তাহারেই পড়ে মনে পর্ব ১২

#তাহারেই_পড়ে_মনে
পর্ব বারো
কার্তিকের মাঝামাঝি সময়, মিষ্টি দাঁড়িয়ে আছে শিউলিতলায়, ওর আবার বাংলা দিনতারিখ মুখস্থ থাকে ভালো। বেশ বড় গাছ, ওর নানির হাতের লাগানো। মিঠি ছোট্ট ছোট্ট হাতে ফুল কুঁড়োচ্ছে আর নিজের ফ্রক গুটিয়ে কোচড় ভরে নিচ্ছে। ফুলে শিশির মাখামাখি। ওর পা দুটোও শিশিরে মেখে ভিজে কাদাকাদা হয়ে আছে। বিরক্ত হচ্ছে মিঠি আবার ফুলের গন্ধ আর রঙে খুবই আনন্দিত।
ছয় বছর বয়সে এই প্রথমবার ও মামাবাড়ি এসেছে। মিষ্টি চায় ও প্রকৃতির সবকিছুই অনুভব করুক তাই খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটতে নিয়ে এসেছে, ফুল কুড়োচ্ছে।
‘এটা কি অরেঞ্জ কালার, মিষ্টি?’ মিঠি ওর আঠারো বছরের বড় বোনকে নাম ধরে ডাকে। মিষ্টি অনেক চেষ্টা করেছে আপা বলে ডাকানোর, ও পাত্তাই দেয়নি।
ওর প্রশ্নে মিষ্টি দ্বিধায় পড়ে যায়, এটা কি আসলেই কমলা রঙ? কমলা কি এতো কোমল হয়? আসলে এটার কোনো নাম নেই – এই রঙের নাম শিউলিবোঁটা রঙ!

সারাবাড়ি নিস্তব্ধ। শুধু রান্নাঘরে হাড়ি-খুন্তির ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে। এমনিতেই বড়মামির কাজের বিরাম নেই আরও আজ তো অনেক মানুষের রান্না। কত মানুষ আসবে আর কতজন তো এসেই গেছে। ছোটমামার মেয়ে হাস্নার বিয়ে। গাঁয়ে হলুদ আজকে। দুপুর থেকে বাবুর্চির রান্না শুরু হবে। সকালের ব্যবস্থাটা বড়মামিরই করতে হবে। গত পাঁচবছরে মিষ্টি মামাবাড়ি আসেনি। পড়াশুনার অজুহাতের মুলা ঝুলিয়ে এড়িয়ে গেছে সবার আহবান। এবারেরটা আর এড়ানো সম্ভব হয়নি। হাসনা এইবাড়ির সবচেয়ে ছোট মেয়ে, মিষ্টির চাইতেও চার বছরের ছোট আর নানিও খুব অসুস্থ। তাই আসতেই হলো এবার।

মিষ্টি আস্তে আস্তে বড়মামির রান্নাঘরে উঠে বসলো। এবাড়ির সব বদলে গেছে, বিল্ডিং উঠেছে সবার, বড়ঘরের বারান্দাটা পাকা করা হয়েছে। উঁচু চৌকি ছেড়ে খোলা মেঝেতে বসে সবাই আড্ডা দেয় এখন। শুধু মামির রান্নাঘরটাই আগের মতো আছে।

‘তোমাকে কোনো সাহায্য করবো, মামি?’

প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বড়মামি বললো ‘তুমি কি পারো মা কিছু? তোমার মা যে কয় চা বানানো ছাড়া আর কিছু পারো না!’

‘আসলেই পারি না মামি। তবে চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।’

‘থাকনা মা, তুমারে দেখলেই তো শান্তি লাগে। কত বড় পাশ দিছ তুমি, কত বড় চাকরি করো।’

‘বড় চাকরি করি না মামি। আমি স্কুলে পড়াই। ভালো লাগে। বড় চাকরি করতে ইচ্ছে করে না।’

‘যাওতো, কালিঝুলি মেখে ভুত হয়ে যাবা। সবার ঘুম ভাঙতেছে। তুমি ঘরে গিয়াই বসো। এই গরমে বসা লাগবে না। তোমার ছোটমামা কত শাড়ি আনছে, আজকে একটা শাড়ি পইরো মা।’

