#প্রণয়_রেখা
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
২৮.
একটা লাল বেনারসির সখ মোহনার অনেক আগ থেকেই ছিল। তবে সেই সখ গায়ে জড়িয়েই যে তার বিয়ে হবে সেটা আগে কখনো ভাবেনি সে। একটা লাল টকটকে শাড়ি, ঠোঁটে রক্তিম রঞ্জক পদার্থ, চোখের নিচে হালকা কাজলের ছোঁয়া আর ললাটের ক্ষুদ্র বিন্দু; ব্যস এইটুকুই। এইটুকুই কি একটা মেয়ের বিয়ের সাজ?
শাড়ি গায়ে মোহনা আয়নায় চেয়ে বলে,
‘আমাকে সুন্দর লাগছে।’
তার কথা শুনে মাহিয়া আর এশা হাসে। এশা বলে,
‘নিজের প্রশংসা নিজেকে করতে হয় না, আমরা আছি না তার জন্য।’
মোহনা আলতো হেসে বলল,
‘কে বলেছে, নিজের প্রশংসা নিজে করতে হয় না? আমার নিজের কাছে আমি নিজে সবসময়ই প্রশংসনীয়। আর এটাকে অহংকার বলে না, এটাকে বলে আত্মানুরাগ, নিজেকে নিজে ভালোবাসা।’
‘আচ্ছা বাবা, বুঝেছি। এখন একটু তোর মেকআপ টা দেখ, আরেকটু করলে কী হয়? বেশি নরমাল হয়ে গিয়েছে না?’
‘উঁহু, এইটুকুতেই ঠিক আছে।’
‘আচ্ছা, তাহলে তুই বস। এবার আমরা একটু সাজি।’
মোহনা বিছানায় গিয়ে বসে বলল,
‘এশা শোন, তুই কিন্তু আবার বেশি সাজিস না। পরে তোকে দেখে রাফাত এত পাগল হবে যে, আমার বিয়ের কাজীকে বলে নিজের বিয়েটাও পড়িয়ে ফেলবে। আবার তোর পরিবারও আজ থাকবে, রাফাতের জন্য কিন্তু আজ খুব সুযোগ। সো, বি কেয়ারফুল।’
এশা নাক ফুলিয়ে বলে,
‘বেশি বুঝিস তুই।’
মোহনা ঠোঁট চেপে হাসে। এশা আর মাহিয়া তৈরি হয়। তাদের তৈরি হওয়ার মাঝেই নিচ থেকে গাড়ির শব্দ পাওয়া যায়। সেই শব্দে মোহনার মনে মোচড় দিয়ে উঠে। হঠাৎ তার মাথায় আসে, তার আজ বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সে আজ থেকে অন্য এক বাড়ির বউ হতে যাচ্ছে। কেমন যেন অন্যরকম এক অনুভূতি। না ভয়, না অস্বস্তি। এই অনুভূতির ঠিক ধরা বাঁধা কোনো নাম নেই। তবে মোহনার বুক ভার হচ্ছে, ভালো লাগছে যেমন খারাপও লাগছে খুব। সে বুকে হাত দিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে এশাকে বলে,
‘দোস্ত, আমার কেমন যেন লাগছে।’
এশা তার সাজায় ব্যস্ত ছিল। মোহনার কথা শুনে সে পেছন ফিরে তার দিকে চেয়ে বলল,
‘ভয় পাচ্ছিস?’
‘না, ঠিক ভয় না। একটু অন্য কিছু, বুঝতে পারছি না।’
এশা গিয়ে তার পাশে বসল। মোহনার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,
‘বিয়ের সময় হয়তো সব মেয়েরই এমন হয়। আমার আম্মুও বলেছিল, আম্মুর বিয়ের দিনের অনুভূতির কথা। সেদিন নাকি বুকের ভেতরে কেমন করে, স্পন্দন বেড়ে যায়। ভয় হয়, অস্বস্তি লাগে। তোরও এখন এমন হচ্ছে তাই না?’
