তুমি আমার প্রেমবতী পর্ব -০২

#তুমি_আমার_প্রেমবতী
#পর্বঃ২
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

৩.
চৈত্র মাসের রৌদ্র তাপ জনজীবন বিপণ্ণ করে তুলেছে।ব্যাস্ত শহরের সবাই কোনো না কোনো ভাবে নিজেকে শীতল করার চেষ্টায় নিমগ্ন।এরই মাঝে কোনো কোনো স্বার্থপর মানুষ সেই চেষ্টা না করে তাদের নিত্যকার কাজকর্ম করতে বেশি ব্যাস্ত। রিকশা চালক বা রাস্তার ধারের ফুটপাতে তাকালে বাস্তবতার চিত্রটা বেশ ভালো করেই বোঝা যায়।
এই ভর দুপুরে গরমে গাড়িতে বসে বার বার বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে উঠছে অভির।এসির হাওয়াটা বেশ গরম বেরুচ্ছে।ঘন্টা খানেক ধরে জ্যামে বসে আছে সে।গলাটাও বেশ শুকিয়ে গেছে।পানির বোতলের দিকে তাকিয়ে নিজের ওপর বেশ রাগ হলো।গাড়িতে একটু পানিও নেই।স্নিগ্ধার বাড়ি থেকে রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে এসে পরলো এই জ্যামে।শহরের জ্যামে একবার পরলে কতক্ষন বসে থাকতে হবে তার ঠিক নেই।কিন্তু অভির গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে উঠেছে।ভাগ্যিস তার গাড়িটা রাস্তার এক সাইডে ছিল।দ্রুত নেমে পরলো গাড়ি থেকে।নামার সাথে সাথে এক বছর দশেকের ছেলে এসে দাঁড়ালো অভির সামনে।দু’ হাতে চারটি পানির বোতল।শুকনো জীর্ণশীর্ণ চেহেরাটা।হয়তো বহুকাল পেট ভরে খেতে পায় নি।শুকনো মুখমন্ডলের মাঝে সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট দুটি বড় বড় আঁখি ।গায়ে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি।কয়েকাংশ কেউ একজন পরম যত্নে সেলাই করে দিয়েছে।তাও ছোট খাটো বেশ কয়েকটা ছিদ্র দেখা যাচ্ছে।অভির কাছে বেশ মায়াবী লাগলো ছেলেটার চেহেরা।অভি কিছু বলার আগেই ছেলেটা রুক্ষগলায় শোধালো,

‘স্যার, পানি লাগবে?একদম ফ্রেশ পানি।গরমের দিনে এমন ঠান্ডা পানি আপনি অন্য কোথাও পাবেন না।’

অভি জানে সে চাইলে এখন রেস্টুরেন্টে গিয়ে দামি মিনারেল ওয়াটার কিনে খেতে পারে।কিন্তু তাতে এই ছেলেটা যেই সামান্য টাকা পানি বিক্রি করে পেত সেটা পাবে না।অভির ভাবনার মাঝেই আবার ছেলেটা বলল,’স্যার, নিন না স্যার! একটা পানির বোতল নিন না!’

ছেলেটার কন্ঠের আকুতি অভির মন ছুঁয়ে বিবেকে আঘাত করলো। একটা মাত্র পানির বোতল বিক্রি করার সে কী আকুলতা ছেলেটির কন্ঠে।অভি ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,’আমাকে এই সবগুলো পানির বোতল দাও।আর একদিনে কতগুলো পানির বোতল বিক্রি করো তুমি?মানে কত টাকার বিক্রি হয়?’

