তোর মায়ায় আবদ্ধ পর্ব ৪

#তোর_মায়ায়_আবদ্ধ
#পর্ব_৪
#আঁধারিনী(ছদ্মনাম)

বিয়ের পর আপন মানুষ গুলোকে ছেড়ে নতুন জায়গায় আসার পর আবার যখন শুনতে পায় আপন মানুষ গুলোর সাথে আবার দেখা হবে তখন অন্যরকম অনুভূতি হয়।প্রতিটা মেয়ের কাছেই এই আনন্দটার কোনো তুলনা নেই।আমি আবারো বাবা অধরা আকাল ভাইয়া কাকা কাকিমার সাথে দেখা হবে ভাবতেই খুশীতে মন টা ভরে উঠছে।

আচ্ছা বাবারও কি আমার মতো এমন খুশী লাগছে?বাবা আসলেই নাহয় জিঙ্গেস করা যাবে।বাবারা আসতে এখনো ঘন্টা দুয়েক বাকি।দুপুরের নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে আজ এ বাড়িতে।ঘরেই আয়োজন করা হচ্ছে সব।কারণ মানুষ বেশি নাহ।আমার পরিবারের বাবাসহ ওই কয়জন।আর মিথিলা আপু তাঁর স্বামী আর আপু পাঁচ বছরের একটা ছেলে আসবে।মিথিলা আপু হচ্ছে শুভ্রের বড়বোন।এইজন মানুষ নিয়েই ঘরোয়া ভাবে আমার বউভাতের অনুষ্ঠান।আশেপাশের আরো কয়েকজন আত্মীয় স্বজনও আছে অবশ্য। মিহি ওর কয়েকজন বান্ধবীকেও ইনভাইট দিয়েছে।

বলতে গেলে রান্নাঘরে এখন জমজমাট পরিবেশ।খাবারের গন্ধে সারা বাড়ি মৌ মৌ করছে।রান্নার সবটাই শাশুড়ী মা নিজেই সামলাচ্ছে।রোকেয়া সহ আরো কয়েকজন আছে অবশ্য হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে।তাও শাশুড়ী মা একা একা রান্না ঘরে খাটছেন আর আমি এখানে বসে থাকবো একটু কেমন দেখায় নাহ তাই গিয়েছিলাম। কিন্তু শাশুড়ী মা গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বললেন,

“তোমার বাবা কি কি পছন্দ করে?” এই প্রথমবার শাশুড়ী মা আমার সাথে কথা বললেন।আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন।

” ইলিশ মাছ ” উত্তেজনায় কোনোরকমে ইলিশ মাছ টার নাম বলেই ওখান চলে এলাম।

শাশুড়ী মাকে এখন স্কুলের স্যার বলে মনে হচ্ছে। স্কুলে যেমন পড়া যতোই ভালো করে পড়ি নাহ কেনো স্যারের সামনে গেলে কখনোই উত্তর ঠিকভাবে দিতে পারতাম নাহ।কথা বলতেই অবস্থা নাজেহাল ঠিক তেমন অবস্থা। আচ্ছা শাশুড়ী মা কি স্কুলের টিচার নাকি?হতেও পারে যেই গম্ভীর মুখ। অবশ্য এ বাড়ির প্রত্যেকের মুখটাই গোমড়া মুখোই থাকে।অদ্ভুত বাড়ি এটা। শাশুড়ী মাকে তো আর হেল্প করা হলো না তাই আবারো মিহির ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম।শুভ্র এখন ওর ঘরে তাই ওই ঘরে যাচ্ছি নাহ।যা বদ লোক কথায় কথায় গলা টিপে ধরার অভ্যেস।সকালে এমনিতেও অল্প খেয়ে বাবার সাথে রাগ করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।তাই আর সাহস করে ওই ঘরে যাইনি।

আমি মিহির ঘরে যাওয়ার জন্য সিঁড়িতে উঠার আগেই দরজায় বেল বেজে উঠলো।বাবারা চলে আসলো নাকি।গোটা একদিন পর ওদের দেখবো তাই প্রচুর এক্সাইটেড ছিলাম।যার দরুন বেল বাজার সাথে সাথেই আমি দরজার কাছে হাজির।কিন্তু দরজা খুলতেই ত্রিশ বত্রিশ বছরের এক যুবতী মেয়ে একটা ছোট্ট ছেলে সঙ্গে একজন লোকও আছে। উনারাই হয়তো মিথিলা আপুরা।

