তিক্ততার সম্পর্ক পর্ব -৪৯+৫০ শেষ

#তিক্ততার_সম্পর্ক
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্বঃ ৪৯

আরিশার কথা শুনে আরমান শুকনো মুখে বিষম খেলো রীতিমতো।

আসলে আমার ঘুম খুব পাতলা, একটুতেই ভেঙে যায়।

আরমান কিছু না বলে চুপ করে রইলো।

হঠাৎ আরিশা দাঁতে জিহ্বা কেটে বললো, এই যা, সেই কখন থেকে বকবক করছি অথচ এখনো আপনার নামটাই জানা হলো না আমার। কী নাম আপনার ?

বরাবরের মতো আরমানের ছোট উত্তর, আরমান মাহমুদ।

ওয়াও নাইচ নেইম আর আমার নামের সাথে কিন্তু অনেকটা মিলও আছে।

আরমান ছোট ছোট চোখে তাকালো আরিশার দিকে আর বিনিময়ে আরিশা ফোকলা হাসলো। আরমান চোখ সরিয়ে নিলো।

আরিশা গলার আওয়াজ নিচু করে বললো, আপনাকে একটা সিক্রেট বলছি শুনুন, আপনার কাজে লাগবে।

আরমান আবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো আরিশার দিকে আর আরিশা বললো, আমার পাপা হচ্ছে হিটলারের খালাতো ভাই। আস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে থেকে আমাকে বাংলাদেশের কালচারে চলতে বলে সবসময়। এটা কেমন কথা হলো বলুন তো আপনি ? আমাকে চালাকি করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলো উনার বন্ধুর হ্যাংলা ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আমিও কম যাই নাকি, ঐ ছেলের এমন হাল করেছি জীবনে বিয়ের কথা মুখে নিতেও ভয় পাবে।

কথাটা শেষ করে ভাব নিয়ে চশমাটা আবার একটু নেড়েচেড়ে ঠিক করে নিলো। এদিকে আরিশার কথা শুধু আরমানের চোখ রসগোল্লার মতো হয়ে গেছে। মেয়েটাকে দেখে মনে হয় না এতোটা দুষ্টু হতে পারে।

এসব আপনাকে কেনো বলছি সেটা শুনুন। আপনি আমার পাপার আন্ডারে কাজ করবেন তাই আগেই সাবধান করে দিলাম।

আরিশা নিজের সীটে আয়েশ করে বসলো আর আরমান অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিজের বাবাকে কেউ হিটলারের খালাতো ভাই বলতে পারে আরমানের ধারণা ছিলো না।

৫৮.
মিনি ছাঁদে বসে আছে ইমা, ইয়াদ এখনো বাসায় ফিরেনি, বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে সে। ইমার মন ভালো নেই আজ। এয়ারপোর্ট থেকে আসার পর থেকে একটুও স্বস্তি পায়নি। বারবার আরমানের ব্যথিত চোখ আর ছাহেরা বেগমের কান্না চোখে ভাসছে। ইমার মনে হচ্ছে আরমান চলে যাওয়ার জন্য সেই দায়ী।

ইমা উঠে গিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আর বিড়বিড় করে বললো, মণি নিজের কর্মের ফল সবাইকেই ভোগ করতে হয়। মায়ের কাছ থেকে তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে আজ ভাগ্যই তোমার থেকে তোমার আদরের ছেলেকে দূরে সরিয়ে দিলো।

ইমা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরতেই ইমা চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে ইয়াদ। ইমাকে তাকাতে দেখে ইয়াদ ভ্রু নাচিয়ে মুচকি হাঁসলো। ইমা আবার সামনে তাকালো।

ইয়াদ ইমার কাঁধে থুতনি রেখে বললো, কী হয়েছে আমার বউটার ?

ইমা ইয়াদের প্রশ্ন উপেক্ষা করে বললো, আপনি কখন আসলেন ?

আপনি যখন ভাবনায় বিভোর ছিলেন তখনই এসেছি ম্যাম। তোমাকে এখানে বসে থাকতে দেখে ফ্রেশ হয়ে তারপর আসলাম।

ইমা ইয়াদের হাত ছাড়িয়ে বললো, চলুন আপনার খাবার দিচ্ছি।

ইয়াদ ইমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আগে বলো তোমার কী হয়েছে, এতো মনমরা কেনো তুমি ?

আরমান ভাইয়া আজ চলে গেছে, খালামুনি খুব কান্নাকাটি করছিলেন আর এখনও করছে। কথার ফোন এসেছিলো একটু আগে।

ইয়াদ বললো, না গেলেই তো পারতেন হঠাৎ এভাবে চলে কেনো গেলেন ?

ইমা ইয়াদের প্রশ্ন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রুমের দিকে যেতে যেতে বললো, রাত অনেক হয়েছে আপনি খাবেন চলুন।

ইয়াদ আর কথা বাড়ালো না চুপচাপ ইমার পেছনে যেতে লাগলো। খাবার টেবিলেও ইমা একদমই খাচ্ছিলো না শুধু খাবার নাড়াচাড়া করছে। ইয়াদ সেটা খেয়াল করে নিজেই এক লোকমা খাবার ইমার সামনে ধরলো। ইমা একবার ইয়াদের দিকে তাকিয়ে খাবারটা মুখে নিলো। ইমার মুখে খাবার তুলে দিয়ে ইয়াদ ইমার সামনে হা করলো। ইয়াদের কান্ড দেখে ইমা মুচকি হেঁসে ইয়াদের মুখে খাবার তুলে দিলো। এরপর একে অপরকে খাইয়ে দিতে লাগলো। খাওয়া শেষে ইয়াদ রুমে চলে গেলো আর ইমা সব গুছিয়ে রুমে আসলো। ইয়াদকে রুমে না দেখে মিনি ছাঁদে তাকিয়ে ইয়াদকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো।

কী ব্যাপার এখন আবার এখানে এসে দাঁড়ালেন কেনো, রাত হয়েছে তো ঘুমাবেন চলুন।

ইমা কথাটা বলে চলে আসতে গেলে ইয়াদ হাত টেনে ধরলো ইমার।

ইমা পেছনে ফিরে তাকিয়ে বললো, কী হয়েছে ?

সেটা তো তুমি বলবে।

ইমা অবাক হয়ে বললো, মানে ?

ইমা আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম আমার সামনে তোমাকে স্বচ্ছ কাঁচের মতো দেখতে চাই। কিন্তু আজ তোমাকে আমার কাছে আয়নার মতো মনে হচ্ছে। যার আড়ালে ভিন্ন কিছুও থাকতে পারে আমার অজানা। ইমা আমাকেও বলবে না কী হয়েছে তোমার ?