একরকম জোর করেই ওকে ঠেলেঠুলে উঠিয়ে দিলো মহিলা। মিষ্টি নানির ঘরে এসে নানির আলমারি খুলে বসলো, নানির কত শাড়ি। এখান থেকেই একটা শাড়ি পরবে ও আজকে। কত কত শাড়ির ভিতর থেকে একটা গোলাপি রঙের জামদানিই ওর মনে ধরলো। এই রঙের প্রতি দুর্বলতা ও আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বলা যায় মায়া কাটানোর চেষ্টাই করেনি। খুব যত্নে এই ব্যথাটা বুকের ভেতর পুষে রেখেছে।
হলুদের অনুষ্ঠানে এই রঙটা কি যায়? না যাক, ও এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ না যে ওর মিলিয়ে শাড়ি পরা না পরাতে অনুষ্ঠানের কিছু যাবে আসবে বরং আড়ালপ্রিয় মানুষ মিষ্টি।

মিঠি সারাবাড়ি দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে। এমন খোলামেলা আর এতো মানুষ ও দেখেনি কখনো। আনন্দের তাই কোনো সীমা নেই। জাফরিনও কখনো বড়মামির রান্নাঘরে নইলে মেজমামার ঘরে আর নয়তো ছোটমামার দাওয়ায়। সবাই ছুট পেয়েছে একসাথে।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়িও ভরে গেল মানুষে। মেয়ের বিয়েতে ছোটমামা কোনো কমতি করেননি। পুরো তিনদিনের আয়োজন লাগিয়ে দিয়েছেন। বড়ঘরের বারান্দাটা নানাবয়সি কাজিনরা দখল করে নিয়েছে। ওখানে লাইন ধরে মেহেদি পরার প্রতিযোগিতা চলছে। মিঠি খুব অস্থির হয়ে পড়েছে – ওকেও মেহেদি পরিয়ে দিতে হবে। মিষ্টি গোসল করে ভেজা চুলে, যত্ন করে শাড়ি পরলো- গোলাপি শাড়িটা বিয়ের দিনের জন্য তুলে রেখে ছোটমামার আনা একটা হলুদ তাঁতের শাড়ি নিয়েছে। তারপর মিঠির হাত ধরে আসরে এসে বসলো। নানারকম সভ্য- অসভ্য কথায় ও ঠিক তাল মেলাতে পারে না কিন্তু এই অকারণ হাহা-হিহি বেশ ভালো লাগে।

‘মিষ্টি, তুই গোসল করে এসেছিস?’ বড়মামার ছোটছেলে জহির এসে কান টানলো ওর। ‘হলুদে তো চুবাবোই কাদার ভেতরও ডুবানি দেবোই তোরে আজকে। তুই ছাড়া আমার হাত থেকে বাঁচার রেকর্ড আর কারো নেই।’

‘হ্যাঁ, ও আবার বাঘমামার পিছনে পলাবে।’ টিপ্পনী কাটলো রূম্পা, মেজমামার মেয়ে।

‘এই এই সর সর, কেউ মাস্টারনির সাথে ঝামেলা করিস না, বেতের বাড়ি খাওয়ার সখ হইছে? প্যাদানী দিয়ে ফেল করায় দেবে সবকয়টারে।’ আরেকজন ফুট কাটলো।

নির্মল হাসিতে গড়িয়ে পরতে থাকলো সবকয়জন। এরা খামাকাই হাসতে পারে আর সংক্রামক ব্যাধির মতো দ্রুতই সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।

‘মিষ্টি আয় আয় তোর হাতে মেহেদি লাগিয়ে দেই।’ পলা ডাকলো ওকে।

খুব আনন্দ নিয়ে মেহেদি পরতে বসলো ও। বড়ঘরের বারান্দা থেকে রাস্তাটা দেখা যায়। মিষ্টি পরিষ্কার দেখলো বাইকটা রাস্তার উপর এসে থামলো। হলুদ রঙের শাড়ি পরা একটা মেয়ে নামলো পেছন থেকে। মেয়েটা পাশে দাঁড়ালো। বাইকে বসা ছেলেটা মাথা থেকে হেলমেট নামিয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে নিলো। হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুল সমানও করলো, তারপর মেয়েটাকে কি যেন বলে হেসে দিয়ে বাইক ছুটিয়ে চলে গেলো। মূহুর্ত কয়েক – আজও মিষ্টির অনুভূতিগুলো সেইরকমই তাজা। দূর থেকে এক এই ঝলক প্রিন্সকে দেখে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ও মুখ নামিয়ে ফেললো। পলা ঝাড়ি দিলো ‘চুলগুলো সরা না, হাতে এসে পড়ছে, মেহেদি নষ্ট হয়ে যাবে।’ মিষ্টি উত্তর দিলো না, ওর নাক ফুলছে, ঠোঁট কাঁপছে, গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে। ও আরও ঝুঁকে এসে নিজেকে গোপন করে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলো।

