প্রাক্তন পর্ব ২৩+২৪

#প্রাক্তন
#লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব- ২৩

আমি বুঝতে পারছিলাম না সোহান কী বলবে। তাই শান্ত গলায় বললাম

– কী বলবি বল।

সোহান মাথাটা নীচু করে বলল

– আংকেল তুই আসার পরেই স্ট্রোক করেছেন। কোন হাসপাতালে আছে জিজ্ঞেস করলাম বলল না। বারবার জানার চেষ্টা করলাম বলল না। তোর ভাই কল দিছিল। ওরা তোর বাবার এ অবস্থার জন্য তোকে দায়ী করছে। কারণ তোর বিষয়টা পত্রিকায় তোর ছবি দিয়ে ছাপা হয়েছে। অনেকে তা দেখে তোর বাবাকে কটুক্তি করে কথা বলেছে। তাই সেটা নিতে না পেরে এ অবস্থা।

সোহানের কথা শুনে মনটা ভেঙ্গে গেল। ভাবতে লাগলাম আমি দোষী না তবুও আমার ছবি ছাপিয়ে সবাইকে জানাতে হলো। আর যারা অপরাধ করল তাদের কেউ চিনল না। এ সমাজ শুধু ভূক্তভেগীদের ভোগান্তিতে ফেলতে ব্যস্ত। সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে তাতে তাদের কোনো হুঁশ নেই। সবাই যেন আমাকে দোষী করতেই ব্যতিব্যস্ত। মানুষ কিছু বুঝুক আর না বুঝুক কথা শুনাতে মহা ব্যস্ত। কাউকে কয়টা কথা শুনিয়ে যেন তারা শান্তি পায়। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। চোখ দিয়ে গড় গড়িয়ে পানি পড়ছে। টুকটুকি আমার চোখের জল মুছে দিতে ব্যস্ত। আমার ফোনটা নিয়ে মামাকে কল দিয়ে বাবা কোন হাসপাতালে জিজ্ঞেস করলাম। মামাও আমাকে দুইটা কথা শুনিয়ে রেখে দিল। ঠিকানা দিল না বাবা কোথায় আছে। কষ্টে যেন আরও বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। যাদেরকে কল দিচ্ছিলাম সবাই কথা শুনাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বড় অন্যায় করে ফেলেছি। অনেক খুঁজ নেওয়ার পরও জানতে পারলাম না বাবা কোন হাসপাতালে। মা,ভাই তো কল ও ধরছে না। বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে। আজকে বাবার কিছু হলে সেটার দায়ভার আমার উপর পড়বে। সবাই বলবে আমি বাবার খুনী। আমার জন্য বাবা মারা গেছে। কেউ বলবে না কিছু মানুষের বিষের মতো জবানের জন্য বাবার মৃত্যু হয়েছে। চোখে যেন আপন গতিতে পানির ধারা বইয়ে চলেছে আর টুকটুকিও চোখের জল মুছতে মহা ব্যস্ত। সোহান পাশে দাঁড়িয়ে আছে তবে কী সান্ত্বনা দিবে সে ভাষা সোহানের নেই। আমার বুকটা ধরফর করছে বাবাকে এক মুহূর্ত দেখার জন্য তবে বাবার খুঁজ মিলল না।

এর মধ্যেই সোহানের মা আসলো। আমাকে সোফায় বসে কাঁদতে দেখে মোটেও চমকাল না। উনার কাছে বিষয়টা অতিস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যদিও জানি না কেন। তবে মনে হচ্ছে সোহান আমার ব্যপারে আন্টিকে সব বলেছে। আন্টি আসার সাথে সাথে টুকটুকি কোল থেকে নেমে গিয়ে আন্টিকে ধরে বলল

– দাদুমনি মা কাঁদছে কেন? মা কে বলো, না কাঁদতে। মায়ের কান্না দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে তো। ও দাদুমনি। মাকে বলো না, কান্না না করতে।

আন্টি এবার টুকটুকির কথা শুনে একটু বিচলিত হলো। ইতোমধ্যে আমি যে টুকটুকির মা হয়ে গেছি সেটা উনি হয়তো বুঝতে পারে নি। সোহান নির্বাক। এ পরিস্থিতিতে সে কী বলবে সেটা সোহানের হয়তো জানা নেই। চুপ হয়ে আছে সে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কথোপকথন শুনছিল। আন্টি সোহানের দিকে তাকিয়ে বলল

– কী রে অপ্সরা কাঁদছে কেন? আবার কী কিছু হয়েছে?

