#তোর_নামেই_এই_শহর
#লেখিকা_সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_১৮
(৫১)
বিছানার এক পাশে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে হুরায়রা। সামনে একটা বেগুনী শাড়ি, মেচিং ব্লাউজ আর কিছু গয়না পড়ে আছে। একটু আগে ইয়াদ এসে সেগুলো রেখে গেছে। বাড়ির মেয়েরা সকলে একি রকম শাড়ি পড়ে তুরিনের ননদের গায়ে হলুদে যাবে। ইয়াদ সবার জন্য বেঁচে বেঁচে একি রকমের শাড়ি কিনে এনেছে ঠিকই তবে হুরায়রা জন্য আনা শাড়িটা বাকি সবার থেকে আলাদা। দোকানে ঢুকে প্রথমেই যে শাড়িটা তার নজর কেড়েছিল কোন ভাবনা চিন্তা না করেই সেটাই কিনে নিলো হুরায়রার জন্য। বাড়িতে এসে সবাইকে সবার টা বুঝিয়ে দিয়ে হুরায়রার শাড়িটা নিয়ে সে নিজে হুরায়রার ঘরে গেলো। পুরো ঘর অন্ধকার করে শুয়ে ছিলো হুরায়রা। ইয়াদের উপস্থিতি বুঝতে পেরেও নড়লো না একিভাবে শুয়ে থাকলো। ইয়াদ ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাতেই চোখ মুখ কুঁচকে নেয় সে। আলোতে বিরক্ত হচ্ছে বুঝাতে অন্য পাশ ফিরে শোয়। ইয়াদ কোন বাক্যালাপ না করেই সারাসরি হুরায়রা খাটের কাছে এসে দাঁড়ায়, হাতে থাকা প্যাকেটটা বিছানার এক পাশে রেখে বলে,
“শাড়ির সাথে যা যা লাগে সব এখানে রেখে গেলাম। দয়া করে নিজে নিজে পড়তে যাস না আবার না হয় দেখবি ঘর থেকে বের হয়ে গাড়ি অবধি পৌঁছাতে পৌঁছাতে পুরোটা খুলে গেছে।”
ইয়াদের কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতে শোয়া থেকে ধুপ করে উঠে বসে হুরায়রা। ইয়াদের হাতের দিকে একবার তাকিয়ে পাশে রাখা শাড়িটার দিকে নজর দেয়। বলে,
“আপনাকে তো বলি নি আমি ওখানে শাড়ি পড়েই যাবো আপনি আমার জন্য শাড়ি আনতে গেলেন কেনো?”
“বাড়ির সকলের জন্যই এনেছি তোর জন্য একা আনি নি।”
“একা আনেন নি ঠিকই কিন্তু সকলের থেকে আলাদা করে এনেছেন। আপনি হুমাশা, তিয়াশা, অরা ওদের জন্য একরকম আনলেন আর আমার বেলায় ভিন্ন কেনো?”
“তোকে এটাতে ভালো মানাবে তাই এনেছি।”
“আমি পড়বো না এই শাড়ি।”
ইয়াদ ভ্রু কিচকে তাকালো হুরায়রার দিকে। হুরায়রা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। ইতিমধ্যে তার চোখ নাক লাল হয়ে উঠেছে। ইয়াদ দেখেই বুঝতে পারলো এখনি হুরায়রার দু চোখ অঝোর ধারায় শ্রাবণ নেমে আসবে। হুরায়রা একবার ইয়াদের দিকে তাকালো তারপর আবার অন্য দিকে ফিরে বলল,
“আপনার দেয়া শাড়ি আমি পড়বো না। আপনি কি ভেবেছেন আমার কোন মান অপমান নেই?”
“এই তুই তখন থেকে বড্ড কথা বলছিস তো। কি হয়েছেটা কি? আজকাল দেখছি খুব মুখে মুখে কথা বলা হচ্ছে।”
“কেন আমি কি আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কথাও বলতে পারবো না। তাছাড়া আপনার দেয়া কোন কিছুই আমি নিবো না।”
হুরায়রার জোরগলায় বলা কথাগুলো ইয়াদ চুপচাপ শুনে গেলো। মেয়েটা হঠাৎ করে তার সাথে এইভাবে কথা বলছে কেন? হুরায়রা আর যাই করুক কখনো এমন জোরগলায় তার সাথে কথা বলে নি। ইদানীং সে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করছে হুরায়রার মধ্যে যা তাকে এক মুহূর্তের জন্য ভাবিয়ে তুলল। ইয়াদকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হুরায়রা আবার বলল,
“এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো। যান আমি তৈরি হবো।”
ইয়াদ নিজের মধ্যে কঠিনতা ধারণ করলেও সেটা প্রকাশ করলো না শান্ত গলায় বলল,
“শাড়িটা পড়ে রেডি হয়ে আয়। একটু পর গাড়ি ছাড়বে। শাড়ির সাথে মেচিং করে আন্ডার গার্মেন্টস রাখা আছে এখানে। মাপ মনে হয় না এদিক ওদিক হবে ঠিকটাই এনেছি। তারাতারি তৈরি হয়ে আয়।”
ইয়াদ চলে গেলে হুরায়রা কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এই লোকটা কি করে তার মাপ জানে ছিঃ। হুরায়রা বিছানা ছেড়ে উঠে তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয় ফিরে এসে বিছানার এক কোনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে। আজ যাই হয়ে যাক না কেনো ইয়াদের দেয়া শাড়িটা সে কিছুতেই পড়বে না। অনেক হয়েছে আর নয় এবার সে দেখে নিবে অবহেলার যন্ত্রণা ইয়াদ কি করে সহ্য করে।
