প্রাণ_ভোমরাপর্ব ৩৬+৩৭

#প্রাণ_ভোমরা
#রোকসানা_রাহমান

পর্ব (৩৬)

রিধি থেমে যেতে হৃদ্যের মুখের রঙ পাল্টে গেল। অজানা ভয়ে শিউরে উঠল সারা শরীর। সে শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে বলল,
“কী দেখলি আপু?”

রিধি চুপ। ভাইয়ের মুখের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ। আপুর এই নিশ্চুপভঙ্গি সহ্য হচ্ছে না হৃদ্যের। ভেতরে চলছে তুমুল ছটফটানি! সে ধৈর্য্য হারিয়ে বলল,
“কী হলো,আপু? বল না কী দেখলি?”

এ পর্যায়ে রিধি হেসে ফেলল। সহাস্যে বলল,
“তেমন কিছু নয়। একটু অসুস্থ। মনে হয়..”
“অসুস্থ?”

ভাইয়ের আকস্মিক চিৎকারে রিধি থেমে যেতে বাধ্য হলো। আতঙ্কিত মুখে চেয়ে বলল,
“এত ভয় পাচ্ছিস কেন? একটু জ্বর হয়েছে শুধু।”

হৃদ্য বুঝি আপুর কথাগুলো শুনল না৷ সে সটাং দাঁড়িয়ে পড়ল। ওষুধ ফেলে দরজার দিকে ছুটতে রিধি দ্রুত প্রশ্ন করল,
“কোথায় যাচ্ছিস?”

হৃদ্য উত্তর দিল না। হাবভাব বলছে তার সময়ের বড্ড অভাব। একটু এদিক-সেদিক তাকালে ভয়ানক সময়ের অভাবে ভুগবে! রিধি ভাইয়ের পিছু পিছু আসতে আবার বলল,
“ভ্রমরের বাবা বাসায় আছে কিন্তু!”

হৃদ্য সিঁড়ির মাঝপথে থেমে গেল। রেলিংটা চেপে ধরল শক্ত হাতে। রিধি পেছন থেকে সামনে এসে অবাক স্বরে বলল,
“পাথর হয়ে গেলি যে? ভ্রমরকে দেখতে যাবি না?”

হৃদ্য এক পলক আপুর দিকে তাকাল। পর মুহূর্তে চোখ ফিরিয়ে রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য হাঁটা ধরলে রিধি বলল,
“তুই এত ভীতু? আগে জানতাম না তো!”

হৃদ্য আর এক মুহূর্তের জন্য থামল না। আপুর দিকে তাকাল না। যে গতিতে ছুটে এসেছিল সেই গতিতে ফিরে যাচ্ছে। রিধি ঠোঁট চেপে হেসে ভাইয়ের পাশাপাশি পা ফেলছে। উঁকি দেওয়ার ভঙ্গিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভ্রমরের বাবা কি খুব ক্ষমতাশালী লোক? খুন করে লাশ গুম করে দেওয়ার মতো লোকজন নিয়ে ঘুরে?”

এ পর্যায়ে হৃদ্য থামল। আপুর দিকে চোখ রেখে ধীর স্বরে বলল,
“তুই কি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য একা ছাড়বি?”

রিধি হতাশ হলো। ছোট্ট নিশ্বাস ছেড়ে ভাবল,’একজন আরেক জনের প্রাণ নিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছিস অথচ ভালোবাসি শব্দটা বেরোচ্ছে না!’