সোহান হালকা গলায় বলল

– ওর বাবা অসুস্থ। আর বাকি ব্যাপার তো তুমি জানো।

আন্টি আমার পাশে এসে বসলো। টুকটুকি এবার আমার কোলে বসলো। আন্টি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল

– মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছ তো সহ্য একটু করতেই হবে। মেয়েরা বিয়ে করলেও দোষ,বিয়ে না করলেও দোষ। শান্তি কোথাও নাইরে মা। শান্তি খুঁজে নিতে হয়। রুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আগে কিছু খেয়ে নাও। মারে সামনের পথটা চলতে হবে। ভেঙ্গে গেলে হবে না। ছোট বেলায় তোমাকে দেখেছিলাম। কত সুন্দর ছিলে। আর আজ নিজের যত্ন না নিতে নিতে কেমন হয়ে গেছ দেখেছো কী। যাও ঘরে গিয়ে নিজের যত্ন নাও। নিজেকে আগে সুন্দর করো স্বাভাবিক করো বাকিসব দেখবে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তুমি স্বাবলম্বী মেয়ে তোমার চিন্তা কী এত।

আন্টির কথায় একটু সাহস মিলল। বসা থেকে উঠতেই যেন মাথাটা ঘুরপাক খেল। সোহান হালকা হাতে আমাকে ধরে ফেলল। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সোহানকে ধরে বললাম কোন রুমে যাব বল। সোহান আমাকে ধরে নিয়েই পাশের রুমে গেল। আমাকে শুইয়ে দিয়ে বলল

– আগে বিশ্রাম কর।

আমি শুইয়ে রইলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। সোহান রুম থেকে বের হয়ে গেল। ফোনটা বেজে উঠল। আবিরের মা কল দিয়েছে। আমি কলটা ধরতেই বললাম

– মা.. মা বলেও কথা ঘুরিয়ে বললাম আন্টি কী বলবেন বলুন।

আবিরের মা বেশ নরম গলায় বলল

– মা ডেকেও কেন পরে আন্টি ডাকলে? পূত্র বধূ করতে পারব না তবে মেয়ের জায়গাটা তো আগেই দিয়ে দিছি। মা রে আমি এসবের কিছুই জানতাম না। জানলে এত নোংরামো আমার ছেলেকে দিয়ে করতে দিতাম না। আমি জানি তোমার সাথে যা হয়েছে অনেক বড় অন্যায় হয়েছে। এর দায় এড়ানো যাবে না। তবে আবিরের চাকুরিতে কোনো সমস্যা করো না। আমার একটা মাত্র ছেলে। ওকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে পারমানেন্ট কোনো স্টেপ যেন না নেয় মা। আমার রোজগারের আর কেউ নেই পরিবারে। আবিরের ইনকাম ছাড়া সংসার অচল হয়ে পড়বে। এরকমটা করো না মা। যা হয়েছে তার জন্য আমি মা হয়ে আবিরের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি ক্ষমা করে দাও।

আমি চুপ হয়ে শুনে আবিরের মা কে বললাম

– আচ্ছা আমি বিষয়টা ভাববো। ভালো থাকবেন।

আর কিছু বলতে পারলাম না কলটা কেটে দিলাম। মনে হচ্ছে আমি কী সত্যিই বাড়াবাড়ি করছি নাকি ঠিক আছে। পরক্ষণেই মনে হলো তারাও আমার সাথে কম বাড়াবাড়ি করে নি। তাহলে আমি কেন ছেড়ে দিব। ফোনটা আবার বেজে উঠল। কলেজের প্রিন্সিপাল কল করেছে। কলটা ধরে সালাম দিলাম উনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন

– অপ্সরা যেভাবে তোমার বিষয়টা ফোকাস হয়েছে সেটা সত্যিই আমরা আশা করিনি। কলেজের প্রতিটি স্টুডেন্টের উপর এর প্রভাব পড়বে। আপাতত কী বাড়াবাড়ি না করলে হয় না। কলেজের একটা রেপোটেশন আছে সেটা যেন নষ্ট না হয়।

