তুমি হৃদয়ে লুকানো প্রেম পর্ব ৩৩+৩৪+৩৫

#তুমি_হৃদয়ে_লুকানো_প্রেম
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#পর্ব_৩৩

হাসপাতালে ফিনাইলের তীব্র গন্ধ। নাসিকা গ্ৰন্থিতে তীব্র গন্ধটি ক্ষণে ক্ষণে প্রবেশ করছে। রোগীদের স্বজনের ভীড় যত্রতত্র। ওয়েটিং জোনে বসে রয়েছে তৃষা। দু হাতের তালুতে লুকানো মুখখানি। কেঁপে কেঁপে উঠছে কায়া। পরিহিত পোশাকের কাঁধের অংশে র’ক্তের ছাপ দৃশ্যমান। ক্রন্দনরত ললনার বাম পাশে এসে বসলো পুষ্পি। বান্ধবীর কাঁধে হাত রাখতেই ওকে দু হাতে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগলো তৃষা। পুষ্পি চরমভাবে বিস্মিত! ভাবতেই পারছে না ভাইয়ের বন্ধুর জন্য মেয়েটি এভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে গেছে! এই আবেগ, যাতনা কি শুধুই ভাইয়ের বন্ধুর জন্য? নাকি তন্মধ্যে লুকানো কোনো অনুভূতি? পুষ্পির কপালের মাঝখানে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। আস্তে আস্তে করে সে বান্ধবীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। সামান্য দূরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিন্দু। সে-ও পুষ্পির মতো চিন্তিত। বিস্মিত!

তমস্র রজনী। কেবিনের মধ্যখানে বেড। সফেদ বিছানায় শায়িত মানুষটি। কপালের ক্ষত লুকায়িত ব্যান্ডেজের আড়ালে। ছোপ ছোপ লাল দাগ দৃশ্যমান ব্যান্ডেজের উপরিভাগে। তৃষা পাশেই বসে। টুলের ওপর। বি ধ্ব স্ত অবস্থা মেয়েটির। পোশাকে আহত মানুষটির র’ক্তের দাগ। চুলগুলো স্বল্প এলোমেলো। কপোলে অশ্রুর ছাপ। ফুলে গিয়েছে চোখমুখ। যন্ত্রণা মিশ্রিত চাহনিতে তাকিয়ে। তখনই হঠাৎ কেবিনের দ্বার উন্মুক্ত হলো। দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো রাজীব, দানিশ, মনিকা এবং টগর। বন্ধুর খবর পেয়েই ছুটে এসেছে ওরা। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করেই তারা হতভম্ব! তৃষা এখানে!

” তৃষা তুমি? ”

মেয়েলি স্বরে ঘোর কেটে গেল তৃষার। পিছু ঘুরে দেখতে পেল ভাইয়ের বন্ধুরা দাঁড়িয়ে। সৌজন্যতার খাতিরে উঠে দাঁড়ালো তৃষা। মনিকা অভিজ্ঞ চোখে পড়ে নিলো মেয়েটার মুখখানি। কিছু বোধগম্য হতেই উজ্জ্বল হলো বদন। ছেলেরা ছুটে এলো বন্ধুর নিকটে। নিশাদের করুণ দশা দেখে দুঃখ বোধ করলো। টগর প্রশ্ন করলো,

” এসব কি করে হলো তৃষা? আর তুমিই বা এখানে কেন? ”

তৃষা জিভে সিক্ত করলো অধর। মৃদু স্বরে বললো,

” বিকেলবেলা বাড়ি ফিরছিলাম। পথে ড্রাইভার আংকেল গাড়ি থামালেন। এরপর.. ”

তৃষা বর্ণনা করলো কি থেকে কি হয়েছে। চমকে উঠলো ওরা!

রাজীব জিজ্ঞেস করলো, ” ডক্টর কি বলেছে? ”

তৃষা দৃষ্টি নত করে নিলো। নিজের যাতনা সয়ে থেমে থেমে জবাব দিলো,

” উনি এখন আলহামদুলিল্লাহ্ ঠিক আছেন। অতটা ক্ষতি হয়নি। শুধু দু’টো স্টিচ পড়েছে। ডক্টর আংকেল ইনজেকশন দিয়েছে। উনি ঘুমাচ্ছেন। শীঘ্রই জ্ঞান ফিরে আসবে। ”

স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল বন্ধুরা। মনিকা আহত বন্ধুর পানে একবার তাকিয়ে তৃষার দিকে তাকালো। ওর বি ধ্ব স্ত অবস্থা অনুধাবন করে বললো,

” তৃষা তুমি তাহলে এখন বাড়ি যাও। আংকেল আন্টি নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন। ওনারা এসব জানেন? ”

না সূচক মাথা নাড়ল তৃষা। রাজীব তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,

” তুমি তাহলে বাড়ি যাও বোন। ওনারা চিন্তা করবেন। ”

তৃষা কোনোরূপ আপত্তি করলো না। হয়তো আপত্তি করার মতো অধিকার তার নেই। তাই তো নীরবে মেনে নিলো। কেবিন হতে প্রস্থান করার পূর্বে একটিবারের জন্য দেখে নিলো আহত মানুষটির অবস্থা। নেত্রকোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু কণা। দানিশ রাজীবকে বললো,

” রাজীব! ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ভাই। রাতের বেলা একাকী.. ”

রাজীব সম্মতি পোষণ করে বেরিয়ে এলো। তৃষা, পুষ্পি, বিন্দু এবং রাজীব একত্রে রওনা হলো। দুই বান্ধবীকে পৌঁছে দিয়ে তারপর ‘ ছায়াবিথী ‘ ফিরবে তৃষা, রাজীব।

দিবাকরের আলোয় আলোকিত ধরনী। সমতল আরশির সম্মুখে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে দুয়া। পেছনে দাঁড়িয়ে তূর্ণ লালচে চুলগুলো সেট করে নিচ্ছে। চুল সেট করতে করতে বিরক্তি মাখা স্বরে বলে উঠলো,

” অ্যাই মেয়ে আর কতক্ষণ লাগবে? এবার তো আয়নার সামনে থেকে সর। ”

” দেখতে পাচ্ছো না রেডি হচ্ছি? ”

” সে তো বিগত কয়েক ঘন্টা ধরেই দেখে যাচ্ছি। আর কত? ”

তড়িৎ পিছু ঘুরে তাকালো দুয়া।

” কি বললে? আমি কয়েক ঘন্টা ধরে রেডি হচ্ছি? তুমি জানো কয়েক ঘণ্টা কারে কয়? উল্টোপাল্টা বলবে না বলে রাখলাম। ”

তূর্ণ নাক কুঁচকে দুয়া’র পাশে এসে দাঁড়ালো। বাহুর ধাক্কায় ওকে সরিয়ে নিজে দখল করলো আরশি। দুয়া তো অবাক?

” অ্যাই অ্যাই! এসব কি? সরো বলছি। ”

সরলো না তূর্ণ। বরং দ্রুত চুলগুলো সেট করে নিলো। অতঃপর পড়নের জ্যাকেটের চেন টেনে আঁটকে দিলো। তূর্ণ মহাশয় রেডি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে। নীরবে সরে দাঁড়ালো আরশি হতে। দুয়া ভেংচি কেটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুলগুলো ভালোমতো আঁচড়ে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের ছোঁয়া এঁকে নিলো। এবার হাতে নিলো লেডিস বিয়ানি। সেটা মাথায় পড়তে উদ্যত হতেই ওর হাতটি ধরে ফেলল তূর্ণ। দুয়া প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে তাকিয়ে। তূর্ণ নিজ হাতে বিয়ানি নিলো। অতঃপর সযতনে অর্ধাঙ্গিনীর দীঘল কালো কেশ আগলে মাথায় পড়িয়ে দিলো বিয়ানি। সাজগোজ সম্পন্ন হলো।