ইমা ইয়াদের দিকে এগিয়ে গেলো। ইয়াদের বুকে মাথা রেখে দাঁড়ালো, ইয়াদ আলতো করে ইমার মাথায় হাত রাখলো।

সেদিন কফিশপে আরমান ভাইয়া আমাকে বলেছিলো সে নাকি আমাকে ভালোবাসে।

ইয়াদ চমকে উঠলো, একটু বেশি অবাক হলো ইমার কথা শুনে। কারণ ইমার আগে বলা কথা অনুযায়ী আরমান তাকে সহ্যও করতে পারতো না।

ইমা আবার বললো, যে মানুষটা আমাকে সহ্য করতে পারে না তার মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে আমি বিশ্বাস করিনি। তার কথা শুনে এটাও মনে হয়েছিলো আমার জন্যই সে এখান থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। কিছুই মানতে পারিনি আমি তাই আপনাকেও বলিনি। কিন্তু আজ যাওয়ার সময় ভাইয়ার চোখ যেটা বলেছে সেটা মিথ্যা হতে পারে না। এখন আমার মনে হচ্ছে আমার জন্য একটা মায়ের থেকে তার সন্তান দূরে চলে গেছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে নিজের কাছে।

ইয়াদ ইমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, এখানে তোমার কোনো দোষ নেই। হয়তো ভাগ্যই এমন ছিলো তাই হয়েছে। আর একটা কথা মনে রেখো প্রকৃতি কখনো শূন্যতা পছন্দ করে না। আরমান ভাইয়ার জীবনেও একদিন তোমার শূন্যতা কেউ পূরণ করে দিবে। হয়তো সেদিন তার মায়ের কাছেও ফিরে আসবে। এসবের জন্য নিজেকে দায়ী করে কষ্ট পেয়ো না। তোমার মনি তোমার আর মায়ের সাথে যে অন্যায় করেছে তার শাস্তিও হয়তো এভাবেই পাওনা ছিলো। এসব চিন্তা মাথা থেকে ছেড়ে ফেলো, এখন চলো ঘুমাবে।

রুমে এসে ইয়াদ ইমাকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়লো, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। ইমাও ইয়াদের বুকে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। এতোক্ষণে বিষন্নতা এক নিমিষে কেটে গেলো তার। সব মন খারাপ আর বিষন্নতার মেডিসিন যেনো এটাই।

৫৯.
ইয়াবা আজ কোথায় গিয়েছিলে ভাবির সাথে ?

আরমান স্যারকে এয়ারপোর্টে ছাড়তে গিয়েছিলো ভাবি আর ভাইয়া আমাকে বলেছিলো ভাবির সাথে যেতে, সেখানেই গিয়েছিলাম।

রেহান মুচকি হাসার চেষ্টা করে বললো, তারজন্যই বুঝি আজ মনটা এতো খারাপ আমার ইয়াবার ?

ইয়ানা মাথা তুলে রেহানের দিকে তাকিয়ে বললো, আমার কোথায় মন খারাপ ?

রেহান মুচকি হেঁসে বললো, নয় বুঝি ?

ইয়ানা আবার রেহানের বুকে মাথা রেখে বললো, একদমই না।

রেহান আর কিছু বললো না চুপচাপ শুয়ে রইলো। আজ ইয়ানার কেনো যেনো আরমানের জন্য খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে না। তখনই খারাপ লেগেছিলো কিন্তু সেটা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। আজ ইয়ানা একটা কথা খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে। অবহেলা আর অযত্নে ভালোবাসাটা একসময় মরে যায়। ইয়ানার মনে আরমানের জায়গাটা অযত্ন আর অবহেলায় চাপা পড়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল রেহানের রাজত্ব। রেহানের ভালোবাসার কাছে হার মেনে ইয়ানা বাঁধ্য হয়েছে তাকে ভালোবাসতে। ইয়ানা মাথাটা একটু উঁচু করে টুপ করে রেহানের গালে একটা কিস করলো। ইয়ানার কান্ড দেখে রেহান মুচকি হাঁসলো।

কী ব্যাপার ম্যাডাম, আজ না চাইতেই বৃষ্টি কীভাবে এলো বলুন তো ?

ইয়ানা ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বললো, কেনো ভালো লাগেনি ? ঠিক আছে ফেরত নিয়ে নিচ্ছি।

রেহান দুষ্টু হেঁসে বললো, বললেই ফেরত নেওয়া হয়ে গেলো নাকি ? দাড়াও আমি ফেরত দিচ্ছি সুদ সমেত।

ইয়ানা কিছু বুঝার আগেই রেহান ইয়ানার দুগালে দুটো কিস করে দিলো। ইয়ানা বাঁকা চোখে তাকালো আর রেহান হা হা করে হাসতে লাগলো। ইয়ানাও মুচকি হেঁসে রেহানের বুকে মুখ লুকালো চুপটি করে।

,,,,,

ইশান একটার পর একটা কল দিয়েই যাচ্ছে কিন্তু কথা রিসিভ করছে না আর কেটেও দিচ্ছে না। এদিকে ইশানের পাগল প্রায় অবস্থা কথার এমন ইগনোর দেখে। কথা মনমরা ছিলো তাতে ইশান একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিলো এভাবে মুখ গোমড়া করে থেকো না, ভালো লাগে না। এটা নিয়ে দুজনের ছোট খাটো একটা যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

কল দিতে দিতে ইশান নিজের মনে বিড়বিড় করে বললো, মিস্টার ইশান আরো করো পিচ্চিদের সাথে প্রেম। কথায় কথায় গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। এ খোদা তুমি উদ্ধার করো এই বিপদ থেকে।

ও তার মানে আমি আপনার জন্য বিপদ হয়ে গেছি এখন, তাই না ?

কপাল খারাপ থাকতে যা হয় আর কী। ইশান ফোন কানে নিয়ে বকবক করছে আর কথা কখন রিসিভ করেছে টেরই পায়নি। ইশানের শেষের কথা শুনে কথা তো আরো রেগে বোম হয়ে গেছে।

এখন তো আমি পুরনো হয়ে গেছি, আমাকে আর ভালো লাগে না ।

ইশান অবাক হয়ে বললো, যা বাবা, এই তো সেদিন একসেপ্ট করলে। পুরনো হলে কখন আবার ?

