দূর আলাপন পর্ব ৯

#দূর_আলাপন
পর্ব-৯
অদ্রিজা আহসান
____________
নিনাদের ঘুম হয় না। রাতটা জেগেই কাটে তার আজকাল। জেগে জেগে কত অসম্ভব কল্পনাই সে করে। কখনো কখনো অসম্ভব সে কল্পনার বেড়াজালে পরে, স্বপ্ন ও বাস্তবতার ফারাক সে ভুলে যায় ।
মনে প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে নিনাদ উঠে বসল। আজ রাতটাও নির্ঘুম কাটবে নিশ্চয়ই। অথচ কাল বিকেলে ফ্লাইট। একটা ঘুমের ওষুধ কি খেয়ে নেবে সে? তাই হোক। দেশ ছাড়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সেজন্য দরকার ফ্লাইটের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সুস্থ থাকা। তাই সে করবে।
নিনাদ অস্থির হয়ে বিছানায় বসে রইল। হাত বাড়ালেই পাশের টেবিলে ওষুধের বাক্স। কিন্তু বুকে ঝড় ওঠানো এত শত তার চিন্তা! একটা ওষুধে কি হবে কাজ তার?

নিনাদ নিজের মাথার চুল খামচে ধরে, অনুতাপে। কেন সে করল এমন কাজ! এতটাই কি অসহায় হয়ে পড়েছিল সে। যে শেষে কিনা…..
কি মস্ত ভুলটাই না সে করেছে। আবছা ভাবে দৃশ্য গুলো ভাসতে থাকে নিনাদের চোখের আঙিনায়।

খাঁ খাঁ করা দুপুরে বাড়ির দরজার কড়া নাড়ার শব্দ বড় প্রকট শোনায়। তার ওপর দরজার ওপাশের আগন্তুক মানুষটি বোধহয় অস্থির। কড়া নাড়া তিনি থামাচ্ছেন না এক মুহুর্তের জন্য। তিতিক্ষা ওড়না মাথায় ভালো করে পেচিয়ে দৌড়ে এসে দরজা খোলে। আড়াল থেকে তাকায়। দরজার বাইরে নিনাদ। সে সত্যিই বেশ অস্থির। বাড়িতে তিতিক্ষা তখন একা। বাবা ফেরেন নি গ্রাম থেকে। ছেলেকে নিয়ে তিহা গেছে স্কুলে। ভদ্রতার সব বালাই ভুলে তিতিক্ষা মুখের ওপর দরজা লাগাতে উদ্যত হয়।
নিনাদ যেন জানত তিতিক্ষা এমনই করবে। এগিয়ে এসে সুকৌশলে একটা হাত রেখে দরজা আটকানোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেয় সে। কোনো ছল নয়। কথা বলে সে সরাসরি। হঠাৎ হড়বড় করে কিছু এলোমেলো কথা সে বলে। উদভ্রান্তের মতই তাকায়।
তিতিক্ষা অবাক হয়ে চেয়ে রয় সেদিকে। কি বলল লোকটা! এসব কি কথা সে বলে? ‘সে কোথাও যেতে চায় না। যাবে না কোথাও। শুধু তিতিক্ষা একবার না করুক। সব সে ছেড়ে দেবে। ‘
কি সব ছেড়ে দেবার কথা আবার সে বলে?
ক্যাম্পাসে এত এত মেয়ের সাথে যে তার সম্মন্ধ, তাকে না দেখলে তারা যে ক্ষনে ক্ষনে মরে যায়, তাদের ছেড়ে দেবে সে? গিটার বাজিয়ে সুরের ঝংকার তুলে গান গাওয়া। সেও কি ছেড়ে দেবে? সুন্দরী মেয়ে দেখলে সেই যে তার মিষ্টি করে হাসি, প্রতিউত্তরে সেদিক থেকে কি একটা গোপন ইঙ্গিত। এদিকে ফের তেমনি অহমিকা পূর্ণ গর্বিত হাসি। সব ছেড়ে দেবে সে? এতটা সে পারে নাকি?
নিনাদ তখন উন্মাদ। সব সে পারে। এদিকে যাই তাল দেয়া হয়, সেদিকে তখন তাই সুর বাজে।