তূর্ণ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো তার মাইরা’র পানে। মেয়েটির পড়নে গ্ৰে কালার ফুল নেক সোয়েটার। উপরিভাগে সম রঙের লং কোট। কোটের বাটন আটকে উপরিভাগ আবৃত। নিচে সাইড স্লিট প্যান্ট। মাথায় গ্ৰে লেডিস বিয়ানি। মাশাআল্লাহ্! চক্ষু ফেরানো মুশকিল! তূর্ণ বিমোহিত নয়নে তাকিয়ে রইলো। দুয়া চুলে হাত বুলাতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ নজর পড়লো স্বামীর পানে। তূর্ণ কেমন তাকিয়ে রয়েছে। চোখেমুখে অপার মুগ্ধতা! সে বিমুগ্ধ চাহনিতে মিইয়ে গেল মেয়েটি। সলজ্জ চোখে তাকিয়ে রইল। নয়নে মিলিত হলো নয়ন। তূর্ণ’র পড়নে গ্ৰে কালার স্ট্রিপড্ কুইল্টেড জ্যাকেট এবং জিন্স প্যান্ট। দু’জনেই ম্যাচিং পোশাক পরিহিত। তূর্ণ মুচকি হাসলো। নিভৃতে এগিয়ে এলো কয়েক কদম। দুয়া থমকে গেল নিজ জায়গায়। তূর্ণ দু হাতের আঁজলায় মায়াবী মুখখানি তুলে নিলো। কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো মায়াময় নয়নে। অতঃপর ওষ্ঠের আদুরে পরশ এঁকে দিলো ললাটে। আনমনে দুয়া’র একটি হাত উঠে এলো। রাখলো কপোলে রাখা অর্ধাঙ্গের হাতের ওপর।

তূর্ণ এবং দুয়া আজ এসেছে চিলন ক্যাসেল। যা লেক জেনেভার সন্নিকটে অবস্থিত। চিলন ক্যাসেল তার বর্তমান আকারে কয়েক শতাব্দীর নির্মাণ ও পুনর্বিকাশের ফলাফল।
উনিশ শতকের শেষ থেকে সম্পাদিত খনন, বিশেষ করে প্রত্নতাত্ত্বিক আলবার্ট নায়েফ এর নেতৃত্বে করা খননগুলি ইঙ্গিত দেয় যে ব্রোঞ্জ যুগ থেকে স্থানটি দখল করা হয়েছে।
যে পাথুরে দ্বীপে দুর্গটি অবস্থিত সেটি প্রাকৃতিক সুরক্ষার একটি রূপ এবং ইউরোপের উত্তর থেকে দক্ষিণে উত্তরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি কৌশলগত অবস্থান উভয়ই গঠন করে। প্রাসাদটি আসল দ্বীপের ডিম্বাকৃতির আকার ধারণ করেছিল যার উপর এটি নির্মিত হয়েছিল। এটি প্রায় একশো মিটার লম্বা এবং পঞ্চাশ মিটার চওড়া। এটি শিলা থেকে এর নামও নিয়েছে। ‘ চিলন ‘ শব্দের অর্থ একটি প্রাচীন ভাষায় ‘পাথুরে প্ল্যাটফর্ম’। এই দুর্গের ইতিহাস তিনটি মহান সময়কাল দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেভয় পরিবার, বার্নিজ বেলিফ এবং ভাউডের ক্যান্টন। যদিও তথাকথিত ‘স্যাভয়ার্ড’-শৈলীর দুর্গগুলি সাধারণত একটি বর্গাকার প্লটে তৈরি করা হয়েছিল, যার প্রতিটি কোণে নলাকার টাওয়ার রয়েছে। চিলন ক্যাসেলকে যা বিশেষ করে তোলে তা হলো পাথুরে দ্বীপের ডিম্বাকৃতির সাথে এটিকে যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

চিলন ক্যাসেল একটি প্রাকৃতিক পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। দুর্গটি চারদিক থেকে লেকের মাধ্যমে প্রবেশ করা যেতে পারে। এটি একটি ‘জলপ্রান্তর দুর্গ’ হিসাবে বিবেচিত হয়। চিলন একটি সেতু দ্বারা জমির সাথে সংযুক্ত (পূর্বে একটি ড্রব্রিজ, যার পুলি সিস্টেমের অবশিষ্টাংশ এখনও দেখা যায়)। চিলন হলো একটি দ্বৈত-উদ্দেশ্যের দুর্গ: উত্তরের সম্মুখভাগ – তীরচিহ্ন এবং পরে লুপফুল দিয়ে ছিদ্র করা হয়েছে এবং ম্যাকিকোলেশন দিয়ে শীর্ষে রয়েছে – এটি প্রতিরক্ষামূলক অংশ গঠন করেছে যা ভায়া ফ্রান্সিজেনা সড়ককে সুরক্ষিত করেছে। দক্ষিণ দিকে হ্রদের মুখোমুখি, দুর্দান্ত গথিক জানালাগুলি রাজকীয় বাসভবনের সম্মুখভাগকে শোভিত করে; ভাউড রিভেরা, লেক জেনেভা এবং পর্বতমালার সাধারণ ল্যান্ডস্কেপ দেখে। কেন্দ্রে, কিপ এবং ট্রেজার রুম সেন্ট্রি ওয়াক করে কর্পস ডি লগিসের সাথে সংযুক্ত থাকে। শুধু এখানে বসবাস করার জন্য। অভ্যন্তরীণ স্থান তিনটি প্রধান উঠানে বিভক্ত। প্রতিটি তাদের চারপাশের বিল্ডিংগুলির ব্যবহারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ: ক্যাসেলান এবং প্রভুর বাসস্থান, যা সামন্ত ব্যবস্থার সময়কালের।

তূর্ণ দুয়া’র হাতটি ধরে প্রবেশ করলো ক্যাসেলে। তারা লেকের মাধ্যমে ক্যাসেলে প্রবেশ করেছে। ক্যাসেলের আকৃতি ডিম্বাকৃতির। যা মুগ্ধ করলো দুয়া’কে।

” ওয়াও! কি সুন্দর! কিন্তু এটা এমন আকৃতির কেন? ”

তূর্ণ মুচকি হেসে বললো,

” প্রাসাদটি আসলে দ্বীপের ডিম্বাকৃতির আকার ধারণ করেছে যার উপর এটি নির্মিত। ”

” তাই? ”

” হুম। ”

দুয়া কৌতুহলী দৃষ্টিতে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে। এত পুরনো ক্যাসেলে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশ্বাস হতে চাইছে না যেন। দুয়া আস্তে করে তূর্ণ’র হাতটি ছাড়িয়ে নিলো। ক্যামেরা বন্দি করতে লাগলো নজরকাড়া দৃশ্যগুলো। ওরা হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে গেল দক্ষিণ দিকে। সেথায় হ্রদের মুখোমুখি দুর্দান্ত গথিক জানালাগুলো রাজকীয় বাসভবনের সম্মুখ ভাগকে শোভিত করে রেখেছে। ওখান থেকে দেখা মিলে ভাউড রিভেরা, লেক জেনেভা এবং পর্বতমালার সাধারণ কিছু দৃশ্য। দুয়া’র মুখনিঃসৃত হলো,

” মাশাআল্লাহ্! ”

বিমোহিত রমণী ফটাফট ক্যামেরা বন্দি করতে লাগলো এমন অসাধারণ দৃশ্যপট! তূর্ণ পাশ থেকে বলে উঠলো,

” ক্যাসেলের নাম চিলন কেন রাখা হয়েছে জানো? ”

দুয়া ওর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। সে জানে না। জানতে ইচ্ছুক।

” চিলন শব্দের অর্থ একটি প্রাচীন ভাষায় পাথুরে প্ল্যাটফর্ম। তাই এর নাম রাখা হয়েছে চিলন। ”

দুয়া আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বললো,

” পারফেক্ট নাম রেখেছে। আসলেই পাথুরে প্লাটফর্ম। ”

” হুম। ”

ওরা দু’জনে মিলে ক্যাসেল ঘুরে দেখতে লাগলো। সেথায় পুরনো আমলের বহু নিদর্শন সংরক্ষিত। সবটাই চমকপ্রদ! চোখ ধাঁধানো। দু’জনে ঘুরে ঘুরে সবটা অবলোকন করতে লাগলো। ক্যামেরা বন্দি হলো অগণিত ফটো।

