কৃষ্ণবেণী পর্ব -২৪+২৫

#কৃষ্ণবেণী
#পর্ব_২৪
#নন্দিনী_নীলা

নীলগিরি কে বলা হয় বাংলার দার্জিলিং। দীগন্ত জুড়ে সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি যে কাউকে এর রূপ দিয়ে বিমোহিত করে রাখবে। যদি সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় মেঘ ছোঁয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে নীলগিরি সেই ইচ্ছে পূরণ করবে। নীলগিরি পাহাড় চূড়াতেই রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটক কেন্দ্র গুলোর একটি নীলগিরি পর্যটক কেন্দ্র। বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ২২০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের নাম নীলগিরি।

নীলগিরি চারপাশে চোখ মেলে তাকালে সারি সারি মেঘের পাহাড়ে আছড়ে পড়া ও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য সবাইকে বিমোহিত করবে। নীলগিরির চূড়া থেকে পাহাড়ের সারির পাশাপাশি আকাশ পরিস্কার থাকলে চোখে পড়বে বগালেক, বাংলাদেশের পঞ্চম সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া কেওক্রাডং, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও সাঙ্গু নদী।
ভোর সকালে তৃষ্ণাকে তুলে নিয়ে এসেছে এই অপরুপ সৌন্দর্যের দৃশ্যে। তৃষ্ণার শশুর শাশুড়ি গতকালের জার্নিতে নেতিয়ে গেছে আরা আসেনি।
এসেছে তৃষ্ণা – জায়ান, জোভান, আয়ান- উষসী, আরিফ ও উর্মি।
তৃষ্ণার এক হাত খুব যত্ন সহকারে ধরে জায়ান প্রতিটা পা ফেলছে আর তৃষ্ণা মুগ্ধ নয়নে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে জায়ান খুব সুন্দর করেই সব চিনিয়ে দিচ্ছে।
তৃষ্ণা গ্রামের মেয়ে অনেক হাঁটার অভিজ্ঞতা আছে। জায়ানের বাহু ধরে হাঁটছে।

এদিকে উষসী একটু হেঁটে হাঁপিয়ে গেছে। এদিকে আয়ান ভালো হ‌ওয়ার নাটক করে উষসীর মন জয় করে ফেলেছে অনেকটাই। এখন উষসীকে হাঁপিয়ে যেতে দেখে ও জোর করে পাঁজকোলে তুলে নিলো ফট করেই।
উষসী চোখ কপালে তুলে বলল,” কোলে নিচ্ছো কেন?”

” তুমি হাঁটতে পাচ্ছ না তাই।”

” আমাকে কোলে নিয়ে তুমি হাঁটতে পারবে না নামাও।”

“পারব। তুমি আমার গলা জড়িয়ে ধরো।”

উষসী তো খুশিতে বাক বাকুম। আয়ান উষসীর মনের সব দুটানা কাটাতেই এই কাজ টা করেছে। ওর চোখে ভালো হ‌ওয়ার জন্য। উষসীর চাহনি দেখে মনে হচ্ছে উষসী ওকে বিশ্বাস করতে পারছে। উষসী থেকে থেকে লজ্জা পাচ্ছে। এদিকে আয়ান ঘেমে একাকার। এই উষসী যে এতো ভারি হবে ও বুঝতে পারে নাই। ওকে দেখে তো চিকন‌ই লাগে কিন্তু এতো ওজন হবে কে জানতো।
ভালো সাজতে গিয়ে এখন নাকানিচোবানি খাচ্ছে।
উষসী খুশিতে আয়ানের গলা জড়িয়ে লজ্জায় কাঁচুমাচু হচ্ছে। এদিকে আয়ান নামাবে কি করে ভেবে না পেয়ে আর কুলাতে না পেরে ঠাস করে কোল থেকে ফেলে দেয়। উষসী ওমাগো বলে চিৎকার করে ওঠে‌।
জায়ান আর তৃষ্ণা ওদের পেছনে ছিল। ওদের দুজনের কান্ড কারখানা এতোক্ষণ দুজনেই পর্যবেক্ষণ করেছে। এই ঘটনা ঘটতেই তৃষ্ণা জায়ানের বাহু থেকে মাথা উঠিয়ে নিলো মৃদু চিৎকার করে।
” এএএ পরে গেল তো।”

