তুমি যে আমার পর্ব -৩৮+৩৯

#তুমি_যে_আমার🥀
#Writer_Nondini_Nila
#Part_38

মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বুলিয়ে নিজেও চোখের জল ফেলতে লাগলেন নিবিড় চৌধুরী। একমাত্র মেয়েকে ছাড়া তিনি একটি রাত কাটিয়েছেন। মেয়েটাকে দেখার জন্য তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করছিল। বাপি কে ছেড়ে মাম্মাকে জড়িয়ে ধরলো বর্ষা। তূর্য দুজনকে সালাম করে হাসিমুখে কথা বললো। তাদের সাথেই দুপুরের খাবারটা খাওয়া হলো। সন্ধ্যার পর শশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য তূর্য বউকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। বর্ষার বাবা-মা আগেই চলে গেছেন। তূর্য’রা একটু পর বের হয়েছে। কারণ বাসায় অনেক গেস্ট ছিলো কিছু গেস্ট কে বিদায় করে ওরা বের হতে হয়েছে। বর্ষা বাসায় যাওয়ার সময় আকুল আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। তূর্য ড্রাইভ করছে আর একটু পরপর আড়চোখে বর্ষার দিকে তাকাচ্ছে। বর্ষা ভুল করেও তাকাচ্ছে না তূর্য এর দিকে।

তূর্য হঠাৎ বলে উঠলো, ‘ তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’

বর্ষা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তূর্য এর দিকে। বর্ষাকে চমকাতে না পেরে তূর্য দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।

‘ কি হলো এ ভাবে তাকাচ্ছ কেন? জানতে চাইবেনা কি সারপ্রাইজ!’

‘না আপনার কাছে আবার সারপ্রাইজ আছে নাকি। নিশ্চিত আবার কোন দুঃসংবাদ পাবো তাই আগে থেকে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করছি।’

‘বাহ বর্ষা মনি তো খুব শক্ত হয়ে গেছে দেখছি।’

বর্ষা কিছু বললো না। তূর্য রেগে গাড়ি থামিয়ে ফেললো। বর্ষা তাও চুপচাপ র‌ইলো। তা দেখে তূর্য এক হাতে হেঁচকা টানে বর্ষাকে টেনে নিজের কোলের উপর বসিয়ে দিলো।বর্ষা ছটফট করছে,

‘ ফাজিল লোক ছারুন আমাকে। রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে কি শুরু করলেন।’

তূর্য কিছু না বলে বর্ষাকে জাপ্টে ধরে র‌ইলো। বর্ষা রাগে দুঃখে তূর্য এর হাতে খামচে দিলো। তূর্য টু শব্দ অব্দি করলো না। পাঁচ মিনিট এভাবেই জাপ্টে থেকে নিজেই ফট করে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পেতেই বর্ষা নিজের সিটে এসে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকালো তূর্য এর দিকে।
তূর্য মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। হঠাৎ বর্ষার কেন জানি মনে হচ্ছে রাস্তাটা খুব পরিচিত। ও উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে জানালা দিয়ে চেনার চেষ্টা করছে এটা কোন জায়গা আস্তে আস্তে থেমে গেল গাড়ি। গেটের দিকে তাকাতে ওর বুকটা ধ্বক করে উঠলো এটা তা ওদের বাসা।
সেই চিরচেনা বাসা। এখানে কেন নিয়ে এলো?
বর্ষা জিজ্ঞেস করতে তূর্য দিকে তাকিয়ে দেখে তিনি গাড়ি থেকে নামছে। আমার পাশে এসে ও দরজা খুলে আমাকে ও নামতে বললো। আমি নিঃশব্দে নেমে দাঁড়ালাম। তারপর বললাম,

‘ এখানে এসেছেন কেন? আপনার মতলব কি বলেন তো?’

