তুই হৃদহরণী পর্ব ১৫

#তুই_হৃদহরণী
#সাদিয়া
পর্ব : ১৫

“পাগলি মানুষ কি নিজের হৃদয় কে একা রাখে? শ্বাসই নিতে পারবে না তবে। আর তুমি তো আমার হৃদহরণী”
আহরার কাজে মন দিল।

ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে মোনতাহ্ দেখতে পেল বিপদ অতি নিকটে। মানে ফিরাত দাঁড়িয়ে আছে মাঠে, গাড়িতে হেলান দিয়ে। রোদ ঝিলিক দিচ্ছে তার দেহে। অদ্ভুত সুদর্শন পুরুষ। মোনতাহ্ সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝেড়ে ফেলে। তাকে দেখে ফিরাত চশমা খুলে বুকে ঝুলায়। এগিয়ে গেল মোনতাহ্ র দিকে। মোনতাহ্ পথ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলেও পারল না।
“আরে ম্যাম কথা না শুনেই চলে যাচ্ছেন যে।”

“….
মোনতাহ্ চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার হাটা শুরু করল। ফিরাত লম্বা দুই পা পিছিয়ে তার সামনে গেল। টেডি একটা স্মাইল দিয়ে বলল
“কথা না বলেই চলে যাবেন চাঁদ।”

“….

“কিছু বলবে না?”

সে রেগে গিয়ে বলল,
“কি চাই কি আপনায় বলুন তো।”

“তোমাকে।”

মোনতাহ্ কিছু বলল না। তবে ভেতরে নিশ্চয় অজানা এক ভালো লাগার শিহরন আবেশ দিচ্ছে। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ মুখ শক্ত করে চলে যেতে নিলে ফিরাত হাত ধরে।
“হচ্ছে কি? ছাড়ুন।”

“কখনই না।”

“এসব কিন্তু আমার একদম ভালো লাগে না।”

“চাঁদ কে যে আমার বেশ ভালো লাগে।”

“তো চাঁদ কে গিয়ে বলুন না। আমাকে কেন বলছেন? ছাড়ুন হাত টা। দেখবে অনেকে।”

“আমার চাঁদ যে আপনি।”

“…..

“কিছু বললে না যে মুন।”

“আমার ছাড়ুন হাত টা।”

“আর কত ছাড়াবে বলো? কয় টা মাস ধরে তোমার পিছু ঘুরছি আমি? চিন্তা করে দেখো। বেশি করলে না উঠিয়ে নিয়ে যাবো। মনে রেখো চাঁদ।”
কথা বলা শেষে ফিরাত হাত ছাড়ল মোনতাহ্ র। তারপর আবার চশমা টা লাগিয়ে গাড়ি নিয়ে মাঠ পেরিয়ে উঠল রাস্তায়। মোন তখনো হা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে একটু আগের কথা টা।
“কি গুণ্ডা লোক রে বাব্বাহ্।”

দুপুরের টিফিন টাইম চলে সবাই ক্যান্টিনে গেলেও তুরফা যায় না। আজ আহরারও রেস্টুরেন্ট খেতে যায় নি। দুপুর ২.২৮ মিনিট বাজে। আহরার অপেক্ষা করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তুরফা কে। হিজাব পরে কি সুন্দর কাজে মনোযোগ দিয়েছে। দিক বেদিক ভুলে। সাদা বর্ণের মুখ টা লাল দেখাচ্ছে। চিকন ঠোঁট গুলি দিয়ে বিড়বিড় করছে। পর্দার ওপারে এই দৃশ্য মারাত্মক মুগ্ধকর লাগছে। মোহমতীর এমন রূপের ঝটায় পুলকিত হচ্ছে আহরার। ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে সে ঠোঁট চেঁপে খানিক হাসল। আবার তাকাল তুরফার দিকে। কাজ নিয়ে থতবত করছে সে। দেখে বুঝাই যাচ্ছে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ফাইল গুলি শেষ করার জন্যে। যাতে রাতে অফিস থাকতে না হয়। আহরার মনে মনে বলল, “তাতে কি হৃদহরণী এগুলি শেষ করলে না হয় আবার ভরবে তোমার টেবিল।” আবারো মুচকি হাসল কিছু। চোখ কেবিনের বাহিরে গেলে কাঁচের মধ্যে লোক টাকে দেখে আহরার উঠে গেল।

তুরফার কল বাজচ্ছে সেই কখন থেকে। কিন্তু ধরতে পারছে না বা ধরার সুযোগ হচ্ছে না। ফাইলের দিকে তাকিয়ে থেকেই কোনো রকম কল টা রিসিভ করল।

“হ্যালো তুরি।”

“….