মিথিলা আপু আমার দিকে একটু কেমন দৃষ্টিতে তাকালেন।একজন অচেনা মানুষ এভাবে তাকালে সবারই অস্বস্তিতে পরবে।আমারও ঠিক তেমন অবস্থা। প্রচন্ড অস্বস্তি নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি।আমাকে পাশ কাটিয়ে আপু ভেতরে ঢুকলেন।আপু ভেতরে আসতেই শ্বাশুড়ি রান্নাঘর থেকে চলে এলেন।

” তোরা এসে পরেছিস আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”শাশুড়ী মা ব্যস্ত হয়ে বললেন।

” না না মা কোনো অসুবিধা হয়নি।”পাশ থেকে মিথিলা আপুর স্বামী উত্তর দিলেন।

মিথিলাদের সাথে টুকটাক কথা হচ্ছিলো শাশুড়ী মায়ের সাথে।হঠাৎ মিথিলা আপুর ছেলে শাশুড়ী মায়ের হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে উঠলো,

” নানিমা নানিমা বাবা বললো মামু নাকী আমার জন্য একটা মামী নিয়ে এসেছে।বলো না আমার মামী কোথায়?”

” এই যে তুর আব্বা এইদিকে তাকান।আপনার মামিমনি এই যে এখানে।”মিহি হঠাৎ কোথা থেকে এসে যেন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখিয়ে তুর মানে মিথিলা আপুর ছেলেকে বললো।

” খালামনি সত্যি এই পুতুলের মতো মেয়েটা আমার মামিমনি?” বিস্ময় নিয়ে বললো তুর।

মিহি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই তুর আমার কাছে এসে প্রথমে আমার হাতে আঙুল দিয়ে একটুখানি ছুঁয়ে দেখে বলে উঠে,

” তুমি সত্যিই পুতুল নাহ?”এখনো প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ওর কথা শুনে ওর বাবা আর মিহি হেঁসে উঠলো।আর বিস্মিত আমাকে কোন দিক থেকে পুতুল মনে হলো ওর?ইয়া আল্লাহ এতোক্ষণ এখানে আমি চুপচাপ একজায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে আমাকে পুতুল ভেবেছিলো।তুর এখন আমাকে পুতুল মামী বলে ডাকবে বলে পন করে বসেছে।ছেলেটা দারুণ মিষ্টি অল্পতেই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে।এই তো মাত্র কিছুক্ষণেই আমাকে কতোটা আপন করে নিলো।

তবে মিথিলা আপু আমাকে মোটেও পছন্দ করেননি।মিথিলা আপুর স্বামী অবির ভাইয়া আমার সাথে কথা বললেও আপু একবারের জন্যও আমার সাথে কথা বলেনি।তুর কে নিয়ে যখন চলে আসছিলাম ড্রয়িং রুম থেকে তখন শুনলাম মিথিলা আপু শাশুড়ী মাকে বলছে,

” মা বাবা এটা কেনো করলো?শুভ্রের জন্য আমি তো তোমাদের অনেক আগেই আমার ননদের কথা বলে রেখেছিলাম।শুভ্রেরও তো আমার ননদ রাত্রিকে খুব পছন্দ ছিলো।তারপরও এসব কি?আর এই মেয়ে কি রাত্রির থেকে খুব বেশি ভালো দেখতে?রাত্রির পায়ের নখের যোগ্যতাও তো এই মেয়ের নেই।বাবা কিন্তু এটা ঠিক করলো নাহ।”