তূর্য ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তখন আব্বু বেরিয়ে এলো বাসা থেকে বর্ষা বাপিকে দেখে চমকে উঠলো। আব্বু এই বাসায় কি করছে? কি হচ্ছে সব ওর মাথার উপর দিয়ে গেলো। কিন্তু সব কিছু ওর কাছে ক্লিয়ার হলো বাসায় ঢুকে। আব্বু যা বললেন তা শুনে বর্ষা চরমভাবে অবাক হলো। বর্ষা সোফায় বসে থেকে তূর্য এর নাটকীয় মুখটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে। উনি এসব কেন করছে? এতে উনার কি লাভ? লাভ ছাড়া তো উনী কিচ্ছু করে না। আবার কি ফন্দি এঁকেছে আল্লাহ জানে। অফিসার আদিল উরফে তূর্য নাকি সেই ফাইল মানে যেটা আমাকে দিয়ে কিডন্যাপ করিয়ে নিয়েছিলো সেটাই নাকি তিনি উদ্ধার করেছেন। কতো বড় নাটক বাজ। আর বর্ষার বাপিকে দায় মুক্ত করেছেন। তাই বাপি নিজের ব্যারিসটার পদ আবার ফিরে পেয়েছেন। আর বাসাটা দেনা দায়ে জন্য যারা দখল করেছিল। তারা খবরে, পেপারে এসব দেখে ফোন করে সময় দিয়েছেন, আর বাসায় আসতে বলেছে।

বাপি এমনিতেই তূর্য বলতে অজ্ঞান ছিলো এখন তো আরো। তূর্যের সাথে এতো সুন্দর করে কথা বলছে। আর মাঝে মাঝে হেসে উঠছে। যেন বাপির মতো সুখি আর কেউ নাই। তিনি কতোটা খুশি তা তার এই মুখের হাসি বলে দিচ্ছে। বর্ষা এক দৃষ্টিতে বাপির হাসি মুখটা দেখছে। তিনি যাকে সব চেয়ে আপন ভাবছে সেই যে তার সব চেয়ে বড় শত্রু বর্ষা কি করে বুঝাবে নিজের বাপিকে। বাপি এতোটা বিশ্বাস করে তূর্য কে যে বর্ষার কথাও হয়তো বিশ্বাস করবে না ও জানে। অন্তত এই কাজটা করে তূর্য একদম সেই আশা বরবাদ করে দিছে। মাম্মা রান্না ঘরে ওদের জন্য খাবার তৈরি করছে আগের সেই কাজের মহিলাটা আছে সাথে। বর্ষা নিজের ঘরেই চলে এলো। পেছনে তাকিয়ে একবার বাপি আর তূর্য কে দেখে।
কতোদিন পরে আমার প্রিয় ঘরটায় ঢুকলাম। যেভাবে রেখে গেছি সেভাবেই আছে। অদ্ভুত বিষয় রুমটা খুব পরিষ্কার। এতো দিন না থাকার ফলে তো ময়লা থাকার কথা কিন্তু না। আমি আয়নার সামনে গিয়ে নিজের সব কসমেটিক দেখলাম। সব রেখে গেছিলাম শুধু জামাকাপড় ছাড়া। এছাড়া একটা জিনিস ও নেয়নি।আমার প্রিয় টেডিবিয়ার গুলো একনজর দেখে লাল টা জরিয়ে ধরলাম এটা আমার আট বছর বয়সের জন্মদিনে আব্বু দিয়েছিলো। এটা নিয়ে চুল ছেড়ার কাহিনী আছে।
শপিং মলে ঢুকে টেডিবিয়ার দেখছিলাম। তারপর এই লাল টা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায় তখন আরেকটা মেয়েও এই লালটায় পছন্দ করে। দুজনে একটা ধরে টানাটানি করতে‌ লাগি। এক রঙের আরো আছে বলে বাপি আমাকে টানতে লাগে আর মেয়েটাকে তার মা কিন্তু আমরা ছারছিলাম না। আমাদের হাত থেকে টেডিবেয়ার পরে যায় তখন মেয়েটা আমার চুল টেনে ধরে আমিও ধরে। সেকি ঝগড়া আল্লাহ। পরে দুজনেই দুইটা লাল টেডিবেয়ার নিয়ে নেয় আর দুজনের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটি। এখনো মনে পরলে আমি হাসতে লাগি। এখনো হাসছি হাসতে হাসতে বর্ষা বিছানার বসে পরলো। হঠাৎ চোখ পড়লো দরজায় কাছে তূর্য বুকে হাত ভাজ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

বর্ষা তাকাতেই বলল, ‘ একা একাই হাসছো মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি?’