বিশাল জায়গা নিয়ে সবুজের সমারোহ। তন্মধ্যে গোলাকার আকার ধারণ করে ছয়/সাতটি ফুলের ক্ষুদ্র সমারোহ। সেথায় রয়েছে হলুদ, কমলা, সবুজাভ অসংখ্য ফুল আর ফুল। এই ফুলেল সমারোহ এর কেন্দ্রবিন্দু গোলাকার আরেকটি ফুলের মেলা। বিশাল জায়গা নিয়ে অবস্থিত এই ফুলেল সমারোহ পরিচিত ফ্লাওয়ার ক্লক নামে।

৬,৫০০ টিরও বেশি ফুল এবং গাছপালা রয়েছে ফ্লাওয়ার ক্লক এ। যা L’horloge Fleurie নামে পরিচিত। এই ফ্লাওয়ার ক্লক বিশ্বের দীর্ঘতম সেকেন্ড হ্যান্ড বৈশিষ্ট্যযুক্ত। যার দৈর্ঘ্য ২.৫ মিটার! ১৯৫৫ সালে নির্মিত এই বিশাল ঘড়িটি প্রতি ঋতুর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বছরে একাধিকবার সাজানো হয়। এই বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, ফুলের সৌন্দর্য এবং সবুজ সবুজে ঘেরা। জেনেভাতে দেখার জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত স্থানগুলির মধ্যে একটি হওয়ার পাশাপাশি, ঘড়িটি সুইজারল্যান্ডের প্রিমিয়াম ঘড়ি শিল্পকেও স্মরণ করে। এই ঘড়িতে যাওয়া মানে অন্য সময়ে ভ্রমণ করার মতো!

ঘড়িটি গার্ডেন অ্যাংলাইজের ধারের কাছে বসে আছে এবং একটি স্যাটেলাইট সংযোগের সাথে সংযুক্ত থাকে। যার মানে এটি সর্বদা সঠিক সময় দেখায়! প্রতি ঋতুতে এই ফ্লাওয়ার ক্লকের চব্বিশ ঘন্টা ফুলের আয়োজন পরিবর্তিত হয়।

দুয়া দাঁড়িয়ে ফ্লাওয়ার ক্লক এর কাঁটা সাতের কাছে। সেথায় এই মুহূর্তে হলদে কমলা ফুলের সমারোহ। দুয়া বিলম্ব না করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো।দু হাতের আঁজলায় ভরে নিলো ফুলের কোমল দেহ। আবেশে সিক্ত হলো তনুমন। আহা! কি কোমল! সুগন্ধময় পরশ! নিমিষেই ভালোলাগায় ছেয়ে গেল হৃদয়। অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,

” মাশাআল্লাহ্! আল্লাহ্ কিইনা পারে? ”

তূর্ণ তা শুনতে পেল।

” এক্সাক্টলি। ছয় হাজার পাঁচশো ফুলের সমারোহ এখানে। এই যে ফ্লাওয়ার ক্লক? এটা স্যাটেলাইট সংযোগের সাথে সংযুক্ত। যার মানে এটি সবসময় সঠিক সময় দেখায়! জানো দুয়া? প্রতি ঋতুতে এই ফ্লাওয়ার ক্লকের ফুলের আয়োজন পরিবর্তিত হয়। সো ইনক্রেডিবল! ”

দুয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর তূর্ণ’র দিকে তাকিয়ে বললো,

” এই যে পার্সোনাল ফটোগ্রাফার! ”

তূর্ণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নিজের দিকে তর্জনী তাক করে শুধালো,

” পার্সোনাল ফটোগ্রাফার? মি? ”

” ইয়েস। এবার ফটাফট কয়েকটি ছবি তুলে দাও তো। ”

তূর্ণ কয়েক কদম এগিয়ে গেল। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর মতো লাভ-লোকসান হিসেব কষে বললো,

” তাতে আমার লাভ? ”

” লাভ! তুমি এরমধ্যে লাভ খুঁজছো? ”

” অফকোর্স। আফটার অল কমার্সের স্টুডেন্ট বউ আমার। সে সারাক্ষণ লাভ লোকসান নিয়ে পড়ে থাকে। তাহলে স্বামী হিসেবে আমি কেন জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে থাকবো? হুঁ? নাউ টেল মি। তোমার রঙচঙা ফটো তুলে আমার কি লাভ? আমি কি পাবো? হুঁ? ”

ভ্রু নাচিয়ে চলেছে মানুষটা। দুয়া ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। উঠে দাঁড়িয়ে কাছে এলো মানুষটির। চোখে চোখ রেখে বললো,

” কি চাই তোমার? ”

রহস্যময় হাসলো তূর্ণ। মাইরা’র কর্ণ কুহরে অধর ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

” সাসপেন্স। সময় মতো জেনে যাবে। ”

তড়িৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালো তূর্ণ। ক্যামেরা হাতে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে দুষ্টু হেসে বললো,

” আদ্রিয়ান আয়মান তূর্ণ ইন ইওর সার্ভিস। প্লিজ অ্যাক্সেপ্ট মাই সার্ভিস অ্যান্ড স্যাটিসফাই মি। ”

তূর্ণ’র দুষ্টুমিতে মেতে উঠলো দুয়া। খিলখিল হাসির কলরবে মুখরিত হলো চারিপাশ। তূর্ণ বিমুগ্ধ চাহনিতে অবলোকন করলো সে হাসি! চোখেমুখে তৃপ্তির আভা!

চলবে.

[ কেমন লাগছে সুইজারল্যান্ড ট্রিপ? গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি। ধন্যবাদ সবাইকে পাশে থাকার জন্য। ]#তুমি_হৃদয়ে_লুকানো_প্রেম
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#পর্ব_৩৪

” মিসেস জাহিরাহ্ দুয়া! দিবাকালীন লেনদেন পরিশোধ করতে আপনি প্রস্তুত তো? ”

মানুষটির চোখেমুখে দুষ্টুমির ছাপ। এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছে। তাতে আর’ক্ত আভা ছড়িয়ে পড়লো মেয়েটির মায়াবী বদনে।
.

নিশাকরের দ্যুতি বিরাজমান ধরনীর বুকে। হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে দুয়া। হাতে ক্যামেরা। সম্পূর্ণ মনোযোগ তাতেই নিবদ্ধ। একের পর এক ফটো দেখে চলেছে। চিলন ক্যাসেল, ফ্লাওয়ার ক্লক। গতকালের লেক জেনেভা সফর। সকল ফটো দেখে চলেছে। চোখেমুখে তৃপ্তির আভা। হঠাৎ অভিব্যক্তি বদলে গেল‌। কপালে পড়লো ভাঁজ। অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে উঠলো,

” এটা কি হলো? ”

” হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট? ”

তূর্ণ সমতল আরশির সম্মুখে দাঁড়িয়ে। তোয়ালে চালনা করে চলেছে স্বল্প সিক্ত কেশের ভাঁজে ভাঁজে। দুয়া’র প্রশ্ন বুঝতে না পেরে উপরোক্ত প্রশ্নটি করলো। দুয়া চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকালো। তার দিকে ক্যামেরা তাক করে বললো,

” এই দ্যাখো। এটা কেমন ফটো হুঁ? পেছনে চমৎকার ব্যাকগ্ৰাউন্ড। অথচ আমি? চোখের পলক পড়েছে ঠিক তখন ফটোটা তুলেছো। একটু দেখেশুনে তুলবে না? তোমার জন্য কি সুন্দর ফটোটা বি শ্রী হয়ে গেল। ইশ্। ”

মেয়েটার কণ্ঠে আফসোস! তূর্ণ তোয়ালে চালনা বন্ধ করে ডান পাশে তাকালো। দুয়া’র দিকে।

” এই হলো বেডি মানুষ। শত শত অসাম ফটোর ভিড়ে একটা হয়তো খুঁত। তাতেই বেজার করে ফেলছে মুখ। ”

দুয়া বড় বড় চোখ করে তাকালো। নিজের দিকে তর্জনী তাক করে বিস্মিত কণ্ঠে থেমে থেমে শুধালো,

” আ-মি? বেডি মানুষ? ”

তূর্ণ তোয়ালে যথাস্থানে রাখতে রাখতে বললো,

” নাহলে কি? ধে ড়ি খুকি? বিয়েশাদী হয়ে গেছে। ক’দিন পর জামাইয়ের বাচ্চার মা জননী হবি। তাহলে বেডি নয়তো কি? ”

দুয়া ক্যামেরা পার্শ্বে রেখে তৎক্ষণাৎ বিছানা ত্যাগ করে নেমে পড়লো। তূর্ণ’র পাশে গিয়ে জোরালো কণ্ঠে বললো,

” একদম বাজে কথা বলবে না। আমাকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে বেডি লাগে? হুঁ? তুমি জানো আমাকে এখনো পিওর সিঙ্গেল লাগে। আমি জাস্ট একটা ইশারা করলেই না ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে। ”

তূর্ণ ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। থুতনিতে বৃদ্ধাঙ্গুল এবং তর্জনী ঠেকিয়ে ভাবনায় মশগুল হয়ে বললো,

” তুই কি ট্রাফিক পুলিশ নাকি প্রাইমারি স্কুলের পিটি স্যার? যে তোর এক ইশারাতেই লাইন লেগে যাবে? হুঁ?”