বাইকটা বাড়ির ভিতর এসে দুবার চক্কর দিলো তারপর বড়ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে প্রিন্স এগিয়ে এসে বসলো বারান্দায়।

‘আরেহ, প্রিন্সভাই, ভাবির কারাগার থেকে মুক্তি পাইছো তাইলে? বিয়ের পর থেকে সুন্দরী বউয়ের আঁচল থেকে তো বেরোতেই দেখা যায় না তোমারে।’ ছোটমামার ছেলে পাপ্পুর কথায় হাহা করে হেসে উঠলো সবকয়জন। প্রিন্সও হেসে চাপর মারলো পাপ্পুর পিঠে।

মিষ্টি হাত মুঠো করতে চাইলো কিন্তু মেহেদি পরা হাতে সুবিধা করতে পারলো না। এমন কেন হয়, কিছুতেই কেন ভুলে যাওয়া যায় না সবকিছু। চোখ ছলছল করতে থাকলো, বহু চেষ্টায় গাল বেয়ে বইবার আগেই চোখের পানিকে চোখেই শুকিয়ে নিলো ও। এমন তো না যে ও জানতো না এখানে প্রিন্সের দেখা পাবে। আত্মিয় স্বজন সবাই যে আসবে এতো জানাকথাই। এতোদিনে মন থেকে একদিনের জন্যও মুছে যায়নি প্রিন্স, একটা রাতের ঘুমও আসেনি মিষ্টির ওকে না ভেবে কিন্তু মিষ্টির তো অসীম ধৈর্য্য, মনের সেই ব্যকুলতা কোনোভাবেই সবার সামনে খুলে দিতে দেবে না ও। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা কান্নার দলাগুলোকে ঠেলেঠুলে নীচে নামাতে প্রানান্তকর ঢোঁক গিললো কয়েকবার। বহু চেষ্টায় নিজেকে স্বাভাবিক করলো।

পাপ্পুর কথা টেনে নিয়ে জহির উত্তর দিলো ‘আরেহ ওইরকম ডানাকাটা বউ পেলে আমিও তো নামাযের পাটিতে বইসেই থাকতাম, ভাই-বন্ধু চিনতাম না।’ হাসিতে আবার মাতোয়ারা হলো পুরো জটলা।

‘তাহলে তো এখন প্রিন্সভাইর পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা উচিত সারাদিন, তাই না? কী বলো, প্রিন্সভাই?’ চুলগুলোকে মাথার পেছনে পাঠিয়ে সোজা হয়ে বসে নিজেকে দৃশ্যমান করে হাসতে হাসতে বললো মিষ্টি।

প্রিন্স চমকে উঠে তাকালো। একদম ওর মুখোমুখি মিষ্টিকে দেখে অবাক হয়ে গেলো – মিষ্টি যে আসবে এখানে তা ভাবেইনি প্রিন্স। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো ‘কে বলেছে পড়ি না। ছয় ওয়াক্ত পড়ি। আসলেই তো শুকরিয়া করারই ভাগ্য আমার!’

চশমার ঘোলা কাচের ভিতর দিয়ে মিষ্টির রাঙাচোখ দেখা গেল না একেবারেই।

সেইসময়ে সবাই হৈহৈ করে উঠলো হাসনার মেহেদির রঙ দেখে, সুন্দর রঙ এসেছে। একে একে মিষ্টির মেহেদি তোলার সময়ও এলো। রূম্পা কৌতুক করে বললো ‘দেখি দেখি, মিষ্টি তোর মেহেদি কেমন লাল হলো? সাজিদ ভাই কতটা ভালোবাসবে তোকে দেখি?’

