প্রীতিকাহন পর্ব ৩৯+৪০

#প্রীতিকাহন❤
#লেখনীতে_কথা_চৌধুরী❤
#পর্ব_৩৯

❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ❌

“এই মিষ্টি, এসো শিগগির।” নবাবের ডাকে মিষ্টির চৈতন্য হলো আর চোখ তুলে তাকাল সে নবাবের দিকে। নবাব কখন জিপে উঠেছে টের পায়নি মিষ্টি। নিলয় আর জিসানও গাড়ির সামনের দিকে বসে আছে। হুট করে ভাবনায় মশগুল হলে সময় কখন পেরিয়ে যায় তা টের পাওয়া মুশকিল। এখন সেটা অনুভব করে আর সময় ব্যয় করল না মিষ্টি। নবাবের বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করল আর নবাবও আলতো হাতে টেনে মিষ্টিকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলো।

গাড়ি চলতে শুরু করলেই নিলয় নবাবকে জিজ্ঞেস করল, “নবাব, দুপুরে তো খাওয়া হয় নাই তোদের, না রে?”

“না।”

গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নিলয় বলল, “আমাদেরও হয় নাই। তাইলে এককাজ করি, কোনো রেস্টুরেন্ট দেখে গাড়ি থামাই। খালি পেটে যুদ্ধ করতে কষ্ট হবে দোস্ত।” নিলয়ের পাশের সিটে বসে জিসান তাকে সায় দিলো, “যা বললি দোস্ত। সামনে তো যেই ঝামেলা অপেক্ষা করতেছে আমাদের জন্য। আমার…” জিসানের কথার মাঝে নিলয় ধমকে উঠল, “ধুর শালা, সবসময় এত বেশি কথা কস ক্যান?”

“নিলয়, থাম তোরা৷ রেস্টুরেন্টে চল।” নবাব কিঞ্চিৎ বিরক্ত প্রকাশ করতে কেউ কোনো কথা বাড়াল না।

কড়া রোদে ঝলমল করছে আকাশ। আশেপাশে যানবাহন আর তাদের তিক্ত শব্দের ভিড়ে গাড়ি চলছে ধীর গতিতে। গাড়িতে বসা চারজন মানুষই চিন্তায় মগ্ন অথচ তাদের প্রত্যেকের চিন্তার বিষয় একই।

“মিষ্টি, আজকে আবারও একটু সহ্য কোরো আমায়। জানি, আজকে হয়তো তোমার কাছে আরও নেমে যাব। তবে এতে আমার আপত্তি নেই৷ তোমাকে একটা নিরাপদ জীবন উপহার দিতে পারলে এরচেয়ে বড় পাওয়া আমার জন্য কিচ্ছুটি হবে না, মিষ্টি।” মিষ্টির পাশে বসেই আনমনে ভাবল নবাব। দৃষ্টি তার তপ্ত প্রকৃতিতে বিরাজমান, কিন্তু ব্যাকুল মন মিষ্টির সমুদ্রে বহমান।

নবাবের হঠাৎ চোখে পড়ল মিষ্টি কেমন আনমনা হয়ে আছে। গাড়িতে উঠে একটা কথাও বলেনি। মিষ্টিকে এমন নিশ্চুপ দেখতে নবাবের ভালো লাগছে না। তাই সে বাম কনুই দিয়ে মিষ্টিকে আলতো করে গুঁতো দিলো৷ এতে খানিকটা চমকে মিষ্টি তাকাল নবাবের দিকে আর সাথে সাথে নবাব জানতে চাইল, “এই মিষ্টি, কী ভাবছ?”

“কিছু না।” বলেই মাথা নামিয়ে নিলো মিষ্টি।

“সত্যি?”

মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলো মিষ্টি, “হুম।”

.