ছেলেটা অভির মুখের দিকে চোখ বড় করে তাকালো।অভির মুখের কোনো পরিবর্তন নেই।একদৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষা করছে সে।ছেলেটা বলল,’এই তো দুইশো’ থেকে তিনশো’ টাকার। মাঝে মাঝে আমি আর আপু মিলে পাঁচশো’ টাকারও বিক্রি করতে পারি।’

অভি পকেট থেকে একটা হাজার টাকার নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিয়ে বলল,’কিছু কিনে খেয়ে নিও।আর এই রোদের মাঝে এই সব করছো যদি অসুস্থ হয়ে যাও।’বলতে বলতেই অভি এক বোতল পানির সবটুকু খেয়ে নিল।
ছেলেটা হাসলো।প্রাণ খোলা হাসি!অভি মুগ্ধের মতো দেখলো ছেলেটার হাসি।

‘কি যে বলেন স্যার!আমরা এই সব রোজ করি। আমাদের মতো গরিবদের এই রোদে কিছু হয় না।আপনারা বড় মানুষ। বড় বড় বাড়িতে থাকেন।আপনারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। আমরা নই। শুনেছি আপনাদের মতো বড়লোকদের বাড়িতে নাকি ঘর ঠান্ডা করার মেশিন ও থাকে।কি যেন বলে…’
কিছু একটা মনে পরার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,’ওসি!!! ওসি!!! ‘

এইবার অভি হেসে ওঠলো বলল,’ওটা এসি।বুঝছো?তা পানি বিক্রেতা মশাই তোমার নাম কি? ‘
ছেলেটার দ্রুত জবাব,’আদিল।ভালোবেসে আমাকে সবাই আদু বলে ডাকে।অনেকে অবশ্য ঠাট্টা করে আদু ভাই বলে।’

‘কেন?আদুভাই কেন?’

এর মাঝেই জ্যাম অনেকটা কমে গেছে।দ্রুত এখন না গেলে আবার জ্যামে পরলে সমস্যা।অভি আদিলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার আদুভাই হবার গল্পটা আরেকদিন শুনব।আজকে তাহলে যাই।’

আদিল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।কেন জানিনা তার এই মানুষটাকে খুব পছন্দ হয়েছে।হাতের টাকার দিকে তাকিয়ে একটা প্রশান্তির হাসি দিলো।

৪.

ভার্সিটির অডিটোরিয়ামে দাঁড়িয়ে কারো অপেক্ষা করছে সাক্ষর। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।গায়ে একটা মেরুন রঙের একটা শার্ট।গায়ের রঙ ফর্সা।হাতে একটা মোটা বই।যার ওপর মোটা অক্ষরে লেখা,❝Relation among Legislature Executive and Judiciary.❞
অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র সে।পড়াশোনার সুবাদে চট্টগ্রামে আছে সে।আইন নিয়ে পড়াশোনা করছে।ছোট বেলা থেকেই আইনের প্রতি তার অন্য রকম একটা আগ্রহ ছিল।শান্ত ছেলেটি তেমন প্রয়োজন না হলে কারো সাথে খুব একটা কথা বলে না।গরমে যখন ভার্সিটির প্রায় সবাই তটস্থ তখন সে শান্ত ভঙ্গিতে কারো অপেক্ষারত।কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা খুবই শান্ত আর শৃঙ্খলাপূর্ণ হয় তাদের একজন সাক্ষর।হঠাৎ করেই কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে স্বাভাবিকভাবে পেছনে ফিরে তাকায় সে।দাঁড়ানো তাওহিদ কে দেখে মুচকি হাসে সাক্ষর।তাওহিদ একটু রসিকতা করে বলে,

‘সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছিস?এখনো আসেনি।তবুও বিরক্তির কোনো ছাপ নেই চোখে মুখে।তা আর কতক্ষণ পড়শীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবি? চল, হোস্টেলে চল।’

সাক্ষরের সোজা–সাপটা জবাব,’না, তুই চলে যা, আমি পড়শীকে বইটা দিয়েই চলে আসবো।’