মিষ্টির মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। জাফরিনকে বারবার বলা হয়েছে এই ব্যাপারটা নিয়ে এতোটা না ভাবতে, এখনই মিষ্টি বিয়ের জন্য প্রস্তুত না, আর মনের ভেতর একজনকে পুষে রেখে আরেকটা নতুন সম্পর্কে জড়ানো অন্যায় মনে হয় ওর। অথচ সে সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে।

‘সাজিদ কে?’ প্রিন্স প্রশ্ন করলো।

এরা সবাই একজনের উত্তর আরেকজন দিয়ে দিচ্ছে। জহির উত্তর দিলো প্রিন্সের প্রশ্নের ‘মিষ্টির আশিক। বিসিএস হয়ে গেছে। ফরেন ক্যাডার। গেজেটেড হওয়া বাকি। কিন্তু মিষ্টির দোকানের ময়রা হওয়াতেই আগ্রহ বেশি।’

মিষ্টি চোখের কোনা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো প্রিন্সের মুখচোখ লাল হয়ে গেছে, হাতের মুঠোও পাকানো।

‘বারে বাহ, নিজে বউ কোলে নিয়ে ড্যাঙড্যাঙ করে ঘুরছে আমার সামনে দিয়ে আর আমার বেলায় মন মানছে না!’ মনে মনেই বললো মিষ্টি।

‘কিন্তু সাজিদ বাবাজির ভাগ্যে তো শিকে ছিঁড়িবে না। মিষ্টি যত জ্বালিয়েছে ছোটবেলায় আমাদেরকে, ওর তুলনা খেতে খেতে আমাদের ছোটবেলা হেল হয়ে গেছে। মিষ্টি এমন, মিষ্টি তেমন, মিষ্টির মতো হ, দেখ মিষ্টি কত পড়ে হ্যান ত্যান শুনতে শুনতে যত অভিশাপ দিয়েছি ওকে তাতে তো ওর বিয়ে হবেই না।’ পাপ্পুর কথায় সবাই হেসে দিলো।

কান্তা সবার বড়, দুই বাচ্চার মা সুন্দর করে বললো ‘খারাপ কী হয়েছে বল, এই জন্যই তো ওর মনে যা চায় ও করতে পারে। বিয়ে না করে আরও পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে, দেশের বাইরে যেতে চাইছে, আমরা এরকম বললে দিতো? কোন দেশে যাবিরে মিষ্টি?’

‘ঠিক হয়নি আপা, দুটো ভার্সিটিতে সুযোগ আছে। যেকোনো একটাতে কনফার্ম করবো।’

‘এইগুলো কোনো কথা না। আসলে মিষ্টি বড়সড় ছ্যাঁক খেয়েছে, তাই দেবদাস হয়ে গেছে। নইলে ছোট ভাইবোনদের ও বিয়ে হয়ে গেলো ও এখনো বাহানা করে কেন? এরপরে হয়তো মিঠির বিয়েও দেখে ফেলবে ও।’ পাপ্পুর কথায় সব হৈহৈ করে উঠে মিষ্টির কথা চাপা দিয়ে দেয়।

‘কিন্তু ওর প্রেম তো বই’র সাথে, ওরে কে ছ্যাঁকা দেবে?’ এটাও কৌতুক করেই বললো পলা।

ভাগ্যিস প্রিন্স আর ওর কথা কেউ জানে না তাহলে এতো সহজ কেউ হতে পারতো না, মনে মনে ভাবলো মিষ্টি। তারপর বেশ সুন্দর করেই বললো ‘আসলেই আমার প্রেম বইয়ের সাথে আর সত্যি সত্যিই বইগুলো কখনো কষ্ট দেয় না।’

কাছাকাছি বয়সের ভিতর মিষ্টিই একমাত্র অবিবাহিত, আর তারপরের সিরিয়াল মিঠি, সেতো এখনো অনেক দেরি তাই মিষ্টিকেই নিয়ে পড়লো সবাই আর এদের পালে আরও বাতাস দিতে তখনই মিঠি দৌঁড়ে এলো মিষ্টির ফোন নিয়ে ‘সাজিদ ভাইয়া ফোন করেছে, সাজিদ ভাইয়া ফোন করেছে।’

‘ওওওঅঅঅঅ’ সব একযোগে হেসে উঠলো। জহির একটা ঝাড়ি দিয়ে বললো ‘এই ভাইয়া কীরে, দুলাভাই বল?’