মোহনা অসহায় ভাবে মাথা নাড়াল। এশা দ্বিতীয় কোনো কথা বলার আগেই সেখানে লায়লা বেগম এসে বললেন,
‘কিরে, তোদের এখনো শেষ হয়নি। দরজার সামনে বর দাঁড়িয়ে আছে, বরণ করবি চল।’
এশা বলল,
‘জি আন্টি, আসছি।’
পরে আর মোহনার সাথে কথা না বলেই এশা মাহিয়াকে নিয়ে দরজার কাছে গেল গেইট ধরতে। এশা আর মোহনা পাত্রী পক্ষ। আর রাফাত ছিল পাত্র পক্ষ। গেইটে কত টাকা দিবে সেই নিয়ে দুই পক্ষের তুমুল তর্ক শুরু হয়েছে। এশা আর মাহিয়ার দাবি, তারা দশ হাজারের কমে ছাড়বে না। ঐদিকে রাফাত পাঁচও দিবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
বেশ অনেকক্ষণ তর্ক বিতর্কের পর অবশেষে ছয় হাজারে গিয়ে তাদের মনস্থির হলো।
লরিনকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে দিয়ে মাহিয়া তার বোনের কাছে ছুটে গেল। গিয়ে বলল,
‘আপু জানো, লরিন ভাইয়াকে যা লাগছে না।’
‘তুই আমার জামাইয়ের দিকে নজর দিচ্ছিস?’
মোহনা ভ্রু কুঁচকে বলল। মাহিয়া ভেংচি কেটে বলল,
‘এএ, আমার বয়েই গেছে তোমার বিদেশির দিকে নজর দিতে। আমি তো শুধু বলছিলাম, দেখতে কেমন লাগছে। আসলে ভাইয়াকে দেখতে একটুও ভালো লাগছে না। আমি তো মিথ্যে বলছিলাম, তোমাকে খুশি করার জন্য।’
‘আচ্ছা হয়েছে, আমি জানি কোনটা তোমার সত্য আর কোনটা তোমার মিথ্যা।’
মাহিয়া মুখ কালো করে বলল,
‘যাও, তোমাকে আর কিছু বলবোই না।’
সে আবার ড্রয়িং রুমে গেল। লরিনের কাছে গিয়ে বসে বলল,
‘জানেন ভাইয়া, আপুকে যা লাগছে না। আপনি তো আজ পাগলই হয়ে যাবেন।’
লরিন সরু চোখে মাহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ভীষণ দুষ্টু হয়েছ তুমি।’
‘এখন হয়নি তো, আগে থেকেই ছিলাম।’
মাহিয়ার কথা শুনে লরিন খুব কষ্টে হাসি আটকায়। তারপর সে তার ফোনটা মোহনার কাছে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
‘তোমার আপুর ছবি তুলে নিয়ে আসো, তোমার কথা শুনে এখন দেখতে মন চাচ্ছে।’
মাহিয়া লরিনের ফোন নিয়ে মোহনার কাছে গেল। গিয়ে তাকে বলল সব। মোহনা ছবি তুলতে না দিয়ে ফোনের নোট প্যাডে গিয়ে কিছু একটা লিখল। তারপর সে মাহিয়াকে বলল এটা লরিনকে পড়তে দেওয়ার জন্য। মাহিয়া আস্তে আস্তে আবার লরিনের কাছে গিয়ে বসল। সেখানে বড়োরা সবাই আছে বলে, মাহিয়া কোনো হৈ চৈ করতে পারছে না। সে লরিনকে ফোন দিয়ে বলল,
‘আপু এটা পড়তে বলেছে।’
লরিন দেখল তার ফোনের নোট প্যাডে লেখা,
‘একটুও ধৈর্য নেই আপনার? এত তাড়া কিসের, হু?’