হঠাৎ তিতিক্ষা বুঝতে পারে, নিনাদ এসব কথা বলছে ঘোরের মাঝে। ঘোর কেটে গেলেই পূর্বাবস্থায় ফিরবে সে। তিতিক্ষা এবার চরম কাজটা করে। সেদিন তিতিক্ষা এত অপমান নিনাদ কে করে যে ঘোর তার কেটে যায় সহজেই! তিতিক্ষার সেসব খেয়াল তখন আর নেই। সামনের মানুষটি যে পূর্ণ মনোযোগে তার বাক্যবাণ গলঃধকরন করছে সেসব খেয়াল না করেই অনবরত সে বলে যায় তার কথা।
নিনাদের সামনে সেদিন নিজের সরূপের যে আয়না উন্মোচিত হয়, সেখানে নিনাদকে বড় কুৎসিত দেখায়। সে নাকি চরিত্রহীন, লম্পট, বড় নাকি মুখরা তার স্বভাব!

ছলনা করেই হোক কাউকে খুশি করবে, এমন মেয়ে তিতিক্ষা নয়। নিনাদ ইঙ্গিতে যে প্রশ্ন তাকে করে, তার উত্তর সে দেয় সরাসরি। বলে, সারাজীবন নাহয় অনূঢ়া থাকবে সে। তবুও নিনাদকে বিয়ে কখনোই সে করবে না। তারও নাকি আবার উচ্চাশা আছে! নিনাদ ভাবল উচ্চাশা আছে! তবে অন্য মেয়ে আর তিতিক্ষার মাঝে তফাত রইল কি? পরমুহূর্তেই তিতিক্ষা বলল, বিয়ে সে রিকশাওয়ালা কেও করতে ডরায় না। চোখ বুজে রাজি। তবে ওপারে তার স্থানী ঠিকানা থাকা চাই। অর্থাৎ তাকে হতে হবে পূর্ণ দ্বীনদার। যেন জীবনের সব কষ্ট তারা এপারেই সাঙ্গ করে ওপারে পাড়ি জমাতে পারে বেশ নিশ্চিন্তে। তাদের সুখের স্থানী ঠিকানায়।’
উত্তর শুনে নিনাদের মনে হল এতদিনে এই মেয়েটিকে সে কিছুমাত্র চিনতে পারে নি। তার এতদিনের সমস্ত স্বপ্ন, আশাও বৃথাই আঁকা হয়েছিল। এই মেয়ের চিন্তাধারা বয় অন্য এক স্রোতে, যার ধারে কাছে নিনাদের অস্তিত্বের চিহ্ন কোন নেই!

সেদিন নিনাদ ভীষণ তপ্ত দুপুরে তার বুক পূর্ণ করেই ফিরেছিল নিজ বাড়ি। নিজের সরূপের প্রকৃত পরিচয়, তার বহুদিনের জমানো সমস্ত আশার একমুহূর্তে ধূলিসাৎ, আর ওপাশের দরজাটা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবার দারুণ ভয়ানক শব্দ। সব সে পেয়েছিল শ্রাবণের অসাধারণ সুন্দর, সাদা নীল আকাশের নিচে, কড়া রোদের সেই বিষন্ন দুপুরে।

_____________________

সবাই এসেছে নিনাদকে বিদায় দিতে। বিশাল বন্ধুর দল, শিউলি ফুআম্মা আর আফরিন। তবুও যেন কি বাকি রয়ে গেল। কি এক অজানা সুখের আকাঙ্ক্ষা যেন নিনাদ করছে। আফরিন উৎসুক হয়ে তাকাচ্ছে এদিক-সেদিক। নিনাদও তাই। তিহার পরিবারের সবাই আসবে আজ। সেজন্যই এই প্রছন্ন তীব্র অপেক্ষা তার। আজ শেষ বারের মত সে নাহয় একটু দোষ করবে। তাকে চোখ ভরে দেখে নেবে। আর কখনো না। সব কথা সে ভুলে যাবে। তিতিক্ষার করা অপমান আর তার দেয়া অপ্রয়োজনীয় একপাক্ষিক ভালোবাসা। সব। শুধু মনে রাখবে আজকের দিনটা। একটুও কি সে পারে না? তবুও কি তিতিক্ষা তাকে আটকাবে গুনাহের জালে ? বলবে কঠিন গুনাহ আছে এই কাজের মাঝে। বলুক! সাধু সন্ন্যাসী তো সে নয়! হয়তো হত একদিন। তিতিক্ষা পাশে থাকলে। সে পথ যখন বন্ধ হয়ে গেছে তাহলে এসব ক্ষুদ্র অপরাধ সে করতে পারে বৈকি!

