পুতুল বউ পর্ব -১৯+২০

#পুতুল_বউ
#Afxana_Junayed
#পর্ব_১৯

পুতুল চেয়ারম্যান বাড়িতে এসেই আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে,একবার বাগানে যাচ্ছে তো একবার ছাদে। সারাক্ষণ শুধু ছোটাছুটি করছে আপাতত এই বাড়িতে বিশেষ অনুমতি ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়ার নিষেধ আছে।গার্ডরা করা করে নজরদারি করছে সারা বাড়ি!লম্বা স্কার্ট আর টপস পড়ে বাবার সামনে বসে আছে,তিনি চকিতে হেলান দিয়ে চা পান করছেন।হাতের যে সাইডে গু’লি লেগেছে সেখানে ব্যান্ডেজ করা কয় দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে,তবে নিয়মিত ঔষধের মধ্যে থাকতে হবে,আর এই দায়িত্ব নিয়েছে শ্রেয়া!কারণ পুতুলের মার মস্তিষ্ক এতো তেজ না কখন ভুলে যায় ঠিক নেই।

আজ প্রায় দু সপ্তাহ হয়ে গেলো পুতুল এ বাড়িতে এসেছে,এই কয়দিনে মাত্র একবার পুতুলের সাথে সামিরের দেখা হয়,তার বাবাকে দেখতে এসেছিলো তারা সবাই সামিয়া আন্টি তাকে অনেক আদর করে দিয়ে যায়।তারো একটু মন খারাপ হয়,এ কয়দিন তাদের বাসায় ছিলো সবার সাথে কম হলেও ভালোই মজা করতো কখনো অনুভব হতো সে অচেনা বাড়িতে রয়েছে।আলিয়াকেও খুব মিস করছে,তবে সব চেয়ে বেশি মিস করছে প্রতিদিন একবার হলেও কালো গোলাপকে দেখা,হয়তো ছুতে পারতো না তবে খুব কাছ থেকে দেখতে তো পারতো।আসার আগে এক পলক দেখে আসতেও পারে নি সেই গাছটাকে,সে কি জানতো যে তার প্রিয় জিনিসটা এতো অপেক্ষার পর দ্রুত কাছে এসে আবার দ্রুত চলে যাবে?না জানি কবে আবার দেখা হবে,হসপিটালে থাকা অবস্থায় সামিরের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়,আবার কেমন যেনো এই কয়দিনে সব আবার অচেনা হয়ে যায়,যখন সামির তাদের বাসায় এসেছিলো শুধু দু জনের চোখাচোখি হয়েছিলো।পুতুল আকস্মিক যখন সামিরের দিকে তাকাতো দেখতো তার পূর্বে থেকেই সামির তার দিকে তাকিয়ে আছে,সে মাথা নত করে নিতো।সাথে সিজানও এসেছিলো তার সাথে বেশ হাসাহাসি হয়েছিলো।
গত এক সপ্তাহ ধরে ইমন আর তার কিছু বন্ধু জেলে আছে,কেনো আছে কি অপরাধে আছে কিছুই জানেনা পুতুল।তবে এটা শুনে স্বস্তি পেয়েছে যে তার পরিবারের উপর এখন আর কোনো ঝুঁকি নেই,

বাবার পাশে বসে আরামচে আম খাচ্ছে পুতুল!গাছের ফর্মালিন মুক্ত মিষ্টি আম,মূলত তার বাবার জন্য আম গুলো কাটা হয়েছিলো শ্রেয়া এসে দিয়ে যায়,পুতুলের বাবা নিজে না খেয়ে পুতুলকে খেতে বলে,পুতুল আর না করে না একা একাই সব টুকু খেতে শুরু করে।পুতুলের বাবা পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়,তৎক্ষনাৎ ঘরে প্রবেশ করে বাবার খুব বিশ্বেস্ত একজন মানুষ যাকে ম্যানেজার বললেও চলে,যার নাম শফিক তিনি এসে বলে,