বর্ষা হাসি থামিয়ে মুখ গম্ভীর করে টেডিবিয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আর পাশে বর্ষার লাগেজ দেখা যাচ্ছে। বর্ষা লাগেজ থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে যায়।
তূর্য একটা ডেভিল হাসি দিয়ে ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

.
নিদ্রা আর অভ্র তিন দিন বান্দরবন কাটিয়ে বাসায় এলো। নিদ্রার সমস্ত মন খারাপ নেসটায় চলে গেছে যেনো। আবার দুজনকে খুব ভালো ফ্রেন্ড হয়ে উঠেছে।বাসায় এসেই অফিসার আদিল এর সাথে বর্ষার বিয়ে কথাটা জানতে পারে। আর শুনেই নিদ্রা অভ্রর দিকে তাকায়। কিন্তু না মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হয়নি।

‘ কি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?’

‘এমনি!’

অভ্র খবরটা আগেই শুনেছে। নিজে থেকে বর্ষার সাথে কথা না বললেও ওর সব খোঁজ খবর ই রেখেছিলো। কিন্তু সেটা আড়ালে লুকিয়ে। কারণ ও চায় না ওর এসবে আর নিদ্রা কষ্ট পাক।

বৌভাতের যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিল আদিল নিদ্রাকে কিন্তু ওরা ক্লান্ত হয়ে বান্দরবান থেকে বাসায় ফিরেছে তাই আর যেতে পারেননি।

পরদিন হসপিটালে গিয়ে নিদ্রা বসে ছিলো নিজের চেম্বারে। বিকেলের দিকে আদিল কে দেখলো। এসেই খুব কিউট করে একটা হাসি দিয়ে বসলো।

‘ কেমন আছেন মিসেস অভ্র?’

‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তা আপনি এখানে?’

‘ হুম আপনাকে আমার বাসায় যেতে হবে। সেটা বলতেই এসেছি।’

‘ কেন? আমি আপনার বাসায় কেন যাব?’

‘ বৌভাত তো আসলেন না। তাই সেই উপলক্ষে যাবেন।’

‘ এ্যা এটা আবার কেমন কথা? আমরা ক্লান্ত ছিলাম আপনাকে বলেছি।’

‘ হুম বলেছেন। তাই তো আজ যেতে বলেছি।’

‘ আজ?’

‘ হুম প্লিজ। আপনি আর মিস্টার অভ্র দুজনে ডিনারের দাওয়াত। আসবেন কিন্তু আমি আপনাদের অপেক্ষায় থাকবো। বাই।’

বলেই নিদ্রা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো তূর্য। নিদ্রা করে তাকিয়ে র‌ইলো। এমন ভাবে বললো এখন না গিয়ে ও উপায় নাই।