অনেকটা পথ চলে আসার পরও তেমন কোনো রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল না নিলয়ের। বাধ্য হয়ে একটা সাদামাটা রেস্টুরেন্টে ঢুকতে হলো তাদের। নিলয় গাড়ি থামানোর আগে অবশ্য নবাবকে বলেছিল, “দোস্ত, আরেকটু দেখি। সামনে হয়তো ভালো রেস্টুরেন্ট পড়তে পারে।”

“কী দরকার এসবের? তাছাড়া তুই এই এক কথা বলে বলে এতটা পথ এসেছিস। যা পেয়েছিস তাতেই কাজ চালিয়ে নেন। বেশি লোভ করলে পরে দেখবি কপালে খাওয়াই জুটবে না।” নবাবের কথা শুনে নিলয় কিছু একটা ভেবেছিল, কিন্তু প্রতিত্তোরে নীরব শুধুই ছিল।

সাধারণ একটা কাঠের টেবিলে চারটে লাল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাইরে থেকে রেস্টুরেন্টের ভাব এলেও ভেতরটা দেখে কোনোভাবেই রেস্টুরেন্ট মনে হচ্ছে না নিলয়ের কাছে, “দোস্ত, এটা তো রেস্টুরেন্ট না রে, মাছ-ভাতের হোটেল।”

“পথেঘাটে তুই কি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিলি চিকেনের খোঁজ করছিস নিলয়?” বেশ গম্ভীর গলায় নবাব প্রশ্ন করতে নিলয় কিঞ্চিৎ ভড়কে গেল, “ধুর! এসব কে খাবে? না, মানে…” নিলয়ের আমতা-আমতা করার মাঝে নবাব খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলো। কথায় বাধা প্রাপ্ত হয়ে নিলয় এবার অন্য প্রসঙ্গ টানল, “আচ্ছা, তোদের এত দেরি কেন হলো ঢাকা আসতে?”

“প্লেন আসতে দেরি হয়েছে। তোকে জানানোর মতো কোনো সুযোগ ছিল না। তাই জানাতে পারিনি। আশেপাশে কোনো দোকানও ছিল না যে ফোন করব।”

“সিমকার্ড নেওয়া হয়নি তোর?”

“না, কাগজপত্র তো সাথে নেই। তাছাড়া সঙ্গে যেই সিমকার্ড ছিল সেটা সিলেটে হাওয়া খাচ্ছে।” হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই নবাব জিজ্ঞেস করল, “তোকে একটা সিমকার্ড দিয়েছিলাম, সেটা কোথায়?”

“আছে আমার কাছেই।”

“এখন আছে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে দেয় জলদি। একটা কল করি।” বলেই ফোন বের করল নবাব। ওর হাতে ফোন দেখে চমকে গেল মিষ্টি, “ফোন এলো কোথা থেকে নবাবের কাছে? আর এটা তো সেই ফোন, যা দিয়ে আমি অর্ষার সাথে কথা বলেছিলাম।” প্রশ্নটা যদিও মিষ্টি নিজেকে করল, কিন্তু বিষয়টা জানবার জন্য নিজের মাঝে একই সাথে রাগ এবং কৌতূহল অনুভব করল। তবে সবকিছু এখন নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে চুপটি করে রইল।

“এই নে।” মানিব্যাগ থেকে একটা সিমকার্ড বের করে নবাবের দিকে এগিয়ে দিলো নিলয়। সিমকার্ড হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নবাব জানতে চাইল, “আমার সিমকার্ড তোর মানিব্যাগে কী করছে?”

“সেদিন যে দিলি এরপর মানিব্যাগ রাখছিলাম।”

“তারপর তুই এটা আর বেরই করিসনি?” আঁতকে উঠল যেন নবাব।

অহেতুক দাঁত বের করে একটু হাসতে চেষ্টা করল নিলয়, “না দোস্ত, এত ঝামেলায় ছিলাম যে, সিমকার্ডের কথা আর মনেই নাই।”

“তুই আমার এমন দরকারী সিমকার্ড সেদিনের পর ছুঁয়ে দেখিসনি?”

“শালা, এমন করছিস কেন? হারায় নাই তো আর।”

ফোনে সিমকার্ড ঢুকিয়ে নবাব ফোন চালু করল। ফোনের স্ক্রিনে ঠিকঠাক করে সিম কোম্পানির প্রতীকী ভাসতেই নবাব নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলল, “তোর কপাল ভালো তাই কিছু বললাম না। আমার এই সিমকার্ডের যদি কিছু হতো তবে…” নবাবের কথার মাঝে নিলয় বলে উঠল, “কিছু তো হয় নাই। এবার চুপ যা।” এরপর জিসানকে বলল, “ওই জিসান, তুই মুখে তালা দিলি?”