রিধি চলে যেতে হৃদ্য দরজায় সিটকিনি তুলল।
_________________
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে মূল দরজা,জানালা ও রান্নাঘরটা ভালো করে দেখে নেন শরীফা খন্দকার। আজও দেখে নিলেন। সব শেষে বাতি নিভিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়িয়ে থমকে গেলেন। হঠাৎ মনটা ভারি হয়ে আসে। মীর খন্দকার ঘন ঘন আসায় ও দীর্ঘ দিন থাকার ফলে ভ্রমরের সাথে ঘুমানো হচ্ছে না। মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাসটা তো আর এক,দুই দিনে গড়ে উঠেনি! স্বামীর পাশে শুয়েও কেমন অস্থিরতা টের পান। ঘুম ভেঙে যায় একটু পর পর। শরীফা খন্দকার পাশের রুমটায় ঢুকলেন। সকাল থেকে মেয়েটার মুখ শুকনো দেখাচ্ছিল। খেতে চাচ্ছিল না কিছু। কৌতুহলে কপালে হাত দিয়ে দেখেন উষ্ণভাব। মীর খন্দকার ডাক্তার দেখাতে চাইলেও তিনি মানা করে দেন। তার মতে,সামান্য জ্বর,সর্দিতে পাতা পাতা ট্যাবলেট খাওয়ার কিছু নেই। একটু বিশ্রাম,যত্ন,চলাফেরায় সাবধানতা ও খাওয়া-দাওয়া করলেই ঠিক হয়ে যাবে।

মেয়ের কপালে হাত রাখতে খানিকটা চিন্তামুক্ত হলেন শরীফা খন্দকার। গরম ভাবটা কম লাগছে। মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে গালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন বারান্দায় ঢোকার দরজাটা খোলা। হিমেল হাওয়া ঢুকছে নিঃসংকোচে! তিনি যাওয়ার আগে দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে চমকে উঠলেন। স্পষ্ট দেখলেন,একটা কালো ছায়া বারান্দার মেঝেতে লাফিয়ে পড়ল। ভয় পেলেন তবে পিছিয়ে গেলেন না। ছায়ার উপর স্থির দৃষ্টি রেখে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে? কে ওখানে?”

মুহূর্তে কালো ছায়াটা নড়েচড়ে এক পাশে সরে গেল।কিছুক্ষণ পর চাপা ও সংকোচ পূর্ণ কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আন্টি,আমি।”

ছেলে কণ্ঠ পেয়ে বেশ ঘাবড়ে গেলেন শরীফা খন্দকার। কণ্ঠ পরিচিত লাগল না। আবার অপরিচিতও নয়। খানিকটা দ্বিধা থেকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আমি মানে? আমিটা কে?”

হৃদ্য ধীরে ধীরে শরীফা খন্দকারের সামনে আসল। ঘরের আলো মুখের একপাশে পড়তে বিস্মিত বদনে বললেন,
“তুমি রিধির ভাই না?”

হৃদ্য মাথা হেঁট করে ফেলল। শরীফা খন্দকার কঠিন দৃষ্টি ছুড়ে বললেন,
“এত রাতে এখানে কী?”

হৃদ্য কথা বলতে পারল না। শরীফা খন্দকার পূর্বের স্বরে বললেন,
“তোমার সাহস তো কম না,এই অন্ধকারে কুয়াশা ঠেলে অন্য বাড়ির বারান্দায় ঢুকছ? উদ্দেশ্য কী?”

হৃদ্য মাথা তুলল। শরীফা খন্দকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল নীরবে।

“চুপ করে আছো কেন? তুমি নিজ থেকে বলবে নাকি ভ্রমরের বাবাকে..”

শরীফা খন্দকারের ধমকানির মধ্যে হৃদ্য রুমের ভেতর ঢুকে পড়ল। সোজা গিয়ে দাঁড়াল ভ্রমরের মাথার কাছে। মেঝেতে হাঁটু ভর করে বসল। ভ্রমরের একটা হাত চেপে ধরে কোমল স্বরে ডাকল,
“পুচকি?”

ভ্রমর এক ডাকেই চোখ মেলল। আকাশ মাপের বিস্ময় নিয়ে তাকালে হৃদ্য সুধাল,
“এটা কিছু হলো?”
“কী?”
“এই যে আমাকে সুস্থ করতে গিয়ে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লি?”

