তো।সাফা আবার উঠতে চায়।ছেলেটা বলে,
—” আপনি বলতে পারবেন এই আজাইরা প্রশ্নের উত্তর??”
সাফা ঘুড়ে তাকায়।চোখে মুখে কঠিন দৃষ্টি। ছেলেটা দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বলে,
—” না মানে আপনি ওই কথাটা শুনেই এদিকে এসেছেন তাই বললাম।রাগ করলে সরি।”

সাফা আবার বসে।ঝুমা দূর থেকে দেখে।সাফা সমুদ্রের দিকে চোখ রাখে।একদম গভীরে।তারপর বলা শুরু করার ভঙিতে বলে,
—“প্রেম জীবনের একটা অদ্ভুত পৃষ্ঠা।এই পৃষ্ঠা তুমি না পড়তে চাইলেও তোমাকে পড়তে হবে।এ যেনো জ্বলন্ত আগুন।এতে না জ্বলে তুমি পার পাবেনা।এর প্রথম অনুভুতি তোমাকে সব দিক থেকে থমকে দিবে।ভাসিয়ে নিবে বহু থেকে বহু দূর।সমুদ্রের উত্তাপের মত এর ঢেউ।তুমি ভাসবে এই ঢেউয়ের মাঝে।কিন্তু,কিন্তু প্রেম তো আগুন।আর আগুন নিয়ে খেললে যদি তুমি না জ্বলো তবে খাটি হবে কিভাবে?তাই প্রেমে জ্বলতে হয়।এটা যতটা দ্রুত তোমাকে আক্রমণ করবে ততটা দ্রুত তোমাকে মুক্তি দিবে এটা ভাবা নিছক বোকামি।এটা মুক্তি দেওয়ার নয়।এই যন্ত্রনা কঠিন, ভয়ংকর কঠিন এর প্রহার।তোমার হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরে এর আক্রমণ চলে।সবার প্রেম আলাদা।কারো সাথে কারো প্রেমের মিলবন্ধন নেই।আল্লাহ মানুষ যেমন আলাদা আলাদা বানিয়েছে তাদের মাঝের সব সত্তাকে আলাদা আলাদা রূপ দিয়েছে।প্রেমেও দিয়েছে আলাদা অনুভুতি ।মেয়েদের প্রেম পুুরুষের চেয়ে আলাদা।মেয়েদের প্রেম লুকানো।একান্ত নিজের করে রাখার ক্ষমতা আছে এদের।পুুরুষ জাহের করতে পারে নারী লুকিয়ে রাখতে পারে।এটাই প্রেমের আসল নাম।প্রেম তোমাকে বুঝিয়ে দিবে তুমি নিজের নও।এটাই তো পার্থক্য। প্রেম ভালোবাসা আর ভালো লাগার মাঝে।প্রেম বাতাসের মত এসে তোমার মনের কুড়িকে জাগিয়ে দিবে ভালোবাসার নামে।সে বাতাস চলে গেলেও এর শীতলতা তোমাকে দগ্ধ করবে তিলে তিলে।প্রেমে হার নেই।যা আছে সব জিত।এই যেমন তুমি তাকে পেলে না এটা জিত।পাওয়াতে সব সময় জিত থাকে এটা ভুল।হারেও থাকে বহু জিত।ভালো থাকার নামই ভালোবাসা।তাই সে ভালো থাকলেই হবে।এটাই তোমার জিত।তাকে মনের মাঝে রেখে একান্তে কষ্ট পাওয়াটা হল বিচ্ছেদ।এর প্রতিটা সময় মনের মাঝে পুষে রাখা হল এর ভয়ংকরতা।”

সাফা উঠে দাঁড়ায়। আজ হৃৎপিন্ডটা বেশিই ভারী হয়ে আছে।কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসছে।সব কিছু এলোমেলো লাগছে।সবাই মুগ্ধ শ্রোতার মত সব শুনেছে।সাফা কিছুদূর যেতেই ছেলেটা চেঁচিয়ে বলল,
—” আপনি এত সুন্দর ভালোবাসার অর্থ বুঝেন।যে আপনার প্রেমিক বা প্রিয়তম হবে সে খুবি লাকি।”

সাফা ঘুড়ে তাকিয়ে হাঁসে। তারপর আবার চিৎকার করেই বলে,
—” সে সবচাইতে অনলাকি ছিলো।”