লাগাতার নিলয়ের ঝাড়ি খেয়ে জিসান একদম চুপ মেরে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে এখন অবধি একটা কথাও বলেনি সে। এমন চুপচাপ জিসান খুব কমই থাকে। তবে নিলয়ের ঝাড়ি খাওয়ার ইচ্ছে নেই বিধায় ফোন নিয়ে পড়ে আছে, কিন্তু এখন নিলয়ের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বলল, “আমি কিছু বললেই তো তুই গাল দেস। তাই চুপ করে আছি।”

“হুদাই প্যাচাল পারলে তোরে কি বাহবা দিবো? এখন চল আমার সাথে?”

“কোথায়?” একই প্রশ্ন নবাবেরও ছিল, কিন্তু জিসান করেছে বলে নবাব কেবল অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।

“চিন্তা করিস না। তোরে বিয়া করতে নিচ্ছি না। আমার অলরেডি বিয়া হয়ে গেছে।”

“যাহ্ শালা, দেশে কি মেয়ের অভাব যে, আমি তোরে বিয়া করুম?”

শরীর দুলিয়ে হেসে উঠে নিলয় বলল, “চল, চল।” এরপর নবাবকে বলল, “দোস্ত, তোর থাক। আমরা আসছি।”

“ঠিক আছে।” এই বলে নবাব ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাউকে বারংবার কল করছে, কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে। তাই বিরক্তিতে নবাব বলে উঠল, “ধ্যাৎ, সবখানে একই সমস্যা। বাংলাদেশে কবে যে নেটওয়ার্কের মান ভালো হবে।”

“তুমি তো বলেছিলে ফোন সিলেটে ফেলে এসেছ৷ তাহলে এটা এখন কীভাবে এলো?” নিলয় আর জিসান চলে যেতেই মিষ্টি প্রশ্ন করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে ছিল। এখন সুযোগ পেয়ে একটুও দেরি করল না সে।

“ফোন নয়, সিমকার্ড ফেলে এসেছি। পুরো সত্যিটা তোমায় বলিনি। কেন বলিনি, সেটা এখন ব্যাখ্যা করতে হবে?” চেয়ারে হেলান দিয়ে ফোন স্ক্রোল করছে নবাব। দৃষ্টি তার ফোনের স্ক্রিনে আর সেই অবস্থায় সে মিষ্টিকে প্রশ্ন করল।

“তোমার মিথ্যা কথার মিথ্যা ব্যাখ্যা শুনবার আগ্রহ নেই আমার।” মিষ্টির কথার ভিড়ে রাগ স্পষ্ট আর সেটা টের পেয়ে নড়েচড়ে বসল নবাব।

“না থাকলেও শুনতে হবে মিষ্টি। ব্যাখ্যাটা হলো তুমি ফোন নাড়াচাড়া করতে আর অর্ষাও কল করত। তাই দু-জনকে ভড়কে দিতে সিমকার্ড ফেলে দিয়ে ফোন নিজের কাছে রেখে এমনটা বলেছি। এতে লাভ দুটো হলো এক. অর্ষা আর কল করার সুযোগ পায়নি; দুই. তুমি আর ফোন নিয়ে কোনো কিছু ভেবে দেখোনি।” কথাগুলো বলে মিষ্টির দিকে তাকাল নবাব। মিষ্টি একদৃষ্টিতে নবাবের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছু বলছে না বলে নবাব জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছ?”

“জঘন্য তোমাকে।” প্রচণ্ড ঘৃণায় শব্দযুগল উচ্চারণ করল মিষ্টি। এতে নবাব চোখ সরিয়ে হেসে উঠল। মাস্ক বিহীন নবাবকে হাসতে দেখে মিষ্টি জিজ্ঞেস করল, “হাসছ কেন?”

“তোমার মিষ্টি রাগ দেখে।” মিষ্টি রাগে মুখ ফিরিয়ে নিলো, কিন্তু কিছু একটা বলার জন্য ভাবল। তবে সেটা নবাবকে বলার আগেই জিসান এসে জিজ্ঞেস করল, “দোস্ত, তুই কি সত্যি বিদেশে চলে যাবি?”

“হুম, এখানে থাকার মতো তো কোনো কারণ নেই।”

“কিন্তু…” জিসানকে থামিয়ে দিয়ে পাশ থেকে নিলয় বলল, “ধুর জিসান, এখন কি এসব বলার সময়?” তারপর নবাবকে উদ্দেশ্য করে বলল, “দোস্ত, আজকে যা হবে একটু সাবধানে থাকিস।”

“ভয় পাচ্ছিস?” নবাব জানতে চাইল।

“না, কিন্তু চিন্তা হচ্ছে।” নিলয় জবাব দিলো।

“কেন? সব কি ঠিকঠাক করা নেই?”