.
রাতটা কাটিয়ে দশটার দিকে তূর্য বর্ষাকে বাসায় নিয়ে এসেছে। বর্ষা চুপচাপ এসেছে কিছু বলেনি। কিভাবে এসব থেকে বেরোতে পারবে জানেনা।সারাদিন তূর্য বাইরে বাইরেই ছিলো। আর বর্ষা রুমে শুয়ে বসে শাশুড়ি মা এক বার রুমে এসেছিলো। বর্ষা দুপুরে খেতে বের হয় তখন তূর্য ও ছিলো। শাওন ছিলো না। তিন জন খাবার খেয়েছি। অবাক করা একটা বিষয় বিকেলেই জানতে পারে এটা শাওন এর মা। তাকে তূর্য আম্মু বলে। আর রুমে তূর্য এর বাবা আছে যিনি কথা বলতে পারে না আবার হাঁটতে ও পারে না। তাকে দেখে আরেক ঝটকা খেয়েছি একদম তূর্য এর মতো দেখতে। আমাকে শাওন এর মা নিয়ে পরিচয় করে দিয়েছে এটা আমার শশুর মশাই। সন্ধ্যার দিকে তূর্য এসে জানায় তার নাকি একজন স্পেশাল গেস্ট আসবে তাই রান্নার আয়োজন করতে।

শশুরের সাথে দেখা করে এসে রুমে বসে ছিলাম। তূর্য ঘেমে একাকার হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পরে দশ মিনিট পর উঠে আমার দিকে তাকিয়ে। আবার উঠে ফ্রেশ হয়ে চলে যায়।
#তুমি_যে_আমার🥀
#Writer_Nondini_Nila
#Part_39

নিদ্রা সেন্সলেস হয়ে পরে আছে। বর্ষা তারাতাড়ি পানির গ্লাস এনে ওর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলো। জ্ঞান ফিরছে না ভয়ে ওর হাত পা কাঁপছে। হঠাৎ কি হলো এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেলো কেন বুঝতে পারছে না বর্ষা। অভ্র নিদ্রার হাত ধরে ওকে চেক করছে। ডাক্তার যেহেতু তিনিই তাই আর তূর্য কে নতুন করে ডাক্তার ডাকতে হয় নি।

বর্ষা এক পাশে গুটিগুটি মেরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিদ্রার দিকে। আর ভাবছে এই ছবি গুলো দেখে এমন সেন্সলেস হলো কেন? সোফার নিচে পরে আছে ফটো এ্যালবামটা। এ এ্যালবামের ছবিগুলো দেখতে গিয়ে নিদ্রা আপু অজ্ঞান হয়ে গেল। স্ট্রেঞ্জ!

‘ আদিল আমাদের এইভাবেই বাসায় ফিরতে হবে। নিদ্রার জ্ঞান ফিরতে লেট হবে। হঠাৎ এভাবে সেন্সলেস কেন হলো কিছু বুঝতে পারছিনা ও মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছে। কিন্তু এমনটা কেন হলো?’ অভ্র চিন্তিত মুখে বলল।

তূর্য বলল, ‘ আজকে এখানে রাতটা কাটিয়ে যান মিস্টার অভ্র। এভাবে আপনাকে বাসায় যেতে দিতে পারি না।’

‘না বাসায় ফিরতে হবে। থাকাটা সম্ভব না।’

তূর্য বলেও রাজি করাতে পারলো না তাই বাধ্য হয়ে বললো,

‘তাহলে আমি আপনাদের কে ড্রপ করে দিই। এভাবে ছাড়তে পারবো না।’

‘ ইটস ওকে আমি ম্যানেজ করতে পারবো।’

‘ বাসায় যেতে চাইলে আমার অফারটা গ্রহণ করতে হবে। না হলে আজকে এখানে থাকতে হবে। ‘

‘ আচ্ছা চলুন।’

তূর্য চলে গেলো। আমি গেট পর্যন্ত এসে বিদায় দিলাম। অভ্র নিদ্রা কোলে তুলে গাড়িতে নিয়ে বসলো আর তূর্য ড্রাইভিং সিটে বসলো।
গাড়িটা আড়াল হতেই আমি দরজা আটকে ভেতরে চলে এলাম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরে নিদ্রা আপুরা এসেছিলো। তাদের দেখে তো আমি চমকে যায়। নিদ্রা আপু আমাকে জড়িয়ে ধরে আমি ও ধরি। তারপরই জানতে পারি নিদ্রা আপুরাই হচ্ছে তূর্যের সেই স্পেশাল গেস্ট। এই লোকটার সাথে আবার নিদ্রা আপুদের এত খাতির কিভাবে হল জানিনা কিন্তু আসার পরে তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম সাথে তূর্যের খুব ভালো একটা সম্পর্ক।