উনার কথাটা শুনে হালকা রাগ জমল। বেশ জোরেসোরেই বললাম

– অন্যরা না হয় অশিক্ষিত বোকা,আপনি তো শিক্ষিত। আমি কেন তাদের ছেড়ে দিব। কলেজের স্টুডেন্টরা আমার থেকে কী শিক্ষা নিবে তাহলে? তারা এ শিক্ষা নিবে কীভাবে অন্যায় করার পরও অন্যায় কারীকে ছেড়ে দিতে হয়? এটা কী আদৌ উচিত হবে তাদের ছেড়ে দেওয়া।

– তুমি বিষয়টা নেতিবাচক করে নিচ্ছ। বিষয়টা তা না। কলেজের বাচ্চাদের উপর এটার প্রভাব পড়বে। সে সাথে অভিভাবকদের উপর। কলেজের সুনামও নষ্ট হবে।

– কলেজের সুনাম কখনও একটা টিচারের ব্যাক্তিগত বিষয়ের উপর নির্ভর করে না। এটা পুরোপুরি আমার ব্যক্তিগত বিষয়। এটার সাথে কলেজের কোনো কিছু জড়িয়ে নেই। সুতরাং এ ব্যাপারে স্থগিত করব কী না সেটা শুধু আমার ব্যাপার। আমাকেই ভাবতে দিন। কলেজের কোনো ব্যাপার হলে আমি আপনার কথা মেনে নিতাম। তবে আমার ব্যাক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ রইল।

– আচ্ছা করলাম না। তেমাকে জানানো বা সাবধান করার দরকার ছিল সেটা করলাম। বাকিটা একান্তই তোমার ব্যাপার।

বলেই কলটা কেটে দিল। আমি শুধু ভাবতে লাগলাম। সবাই যেভাবে আমার পেছনে উঠে পড়ে লেগেছে মনে হচ্ছে অন্যায় আমি করেছি। এ সমাজ তো বদলে দিবে না কাউকে আর এ সমাজ ও বদলানো যাবে না তাই নিজেকে বদলে নিজের স্থান তৈরী করে নিতে হবে।

সাহস জুগাতে লাগলাম মনে। আবির তার শাস্তি পাচ্ছে। নাহয় তার মা কল দিত না। অরন্যের হদিশ নেই। নাফিসাও আর কল দেয়নি৷ নোংরা সম্পর্কের থেকেও মুক্তি পেয়েছি৷ বাবা কোথায় আছে জানি না। বাবার জন্য খরাপ লাগছে। মন থেকে বাবার জন্য দোয়া করে যাচ্ছি। জানি এ খারাপ সময় বেশিদিন থাকবে না তবে খারাপ সময় গুলো বড্ড বাজে তাড়াতাড়ি যেন পার হয় না। টুকাটুকি এসে আমার পাশে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল

– মা চোখ বন্ধ করো আমি মাথা টিপে দিচ্ছি। একটু ঘুম দাও তুমি।

বলেই কপালে হালকা চুমু দিল। টুকটুকির শীতল স্পর্শ আমাকে আলিঙ্গন করল। তাকে ধরে জড়িয়ে নিলাম বুকে। বেশ মিশে পড়েছে। জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না।

ঘুম থেকে উঠার পর সোহান যা বলল তা শুনে নিজের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল।
#প্রাক্তন
#লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব- ২৪

(নোট- এক পর্বে শেষ করা গেল না। আরেকটি পর্ব লাগবে।)

