তুমি আমার প্রেয়সী ২ পর্ব -১১

#তুমি_আমার_প্রেয়সী
#সিজন ২
#তাসনিম_জাহান_রিয়া
#পর্ব_১১

এক ঘন্টার মতো ডান্স শিখিয়ে কণা বাসায় আসে। কলিংবেল বাজাতেই তিশান আহম্মেদ এসে দরজা খুলে দেন। কণা ড্রয়িংরুমে যেতেই অবাক হয়ে যায়। সোফায় বসে থাকা লোকটাকে দেখে সে চমকে ওঠে। এখন সে কী করবে? কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। সে কী করে তার ভাইয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে।

পারবে না সে তার ভাইয়ের সাথে মিস বিহেভ করতে। কিন্তু সাফাতকে অপমান না করলে যে ঐ লোকটা সাফাতকে মেরে ফেলবে। কণা কিছু না বলে হনহনিয়ে রুমে চলে যায়। এতে সাফাতের কিঞ্চিত খারাপ লাগে। কিন্তু সাফাত নিজের খারাপ লাগাকে পাত্তা দেয় না। সে ভাবে কণা হয়তো তার ওপর এখনো অভিমান করে আছে। সাফাত সোফা থেকে ওঠে কণার পিছু পিছু যায়। কিন্তু কণা সাফাতের মুখের ওপর ঠাসস করে দরজা বন্ধ করে দেয়।

এতে সাফাত হো হো করে এসে দেয়। তার বোনটা একটুও পাল্টায়নি ঠিক আগের মতোই আছে। কণা ছোটবেলা থেকে সাফাতের ওপর রেগে গেলে সাফাতের সাথে কথা বলে না। রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। সাফাত দুই তিন বার দরজায় করাঘাত করে। কিন্তু কণা দরজা খুলে না। সাফাত চেঁচিয়ে বলে,

কণা দরজা খুল। খুলবি না দরজা? যা খুলতে হবে না দরজা। আমিও দেখি তুই কতক্ষণ আমার ওপর রেগে থাকতে পারিস। আজকে থেকে তো আমি এখানেই থাকবো। আমি তোর অভিমান ভাঙিয়েই ছাড়বো।

সাফাত এখানে থাকবে শুনেই কণার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। যার কাছ থেকে দূরে থাকতে চায় সেই কাছে চলে আসে। সাফাত এখানে থাকলে তাকে প্রতিমুহূর্তে সাফাতের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে হবে।

২৪

আভিয়ান আজকে প্রায় এক মাস পরে নিজের বাসায় যাচ্ছে। আভিয়ান হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। কলিংবেল বাজাতেই পঞ্চাশ উর্ধ বয়সী এক মহিলা এসে দরজা খুলে দেয়। মহিলাটির পড়নে কালো রঙের একটা সুতি শাড়ি। চোখে হাই পাওয়ারী চশমা। মাথার বেশ কিছু চুলে পাক ধরে গেছে। আভিয়ান মহিলাটিকে দেখেই ঝাপটে জড়িয়ে ধরে।

কেমন আছো মাম্মি?

আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস বাবা?

আলহামদুলিল্লাহ ভালো। মাম্মি পাপা আর অহি কোথায়?

তোর পাপা অফিসে গেছে আর অহি রুমে।

আমি আসছি শুনতে পায় নাই। ঐ শাকচুন্নি কই তুই? নতুন বউয়ের মতো ঘরের ভিতর লুকিয়ে আছিস কেনো?

অহি নিজের রুম থেকে বের হয় চোখ গরম করে আভিয়ানের দিকে তাকায়। আভিয়ানের চুলে ধরে টেনে বলে,

চলে আসছে বিদেশি বান্দর। আমি শাকচুন্নি না তোর বউ শাকচুন্নি।

আভিয়ান অহির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

আমার বউ কিন্তু তোর বান্ধবীই হবে। তার মানে তোর বান্ধবী শাকচুন্নি। আর শাকচুন্নির সাথে কোনো মানুষের ফ্রেন্ডশিপ হতে পারে না। তাই তুইও শাকচুন্নি।