“সবই ঠিকঠাক আছে৷ কিন্তু…”

“সব যখন ঠিকঠাক তবে বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়। তিনি যা ভালো বুঝবেন, তাই করবেন।”

“হুম।” বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিলয় আর সেটা স্পষ্ট শুনতে পেয়ে মিষ্টির অন্তরাত্মা হঠাৎ কেঁপে উঠল। এই মাত্র যেই নবাবের প্রতি মিষ্টি রাগ অনুভব করছিল, এখন নিলয়ের কথা শুনে সেই নবাবের চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠল, “হে আল্লাহ, আমার নবাবের যেন কিছু না হয়। আপনি ওকে রক্ষা করুন আর আমার পরিবারকে যেন ঠিকঠাক অবস্থায় পাই আল্লাহ। আপনার কাছে আমি এর বেশি কিচ্ছুটি চাই না।”

খাওয়াদাওয়া শেষ হতে জিসান বলে উঠল, “দোস্ত, তোরা বস এখানে। আমি আর নিলয় দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।”

নবাব বুঝতে পারছে না বিষয়টা তাই জিজ্ঞেস করল, “আবার কোথায় যাচ্ছিস?”
#প্রীতিকাহন❤
#লেখনীতে_কথা_চৌধুরী❤
#পর্ব_৪০

❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ❌

“না মানে…” নিলয় আমতা-আমতা করল। একবার মিষ্টিকে দেখল তো একবার নবাবকে। নিলয়ের এমন অস্বস্তির কারণ নবাব ধরতে পারছে না। তাই একটু জোর গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী মানে মানে করছিস? হাতে সময় নেই। এখন কোথায় যাচ্ছিস শুনি একটু।”

নিলয় ভাবছে কীভাবে জবাব দিবে এরমধ্যে জিসান বলে উঠল, “আরে দোস্ত, অনেকক্ষণ হইছে সিগারেট খাওয়া হয় নাই। একটু টান…” এতটুকু বলতেই নিলয় বললে উঠল, “জিসান, থাম এবার।” এই প্রথম নিলয় জিসানের ওপর রাগ না করে চুপসে গেল। এদিকে সিগারেটের কথা শুনে মিষ্টি হকচকিয়ে গেল, কিন্তু নবাব সবার ভাবনার ব্যতিরেকে হেসে উঠল, “এটা বলতে এত সংকোচের কী আছে? যাক, যা তোরা তবে জলদি ফিরবি।”

অনুমতি পেয়ে নিলয় দুই হাতে নবাবের ডান হাত চেপে বলল, “থ্যাঙ্কস রে, দোস্ত।” এরপর সোজা হয়ে জিসানের পিঠে চাপড় মেরে বলল, “চল, তুই শালা এই প্রথম মুখ ফস্কে আমার কাজে দিলি।”

“আমি সবসময়ই তোর কাজের কথা ভেবেই মুখ খুলি।” দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল। এদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিষ্টি দেখল নবাবকে। এখনও হাসি লেগে আছে নবাবের মুখে আর সেটাই যেন রাগাচ্ছে মিষ্টিকে, “তুমি বসে আছ কেন? তুমিও যাও, হাওয়া ছড়াতে।”

নিজের ফোনে মত্ত থেকে আর নত দৃষ্টিতে নবাব বলল, “এসব তো বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছি।”

তাচ্ছিল্যের সুরে মিষ্টি জানতে চাইল, “তাই না-কি?”

“হুম।”

“কেন?” এবার তাকাল নবাব মিষ্টির দিকে। কালো হিজাবের বাইরে ভাসমান মিষ্টির চোখে স্থির দৃষ্টি দিলো সে আর শীতল কণ্ঠে বলে উঠল, “তোমার নেশার তীব্রতার কাছে ব্যর্থ যে, হাজারও নিকোটিনের ধোঁয়া।” এমন জবাব মিষ্টি আশা করেনি তবে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ডুবে গেল। হঠাৎ-ই মিষ্টির মনে হলো সে নেশায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছে। আচম্বিতে লজ্জা এসে যেমন ধরা দিলো মিষ্টির মাঝে, তেমন আচম্বিত চোখ নামিয়ে চুপ হয়ে গেল সে।

মিষ্টির হঠাৎ নীরবতায় নবাবের দুষ্ট মন হেসে উঠল তাই সে মিষ্টির কানের কাছে ফিসফিস করল, “এই মিষ্টি, তুমি কি ঠিক আছ? না-কি মনটা এলোমেলো হলো গো।” এসব কথা শুনে মিষ্টি তার চিবুক আরও নামিয়ে নিলো। লজ্জায় মিষ্টিকে গুটিয়ে যেতে দেখে নবাব এবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল।

.