ঘুম থেকে উঠার পর সোহান যা বলল তা শুনে নিজের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল। অরন্যকে কেউ একজন খুন করেছে। আর সেটার দায় চাপানো হচ্ছে আমার উপর। সবাই সন্দেহের তীর আমার দিকে যে, আমি অরন্যকে খুন করেছি। এ অবস্থায় কী করব আমি জানি না। অরন্যকে আমি ভালোবাসি না এটা ঠিক, তবে অরন্যের মৃত্যু কামনা কখনও করিনি। যতই হোক একটা সময় আমি তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম আজকে যেন তার মৃত্যুটা আমার গলায় কাঁটা হয়ে বিদে রইল। কথা বলতে পারছি না হাত পা কাঁপছে। ময়না তদন্তে পাঠানো হয়েছে ওর লাশ। জানি না অরন্যকে কে খুন করল। তার স্বার্থই বা কিসে নাকি অরন্য আত্মহত্যা করেছে। সে আত্মহত্যা করলে হয়তো নিজেকে কখনও সামলে নিতে পারব না। কষ্ট হচ্ছে অনেক। চাপা কষ্ট গুলো ভীষণ রকম যন্ত্রণা দেয়। জীবনের গতি হারিয়ে ফেললাম পুনরায়। ময়না তদন্তের রিপোর্ট দিবে সন্ধ্যায়। তবে আমি কী আমাকে স্থির রাখতে পারব? সোহান আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার ঠিক পাশে এসে বলল

– তোর সে রূপটায় এখন ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতি হয়তো তোকে শক্ত করতে বাধ্য করেছে তবে তুই যে কোমল সেটা আবারও প্রকাশ পেল। নাহয় অরন্যের জন্য এতকিছুর পরও তোর চোখ ভার হয়ে আসতো না। অরন্যকে অনেক ভালোবাসিস তাই না?

উত্তরটা দিতে পারলাম না। চোখ দিয়ে দু ফুটো জল শুধু গড়িয়ে পড়ল। কারণ উত্তর দেওয়ার মতো কোনো উত্তর আমার অভিধানে পাচ্ছি না। চুপচাপ বসে রইলাম। মনে আওরাতে লাগলাম কে খুন করল অরন্যকে। অরন্যের মুখটা চোখে ভেসে আসতে লাগল। সামলাতে পারলম না জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। সোহান আমাকে ধরল। আমি যেন আরও জোরে কাঁদার সাহস পেলাম। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলাম। জানি না কতক্ষণ কেঁদেছি। কাঁদতে কাঁদতে একটা পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সারাটাদিন ছন্নছাড়া হয়ে পার করলাম। বাবার খোঁজ পেলাম। বাবা আগের চেয়ে সুস্থ। আবির জেলে। সব মিলিয়ে একটু আশা একটু নিরাশা নিয়েই দিনটা পার হলো।

সন্ধ্যায় ময়না তদন্তের রিপোর্টটায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হলো অরন্যকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। সে সাথে আরেকটা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল। সেটা হলো অরন্যকে হত্যা করেছে নাফিসা। নাফিসার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। কেন জানি না কথাটা শুনার পর অনেক খারাপ লাগল। চার বছর আগে এ নাফিসার জন্যই অরন্য আমাকে ছেড়েছিল। সে দেখেছিল টাকা। কিন্তু সে টাকা অরন্যকে সুখ দিতে পারল না। অরন্যের জীবনটা আরও তছনছ করে দিল। শেষমেষ যার জন্য আমাকে ছেড়েছিল তার হাতে খুন হলো।

নাফিসার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অরন্যকে সে খুন করেনি। অরন্য তাকে অপমান করেছে, তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে নাকচ করেছে এ বিষয়টা তার খারাপ লেগেছিল তাই খুনের হুমকি দিয়েছিল কিন্তু খুন করেনি। তবে সকল প্রমাণ সাক্ষ্য দেয় নাফিসায় অরন্যকে খুন করেছে। যদিও সব খুনী স্বীকার করে না সে খুন করেছে। জানি না অরন্যকে খুন করে তার কী লাভ হলো। কতটা জঘন্য হলে মানুষ এমন কাজ করে। অথচ বিয়ের পর নাফিসায় অরন্যকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। বুকের ভেতরটায় কম্পন দিতে লাগল। পরিণতি কখন কীভাবে রূপ নেয় তা বলা যায় না। টুকটুকি ঝোঁকের মতো পাশে বসে ছিল। সোহান ও এক মুহুর্তের জন্য আমাকে একা ছাড়ে নি।