আপনি আর কথা বলবেন না আমার সাথে, কলও দিবেন না বলে দিলাম।

ইশানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কথা ফোন কেটে দিলো। ইশান হ্যালো হ্যালো করে বুঝতে পারলো অনেক আগেই কেটে দেওয়া হয়েছে। ইশান নিজের চুল টানতে লাগলো৷ কথা আগের মতো আর গম্ভীর নেই, দিন দিন যেনো চঞ্চল হয়ে উঠছে ইশানের সাথে থেকে। ইশান একসময় খুব করে চাইতো কথা সবসময় বকবক করুক তার সাথে ছোট ছোট ঝগড়া করুক। কিন্তু এখন যখন এসব করছে তখন মনে হচ্ছে আগের কথাই ভালো ছিলো তার জন্য। এখন তো তার জীবন ধনেপাতা করে দিচ্ছে। ইশান গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে গেলো। এখন এভাবেই ম্যাডামের রাগ ভাঙাতে হবে তার। বাড়ির সামনে গিয়ে কল দিলে কথা রিসিভ করেই মারলো এক ঝাড়ি।

উত্তরে ইশান ছোট করে বললো, নিচে আসো একটু।

এটুকু বলেই কল কাট করে দিলো৷ কথা কিছু বুঝতে না পেরে কিছু সময় হা করে রইলো। তারপর দরজা খোলে উঁকি মেরে দেখলো কেউ নেই। তাই পা টিপে টিপে বের হয়ে এলো বাসা থেকে। গেইটের কাছে বসে দারোয়ান ঘুমে ঝিমাচ্ছে তাই বের হতে প্রবলেম হলো না। ইশান একটা টেডিবিয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাতে লেখা সরি আর সাথে অনেকগুলো চকলেট।

ইশান একহাতে কান ধরে বললো, সব দোষ আমার, সরি সরি সরি আর হবে না।

কথা কিছু না বলে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ইশানকে আর ইশান মুচকি হাঁসলো।

৬০.
পুরো জার্নি আরমানের মাথা খেয়ে আরিশার স্বস্তি হয়নি এখনো আরমানের পিছু ছাড়ছে না সে।

আরমান বিরক্ত হয়ে বললো, আপনি এবার তো নিজের গন্তব্যে জান।

আরিশা চশমা ঠিক করে আশেপাশে তাকিয়ে বললো, আমার জন্য গাড়ি চলে এসেছে আপনি চলুন আমার সাথে। একই জায়গায় তো যাবো।

আরমান সামনে তাকিয়ে বললো, আমার জন্য অফিস থেকে গাড়ি পাঠানো হবে।

আরিশা জোর গলায় বললো, গাড়ি আসবে আর এসেছে এর পার্থক্য বুঝতে পারছেন না ? এক জায়গায় যেহেতু যাবো তাহলে সাথে গেলে কী প্রবলেম বলুন তো ? আপনাদের অফিস থেকে একটা এপার্টমেন্টেই সবার ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। আমাদের অবশ্য একটা নিজস্ব বাড়ি আছে তবে পাপার অফিসে যাওয়ার সুবিধার্থে অফিসের দেওয়া ফ্ল্যাটেই থাকি আমরা।

আরমান কী করবে বুঝতে পারছে না। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার পরও আরিশা কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না।

আরিশা এবার বিরক্ত হয়ে আরমানের হাত টেনে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে বললো, চলুন তো চুপচাপ। আমি পাপাকে বলে দিচ্ছি অফিস থেকে আর গাড়ি পাঠাতে হবে না।

আরমানের চেহারাটা দেখার মতো হয়েছে। ভয়ে যার সাথে কেউ কথা বলতে পারে না। এই মেয়ের এতো সাহস তার হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে। আরমানের কথা বন্ধ হয়ে গেছে আরিশার কান্ডকারখানা দেখে।

আরিশা নিজের পাপাকে কল দিয়ে বললো, পাপা তোমাদের অফিস থেকে এয়ারপোর্টে যে গাড়ি পাঠানোর কথা ছিলো সেটা ক্যান্সেল করে দাও। মিস্টার আরমান আর আমি একই ফ্লাইটে এসেছি আর এক গাড়িতেই আসছি।

আরিশা নিজের বাবাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দিলো একা বকবক করেই। আরমান এই মেয়েকে যতো দেখছে ততই অবাক হচ্ছে।

আরিশা আরমানের দিকে তাকিয়ে আবার বললো, আমি এতো ভালো বাংলা কীভাবে বলতে পারি জানেন ? আমাদের বাসায় বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ আর তার ক্রেডিট পুরোটাই আমার পাপার পাওনা।

আরমানের আরিশার কথায় কোনো মনোযোগ নেই সে বাইরে তাকিয়ে নতুন এক দেশ দেখছে। রাতের অন্ধকার আড়াল করতে সারি বাঁধা লাইটের বহর। কোনো মিল নেই বাংলাদেশের সাথে। রাস্তায় জ্যাম, হর্ণের আওয়াজ, মানুষের চেঁচামেচি, রাস্তার পাশের নর্দমা স্তুপের দম বন্ধ করা বাজে গন্ধ কিছুই নেই এখানে। তবু আরমানের ভালো লাগছে না এই শহর। এই শহরে তার কোনো আপনজন নেই। মা বলে ডাকতেই কেউ দৌড়ে আসবে না তার কথা শোনার জন্য। এখানে সে সম্পূর্ণ একা কেউ নেই তার পাশে। ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে হয়তো হাউমাউ করে কেঁদে বুকের ভারী ভাবটা একটু কমাতে পারতো কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। কারণ সে ছেলে আর ছেলেদের কাঁদতে নেই। বুকের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলতে হয় তাদের। আরিশা খেয়াল করলো আরমান বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাই বাইরে যা দেখা যাচ্ছে তার ছোট খাটো বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে আরিশা। আরমান আদৌও সেসব শুনছে কিনা বুঝার উপায় নেই।

অনেক ঝড় ঝাপটা মোকাবেলা করে আরমান অফিসের দেওয়া ফ্ল্যাটে পৌঁছালো। আরমানের ফ্ল্যাট পাঁচ তলায় আর আরিশাদের ফ্ল্যাট সাত তলায়। আরমান আরিশাকে কিছু না বলেই লিফট থেকে নেমে গেলো আর আরিশা তা দেখে মুখ গোমড়া করলো কিন্তু পরক্ষণে কিছু ভেবে মুচকি হাঁসলো। আরমান নিজের রুমে গিয়ে, ওয়াশরুম থেকে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বেডে শুয়ে পড়লো ধপাস করে। ফ্ল্যাটে দুটো বেডরুম, প্রত্যেক রুমে আলাদা ওয়াশরুম, একটা ড্রয়িংরুম আর সাথেই কিচেন। আরমান বেডে শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো ক্লান্তিতে। এদিকে আরিশা কয়েকবার কলিংবেল বাজালে ঘুমঘুম চোখে তার মা দরজা খোলে দিলো। ভেতরে গিয়ে আরিশা মম বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলো।

আশা ঘুমঘুম গলায় বলে উঠলো, এমন চিৎকার চেচামেচি না করে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়। তোর পাপা অনেক রেগে আছে সকালে কথা হবে।

আরিশা গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইলো আর তার মা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার পেছন ফিরে বললো, কিছু খাবি, ক্ষুধা পেয়েছে ?

আরিশা গোমড়া মুখে বললো, না খেয়েছি।

ওকে, তাহলে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়।

সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে থমথমে মুখে বসে আছে আবির রায়হান। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে আরিশা।

থমথমে গলায় আবির বললো, তুমি রাকিবকে হেনস্তা করেছো কেনো ?

আমার তাকে পছন্দ হয়নি।

স্পষ্ট গলায় আরিশার উত্তর দেখে আবির বললো, তুমি এ পর্যন্ত কতগুলো ছেলেকে রিজেক্ট করেছো তার হিসাব আছে তোমার কাছে ?