মহুয়া জাহান আভিয়ানকে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়ার কথা বলে দ্রুত পা চালিয়ে কিচেনে চলে যান। তিনি জানেন আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে নিজেই লজ্জায় পড়ে যাবেন। এখনি তার ছেলে মেয়েরা লাগামহীন কথা বার্তা বলা শুরু করবে। তারা বেমালুম ভুলে যাবে যে তাদের সাথে তাদের মাও আছে।

তোর মতো কাইল্লার লগে আমি আমার বান্ধবীর বিয়ে দিব না।

আমি কাইল্লা না তুই কাইল্লা। দেখ আমি তোর থেকে কতো বেশি ফর্সা।

ফর্সা হয়ে লাভ কী? কোনো মেয়ে তো পাত্তা দেয় না। আমার আলা ভুলা বান্ধবীটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের গফ বানিয়ে নিয়েছিস। আর এদিকে আমাকে দেখ দিনে ১০ টা প্রোপোজেল পাই।

এতো প্রোপোজেল পেয়ে লাভ কী? জীবনে তো একটা প্রেমও করতে পারলি না। চিরকালের সিঙ্গেল। তাই ভাব কমায়া ল। আমি ভুলি ভালিয়ে আর যেভাবেই হোক প্রেম তো করি তুই তো সেটাও পারিস না। প্রেম করতে হলেও একটা যোগ্যতা লাগে। যেটা তোর নাই।

দেখ………….

তোরা আবার শুরু করছিস। একসাথে হলেই দুইটা শুধু ঝগড়া করে। আর একটু দুরে গেলেই একজন আরেক জনকে ছাড়া বাঁচে না।

বাহ বাহ মটু জিয়ানের বউ দেখা যায় এখানে। কীরে ফক্কিনি আমাদের বাসায় কী করিস?

দেখো ভাইয়া একদম ফাইজলামি করবা না।

নওমির কথা শুনে আভিয়ান আর অহি দুই জনই চোখ বড় বড় করে নওমির দিকে তাকায়। দুজনের যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না নওমি আভিয়ানকে ভাইয়া ডাকছে। আভিয়ান পড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করতেই অহি ধরে ফেলে। অহি অবিশ্বাস্য সুরে বলে,

ভাই আমি কী স্বপ্ন দেখছি?

অহিরে আমারো মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। যে মেয়েকে আমি চড়ায়া থাপড়ায়া ভাই ডাকাতে পারতাম না। সেই মেয়ে আজকে নিজে থেকে আমাকে ভাইয়া ডাকছে। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। সবই মটু জিয়ানের কামাল। জয় বাবা মটু জিয়ানের জয়।

আভিয়ানের কথা বলার ধরন দেখে অহি ফিক করে হেসে দেয়। নওমি চোখ রাঙিয়ে আভিয়ানের দিকে তাকায়। আভিয়ান হো হো করে হেসে দেয়।

[ আপানারা অনেকে সম্পর্কগুলো নিয়ে কনফিউশনে আছেন। সম্পর্কগুলো আপনাদের ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। সাফাত আর কণা হচ্ছে আপন দুই ভাই বোন। সাফাতের গার্লফ্রেন্ড বন্যা। আভিয়ান আর অহি হচ্ছে আপন দুই ভাই বোন। আভিয়ান আর অহির মামাতো বোন নওমি। নওমির বয়ফ্রেন্ড জিয়ান। আভিয়ানের গার্লফ্রেন্ড ঐশি। ঐশি, কণা আর অহি হচ্ছে বেস্টফ্রেন্ড। ]

২৫

কণা পার্কে একটা লেকের সামনে বেঞ্চে বসে আছে। কণা চোখ দুটো লেকের টলমলে পানির দিকে স্থির। কণার মাথায় কিছু আসছে না। সে কী করবে? ভেবে পাচ্ছে না। সাফাত যতক্ষণ বাসায় ছিল ততক্ষণ কণা রুম থেকে বের হয়নি। সাফাত একটা জরুরী কাজে ভার্সিটি যেতেই কণা বাসা থেকে বের হয়ে আসে। কণা নিজের পাশে কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে পাশ ফিরে তাকায়। নিজের পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটাকে দেখে কণা চমকে ওঠে। তার পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটা যে বন্যা। কণা আরেক দিকে ফিরে স্কাফটা আরেকটু টেনে ভালো করে নিজের মুখটা ঢেকে নেয়।

কণা তুমি আমার কাছ থেকে কী লুকাতে চাইছো?

