প্রথম প্রেম পর্ব ৮

#প্রথম_প্রেম
৮ম পর্ব।

আজ তিন দিন হলো শাওন মেসে উঠেছে। রাজিব দরকারী সব জিনিস পত্র কিনে দিয়েছে। কিন্তু কোন ভাবেই মন ঠিকছেনা শাওনের। মন পরে আছে, অফিসার্স কোয়ার্টারে। উর্মি ছাড়া আজ তিন দিন, কেমন যেন অসহায় লাগছে। মনে হচ্ছে ভেতর টা পুরো ফাঁকা হয়ে আছে। এরই নাম হয়তো ভালবাসা!

উর্মি জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, হয়তো একবার শাওন রাস্তার উল্টো দিকের চায়ের দোকানে দাঁড়াবে। কিন্তু তিন দিনে তা হয়নি। শাওনের লেখা চিঠি গুলো যে কতশত বার পড়েছে উর্মি তার হিসেব নেই।
যেন সময় আটকে গিয়েছে, সব কিছু চলছে। কিন্তু কি যেন একটা নেই! যেটা রক্তের সাথে মিশে আছে, সেটাই নেই। আজ তিন দিন কতবার যে, যোগাযোগ করতে চেয়েছে উর্মি। কিন্তু প্রত্যেক বারই ব্যর্থ হয়েছে।

উর্মির বাবা তোফায়েল সাহেব কিছুক্ষণ আগে, বাসায় ফিরেছেন। তিনি মোবাইল চার্জে রেখে ওয়াশ রুমে গিয়েছেন। উর্মি চেষ্টা করছে, একটা কল দিতে যেন পারে, কারণ আজ তিন দিন ধরে রুনা খানম টেলিফোন তালা দিয়ে রেখেছেন। তাই, চেষ্টা করেও কাজ হয়নি। রুনা খানম তরকারি গরম করছেন, এই ফাঁকে উর্মি বাবার মোবাইল থেকে এস.এম.এদ লিখছে কাঁপা কাঁপা হাতে।

শাওন,
তিন দিন ধরে তোমাকে দেখিনা, দমবন্ধ লাগে। জানিনা কবে দেখা হবে! তুমি ভালো থেকো। এটা বাবার নাম্বার।
প্লিজ নো কল নো এস.এম.এস
উর্মি।

এস.এম.এস দিয়েই ডিলিট করে ফোন জায়গায় রেখে দিল, তবে খুব আনন্দ লাগছে যে, শাওন এর সাথে তো সামান্য যোগাযোগ হলো।

শাওন এই এস.এম.এস পাওয়ার পরে মন কিছুটা শান্ত হয়েছে। উর্মি তাহলে তাকে মনেই রেখেছে। শাওনের ও লিখিতে ইচ্ছে করছে, হ্যা উর্মি আমারও দম আটকে আছে।

এভাবে প্রতিদিন কত কত অচেনা নাম্বার থেকে উর্মি এস.এম.এস দিয়েছে। কিন্তু নিচে একটা কথা লিখা ঠিকই আছে, সেটা হচ্ছে নো কল, নো এস.এম.এস।
শুধু কখনো লিখে এটা বাবার নাম্বার, কখনো ফুপির, কখনো চাচীর। এজন্য শাওনের কন্টাক্ট লিস্টে অনেক গুলি নাম্বার সেইভ করা, উর্মিস ফুপি, উর্মিস আপু, এইভাবে। সুযোগ পেলেই এস.এম.এস করে উর্মি, তবে রিপ্লাই এস.এম.এস দেওয়ার সুযোগ থাকেনা। কথা নাই, ফোন কল নাই, দেখা নাই, তবুও মনে হয়, উর্মি আছে খুব, খুব কাছে।

দুইমাস ধরে এভাবেই এস.এম.এস দিচ্ছে উর্মি। কিন্তু আজ উর্মির কাছে কথা বলার সুযোগ এসেছে। কারণ উর্মির নানু কল করে বলেছেন, তার সাথে থাকা মেয়েটি আজ বাড়ীতে যাচ্ছে, যেন এক রাত উর্মি গিয়ে থাকে। কিন্তু উর্মির মায়ের মেয়েকে দেওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই। তার ধারনা যদি শাওন কে কল দেয় তার মেয়ে। তাই তিনি বার বার বলছেন, তুমি চলে আসো আম্মা, উর্মি গিয়ে কি করবে।