আর করবো না।

আবির অবাক হয়ে বললো, মানে ?

তোমার অফিসে নতুন জয়েন করার জন্য যে গতরাতে আমার সাথে ফ্লাইটে এসেছে। He is much better than Rakib.

আবির রেগে বললো, চেনা নেই জানা নেই একদিনে তাকে পছন্দ হয়ে গেলো তোমার ?

প্রত্যেকবার তুমি যে কথাটা আমাকে বলো আজ আমি সেটা তোমাকে বলছি, সময় নাও চেনো জানো তোমার অফিসেই তো জয়েন করবে। তুমি সময় নাও আমার প্রবলেম নেই। তাকে আমার যতটুকু চেনার প্রয়োজন ছিলো গতকালই চিনে নিয়েছি এবার তোমার পালা।

আরিশা কথা শেষ করে নিজের রুমে চলে গেলো আর আবির রাগে বোম হয়ে বসে রইলো। আবিরের প্রবলেম হচ্ছে মেয়েকে আস্ট্রেলিয়ায় বড় করে মেয়ের উপর আচরণ করে বাংলাদেশের। না দেখে না জেনেই আরমান সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারণা তৈরি হয়ে গেলো আবিরের মনে। মিসেস আশা নিরব দর্শক মাত্র। আরিশার ঘুম শেষ হয়নি, জরুরি তলবে ডাইনিং টেবিলে হাজির হতে হয়েছিলো৷ বেডে শুয়ে একবার আরমানকে কল্পনা করে মুচকি হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিলো।

চলবে,,,,#তিক্ততার_সম্পর্ক
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
অন্তিম পর্ব

ঝলমলে আলোতে নজর কাঁড়ছে বাড়িটা। ফুল আর নানা রঙের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে সবার। আজ কথা আর ইশানের গায়ে হলুদ। দেখতে দেখতে কেটে গেছে পাঁচটা বছর, বদলে গেছে অনেক কিছু। পাঁচ বছর হয়ে গেছে আরমান এখনো দেশে ফিরেনি। দেশে ফেরার কথা বললে সবসময়ই এড়িয়ে গেছে। তবে আজ ছাহেরা বেগম পথ চেয়ে বসে আছে, আরমান তার একমাত্র ছোট বোনের বিয়েতেও আসবে না। এটা কী করে হতে পারে ? তাকে জানানো হয়েছে কথার বিয়ের ডেট। কথার সাথে ছাহেরা বেগমের সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি বরং ধীরে ধীরে আরো বেশী অবনতির দিকে গেছে। আরমান দু তিনদিন পর মন চাইলে কল করে, না চাইলে করে না। ছাহেরা বেগম দুজন সন্তান থাকতেও তাদের থেকে দূরে। একটু পরই হলুদ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে কথাকে সাজানো হচ্ছে। পর্লারের মেয়েরাই সাজাচ্ছে তাকে।

কথা আরমান কী তবে সত্যি আসবে না ?

কথা মায়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো, তোমার বা তোমার ছেলের কাছে আমার গুরুত্ব কোনো কালেই ছিলো না। তাই অন্য কোনোদিন আর আজকের দিনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই মিস্টার আরমান মাহমুদের কাছে।

কথাটা শেষ করার আগেই এক বিন্দু পানি গড়িয়ে গেলো চোখের কোণ থেকে। আর পাঁচটা ছোট বোনের মতো, বড় ভাইয়ের কাছে গুরুত্ব কখনোই পায়নি কথা। সেই অভিযোগ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গাঁথা থাকবে তার মনে।

৬১.
আজ আমার মাকে একদম প্রিন্সেস লাগছে।

কথাটা শেষ করে দুই বছরের মেয়ের কপালে চুমু খেলো ইায়ানা। মেয়েটা যতো বড় হচ্ছে দিনদিন যেনো ততই কিউট হচ্ছে। দেখতে পুরো রেহানের মতো হয়েছে রোহিণী। চুপচাপ বসে থাকলে সবাই ডল থেকে ভুল করে।

ইয়াবা তোমার হলো ? সবাই কিন্তু রেডি হয়ে গেছে এখনই রওনা দিয়ে দেবে।

হলুদ রঙের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে রেহান দরজা ঢেলে ভেতরে এলো।

ইয়ানা ভাব নিয়ে বললো, আমার ভাইয়ের বিয়ে কী আমাকে ছাড়া হবে নাকি ?

রেহান চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলো। ইয়ানার গায়ে হলুদ সবুজ কম্বিনেশনের শাড়ী আর রোহিণীর গায়ে সবুজ রঙের প্রিন্সেস ড্রেস। মা মেয়ে দুজনকেই চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে, রেহানকেও কম লাগছে না পাঞ্জাবিতে, সব মিলিয়ে পার্ফেক্ট ফ্যামিলি।

রেহানকে দেখে ছোট রোহিণী হাত বাড়িয়ে ভেঙে ভেঙে পাপা বলে ডাকতে লাগলো। রেহান এগিয়ে এসে মেয়েকে কোলে নিয়ে গালে কিস করলো।

রেহান মুচকি হেঁসে বললো, আমার মাকে তো আজ প্রিন্সেস লাগছে।

ইয়ানা কোমরে হাত দিয়ে বললো, এই তুমি আমাকে কপি করলে কেনো ?

রেহান অবাক হয়ে বললো, আমি কখন তোমাকে কপি করলাম।

রোহিণীকে এখনই আমি এটা বললাম আর তুমিও এটাই বললে কেনো ?

রেহান চোখ মেরে বললো, দেখলে তোমার সাথে আমার কত মিল ইয়াবা।

দুজনের ঝগড়ার মাঝেই রোহিণী হঠাৎ রেহানের গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বললো, পাপা।

ইায়ানা রোহিণীর দিকে তাকিয়ে বললো, ওরে দুষ্টু এতোক্ষণ কষ্ট করে সাজালাম আমি আর পাপাকে আদর দেওয়া হচ্ছে ?

রেহান চোখ টিপ মেরে বললো, চিন্তা করো না, তোমাকে আমি আদর করে উসুল করে দিবো।

ইয়ানা রেহানকে মারতে মারতে বললো, এখন লেট হচ্ছে না ?

রেহান ব্যস্ত হয়ে বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ চলো।

৬২.
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে চার বছরের ইমাদ আর বেডে বসে গালে হাত দিয়ে ছেলের কান্ড দেখছে ইমা। চার বছর বয়স কিন্তু অ্যাটিটিউড দেখে মনে হয় একদম ম্যাচিউরড একটা ছেলে। কথার মাঝেও কোনো জড়তা নেই তার, একদম স্পষ্ট কথা বলে।

ইমা দুষ্টুমি করে বললো, বাবা আপনার হয়েছে ? যদি হয়ে থাকে তাহলে চলুন আমাদের লেট হচ্ছে।

ইমাদ ঘুরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, ওফ মা একটু ভালো করে দেখতে দাও। চাচ্চুর বিয়ে কী আর বারবার আসবে নাকি ? কত মানুষ আসবে বলো তো, সবাই দেখবে না আবসার হামিদ ইমাদকে ?