“হ্যালো।”

“হ্যাঁ”

“কয়টা কল দিয়েছি বলতো তোকে।”

“হুম।”

“আরে আমি কি বলছি শুনছিস না?”

“না। আজ আমার কান বন্ধ।”

“বন্ধ মানে?”

“বন্ধ মানে বন্ধ। বজ্জাৎ রাগি অসভ্য ইতর লোক টা আমায় এত কাজ দিয়েছে কান কেন? কখন না আমিই বন্ধ হয়ে যাই। আমার কি ইচ্ছে হচ্ছে জানিস? গরম গরম তেলের মাঝে পাপরের মতো উনাকে ছেড়ে দিয়ে ভেজে ফেলি। তারপর মড়মড় করে কামড়ে খাই।”

“কি যা তা বলছিস রে তুই?”

তুরফা এবার ফাইলের উপর থেকে চোখ তুলল। চোখ গুলি ব্যথায় টনটন করছে। চোখ বন্ধ করে নিল। মোন কে বলল,
“কখন যে আমি পাগল সরি পাগলি হয়ে যাই বুঝা মুশকিল। দেখেছিস তুই আমার এত কাছের মানুষ হয়েও আমায় চিনতে পারছিস না আর বাকি রা তবে আমায় কি বলবে? আমায় দেখে এরপর হাসাহাসি করবে। এই লোক আমাকে পাগলি বানিয়ে ছাড়ল রে। ইচ্ছে করছে চাকরি ওর মুখে মারি কলার খোসার মতো। বিরক্তকর।”

“কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। কি বলছিস তুই?”

“আজ বোধহয় আমার বাসায় যাওয়া হবে না রে।”

“বাসায় আসবি না মানে? দেখ তুরি কি হয়েছে জানি না রাতে কিন্তু বাসার বাহিরে থাকা যাবে না। ৮ টার মাঝে যে করেই হোক বাসায় চলো আসবি। আর বাসায় না এসে যাবি কোথায়? আমি কিছু জানি না তুই রাতে বাসায় আসবি। আমি একা থাকতে পারব না।”

“আমার মনে হচ্ছে কাজ করছি আমি আর পাগল হয়েছিস তুই। ছাগলের মতো মে মে করোই যাচ্ছিস আমায় কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে। আমি কি একা থাকতে পারি? অফিসে আমায় আজ একা থাকতে হবে। বজ্জাৎ বস লোক টা আমায় এত এত ফাইল দিয়েছে আর বলেছে কাজ শেষ না করে আমি অফিসের বাহিরে যেত পারব না। মনে হচ্ছে আজ কেন? কাল রাতের আগেও আমি বাসায় যেতে পারব না। একা থাকতে হবে আমার।”

“কি বলছিস এই সব? কেমন বস উনি?”

“ডেভিল মার্কা। আমি প্রায় শেষ। আজ আমি বাসায় যেত পারব না। অফিসে একা পেয়ে ভূত না আমায় খাবলে ধরে। ঘাড় না মটকে দেয় আমার। এ্যা..”

“আরে আরে কাঁদছিস কেন? চুপ কর তুরি।”

“এখন আমার কি অবস্থা জানিস?”

“কি?”

“আমি জ্ঞান হারাব, মরেই যাবো, বাঁচাতে পারবি না কো। ও আমি জ্ঞান হারাব মরেই যাবো। সত্যি মরে যাবো আমি।”

“এত চিন্তা করিস না। তাড়াতাড়ি করে ফেলার চেষ্টা কর। যার জন্যে ফোন দিয়েছি, খেয়েছিস?”

“আর খাওয়া? কাজ করেই জীবন শেষ।”

“কি বলছিস খাস নি? তাড়াতাড়ি করে গিয়ে খেয়ে নে।”

“পরে খাব….

সামনে তাকিয়ে আহরার কে দেখল।

“আমি তোকে পরে কল করছি।”
বলেই কেটে দিল। উঠে দাঁড়াল না। ভ্রু কুঁচকে একবার দেখে আবার ফাইলে মনোযোগ দিল তুরফা। মনে মনে বলল, “লে জ্ঞান আর হুকুম দেওয়ার ভান্ডার চলে আসছে। এখন হয়তো বলবে কথা বলছিলে কেন? জানো না অফিসে কাজের সময় ফোনে কথা বলা নিষেধ, হ্যানত্যান ব্লা ব্লা। আপদের এখান থেকে তুলেও নেয় না।”
আহরার চুপচাপ তুরফার দিকে তাকিয়ে খাবার গুলি টেবিলে রাখল। তুরফা আগে খেয়াল না করলেও এখন করেছে। আড়চোখে একবার দেখে ফাইলে কাজ করার অভিনয় করতে লাগল।

“ভয় পাচ্ছো আমায়?”