তূর্ণ এমন চেহারা বানিয়ে রেখেছে যেন শত কোটি টাকা মূল্যের প্রশ্ন করে ফেলেছে। এখুনি এই মূহুর্তে যার জবাব চাই। দুয়া তো বাকশূন্য! কি থেকে কি বলবে বুঝতেই পারছে না। কোনোমতে শুধু এটাই বললো যে,

” তুমি একটা যা তা। ”

বলেই সামনে থেকে সরে গেল। তখনই পিছু ডাকলো তূর্ণ। তুড়ি মে রে বললো,

” ও য়ে! ”

থেমে গেল দুয়া। পিছু ঘুরে তাকাতেই লক্ষ্য করলো মানুষটির চোখেমুখে ভিন্ন আভা। কিন্তু কেন? তূর্ণ ট্রাউজারের পকেটে দু হাত গলিয়ে বলতে লাগলো,

” পার্সোনাল ফটোগ্রাফার তার দায়িত্ব তো পালন করেছে। এবার মূল্য চুকানো যাক? ”

দুয়া ঠিক বুঝতে পারলো না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তখনই চোখে চোখ পড়লো।

” মিসেস জাহিরাহ্ দুয়া! দিবাকালীন লেনদেন পরিশোধ করতে আপনি প্রস্তুত তো? ”

মানুষটির চোখেমুখে দুষ্টুমির ছাপ। এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছে। অধর কোণে দুষ্টু হাসির আভাস। আর’ক্ত আভা ছড়িয়ে পড়লো মেয়েটির মায়াবী বদনে। সেও সন্তর্পণে পেছাতে লাগলো। একান্ত মানুষটির প্রতিটি কদমে ঝড়ো দামামা বয়ে চলেছে মানসলোকে। তীব্র পবনে এলোমেলো অন্তঃস্থল। শুকিয়ে কাঠ গণ্ডস্থল। পেছাতে পেছাতে মেয়েটির পৃষ্ঠদেশ ঠেকলো দেয়ালে। পিছু হটার পথ অবরুদ্ধ। অতি সন্নিকটে উপস্থিত একান্ত জন। অস্বাভাবিক ধুকপুকানি শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে কড়া নাড়ছে। অবনত হয়ে এলো মুখশ্রী। তূর্ণ আরেকটু ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়ালো। দু’জনের গাত্র প্রায় ছুঁই ছুঁই। মানুষটির বাম হাতটি ঠেকে দেয়ালে। ধীরজ গতিতে মৃদু ঝুঁকে গেল তূর্ণ। অধর ঠেকালো মাইরা’র কর্ণ কুহরে। তপ্ত শ্বাসের বহরে কম্পিত হলো কোমল কায়া। ঘোর লাগানো স্বরে তূর্ণ বলে উঠলো,

” পিছু হটে কি লাভ বিবিজান? আপনার শুরু এবং অন্তে যে একজনারই অস্তিত্ব বিদ্যমান। সে কে জানেন তো? তূর্ণ। আপনার একান্ত তূর্ণ। ”

একান্ত তূর্ণ! ছোট্ট দু’টো শব্দে মোহাচ্ছন্ন হলো মেয়েটি! হৃদযন্ত্রটি দ্রুতবেগে স্পন্দিত হতে লাগলো। কর্ণ পাতায় অনুভূত হলো অধর স্পর্শ। নিমিষেই মুদিত হলো মায়া মায়া আঁখি পল্লব। শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে পৌঁছালো সম্মোহনী ডাক,

” মাইরা! চোখ মেলে তাকাও। আমার চোখে চোখ রাখো। তাকাও না মাইরা। ”

সম্মোহনী সে ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলো না কোমল হৃদয়। আস্তে ধীরে আঁখি পল্লব মেলে তাকালো দুয়া। অবনত মুখশ্রী স্বল্প উঁচু হলো‌। তার পানেই ব্যাকুল চাহনিতে তাকিয়ে ছিল মানুষটি। নয়নে নয়ন মিলিত হতেই তার অধর কোণ কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো। ঝলমলে হলো বদন। তা লক্ষ্য করে মেয়েটির দু কপোল তপ্ত হলো। মুখখানি অবনত করতে উদ্যত হতেই বাঁধাপ্রাপ্ত হলো। বাঁ কপোল এখন পুরুষালি হাতের আঁজলায়। কপোলের কোমল আবরণে ঠেকে বৃদ্ধাঙ্গুল। বাকি চারটে আঙ্গুল কানের পেছনে গলিয়ে। মুখখানি উঁচু করে নিজ বরাবর নিলো তূর্ণ। বৃদ্ধাঙ্গুল আলতো করে বুলিয়ে চলেছে কপোলে। শিরশিরানি অনুভূত হচ্ছে মেয়েটির শিরায় শিরায়। নিভু নিভু করছে আঁখি। তূর্ণ হৃদয়ের অন্তঃস্থল হতে এ মুহুর্তটুকু অনুভব করতে লাগলো। মায়াবী মুখখানিতে আচ্ছন্ন হলো বারংবার। মায়া মায়া আঁখি, সুডৌল নাসিকা, নে”শাক্ত ওষ্ঠাধর। সবেতে বেকাবু পৌরুষ চিত্ত। নিজেকে সামলানো দায়। আজ আর লুকানো অনুরক্তি অন্তরালে রাখলো না। নিভৃতে মুখখানা একটু ঝুঁকিয়ে নিলো তূর্ণ। ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিলো ললাটের মধ্যিখানে। অতঃপর একটু নিম্নে এলো। সুডৌল নাকে বসালো ওষ্ঠ চাপ। ওষ্ঠের ছোঁয়া ধীরে ধীরে আরো নিম্নে ধাবিত হলো। কোমল ওষ্ঠে কিঞ্চিৎ স্পর্শ করলো পুরুষালি ওষ্ঠ। তরঙ্গ বয়ে গেল মেয়েটির হৃদ গহীনে। তৎক্ষণাৎ বেসামাল নিজেকে সামলাতে ঠাঁই নিলো প্রশস্ত সুঠাম বক্ষপটে। দু হাতে আঁকড়ে ধরলো অর্ধাঙ্গের পৃষ্ঠদেশ। তৃপ্তির আভা ছড়িয়ে পড়লো মানুষটির বদনে। সে-ও দু হাতে আবদ্ধ করে নিলো সঙ্গিনীর কায়া। একে অপরের সনে লেপ্টে অতিবাহিত হলো কিছু অবর্ণনীয়-মোহনীয় মুহূর্ত!