সাফা হাঁটছে। ঝুমা তার পাশে।সাফার চোখমুখ ফুলে গেছে।ঝুমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।আবার দৌড়ে সাফার পাশে পাশে হাঁটে।তারপর বলল,
—” ভাই আমার মনে হয় উনি এত সময়ে বিয়ে করে ফেলেছে।তোর কি মনে হয়??”
সাফা থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুড়িয়ে বলে,
—” উনিটা কে??”
—” আরে নিভ্রনীল। উনার জন্য মেয়েরা তো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।মনে তো হয় বিয়েটিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চার বাপও হয়েগেছে। না একবছর হলেও হিসাব করলে আরো অনেক মাস চলেগেছে না।তাই বললাম।”
সাফা কিছু বলল না।চুপ করে থাকে।ঝুমা আবার বলে,
—” তোকে অনেক খুঁজেছে উনি।এমন কি এ..
—” তোকে প্রশ্ন করেছি??এসব বাদ দিতে কয়বার বলেছি??তুই আমার সাথে কথাই বলিস না।ফালতু।”

সাফা বাড়ির ভিতরে ডুকে যায়।ঝুমা মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ তারপর সেও ডুকে যায়।
______________________________
নিভ্র ঘরের প্রতিটা জিনিস নিখুঁত ভাবে ভেঙেছে।টিভি থেকে শুরু করে সোফা। সব আসবাবপত্র ভেঙে ফেলেছে।এতে তার পরিবারের প্রতিটি মানুষ খুশি।নিভ্র যেদিন জিনিস ভাঙে সেদিনই সবার সাথে দুইচারটি কথা বলে।এতেই তারা খুশি।আজও ভেঙেছে।কিন্তু আজকে নিভ্র বেশিই রিয়েক্ট করছে।চিৎকার চেঁচামেচি করছে।বলছে,
—-“কয়বার বলেছি মেয়েদের আমার কেবিনে পাঠাতে না।কয়বার। তবুও কেনো পাঠালে??কেনো??”

কথাটা বলেই টেবিলের গ্লাসস ছুঁড়ে মারে।রাগে চোখমুখ লাল হয়ে আছে।সবাই এবার ভয় পাচ্ছে।অভ্র পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।কিছুক্ষণ আগেই ঘরে ডুকেছে।ডুকেই এসব দেখছে।নিভ্র বুকে হাত দিয়ে এবার বসে পড়ে।হঠাৎ করেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে।অভ্র ডাক্তারকে কল করেছে।নিভ্রকে তার রুমে রাখা হয়েছে।ফ্যামিলির সব মেম্বরের অবস্থা এমনেই খারাপ।তার উপড় আজ কি এমন হয়েছে নিভ্র এতটা হাইপার এটা অনেকেই বুঝতে পারছে না।ডাক্তার কঠিন গলায় বলে,
—” দেখো আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি ওকে কন্ট্রোল করো।নিভ্রর হার্ট দিন দিন প্রচন্ড দূর্বল হয়ে পড়ছে।এতে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বেশি।তাই ওর এত উত্তেজিত হওয়া মোটেও ভালো না।”