-চাচা বাহিরে আতোয়ার মিয়া আসছে আপনার সাথে দেখা করতে।

-আচ্ছা আসতে বলো।

স্যার এর আদেশ পেয়ে শফিক উলটো ঘুরে চলে যায় তাকে আনতে।শফিক যেতেই পুতুলের বাবা নিচু হয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে পুতুলের দিকে তাকিয়ে বলে,

-পুতুল মা তুমি এই খাবার গুলো নিয়ে তোমার ঘরে যাও,আর কিছু লাগলে ভাবিকে বলিও।

পুতুল আর কোনো দ্বিধা না করে আম খাওয়া এঠো হাতে একটা প্লেট আরেক হাতে স্যুপের বাটি নিয়ে ঘরে থেকে বের হয়ে যায়।সিঁড়ির অপর প্রান্তে তার ঘর আর এই প্রান্তে তার বাবা মার ঘর।দুই হাত ভর্তি খাবার নিয়ে আস্তে আস্তে হাঠতে হাঠতে সিঁড়ির সামনে আসে পুতুল।তখন একজন বয়স্ক ফর্সা করে লোক সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে।পুতুল ভ্রু কুঁচকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে এনাকে সে চিনে,
আতোয়ার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পুতুলকে দেখে যেনো মহা খুশি হয়,দাঁত বের করে হাসি দিয়ে আরো দ্রুত ওঠার চেষ্টা করে।পুতুল দু হাত একটু ফাক করে একটা হাসি দেয়,আতোয়ার পুতুলের কাছে এসে বলে,

-আরে পুতুল নি।কেমন আছো তুমি,কতদিন পর তোমার লোগে দেহা।

-হুম মামা ভালো আছি তুমি কেমন আছো?

-আর আছি ভালাই।আচ্ছা থাক মা আমি তোর বাপের লগে দেহা করে আসি,

পুতুল মাথা নাড়ায়,আতোয়ার পুতুলের বাবার ঘরের দিকে যায়।পুতুলের এই লোকটাকে ভালোই লাগে,তাকে সবসময় মা মা বলে ডাকে।তার চেয়ে বেশি ভালো লাগে তাহার ছোট ছেলেকে কেমন পাগল পাগল টাইপ মাঝে মাঝে তার কান্ড দেখে খুব হাসি পায় পুতুলের। মেয়েদের থেকেও বেশি লজ্জাবতী ছেলেটা।

পুতুল আর বেশি চিন্তা না করে ঘরে গিয়ে সব খাবার টুকু সাবার করে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরে,এই বোরিং লাইফ আর ভালোলাগেনা।ভাবিও এখন ব্যস্ত নানা কাজে একটু ঘুরতে যেতে মন চায় কিন্তু এই মনটাকেই কেউ বুঝেনা আহাগো কতো কষ্ট!

কিছুক্ষণ এভাবে পরে থেকে হাতে ফোনটা দিয়ে মারজিয়াকে মেসেজ দেয় চটজলদি তাদের বাসায় আসার জন্য,কিন্তু মারজিয়া মুখের উপর না করে দেয়।পুতুল বুঝে এই মেয়েকে হাজার বলেও এখন রাজি করানো যাবে না,তাই সে উঠে রেডি হয়ে সবার কাছে অনেক রিকুয়েষ্ট করে রাজি করিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।এখন মারজিয়াদের বাসায় গিয়ে ওকে টানতে টানতে নিয়ে আসতে হবে।না হলে কোনোকালেই আসবে না।

______

সামির বিছানা থেকে ওয়ালেটটা পকেটে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যায়।নিচে আলিয়া খাবারেরটা টেবিলটা গুছিয়ে রাখছিলো ড্রয়িং রুমে সামিয়া বসে বসে চা খাচ্ছে আর বই পড়ছে।সামির কোনো দিকে না তাকিয়ে খানিকটা দৌড়ে বাড়ি থেকে বেড় হয়ে গেলো।আলিয়া এক ধ্যানে সামিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। “এই ভর দুপুরে আবার কই যায়?”