নামটা বাবা মা দুজনের সাথেই অনেক মিল কিন্তু চেহারা পুরো বাবার মতো আর সব কাজেই বাপকে কপি করে বেড়ায় এই ছেলে। ইয়াদও বুঝে গেছে ছেলের কাহিনী। তাই তো নিজের জন্য যা যা শপিং করে, সব কিছুরই একটা ছোট সাইজ নিয়ে আসে ইমাদের জন্য। আজও বাবাকে কপি করে হলুদ পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা, জেল দিয়ে চুল সেট করা, চোখে সানগ্লাস, পায়ে ব্ল্যাক শো একদম পার্ফেক্ট।

তোমাদের জন্য সবাই গাড়িতে ওয়েট করছে আর তোমরা মা ছেলে মিলে রুমে করছোটা কী বলো তো একটু আমাকে ?

ইয়াদ অনেকটা রাগি গলায় কথাটা বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলো। রুমে চোখ বুলিয়ে ইমাকে বেডে বসে থাকতে দেখে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকালো। ইমাদ বেশ স্টাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াদ একবার নিজের দিকে তাকিয়ে আবার ছেলের দিকে তাকালো। ইয়াদের মনে হচ্ছে তার একটা ছোট ভার্শন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা পুরো কপি করেছে তাকে। ইয়াদ অসহায় চোখে ইমার দিকে তাকালে ইমা নিচের ঠোঁট কিছুটা উঁচু করে বুঝালো নতুন কিছু না।

ইমাদ বেশ হাসিখুশি মুখে বললো, বাবা দেখতো তো আমাকে তোমার মতো লাগছে কিনা ?

ইয়াদও মুখে হাসি ফুটিয়ে ইমাদের কাছে গিয়ে কোলে তুলে বললো, আমার থেকেও অনেক বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে আমার বাবাকে।

ইমাদ মুখ গোমড়া করে বললো, তোমার থেকে বেশি লাগবে না, তোমার মতো লাগলেই হবে।

ইয়াদ এবার ইমার দিকে তাকালো ইমা মুচকি হাঁসলো। আজ সবার ড্রেস প্রায় এক রকম। ছেলেদের হলুদ পাঞ্জাবি আর মেয়েদের হলুদ সবুজ কম্বিনেশন শাড়ি। ইমাও সেটাই পড়েছে, পাঁচ বছরে ইয়াদ বা ইমার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এখনও তেমনি আছে যেমন পাঁচ বছর আগে ছিলো। তবে পরিবর্তন হয়েছে তাদের ভালোবাসারটা। আগের থেকেও অনেক বেশি মধু হয়ে উঠেছে তাদের সম্পর্ক। ইমাদের জন্মের সময় ইমা প্রায় মরতে বসেছিলো সেখান থেকেই ইয়াদ আরো পাগলের মতো ভালোবাসে ইমাকে। ইমাকে হারানোর ভয়ে আর বাচ্চাও নেবে না ঠিক করেছে। আবসার হামিদ ইমাদই থাকবে তাদের একমাত্র সন্তান।

ইমা বেড থেকে উঠে বাবা ছেলেকে তাড়া দিয়ে বললো, এবার চলুন আপনারা।

ইয়াদ আর ইমা পাশাপাশি বের হওয়ার সময় ইয়াদ আস্তে করে ইমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, আজ আবার নতুন করে প্রেমে পড়লাম।

ইয়াদের এই লো ভয়েস এখনো ইমার গায়ে কাটা দেয়, এখনো ইয়াদের স্পর্শে কেঁপে উঠে ইমা। ইয়াদের বলা কথাটা যেনো কান থেকে সোজা হৃদয়ে শীতল ছোঁয়া দিলো ইমার। ইয়াদের দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি দিয়ে সামনে আগাতে লাগলো সে।

ইমাদ ইশানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, পাপা নামিয়ে দাও আমাকে জলদি।

ইয়াদ ইমাদকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই এক ছোটে ইশানের রুমে চলে গেলো। ইশানের হলুদ অনুষ্ঠান হয়ে গেছে, এখন সবাই কথাদের বাড়ি যাবে। ইশান শাওয়ার নিয়ে কাবার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছছে টাওয়েল দিয়ে।

ইমাদ রুমে ঢুকেই বললো, চাচ্চু দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে ?

ইশান পেছন ঘুরে ইশানকে দেখে এগিয়ে এসে কোলে তুলে দু’জনে হাই-ফাইভ করলো আর ইশান বললো, প্রিন্সের মতো লাগছে।

ইমাদ খুশি হয়ে বললো, ইয়ে,,,,

ইশান ইমাদের দিকে গাল এগিয়ে দিতেই ইমাদ টুস করে একটা কিস করলো আর ইশান হাসি মুখে তাকে নামিয়ে দিলো। ইমাদ যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই ছুটে বের হয়ে গেলো। ইশানের সাথে ইমাদের খুব ভাব ইমাদ ছোট থেকেই।

৬৩.
ইশান বেড়ে শুয়ে ভিডিও কলে কথাকে দেখছে আর কথা মাঝে মাঝে ইশানের দিকে তাকাচ্ছে। আশেপাশে এতো মানুষ তবু ইশানের জন্য কল কাটতে পারছে না। ইশান বলে দিয়েছে এখন কল কেটে দিলে আর শোধ বাসর রাতে তুলবে। সেই ভয়ে কথাও কল কাটার সাহস পাচ্ছে না।

কথা আস্তে করে বললো, এভাবে কী দেখছো হ্যাঁ ?