রওশান ছেলে কোলে নিয়ে আগে আগে এল। বাকিরা পেছনে। নিনাদ ছোটনকে দেখে হেসে আবার সেই আগমনী পথের দিকে তাকাল। তিহা এল, তারপর মারুফ সাহেবও তো এল। কিন্তু সে কোথায়? কই আর তো কেউ আসে না। সে কি বেশি পেছনে পরে গেল? একা আসতে কি ভয় পাচ্ছে? নিনাদ কি যাবে তাকে এগিয়ে নিয়ে আসতে? নিনাদ অস্থির হয়ে উঠল। আর তো সে পারছে না। অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা এখন আর কাজ করছে না।
অস্থির সুস্থির অবস্থার এক ঘোরের মাঝেই নিনাদ সবার সাথে কথা বলে চলল। সবাই তাকে শুভকামনা জানিয়ে নানান উপহারও দিল। বন্ধুরা সব আলাপে মশগুল হলে এক ফাঁকে তিহাকে সে জিগ্যেস করল। অনেক চেষ্টার পর অস্ফুট স্বরে কথা বের হল তার মুখ দিয়ে, ‘কিরে, ছোট গিন্নি এল না? নাকি এখনো জ্যামে আটকা পড়ে আছে? ‘
তিহার হঠাৎ যেন কি মনে পরে গেল। সে তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করল। মুখে বলল, ‘ না রে। ও এল না। এত করে বললাম আমি আর বাবা। কথা শুনলে তো। আমি আসার সময় এটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। বলল তোকে দিতে। ‘ প্যাকেট টা সে দিল নিনাদকে। নিনাদ যন্ত্রের মতই নিল সেটা। তার আর বলার কিছু নেই। আজ শুরু থেকেই সে বড় চুপচাপ ছিল। বন্ধুদের পেয়েও সে মুখ খোলে নি। তার সমস্ত হাসি, ঠাট্টা, মশকরা যেন বাকি সবের মতই তার সুটকেসে বন্দি হয়েছে। হাসবে সে কি করে!

নিনাদ আর বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। ফ্লাইটের আর বেশিক্ষণ বাকি নেই, সব বুঝে গুছিয়ে নিয়ে উঠতে হবে। এইসব বলে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে, আরেক দফা ফুআম্মার চোখ মুছিয়ে দিয়ে সে যেতে লাগল। তিনটি মেয়েমানুষ এয়ারপোর্টে ভরা জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল হাউ মাউ করে। নিনাদ একবারও পেছন ফিরল না। এই কান্নার আওয়াজ কি তার কানে পৌঁছায় নি? নিনাদ কি এত নিষ্ঠুর? নাকি সে পেছন ফেরেনি এই ভয়ে যে, আর কেউ তার একান্ত কষ্টের গোপন কান্না দেখে ফেলে অনধিকার ভাগ বসাবে তাতে!

______________________

ওহিও’র বাহারি রঙের মেঘ পূর্ণ শীতল আকাশে তখন রাত্রি নেমেছে। রাতের গভীরতার সাথে সাথে আকাশে মেঘ সরে গিয়ে সেখানে উঠেছে মস্ত এক থালার মত বড় রূপালী চাঁদ। ভীষণ তীব্র স্বচ্ছ প্রস্ফুটিত সেই পূর্ণ চাঁদের আলো। কত বড় চাঁদ! নিনাদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়। বাংলাদেশে থাকতে চাঁদকে এত বড় তো কখনো লাগে নি তার! কিজানি চাঁদটা কিভাবে হঠাৎ এত বড় হয়ে গেল।