সামির গেরাজে গিয়ে গাড়ির লক খুলতে যাবে তখন মনে পরে চাবি তো ঘরেই রেখে আসছে।বি’র’ক্তি ‘চ’ উচ্চারণ করে আবার দৌড়ে বাড়ির ভেতর গেলো।তখনো আলিয়া আবার তাকিয়ে রইলো এইবার দৃশ্যটি সামিয়ার চোখে পড়ে,সামির উপরে যেয়ে চাবি নিয়ে নিচে নামে।সামিয়া বইটা সামনের টেবিলে রেখে সামিরকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করে,

-কিরে এতো অস্থির হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?

-পরে এসে বলবো আসছি!

বলে কাউকে কিছু বলার না সুযোগ দিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেলো।জলদি করে গাড়িতে উঠে,রওনা দেয় গন্তব্য স্থানে!খুব দ্রুত গাড়ি চালিয়ে একটা হসপিটালের সামনে এসে গাড়ি থামায়।গাড়ি পার্ক করে ভেতরে ঢুকে যায়,মুহুর্তেই আবার থেমে যায়।মুখ বন্ধ করে নেয়,,,নিজের প্রতি নিজের এতো বিরক্ত লাগছে সামিরের।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আবার উল্টো ঘুরে বাহির থেকে একটা ওয়ান টাইম মাস্ক কিনে বড় একটা শ্বাস নিয়ে আবার ভেতরে ঢুকে যায়।
লিফট দিয়ে সাত তোলায় উঠে একটা কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে যায়,কেবিনে দুইটা নার্স সহ সিজান আর একটা মেয়ে আছে,নার্স দুটো মেয়েটাকে ধরে আটকানোর চেষ্টা করছে,কিন্তু মেয়েটা অতিরিক্ত পাগলামো করছে ছুটাছুটি করছে।সামনের সিজান রক্ত চক্ষু নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে,তার আর সহ্য হচ্ছে না এইসব ওভার ড্রামা।তার উপর আবার সামিরের এতো উদয় হওয়া যেনো জাস্ট অ’স’হ্য লাগছে।

সামির এসে প্রথমেই মেয়েটাকে একটা ধমক দিয়ে নার্সগুলোকে বাহিরে যেতে বলে,তারা চলে যায়।মেয়েটা এইবার শান্ত হয়ে বেডে বসে কাপতে থাকে,সামির মেয়েটার সামনে এসে বলে,

-এইসব কিন্তু আর স’হ্য হচ্ছে না রাকি!এইবার অ’তি’রি’ক্ত হয়ে গিয়েছে।আচ্ছা তুই ক্লিয়ার করে বল তো তুই কি চাচ্ছিস?সেদিন নিজেকে নিজে গু’লি করলি এতো দিন কোমায় ছিলিস দু দিন ধরে ঠিক হয়ে আবার পাগলামো লাগিয়ে দিয়েছিস।কেনো এমন করছিস ক্লিয়ারলি বলবি তুই!

সামিরের কথায় রাকি বেডের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,

-আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল সামির!

-চল!

বলে সামির রাকির হাত ধরে টান দিয়ে বেড থেকে নামিয়ে কেবিনের বাহিরে চলে যায়।পেছন পেছন সিজান ও যায়,

পুতুল দুই হাতে তিনটা হাওয়াই মিঠাই নিয়ে একটা খেতে খেতে সাত মাসের গর্ভবতী মহিলাদের মতো রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে,পাশে মারজিয়াও রয়েছে,নানা রকম ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে তাকে নিয়ে তারপর ছাড়ছে পুতুল।দুপুরের খারা রোদ একদম তার মুখে এসে পড়ছে,টিয়া কালার হিজাবের ভেতরে ফর্সা মুখটা একদম লাল টমেটো হয়ে আছে,আর এদিকে পুতুলতো বিন্দাস খেয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ হাটার পর পুতুল ওইপারে হাত দিয়ে লাফালাফাতে বলে,

-দেখ দেখ গোল্লা আইস্ক্রিম চল খাই!