সবাই ছুটে এসে উষসী কে মাটি থেকে তুলেছে। আয়ান চোরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বেশি ভালো হতে গিয়ে এখন আরো খারাপ হয়ে গেল।
উষসী তো ওমাগো, বাবাগো, আমার কোমর ভেঙে গেল গো বলে চেঁচিয়ে কাঁদছে।
তৃষ্ণা উষসীর শরীরের ময়লা পরিষ্কার করে দিলো। উষসী এখন দাড়াতেও পারছে না। দাঁড়ানো থেকে ফেলে দিছে ওর কোমরের অবস্থা শেষ।

উষসী আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,” তুমি ইচ্ছে করে আমাকে ফেললে তাই না। বেশি ভালবাসা দেখাতে গিয়ে আমাকে বিছানায় ফেলার ব্যবস্থা করে দিলে। ব‌উকে কোলে নিয়ে একটু হাঁটতেও পারো না। এতো ফিটফাট শরীর নিয়ে ঘুরো কেন? অকৃতজ্ঞ স্বামী। এখন আমি হাটবো কি করে।”

জায়ান বলল,” যে ফালিয়েছে সেই কোলে করে নিয়ে যাবে।”

আয়ান বলল,” আমি তো নিয়ে যেতেই চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার গায়ে যে এতো ওজন আমি কি জানতাম। কীভাবে যে পরে গেলে। এখানে কারো পায়ে ব্যথা হলো না তোমার কেন হলো।”

” এই এই তোমাকে কি আমি বলেছি আমায় কোলে নাও। নিজে জোর করে নিজেই ফেলে দিলে‌। আবার কোলে নাও বলছি তোমার জন্য আমি অকেজো হয়েছি আমার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।”

আয়ান বিড়বিড় করে নিজেকেই বকছে। কেন যে আলগা পিরিত দেখাতে গেল।
আয়ান উষসীকে আবার কোলে নিয়ে খুব কষ্টে হাঁটছে। উষসী তখন লজ্জা মুখে থাকলেও এখন আছে শয়তানি মুখে।

” কি গো মোর পেয়ারের স্বামী খুব মজা লাগছে তাই না।।”

আয়ান জোর করে মুখে হাসে টেনে মাথা নাড়ায়।
জোভান ফোন টিপতে টিপতে আগে চলে গেছে।
সবার পেছনে আছে আরিফ আর আরিফের আগে উর্মি। উর্মি হাঁটতেছে আনমনে।

হঠাৎ কেউ ওর বাহু ধরে টেনে ধরে পেছনের দিকে তারপর বলে উঠে, ” আরে দেখে হাঁটেন। এখনি পায়ে কাঁটার আঘাত খাইতেন।”

উর্মি সামনে তাকিয়ে দেখলো আসলেই ওর পা ফেলার জায়গায় কাঁটা ডাল পরে আছে।
উর্মি ধন্যবাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

আরিফ ওর পেছনে পেছনে আসছে এতোক্ষণ আনমনে ছিল বিধায় বুঝতে পারেনি। এখন বুঝতে পেরে আন‌ইজি লাগছে।
আরিফ হঠাৎ বলে উঠল,” সরি!”

উর্মি চমকে পেছনে ফিরে বলল,” কেন?”

” আমার জন্য আপনি জায়ানের কাছে অনেক ধমক খেয়েছেন তাই না।”

তৃষ্ণা কপাল কুঁচকে বলল,” আপনি লুকিয়ে কথা শুনেছেন!”