ভ্রমর প্রথমে অবাক হলো। পর মুহূর্তে সন্দেহ নিয়ে বলল,
“মনে হয় এটা ছোঁয়াচে রোগ।”

হৃদ্য হেসে ফেলল। ভ্রমর নিজের হাত ছাড়িয়ে চটপটে বলল,
“ছাড়ো,ছাড়ো আমাকে। নাহলে ছোঁয়াচে রোগটা আবার তোমার শরীরে গিয়ে পড়বে।”

হৃদ্য হাত ছাড়ল না। শক্ত করে ধরে কিছু একটা বলল বোধ হয়। দূর থেকে শরীফা খন্দকার শুনতে পেলেন না। শোনার ইচ্ছেও হলো না। মনে পড়ল নীলার সেই কথাগুলো। তিনি সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। নিঃশব্দে বের হতে হতে মনে প্রশ্ন রাখলেন,’ওরা কি একে অপরকে ভালোবাসে?’
________________
“ভ্রমর,তুমি এখনও রেডি হওনি?”

বাবার কণ্ঠে ভ্রমর আঁতকে ওঠল। চুপচাপ শোয়া থেকে উঠে বসলে তিনি বললেন,
“আমাদের এখনই বের হতে হবে,মা। যাও লক্ষি মেয়ের মতো জামাটা পাল্টে আসো।”

ভ্রমর কিছু বলতে চাইল, পারল না। তার আগেই মীর খন্দকার বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে রুমের দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে গেলেন। ভ্রমর ধপ করে নিশ্বাস ফেলল। চট করে কল লাগাল হৃদ্যের নাম্বারে। কল ঢুকল না। ফোন বন্ধ! ভ্রমর দ্বিতীয় বারের মতো কল ঢুকাল। এবারও বন্ধ পেয়ে রেগে গেল। ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বলল,
“এখন আমি কার কথা রাখব?”

ভ্রমর বারান্দায় ছুটে গেল। কতক্ষণ এদিক থেকে ওদিক ছুটোছুটি করে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। বসার রুমে বাবাকে না পেয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় হৃদ্যের বাসায়। তাড়াহুড়োয় কলিংবেল ছেড়ে দরজায় আঘাত করতে থাকে ঘন ঘন।

রিধি দরজা খুলে মৃদু হাসল। পর মুহূর্তে ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ব্যাপার কী? চোখে,মুখ এমন করে আছিস কেন?”

ভ্রমর ভেতরে ঢুকে হৃদ্যের রুমের দিকে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার ভাই কোথায়?”
“হৃদ্য? ও তো বাসায় নেই। টিপুর বাসায় গেছে।”

ভ্রমর থেমে গেল। রিধির দিকে ছুটে এসে বলল,
“টিপু ভাইয়ের বাসায়? কেন?”
“ঠিক জানি না। তবে বলে গিয়েছে ফিরতে রাত হবে।”

ভ্রমর আর শান্ত থাকতে পারল না। চটে গিয়ে বলল,
“তোমার ভাই এত খারাপ? তোমরা শাসন করো না বুঝি? চড়-থাপ্পড় মারো না?”

ভ্রমরের মুখ থেকে এমন কথায় রিধি যেন আকাশ থেকে পড়ল। কৌতুলে বলল,
“সে কি? মারব কেন? আমার একমাত্র ভাই! আদর করে কুল পাই না,মারব কখন? কিন্তু ভ্রমর,হঠাৎ এসব বলছিস কেন? কিছু করেছে নাকি?”

ভ্রমর সোফায় বসল। রাগি চোখে তাকাল। পর মুহূর্তে মন খারাপের সুরে বলল,
“করেছেই তো।”
“কী করেছে?”
“সকালে ঘুম ভাঙল ম্যাসেজের শব্দে। একের পর এক ম্যাসেজ আসছে তো আসছেই।”
“তাই নাকি? ভাই পাঠিয়েছে?”
“হ্যাঁ। সে আর মা ছাড়া আমার নাম্বার আর কেউ জানে নাকি? গুণে গুণে একশটা ম্যাসেজ।”

রিধি ভ্রমরের কাছে ঘেষে বসল। কৌতুহলে জিজ্ঞেস করল,
“এত ম্যাসেজ? কী লিখেছে ম্যাসেজে?”