-ওইটা তো ওই পারে,এই বরফ কুচি খাওয়ার জন্য তুই এখন রোড পার হয়ে ওখানে যাবি?

-হুম সমস্যা কি?আর ওখান দিয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তা তাড়াতাড়ি,চল না যাই!

-আয়..!

মারজিয়া পুতুলের দিকে রাগি লুকে তাকিয়ে তার হাত ধরে সাবধানতা অবলম্বন করে ওপারে গিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়ায়,আর তখন পুতুলের শুরু হয়ে যায়,

-মামা দুইটা দেও দাও,আর শুনো বরফ বেশি করে কুচি করে দিবা ওই সবুজ আর লাল কালার দিবা,কমলাটা তিতা ওটা দিও না।আর ড্যানিশ বেশি করে দিবা।জলদি দেও,,উফফ কি গরম।

-এই তুই চুপ থাক দিতেছে তো!

-তুই চুপ থাক!

দুই জনেই ভেংচি কাটে,লোকটা দুই জনের হাতে দুটো ওয়ান টাইম কাপ ধরিয়ে দেয় যেটার মধ্যে গোল্লা আছে,কিন্তু গোল্লায় ড্যানিশ কম থাকায় পুতুল চিল্লিয়ে উঠে,

-আরে মামা তোমারে না বলছি ড্যানিশ বেশি করে দিতে এতো কম দিছো কেন,টাকা দিয়ে কিনি নাই?

-আমরা সবসময় এইটুকুই দেই মা,

-সবাই আর আমি এক নাকি,না মামা আমি জানিনা আমার আরো ড্যানিশ দেও নাইলে আমার টাকা ফেরত দেও,

এইবার লোকটা তেতে উঠে,

-আরে মেয়ে কি বলো এইসব দশটাকা দিয়ে আইস্ক্রিম খেতে আসছো আবার ডিমান্ডের চেয়ে বেশি চাও?আর তুমি আমগো চেয়ারম্যান এর মাইয়া না?উনি কত ভালো মানুষ আর হের মাইয়া?

-এই,,এই মিয়া কি বলতে চান হ্যা আমি ঝগড়ুটে?মোটেও না,শুধু একটু ড্যানিশই তো চেয়েছি পুরো দোকান তো চাই নি।

মারজিয়া এদের দুজনের ঝগড়া দেখছে আর সেই ফিল নিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা গোল্লা খাচ্ছে,কিছুক্ষণ পর পর হেসে উঠছে,হঠাৎ সামনে কিছু একটা নজর পড়তেই ভ্রু কুঁচকায়।পুতুলকে খোঁচা দেয় দেখার জন্য।কিন্তু পুতুলে সেখানে খেয়াল না করে এক নাগারে ঝগড়া করতে থাকে,মারজিয়া এইবার পুতুলের মুখ ধরে ঘুড়িয়ে সামনের দিকে নেয়,পুতুলের মুখ বন্ধ হয়ে যায়।ভালো করে চোখ ডলে দেখে নাহহ!সে তো ঠিকি দেখছে,সামনে সামির মাস্ক পড়া থাকলেও তার চোখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সেটা সামির।সঙ্গে সিজান দাঁড়িয়ে আছে,পাশে একটা মেয়েও আছে।

সামির গাড়ির পেছনের দরজা খুলে রাকিকে বসতে বলে,রাকি নীরব হয়ে বসে পড়ে।সিজান সামনে বসতে যাবে তখন তার চোখ যায় দূরের দোকানে থাকা দু টো মেয়ের দিকে।যাদের স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে,এবং মেয়েগুলো তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।সিজান সামিরকে বলে,সামির তাকাতে তাকাতেই পুতুল আর মারজিয়া উলটো ঘুরে চলে যায়।সামির আর কিছু না বলে গাড়িতে চরে চলে যায়।