“আপনি বাঘ না ভাল্লুক? নাকি এনাকন্ডা যে গোগ্রাসে খিলে ফেলবেন আপনাকে ভয় পেতে হবে।”
মনে প্রশ্ন টা আওড়াল।

“কি হলো চুপ কেন?”

“….

“ফাইল রাখো আগে খেয়ে নাও।”

“আমার খিদে নেই। আর হলে আমি ক্যান্টিন থেকে খেয়ে নিব। আপনার আনা খাবার খেতে হবে না আমার।”

“তুমি জানো এখানে কত টাকার খাবার আছে? তবুও ক্য..”

“আপনার মতো এত বড়লোক নই আমি। তাই জানারও দরকার নেই। আমি এসব খাবো না নিয়ে যান।”

“চুপ করে বসে পরো এক সাথে লাঞ্চ করব।”

“কখনোই না।”

“তার মানে তুমি আমার সহজ কথা শুনবে না?”

“….

“তাই তো?”

তুরফা খানিক বিব্রত হয়। ভাবে এখন কি করে বসে। আহরার বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চোখ শক্ত করে পা বাড়াল তার দিকে। তুরফা ভয় পেল। কিছু না বলে আহরারের হাতের ফাঁক দিয়ে এক দৌড় দিল। কিন্তু উপকৃত হলো না। কথায় আছে ‘মৌল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।’ তুরফারও হলো সেই দশা। দরজার সামনে গিয়ে সে আটকাল। দরজা তো লক করা। এবার আরো ভয় হলো। রাগি লোক টা না জানি এখন কি করে। আহরারের কথার অবাধ্য হলে কেউ তার ভীষণ রাগ হয়। কিন্তু এখন হলো না। হাসি পেল খুব। তবুও শক্ত করে নিল। তুরফার সামনে রাগি ভাবে থাকতে হবে তাকে। খুব রেগে গেছে এমন একটা ভাব করে নিল। তারপর শান্ত পায়ে এগুতে শুরু করল। ওদিকে তুরফার হাল বেহাল। করুণ অবস্থা তার। দুই ভ্রু এক হয়ে আছে, কাঁপা ঠোঁট যেন বিড়বিড় করছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বের হওয়ার কোনো বিকল্প রাস্তা নেই। আহরার এগিয়ে আসছে যত যেন ভয় টাও তাকে জড়িয়ে নিচ্ছে তত। কাঠগলা হয়ে গিয়েছে তার। জিহ্ব পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়েছে।

“আ আমি আসলে….”

“….

“সরি, প্লিজ সরি। প্লিজ।”

তুরফার মাথার পেছনে ধরে আহরার এগিয়ে নিয়ে আসল তাকে। তুরফা ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। আহরার ধ্যান ধরা নজর দিয়েছে তুরফার চোখ মুখে। নূরের মতো মুখ টা হয়তো এই প্রথম এত কাছ থেকে দেখা হচ্ছে তার। আহরার চুপ করে সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগল। মুখে কথা নেই। চিকন লাল কাঁপা ঠোঁট গুলির মাঝে ভয়ংকর সৌন্দর্য অবস্থান করছে। আহরার মুখ টা আরো একটু এগিয়ে নিয়ে গেল। গরম নিশ্বাস পরছে মুখে। আহরার বুঝতে পারছে তুরফার শরীর অনবরত কাঁপছে। সে মুচকি হাসল। ফিসফিসানি কন্ঠে বলল
“পালাবার পথ নেই প্রিয়,
তুমি বদ্ধ মন মণিকোঠরে।”
এটা বলে আহরার তুরফার মুখে ফু দিয়ে ছেড়ে দিল। তুরফার সারা শরীর কেঁপে উঠল। লোমকূপ দাঁড়িয়ে পরল। ধাক্কা খেলো দরজার সাথে। মাথা টা ঝিমঝিম লাগছে। চোখের পাতাও ঘন ঘন পরছে। আহরার ভেতরে ভেতরে হাসল। তুরফার হাত ধরে নিয়ে গেল টেবিলে। নিজে বসে খাবার সার্ফ করে দিল তার সামনে।

“একটা কথাও যেন না হয়। খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি করে। ফাইল শেষ করতে হবে।”

শেষের কথাটা শুনেই তুরফার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আহরারের দিকে রাগি চোখ নিয়ে তাকাল।

“কি? এমন করে কি দেখছ? চোখ দিয়েই সুদর্শন মানুষ কে খাবার বদলে গিলে ফেলবে নাকি?”