ভ্রমরের মন খারাপ কেটে গেল। কপট রাগ নিয়ে বলল,
“আমাকে না বলে কোথাও বের হবি না।”
“এটা লিখল?”
“হ্যাঁ।”
“আর কী কী লিখল?”
“আর কিছু না।”
“তুই যে বললি,একশটা ম্যাসেজ?”
“একশটা ম্যসেজে এই একটা কথায় লেখা ছিল।”

রিধির কৌতুহলে ভাঁটা পড়ল। মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল,’নিরামিষের তরকারি!’

“আমাকে বের হতে নিষেধ করে সে হাওয়া হয়ে গেছে এটা কেমন হলো বলো তো,আপু? এদিকে বাবা বলছে,তাঁর সাথে বেরোতে হবে।”
“এটা নিয়ে এত চিন্তা? হৃদ্যকে কল দে তাহলেই তো হয়।”
“দিয়েছিলাম তো। ফোন বন্ধ বলছে।”

রিধি খানিকটা চিন্তায় পড়ল। ভাবছে কিছু। হঠাৎ সে নিজের ফোন থেকে কল দিতে বুঝতে পারল ভ্রমর সত্যি বলছে।

ভ্রমর করুণ স্বরে বলল,
“আমি এখন কার কথা শুনব,আপু?”

রিধির মায়া হলো। বলল,
“বাবার সাথে ঘুরে আয়। আমি ভাইকে সামলে নিব।”
“সত্যি?”

রিধি আশ্বাস দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”

ভ্রমর খুশি মনে হৃদ্যের রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজার সামনে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লে রিধি সুধাল,
“কী হলো?”

ভ্রমর ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,
“আমার বাবার সাথে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
“কেন?”

ভ্রমর সাথে সাথে জবাব দিল না। মাথা ঝুকিয়ে হৃদ্যের বিছানায় বসে বলল,
“এত বার করে বলল,না শুনলে যদি কষ্ট পায়?”

রিধি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে ভ্রমরের পাশে বসে বলল,
“আমার ভাই কষ্ট পেলে তোর খারাপ লাগে?”
“হুম। খুব খারাপ লাগে।”
“কেন?”

ভ্রমর রিধির দিকে এমনভাবে তাকাল মনে হলো খুব কঠিন একটা প্রশ্ন করেছে। রিধি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“ভালোবাসিস?”

চলবে#প্রাণ_ভোমরা
#রোকসানা_রাহমান

পর্ব (৩৭)

রিধি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে ভ্রমরের পাশে বসে বলল,
“আমার ভাই কষ্ট পেলে তোর খারাপ লাগে?”
“হুম। খুব খারাপ লাগে।”
“কেন?”

ভ্রমর রিধির দিকে এমনভাবে তাকাল মনে হলো খুব কঠিন একটা প্রশ্ন করেছে। রিধি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“ভালোবাসিস?”

ভ্রমরের চোখ অস্বাভাবিক রকম বড় হয়ে আসল। পর মুহূর্তে ভ্রূ কুঁচকে ফেলল। কিছু বলার জন্য ঠোঁট দুটো নড়ে উঠতে রিধি বলল,
“আচ্ছা,ছাড়। অন্য কিছু বল।”
“কী বলব?”

ভ্রমরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আনল রিধি। সামনের দিকে মুখ করে সাধারণ সুরে বলল,
“কয়েক দিন ধরে দেখছি দুটোতে খুব ঝগড়া করছিস। কারণ কী?”

ভ্রমর ম্যাচের শলার মতো আচমকা জ্বলে উঠল। বসা থেকে উঠে রিধির মুখোমুখি দাঁড়াল। মুখ বিকৃতি করে বলল,
“তো করব না? বাজানের কাছে আমাকে খারাপ বানানোর জন্য তোমার ভাই উঠে-পড়ে লেগেছে যে।”

রিধি দুই হাত কোলের উপর রেখে চোখ তুলে গম্ভীর স্বরে বলল,
“সত্যি?”
“খুব সত্যি।”
“কিভাবে?”