নাফিসাকে জেলে নেওয়া হলো। অরন্যের বিষয়টাও আমার জীবনে অস্পষ্ট স্মৃতি করে এক কোণে জমা রাখলাম। আবিরকে চাকুরি থেকে পুরোপুরি বরখাস্ত করেনি৷ তবে ২ বছর সে চাকুরির কোনো বেতন পাবে না। আস্তে আস্তে আমার বিষয়টা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। কেউ আমাকে ভালো বলছে কেউ আমাকে দোষী করছে। তাতে আমার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বাবা এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন। তবে বাসায় যাবার অনুমতি এখনও পাইনি। কলেজে নিয়মিত ক্লাস করতে যাই। স্টুডেন্টরা আমাকে দেখে কেউ মুখ টিপে হাসে কেউ এসে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে।

কেটে গেল এক মাস। টুকটুকিকে নিয়ে বেশ ভালোই ঘটরমটর করে চলছে জীবন। অরন্যকে খুব বেশি মনে পড়ে। আজকে একটু বেশিই মনে পড়ছে ওকে। কেন জানি না ওর হাসিটা না চাইতেও চোখের সামনে ভাসছে। পুরনো সেই স্মৃতি গুলো বারবার ব্যাগরা দিচ্ছে। প্রচন্ডরকম ভাবে অরন্যকে অনুভব করছি। কেন এমন হচ্ছে আমার। জানালার পাশে দাঁড়িয়েই সে মধুমাখা কালো অতীত গুলো মনে করে কখনও হাসছিলাম কখনও কাঁদছিলাম। এমন সময় কারও হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। সোহান পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি সোহানকে দেখে তার দিকে তাকালাম। সোহানও আমার দিকে তাকাল। হালকা গলায় বলল

– পুরনো আঁকড়ে আর কতদিন থাকবি। একটু তো নিজেকে শান্ত করতে পারিস। জীবনের সুখ গুলো খুঁজে নিতে পারিস।

– আমার জীবনে সুখ খোঁজা আর মরীচিকার পেছনে ছুটা এক কথা রে। আচ্ছা সোহান অরন্যের পরিণতি এমন না হলেও তো পারত। এমন কেন হলো।

– সব প্রশ্নের উত্তর তো আমার কাছে নেই। তুই এখনও অরন্যকে ভালোবাসিস বেশ ভালোই বুঝা যাচ্ছে। অরন্য তোর সাথে যা করেছে তার শাস্তি সে দুনিয়াতে পেয়েই ওপারে গেছে। তার জন্য দোয়া করিস যেন ওপারে ভালো থাকে।

সোহানের কথাটা শুনে হুহু করে কেঁদে দিলাম। সোহান হাত দুটো ধরে বলল

– কাঁদিস না। একটু সামলে নে নিজেকে।

সামলাতে পারছিলাম না। চোখগুলো ঘোলা হয়ে আসছিল। ভেতরটা অশান্তিতে পুড়ে যাচ্ছিল। বড্ড বেশি বেহায়া আমি এত কিছুর পরও অরন্যের এ পরিণতি মেনে নিতে পারছি না। মাথাটা ঝিম ঝিম করতে লাগল। আমি সোহানের কোলেই ঢলে পড়লাম।

চোখ খুলে দেখলাম বিছানায় শুয়ে আছি। টুকটুকি আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে। আন্টি পাশের চেয়ারটায় বসে আছে। সোহান ঘরে প্রবেশ করলো। আন্টি সোহানের দিকে তাকিয়ে বলল

– অপ্সরার কী হয়েছে? ডাক্তার কী বলল?

– তেমন কিছু না। অনিয়ম করে চলে তো। প্রেসার লো। ওর জন্য একটু স্যুপ করে দিতে পারবে মা।

– এখনি আনছি।

বলেই আন্টি চলে গেল। সোহান টুকটুকিকে কোলে নিয়ে বলল

– মামনি দাদু মনিকে একটু সাহায্য করো গিয়ে মায়ের খাবার বানাতে।

টুকটুকি কোল থেকে নেমে দৌঁড়ে রুম থেকে বের হলো। সোহান আমার পাশে বসলো। আমি হালকা গলায় বললাম

– কিছু বলবি?

সোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল

– তুই প্র্যাগনেন্ট। সিমটম দেখে ডাক্তার তাই বলে গেল। পুরোপুরি নিশ্চিত না তবে ডাক্তার বলল আল্ট্রা করতে। কাল গিয়ে একটা আল্ট্রা করে আসিস। আর বাচ্চাটা অরন্যের। অরন্যও বেঁচে নেই। কী করবি তুই।

– কাল আল্ট্রা করে আগে নিশ্চিত হই তারপর ভাবা যাবে। টুকটুকি কোথায়?