দিবাকরের আলোয় উজ্জ্বল চারিপাশ। ইন্টারলেকেন এর ঘাসে ভরা সবুজ অঞ্চল। পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ। তূর্ণ এবং দুয়াও দাঁড়িয়ে। তূর্ণ জুতো পড়ে নিচ্ছে। একজন নিয়োজিত ব্যক্তি দুয়া’র মাথায় হেলমেট পড়িয়ে দিচ্ছে। দুয়া ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দে পড়ছে দোয়া দরুদ। ভয় হচ্ছে কিনা! দুরুদুরু করছে বুক। স্বল্প সময়ের মধ্যেই দু’জনে রেডি। পাইলট ওদের দুজনকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে ইংরেজিতে শুধালো,

” আর ইউ গায়েজ রেডি? ”

তূর্ণ এবং দুয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। দুয়া অবশ্য ভীত নজরে স্বামীর পানে একবার তাকিয়েছে। তূর্ণ তা লক্ষ্য করে মাইরা’র পানে এগিয়ে এলো। কপোলে ডান হাতটি রেখে মিহি স্বরে বললো,

” ডোন্ট ওয়ারি দুয়া। আমরা সবাই আছি তো। ইনশাআল্লাহ্ খুব মজা পাবে। তোমার না প্যারাগ্লাইডিং করার খুব ইচ্ছে? তবে আজ কেন ভয় পেয়ে পিছু হটছো? বি ব্রেভ। ভয়কে জয় করো। এনজয় দ্যা মোমেন্ট। ”

দুয়া কপোলে রাখা হাতটির ওপর হাত রাখলো। মৃদু স্বরে শুধালো,

” আ আমরা পারবো তো? ”

” ইনশাআল্লাহ্। ”

ললাটে ওষ্ঠের ছোঁয়া পেয়ে মেয়েটি লাজুক হাসলো। বড় দম ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করলো। প্রস্তুত তারা প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্য। প্যারাগ্লাইডিং হলো ফ্লাইং প্যারাগ্লাইডারদের বিনোদনমূলক এবং প্রতিযোগীতা মূলক দুঃসাহসিক খেলা; হালকা ওজনের, মুক্ত-উড়ন্ত, পায়ে লঞ্চ করা গ্লাইডার এয়ারক্রাফ্ট যার কোন শক্ত প্রাথমিক কাঠামো নেই। পাইলট একটি জোতা নিয়ে বসে থাকে বা ফ্যাব্রিক ডানার নিচে ঝুলে থাকা কোকুন-সদৃশ ‘পড’-এ শুয়ে থাকে। ডানার আকৃতি সাসপেনশন লাইন, ডানার সামনের অংশে প্রবেশকারী বায়ুর চাপ এবং বাইরের দিকে প্রবাহিত বায়ুর বায়বীয় শক্তি দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

তূর্ণ এবং দুয়া পাশাপাশি দু’টো গ্লাইডার এয়ারক্রাফ্টে বসে। ওদের পেছনে পাইলট। আস্তে ধীরে সমস্ত ফর্মালিটিজ পূরণ করে দিগন্তে উড্ডয়ন করলো এয়ারক্র্যাফ্ট দু’টো। ভয়ে-আতঙ্কে তৎক্ষণাৎ আঁখি পল্লব বন্ধ করে নিলো দুয়া। রুদ্ধ হয়ে এলো শ্বাস প্রশ্বাস। ঘন ঘন দোয়া দরুদ পাঠ করতে লাগলো মেয়েটি। ততক্ষণে তারা বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে। হঠাৎ কর্ণ কুহরে পৌঁছালো জোরালো কণ্ঠস্বর,

” ওপেন ইওর আইস দুয়া! ”

অর্ধাঙ্গের কণ্ঠ। ফেলতে পারলো না মেয়েটি। দোয়া পাঠ করতে করতে আস্তে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। নিম্ন দৃশ্য অবলোকন করে চিৎকার করে উঠলো। পেছন হতে পাইলট ওকে শান্ত করতে চাইছে। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। তখন এগিয়ে এলো তূর্ণ। ইন্টারলেকেন এর দিগন্তে জোরালো কণ্ঠে নিজ মাইরা’কে সাহস সঞ্চয় করতে সহায়তা করলো সে। আস্তে ধীরে স্বাভাবিক হলো দুয়া। তূর্ণ’র অনুপ্রেরণায় সে-ও একসময় আনন্দে আত্মহারা হলো‌। জোরে জোরে প্রকাশ করতে লাগলো উচ্ছসিত ধ্বনি। তা প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো আকাশে বাতাসে।

ইন্টারলেকেনের একটি অবিস্মরণীয় প্যারাগ্লাইডিং অ্যাডভেঞ্চারে শ্বাসরুদ্ধকর সুইস আল্পস উপভোগ করে চলেছে তূর্ণ দুয়া যুগল। এখানে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রত্যয়িত পাইলটরা নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ ফ্লাইট নিশ্চিত করার জন্য সম্পূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে থাকে।

বাতাসের অতুলনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মাউন্ট আইগার, মঞ্চ এবং জংফ্রাউ-এর মতো আইকনিক সুইস পর্বতগুলির অত্যাশ্চর্য দৃশ্যে বিস্মিত হয়ে চলেছে দুয়া! ভয়ডর ভুলে উপভোগ করছে অতুলনীয় সৌন্দর্য। আকাশ পথে যেন হেঁটে যাচ্ছে এই কপোত কপোতী। ব্রিয়েঞ্জ এবং থুনের ফিরোজা নদী দ্বারা বিভক্ত ইন্টারলেকেনের বিস্ময়কর দৃশ্যে ভিজে যাচ্ছে তাদের অন্তঃস্থল। এক বিস্ময়কর এবং মন্ত্রমুগ্ধকর প্রভাব তৈরি হচ্ছে মানসলোকে। সুইস আল্পসের মধ্য দিয়ে একটি অবিস্মরণীয় যাত্রা। যা সারাজীবনের জন্য গেঁথে রইবে স্মৃতির পাতায়।

প্যারাগ্লাইডিং শেষে সুস্থ সবল দেহে সবুজের বুকে নেমে এলো তূর্ণ, দুয়া। খুশিতে মেয়েটি আত্মহারা। অধরে লেপ্টে মায়াবী অমূল্য হাসি। তাতে তৃপ্ত তূর্ণ। ওরা সমস্ত ফর্মালিটিজ পূরণ করে হাতে হাত রেখে এগোতে লাগলো। সেথা হতে কিছুটা দূরে নীরব স্থান বেছে নিলো। বসলো পাহাড়ের বুকে। তূর্ণ’র বুকে লেপ্টে মেয়েটির পৃষ্ঠদেশ। পুরুষালি শক্তপোক্ত দু হাতে আবদ্ধ দুয়া। ওর ডান কাঁধে মানুষটির থুতনি ঠেকে। দুয়া খুশিমনে দু হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে উচ্ছসিত কণ্ঠে বলতে লাগলো,

” অসাম! আমেজিং। আমি বলে বোঝাতে পারবো না এই মুহূর্তে ঠিক কি ফিল করছি। তুমি। তুমি বুঝতে পারছো তো আমি কি বলতে চাইছি? আমার খুব খুব ভালো লেগেছে। এমন অনুভূতি কখনো হয়নি। আকাশের বুকে তুমি আমি। নিচে ইন্টারলেকেন। উফ্। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ছিল। একদম মনোমুগ্ধকর! এজন্য তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। থ্যাংকস অ্যা লট স্বামী সাহেব। ”

স্বামী সাহেব! নিঃশব্দে হাসলো তূর্ণ। অর্ধাঙ্গীকে গাঢ় বাঁধনে আবদ্ধ করে মৃদু স্বরে বললো,

” কিন্তু আমার যে থ্যাংকস বিহীন ভিন্ন কিছু চাই। ”

” কি চাই? ”

উত্তর না পেয়ে মুখখানি ডানে আনলো দুয়া। স্বামীর চোখে চোখ পড়লো। হলো অব্যক্ত আলাপণ! চোখের সে ভাষা মেয়েটি বুঝতে সক্ষম হলো। আজ এমন আনন্দঘন মুহূর্তে স্বামীর ইচ্ছে অপূর্ণ রাখতে মন সায় দিলো না। তাই তো নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে সাহসী হলো মেয়েটি।

সুগভীর নয়নে মিলিত মায়াবী নয়ন। ডান হাতে আঁকড়ে ধরলো উদরে রাখা অর্ধাঙ্গের হাতটি। বাঁ হাতে স্বামীর কপোল ছুঁলো। আস্তে করে অগ্রসর হলো। কোমল ওষ্ঠাধর স্পর্শ করলো একান্ত ব্যক্তিগত মানুষটির বাম কপোলে। আবেশে সিক্ত হলো তনুমন। উদরে অনুভূত হলো পুরুষালি হাতের মৃদু চাপ। ইন্টারলেকেনের বুকে সে এক মিষ্টিমধুর মুহূর্ত!