ভ্রমর হাত নেড়ে অঙ্গভঙ্গিতে রাগ ঝরিয়ে বলল,
“বাজান আমাকে বেশ কয়েক বার একটা রেষ্টুরেন্টে নিয়ে যাচ্ছে। একজনের সাথে পরিচয় করাবে বলে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে হয়। কিন্তু তোমার ভাইয়ের জন্য সেই পরিচয়টা হচ্ছেই না। প্রতি বার আমি তার জন্য অপেক্ষা করি। সে আসে। কথা বলাও শুরু হয়। কিন্তু এক থেকে দুই কথাতে যেতে তোমার ভাই কল করে বলবে,’ভ্রমর কোথায় তুই? তুই এখনই আমার সামনে আসবি।’ আমি না বললে আমার বাবাকে টেনে আনে। বলে কিনা হাতুড়ি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিবে। বলো এরপর কি আর পরিচয় হওয়া যায়? অতিথি ফেলে,বাজানকে ফেলে ছুটে আসতে হয়। এতেও তার শান্তি হয় না। আমাকে ঝারি দিতে আসে। কত সাহস! এক বার ভাবেও না তার জন্য বাজানকে কত দুঃখ দিয়েছি। আমার উপর কী পরিমাণ অখুশি হবে।”

ভ্রমরের রাগ গলে গিয়ে অভিমানের রূপ নিতে রিধি হাসল। তৃপ্তির হাসি! মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেছে। ভ্রমরকে টেনে পাশে বসাল রিধি। ভীষণ আগ্রহ নিয়ে সুধাল,
“আমার ভাই ডাকে আর তুই চলে আসিস। আমার ভাই বুঝি খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ?”

ভ্রমর ভ্যাংচি কেটে বলল,
“ছাই গুরুত্বপূর্ণ! তোমার ভাই হলো ষড়যন্ত্রকারী! নিজেকে রক্ষা করতে ছুটে আসি।”
“আসলেই?”

ভ্রমর সন্দেহ চোখে তাকাল রিধির দিকে। নরম স্বরে বলল,
“তুমি এমন করে কথা বলছ কেন,আপু? আমার কেমন জানি লাগছে।”
“কেমন?”

ভ্রমর চট করে কিছু বলতে পারল না। কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
“বুঝতে পারছি না।”

রিধি একপেশে হাসল। বিছানায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“এই যে এখানে আসলে ভাইয়ের বিছানা ঝেড়ে দিস। তোর ইচ্ছে করে না এখানে একটু ঘুমাতে?”

ভ্রমর উত্তর দিল না। গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল বিছানার পানে। রিধি লক্ষ্য করে আগের সুরে বলল,
“ইচ্ছে করে না রাত জেগে জোসনা আলাপ করতে? দুষ্টুমি করতে? ভাইকে জ্বালাতন করতে? এই ভ্রমর,হৃদ্যকে জড়িয়ে ধরেছিস কখনও?”

রিধির শেষ প্রশ্নে ভ্রমর কেঁপে উঠল। নিশ্বাস থেমে গেল। বিছানার চাদর খামচে ধরল বাম হাতে!

ভ্রমরের অঙ্গভঙ্গির অভিব্যক্তিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করছিল রিধি। সে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“তোর সংসার করতে ইচ্ছে করে না? যে সংসারে শুধু তুই আর ভাই থাকবে। ইচ্ছে হলেই দেখতে পারবি,কথা বলতে পারি,ছুঁতেও পারবি গভীরভাবে। তোদের কেউ বাধা দিবে না। এমন কী তোর বাবা,মাও না।”

এইটুকু বলে রিধি থামল। ভ্রমরের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল সে শুনছে। শুনতে শুনতে হারিয়ে যাচ্ছে কোথাও। রিধি মুখটা আরেকটা কাছে এগিয়ে নিয়ে বলল,
“বিয়ে করবি আমার ভাইকে?”