নিনাদ সেদিকে তাকিয়ে থাকে। যে বাড়িটায় সে থাকে সেখানে ছাদ নেই। আশেপাশের কোন বাড়িতেই ছাদ নেই এখানে। কিন্তু বাড়ির সামনে বিশাল খোলা জায়গা আছে। এই মধ্যরাত্রিতে নিনাদ সেখানে খাপছাড়া ভাবে হাঁটে। মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে দেখে ওই একফালি রূপোর থালাটাকে। নিনাদের তখন হঠাৎ কেমন শূন্য লাগে চারপাশ। ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে বুকের ভেতর টা। এখানে কত সুন্দর আনন্দময় বিচিত্র জীবন তার। মাসে একবার তারা ফিশিংয়ে যায়, লেক ইরিতে যাওয়া হয় সময়ে অসময়ে। তার রুমমেটরা খুব স্নেহ করে তাকে। এখানে সে সবার চেয়ে বয়সে ছোট ও নতুন কিনা তাই।
যা সে চায় সব সে করতে পারে এখানে। কেউ বাঁধা দেবে না তাকে। তবুও যেন কোন কিছুই ভালো লাগে না নিনাদের। দিনগুলো কেটে যায় ভীষণ ব্যাস্ততার মাঝে। কিন্তু রাতগুলো যেন ফুরাতে চায় না আর।

নিনাদের মনে পড়ে বহু বছর আগের সেই বিভীষিকাময় রাত্রি গুলোর কথা। যখন অভাবের সংসারে মাঝপথে তাদের ফেলে বাবা চলে গেলেন। বাবার মৃত্যুতে ভীষণ শোকে তার পাগলপ্রায় মাও ওপারে পাড়ি জমালেন বাবার প্রয়াণের মাত্র তিনদিন পর। নিনাদ তখন ছ’মাসের কোলের ভাইটাকে নিয়ে একা এই মাঝদরিয়ায়। ভাইটাকে সে নিজের প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাইল। অনাহারে নিজে শুকিয়ে মরে ভাইকে খাওয়াল। কিন্তু সেও রইল না। এক শরতের বিকেলে প্রচন্ড জ্বরে ধুঁকে ধুঁকে, অপুষ্টিতে ভুগে সেও মারা গেল। নিনাদ রইল একা। পুরো পৃথিবীতে সে তখন ভয়ানক একা যেন। আর কেউ নেই। না খেয়ে অনাহারে, তীব্র মনকষ্টে সেও যখন মৃত প্রায় তখন হঠাৎ মেঘদূতের মত শিউলি বেগম এসে হাজির হলেন। তাকে নিয়ে চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি। নিনাদকে সুস্থ স্বাভাবিক করে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দিলেন ক্লাস ফাইভে ।

স্কুলের শিক্ষকরা কিছুদিন পরই শিউলি বেগমকে ডেকে নিয়ে জানাল নিনাদ পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। তার মেধা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। এক ক্লাস ওপরের পড়া সে ধরে ফেলে অনায়েসেই। ফাইভ পাসের পর স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্বইচ্ছায় তাকে শহরে পড়ার জন্য পাঠাতে চাইলেন। শিউলি বেগম গ্রামের মেয়ে হলেও ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। আবেগী মন তার ছিল না। তিনি রাজি হলেন ছেলেকে শহরে পড়াতে। ঢাকার পাশে মানিকগঞ্জের এক ছোট্ট গ্রাম থেকে নিনাদ আবার এল শহরে। হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে গেল সে।

নিনাদ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। কি দিন ছিল, কি দিন এল, জীবনে কত সে পেল, কত সে হারাল। শুরুতে সে যেমন একা ছিল আজও তেমনই একা সে রয়ে গেল। মাঝে যে এসেছিল মাঝেই সে চলে গেছে। না, সে আদৌও আসেই নি কখনো। নিনাদ জোর করে টেনে এনেছিল তাকে। এবার স্বইচ্ছায় ছেড়ে দিল। আর কেউ কি আসবে এই পোড়া জীবনে? না আসুক। নিনাদ একাই ভালো থাকতে জানে। সে একাই বেশ কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন টা।
চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here