“বিয়ার আসর থেইকা বউরে তুইলা নিয়া গেছ মিয়া। আবার ফিরা আসনের খবর দিয়া আমাগো এহানে ডাকছ। বিষয়ডা বুঝলাম না।” বলেই পান চিবিয়ে চিপটি ফেললেন কবিরের বাবা। সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি আর টুপি পড়া মানুষটা এই এলাকার চেয়ারম্যান হলেও নবাবের কথা মতো নিলয় এবং জিসাব ডাকে মিষ্টিদের বাড়িতে হাজির হয়েছে। শুধু কবিরের বাবা নয়, কবির এবং তার বন্ধু জাহিদও এসেছে। আরও এসেছেন নবাবের মা-বাবা, ইফাদের মা-বাবা, অর্ষা, পুলিশসহ গ্রামের কিছু বিশিষ্টজন।

সোবহানের বাসায় আজ বড়োসড়ো মিটিং-এর ব্যবস্থা করেছে নিলয় আর জিসান, কিন্তু পরিকল্পনায় তিন বন্ধুই জড়িত। মূলত আজকে এই মিটিং-এর মাধ্যমে অনেক বিষয়ের খোলসা করতে চায় নবাব। বিষয়টা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এতে নবাবকে সাহায্য করেছে তার বাবা আরমান এবং আরমানের বন্ধু জহির। জহির যেহেতু একজন পুলিশ অফিসার। তাই সবাইকে এখানে জড়ো করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি নিলয় আর জিসানকে। পুলিশের নাম শুনে কোনোরূপ বাহনা ছাড়াই সবাই রাজি হয়ে গেছে, কিন্তু এখন সবার সম্মুখে দাঁড়িয়ে চুপটি করে আছে নবাব।

ভয়ে জড়োসড়ো হওয়া মিষ্টি নবাবের বাহু চেপে গায়ের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে তার কিছুই মিষ্টির বোধগম্য হচ্ছে না। গাড়ি থেকে নেমে যখন বাড়িতে পা রাখে মিষ্টি, তখন এতসব মানুষের ভিড়ে কবিরকে দেখে আঁতকে উঠে সে। আর নিজের অজান্তেই নবাবকে আঁকড়ে ধরে যেন নিজের জীবন গেলেও নবাবের কিছু হতে দিবে না সে। মিষ্টির এহেন অবস্থা দেখে নবাব তাকে আস্বস্ত করেছিল, “এই মিষ্টি, ভয় পেয়েও না। কিচ্ছু হবে না।” কিন্তু মিষ্টির ভয় কাটেনি। তাই সে নবাবের বাহু এক সেকেন্ডের জন্যও ছাড়তে পারেনি।

মিষ্টির চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মিষ্টির বাবা, সোবহান আর দূরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন মিষ্টি মা, নিঝুম। নিজের মাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখে মিষ্টির স্বস্তি হয়েছিল। তবে মেয়েকে দেখে মায়ের মুখে যে হাসির ঝিলিক মিষ্টি দেখেছে। এতে মিষ্টি বুঝে গেছে, নিজের মায়ের কাছে সে হয়তো অপরাধী নয়। কিন্তু মিষ্টি তার বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা একবারও ভালো করে তাকায়নি মিষ্টির পানে। ফলে আহত হৃদয়ে মিষ্টির মন বলে উঠেছিল, “বাবা, আমি তো কোনো দোষ করিনি। বিনাদোষে কি মেয়েকে ত্যাজ্য করবে?”