ভ্রমরের উদাস চোখ জোড়া রিধির মুখে স্থির হলো। খানিকটা দূরে সরে বসল বোধ হয়। রিধি আরেকটু সরে এসে বলল,
“তুই শুধু কল্পনা কর। তোর আর হৃদ্যের বিয়ে হলো। তারপরে দুজনে ভীষণ ব্যস্ত। তুই সংসার গুছাতে। হৃদ্য তোকে গুছাতে। ”
“আমাকে গুছাবে?”

ভ্রমরের আকস্মিক প্রশ্নে থতমত খেল রিধি। খানিকটা নড়েচড়ে ধমকের সুরে বলল,
“মন দিয়ে কল্পনা কর।”
“আচ্ছা।”

রিধি ভ্রমরের ‘আচ্ছা’ শুনে হেসে ফেলল। ভ্রমর বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হাসছ কেন?”

রিধি ভ্রমরের গালে আদুরে চড় মেরে বলল,
“গাধা,হৃদ্য আমার ছোট ভাই হয়। আপু হয়ে এসব বলা যায় নাকি?”
“কী বলা যায় না?”

রিধি এবার ভ্রমরের মাথায় চটাঘাত করে বলল,
“তোর মাথা।”

ভ্রমর মন খারাপ করল। চোখ,মুখ ছোট করে ফেললে রিধি কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“নিবি আমার ভাইকে সারা জীবনের জন্য?”

ভ্রমরের মন খারাপ উবে গিয়ে সমুদ্র মাপের বিস্ময় ভর করল মুখমণ্ডলে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো বুকের ভেতরে মানুষের মতো কিছু একটা হাত-পা ছুড়ে ছটফট করছে। ব্যথাও সৃষ্টি হলো কী? যে ব্যথায় যন্ত্রণা নয় সুখে ভরপুর!

রিধি আবার বলল,
“একদম নিজের মতো করে যত্ন করার সুযোগ পাবি জনম ভর। ইচ্ছে হলেই তার সামনে কাঁদতে পারবি,হাসতে পারবি,রাগ ঝারতে পারবি,অভিমান করতে পারবি। নিবি আমার ভাইকে নিজের করে? যাতে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে!”
“অন্য কেউ?”

ভ্রমরের থেকে একটু দূরে সরে আসল রিধি। অন্য দিকে মুখ করে বলল,
“তুই না নিলে তো ভাইকে অন্য কাউকে দিয়ে দিতে হবে তাই না?”
“কাকে?”
“তার বউকে।”
“বউ!”
“হ্যাঁ, বউ। যে ভাইয়ের কাছে থেকে যত্ন-আত্তি করবে। ঘর গুছিয়ে দিবে। ভাইয়ের জন্য রাঁধবে,কাপড় ধুয়ে দিবে। অসুখ করলে রাত জেগে সেবা করবে। শুধু কি সেই করবে? ভাইও তো করবে। বুঝলি তখন হৃদ্য কিন্তু খুব ব্যস্ত থাকবে। তোর সাথে তেমন একটা কথা বলার সুযোগ পাবে না,দেখা করা তো অসম্ভব!”
“কেন অসম্ভব?”
“বা রে! ভাইয়ের বউ কি অন্য মেয়ের সাথে দেখা করতে দিবে? দেখবি হুট করে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছে।”
“কথা বলাও বন্ধ করে দিবে?”
“তো দিবে না? তখন তো বউই ভাইয়ের সব।”

মুহূর্তে ভ্রমরের চোখ ছলছল করে উঠল। রিধি সে দিকে তাকিয়ে বলল,
“এবার বল তুই নিবি নাকি অন্য কাউকে দিয়ে দিব?”

ভ্রমরকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিল না রিধি। দ্রুত বলল,
“তুই ভেবে-চিন্তে আমাকে জানাস।”

কথাটা বলে হৃদ্যের ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে দেখে শ্রাবণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি?”