” সরি আমি ভুল করে শুনে ফেলেছি। আরেকটা কথা আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো লজ্জায় এতোটা রুড বিহেভ করেন। তাই আপনার আমার প্রতি সংকোচ লজ্জা কাটিয়ে ফেলতে ওমনটা করতাম। এজন্য আপনার চোখেই আমি অনেক খারাপ হয়ে গেছি। বুঝতে পারি নি। আপনি যে আমাকে একটু ও পছন্দ করেন না। কিন্তু গতকাল আপনার কথায় স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়েটা আমি করব না।‌আপনি চিন্তা করবেন না। এই বিয়ে ভাঙার সমস্ত দোষ নিজেকেই দিব।”

উর্মি বিষ্ময়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। অবাক নয়নে আরিফের দিকে তাকিয়ে দেখল লোকটাকে আজ খুব অন্যরকম লাগছে‌। শক্তপোক্ত পুরুষ লাগছে। যার মধ্যে নাই কোন ছেলেমানুষি।
উর্মি বলল, ” আমি আসলে আপনাকে খারাপ ভাবিনি। এই বিয়েটা আমি করতে চাইনা। আপনি এমনিতেই মানুষটা ভালোই।”

তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে বলল,” ভালো হলে এতো বিরক্ত ওই চোখে থাকতো না। যাইহোক বাদ দেন। সবাই চলে গেল। চলুন এগোনো যাক।”

উর্মি নিজেও লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরলো কথাটা বলে। কম খারাপ আচরণ তো করেনি। কিন্তু একটা কারণে খুব শান্তি লাগছে। বিয়েটা ভেঙ্গে দিবে এইটাই ওর মনটা ফুরফুরে করে তুললো।
আরিফ এগিয়ে গিয়ে ও এর জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

” তাড়াতাড়ি আসুন। এদিকের জায়গা বিপজ্জনক একসাথে যাই।”

উর্মি মাথা নিচু করে আরিফের সাথেই হাঁটতে লাগলো।
_______________________

তৃষ্ণা হাঁটতে হাঁটতে বলল,” আপনি আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে পারবেন?”

জায়ান ভ্রু কুটি করে তাকালো তৃষ্ণার দিকে। তৃষ্ণা শুকনো ঢোক গিলে বলল,” না মানে। উষসী ভাবিকে কোলে নিয়ে হাঁটতে অনেক কষ্ট করছিল আপনার ভাই তাই জানতে মন চাইল আপনি পারবেন কিনা।”

জায়ান হাতের সেল ফোন অফ করে পকেটে রেখে বললেন,” দেখতে চাও নাকি শুনতে চাও?”

তৃষ্ণা বোকা চোখে তাকিয়ে বলল,” দেখব কি করে?”

” এদিকে আসো দেখাই।”
তৃষ্ণা কে কাছে ডেকে বলল জায়ান। তৃষ্ণা কাঁচুমাচু মুখ করে এগিয়ে এলো জায়ানের দিকে। জায়ান নিচু হয়ে ফট করেই তৃষ্ণা কে পাঁজকোলে তুলে নিলো। তৃষ্ণা ভয় পেয়ে জায়ানের গলা জড়িয়ে ধরেছে। দেখাবে বলে যে কোলে তুলে নিবে তৃষ্ণা ভাবতেই পারেনি। চোখ বড়ো বড়ো করে জায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। জায়ানের মুখে দুষ্টু হাসি।

তৃষ্ণা লজ্জা মাখা গলায় বলল,” আপনি আমাকে কোলে তুললেন কেন? কষ্ট হবে আপনার নামান।”

” তোমার হাজব্যান্ড এর জিম করা বডি এতো অল্প ওজনের ব‌উ কোলে নিয়ে এই পথ পাড়ি দিতে না পারলে এত শক্তি বানিয়ে লাভ কি?”

” আপনার থেকেও ত আপনার ভাই মোটা তিনি উষসী ভাবিকে কোলে নিয়ে হাপাচ্ছিল।”

” সেই চিন্তা তোমার করা লাগবে না। আসো আমরা একটা রোমান্টিক সময় পার করি।”
বলতে বলতে জায়ান তৃষ্ণার গালে চুমু খেলো। তৃষ্ণা লজ্জা চোখ বন্ধ করে নিলো।
___________________________

জোভান ফোন দিয়েছে মিহির কে।
” কোথায় তুমি?”

” পেছনে তাকাও।”

পেছনে তাকিয়ে দেখল মিহির দাঁড়িয়ে আছে। জোভান ফোন কেটে মিহির এর কাছে এসে বলল,” কি খবর তোমার?”

” ভালোই। উর্মি কোথায়?”