মিষ্টির এইসব হালকা রসিকতা খুব খারাপ লাগতে লাগলো। তারউপরে যখন সবাই জেদ করলো, লাউড স্পিকারে রেখে সাজিদের সাথে কথা বলতে হবে তখন সত্যি সত্যিই ও মেজাজ হারালো আর রাগ করে উঠে গিয়ে নানির ঘরে ঢুকে দরজা দিলো।

শুধু রাগ করেই না, ও ওই আসর থেকে উঠে আসার অজুহাতও খুঁজছিলো। ওর সহ্যক্ষমতা বেশি বলে বারবার সেই পরীক্ষায় বসার মানসিক শক্তিটাও কি বেশি? চুপচাপ এককাত হয়ে শুয়ে রইলো ও। নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতাটাও অনেক বেশি ওর – শুধু আজকে অনেকদিনের পরে প্রিন্সকে দেখে নাজুক হয়ে পড়েছিলো।

মাঝে মাঝেই ও ভাবে, এইযে বুদ্ধিমতি, ধৈর্যশীল, সহনশীল, বাস্তববাদী আরও গালভরা কঠিন কঠিন বিশেষণ ওর গায়ে ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে সবাই তাতে কি ওর ভেতরের মন নামক বস্তুটা মরে গেছে। ফুল দেখে, গান শুনে, মিঠিকে হাসতে দেখলে ও কি খুশি হয়না? তাহলে ওর দুঃখগুলোও যে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই হবে না সেটা কেন সবাই ভেবে নেয়? ও নিজেকে সামলে নেয়, সবার সামনে কাঁদে না বলে কি বুকের উপর জমানো কষ্টের ভার কমাতে গোপনে নিজেকে উজাড় করে চোখের পানিতে ভাসে না? প্রিন্সের চোখের সামনে ও কিভাবে থাকে আর কিভাবে সহ্য করে এলো এতটা সময় তা শুধু ও নিজে আর ওর অন্তর্যামীই জানে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? এরপরে নানারকম প্রশ্ন, ডাকাডাকি শুরু হয়ে যাবে। কোনো সিনক্রিয়েট করার মতো হালকা মনও তো না মিষ্টির।

ও নিভৃতে হলুদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলো, বরাবরের মতই নিয়াজ সর্দারের সাথেই লেগে থাকলো। বড়মামাও খুব খুশি, সবার সাথেই ভাগ্নিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন গর্ব করে। ঢাকার কতবড় নামকরা স্কুলের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষিকা তার ঐটুকু মিষ্টি!

মিষ্টি চোখ ঘুরিয়ে কোনোদিকে তাকালো না, কেউ ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে কীনা জানার প্রয়োজন মনে করলো না।

*****

নির্ঘুম রাতগুলোতে চোখের নীচে পড়া কালো দাগগুলোকে মিষ্টি খুব সহজেই ঢাকা দিতে পারে মাইনাস পাওয়ারের মোটা চশমার আড়ালে। ওইটুকু ওর কাছে আশির্বাদ মনে হয় – চোখে কাজল পরা বা অন্য সাজের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় অনেকটাই। শুধু শাড়িটাই জড়িয়ে নিলো কোনোরকমে। বিয়েতে এসেছে, অনুষ্ঠানে থাকতে হবে তাই থাকা, নাহলে ওর আনন্দটুকু মরে গিয়ে কখন এইবাড়ি ছাড়বে সেই জন্যই ছটফটানি রয়ে গেছে শুধু!

থেকে থেকে দুএকবার ইচ্ছে জেগেছিলো প্রিন্সকে কিছু প্রশ্ন করার, পরে নিজেকেই প্রবোধ দিয়েছে এই বলে যে, আদৌ প্রিন্স কি কোনোদিন ওর সাথে কমিটেড ছিলো, প্রিন্সের মতো ছেলেরা কি কোনোদিন দায়িত্ব নেয়, দায়বদ্ধতা বোঝে? প্রশ্নের উত্তর যখন ওর জানা আছে তখন অকারণ কারো কাছে কিছু জানতে চাওয়া বৃথা।
গোলাপি রঙের পাঞ্জাবি পরা প্রিন্সের দিকে একবার তাই শুধু চোখ চেয়ে তাকিয়েই নজর ফিরিয়ে নিয়েছিলো ও।
পাপ্পুটা বড্ড বেঁফাস কথা বলে। বলেই ফেললো ‘প্রিন্সভাই আর মিষ্টিকে মনে হচ্ছে জামাই-বৌ, ম্যাচিং কালারের জামাশাড়ি পরেছে।’

মিষ্টির মুখ আরক্ত হয়ে উঠলো। এমনিতেই গোলাপি রঙটা বেছে নেওয়াতে ওর নিজের উপরেই নিজের রাগ হচ্ছিলো। কখনো কখনো মানুষকে তার সাব-কনশাস প্রসেসই নিয়ন্ত্রণ করে। মিষ্টি বেশ রেগে গিয়েই বললো ‘প্রিন্সভাই কি জানে, এইযে গোলাপি রঙটা, এটা মেয়েদের রঙ?’