শ্রাবণ মনে হয় প্রশ্নটা শুনল না। রিধি আরেকটু সামনে এগিয়ে জোর গলায় পূর্বের প্রশ্নটাই করল,
“আপনি? এ সময়?”

শ্রাবণের সম্বিৎ ফিরল। নিজেকে সামলে বলল,
“অফিসে তেমন চাপ নেই। শরীরটাও ভালো লাগছিল না। তাই চলে এলাম।”
“ওহ।”

________________
হৃদ্য বাসায় ফিরল রাত দশটায়। বাসার কলিংবেলের সুইচ চেপে ধরতে দরজা খুলে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই? বাসায় যাসনি?”

ভ্রমরের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করল হৃদ্য। মুহূর্তকাল কেটে যাওয়ার পর বলল,
“ভেতরে ঢুকতে দিবি না নাকি?”

ভ্রমর এবারও চুপ। হৃদ্যের খানিকটা খটকা লাগল। মনে পড়ল সকালের পাঠানো ম্যাসেজের কথা। তার মনে হলো ভ্রমর খুব রেগে আছে। ঝগড়া করার আগেই সামলে নিতে হবে। সে সামান্য হেসে গুছিয়ে বলতে চাইল,
“একটা জরুরি কাজে টিপুর বাসায় গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ওর ছোট বোনের বিয়ে। তারপর..”
“তোমার ভ্রূগুলো এত সুন্দর! আগে তো খেয়াল করিনি।”

ভ্রমরের মুখ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত প্রশংসায় হৃদ্য স্তম্ভিত হলো। অপ্রতিভ কণ্ঠে বলল,
“কী বললি?”
“চোখগুলোও সুন্দর। নাকটাও,ঠোঁট দুটিও সুন্দর!”

হৃদ্য এবার সন্দেহ চোখে তাকাল। খানিকটা উঁচু স্বরে ডাকল,
“ভ্রমর?”

ভ্রমর ছিটকে উঠল। বাইরে বের হয়ে অনুরোধের স্বরে বলল,
“আমাকে একটু বাসায় দিয়ে আসবে? আমার একা যেতে ভয় লাগছে।”

হৃদ্য মুখে কিছু বলল না। ভ্রমরের আগাগোড়া পরখ করে আগে আগে হাঁটতে শুরু করল।
________________
ঘরের বাতি নিভিয়ে বালিশে মাথা রাখতে শ্রাবণ নরম স্বরে সুধাল,
“আপনার ইচ্ছে করে না?”

রিধি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী ইচ্ছে করে না?”
“সংসার করতে।”

রিধি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিষ্ঠুরের মতো বলল,
“না।”
“আমার কিন্তু করে।”

রিধির দিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তবুও শ্রাবণ একাধারে বলতে লাগল,
“যে সংসারে শুধু আপনি আর আমি থাকব। রাতে স্বপ্ন দেখে যখন কাঁদবেন তখন জড়িয়ে ধরব। এক,দুটো চুমু খেয়ে আশ্বাস দিয়ে বলব..”
“আমি স্বপ্ন দেখে কাঁদি?”
“হ্যাঁ। ”
“কে বলল আপনাকে?”
“বলতে হবে কেন? আমি নিজ চোখে দেখেছি,নিজ কানে শুনেছি। কেন কাঁদেন বলুন তো?”

রিধি নিভে গেল। হাত-পা জড়ো করে বলল,
“জানি না।”
“জানেন। আমাকে বলতে চাচ্ছেন না। কেন?”

রিধি হঠাৎ রেগে গেল। শক্ত স্বরে বলল,
“আমি ঘুমাব। একদম বিরক্ত করবেন না।”

কথাটা শেষ করে কম্বল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল রিধি। শ্রাবণ কি টের পেল রিধি স্বপ্নে নয় জেগে থেকেই কাঁদছে?