” আছে ওর হবু বর‌ এর সাথে কোথাও।”

মিহির বলল,” তাহলে আমাকে এখানে এনেছ কেন? তাদের প্রেম কাহিনী দেখাতে?”

“তুমি কি ভালোবাসো আমার বোনকে?”

মিহির থেকে বলল,” হ্যা বাসি।”

” তাহলে ওকে কি এমন করেছো যে ও তোমার সাথে কথা বলতে চায় না। এতোটা অবহেলা কেন করেছো?”

” সব তোমার ভাইয়ের জন্য সে আমাকে হুমকি দিয়েছিল‌। উর্মির সাথে কথা বললে আমার পড়ালেখা ও এই শহরে থাকতে দিবে না।”

” হ্যা সব জানি আমি‌। এজন্য‌ই আমি আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করেছি। আমার‌‌ বোনের জন্য। উর্মি আমার বোন আমার রক্ত তাই ওর কষ্ট আমি বুঝি। ও তোমাকে ছাড়া আর কারো কাছেই ভালো থাকবে না। আমার বোনের সুখের জন্য আমি জায়ানের বিরুদ্ধে গিয়েছি।”

মিহির কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে আছে।
” উর্মি আর আমি তো জায়ান ভাইয়ার আপন ভাই বোন নয়। এজন্য আমাদের প্রতি তার ভালোবাসা নাই। নিজে নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে সুখে আছে কিন্তু আমাদের সুখ কেড়ে নিতে চায়। আমি তা হতে দেব না। আমার বোনের সুখ আমি দেখব। তোমাদের বিয়ে আমি দেব।”

মিহির বিস্মিত কন্ঠে বলল,” আপন ভাই বোন না মানে কি বলছো তুমি জোভান?”

জোভান মিহির কে টেনে আড়ালে নিলো।
” তুমি এখন চলে যাও। সময় মতো উর্মির সাথে দেখা করিয়ে দেব।”

মিহির হাজারো কৌতুহল নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছে। কিন্তু জোভান আর কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেল।

#চলবে……..#কৃষ্ণবেণী
#পর্ব_২৫
#নন্দিনী_নীলা

উর্মির সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে মিহির। উর্মি এই জায়গায় মিহির কে দেখে বিষ্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেছে।
অবাক চোখে মিহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।
উর্মি মিহির কে দেখেই গলগলিয়ে চোখের জল ছেড়ে দিলো। চেয়েও কান্না থামাতে পারছে না। কত দিন পর মিহির কে দেখলো। প্রিয় মানুষকে চোখের সামনে দেখে নিজেকে দূর্বল করে ফেলল। মিহির সেই সুযোগ টাই কাজে লাগালো। উর্মির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বারবার করে ক্ষমা চাইতে লাগলো। উর্মি কান্না থামিয়ে মিহির কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছে মিহিরের দিকে। মিহিরের বিহেভিয়ার ওকে চমকে দিচ্ছে। তাকে অপরিচিত লাগছে।
মিহির উর্মির তাকানোর ভঙ্গি দেখে থতমত খেয়ে গেল।
নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,,” ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

উর্মি বলল,” কে তুমি? মানুষটা পরিচিত লাগলেও বিহেভ অপরিচিত লাগছে!!”

” তোমরা মেয়েরা পারো ও বটে। পাত্তা না দিলেও অবাক হ‌ও দিলেও অবাক হ‌ও।”

” মানে!”

” মানে এখন আমি এখানে আছি তোমার চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছি। দেখে কি অবাক হ‌ওনি?”

” হয়েছি। হ‌ওয়াটা কি অস্বাভাবিক?”

” তা নয়। কিন্তু তোমার এখানে আমাকে দেখে খুশি হ‌ওয়া উচিত ছিল।”

” তোমাকে দেখে আমি খুশি কেন হবো? তুমি কি আমায় ভালোবাসো বলতে আসছো যে খুশি হবো।”

” তার জন্য ও ত আসতে পারি।”

” তোমার ওই চোখে আমার জন্য একফোঁটা ও ভালোবাসা নাই।” তাচ্ছিল্য করে হাসলো।

বলতে বলতে উর্মি আরিফের বলা কথাটা মনে করল, আরিফ বলেছিল আমার চোখে নাকি তার জন্য শুধুই বিরক্ত দেখতে পায়। আমিও তো মিহিরের চোখে বিরক্তের আভাস দেখতে পাচ্ছি।”

মিহির ওকে আরো চমকে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করে বসলো। উর্মি বুঝতে পারছে না কি করবে।মিহির এসব কি করছে। হঠাৎ এসে এমন অদ্ভুত বিহেভ করছে কেন?