ইফতেখার হু হু করে কেঁদে দেয়।আজ নিভ্রর এতটা হাইপার হওয়ার পিছনে তিনি দায়ি।এক সুন্দরী মেয়েকে নিভ্রর সহকারীট পোস্টের জন্য নিজে সুপারিশ করে পাঠিয়েছে।মেয়েটাও ডাক্তার।যেটা নিভ্রর মেজাজ আরো খারাপ করে দিয়েছে।তিনি কি করবে??তার ছেলে দিন দিন উম্মাদের নেয় পরিনত হচ্ছে। এতদিন পরে ভালো হয়েছে।এখন যদি আবার অসুস্থ হয়ে পরে!!সে ভয়েই তিনি চাচ্ছে নিভ্র নিজের জীবনে এবার এগিয়ে যাক।কিন্তু নিভ্র আজ এতটা হাইপার হবে এটা তিনি বুঝতে পারেনি।ছেলের এমন খারাপ অবস্থা আর নিতে পাড়ছেনা তিনি।সাফা নামের মেয়েটাকে পেলে যে কি করবে তিনি নিজেও জানে না।সব তার জন্যই হয়েছে।এত ভালোবাসার প্রতিদান এভাবে দিলো??কিভাবে পারলো?? ইফতেখার আবার কেঁদে উঠে।সাখাওত স্ত্রীর দিকে তাকালেন না।ছেলের চিন্তায় তার ঘুম হয় না। বাড়ির সবাই চিন্তিত হয়ে আছে।মাহবুব বললেন,
—” ওকে কন্ট্রোল করা আমাদের হাতে নেই।এটা তুই যানছ আশিক।তবুও কেনো বলছ?”
ডা.আশিক মুখ ভার করে বললেন,
—” জানি।তবুও করতে হবে।আর সাফাকে খুজে বেড় কর।আমি এত কিছু বুঝিনা।তোরা কিসের এত বড় লোক বলতো??এত কিসের পাওয়ার??এসব পানিতে ফেলেদে।একটা পুচকু মেয়েকে খুজে বেড় করতে পারলিনা।মর তোরা।আর তুমি সাখাওত ছেলের প্রতি মনোযোগী হও সবাই।আমার লাইফে আমি এমন ভয়ংকর প্রেমিক দেখি নাই।ভালোবাসা যে এতটা ভয়ংকর আর ডেস্পারেট করতে পারে নিভ্রকে না দেখে বুঝতেই পারতাম না।আল্লাহ।একজন হার্টসার্জেন ও। তবুও নিজের প্রতি এত উদাসীন কেনো??আল্লাহ সাফাকে ফিরিয়ে দেয়।আমার এত বছরের ক্যারিয়ারে এই প্রথম রোগীর জন্য ঔষুধ না একজন ভালোবাসার মানুষকে চাইছি।ওই মেয়ে বাদে আমার মনে হয় না নিভ্র জীবিত থাকবে।সরি খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই।এত দিন ওর টিকমেন্টের করে আমি এটাই বুঝেছি।”

কথাগুলো বলেই তিনি থামলেন।দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কিছু সময়।বাড়ির সবাই কেঁদে দিয়েছে।রাফা তো প্রচন্ড চিৎকার করেই কাঁদছে।নিশান তাই তাকে নিয়ে রুমের বাহিরে চলে গেছে।আশিক আবার বলেন,
—“অভ্র রেগুলার ঔষুধ দিবে। এখন আসি।ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে ঘুমাবে এখন ও।তোমরা প্লিজজ ওকে খুঁজে বের করো।নিভ্র আমার স্টুডেন্ট ছিলো।ওর মস্তিষ্ক বাকি সবার মত সাধারন না।ভিন্ন অসাধারণ মস্তিষ্ক তার।তাই সব দিকে পারদর্শী ও।একবার যা ভেবে নেয় তাই থাকে মাথায়।প্রচন্ড বিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট ছিলো।একটা কাজ করবে ভাবলে সেটাই করে সে।তাকে নিয়ন্ত্রণ করা দায়।আর ছোট থেকেই একা থাকতে থাকতে আর প্রচন্ড যিদ্দি হওয়ায় নিভ্র অন্যরকম হয়েছে।ওর যা চাই তা না পেলে ও সত্যি ডেস্পারেট হয়ে পরে।অভিজ্ঞাতা থেকে বলছি। ডু সামথিং।”
.
.
#চলবে__________________
নিভ্রর চিন্তায় কার কার ঘুম হারাম হয়েছে??বলেন বলেন শুনি??😶😶
বিচ্ছেদ ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তাই এটা গল্পে নাটকে, ছবিতে এমনকি জীবনেও থাকে।তবে হ্যা যারা অভ্র আর রাফাকে দোষি মনে করেন তাদের জন্য কিছু কথা।আমার মতে এদের কোনো দোষ নেই।ওরা কথা বলার সময় কিন্তু সাফাকে দেখেনি।আর অভ্র আমার প্রিয় একটা ক্যারেক্টার।ওর মত এত ত্যাগ কেউ করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।তাই ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।আর সবার প্রিয় নিভ্রর কি হবে সেটাই চিন্তা সবার।আহ নিভ্র আহ। কি লাকি আপনি।সবাই মনে প্রানে আপনাকে ভালোবাসে।এত ভালোবাসা আপনি কই রাখবা জানি না।🤔🤔

_ভুলগুলো আল্লাহর দেওয়া মহান গুন ক্ষমার চোখে দেখবেন _______🍂

®হাফসা_________________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here