হসপিটালে কেবিনে উপস্থিত বন্ধুমহল। বেডে বালিশে হেলান দিয়ে বসে নিশাদ। মাথায় ব্যান্ডেজ। পাশে বসে থাকা দিবা ওকে ফল খাইয়ে দিচ্ছে। টগর কতক্ষন আর নীরব রইবে? অবশেষে মুখ খুললো।

” দোস্ত? ঘটনা তো ঘইট্টা গেছে‌। শুনছোছ? ”

দিবার হাতে থাকা ফলের টুকরো মুখে দিয়ে নিশাদ জিজ্ঞাসু নয়নে তাকিয়ে রইলো। মানে কি ঘটনা? টগর দাঁত কেলিয়ে হাসলো।

” তোমারে হসপিটাল কে আনছে জানো না? ”

” কে এনেছে? ”

রাজীব এবং টগর একসাথে বললো,

” কে আবার? তৃষা। ”

নিশাদ হতভম্ব! মুখে থাকা ফল অবহেলায় পড়ে রয়েছে। বেচারা চিবোতে ভুলে গেছে যে। নিশাদ শুকনো ঢোক গিললো। মৃদু স্বরে নামটুকু উচ্চারণ করলো,

” তৃ ষা! ”

টগর হাসিমুখে বললো,

” হ রে ভাই হ। তৃষা। তূর্ণ বন্ধুর বুইন তৃষা। চিনো নাই? ”

নিশাদ বন্ধুদের দিকে একপলক তাকালো। চোখের ইশারায় কথাটার সত্যতা জানতে চাইলো। মনিকা মুচকি হেসে বললো,

” সত্যি এটা। তৃষা আর ওর দুই বন্ধু ই তোকে এখানে এনেছে।”

দানিশ প্রশ্ন করলো,

” এবার তুই বল তো। তোর অ্যাক্সিডেন্ট হলো কি করে?”

নিশাদ নীরবে ফল খেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

” অফিস থেকে ফিরছিলাম। ফাঁকা রাস্তা। স্পিড বেশি ছিল। হঠাৎ উল্টো দিক থেকে একটা গাড়ি ধেয়ে এলো। আমি কিছু বোঝার আগেই ওটা আমার পথে বাঁধা সৃষ্টি করলো। প্রাণ বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে গাড়িটা সাইডে নেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হলো। গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো গাড়ির। ”

নিশাদ আর বলতে পারলো না। বড় শ্বাস ফেলে বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে রইলো। শরীর মন কোনোটাই ভালো লাগছে না। ওই একটা নাম শোনার পর থেকে ছন্নছাড়া লাগছে। দিশেহারা হয়ে পড়ছে হৃদয়। রাজীব বাজে একটা গা লি দিলো।

” এইসব স্ক্রাউন্ডে* জন্য ই দেশে অ্যাক্সিডেন্টের পরিমাণ এত বেশি। চোখে পট্টি বাইধা গাড়ি চালায়। আর উল্টো দিকে ঠুকে দেয়। শা*। ”

দিবা ওকে শান্ত করতে বললো,

” রাজীব মুখ খারাপ করিস না। শান্ত হ। ”

আড়চোখে দিবার দিকে তাকালো রাজীব। তপ্ত শ্বাস ফেলে কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে নিলো। দানিশ এবার বললো,

” তৃষা বাচ্চা একটা মেয়ে হতে পারে। তবে বেশ দায়িত্ববোধ আছে তাই না? ও যেমন বাচ্চামো করে সেখানে কালকে ওর আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপ্রত্যাশিত। ”

” হুম। তবে বাচ্চা মেয়ে বলো না। এখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। ক’দিন পর বিয়েশাদী করে কারো ঘরনী হবে। এখনো বাচ্চা আছে নাকি? ”

নিশাদের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছে করে বিয়ের কথা বললো মনিকা। উদ্দেশ্য সফল হলো বটে। বিয়ের কথা শুনতেই কেমন বদলে গেল নিশাদের অভিব্যক্তি। চুপিসারে হাসলো মনিকা। তার মানে সে ভুল নয়। সঠিক ভাবনাই আঘাত হেনেছে! আরেক বন্ধুও বোল্ড আউট! হা হা হা।

চলবে.#তুমি_হৃদয়ে_লুকানো_প্রেম
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#পর্ব_৩৫

” অ্যাই তুমি কি ম্যারাথনে নাম দিয়েছো? এত জোরে ছুটছো কেন? আরে বাবা একটু আস্তে হাঁটো না। ”

তূর্ণ’র পিছু একপ্রকার ছুটছে মেয়েটা। মহাশয় তো বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দুয়া! খরগোশ এবং কচ্ছপের সেই কাহিনীর মতো পেছনে পড়ে গেছে। তাই তো বিরক্ত তনুমন। শেষমেষ বিরক্তি প্রকাশ করে বলেই ফেললো কথাগুলো। তূর্ণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বললো,

” ট্রেন জার্নি করতে চাইলে দ্রুত পা চালান বিবিজান। এমনিতেই লেট হয়ে গেছে। আরেকটু হলেই ট্রেন মিস। ”

তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানালো দুয়া।

” এই না না। মিস হতে যাবে কেন? আমরা চলে এসেছি তো। হাঁটো। জোরে জোরে হাঁটো। ইনশাআল্লাহ্ ঠিক পৌঁছে যাবো।”

স্বামীর হাত ধরে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো মেয়েটি। মৃদু হাসলো তূর্ণ।
.

লাল রঙের ট্রেন, উপরিভাগ তার হলদে। ছোট ট্রেনটি যাত্রা শুরু করলো ওয়াইল্ডার্সউইল হতে। ট্রেনের কেবিন আপাতদৃষ্টিতে ফাঁকা। লোকজন তেমন নেই। লম্বাটে সিটে জানালা সংলগ্ন বসে দুয়া। চোখেমুখে তার অপার মুগ্ধতা! কৌতূহল। স্বল্প গতিতে চলতে শুরু করলো ট্রেনটি। আশপাশে সবুজ আর সবুজ। বৃক্ষরাজিতে ভরপুর। দুয়া’র হাতে মোবাইল। ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ হচ্ছে এই অসীম মুগ্ধকর দৃশ্য! পাশেই বসে তূর্ণ। তার চোখেমুখেও মুগ্ধতা! তবে তা শুধুমাত্র মাইরা’র তরে। তার মোহাচ্ছন্ন চাহনি নিবদ্ধ মাইরা’তে! হালকা পবনে এলোমেলো কেশ। অধর কোণে লেপ্টে মোহনীয় দ্যুতি। ফোলা ফোলা কপোলে লালিমা মাখা। মায়াবী আঁখি যুগলে খুশির ছাপ! ঝঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে পুরুষালি হৃদয়ে।

ওয়াইল্ডার্সউইল হতে রওনা হওয়ার পর ট্রেনটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে লাগলো লুটশিন নদীর দিকে। আস্তে ধীরে নদীটি পার হতে লাগলো। দুয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে জানালার সঙ্গে আরো মিশে যায়। উপভোগ করতে থাকে লুটশিন নদীর সৌন্দর্য! দুয়া যখন লুটশিনে মগ্ন হঠাৎ থমকে গেল। অতি সন্নিকটে অনুভব করতে পারলো একান্ত মানুষটিকে। গলদেশের উন্মুক্ত স্থানে আঁকিবুঁকি করে চলেছে তপ্ত শ্বাস। উদরে পুরুষালি হাতের অস্তিত্ব। মেয়েটি আবেশে শিহরিত হতে লাগলো বারংবার। ডান হাতে ট্রেনের দেহ তো বাঁ হাতে আঁকড়ে ধরলো পরিহিত পোশাক। উপলব্ধি করতে লাগলো আস্তে আস্তে করে বাঁ কাঁধ হতে সরে যাচ্ছে কেশগুচ্ছ। সেথায় জায়গা করে নিচ্ছে একান্ত জন। কাঁধের উন্মুক্ত স্থানে ছুঁয়ে যেতে লাগলো নে.শালো ওষ্ঠ। উদরে চলাচল করছে মানুষটির ডান হাত। মা.দকতায় আচ্ছন্ন স্পর্শে খেই হারালো দুয়া। অবশ হলো তনুমন। আস্তে ধীরে মানুষটির প্রশস্ত-সুঠাম বক্ষপটে নিজের ভর ছেড়ে দিলো। নিমীলিত হলো নেত্রপল্লব। অনুভব করতে লাগলো প্রতিটি স্পর্শ, তার গভীরতা!