বাড়ির সকলে ইতিমধ্যে গাড়িতে উঠে বসেছে। সামনের দুটোর একটিতে বাড়ির বড়রা অন্য একটিতে হুমায়রা, মালিহা, মেহেরিমা, হুমাশা এবং ইনান। সবার পেছনের গাড়িটাতে তিয়াশা, অরা পেছনে বসেছে আর সামনে নাবাদ। ইয়াদ গাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে হুরায়রার অপেক্ষা করছে। সামনের দুটো গাড়ির একটি ইতিমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে অন্যটাও দিবে এক্ষুনি অথচ হুরায়রা এখনো ঘর থেকে বের হয় নি। হুরায়রাকে দেরি করতে দেখে ইয়াদ একবার ভাবলো গিয়ে ডেকে আনবে পরোক্ষণে আবার কি ভেবে আর গেলো না। নাবাদ গাড়িতে বসা ছিলো জানালার কাচ নামিয়ে মাথা বের করে বলল,
“হুর এখনো কি করছে? এতক্ষণ লাগে একটা মেয়ে সাজতে।”
“আমিও তাই ভাবছি। বার বার বলে এসেছি তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিতে কিন্তু না। মেয়েটা দিনকে দিন অবাধ্য হয়ে উঠছে। নাহ আর অপেক্ষা করলে চলবে না আমি গিয়ে ডেকে আনছি।”
ইয়াদ যাবে বলে পা বাড়াতে গিয়ে দেখলো হুরায়রা নিজেই তৈরী হয়ে বেড়িয়ে আসছে। হুরায়রাকে বেড়িয়ে আসতে দেখে ইয়াদ জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। ইতিমধ্যে তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এসেছে। দেখেই বুঝা গেলো প্রচণ্ড রেগে গেছে সে। হুরায়রা এসেই বলল,
“সবাই উঠে পড়েছে গাড়িতে? কিন্তু আমি বসবো কোথায় গাড়িতে তো এক ফোঁটা জায়গা নেই।”
ইয়াদ রাগ সংযত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর জন্য ওই গাড়ি নয় এই গাড়ি। তিয়াশা অরার সাথে গিয়ে বস।”
হুরায়রা গলা বাড়িয়ে পেছনের গাড়িটা একবার দেখলো তারপর বলল,
“আমি এই গাড়ি করে যাবো না আপনি হুমাশাকে বলুন ওটাতে যেতে আমি মায়ের সাথে যাবো।”
হুরায়রার কথায় ইয়াদ নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলো ধমক দিয়ে বলল,
“সব ব্যাপারে তোকে মতামত দেয়া চাই। আমি যেহেতু বলছি এই গাড়ি করে যাবি তার মানে তুই এই গাড়ি করেই যাবি। মামিমা তোমাদের গাড়ি ছাড়তে বলো হুর আমাদের সাথে যাচ্ছে।”
হুরায়রা ইয়াদের দিকে তাকিয়ে নাক উঁচু করে ফেললো। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি আপনার সাথে কিছুতেই যাবো না।”
“না গেলে একা একা বাড়িতে থাক। তোকে আমাদের সাথে নিচ্ছি না।”
“মানে?”
“মানে বুঝতে পারছিস না? সব ই তো বুঝিস তাহলে এটার মানে বুঝছিস না কেনো।”
“আপনি আমার সাথে এমনটা করতে পারেন না।”
“আমি কি করতে পারি না সেটা অন্তত আমার থেকে তুই ভালো জানিস। যেহেতু আমার দেয়া শাড়ি পড়বি না বলে পড়িস নি সেহেতু আমার সাথে যেতে চাচ্ছিস না মানে যাবি না। ঠিক আছে তুই তাহলে একা একা বাড়ি পাহারা দে আমরা বরং যাই।”
বলেই ইয়াদ গাড়িতে উঠে বসলো। হুরায়রা কিচ্ছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
“ঠিক আছে আমি যাচ্ছি না তাহলে আপনারাই যান।”
নাবাদ তিয়াশা এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। বলল,
“কি হচ্ছে কি ইয়াদ তুমি কি ওকে সত্যি ফেলে যাবে নাকি। যদি তাই করো তবে আমাকেও রেখে যাও।”
“সত্যিই ভাইয়া তুমি ওর উপর রাগ দেখাচ্ছো কেন ছোট মানুষ কিছু বুঝে না। এই হুর তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বস।”
“তোমার ভাই আমার সাথে এমন করছে কেন জিজ্ঞেস করো নাবাদ ভাই। আমি কি করেছি।”
ইয়াদ বিনা বাক্যালাপে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কপালের কাছের সুরু রগ গুলো ধীরেধীরে ফুলে উঠছে। মেয়েটা তাকে রাগানোর জন্যই এমনটা করছে। ইয়াদ একবার আড় চোখে হুরায়রার দিকে তাকালো। সাদা শাড়ি, আসমানি রঙের ব্লাউজ, হাতে এক গাছি আসমানি রঙের চুড়ি, খোঁপায় সাদা গোলাপ গুঁজে রেখেছে হুরায়রা। দেখে মনে হচ্ছে যেন একপুঞ্জ সাদা মেঘ ঘিরে রেখেছে তাকে।
(১৮ পর্ব অর্ধেক দিলাম। বাকি অর্ধেক কাল দিবো। লিখা শেষ করতে পারি না আর,আপনাদের নিরাশ করতে চাইনি সে জন্য আজ এতটুকুই পড়ুন। ধন্যবাদ।)