লেখাটা পড়ে লরিন মোহনাকে টেক্সট করল। যেখানে সে লিখল,
‘না নেই। এতদিন ধৈর্য ধরতে ধরতে এখন ধৈর্যের বক্স খালি হয়ে গিয়েছে। এখন যা হবে ছটফট হবে, কোনো ধৈর্য ধরাধরি হবে না। আই মিন, সবকিছু ফাস্ট ফাস্ট। লাইক এখন বিয়ে, আর রাতে বাসর।’
মেসেজ দেখে মোহনার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। মানে ছেলেটা এতকিছু ভেবে ফেলেছে? মোহনা তাকে রাগের ইমুজি পাঠিয়ে লিখল,
‘এখনই এত লাফালে বিয়ে কিন্তু ক্যান্সেল করে দিব।’
লরিন তাকে হাসির ইমুজি পাঠিয়ে লিখল,
‘সাহসী ছেলেরা কারোর হুমকিতে ভয় পায়না।’
মোহনা মেসেজ দেখে ফোনটা রেখে দিল। ছেলেটা পাজি হয়েছে খুব। এই ছেলে যে তাকে সারাজীবন জ্বালিয়ে মারবে সেটা আর বোঝার বাকি রইল না তার।
.
.
কাজী সাহেব বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বড়োরা সবাই ড্রয়িং রুমে। মাহিয়া মোহনার পাশে বসে আছে। এশা আর রাফাত এই মুহুর্তে উধাও। হয়তো ছাদে আছে। কেন আছে, সেটা মোহনারও অজানা।
লরিনের বাড়ির লোকেরা সবাই কথা বলে বললেন, কাবিনের সাথে কবুলও বলিয়ে নিবেন। তাতে একবারে সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে। মোহনার মা বাবাও এই সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি রাখলেন না।
মাহবুব সাহেব লায়লা বেগমকে বললেন, মোহনার রুমে গিয়ে প্রস্তুতি নিতে তিনি কাজী সাহেবকে নিয়ে আসছেন। লায়লা বেগম মোহনার রুমে যান। অপরদিকে মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়াতেই উনার ফোনে কল আসে। ফোন হাতে নিয়ে দেখেন যে উনার বন্ধু আব্দুল্লাহ সাহেব কল করছেন। তিনি এই মুহুর্তে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন, কলটা রিসিভ করবেন কিনা। কারণ, মোহনার বিয়ের ব্যাপারে ঐ পরিবারের কাউকেই তিনি কিছু জানাননি। যদি এখন তিনি কল রিসিভ করার পর উনার বন্ধু বলে উঠেন, তার ছেলেও এখন বিয়েতে রাজী, তখন?
চলবে…#প্রণয়_রেখা
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
২৯.(অন্তিম পর্ব)
মাহবুব সাহেব বড্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। ফোনটা কেটে দিলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ সাহেব আবারও কল করলেন। তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ঐদিকে ছেলের বাড়ির লোকজন তাড়া দিচ্ছেন। মাহবুব সাহেব কল রিসিভ করলেন না, এখন কল রিসিভ করলেই কথা বাড়বে। তখন আবার ছোট কথার সূত্র ধরে বড়ো ঝামেলাও হতে পারে। আপাতত, তিনি কোনো ঝামেলা চান না, কোনোরকমে মেয়ের বিয়ে দিয়ে একটু স্বস্তি পেতে চান।
যখন কাজী সাহেবকে নিয়ে মাহবুব সাহেব মোহনার রুমে ঢুকলেন মোহনার মনটা তখন আরো চুপসে গেল। সে ভয়ে মাথা নুইয়ে ফেলল। বুঝতে পারল, হৃৎস্পন্দন তার আরো বেড়ে গিয়েছে। সে টের পাচ্ছে ধুকপুক ধুকপুক শব্দগুলো। ভয় হচ্ছে, পেটে মোচড় দিচ্ছে, হাত পা কাঁপছে। সঙ্গে গলাও শুকিয়ে উঠছে।
কাজী সাহেব একটা চেয়ারে বসলেন। তার পাশে মোহনার বাবা, লরিনের চাচাসহ আরো কয়েকজন মুরব্বি বসলেন। মোহনার মা ততক্ষণে বেরিয়ে গেছেন। মোহনার কাছে এখন এশা, মাহিয়া আর লরিনের আরো দু’জন কাজিন বসে আছে। কাজী সাহেব তার তীক্ষ্ণ কন্ঠে কাবিননামা পড়ে শুনালেন। অতঃপর সে কাঙ্খিত সময় চলে এল। কাজী সাহেব মোহনাকে বললেন,