ট্রেনটি লুটশিন নদী অতিক্রম করে তৃণভূমিতে উঠলো। প্রবেশ করলো ঘন জঙ্গলে। ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত স্থানটি। তন্মধ্য দিয়ে ইন্টারলেকেন এবং লেক থুন দেখার জন্য কিছু জায়গায় উঁকি দিলো তূর্ণ, দুয়া যুগল। বন ছেড়ে যাওয়ার পরে ট্রেনটি ছোট মধ্য-স্টেশন ব্রিটলাউয়েনেন এর চারপাশে ঘূর্ণায়মান তৃণভূমিতে প্রবেশ করে। এই ব্রিটলাউয়েনেন, ওয়াইল্ডার্সউইলের স্টেশন থেকে প্রায় এক হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত।

অতঃপর ট্রেনটি স্কিনিজ প্ল্যাটে আরোহণ করে। শেষ সময়ে অনেকগুলি টানেল এবং চিত্তাকর্ষক দৃশ্য অতিক্রম করে। ঐতিহাসিক রেলপথ, চোয়াল ড্রপ করার দৃশ্য, প্যানোরামা ট্রেইল এবং আরাধ্য আলপাইন ফুল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তূর্ণয়া যুগল এই পঞ্চাশ মিনিট স্থায়ী যাত্রা পুরোদমে উপভোগ করলো। সেই সঙ্গে কাটলো ছোটখাটো খুনসুটি।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩২২ মিটার উপরে অবস্থিত, হার্ডার কুল্ম। ইন্টারলেকেনের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। এই পর্বতশৃঙ্গটি ফটোগ্রাফার, গুরমেট, হাইকার এবং প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য আদর্শ গন্তব্য। এখান থেকে দর্শনার্থীরা সমগ্র জংফ্রাউ অঞ্চলের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে পারবে।

অপরাহ্ন প্রহর। তূর্ণর হাতে বন্দি অর্ধাঙ্গীর কোমল হাতটি। দু’জনে পৌঁছালো হার্ডার কুলম ফানিকুলারের ভ্যালি স্টেশনে। এই স্টেশনটি মধ্য ইন্টারলেকেন এবং ইন্টারলেকেন অস্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে নদীর ওপারে অবস্থিত। তূর্ণ, দুয়া সহ অসংখ্য দর্শনার্থী প্রস্তুত। যাত্রা শুরু করলো ফানিকুলার টি। ইন্টারলেকেনের শক্ত কুল্ম থেকে ফানিকুলার হার্ডারবাহন যাত্রায় প্রায় দশ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ে ফানিকুলারের পিছনের জানালা থেকে উপত্যকার সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তেমনটি করলো তূর্ণ, দুয়া এবং কিছু দর্শনার্থী। সকলেই বিমোহিত উপত্যকার সৌন্দর্যে! ফানিকুলারটি অতি দ্রুতবেগে ধেয়ে যাচ্ছে। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেল সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে অতি উঁচুতে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো দুয়া।

” আল্লাহ্! বাঁচা গেল। কি দ্রুত চলছিল এটা। ”

তূর্ণ কিছু বললো না। মুচকি হাসলো শুধু। হাতে হাত রেখে ওরা ফানিকুলার ত্যাগ করলো। সরু পাহাড়ি পথ ধরে অগ্রসর হতে লাগলো গন্তব্যে। জায়গাটা কেমন ভীতিকর! বামে বিশাল খাদ তো ডানে দৈ-ত্যকায় পাহাড়। ওরা সাবধানতা অবলম্বন করে হাঁটতে লাগলো। অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেল কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। হার্ডার কুলম্।

তূর্ণ, দুয়া যখন শিখরের কাছে পৌঁছালো তখন প্যাগোডার মতো একটি কাঠামো দেখতে পেল। দুয়া কৌতুহলী দৃষ্টিতে সেথায় তাকিয়ে রইল। মৃদু স্বরে শুধালো,

” আচ্ছা এটা কি? সে-ই বিখ্যাত রেস্তোরাঁ? ”

তূর্ণ জবাব দিলো,

” হাঁ। এটা প্যানোরামা রেস্তোরাঁ হার্ডার কুলম। যেখানে একশো জন অতিথির জন্য একটি ডাইনিং রুম এবং একটি সূর্যের ছাদ রয়েছে যেখানে আরও চল্লিশ জন দর্শনার্থী খাবার, স্ন্যাকস, পানীয় এবং মাঝে মাঝে সিগার এবং হুইস্কির স্বাদ গ্রহণের মতো অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে৷ ”

” আচ্ছা। বুঝলাম। কিন্তু কারো যদি খিদে না পায়? তাহলে? ”

তূর্ণ ওর গালটা টিপে দিলো। হেসে বললো,

” যদি ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত না হয় কোন সমস্যা নেই। শুধু দেখার বারান্দার দিকে যাবে আর প্রকৃতির প্যানোরামা উপভোগ করবে। ”

” চমৎকার! আমার তো খিদে পায়নি। তোমার পেয়েছে? ”

” উঁহু। ”

দুয়া গদগদ কন্ঠে বললো,

” তাহলে দেরি কিসের? লেটস্ এক্সপ্লোর দ্যা বিউটি অফ হার্ডার কুলম্। ”

” ইয়াহ্। ”

ওরা পৌঁছে গেল উঁচু শিখরের চূড়ায়। নৈসর্গিক শিখরটি অসাধারণ জংফ্রাউ অঞ্চলের সবচেয়ে দর্শনীয় দৃশ্যের কিছু অফার করে। এক পাশে লেক ব্রিয়েঞ্জ আরেক পাশে লেক থুন। মধ্যখানে ইন্টারলেকেন। দুই লেকের মধ্যিখানে শহরটি অবস্থিত বলেই এর নামকরণ হয়েছে ইন্টারলেকেন। দুয়া হাঁটতে হাঁটতে উন্মুক্ত সে বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,

” মাশাআল্লাহ্! আল্লাহ্’র সে কি অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য! চমৎকার! ”

মেয়েটি বিমোহিত হয়ে বেলকনি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। পিছু পিছু সঙ্গী তূর্ণ। ক্যামেরা বন্দি হলো অসংখ্য দৃশ্য। সে একেকটি অপরূপ, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য! অপরাহ্ন প্রহরের লালচে কমলা দিগন্ত। নিম্নে দুই লেকের মধ্যিখানে ইন্টারলেকেন শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এতটা উঁচুতে অবস্থিত তূর্ণ, দুয়া যুগল। বিমুগ্ধ চাহনিতে উপভোগ করতে লাগলো হার্ডার কুলম্ এর সবটুকু সৌন্দর্য।

ইন্টারলেকেন যেন একটি পাখির চোখের দৃশ্য এবং লেক ব্রিয়েঞ্জ এবং লেক থুনের মধ্যে বাসা বাঁধার এলাকা। দুটি পান্না-সবুজ হ্রদ, আল্পাইন চূড়া দ্বারা বেষ্টিত। এছাড়া মুকুট গৌরব – আইগার, মঞ্চ এবং জংফ্রাউ-এর বিস্ময়কর চূড়াগুলির একটি নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্য!