নিদ্রা আপুরা তূর্য এর বাবার সাথে দেখা করলেন। সেখানে গিয়ে এক অদ্ভুত কান্ড ঘটলো। তূর্য এর বাবা নিদ্রা আপুকে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগলেন। কিছুই বুঝতে পারলাম না। সেসব দেখে নিদ্রা আপু ভয় পেয়ে রুম থেকে চলে এসেছে।
আমি তো হা করে বোঝার চেষ্টা করছি কি হচ্ছে এসব। নিদ্রা আপুও অবাক কিন্তু তিনি অসুস্থ সেটা আপু জানে তাই ভেবেছেন অসুস্থতার জন্য বোধহয় এরকম করেছে। তিনি যাওয়ার জন্য না। সবকিছু ভুলে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। তারপর তুর্য কোথা থেকে একটা ফটো এ্যালবাম এনে নিদ্রা আপুর হাতে দিয়ে বলল, এটা নাকি তূর্য এর ফ্যামিলি ফটো এ্যালবাম। নিদ্রাকে সেটা দেখতে দিল।
তূর্যের সাথে এক বাসায় আছি কয়দিন হয়ে গেল কিন্তু এই এলবামের খবরা-খবর কিছুই আমার জানা নাই। আমি বোকা চোখে তাকিয়ে ছিলাম। এ্যালবাম খোলার পরে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। গোল গোল চোখ করে আমি অ্যালবামের নিদ্রা আপুর ছবির দিকে তাকিয়ে আছি।
এই তূর্যের ফ্যামিলি ফটো তে নিদ্রা আপুর ছবি কিভাবে এলো এই ছবিগুলোতে এখানকার না।কারণ মহিলাটি দেখতে নিদ্রা আপুর মতো কিন্তু তার সাজ পোশাক দেখে নিদ্রা আপুর মতো লাগছেনা একদম ডিফারেন্স দুজনের সাজপোশাক।

‘আপু তুমি এই ফটোতে কিভাবে এলে? আর এটা কবে কার ফটো তুমি এরকম করে কবে ছবি তুলেছো? আর সামনের বাচ্চা দুটো কে?’

প্রথম ছবিতে নিদ্রা আপুর মতো মহিলার সাথে একটা ছেলে একটা, ও একটা মেয়ে আছে। এই ছোট মেয়ে টা কেও কেন জানি আমার নিদ্রা আপুর মতই লাগছে আর এই পাশের ছেলেটা কে কেন যেন আমার তূর্যের মত লাগছে। আপু ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। পরের পেজে মহিলাটার সাথে একটা পুরুষের ছবি দেখলাম সেটা তো তূর্যের বাবা। আমার মাথা ঘুরছে কি হচ্ছে এসব নিদ্রা আপু তূর্য এর বাবার সাথে। এমন ছবি কেন তুলেছে যেন দুজন স্বামী স্ত্রী। এবার আমার মাথা ঘোরার উপক্রম।
আমার মাথা ঘোরা সেকেন্ডের মধ্যে থেমে গেল। পরের পেজে দেখতে পেলাম তূর্যের বাবা আর 3 জন ছেলেমেয়ে আরে নিদ্রা আপুর মতো দেখতে মহিলাটি ও। এবার তূর্য বললো,

এই মহিলাটা নাকি তার মা, পাশে বাবা, কোলে তার ছোট ভাই, আহান, আর তার বড় বোন আরোহী।
এবার সব ক্লিয়ার হলো। কিন্তু বর্ষা ভাবছে তূর্য এর মা দেখতে নিদ্রা আপুর মতো কেন? এতটা মিলতো শুধুমাত্র জমজ বোনের মধ্যে হয় আর ছেলেমেয়েদের মধ্যে হয়। তাহলে কি নিদ্রা আপু তূর্যের বোন? সোফায় বসে বসে আকাশ-পাতাল ভেবে যোগসুত্র মিলানোর চেষ্টা করছি অ্যালবাম হাতে নিয়ে। কাজের মেয়ে শান্তার কথা আমার ধ্যান ভাঙ্গলো।

‘বউ মনি!’