‘মা, বলো কবুল।’
মোহনার জান যায় যায় অবস্থা। এর আগে কখনো এতটা নার্ভাস লাগেনি তার। ভয়ে বুক কাঁপছে যেন। এটা কিসের ভয়, তা তার জানা নেই। কোনোভাবেই নিজের মনকে বোঝাতে পারছে না। লায়লা বেগম, পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন। এই তো কিছুক্ষণ পরই মেয়ে তার পর হয়ে যাবে। যেন চোখের পলকেই তার ছোট্ট মেয়েটা বড়ো হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে এই তো সেদিন সে ভূমিষ্ঠ হলো, তাকে জড়িয়ে তিনি কত আদর দিলেন। মেয়েটা তার আজ হুট করেই যেন খুব বড়ো হয়ে গিয়েছে।
মোহনার গলার স্বর থমকে গিয়েছে। চেয়েও কথা বের করতে পারছে না সে। মাহিয়া পলকহীন চোখে বোনকে দেখছে। তার এই পৃথিবীতে সবথেকে আপন মানুষ, প্রিয় মানুষ, তার বোন। সে যখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তখন হয়তো মাহিয়া কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশই হয়ে যাবে। আজ তাই আর তার কান্না পাচ্ছে না। এই ভেবে শান্তি যে, বিয়ে হয়ে গেলেও এখনই তো বোন আর তাকে ছেড়ে যাবে না।
কাজী সাহেব মোহনাকে আবারও কবুল বলতে বললেন। মোহনা শুষ্ক চোখে একবার বাবার দিকে চাইল। বাবার রুক্ষ চোখ আজ চিকচিক করছে। এই পাথরের ন্যায় শক্ত চোখের জমিনেও আজ পানি জমেছে মনে হচ্ছে। মোহনা চোখ নামিয়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। এশা কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
‘বলে ফেল দোস্ত। যত সময় নিবি ততই কষ্ট লাগবে, বলে ফেল।’
মোহনা ঘনঘন নিশ্বাস নিল। এক ঢোক পানি খেতে পারলে হয়তো গলাটা ঠিক হতো। কিন্তু সেটারও এখন উপায় নেই। সে চোখ বুজে নিজেকে ধীর স্থির করল। আসলেই সময় নিলে কষ্ট আরো বাড়বে। তার চেয়ে বলার দরকার, বলে দিলেই ঝামেলা শেষ। অবশেষে সে নিজেকে শক্ত করল। ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
‘আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।’
পরপর তিনবার কবুল বলার পর কক্ষে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলেন। তাদের এই আনন্দ ধ্বনি পাশের কক্ষেও গেল। লরিনের কানে এই ধ্বনি পৌঁছাতেই ঠোঁটের কোণে চমৎকার হাসি ফুটে উঠল তার। অবশেষে সে পেরেছে, নিজের ভালোবাসাকে জেতাতে পেরেছে।
লরিনের কবুল বলা শেষে সকলে মোনাজাত ধরে। তারপর শুরু হয় মিষ্টি খাওয়ার হুড়াহুড়ি। এর মাঝে লরিনের অস্থির মন আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠে, মোহনাকে এক পলক দেখার জন্য। তার বউকে এখনো কেন এই রুমে আনা হচ্ছে না? কেউ কি বুঝতে পারছে না, সে কতটা ছটফট করছে? কেউ কি তার কষ্টটা একটুও বুঝতে পারছে না? আশ্চর্য, বিয়ে হয়ে গিয়েছে, এখনো বউ দেখতে এত অপেক্ষা করতে হবে কেন? মানুষগুলো সব অদ্ভুত! কেউ তার মন বুঝে না।
লরিন বসে বিরক্ত মনে ফ্যাচফ্যাচ করেই চলছে। আর এক সেকেন্ডও যেন তার ধৈর্যে কুলাচ্ছে না। এখন কেবল কতক্ষণে সে মোহনাকে দেখবে সেই চিন্তাতেই অস্থির। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মোহনাকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসা হলো। লরিনের দৃষ্টি কাটল তার অতিরঞ্জিত এই মোহনীয় পরিটা। সে নিষ্পলক কিছুক্ষণ চেয়ে মনে মনে ভাবল, “এটা তার বউ?”