ইশান মুচকি হেঁসে উত্তর দিলো, এতোদিনের স্বপ্ন সত্যি হতে দেখছি।

ইশানের উত্তরে কথা লাজুক হাসলো। অনেক ঝড় ঝাপটা পেড়িয়ে তবেই তারা এক হতে চলেছে আজ। অনার্স ২য় বর্ষের ফাইনাল এক্সামে দুই বিষয়ে ফেল করেছিলো ইশান। ইয়াদ সেটা জানতে পেরে ভিষণ রেগে যায়। ইশানকে ডেকে কারণ জানতে চাইলে কথার বিষয়ে সব সামনে আসে। এদিকে বরাবর ভালো রেজাল্ট করা কথাও কোনো মতে টেনেটুনে পাশ। ইশানের ওপর নেমে আসে কঠোর আদেশ। পড়াশোনা শেষ করার আগে কোনো রকম মেলামেশা করা যাবে না। ইয়াদ ইশানকে কথা দিয়েছিলো ভালোভাবে মাস্টার্স শেষ করে অফিসে জয়েন করলে সে নিজে কথার সাথে বিয়ে দিবে। এদিকে কথার রেজাল্টে ক্ষেপে যায় আমিনুল মাহমুদ। এমন পড়াশোনার প্রয়োজন নেই, ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেবো। বাবার এমন হুমকিতে ভয় পেয়ে যায় কথা। ইশানকে জানালে সে ইয়াদকে সব বলে। অবস্থা খারাপ দেখে ইয়াদ নিজে কথা বলে আমিনুল মাহমুদের সাথে। অফিস থেকে বের করে দেওয়ার রাগ মেটানোর যেনো সুযোগ পেয়ে যায় আমিনুল, ইয়াদকে এক প্রকার অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। ইয়াদকে অপমান করেছে শুনে ইশান রেগে গিয়ে বলে কথার সাথে আজ থেকে তার সব সম্পর্ক শেষ। ইয়াদ পরে যায় বিপদে, তার জন্য ভাইয়ের জীবন নষ্ট হবে সেটা মেনে নিতে পারছিলো না কিছুতেই। এদিকে কথার বিয়ে ঠিক করে ফেলে অধিক বয়স্ক এক বড়লোকের সাথে। ছাহেরা বেগম অনেক বুঝানোর পরও আমিনুল কিছুই বুঝার চেষ্টা করে না। কথার বয়স কেবল ১৮ ছিলো, বাস্তবতার চাইতে আবেগে বসবাস বেশি। আবেগের বশেই সুইসাইডের চেষ্টা করে মরতে মরতে বেঁচে যায়। কথা মারা না গেলেও সেই ঘটনায় আমিনুল মাহমুদের ভেতরের রাগ মরে যায় ঠিকই। ইশানের সাথে বিয়েতে রাজি হয়ে যায় আর ইয়াদকে অপমান করার জন্য হাত ধরে মাফ চায়। কিন্তু ঠিক হয় ইশানের মাস্টার্স শেষ হলে অফিসে জয়েন করবে তারপর বিয়ে। মাঝে কোনো যোগাযোগ করতে পারবে না আর পুনরায় খারাপ রেজাল্ট করলে দুজনকেই অন্যকারো সাথে বিয়ে দেওয়া হবে। ইশান আর কথা রাজি হয়ে যায় শর্তে তবে মাঝে মাঝে লুকিয়ে ঠিকই দেখা করে তারা। এভাবেই তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে আজ।

ইশানকে অন্যমনস্ক দেখে কথা বললো, কী ভাবছো তখন থেকে ?

না মানে ভাবছি কোনো ভালোবাসাই সহজে পাওয়া যায় না। তার জন্য অনেক যুদ্ধ করতে হয়। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম খুব সহজেই তোমাকে পেয়ে যাবো। কিন্তু দেখো কত কাঠ খড় পুড়াতে হলো।

কথা মুচকি হেঁসে বললো, সহজে কিছু পেয়ে গেলে তার প্রতি আমাদের গুরুত্ব থাকে না।

ইশান হা হা হা করে হেসে বললো, আমার খুকিটা অনেক বড় হয়ে গেছে দেখছি। এখন বড় বড় কথাও শিখে গেছে।

কথা চেঁচামেচি শুনে বললো, সবাই চলে এসেছে এখন রাখছি। ইয়ানা আপু আর ইমা আপু দেখলে আমাকে নিয়ে মজা করবে।

ইশানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কথা কল কেটে দিলো। ইমা আর ইয়ানা কথাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো।

ইমাদ কথার সামনে গিয়ে বললো, মুনমুন।

ইয়ানা ইমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, ইমাদ বাবা এটা এখন আর তোমার মুনমুন নয়, ছোট মা হয়ে গেছে তো।

ইমাদ গালে আঙুল দিয়ে চিন্তা করার ভাব করে বললো, সেটা কীভাবে হলো ফুপ্পি ?

তোমার চাচ্চুর বউ হয়ে যাবে তোমার মুনমুন আর তোমার ছোট মা হবে।

ইমাদ চিন্তিত হয়ে বললো, তাহলে আমি কী বলে ডাকবো মুনমুন নাকি ছোট মা ?

ছেলের পাকা পাকা কথা শুনে ইমার চোখ রসগোল্লা আর ইয়ানা হা হা করে আসছে। কথা ইমাদকে কোলে নিয়ে বললো, বাবাই তুমি আমাকে আগে যেমন মুনমুন বলতে এখনো মুনমনু বলেই ডাকবে।

ইমাদ হাসি মুখে বললো, ওকে।

কথার কোল থেকে নেমে দিলো এক দৌড় আর তাহেরের সামনে গিয়ে বললো, আসসালামু আলাইকুম মামা।

আরমানের অবর্তমানে কথার বড় ভাইয়ের দ্বায়িত্ব তাহের পালন করছে। আগের থেকে ম্যাচিউরড আর শান্ত হয়ে গেছে তবে এখনো বিয়ে করেনি।

তাহের ইমাদকে কোলে নিয়ে গালে কিস করে বললো, ওয়ালাইকুম আসসালাম, কেমন আছে আমার মামাটা ?

ইমাদ বিজ্ঞের মতো বললো, আলহামদুলিল্লাহ।

তাহের খুশী হয়ে গেলো ইমাদের শিক্ষা দেখে। ইমা নিজের ছেলেকে ইসলামিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত করেনি।

মামা, নানু কোথায় ?

সে তো আগামীকাল আসবে মামা।

সবাই অনুষ্ঠানে মনোযোগ দিলো। ইমাদ তাহেরকে পেয়ে তার কারো কোলেও যায়নি আর নামেওনি তাহেরের কোল থেকে। একে একে সবাই কথাকে হলুদ লাগিয়ে দিলো। কথা সবার আনন্দ দেখতে ব্যস্ত, হঠাৎ গালে ঠান্ডা হলুদের স্পর্শ পেয়ে হাসিমুখে ঘুরে তাকালো কিন্তু হাসিটা মিলিয়ে গেলো পাশে তাকিয়ে।

অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো, ভাইয়া,,,,,,

আরমান আলতো করে জড়িয়ে ধরলো আদরের বোনটাকে। এখান থেকে চলে গিয়ে বোনের শূন্যতা একটু একটু করে বুঝতে পেরেছে সে।

আরমান ভেজা গলায় বললো, আমার বোনটা অনেক বড় হয়ে গেছে, সেই পিচ্চি আর নেই।

কথাও আরমানকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো। কথার কান্নার শব্দে সবাই তাকালো কথার দিকে আর আরমানকে দেখে সবাই থমকে গেলো। ছাহেরা বেগম ছেলেকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো আর আরমানের চোখেও পানি। এতগুলো দিন পর নিজের আপনজনদের কাছে পেয়ে চোখের পানি আঁটকে রাখতে পারেনি। আমিনুল মাহমুদ কাজে ব্যস্ত ছিলো ছেলের কথা শুনে সেও দৌড়ে এলো। ইমা ধীর গতিতে ইয়াদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সবার সাথে কথা বলা শেষে আরমান সামনের দিকে তাকিয়ে আরিশা বলে ডাক দিলো। সবাই অবাক হয়ে তাকালো আরমানের দিকে। তারপর সামনে তাকিয়ে শাড়ী আর হিজাব পরিহিতা এক সুন্দরী মেয়েকে দেখতে পেলো।

ছাহেরা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো, আরমান এটা কে ?