চলবে..!#পুতুল_বউ
#Afxana_Junayed
#পর্ব_২০

শুনশান নীরব লেকের পাড়!মাথার ঠিক উপরে ছোটমোট একটা ব্রিজ,যেখানে যানবাহন চলাচল করছে,তার ঠিক অনেকটা নিচে একটা লেক আর সাইডে সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেড়াও করা।এখানে বিকেলে প্রায় অনেকেই ঘুরতে আসে,কিন্তু এখন দুপুর হাওয়ায় বেশি কাউকে দেখা যাচ্ছে না।ঘাসের মধ্যে ঠোঁট উলটে বসে আছে,পুতুল!মারজিয়া প্যারা নাই চিল মোমেন্টের মতো ভাব নিয়ে পা দুলাচ্ছে আর ফোন চাল্লাচ্ছে, পুতুল একবার মারজিয়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে পাশ থেকে একটা ছোট ইটা দিয়ে নদীতে ডিল ছুড়ে বলল,

-মেয়েটা কে হতে পারে?যদি তাদের কেউ হয় তাহলে তো সামিয়া আন্টি আমাকে বলতো।কি জানি আবার নাও বলতে পারে,,

পুতুলের ভাবলেশহীন কথা শুনে মারজিয়া খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলে,

-কি আজাইরা চিন্তা ভাবনা করছিস পুতুল,ওই মেয়ে ওদের কোনো রিলেটিভ হোক বা অন্য কিছু তাতে তোর কি রে?আর এমনো তো হতে পারে ওটা ওই কা’না সিজান নাকি কি ওই ফটকা ছেলেটার গার্লফ্রেন্ড,এমনি যে ক্যারেক্টার ওগুলো তার দ্বারা আশা করাই যায়।

শেষের কথাটুকু খুব আস্তে বলল মারজিয়া,পুতুল চোখ ছোট ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,

-একদম সিজান আপু সেরকম না,ওনার গার্লফ্রেন্ড থাকলে আমাকে অবশ্যই বলতো,

-সিজান আপু??

মুখটাকে বেকিয়ে কথাটা বলল,মারজিয়া।পুতুল একটু হেসে মারজিয়াকে সেদিনের আপু বলার কাহিনীটা বলল মারজিয়া তা শুনে অবাক হয়ে বলল,

-তোর ছেলেদের আপু ডাকার শখ এটা আমি জানতাম,কিন্তু তুই এই কানা বেটাকে আপু ডাকিস,ছি পুতুল তোর চয়েস কি।

-একদম বাজে কথা বলবিনা,সিজান আপুকে দেখে তোকে কোনদিক দিয়ে কানা মনে হয়।হ্যান্ডসাম আছে,কি কিউট স্মাইল লুক!

-হু লুক পুরা লুচু লুচু,দেখলিনা সেদিন কীভাবে তোর কাধে মাথা রাখতে চেয়েছিলো।ভাজ্ঞিস সামির ভাইয়া এসেছিলো।

পুতুল এইবার মারজিয়াকে ব্যাঙ্ক মেরে হাত নাড়িয়ে বলল,

-হু ‘ভাজ্ঞিস সামির ভাইয়া এসেছিলো’ হা সামির ভাইয়া না কচু!তখন ওই মেয়ের হাত না তোর সামির ভাইয়াই জড়িয়ে ধরে ছিলো সিজান আপু না হুম।

-হু হাত ধরতেই পারে তাতে তোর কি?

-আজব আমার কি!!

-তাহলে চুপ থাক,ওদের চিন্তায় এতোটাই মগ্ন হয়ে গেছিস যে কালকের কথা ভুলেই গেছিস

পুতুল ভ্রু কুঁচকে মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

-কালকে কি?

-কত কিছু হতে পারে,

-কালকে কত তারিখ?

– ২৩

-ওহ হো মনে পরেছে

পুতুলের কথায় মারজিয়া উত্তেজিত হয়ে পুতুলের আরো কাছে এসে বলে

-ফাইনালি মনে পড়লো!বল বল কালকে কি,

বলে পুতুলের উত্তরের আশায় আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।পুতুল কিছুক্ষণ তার মাথা চুলকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে বলল,

-কালকে আমার সামিয়া আন্টিদের বাড়ি যাওয়ার এক মাস হবে,ঠিক এক মাস আগে এই দিকে আমি তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম।মনে আছে তোর?