” মিহির কি হচ্ছে এসব। তুই এখানে কি করছো আর এসব কেন বলছো?”

মিহির শুধু বলছে,” I want to marry you. will you marry me?”

উর্মি হতবিহ্বল চোখে মিহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। মিহির বারবার জিজ্ঞেস করছে।
উর্মির খুশি লাগছে সাথে সন্দেহ হচ্ছে।

” হঠাৎ এতো ভালোবেসে ফেললে? যে প্রপোজ করতে বান্দরবান চলে আসছো?”

মিহির মলিন মুখ করে উঠে দাড়ালো। আর বলল,” আমি তোমাকে সেই প্রথম থেকেই ভালোবাসতাম উর্মি।”

উর্মি অবাক চোখে বলল,” তাই তাহলে আমি যখন তোমার পেছনে পাগলের মতো ঘুরতাম তখন কেন আমাকে গ্রহণ করলে না। বারবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দিতে। আজ যখন আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে মেনে নিয়েছি তখন কেন ভালোবাসার প্রস্তাব নিয়ে এখানে ছুটে এলে? তোমাকে আমার সন্দেহ হচ্ছে কেন বলোতো মিহির।”

মিহির খুকখুক করে কেঁশে আমতা আমতা করতে লাগে।
” কি হলো উত্তর দাও। আর তোমার মনের আসল মতলব আমাকে বলো। আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার উপর দূর্বল বলে এই্ না যে বানানো কাহিনী এসে বলবে আর আমি বিলিভ করে নিব।”

মিহির কপালের ঘাম মুছে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল,” আমি কিছু বলতে পারব না উর্মি কিন্তু এটা সত্য আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

” এই মিথ্যা কথাটা আর বলো না। তুমি আমাকে না আগে ভালোবাসতে আর না এখন ভালোবাসো। তাই দয়া করে মিথ্যা কথা বলে আর নিজের পাপ বাড়িও না সত্যি টাই বলো।”

মিহির মাথা নিচু করে বলল,” তোমার হবু বরের প্রতি তোমার ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে এজন্য এখন আর আমার ভালোবাসা তোমার কাছে সত্য লাগছে না।”

” দয়া করে বলো কেন এমন করছো। নাহলে আমি কিন্তু জায়ান ভাইয়া কে সব বলে দিব‌।”

মিহির ভয় পেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,” তোমার ভাইয়ের জন্য আমি তোমার ভালোবাসা গ্রহণ করিনি। সব সময় ইগনোর করে গেছি।”

” হোয়াট কি সব বলছো?”

মিহির নরম সুরে সব খোলে বলল। উর্মি সব শান্ত গলায় শুনলো তারপর কথা শেষ হতেই মিহির বলল,” তোমার ওই গুন্ডা ভাই আমাকে থ্রেট দিয়ে সব সময় তোমার থেকে দূরে রেখেছিল এমন কি টাকার লোভ ও দেখিয়েছিল আমি নেই নি। আমি কি টাকার জন্য আমার ভালোবাসা বিক্রি করব বলো।”

” ও আচ্ছা তাই। তাহলে আমাকে এসব আগে না বলে আজ বলছো কেন? এতদিন তো ভাইয়ের কথাই শুনেছো আজ কেন তার অবাধ্য হয়ে কেন ভালোবাসি বলতে আসলে।”

মিহির বলল,” তখন আমি তোমার কথা ভেবে তোমায় ইগনোর করতাম। ভেবেছিলাম তুমি আমার কাছে সুখি হবে না। আমি তোমার থেকে দূরে থাকলেই তোমার মঙ্গল। কিন্তু এখন আর পারছি না। অন্য কারো সাথে তোমার মেলামেশা দেখে আমি মানতে পারছি না। এজন্য সব বাধা উপেক্ষা করে আমি তোমার কাছে ছুটে এসেছি আর তোমার ভাইয়ার আসল রুপ তোমাকে দেখাতে এসেছি।
যে সে কতোটা স্বার্থপর। নিজের বোনের সুখের কথা সে ভাবেনা। ওমন ভাইয়ের জন্য তুমি কখনোই সুখের মুখ দেখবে না।”