প্রিন্স এমনিতেই নিশ্চুপ পুরোদিনই, আস্তেধীরে জবাব দিলো ‘তোদের প্রিন্সভাই কোনদিন কবে পুরুষ মানুষের মতো কাজ করেছে?’

মিষ্টি থতমত খেয়ে সরে গেলো।

একফাঁকে গুহাবাসী হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো। নানির ঘরটা সংস্কার করা হয়নি। আলোর অভাবে দিনের বেলায়ও হলুদ আলোর বালব জ্বলে। এই ঘরে খুব একটা কেউ ঢোকেনা। তাই মিষ্টির জন্য এটা গুহার সমানই, নিভৃতে থাকার জায়গা। ও বিছানার উপর পা তুলে বসে কানের, গলার গয়না খুলতে থাকলো। এইসময়েই ভারি কাতান শাড়ি পরা একটা অতি সুন্দরী মেয়ে ঢুকলো ওই ঘরে। অন্ধকার ঘর যেন ঝলমল করে উঠলো। তার উপরে গা ভরা গয়না – যতরকম গয়না পরা যায় সবরকম আছে। চুড়িই উঠে এসেছে কনুই পর্যন্ত! কানেই শুধু একটা বড় ঝুমকো – বেশি পরা যায়না বলেই। টিকলি টায়রা দিয়ে যত গয়না আছে আলমারিতে সবই পরে চলে এসেছে। শো অফ – মিষ্টির মুডটা আরও তেতো হয়ে গেলো। কোনো বড়লোকের বেটি হয়তো ভেবে চোখ ফিরিয়ে নিলো মিষ্টি। মেয়েটি ওর পাশে গিয়েই বসলো। আস্তে করে বললো ‘তোমাদের কি আনন্দ, যেমন ইচ্ছে সাজতে পারো, ইচ্ছে না হলে খুলেও ফেলতে পারো।’

মিষ্টির অবাক লাগলো। ‘আপনাকে বুঝি কেউ জোর করে? ইচ্ছে না হলে এতো পরেছেন কেন?’

‘ইচ্ছে তো হয় সব খুলে ফেলি, মায়া ছাড়তে পারিনা যে।’

মিষ্টির অবাক চোখ দেখে মেয়েটি আবার বলে ‘আমি তোমার কাছে এসেছি মিষ্টি আপা! আমার নাম তুলি। আমি প্রিন্সের বউ।’

‘প্রিন্সের বউ’ এইকথাটা যেন ধাক্কার মতো এসে লাগলো ওর কানে। কোনো কোনো যন্ত্রণা অসহ্য হয় তা কি কেউ জানে? মিষ্টির গলা আবার রুদ্ধ হয়ে এলো, শরীর কাঁপতে লাগলো।

‘আমি অনেকক্ষণ ধরেই তোমার সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজছি, কিন্তু শাশুড়ি মায়ের কাছছাড়া হওয়ার অনুমতিও নেইতো।’

মেয়েটি কেন এসেছে? সাবিহা খালার বদনাম করতে? কিন্তু ওসব শোনার রুচিতো মিষ্টির নেই।

মেয়েটি খুব তাড়ায় আছে এমনভাবে বললো ‘তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো, আপা। আমার স্বামি, কলমা পড়ে, আল্লাহর কালাম স্বাক্ষী রেখে যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে, তার মনের জায়গা যে পুরোপুরি দখল করে রেখেছে তাকে দেখার ইচ্ছে ছিলো খুব।’

মিষ্টির গলা দিয়ে কথা ফুটলো না, কী বলছে এই মেয়েটা এইসব!