-ধ্যাত

বলে পুতুলকে ধাক্কা দিয়ে ঝট করে বসা থেকে উঠে পড়লো মারজিয়া,মুখে তার রাগ+অভিমানের ছায়া স্পষ্ট!পুতুল বসা অবস্থায় মাথা তুলে মারজিয়ার দিকে তাকায় রোদের তাপ পুরো চোখে এসে লাগে,বিধায় চোখ হালকে খুলে বলে,

-তোর আবার কি হলো কি কালকে,বলবি তো।

-কিছুনা চল এখান থেকে,

-এখন যাবো কেনো তোর না কিসের কথা আছে আমার সাথে সেটা বল।

-কিছুনা তুই যাবি নাকি আমি চলে যাবো

-থাক রাগ করিস না আয় এখানে বস বস!রাগ স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর আমার মতো সারাদিন বেশি বেশি খা আর মন আর শরীর দুইটাই ঠান্ডা রাখ।

-ধ্যাত

বলে পুতুলের হাত থেকে নিজের হাত ঝটকা মেরে ধুপধাপ করে ব্রিজের উপরে উঠে চলে গেলো।পুতুল পেছন থেকে অনেক ডাকে কিন্তু মারজিয়া পেছনে তাকায় না,সোজা চলে যায়।

-যা বাবা এই মেয়ের আবার কি হলো কথায় কথায় শুধু ছ্যাত মেরে উঠে,এখন আমি একা কীভাবে যাবো এই রোড দিয়ে,,

মুখটা পাংশেটে করে ওভাবেই কিছুক্ষণ বসে থাকে পুতুল।তারপর উঠে জামা ঝাড়া দিতে থাকে,তখন নিজে ঘাসের দিকে চোখ পড়তেই মনে হলো পেছনে লম্বা কারো ছায়ামানব এর মতো কিছু একটা,হাত থামিয়ে আস্তে আস্তে পেছনে তাকিয়ে,

-তুমি?

মারজিয়া রাগে ক্ষোপে পুতুলকে রেখেই লেকের ডাল থেকে ব্রিজে উঠে যায়,কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু সামনের দিকে জোরে জোরে হাঠতে লাগে,ব্রিজের সাইড দিয়ে হাটার সময় একটু দাঁড়ায় মারজিয়া কারণ এতোক্ষণে তো পুতুলের দৌড়ে এসে তার পেছন পেছন আসার কথা ছিলো কিন্তু এখন তো কোনো শব্দই পাওয়া যাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটু ভাবে পেছন থেকে কেউ আসবে,কিন্তু না এখান চলন্ত গাড়ি ছাড়া এই ভর দুপুরে একটা মানুষের ছিটেফোঁটাও নেই।এদিকে তার মুখ রোদে পুরে লাল হয়ে যাচ্ছে,হিজাবের ভেতরের কান থেকে যেনো ধোয়া বেড় হচ্ছে।একবার পাশের রেলিং এর নিচে লেকের দিকে তাকালো যেখানে তারা বসে ছিলো সেখানটা পুরো ফাকা।আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কোথাও পুতুলকে দেখা যাচ্ছে না।একটু সন্দেহ লাগে মারজিয়ার কিন্তু এখন তার এইসব চিন্তার থেকে রাগ লাগছে বেশি মনে মনে ভাবছে

“এ কেমন বেস্টি জন্ম দিলাম আমি যে কিনা আমার জন্মদিনের তারিখটাও মনে রাখে না,কেউ আমাকে ভালোবাসে না কেউ না”