‘হ্যাঁ বলো।’

‘সবকিছুতো গুছাই ফেলছি আমি কি তাহলে ঘুমাতে যামু। আমনের কিছু লাগব চা-কফি?’

‘না তুমি যাও আমার লাগলে আমি নিজে করে নিতে পারব!’

‘আপনে কষ্ট কইরা করতে যাইবেন ক্যান! আমি থাকতে। আমারে কন আমি কইরা আইনে দেয়।’

‘এখন আমার লাগবে না!’

‘আচ্ছা তাইলে চা কইরা ফ্লাক্সে রাখি! যখন মন চায় খাইয়া নিয়েন।’

‘তুমি যাও তো ঘুমাইতে আমার কিছুই লাগো না!’

শান্তা মুখ কালো করে চলে গেল। শান্তা আমার থেকেও ছোট কিন্তু কাজকর্মে খুব পারদর্শী। আর আমাকে খুবই ভালোবাসে। সারাদিন কাছাকাছি থাকে আর বলে কিছু লাগবে কিনা। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে।ওর এতো এইসব কথায়। এই যেমন এখন ঝাড়ি দিলাম কিন্তু কখনো কিছু মনে করে না ওকে ঝাড়ি দিয়ে আমার‌ই খারাপ লাগে। শাওন এর মা চলে গেছে। তূর্য আমার জন্য এই মেয়েটারে আনছে আমাকে হেল্প করবে। কিন্তু হেল্প আর কি সব কাজ সে নিজেই করে আমাকে কিছুই করতে হয়না। আর আমি ততটা কাজ পারিও না আর পারলে আমার করতে ইচ্ছা হয়না তূর্যের জন্য ওর বাড়ির মানুষের জন্যে আমার কিছুই করতে ইচ্ছুক না আমি।
কিন্তু মেয়েটা খুব কাজ করে এজন্য আমার মায়া লাগে। এজন্য রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি ও আমাকে বসিয়ে রেখে নিজেই সব করে। ওর কাজ রান্নাবান্না করা আর আমার সুবিধা অসুবিধা দেখা।ওর রান্নার হাত খুব ভালো। তূর্যের বাবার জন্য আলাদা একজন লোক রাখা আছে। যিনি সবসময় তার দেখাশোনা করে তার খাবার-দাবার ওষুধ তার সমস্ত কিছু দেখাশোনা তার দায়িত্ব।

শান্তা চলে গেছে ঘুমাতে। আমি সোফা থেকে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা করে রুমে চলে এলাম। বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি আর ব্যস্ত মানুষের চলাচল দেখছি। দশটা বাজে আজকে আকাশে জোসনা আছে। নিজের ফোন না থাকায় বাপি কে একটা কল করতে পারছি না। বাসার ফোনটা ফেলে এসেছি। নজর গেল তূর্য এর গাড়ি চলে এসেছে। নিদ্রা আপুদের কে নিজের গাড়িতে করেই নিয়ে গিয়েছিল। আর নিদ্রা আপুদের গাড়ি তাদের ড্রাইভার নিয়ে গেছে। গাড়ি পার্কিং করে ভেতরে আসতে যাবে তখন একবার উপরে তাকালো আমি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে ফেললাম।

চা হাতে বসে আছি। দুই চুমুক দিয়েছিলাম।আর খেতে ইচ্ছে করছে না ঘুমাবো এখন‌। চা হাতে উঠে দাড়াতেই তূর্য ছুটে এসে আমার হাত থেকে চায়ের কাপ ছিনিয়ে নিলো। আমি মৃদু চিৎকার করে বললাম,

‘ আমার চা’