শ্রাবণ ছোট্ট নিশ্নাস ফেলে বলল,’নারীরা ভারি অদ্ভুত! যখন নিজের বোধের প্রয়োজন হয় তখন সে নির্বোধের মতো আচরণ করে।
______________
“ভাই তুই এখনও বের হোসনি?”

রিধির কণ্ঠে হৃদ্য পেছন ঘুরল। কাপড় ভর্তি ব্যাগের চেইন লাগিয়ে বলল,
“হ্যাঁ এখনি বের হব।”

রিধি ভেতরে ঢুকে ঘড়ি দেখে বলল,
“তুই বলেছিলি বাস ছাড়বে আটটায়। কিন্তু ক্যাম্পাসে থাকতে হবে সাতটার দিকে।”
“হ্যাঁ। ”

রিধি এবার ভাইয়ের নিকট এসে বলল,
“এখন কয়টা বাজে জানিস?”
“কয়টা?”
“আটটা দশ।”

হৃদ্য চট করে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপরেই কাউকে কল তড়িঘড়িতে। রিধি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাকে কল দিচ্ছিস?”
“ভ্রমরকে।”
“ভ্রমর? তোকে এগিয়ে দিতে যাবে নাকি?”
“এগিয়ে দিতে নয়। আমার সাথে যাবে।”
“কী!”

ভ্রমর কল ধরছিল না। হৃদ্য পুনরায় কল দিতে দিতে বলল,
” এত অবাক হওয়ার কী আছে? ভ্রমর কি আমার সাথে কোথাও যায় না?”
“যায়। তাই বলে তোর সাথে রাঙামাটি চলে যাবে? ওর বাবা,মা রাজি হয়েছে?”
“জানি না।”
“মানে কী?”

হৃদ্য আপুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রাগ নিয়ে বলল,
“মেয়েটা কল ধরছে না কেন?”

রিধি ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। বলল,
“ধরবেও না। ও কি তোর মতো পাগল? না ওর বাবা,মা পাগল? একটা ছেলের সাথে মেয়েকে ঘুরতে পাঠিয়ে দিবে। ভ্রমর মুখের উপর না করতে পারছে না তাই কল ধরছে না।”
“ভ্রমর এমন করতেই পারে না। মনে হয় ফোন সাথে নেই।”
“বাব্বাহ! এত বিশ্বাস?”

হৃদ্য উত্তর না দিয়ে ফোন ফেলে বারান্দায় ছুটে গেল। নিচু স্বরে ডাকল কয়েক বার। সাড়া আসছে না দেখে রিধি বলল,
“ভ্রমর যাবে না। তুই চলে যা। পরে কিন্তু বাস মিস করবি।”

হৃদ্য আপুর দিকে ঘুরে দৃঢ়স্বরে বলল,
“ও যাবে।”
“তাহলে আসছে না কেন?”

হৃদ্য চিন্তিত স্বরে বলল,
“মনে হয় কোনো সমস্যা হয়েছে।”
“তাহলে আমি গিয়ে দেখে আসি কী সমস্যা হয়েছে।”

কথাটা বলে রিধি খানিকটা হাসল। হাসতে হাসতে ভ্রমরদের বাসায় হাজির হলো। মূল দরজা খোলা ছিল। সে সংকোচে ভেতরে দৃষ্টি ফেলতে শরীফা খন্দকারের দেখা পেল। দূর থেকে জিজ্ঞেস করল,
“আন্টি ভ্রমর কোথায়?”

শরীফা খন্দকার এগিয়ে আসতে আসতে বললেন,
“রুমে আছে। ভেতরে এসো।”

রিধি ভেতরে আসল। কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। মনে হলো এক জোড়া চোখ তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মুহূর্তে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল বুকের ভেতর। আচমকা ডান পাশে তাকাতে এক অপরিচিত ছেলেকে দেখতে পেল। আশ্চর্য! ছেলেটি তো তার দিকে তাকিয়ে নেই। তাহলে এমন মনে হলো কেন?

চলবে

[রি-চেইক করা হয়নি। ভুল থাকলে কমেন্টে বলে দিও। পরে ইডিট করে নিব।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here