কথাগুলো শুনে খুব খারাপ লেগেছিলো।তাই দ্রুত পায়ে তুর কে নিয়ে চলে আসলাম।শুভ্রের তাহলে রাত্রিকে পছন্দ ছিলো।তারজন্যই কি আমার সাথে ওমন বাজে ব্যবহার করছে?হ্যা তাই হবে হয়তো।আমি কি তবে ওদের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে গেলাম?কিন্তু শুভ্রের যখন অন্য কাউকে পছন্দই তাহলে কেনো ফারহান আংকেল আমার জীবন টা শুভ্রের সাথে বেঁধে দিলো।এমন তো নয় যে আমার সেইদিন বিয়ে না হলে আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যেতো।হ্যা বিয়ের আসরে যে মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে যায় সমাজ তাকে কথা শুনাতে ছাড়তো নাহ।কিন্তু কয়দিন একদিন দুইদিন তিনদিন চারদিনের দিন আর কে কার খোঁজ নিতে যায়।আমার বাবার কাছে আমি কোনো বোঝা ছিলাম না যে বিয়ে না হলে আমাকে খাওয়াতো পড়াতো নাহ।বরং বাবা তো আমাকে কোনোদিন বিয়েই দিতে চাইতো নাহ।বাবার কাছে আমি আমার মায়ের একমাত্র স্মৃতি ছিলাম।বাবা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো।

“মামু তোমাকে এত্তোগুলো থ্যাংক্স আমাকে পুতুল মামী এনে দেওয়ার জন্য। জানো পুতুল মামী খুব খুব ভালো।”

তুরের কথায় আমার ভাবনায় ছেদ ঘটলো।সামনে তাকিয়ে দেখি শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে।আমার দিকে না তাকিয়েই তুরের সামনে নিচু হয়ে ওকে একে একটু আদর করেই চলে গেলো।এই প্রথমবার লোকটাকে আমি একটু হাসতে দেখলাম।

অল্প অল্প করেও কম লোক হলো নাহ।তাই একবারেই খাবার টেবিলে সবার বসার জায়গা হয়নি।দুই ধাপে বসতে হয়েছে।প্রথম ধাপে বসেছে সব ছেলেরা।আর দ্বিতীয় ধাপে বসেছে মেয়েরা।সকালের মতো এখন কিন্তু আর টেবিলে শুধু প্লেট চামচের টুংটাং শব্দ হয়নি।পুরো ঘর কাপানো আড্ডায় মেতেছিলো সবাই বিশেষ করে ছেলেদের টেবিলে।

আবির ভাইয়া নামের মানুষ টা আড্ডা জমাতে ভালোই পারে।আর এমন এমন কথা বলবে মাঝে মাঝে যে সবার সামনে লজ্জায় পরে যেতে হয়।বিশেষ করে মিথিলা আপুকে এমন এমন কথা বলছে যে আপু রেগেমেগে এখান থেকে চলেই গেলো।

বাবারা চলে গেছে কিছুক্ষণ হলো।বাবা যাওয়ার আগে ফারহান আংকেল কে খুব করে অনুরোধ করেছিলো আমাকে আর শুভ্রকে যে কাল ওবাড়িতে পাঠায়।এখানোও শুভ্র ঘাড়ত্যাড়ামি করেছিলো। কিন্তু ফারহান আংকেল আশ্বাস দিয়েছেন আমাদের পাঠাবেন।এ বাড়িতে অনেকেই যে বিয়েটা মেনে নেয়নি তা বাবার বুঝতে অসুবিধা হয়নি।আর শুভ্রের ব্যপার টা তো সেইদিনই বুঝে গিয়েছিলো।তাও চেষ্টা করেছি যাতে বাবা কিছু না বোঝে।কিন্তু আমি ব্যর্থ।আমার মনের কথা বাবা বুঝতে পারবে নাহ এমন কোনো দিন আসেইনি আজ পর্যন্ত। কিভাবে যেনো বাবা ঠিকই আমার মনের কথা বুঝে যায়।যাওয়ার সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

” মা আমি নিজ হাতে তোর জীবন টা নষ্ট করে ফেললাম মনে হয়।এখনো সময় আছে যদি বলিস সব কিছু আবার আগের মতো করে দিবো।”

কিন্তু আমিও তো ফারহান আংকেলকে কথা দিয়েছিলাম তার ছেলেকে আমি গুছিয়ে দেবো।আর যতো যাই হয়ে যাক তার ছেলের হাত আমি কখনো ছাড়বো নাহ।শুভ্রের আমাকে পছন্দ না হলেও আমিই এখন তার বিবাহিত স্ত্রী এভাবে কি আমি তাকে ফেলে চলে যেতে পারি?বলতে গেলে আমি এই বাড়ির মানুষ গুলোর মায়ায় আবদ্ধ হয়ে গেছি।

চলবে,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here