তূর্য চায়ে চুমুক দিয়ে বললো, ‘ ঠান্ডা হয়ে গেছে কিন্তু তবুও ঠান্ডা চা টাই সেই লাগছে।’

‘অসভ্য লোক একটা! আপনি আমার খাওয়া চা কেন ছিনিয়ে নিলেন? বাসায় কি চায়ের অভাব পড়েছে যে আমার হাতে চা ছিনিয়ে নিয়ে খেতে হবে।’

‘তুমি যে আর এটা খেতে না সেটা আমি ভালো করে জানি। আর যদি খেতেও তবু আমি এটাই খেতাম তোমার ঠোটে লাগা চায়ের খাওয়ার লোভ আমি মিস করতে চাইনা বুঝেছ।’

‘আপনি আমাকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে শেষ না করা পর্যন্ত শান্ত হবেন না আমি জানি।’

বলেই তূর্য এর সামনে থেকে চলে এলাম।
তূর্য ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চা খাচ্ছে। বর্ষা বিছানায় শুয়ে পরলো আর মাঝে একটা বালিশ রেখে চোখ বন্ধ করলো।

তূর্য চা শেষ করে রুমে এসে দেখে বর্ষা শুয়ে আছে মাঝে খানে বালিশ দিয়ে। ও ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় গেলো। মাঝখানে থেকে বালিশ সরিয়ে একদম বর্ষার গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। বর্ষা জেগেই ছিলো ওর গায়ের সাথে তূর্য এর শরীর লাগতে ঝট করে চোখ খুলে ফেললো। কিছু বলতে যাবে তার আগেই তূর্য বর্ষার কোমরে দুহাত চেপে ধরে বর্ষাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফিরায়। বর্ষা ড্রিম লাইটের আলোতে অগ্নিদৃষ্টিতে তূর্য এর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

‘ কি শুরু করেছেন? ছাড়ুন আমাকে।’ ছটফট করতে করতে।

তূর্য উত্তর না দিয়ে মাথা এগিয়ে এনে বর্ষার ঠোঁটে চুমু খেতেই বর্ষার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। ও নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে তূর্য কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উঠে বসে হাঁপাতে লাগে।

‘খবরদার আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে আমি আপনাকে খুন করে ফেলবো’

‘ বর্ষা মনি খুন তো আমি হয়েই গেছি আর কিভাবে করবে?’

‘ আপনি দূরে যান‌। আমাকে জোর জবরদস্তি করলে আমি হয় আপনাকে খুন করবো না হলে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেব। একবার জোর করে আমাকে ভোগ করে ও আপনি ক্ষান্ত হননি‌। আবার আমার কাছে আসার চেষ্টা করছেন।আর একবার যদি আপনি আমাকে এভাবে জোর করে নিজের স্বামীর অধিকার চান। তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে দেবো। আপনার এই স্পর্শ গুলো আমার কাছে বিষের চেও বিষাক্ত লাগে। এতটা খারাপ লোক আমি জীবনে দেখি নাই। এইভাবে আমার শরীরের উপর নিজের অধিকার ফলানোর জন্য বিয়ে করেছেন তাই না আমি আগেই জানতাম আপনার মতলব।’

বর্ষার কথা শুনে তূর্য এর মাথায় রক্ত উঠে গেলো। ও বিছানায় উঠে বসে ঠাস করে বর্ষার গালে চর মেরে দিলো।

‘সত্যি কথা বললেই গায়ে ছেকা লাগে তাইনা। মারবেন‌ই তো মেরে ফেলো আমাকে।’ বলে কেঁদে উঠলো বর্ষা।

তূর্য বর্ষার কান্না দেখে কিছুটা শান্ত হলো। আর বর্ষার মাথা টেনে বুকের মাঝে নিলো। বর্ষায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তূর্য ওইভাবেই বর্ষাকে জড়িয়ে শুয়ে পরলো।

#চলবে…….
#চলবে..

( ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here