সুরকার ফেলিক্স মেন্ডেলসোহন কবি আইচেনডর্ফের কথাগুলিকে সঙ্গীতে সেট করার পর থেকে দ্য হার্ডার তার কোনো জাদুকরী আকর্ষণ হারায়নি: “হে মহিমান্বিত বন, কে তোমাকে সেখানে রোপণ করেছে এত উপরে?” একশো বছর আগে মেন্ডেলসোহন পায়ে হেঁটে সুমিটে পৌঁছেছিলেন। একই পথ ধরে একই কাঠের মধ্য দিয়ে, যা আজও ব্যবহার করা হচ্ছে। দর্শকরা এখন এটিকে অনেক সহজে নিতে পারে এবং নস্টালজিক ফানিকুলার রেলপথের মাধ্যমে শীর্ষে ভ্রমণ করতে পারে।

কাঠের শিখর চূড়ায় দাঁড়িয়ে তূর্ণ। দু হাত দু’দিকে ছড়িয়ে রাখা। মধ্যখানে বুকের সঙ্গে লেপ্টে তার মাইরা। তার হাত দুটোও ছড়িয়ে রাখা স্বামীর হাতের সনে। আঁখি পল্লব মুদিত করে তারা উপভোগ করতে লাগলো দি হার্ডার কুলম্। দেহে ছুঁয়ে যেতে লাগলো সতেজ হাওয়া। প্রশান্তি অনুভব করলো হৃদয়ে। এত সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য! স্রষ্টার অকৃত্রিম সৌন্দর্য সঙ্গে একান্ত ব্যক্তিগত জন। এ এক সুখময় মুহূর্ত। সুখে
ম র ণ হয়ে না যায়! দু’জনের চোখেমুখেই তৃপ্তির আভা। এই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করলো এক আগন্তুক। ওদের অনুরোধেই সে এই প্রেমপূর্ণ দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে দিলো।

তমসায় আবৃত ধরিত্রী। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দুয়া। পড়নে পাতলা উষ্ণ পোশাক। তাতে শীতার্ত ভাব নিবারণ করা মুশকিল। দেহে ছুঁয়ে যাচ্ছে শীতল পবন। তবুও নড়লো না মেয়েটি। সে যে মগ্ন চিন্তায়। একান্ত মানুষটির চিন্তার চাদর আচ্ছাদিত করে রেখেছে তারে। মানসপটে বারংবার ভেসে আসছে সেই মানুষটি। যার জন্যি সুমধুর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় হৃৎযন্ত্র। যার একটুখানি সান্নিধ্যে বুজে আসে আঁখি পল্লব। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি ক্রমশ করে ওঠানামা। সেই মানুষটির নয়ন সাগরে সে যে আজকাল বিনা সাঁতার জানা জীবের ন্যায় হাবুডুবু খেয়ে চলেছে। নিজেকে হারিয়ে ফেলছে প্রতিনিয়ত। আজকাল মানুষটি আর কোনোরূপ সীমা মান্য করে না। হুটহাট খুব করে সান্নিধ্যে আসে। তাকে নে.শাতুর কিছু ছোঁয়ায় মুড়িয়ে আবার হারিয়ে যায়। মানুষটি কি বোঝে না তার এই পবিত্র-নে’শাক্ত ছোঁয়াটুকু মেয়েটির হৃদয় কতখানি বেসামাল করে তোলে? করে বেকাবু! বোঝে না তো। বুঝে থাকলে এমনটি করতো না। তাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্পর্শে দিশেহারা না করে সম্পূর্ণ রূপে নিজের করে নিতো‌। নিজ অস্তিত্বে মিশিয়ে নিতো এই কোমল প্রাণটিকে। একান্ত সে মানুষটি সত্যিই অবুঝ। তাই তো অপেক্ষার প্রহরে দাঁড় করিয়ে পরীক্ষা করছে সঙ্গিনীর ধৈর্য্যের বাঁধ। তবে সে-ই বাঁধ ভাঙতে বুঝি আর দেরি নেই। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে।

দুয়া যখন নিজস্ব মানুষটির চিন্তায় মগ্ন। তখন কক্ষ হতে কয়েকবার ডেকে উঠেছে তূর্ণ। কিন্তু কোনোরূপ সাড়া না পেয়ে বেলকনিতে এলো সে। চিন্তামগ্ন মাইরা’কে ফট করে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। হকচকিয়ে গেল মেয়েটি। তড়িৎ দু হাতে গলা আলিঙ্গন করে বললো,

” কি করছো কি? ছাড়ো। ”

হাঁটতে হাঁটতে তূর্ণ বললো,

” ছাড়বো। আজকের জন্য স্পেশাল ছাড়। তবে..! কে বলতে পারে? আগামী রজনী হতে হয়তো কোনোরূপ ছাড় মিলবে না। সো বি প্রিপেয়ার্ড বিবিজান। ”

মানুষটির দুষ্টু কথা বোধগম্য হলো না মেয়েটির। সে ততক্ষণে বিছানায় শুয়ে। বালিশে ঠেকে মাথা।

” তুমি কি বলছো কিছুই বুঝলাম না। ক্লিয়ার করে বলবে কি?”

তূর্ণ বেলকনির দ্বার বদ্ধ করতে করতে বললো,

” বেশি বুঝে লাভ নেই। চটাপট ঘুমিয়ে পড়। আগামীর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাক। ”

কিছুই বোধগম্য হলো না। চিন্তিত দুয়া’র পাশে শয্যা গ্রহণ করলো তূর্ণ। নিভিয়ে দিলো আলো। আঁধারে দুয়া অনুভব করলো মানুষটির স্পর্শ। তাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিয়েছে। ললাটের কার্নিশে অধর ছুঁয়ে আদুরে কণ্ঠে বললো,

” গুড নাইট বিবিজান। ”

দিবাকরের আলোয় উজ্জ্বল বসুন্ধরা। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সাজেদা। হাতে ফটোফ্রেম। স্বামী, দুই সন্তান এবং সে। কতটা সুখ, আনন্দ মিশ্রিত ফটোতে। ফটোটা তোলা হয়েছে তখন তানু’র বয়স মাত্র দুই। দ্বিতীয় জন্মদিন উপলক্ষে তারা সিলেট ভ্রমণে গিয়েছিল। সেথায় তোলা এই ফ্যামিলি ফটো। মানুষটির অধর কোণে খুশির ছাপ। কতটা সুদর্শন লাগছে! হয়তো সে শ্যামবর্ণের। তবে সৌন্দর্যের কমতি ছিল না। সে-ই সৌন্দর্য হয়তো সবার চোখে পড়ে না। শুধুমাত্র যারা মনের চক্ষু দিয়ে অবলোকন করে তারাই দেখতে পায়। উনিও তো দেখতে দেরি করেছিলেন। ওনার মন যে বিভোর ছিল মাসুদের নকল, ভ*য়ঙ্কর সৌন্দর্যে। তাই তো উনি স্বামী, সংসারের মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে এতটা দেরি করে ফেললেন। তবে সহায় ছিল স্রষ্টা। তাই তো উনি অল্পতেই ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। স্বামী সন্তান নিয়ে অতিবাহিত করেছিলেন অজস্র সুখময় মুহূর্ত। একসাথে পাড় করলেন কতটা বছর! মানুষটি হয়তো আজ আর সাথে নেই। তবে তার ভালোবাসা, যত্ন এখনো হৃদয়ে গেঁথে। ছেলেটাও বাবার মতো হয়েছে। যত্নশীল। খুব করে আগলে রাখতে জানে। ভালোবাসতে জানে। হয়তো ওনার ভুলে ছেলে আজ ভালোবাসা হারা। তবে উনি তা সইবেন না। সবটা ঠিক করে ফেলবেন ইনশাআল্লাহ্। ওনার জাবিরের জন্য মিষ্টি একটা বউ আনবেন। সংসারী হবে ওনার ছেলেও। হাঁ। ওনার তো শরীর ভালো না। ডক্টর কিসব চিকিৎসা করছে। উনি একটু সুস্থ হলেই ভাইকে বলবেন। ওনার ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজতে। এরপর ছেলে, ছেলেবউ আর মেয়েকে নিয়ে উনি বাকি জীবন সুখে শান্তিতে কাটাবেন। সেখানে অবশ্য ভাই-ভাবি সব্বাই থাকবে। হুম। সবাই থাকবে। সুখে আচ্ছাদিত হবে বাকি জীবন। থাকবে না আর মিছিমিছি অপ্রাপ্তি।

চলবে.

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here