“কী মিয়া? চুপ করে আছ ক্যান? আমরা তো সারাদিন বইয়া থাকমু না।” কবিরের বাপ ব্যস্ত ভঙ্গিতে নবাবকে জিজ্ঞেস করল।

ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে চেয়ারম্যানের দিকে তাকাল নবাব। গম্ভীর গলায় বলল, “শুরু কোথা থেকে করব বুঝতে পারছি না, কিন্তু শুরু তো করতেই হবে। ঠিক আছে, মিষ্টিকে দিয়েই শুরু করি। ওর সম্পর্কে আপনাদের নতুন করে কিছু বলার নেই কারণ ও আপনাদেরই গ্রামের মেয়ে। তাই ওর সম্পর্কে আপনারা আমার চেয়ে ভালো জানেন। কিন্তু যেটা জানেন না, আমি সেটা বলছি।”

চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে নবাব বলল, “আপনার ছেলের বন্ধু হলো জাহিদ আর সেই জাহিদ ছোট থেকেই মিষ্টিকে পছন্দ করে। তবে সেটা একতরফা। মিষ্টি বড় হলে যখন ওর বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা হয় আর তা জাহিদ জানতে পারে তখনই ওর মাথা বিগড়ে যায়। একের পর এক পাত্রকে ভুজুংভাজুং বোঝাত যেন মিষ্টিকে বিয়ে না করে, কিন্তু ইফাদ সেসব শুনেনি। ফলে ইফাদের সাথে মিষ্টির বিয়ে হয় আর…”

চেয়ারে বসা মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক হঠাৎ নবাবকে প্রশ্ন করল, “তাহলে তুমি বলতে চাও আমার ছেলেকে জাহিদ খুন করেছে?” ছেলের শোকের ভেঙে পড়া ইফাদের বাবা কেমন চোখে দেখে নবাবের কাছে জানতে চাইলেন। স্বামীর এমন প্রশ্ন শুনে পাশে অবস্থান করা ইফাদের মা আঁচলে মুখ লুকিয়ে কান্নার সুর তুললেন, “ইফাদ রে…”

ইফাদের বাবার উদ্দেশ্যে নবাব বলল, “না আঙ্কেল। আপনার ছেলে তো দেশপ্রেমিক ছিল। দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিল, কিন্তু দুর্বৃত্তরা সুযোগ দিলো না কিছু করার। ইফাদ কিছু রাজনৈতিক দলের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে গিয়েছিল যা প্রকাশ পেলে তাদের খুব অসুবিধা হতো। তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছিল আর তখনই মিষ্টির সাথে বিয়ে পাকাপাকি হয়। জাহিদ যেহেতু মিষ্টির প্রতি দূর্বল আর জাহিদ হলো কবিরের বন্ধু। তাই দায়িত্ব দেওয়া হলো কবিরের ওপর। কবির সেই দায়িত্ব নিলো আর খুব গোপনে ইফাদকে সরিয়ে দিলো।”

“ঐ শালা, জিভ টাইনা নিমু না-কি তোর? মিছা কথা কস ক্যান?” হঠাৎ উগ্র হয়ে উঠল কবির, তখন বিরক্ত হয়ে কবিরের বাবা বলল, “কবির, চুপ কর। আগে ওরে বলতে দেয়।” কারোর সাহস না হলেও মোটামুটি সবাই জানে কবিরই ইয়াদকে খুন করেছে, কিন্তু চেয়ারম্যানের ছেলে বলে কেউ সেটা স্বীকার করতে চায়নি আজ-অব্দি।

ছেলেকে থামিয়ে কবিরের বাবা নবাবকে বলল, “তুমি বলো, মিয়া।”

নবাব বলতে শুরু করল, “মোটামুটি সবাই জানে কবির মিষ্টিকে বিয়ে করতে পারেনি বলে ইফাদকে খুন করেছে, কিন্তু কবির তো মিষ্টিকে পছন্দ করত না; পছন্দ করত জাহিদ। কবির ইফাদকে খুন করেছে মিষ্টিকে পাওয়ার জন্য বিষয়টা কেবল রটানো হয়েছে। আসলে ইফাদকে কবির খুন করলেও, সেই খুন করিয়েছিলেন আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব।” নবাবের মুখে এ কথা শুনে কবিরের বাবা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওই মিয়া, তোমার সাহস তো কম না। কার সম্পর্কে কথা কইতাছ জানো?”