মোহনার তার পাশে বসে আছে। ঐদিকে লরিন হতভম্ব। কাউকে লাল রঙে এত কীভাবে সুন্দর লাগে? আশ্চর্য, এত পুরো লাল রঙের মাদক, যাকে ছুঁতে হয় না, দেখলেই নেশা ধরে যায়।
পাঞ্জাবী গায়ে লরিনের এই রূপটা মোহনার কাছে নতুন। আর নতুন জিনিস দেখলে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের মস্তিষ্ক প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হয়। পরে ধীরে সুস্থে সেটাকে মানিয়ে নেয়। মোহনারও এখন হয়েছে তাই। লরিনকে এর আগে সে কখনো পাঞ্জাবীতে দেখেনি। আজ প্রথম বারের মতো দেখছে। আর আজ প্রথম বারের জন্যই তার মনে হচ্ছে, ছেলেটা মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর। আর চিরন্তন সত্য হলো যে, শুভ্রর গায়ে শুভ্রের ছোঁয়া এমনিতেই দৃষ্টিনন্দন।
রাতের খাবার শেষ করে লরিনের বাড়ির লোক সবাই চলে গেলেন। রয়ে গেল কেবল লরিন আর এশা। এতক্ষণ সব স্বাভাবিক থাকলেও এখন লরিনের কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। তার এখন ইচ্ছে করছে চলে যেতে। মোহনাও তখন থেকে গম্ভীর। এশা আর মাহিয়া বেশ মজার মুডে থাকলেও লরিনের তাতে মন পুষছে না।
সবাই যার যার মতো শুয়ে পড়েছে।
মোহনা দুধের গ্লাসটা লরিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
‘আম্মু বলেছে, এটা খাওয়ার জন্য।’
লরিন বাধ্য ছেলের মতো ঢকঢক করে পুরো গ্লাস শেষ করল। মোহনা খালি গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে লরিনকে গিয়ে বলল,
‘উঠে দাঁড়ান।’
লরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘কেন?’
‘সালাম করল।’
লরিন বলল,
‘মুখে দিলেই হবে।’
মোহনা তাকে মুখেই সালাম দিল। তারপর সে বিছানায় পা উঠিয়ে বসল। লরিন চুপচাপ চেয়ে রইল। মোহনা তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কিছু বলবেন?’
মোহনা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘না, মানে হ্যাঁ।’
‘বলুন।’
লরিন বুঝতে পারছে না তার কেন এমন হচ্ছে। ছেলে মানুষের আবার এত কিসের অস্বস্তি। এটা তো তারই বউ। বউয়ের সামনে নো অস্বস্তি।
নিজের মনে সাহস জুগিয়ে সে বলল,
‘তুমি তো এখনও উত্তর দাওনি।’
‘কিসের?’