উর্মি রাগে ফুঁসতে মিহিরের কথা শেষ হতেই উর্মি ঠাস করে মিহিরের গালে চর মেরে বসলো। মিহির হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পরেছে। আচমকা আঘাতে ও স্তব্ধ। উর্মি ওর গায়ে হাত তুলবে ও কল্পনাতেও ভাবেনি।
উর্মি এগিয়ে এসে আরেকটা থাপ্পড় মেরে বলল,” আমার ভাই কে নিয়ে আর একটা বাজে কথা বললে থাপ্পড়িয়ে কথা বলার মুখ বন্ধ করে দিব। আমার ভাই আমার সুখের পথে কখনো বাধা হবে না আমি জানি। আর তুমি আমার মনে ছিলে ভালোবাসা ছিলে এতো দিন কিন্তু আমার ভাই কে নিয়ে এই কথা গুলো বলে নিজের সেই জায়গাটা নিজেই হারালে। চলে যাও আমার চোখের সামনে থেকে কখনো আসবে না আর।”

বলেই উর্মি গটগট করে চলে গেল। মিহির স্তব্ধ হয়ে চলে গেল। দুইটা থাপ্পড় খেয়ে ওর চোখে মুখে রাগে লাল হয়ে উঠেছে। তখনি জোভান দৌড়ে এসে বলল,” উর্মি তোমায় মারলো কেন কি করছো ওকে।”

” ও নিজের ভাইকে নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করলো‌। ”

” ভাইয়ের আসল রুপ তো ও জানে না এজন্য এমন করেছে তুমি ভুল বুঝো না। উর্মি জায়ান ভাইকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তাকে নিয়ে খারাপ কথা বলেছো বলেই এমন করেছে। কিন্তু যখন ভাইয়ার রুপ ওর চোখের সামনে চলে আসবে তখন ও নিজেই তোমার কাছে ফিরে আসবে। হাল ছেড়ো না।”

মিহির রাগ গজগজ করতে করতে চলে গেল।
_________________________

উর্মি নিজের রুমে বসে কাঁদছিল তখন আরিফ দরজা পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। ভেতরে উর্মির কান্নার আওয়াজ পেয়ে কৌতুহল নিয়ে ভেতরে যাওয়ার জন্য দরজায় নক করে।
উর্মি চমকে চোখ মুছে ভেতরে যেতে বলে।

” আপনি কাঁদছিলেন?”

আরিফ কে দেখেই উর্মির মেজাজ আরো গরম হয়ে উঠে,” আপনি আবার লুকিয়ে আমার কাজ দেখছিলেন।”

” জি না। আমি বাইরে যাচ্ছিলাম তখন আপনার গুনগুনিয়ে কান্নার শব্দ পেলাম। কাঁদছিলেন কেন? বিয়ে তো ভেঙে দেব বলেছি।”

” আমার ইচ্ছে হয়েছে কেঁদেছি। আপনি একজন কে কাঁদতে দেখলেন আর জিজ্ঞেস করতে চলে এলেন কেন জানেন না আমি আপনাকে অপছন্দ করি।”

আরিফের মুখটা চুপসে গেল। সরি বলে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। উর্মি আরিফের চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে অজান্তেই কষ্ট পেল।
এভাবে বলাটা উচিত হয়নি। উনি তো আমার কথা ভেবেই এসেছিল। উর্মি পেছন ডাকতে চেয়েও ডাকল না। দরজা আটকে রুমে চলে গেল।
_________________________

আয়ান কাঁধ আর কোমর ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। উষসী কে অনেক বার বলল একটু মলম লাগিয়ে দিতে কিন্তু উষসী ফোন টিপছে। ওর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।‌
ডিনার ওরা রুমেই করেছে। উষসী খুড়িয়ে আর বাইরে গিয়ে খাবে না। আর আয়ান উষসীকে নিয়ে সারা পথ পাড়ি দেওয়ার ফলে ওর শরীর ব্যথায় টান টান করছে।

” উষসী তোমার জন্য আমি এতো কষ্ট করলাম আর তুমি আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছো না।”

” এই সত্যি করে বলোতো তুমি কি কু মতলব এঁকেছো যার জন্য এমন ভালো আচরণ করছো।”

” আমি ভালো হ‌‌ই সেটা তোমরা কেন বিশ্বাস করতে চাও না। আমি ভালো হ‌ই সেটা কি চাও না?”