“আমি জেনেই বলছি আর আপনার বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টও নিয়ে এসেছেন আঙ্কেল।” জহিরকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলতেই জহির এগিয়ে এসে বলল, “হ্যাঁ, আমি আপনাকে এবং আপনার ছেলে কবিরকে অ্যারেস্ট করার জন্যই এসেছি। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। আপনারাই পরিকল্পনা করে ইফাদকে খুন করেছেন। এখানে আপনাদের তিনজনের স্বার্থ জড়িয়ে আছে আর এতে অর্ষাকেও শামিল করেছিলেন।”

“না আঙ্কেল, ইউ আর নট রাইট।” হঠাৎ ন্যাকামি করে বলে উঠল অর্ষা। দূরের একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে সবটা শুনছিল সে এতক্ষণ ধরে, কিন্তু এখন নিজের নাম উঠতেই তার মুখ নড়ে উঠল।

“সব প্রমাণ জহির আঙ্কেলের কাছে আছে, অর্ষা। তাই এসব রংচং উনাকে দেখিয়ে কাজ হবে না।” নবাবের পাশে দাঁড়ানো জিসান হঠাৎ-ই বলে উঠল। এতে নিলয় চমকে গেলেও চাপা গলায় জিসানকে জানাল, “শাবাশ বাঘের বাচ্চা!”

“হঠাৎ তারিফ করছিস যে?” চাপা কণ্ঠে জিসানও জানতে চাইল।

“এমনি, কিন্তু এখন চুপ যা।”

অর্ষা কোনো কথা বাড়াল না আর জহিরও নিজের মতো করে বলে গেল, “অর্ষার সাথে কবিরের সম্পর্ক আছে। তাই ওকে ম্যানেজ করতে আপনাদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু ইফাদ অর্ষার ফাঁদে পড়েনি বলে আপনাদের শুরুতে একটু সমস্যা হয়েছিল। ফলে অন্য চাল চেলেছেন আপনারা। বিয়ের রাতে ভুলভাল ফোন করে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইফাদকে। এতসব আপনি করেছিলেন কারণ আপনার অনেক গোপন খবর ইফাদ জেনে গিয়েছিল। এতে আপনার ক্ষতি হতে পারে এই শঙ্কায় ছেলেটাকে মেরে দিলেন বাপ বেটা মিলে।”

লজ্জায় মাথা নুইয়ে রাখা জাহিদের দিকে চোখ পড়তেই তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল জহির, “আর এই যে মিস্টার জাহিদ, প্রেমিক পুরুষ হওয়ার অনেক শখ। শালা, হাজতে নিয়ে এমন মার মারব না তোর প্রেম দেখবি জানালা দিয়ে পালাবে।” এমন বাক্যে জাহিদ আরও নেতিয়ে গেল।

“অনেক রহস্য উদঘাটন করা হলো এবার এদের গাড়িতে তোলো।” কনস্টেবল শেখরকে বলে এবার নিজের বন্ধু আর মিষ্টির বাবার দিকে এগিয়ে এলো জহির, “বন্ধু, তোর ছেলেটা অনেক বড় কাজ করেছে৷ মেয়েটাকে বাঁচিয়েছে পাশাপাশি ইফাদের খুনীদের চিহ্নিত করেছে, এখন এদের শাস্তি নির্ঘাত হবে।” বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলে এবার সোবহানকে বলল, “আমি নবাবের চাচা হিসেবে অনুরোধ করছি, আপনি এদের মেনে নিন।” কোনো কথা বললো না সোবহান। জহিরও সময় ব্যয় না করে আরমানকে বলল, “আমি এদের নিয়ে যাচ্ছি। বাকিটা তোরা সামলে নিস।”

“ঠিক আছে।”

এতক্ষণ ধরে চুপচাপ থাকা সোবহান নবাবের কাছে এসে হাত ধরে হুট করে জিজ্ঞেস করল, “আমার মেয়ের জন্য এত বড় ঝুঁকি কেন নিলে বাবা?” নবাব কোনো জবাব দিলো না। সোবহান আবার বলল, “তোমার বাবা আমাকে আজকে বলেছে, কতটা আগলে রেখেছ তুমি আমার মেয়েকে।” এই বলে হঠাৎ সোবহান কেঁদে উঠল।

“ভাইজান, কাঁদছেন কেন?” আরমান বিচলিত হলো, কিন্তু সোবহান নিজের কান্না থামাল না। তাই নবাব সোবহানের ধরে রাখা হাতে চাপ দিয়ে বলল, “আঙ্কেল, কাঁদবেন না। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি। পরশু আমার ফ্লাইট, আমি বিদেশে ফিরে যাচ্ছি। আপনি ডির্বোসের কাগজপত্র তৈরি করতে বলুন। আমি সবকিছু শেষ করে দেশের মাটি ছাড়তে চাই।”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here