লরিন বিরক্ত হয়ে বলে,
‘ভুলে গেলে? ঐ যে ছাদে বলেছিলাম, ভালোবাসার কথা বলতে হবে।’
মোহনা তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
‘বিয়ে করেছি তাতেই খুশি থাকুন। এর থেকে আর বেশি কিছু করতে পারব না।’
লরিন কপাল কুঁচকে বলল,
‘যেন বিয়ে করে আমাকে উদ্ধার করেছে? আশ্চর্য, ছোট্ট একটা কথা, বলে দিলেই হয়; না, সেটা নিয়েও এত ঝামেলা করতে হবে। মেয়েদের মনে এত প্যাচ কেন বুঝিনা?’
মোহনা খুব ক্ষেপে গেল। তেড়ে এসে বলল,
‘এই যে মি. বেশি কথা বলবেন না। বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে ভাববেন না এখন আপনি যা খুশি তাই বলেই পাড় পারবেন। বেশি কথা বললে একদম সুই সুতা দিয়ে মুখ সেলাই করে দিব। সো, এখন থেকে সাবধানে কথা বলবেন, বুঝেছেন?’
লরিন তাকে পাত্তা না দিয়ে বলল,
‘এসবে আমি ভয় না। মি. ডানিয়েল লরিন তার সৃষ্টিকর্তাকে ছাড়া আর কাউকেই ভয় পায়না। আর আপনার মতো বাচ্চা মেয়েকে তো একদমই না।’
‘ও হ্যালো, আমি মোটেও বাচ্চা মেয়ে না। বয়স জানেন কত আমার? চব্বিশ। কয়দিন পর পঁচিশ এ পড়ব। আসছে আমাকে বাচ্চা বলতে। আর কি যেন বলছিলেন আপনি? আমাকে ভয় পান না, তাই না? শুনুন মি. নিজের বউকে ভয় পায়না পৃথিবীতে এমন কোনো পুরুষ মানুষ নেই। বড়ো বড়ো রাজা বাদশারাই বউয়ের ভয়ে সবসময় কাবু ছিলেন, সেখানে আপনি তো নিতান্তই একটা ক্ষুদ্র বালক। আপনাকে তো আমি তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিতে পারব।’
মোহনার কথা শেষ হতেই লরিন তার বাম হাতে জোরে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মুখের কাছে নিজের মুখ এনে ম্লান সুরে বলে,
‘আচ্ছা তাই? তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিতে পারবে। এত শক্তি তোমার? তাহলে তো একটু শক্তির পরীক্ষা করতেই হয়, তাই না?’
লরিন মোহনাকে চোখ মারে। মোহনা ঢোক গিলে বলে,
‘হাত ছাড়ুন।’
লরিন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
‘আজকের রাতে নো ছাড়াছাড়ি, ডিয়ার। চলো, একবার তাহলে শক্তির পরীক্ষা করা যাক।’
মোহনা রেগে গিয়ে বলল,
‘বাজে কথা বলবেন না, লরিন। আমার কিন্তু বিরক্ত লাগছে।’
‘এখন বিরক্ত লাগছে, আর একটু পর লজ্জা লাগবে। সমস্যা নেই।’
তারপর….
তারপর..একটা রোদ ঝলমলে সকাল এল। একটা নতুন সকাল। যার মিষ্টি রোদে মিষ্টি হাসল মোহনা। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, সামনে এক বিশাল জগত। পাশ ফিরে দেখল এক বিস্তীর্ণ ভালোবাসা। এই তো সামনের সুন্দর জগতে তার এই ভালোবাসা কী অপূর্বভাবে মিশে যাচ্ছে। যেন তারা একে অপরের পরিপূরক। আজ তার মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস এই ছেলেটা তার জীবনে এসেছিল, নয়তো এই অফুরন্ত প্রেম সে কোথায় পেত? কোথায় পেত এই নিদারুণ সুন্দর সময়? ভাগ্যিস, ছেলেটা তার জীবনে এসেছিল।
মোহনা উঠে চোখ বুজে দু হাত দু’দিকে মেলে দিয়ে উচ্ছাস নিয়ে বলতে লাগল,
‘I want to do with you,
What Spring does with the Cherry trees…I love you, lorin. I love you so much.’
সমাপ্ত।