এর মাঝেই ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছূটে আসে পড়শী।সাক্ষরের সাথেই অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে সে।গরমে সে খুবই বাজে ভাবে জব্দ।এমনিতেই এই ন্যাকাবোকা মেয়ের সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি।দ্রুত ছুটে আসায় সামনের কাটা চুল গুলো কপালে আঁছড়ে পরেছে।নিজের আনমনেই সাক্ষর ‘ফু’ দিয়ে চুলগুলো সরানোর চেষ্টা করছে।অশান্ত পড়শী মুহুর্তে শান্ত বালিকার ন্যায় সাক্ষরের চোখে চোখ রেখেছে।সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে।গরমের সমাপ্তি টানতে হুট করেই জোরে বাতাস বইতে শুরু করলো।আবহাওয়া যেন তাদের বিপক্ষে। চুল গুলো ঠিক হবার বদলে আরও এলোমেলো ভাবে বাতাসে উড়তে লাগলো।কিন্ত একে অপরকে চোখের মায়াডোরে আবদ্ধ করেছে।কারো চোখে পলক পরছে না।যেন চোখের পলক ফেললেই হারিয়ে যাবে দুজন দুজনার থেকে।

‘কিরে ভাই?এখানে দাঁড়িয়ে প্রেম করবি নাকি?বইটা দিয়ে হোস্টেলে ফিরবি।চোখের আলিঙ্গন রেখে এইবার চলুন প্রেমিক পুরুষ,হোস্টেলে ফিরে চলুন।’

তাওহিদের খোলামেলা কথায় দুজনেই বিষণ রকম লজ্জা পেলো।যদিও এখনো মনের ভাবটুকু দুজন দুজনার কাছে প্রকাশ করে উঠতে পারেনি।তবুও দুজনেই জানে তারা একে অপরের অসম্ভব রকমের ভালোলাগা।সেই ভালো লাগা কখন যে লোকানো ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে সে সম্পর্কে এখনো আন্দাজ করতে পারেনি দুজনের কেউ।দুজনের মনেই দুজনের জন্য একরত্তি ভালোবাসার জন্ম হয়েছে।পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দৃষ্টি এদিক ওদিক করতে লাগলো সাক্ষর।পড়শীর লজ্জারাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে তাওহিদ ঠাট্টা করে বলে,’ও মা গো!পড়শী তুই লজ্জা পাচ্ছিস কেন?লজ্জা পাবার দিন তোর আসেনি।এতো লজ্জা পেয়ে লাভ নাই।সারাক্ষন বাঁদরামি করে বেড়িয়ে এখন লজ্জার অভিনয়!ডং দেখলে বাঁচি না।’
সাক্ষর, পড়শী,আর তাওহিদ তিনজন খুব ভালো বন্ধু।তাওহিদের এই কথায় পড়শী মুহুর্তেই ফুঁসে ওঠে। সারাক্ষন কিছু না কিছু নিয়ে তাওহিদ তার পেছনে লেগেই থাকে।ব্যাপারটা একদম সহ্য হয় না তার।এদের সম্পর্ক অনেকটা সাপ–নেউলের মতো।আবার একে অপরের জন্য প্রান দিতেও প্রস্তুত।

‘কি?তোর মনে হচ্ছে আমি ডং করি?আমার সাথে পায়ে পা’ দিয়ে ঝগড়া না করলে তোর পেটের ভাত হজম হয় না, তাই না?’

‘আমার তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই!তোর মতো কারোর সাথে ঝগড়া করতে যাবো।কোথাকার কোন শ্রেয়া ঘোষাল এলো রে!নিজেকে কি তুই ঐশ্বরিয়া রায় মনে করিস নাকি?

পড়শী রেগে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় সাক্ষরের ঠান্ডা ধমকে থেমে যায় সে।

‘আহ!থামবি তোরা?কি শুরু করলি বলতো?’

পড়শী আস্তে আস্তে বিরবির করে বলে,’আমার কি দোষ তাওহিদ নিজেই শুরু করছে।’

‘কে শুরু করছে কে করে নি,সেটা কি তোর থেকে আবার জানতে চাইছি আমি? তুই বাড়িতে ফিরে যা।আর তাওহিদ চল,হোস্টেলে চল।’

চলবে, ইনশাআল্লাহ ✨

(আসসালামু আলাইকুম। বিদ্রঃ– গল্পটা সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক।ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্য আশা করি।হ্যাপি রিডিং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here