আমি আবার তোমার কাছ থেকে কী লুকাবো?

কেনো তুমি আমার সাথে লুকোচুরি খেলা খেলছো? তুমি কী ভাবছো আমি কিছু জানি না? আমি সব জানি। তোমার সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনাটা আমি জানি। তুমি কী ভেবেছিলে তোমাকে দেখলে আমি সবার মতো তোমাকে ঘৃণা করবো? আমি তেমন মেয়ে না। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও সেই সুখটা বেশি দিন টিকেনি। আমার যখন ৫ বছর বয়স তখন আমার বাবা মারা যায়। তারপর থেকেই কষ্ট করে বড় হয়েছি। বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই মা আমাকে নিয়ে নানা বাড়ি চলে যায়। নানা বাড়ি যাওয়ার মাসেক খানি পরেই মা আবার নতুন করে বিয়ের পিড়িতে বসে। লাল বেনারসি পড়ে বউ সাজে। তখন মা আমার কথা একটা বার চিন্তা করেনি নিজের সুখটায় বেছে নিয়েছিল। একবার ভাবেনি তাকে ছেড়ে আমি কী করে থাকবো? আমি নিজের চোখে নিজের মায়ের বিয়ে দেখেছি অন্য একটা লোকের সাথে। এর থেকে কষ্টের হয়তো কিছু ছিল না। মা যখন বিয়ে করে তার নতুন স্বামীর সাথে গাড়িতে ওঠছিল তখন আমি চিৎকার করে মাকে ডেকেছিলাম। কিন্তু মা আমার কথা শুনেনি। আমার কান্না আম্মুর হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারেনি। আমার কথা না ভেবে চলে গিয়েছিল ঐ লোকটার সাথে। তারপর থেকেই অবহেলায় অনাদরে বড় হতে থাকি। প্রথম কয়েক মাস আম্মু আমার খোঁজ নিলেও পড়ে আর আম্মু আমার খোঁজ নেয়নি। আম্মু যখন ৭ মাসের প্র্যাগনেন্ট তখন উনার দ্বিতীয় স্বামিকে নিয়ে কানাডায় চলে যায়। কানাডায় চলে যাওয়ার পর আম্মু নানা বাড়ির সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তারপর থেকে আম্মু কেমন আছে? কোথায় আছে কোনো খবর আমি জানি না। হয়তো সুখেই আছে। তবে আম্মুর বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। সবারই তো ভালো থাকার অধিকার আছে।

বন্যার কথা শুনে কণা কেঁদেই ফেলেছে। তার তো সবই আছে শুধু চেহেরা নেই। এই নিয়ে সে কতো হতাশা। মরে যেতে চায়। আর বন্যা? তার তো কেউ নেই। এই পৃথিবীতে একা বড্ড একা। তাকে ভালোবাসার মতো কেউ নেই। তবু মেয়েটার মুখ থেকে একটু ক্ষণের জন্যও হাসি সরে না। কণা বন্যাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। বন্যার চোখের কোণেও অভি চিক চিক করছে। অনেক বছর পর তার চোখে অশ্রু এলো। মা-বাবাকে হারিয়ে যেনো সে কাঁদতেই ভুলে গিয়েছিল।

২৬

আদ্রিয়ান তার বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সে রিলেক্সে বসে আছে। কারণ ছোঁয়া এখনো ভার্সিটিতে আসে নাই। আসলেই শুধু তার সাথে চিপকে থাকে। এটা এখন তার অসহ্য লাগে। আদ্রিয়ানের এক জিনিস বেশিদিন ভালো লাগে না। তাই তো ছোঁয়াকে তার এখন আর ভালো লাগে না। হঠাও আদ্রিয়ানের সামনে দিয়ে এটা মেয়ে যায়। মেয়েটার ওপর যেনো আদ্রিয়ানের চোখ দুটো আটকে যায়।

চলবে……….

( আজকে অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। তাই আশা করি আপনারাও গঠনামূলক মন্তব্য করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here