আরমান আরিশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো, তোমার বৌমা।

আরমানের কথাটা শুনে ছোট খাটো এক ঝড় বয়ে গেলো উপস্থিত সবার মাঝে। আরিশা এগিয়ে এসে ছাহেরা বেগম আর আমিনুল মাহমুদকে মিষ্টি করে সালাম দিলো। থতমত খেয়ে দুজনেই সালামের উত্তর নিলো। আরমানের আগমনে একটু তাড়াতাড়ি হলুদ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। আরমান একবার তাকালো ইমার দিকে, কোলে চোখে পড়লো ছোট্ট ইমাদকে। যে ড্যাবড্যাব করে দেখছে আরমানকে। ইয়ানা তাকিয়ে আছে আরিশার দিকে মেয়েটার মুখ থেকে যেনো হাসি সরছেই না। ইয়াদ সবাইকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো, এর মধ্যে ইশানও জেনে গেছে আরমানের ফিরে আসার কথা। বিয়ে বাড়ি অনেক মেহমান আছে তাই আমিনুল মাহমুদের রুমেই আরমানকে নিয়ে ছোট খাটো একটা মিটিং বসলো। সেখানে উপস্থিত কেবল কথা, ছাহেরা বেগম, আমিনুল মাহমুদ আর আরমান আরিশার সোফায় বসে আছে চুপচাপ। আরিশার কথা জানতে চাইলে আরমান ফ্লাইট থেকে শুরু করে সব বলে। আবির রায়হান আরমানকে সবসময় চোখে চোখ রেখেছে আর অন্যদিকে আরমান যতক্ষণ বাসায় থাকতো উপস্থিত হয়ে যেতো আরিশা। আরমানের টুকিটাকি হেল্প করতো আর নিজেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে নেয় আরমানের জন্য। একসময় আরমানের মনেও দুর্বলতা তৈরি হয়ে যায় আরিশার জন্য। তবু অজানা কারণে আরমানকে পছন্দ করতে পারছিলেন না আবির। তাই আরিশার আবার বিয়ে ঠিক করে কিন্তু এবার বরযাত্রী আসার আগে তারা মানা করে দেয় অজানা কারণে। মেহমান ভর্তি বাড়িতে আরিশা বলে দেয় সে আরমানকে ভালোবাসে আর তাকেই বিয়ে করবে। আরমান সেখানেই উপস্থিত ছিলো কিন্তু অবাক হয়নি আরিশার আচরণে কারণ সে আগেই বুঝেছিলো। আবির শেষে বাধ্য হয়ে রাজি হয় আরমানের সাথে বিয়ে দিতে আর আরমানও আরিশাকে মেনে নেয়। কারণ মেয়েটা তাকে অসম্ভব ভালোবাসে সেটা আরমান উপলব্ধি করতে পারে। হুট করে বিয়ে করায় আরমান আর বাড়িতে জানায়নি। সব শুনে আমিনুল মাহমুদ দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো আর ছাহেরা গিয়ে আরিশার কপালে চুমু একে দিলো।

ছাহেরা বেগম হাসি মুখে বলে, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে ভেবে কাজ নেই তবে আমি তার তোদের কোথাও যেতে দিবো না।

আরমান এখন আর জানালো না তাদের চলে যেতে হবে। মায়ের মুখের হাসিটা সে কেড়ে নিতে চাইছে না এখন।

৬৪.
পরদিন ধুমধামে বিয়ে শেষ হলো ইশান আর কথার। বিদায়ের সময় কথা বাবা-মা আর ভাইকে জড়িয়ে অনেক সময় কাঁদলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। যার যার গাড়িতে সে সে যাচ্ছে। ইয়াদ ড্রাইভ করছে আর ইমা চুপচাপ বসে আছে বাইরের দিকে তাকিয়ে। ইমাদ ইমার কোলে ঘুমে কাঁদা হয়ে গেছে।

ইমা ভাবছে বিকেলে আরমানের বলা কথাগুলো। ইমা কথার রুমের দিকে যাচ্ছিলো তখনই পেছন থেকে আরমানের ডাকে থেমে যায়।

কেমন আছিস ইমা ?

ইমা ঘুরে তাকিয়ে বললো, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ ভালো রেখেছে, আপনি কেমন আছেন ?

আলহামদুলিল্লাহ,,,

আরমান কথা শেষ করার আগেই কোথা থেকে ইমাদ এসে ইমার পা জড়িয়ে ধরলো। ইমা নিচে তাকিয়ে কোলে তোলে নিলো তাকে।

ইমাদ আরমানের দিকে তাকিয়ে বললো, মা এটা কে ?

আরমান হাত বাড়িয়ে ইমাদকে কোলে নিলো আর বললো, আমি তোমার মামা ?

আমার মামা তো আছে, তাহের মামা ?

আমি তোমার আরেকটা মামা।

ইমাদ কিছু না বলে আরমানকে দেখছে। হঠাৎ কেউ ইমাকে ডাকলে ইমা আরমানের কোল থেকে ইমাদকে নিয়ে সামনের দিকে আগাতে লাগলো।

আরমান পেছন থেকে বললো, আজও কী আমার জন্য রাগ পুষে রেখেছিস মনে ?

রাগ পুষে রাখলে সেদিন এয়ারপোর্টে যেতাম না।

ইমা আর না দাঁড়িয়ে চলে গেলো আর আরমান সেদিকে তাকিয়ে রইলো। আরিশা ইমার জায়গাটা নিতে পারেনি আরমানের মনে তবে নিজের জন্য নতুন করে একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।

আরমান ইমার দিকে তাকিয়ে ছিলো তখনি আরিশা পেছন থেকে আরমানকে জড়িয়ে ধরলো।

আরমান ব্যস্ত গলায় বললো, আরো এটা অস্ট্রেলিয়া নয় এটা বাংলাদেশে। কেউ দেখলে কেলেংকারী হয়ে যাবে।

ইমা পেছনে ঘুরে আরমান আর আরিশাকে দেখে মুচকি হাঁসলো।

কী ভাবছো তখন থেকে ?

ঘোর কাটলো ইমার মুচকি হেঁসে বললো, আপনি ঠিক বলেছিলেন প্রকৃতি কখনোই শূন্যতা পছন্দ করে না।

মানে ?

কিছু না, ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিন।

ইমা ইয়াদের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে কাঁধে মাথা রাখলো। ইয়াদ ইমার মাথায় আলতো করে কিস করে মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করতে লাগলো।

৬৫.
বাসর ঘরে বসে এখনো কান্না করছে কথা।

ইশান রুমে এসে কথার সামনে বসে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থেকে বললো, ইশ কান্না করতে করতে পেত্নী হয়ে গেছে একদম। থাক কান্না করো না তোমাকে সকালে তোমার বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে নিবো, যে একদম কাঁদবে না।

কথা ক্ষেপে গিয়ে ইশানকে মারতে লাগলো আর ইশান কথার দু’হাত আঁটকে বুকে জড়িয়ে নিলো।

এভাবে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখবো, কখনো যেনো ঐ চোখে কাজল ছাড়া আর কিছু দেখতে না পাই বুঝলে ?