কিন্তু উর্মি শুধু প্রার্থনা করছে যেন নানুর কাছে থাকা লাগে। সে চিন্তা করে রেখেছে সে প্রথমেই রাজী হবেনা। নয়তো তার বুদ্ধিমতী মা, সহজেই ধরে ফেলবেন, সে কোন প্ল্যান করছে।

রুনা খানম উর্মিত রুমে এসে বললেন, এই উর্মি তোর নানুর বাদায় থাকতে যাবি?
– তুমি যাচ্ছ নাকি?
– আরে না, এখন উদয়ের স্কুল খোলা।
– তাহলে?
– তুই একা থাকবি, আমি দিয়ে আসবো, আর সকালে তোর বাবা গিয়ে নিয়ে আসবে, আম্মার বাসা থেকে স্কুলে যাবি।
– না, আমার যেতে ইচ্ছে করছেনা।
– তুই যা, তোর নানু একা আছেন।
– আমার…
– আর কথা না, রেডি হ। আর হ্যা, আম্মার মোবাইল ধরবি না।
– আমি তো যেতেই চাচ্চিনা।
– রেডি হ।

উর্মি নানুর বাসায় পৌছেই মোবাইল চার্জে দিল। কারণ সে আজ শাওনের সাথে কথা বলবেই, ঠিক করে নিল। তাই নানু, ওয়াশ রুমে যেতেই এস.এম.এস করলো।

শাওন,
আজ রাতে কথা বলবো, প্লিজ রিচার্জ করে রেখো
আমি রাত হলেই কল দিব, এটা নানুর নাম্বার।
উর্মি।

শাওন এই এস.এম.এস পেয়েই ফোন কার্ড এনে রিজার্জ করে রাখলো, তার উত্তেজনায় ভাত খেতে ইচ্ছে করছেনা। কখন শুনবে সেই মধুর কন্ঠ?

নানু ঘুমানোর পরেই উর্মি কল দিল,

হ্যালো,
– কেমন আছ তুমি?
– হুম, তুমি?
– ভালো নাই তুমি ছাড়া।
– কি?

উর্মি প্রথম এক/দুই মিনিট লজ্জা পেলেও পরে ঠিকই কথা বলেই গেল খুব আনন্দ নিয়ে নিঃসংকোচে। ফিসফিস করে কথা বলেই গেল উর্মি।

নানুর ফোনের টাকা শেষ হলো, শাওনের ফোনের টাকা শেষ হলো। তবুও কথা যেন শেষ হচ্ছেনা। কখন যে, রাত চারটা হয়েছে একদম বুঝেনি উর্মি। এবং এই গরমে সে যে, ফ্যান অন করেনি তাও খেয়াল করেনি , আর একদমই গরম লাগেনি। সত্যি প্রিয়জনের সাথে কথা বলার সময় এতো অল্প লাগে কেন!

উর্মি ফোন রেখে মনে হচ্ছে আজকের মতো এতো আনন্দের রাত আর তার কখনোই আসেনি। এতো আনন্দের ছিল প্রতিটি ক্ষণ! শাওন ছাড়া আসলেই সে অসহায়, তার বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়।

কিন্তু উর্মির এতো কিছুর পর হঠাৎ মনে হলো এখন ফযরের আযান দিবে নানু উঠে যাবেন। তিনি যদি ফোনের ব্যালেন্স চেক করেন তাহলে ঠিকই বুঝে ফেলবেন। এমন কি ফোনের চার্জ ও শেষ। ঠিক সাতটায় তার বাবা তাকে স্কুলের জন্য নিতে আসবেন, উঠতে কি পারবে! আর এখন জেগে থাকতে দেখলে নানু কি ভাববেন? তবে কি তিনি মাকে সব বলে দিবেন?

কত কিছু চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে উর্মির, এদিকে অনেক বেশি আনন্দ ও হচ্ছে কথা বলে! কি হবে সকালে? নানু কি সব বুঝে যাবেন? উর্মি ফোন নানুর বালিশের কাছে রেখে শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম একদম নেই, কি হবে এই চিন্তায়…..

চলবে…

আন্নামা চৌধুরী।
২০.০৭.২০২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here