” তুমি ভালো হলে আমার থেকে খুশি কর কেউ হতো না।”

” আমি সত্যি পরিবর্তন হয়েছি। আমি অনুতপ্ত বিলিভ কর আমার কথা।”

উষসী বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে ফোন রেখে আয়ানের কাঁধে মলম লাগিয়ে দিলো।
” হয়েছে এবার মিথ্যা কথা বন্ধ করো।”

আয়ান উষসীর হাত ধরে টেনে নিজের খুব নিকটে টেনে আনলো। আর বলল,” বিলিভ কর।”

” উফ ছাড়ো এমন জাপ্টে ধরলে কেন? দেখ আমার কাছে আসার চেষ্টা করবে না একদম। তোমার মতো নোংরা মানুষের স্পর্শ আমি সহ্য করতে পারি না।”

আয়ান জোর করেই স্পর্শ করতে চাইলো আর ফিসফিস করে বলল,,” আমি ভালো হয়ে গেছি। এভাবে দূরে সরিয়ে দিও না। আজকের পর হয়তো আর কখনোই এতো কাছে পাবেই না আমাকে। আসো একটু আদর করি তোমায় অনেক দিন হলো তোমাকে কাছে পাই না।”

উষসীর গা গুলিয়ে আসছে আয়ানের স্পর্শে। চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পরছে। মনে একটু জায়গা তৈরি হচ্ছিল কিন্তু আজকের এই বিহেভ এর পর আয়ান জন্মের মতো উষসীর মন বিষিয়ে দিলো।
উষসী চোখ ভর্তি জল নিয়ে বলল,” এই জন্যে এতো ভালো আচরণ করছিলে তাই না। ছিহ আমিও ভাবতে‌ বসে ছিলাম তুমি বোধহয় ভালো হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু আমি ভুলে গেছিলাম তোমার মতো পুরুষ কোনদিন ভালো হতে পারে না। তুমি শরীরের চাহিদা ছাড়া আর কিছুই বুঝো না। আজ তুমি যা করলে এর পর আর কোনদিন তুমি আমার চোখে ভালো হতে পারবে না আয়ান মনে রেখো। আমি যতোদিন বেঁচে আছি তোমাকে ক্ষমা করব না।”

” উষসী বেবি আজকের পর তুমি আমাকে ঘৃণা করার জন্য ও এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে না। জায়ানের সাথে হাত মিলিয়ে আমাকে শাস্তি দিয়েছিলে তাই না। তার শাস্তি তুমি নিজের জীবন উৎসর্গ করে পাবে।”

উষসী আয়ানের কথা শুনে যা বুঝার বুঝে গেল। ও আয়ানের থেকে ছাড়া পেতে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু আয়ানের থেকে ছাড়া পেতে পারলো না।
আয়ান উষসীর গালে হাত দিয়ে বলল,” তোমাকে মারতে আমার খুব কষ্ট হবে উষসী। আমি তোমায় পছন্দ করতাম। তোমার সঙ্গ আমার খুব ভালো লাগে। তুমি হীন আমি একা খুব কষ্টে থাকবো?”

উষসী ডুকরে কেঁদে উঠলো,” আমায় মেরো না। ছেড়ে দাও আমায়। আমি অনেক দূরে চলে যাব। কোনদিন তোমার কোন ব্যাপারে নাক গলাবো না।”

” জায়ান কে ডাকো তোমার পুরোনো আশিক ওই তোমায় বাঁচাবে আমি না।”

#চলবে……

( আসসালামু আলাইকুম। সবাই যথার্থ মন্তব্য করবেন। ধন্যবাদ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here