– পাশের রুমে খেলছে।

– আন্টি জানে কিছু?

– মাকে কিছু বলেনি। বললে স্বাভাবিক ভাবে নিবে না।

– হুম ভালো করেছিস।

– কিছু খেয়ে নে। আর মা স্যুপটা আনলে খেয়ে নিস।

– খাব পরে।

সোহান আর কোনো কথা বলল না, চলে গেল। আমি চুপ হয়ে শুয়ে আছি। অরন্য চলে গেলেও তার শেষ স্মৃতিটা আমায় দিয়ে গেছে। ভাবনার দেয়ালগুলোতেও আজকাল ফাটল ধরেছে। ভাবতে গেলেও যেন অতীত গুলো অস্পষ্ট হয়ে সামনে চলে আসে। অরন্যের জন্য একটু বেশিই খারাপ লাগছে। যদিও মানুষটার মৃত্যু আমি কামনা করে নি।

এর মধ্যেই আন্টি স্যুপ নিয়ে আসলো। আমার দিকে স্যুপটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল

– স্যুপটা খাও। আর নিজের একটু যত্ন নাও।

আমি তেমন কোনো কথা বললাম না। মাথাটা নেড়ে গেলাম। হালকা খেয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করে নিশ্চিত হলাম আমি প্রেগন্যান্ট। প্র্যাগনেন্সি বিষয়টা বেশ জটিল একটা বিষয়। কেউ চায় মা হতে তবুও হতে পারে না। কেউ চায় না সময়ের আগে তার জীবনে এ অধ্যায় আসুক তবুও না চাইতেও চলে আসে। এ বাচ্চাটা নষ্ট করব না। এর কোনো দোষ নেই। একে মানুষ করার মতো ক্ষমতা আমার আছে। তবে সমাজ কী এ বাচ্চাটাকে মর্যাদা আদৌ দিবে? সে কথায় শুধু ভাবছিলাম।

এসব ভেবে ভেবেই বাসায় ফিরলাম। টুকটুকি এসে জড়িয়ে ধরল। ওকে কিছুক্ষণ আদর করে জড়িয়ে ধরে রুমে গেলাম। রুমে যেতেই সোহান এসে জিজ্ঞেস করল

– রিপোর্ট কী?

নম্র গলায় উত্তর দিলাম

– পজিটিভ।

– কী করবি?

– বাচ্চাটাকে পৃথিবীর মুখ দেখাব। তবে বাচ্চাটার জীবন হয়তো বাবা ছাড়া ছন্নছাড়া হবে। অনেক শক্ত করে ওকে মানুষ করতে হবে নাহয় এ সমাজ ওকে তিলে তিলে মেরে ফেলবে।

– আচ্ছা অপ্সরা তুই টুকটুকির মা হয়ে যা আর আমি তোর বাচ্চার বাবা। ভালো হবে না বিষয়টা? এ বাচ্চা নাহয় আমার পরিচয়ে মানুষ হবে আর টুকাটুকির মায়ের পরিচয়ে তুই। তোকে আমি পছন্দ করি কখনও বলা হয়নি। কারণ তুই যে অবস্থায় ছিলি কখনও তা বিশ্বাস করতি না। একটু এদিকে আয়।

বলেই সোহান আমার হাত ধরে টানতে টানতে তার ঘরে নিয়ে গেল। এ বাসায় আসার পরও একটাবারও আমি সেহানের ঘরে যাই নি। আজকে এ প্রথম আসলাম। টেবিলের উপর একটা ছোট্ট পুতুল বেশ সযত্নে সাজানো যেটা সোহানকে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় দিয়েছিলাম। সোহান তার আলমিরা টা খুলে আমার দেওয়া সব স্মৃতি গুলো দেখাতে লাগল। আর হালকা গলায় বলল