আহরারের ঠেশ দেওয়া কথায় তুরফা আরো রাগল। মনে মনে বলল “যদি পারতাম আপনায় খেয়ে ফেলতে কত যে খুশি হতাম। তবুও হয়তো আমার পেটে গিয়েও শান্তি দিতেন না। আপনার হাঁড় হাড্ডি সারাক্ষণ হয়তো আমায় গুতাত।”

দুজনেই খেয়ে নিল। একজন এসে সব টা পরিষ্কার করে দিল। আহরার যাওয়ার আগে বলল,
“এখন শান্ত হয়ে কাজ করেন আমার হৃদহরণী।”
মুচকি হাসতে হাসতে চলল আহরার। তুরফা বিড়বিড় করে বলল,
“বজ্জাৎ ইতর প্রাণী লোক।”

ঘড়ির কাটা যখন ৪ টা বেজে ৫০ মিনিট তখন ফিরাত আসে হাতে তিন টা ফাইল।
“ভাই আহরার এ গুলি সাইন করে দে।”

“রাখ ওখানে।”

“রাখলে হবে না। এখনি সাইন কর আমি মিহির কে দিয়ে ব্যাংকে পাঠিয়ে দিব।”

আহরার ফাইল গুলি দেখে সাইন করে দিল। ফিরাত চলে যাওয়ার সময় আহরার ডাক দেয় পিছন থেকে। ঘড়িতে সময় দেখে বলে,
“আজ ছুটি দিয়ে দে সবাই কে।”

“তাড়াতাড়ি যে?”

“এমনি।”

“ওকে বলে দিচ্ছি। তাহলে আমি তুরফার সাথে যাবো। একটু কাজও আছে।”

“ও কোথাও যাচ্ছে না।”

“মানে?”

“আজ সারারাত ও অফিসে বসে ফাইল দেখবে।”

“কি বলছিস কি ইয়ার?”

“ঠিক তাই।”

“ভাই আহরার ও একা একটা মেয়ে থাকবে কি করে? বিপদ আপদ..”

“তোকে যেটা বললাম সেটা কর গিয়ে।”

“কিন্তু..”

“যা।”

আহরারের ধমকে আর কিছু বলল না ফিরাত। তুরফার দিকে মায়াভরা চোখ নিয়ে তাকাল। তারপর চলে গেল। অফিসের সবাই একে একে চলে যাচ্ছে। ফিরাত গাড়ি নিয়ে যেতে যেতে আকাশের দিকে নজর দিল। অবস্থা ভালো নেই। রাতে হয়তো বৃষ্টি আসতে পারে। তুরফা একা অফিসে থাকবে ভেবে তার খারাপ লাগছে। ওদিকে মোনতাহ্ ও তো একা থাকবে। হঠাৎই এ কথা মনে হলো তার। মাথা উল্টে গেল। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। বাসায় গিয়ে আহরার কে বুঝাতে হবে। যে রাগি মানবে তো?

“মিস তুরফা।”

চোখ তুলে তাকাল সে। আশেপাশে কেউ নেই অফিস একা। বুকটা হু হু করে উঠল তার।

“মন দিয়ে কাজ করুন। আর হ্যাঁ কাজ শেষ না করা অবধি এখান থেকে বের হবেন না। মনে থাকে যেন।”
আহরার হনহন করে বের হয়ে গেল। তুরফা দাঁড়িয়ে শুধু দেখল। ভেতরে শুধু ভয় আর ভয় হচ্ছে। কলিজা যেন চিঁপা দিয়ে উঠল। চোখ টলমল করছে। হার্টবিট বাড়ছে শুধু। কখন না সেন্সলেস হয়ে যায়। হাটু কাঁপছে দাঁড়াতে পারছে না। ধপ করে বসে পরল। ভেতরে অজানা যত ভয় আছে সব ঘিরে নিয়েছে তাকে।
কাঁপা কাঁপা গলার কন্ঠ দিয়ে বের হয়ে এলো “তবে সত্যিই আজ আমার একা অফিসে থাকতে হবে? বড্ড বিপদ আশংকা করছি।”

চলবে….

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here