বিকেলের দিকে মারজিয়া বিষন্ন মেঘে ঢাকা মন নিয়ে গালে হাত দিয়ে তাদের ছোট্ট উঠোনে বসে আছে,আগে কখনো সে রাগ করলে পুতুল যেভাবেই হোক ফোন বা মেসেজ দিয়ে রাগ ভাঙাতো কিন্তু এখন তার কোনো পাত্তাই নেই।শ্রেয়া ভাবিকে মেসেজে জিজ্ঞেস করেছিলো পুতুল বাসায় নাকি,সে বলেছে মহারানী নাকি দিব্বি বসে বসে খাচ্ছে।মারজিয়া মন খারাপ হয়ে যায়,
“আজকাল পুতুলটা যেনো কেমন একটা হয়ে গিয়েছে সব কিছু কেমন যেনো লুকায়!যেখানে আগে একটা আকাম করলেও তাকে না বলা পর্যন্ত পেটের ভাত হজম হতো না।কি জানি,তবুও তারা আমাদের মা মেয়ের জন্য যা করেছে তার জন্য লাখ লাখ শুকরিয়া”

বলে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে ঘরে চলে যায়।কিছু সেকেন্ড সময় পার হতে না হতেই মারজিয়ার মা মারজিয়াকে ডাকতে থাকে,মারজিয়া সবেই বিছানায় শুতে নিচ্ছিলো মার ডাক শুনে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে চেচিয়ে বলে,

-কি হয়েছেটাকি সারাক্ষণ এতো ডাকাডাকি করো কেনো।

-আমার কাজে কি আর ডেকেছি তোকে?দেখ বাহিরে কে জানি এসেছে তোর নাম বলল,

মারজিয়া ভ্রু কুঁচকে জলদি করে বাহিরে বের হয়ে দেখে গেইটের সামনে মাথায় ক্যাপ আর গোলাপি কালার একটা টি শার্ট পড়া ছেলে, মনে হচ্ছে কোনো কোম্পানির টি শার্ট। কাধে বড় একটা ব্যাগ আর হাতে একটা প্যাকেট!মারজিয়া সামনে যায় ছেলেটা মারজিয়াকে দেখে বলে,

-আপনিই কি মারজিয়া রৌণ?

-জ্বী!

ছেলেটা তার হাতের প্যাকেট মারজিয়ার দিকে দিয়ে বলে,

-আপনার পার্সেলটা

মারজিয়া ভীষণ অবাক হয়,সে তো কোনো অর্ডার দেয়নি কে পাঠালো এগুলো?আর এই গ্রামে তো কোনো ডেলিভারি ম্যান আসে না তাহলে?

-ভাইয়া আমি তো কোনো কিছু অর্ডার দেই নি!

-না আপু এটা আমাদের মার্কেট থেকে আপনাকে ডেলিভারি করা হয়েছে।

– আ,,আচ্ছা কত টাকা?

-না আপু পেমেন্ট আগেই পে করে দিয়েছে,

বলেই মারজিয়াকে আর কিছু না বলতে দিয়ে ছেলেটা চলে গেলো।মারজিয়া তো হা করে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে,কে দিলো এটা কে দিলো এটা? পুতুল!

মারজিয়া ঘরে এসে প্যাকেটটা ভালো করে চেক করে দেখে উপরের ডাকটিকিটে তার নাম লেখা,প্যাকেটটা খুলে তো আরো বেশি অবাক হয়।চকলেট ক্রিম মিক্সড কালারের একটা শাড়ী দেখে মনে হচ্ছে অনেক দামী।সাথে চকলেট কালার দু মুঠো চুড়ি আর অনেক গুলো চকলেট।মারজিয়া তো পুরোই অবাক এগুলো দেখে,চকলেট বক্স খুলতেই একটা হলুদ খামের চিঠি পায়,যেখান দু তিন লাইনে লেখা

~ ডিয়ার ছ্যাতরাণী,
এই হুটহাট আগুনে ঘি ঢালার মতো ছ্যাত করে ওঠা বাদ দাও।আর এই চকলেট গুলো পরিধান করে আমার প্রেমে চকলেটের মতো গলে যাও।অগ্রীম শুভ জন্মদিন আমার কিটকেট!
জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।”

চলবে..!

{সবার কথা অনুযায়ী পরবর্তী পর্ব গুলো কিন্তু বহুত লোমান্টিক হবে,সো সবাই ভালো ভালো কমেন্ট করো!}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here