– তুই যখন যা দিয়েছিস যত্ন করে রেখেছি। তোকে ভালোবাসি কখনও মুখ ফুটে বলতে পারিনি আমি। অরন্যের ব্যাপারটা জানার পর আরও বলেনি। কারণ তোকে সবসময় পাশে চেয়েছিলাম। একটা সময় পর তুই না বলেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিস। এর তার কাছে মাঝে মাঝে খোঁজ নিলেও পরে আর খোঁজ ও পাইনি। অপ্সরা বড্ড ভালোবাসি। আর এটা আবেগ না। আবেগের বয়স পার করে এসেছি বহুদিন হলো। আমি তোর ভালোবাসা চাই না। চাই তুই আমার পাশে থাক আমার ভালোবাসা গ্রহণ কর।

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। সোহানের ভালোবাসায় কোনো লোভ নেই। তবুও অন্যের বাচ্চা নিজের করে সে কী নিতে পারবে? এ ভাবনাটা আসতেই বলে ফেললাম

– অরন্যের বাচ্চা আমার পেটে তাকে কী তুই মানতে পারবি?

– নিজের বাচ্চার মতো দেখব। ঐ বাচ্চার কোনো দোষ নেই। কেউ জানবে না এটা অরন্যের বাচ্চা, সবাই জানবে এটা আমার বাচ্চা। তুই চাইলে আজ কালকের মধ্যে বিয়ে করব। বলব বিয়ের পর পরই বাচ্চা নিয়ে ফেলেছি। হাতে বেশি সময় নেই অপ্সরা কী করবি বল। না করিস না প্লিজ।

সোহানের দিকে তাকালাম। তার ভালোবাসায় আবদ্ধ চোখ গুলো আমার চোখে নিবিদ্ধ হলো। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। তাই বেশ হালকা গলায় বললাম

– এখন থেকে তুমি করে ডেকো। স্ত্রী হলে তুই করে ডাকলে মানুষ কী বলবে।

আমার কথাটা শুনে সোহান আমাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল। পরক্ষণেই ছেড়ে দিয়ে বলল মাকে জানিয়ে আসি। চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম

– মা কী রাজি হবে?

– অনেক আগেই রাজি করিয়েছি। তার ছন্নছাড়া ছেলে বিয়ে করবে এটাই তো বেশি। বাবা থাকলে হয়তো খুশি হতেন। তবে বাবা তো ভাইয়ের ব্যাপারটা সহ্য না করে ওপারে চলে গেছেন। মাকে বলতে হবে তোর বাবা মাকে জানাতে।

– আমার বাবা মা কে জানাতে হবে না। তারা তো বলেই দিয়েছে তাদের মেয়ে আমি না।

– তুই বোকা বোকায় রয়ে গেলি। মা, বাবা হয়তো একটু অভিমান করেছে সেটা ঠিক ও হয়ে যাবে। ওরা চাচ্ছিল তোর একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ হোক। তাই এমনটা করেছে। আর আমি কী পাত্র হিসেবে খারাপ নাকি যে পছন্দ হবে না।

কথাটা বলে সোহান নিজের কলারের এক কোণা একহাতে নিজে ধরে আমার দিকে তাকাল। আমি পরক্ষণেই হালকা হেসে দিলাম। অনেক কষ্টের মধ্যে একটু খানি প্রশান্তি। হালকা হেসে বললাম

– আমার সামনে থেকে যা তো।

সোহান আমার কানের কাছে এসে বলল

– বড্ড ভালোবাসি তোকে। সরি তুমি হবে। বড্ড ভালোবাসি তোমাকে। ধুর বাল তুই এই সুন্দর। বড্ড ভালোবাসি তোরে। গেলাম আমি মাকে বলতে।

বলেই চলে গেল সোহান। আর আমি সোহানের রুমে বসে রইলাম।।এদিক ওদিক চোখ বুলাতে লাগলাম। সারা ঘরেই আমার দেওয়া টুকুটাকি জিনিস পত্র। ক্যালেন্ডারে চোখ গেল। ক্যালেন্ডারটা বেশ পুরনো। এত পুরনো ক্যালেন্ডারও টানিয়ে রেখেছে। বিষয়টা দেখে মনে হলো সোহান একটু বেশিই পাগল। তাই বসা থেকে উঠে ক্যালেন্ডারের কাছে গিয়ে সেটা হাতে নিলাম। সাথে সাথে বেশ চমকে গেলাম। সোহান কী আমার সাথে নাটক করল?

(কপি করা নিষেধ)
(কপি করা নিষেধ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here