কথা মুচকি হেঁসে ইশানের বুকে লেপ্টে শুয়ে রইলো। ভালোবাসা নিজের করে পাওয়ার সুখটা উপভোগ করছে দুজনে।

,,,,,,
ইয়ানা ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে আর রেহান মেয়েকে নিয়ে নাজেহাল অবস্থা। রেহান চেঁচিয়ে ইয়ানাকে ডাকছে আর ইয়ানা সেটার মজা নিচ্ছে। মেয়েকে এতো ভালোবাসে তবু একটু সামলাতে পারে না রেহান।

তোমার মেয়ে আমার অবস্থা খারাপ করে দিলো ইয়াবা।

ইয়ানা চেঁচিয়ে বললো, ভালো হয়ে থাকলে তোমার মেয়ে আর দুষ্টুমি করলেই আমার মেয়ে হয়ে যায় তাই না ?

ইয়ানা বের হয়ে মাথায় টাওয়েল জড়িয়ে নিয়ে তারপর রেহানের কোল থেকে রোহিণীকে কোলে তুলে নিলো।

রেহান ইয়ানার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বললো, তোমাকে না সেই লাগছে।

ইয়ানা চোখ গরম করে তাকাতেই রেহান দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। ইয়ানা মুচকি হাঁসলো রেহানের কাজে।

,,,,,,,,,
এদিকে আরমান ভাবছে কীভাবে বাবা মাকে আবার চলে যাওয়ার কথা জানাবে। আরিশা তো নিশ্চিন্তে আরমানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। আরমান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েটা তার অন্ধকার জীবনে আলোর ছোঁয়া নিয়ে এসেছে। তাই অবহেলা না করে দু-হাতে আগলে নিয়েছে আরমান। বুকের কষ্টগুলো ভুলার একমাত্র মেডিসিন এই আরিশা। আরমান কথাগুলো ভেবে আরিশার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকালো। কপালে আলতো করে চুমু একে দিলো।

তুমি সবসময় এমন লুকিয়ে আদর করো কেনো আমাকে ?

আরিশার কথা শুনে আরমান থতমত খেয়ে গেলো। আরমান ভেবেছিলো আরিশা ঘুমিয়ে পড়েছে।

আরিশা মাথা তুলে আরমানের দিকে তাকিয়ে বললো, কী হলো কথা বলছো না কেনো ?

আরমান মুচকি হেঁসে বললো, কারণ ঘুমালে তোমাকে কিউট লাগে তাই।

আর জেগে থাকলে ?

আরমান দুষ্টুমি করে বললো, পেত্নীর মতো লাগে।

আরিশা ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বললো, পেত্নী লাগুক আর যাই লাগুক আমার সাথেই থাকতে হবে সারাজীবন।

আরমান মুচকি হাঁসলো শুধু কিছু বললো না।আরিশা একটু নড়েচড়ে উঠে বললো, আচ্ছা আমরা একেবারে চলে আসতে পারি না এখানে ?

আরমান একটু চিন্তা করে বললো, তুমি এখানে থাকতে চাও।

আরিশা খুশি হয়ে বললো, হুম।

আরমান মুচকি হেঁসে বললো, যথা আজ্ঞা মহারানী এবার গিয়ে এখানকার অফিসে আসার চেষ্টা করবো।

আরিশা খুশি হয়ে আরমানের ঠোঁটে টুপ করে কিস করে আবার শুয়ে পড়লো। আরিশার এমন আচরণের সাথে আরমান পরিচিত তাই অবাক হলো না।

৬৬.
ইমা নিজে ফ্রেশ হয়ে ইমাদকে ফ্রেশ করিয়ে এনে ঘুম পাড়াচ্ছে আবার। ইয়াদ রুমে ঢুকলে ইমা সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো। ইয়াদ সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে এলো।

চুল মুছতে মুছতে বললো, ইমাদ ঘুমিয়েছে ?

হুম, এই ছেলেকে ঘুম পাড়ানো ছোট খাটো একটা যুদ্ধ।

ইয়াদ হুট করে ইমাকে কোলে তুলে মিনি ছাঁদের দিকে রওনা হলো। ইমা চমকে উঠে ইয়াদের গলা জড়িয়ে ধরলো।

কী ব্যাপার আজ এতো রোমান্টিক মুড ?

ইমার কথা শুনে ইয়াদ মুচকি হেঁসে বললো, আজ পূর্নিমা তাই দুজনে চাঁদ দেখবো।

ইমা ইয়াদের প্রকৃতি প্রেম দেখে মাঝে মাঝে অবাক হয়। প্রথম দিকের ইয়াদকে মনে করলে এই ইয়াদের সাথে মেলাতে পারে না ইমা। ইয়াদ ইমাকে দোলনায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসলো। ইমার জন্যই এখানে দোলনার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো ইমার প্রেগনেন্সি কালীন সময়ে।

ইমা ইয়াদের কাঁধে মাথা রেখে বললো, আজ আমাদের কারো জীবনে আর কোনো #তিক্ততার_সম্পর্ক নেই তাই না ?

ইয়াদ মনে মনে বললো, জীবনে কিছু তিক্ততা থেকেই যায় ইমা। মিসেস রুবিনা কবিরকে দেখলে আজও আমার সেই বিষাক্ত অতীতের কথা মনে পড়ে যায়। মানসিক ভারসাম্যহীনতার জন্য আজও তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। এই একজনই হয়তো যথেষ্ট #তিক্ততার_সম্পর্কের স্বাদ দিতে।

ইমা ইয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো, কী ভাবছেন ?

কিছু না, ভাবছি আবার হানিমুনে যাবো। আগের হানিমুনের স্মৃতি অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।

ইমা ভ্রু কুঁচকে বললো, ছেলেকে সাথে নিয়ে হানিমুনে ?

তো কী হয়েছে ? ছেলেরও জানা উচিত তার বাবা তার মাকে কতটা ভালোবাসে। ইশান আর কথা হানিমুনে চলে যাওয়ার পর আমরাও যাবো।

ইমা আর কিছু বললো না। ইয়াদের বুকে মাথা রেখে চাঁদ দেখতে লাগলো। এখন একটাই ইচ্ছে ইমার, এই বুকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা।

ইয়াদ ইমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইলো। ইমা তার বুকে থাকলে পৃথিবীর সব সুখ যেনো তার পায়ের কাছে থাকে। ইমা মেয়েটাকে ছাড়া তার নিশ্বাস নেওয়াও অসম্ভব।

ভালো থাকুন নিঃস্বার্থ ভালোবাসাগুলো। একে অপরের সাথে পাড়ি দিক জীবনের বাকিটা পথ।

——————————সমাপ্তি—————————–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here