‘প্রিন্স খুব কষ্টে আছে আপা, শুধু বেঁচে থাকার দরকার তাই আছে। অভ্যাসে খায়, ঘুমোয়, হাঁটে-চলে। একদিনের জন্যও তুমি মুছে যাওনি ওর মন থেকে। এইমূহুর্তের জন্যও আমার কাছে আসেনি সে, মিষ্টির জায়গা আমাকে কখনো দেয়নি। আমি শুধু নামেই বউ, কথা বলে, যা চাই এনে দেয়- এইটুকুই শুধু সম্পর্ক আমাদের।’

এবার মনে হয় মিষ্টি বুঝতে পারলো মেয়েটি কি বলতে চাইছে ‘তো তুমি কি নিজেরে শাবানা ভাবো? নিজের অধিকার নিতে পারোনি? আর আমাকে কি রিনা খান মনে হচ্ছে? আমি তো কোনোদিন তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করিনি।’

মেয়েটির মন ব্যথাতুর হলো। সুন্দর মুখে কালো ছায়া পড়লো। ‘চেষ্টা করেছি আপা। কিন্তু মায়া ছাড়তে পারিনি। এই যেমন অরুচিকর জেনেও এতো গয়নায় সং সেজে আছি। এই ছাড়া এই বিয়েতে কিছু পাইনি আমি।’

মেয়েটির দুঃখ এবার মিষ্টিকে স্পর্শ করলো। ওর দিকে তাকিয়ে ভাবলো, মেয়েরাই কেন এইভাবে মরে?

‘তবে তুমি আমাকে কি করতে বলছো? তুমি নিশ্চয় কোনো অসম্ভব অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে আসোনি আশা করছি। যা আর সম্ভব না তা নিশ্চয়ই বলবে না।’

তুলি আস্তে আস্তে বললো ‘উনি তার কষ্টের কথা ভুলে তোমার কষ্ট, তোমার দুঃখের কথা ভাবে সারাক্ষণ। তুমি কিভাবে নিজেকে সামলেছ তাই ভেবে তড়পাতে থাকে। তুমি যদি সুখে থাকো তবে হয়তো উনি মনে মনে শান্তি পাবে, আপা।’

‘আমি ভালো নেই এই কথা তোমার উনিকে কে বলেছে। বরং আমার মতো শান্তিতে খুব কম মেয়েই আছে।’

‘তুমি বিয়ে করে নাও মিষ্টি আপা!’

মিষ্টি ধাক্কা খেলো। ‘আমি বিয়ে করলেই তোমার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আর তোমার কথামতো বিয়ের মতো এতোবড় একটা সিদ্ধান্ত আমি যাচ্ছেতাইভাবে নিয়ে নেবো, তুমি ভাবলে কি করে?’

‘ভাবলাম কারণ আমি জানি। প্রিন্স তার মিষ্টিকে যতটা ভালোবাসে, মিষ্টিও তার থেকে কম কিছু বাসেনা। সে তোমাকে ভালো রাখতে যখন তোমাকে ছেড়েছে তখন তাকে ভালো রাখতে তুমিও সম্ভব – অসম্ভব সব করতে পারবে।’

প্রিন্স কোন শর্তে বিয়ে করেছিলো একে একে বলে গেল তুলি, মিষ্টিকে স্তম্ভিত করে দিয়ে।

তারপর খুব দ্রুতই বেরিয়ে গেলো। মিষ্টি একেবারে বজ্রাহত হয়ে বসে রইলো। এতোদিন নিজে প্রতারিত হয়েছে ভেবে যে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলো সেখানে প্রিন্সের সমঝোতার এই বিয়ে যে কতবড় ত্যাগ, কতটা ভালোবাসলে একটা মানুষ গোপনে, নিঃশব্দে এতোটা কঠিন স্যাক্রিফাইস করতে পারে ভেবে ছটফট করে উঠলো ও!
নিজের কষ্টটাই দেখেছে শুধু ও উপলব্ধি করতে পারেনি কত কষ্ট হয়েছে প্রিন্সের এই বিয়েটা করতে, এতোদিন মিষ্টিকে না দেখে থাকতে। এতোদিন পরে দেখা হয়েও মিষ্টি যখন একদম অচেনা মানুষের মতো ব্যবহার করলো, তখনও বা তার কতটা কষ্ট হয়েছে মেপে কুল কিনারা করতে পারল না ও!

চোখ মুছে যখন ঘর থেকে বেরুলো ও অতিথিদের সাথে প্রিন্সরাও চলে গেছে। ওর সমস্ত প্রাণ হাহাকার করে উঠলো! ইশ, ছেলেটা শুধু এইটুকুই জেনে চলে গেলো, মিষ্টি ওকে ঘৃণা করে!

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here