প্রেম পড়শী পর্ব -০৭

#প্রেম_পড়শী
#পর্ব_৭
#লেখনীতে_নবনীতা_শেখ
[প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত]

-“রঙ্গন, তুমি কি অন্যত্র ঝুঁকেছ?”

রঙ্গন বিস্ফোরিত নেত্রে তাকাল। বুঝতে পারছে না সে। তার তাকানো দেখে মোহ হেসে দিলো। হাসতে হাসতে বিছানায় বসে বলল,
-“ড্রেসিং মিররের সামনে দাঁড়াও।”

রঙ্গন দ্রুত পায়ে ড্রেসিং মিররের সামনে আসতেই পরনের হালকা রঙের টি-শার্টের বুকের দিকটায় লিপস্টিকের দাগ দেখতে পেল। মনে পড়ে গেল এই টিশার্ট শেষবার পড়ার দিনটা।
ক’দিন আগে মোহকে একটু জোর করে নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। গাড়িতে বসে যখন বিভিন্নভাবে সে মোহকে জ্বালাচ্ছিল, মোহ ব্রেক কষতে বলেছিল। রঙ্গন ব্রেক কষার সঙ্গে সঙ্গে মোহ তার বুকের বাঁ-পাশে বেশ জোরেশোরেই কামড়ে দেয়। সেই দিনটা মনে পড়তেই থতমত খেয়ে রঙ্গন মোহর দিকে তাকাল। মোহ স্কেচে চোখ স্থির রেখেই বলে উঠল,
-“খুলে রেখো তো, ধুয়ে দেবো।”

রঙ্গন ফ্রেশ হয়ে এসে মোহকে বলল,
-“হুট করে এ-বাড়িতে? ও-বাড়িতে কিছু হয়েছে?”
-“কী হবে?”
-“কেউ কিছু বলেছে?”
-“কী বলবে?”

রঙ্গন প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“সব ঠিক আছে তো, মোহ?”
-“সব ঠিক আছে। ও-বাড়িতে শান্তি লাগছিল না, তাই এখানে এলাম। রাতটা থাকব। তোমার কি খুব আপত্তি এতে?”
-“না।”
-“আপত্তি থাকলেও আমার কিছু করার নেই। আমি আজ এখানেই থাকব।”
-“আচ্ছা। খেয়েছ রাতে?”
-“খেয়েছি। তুমি?”
-“খেয়ে এসেছি। রাত হয়েছে, রূশীর রুমে গিয়ে ঘুমাও।”
-“এখানে থাকলে কি খুব সমস্যা হবে?”

মোহর কথায় রঙ্গন চকিতে তাকাল। বিস্মিত স্বরে বলল,
-“এখানে থাকবে কেন? পাগল নাকি?”
-“এখানেই থাকব।”
-“পাগলামি কোরো না, অন্যরুমে যাও।”
-“তাহলে তো ও-বাড়িতেই থাকতে পারতাম, এখানে কেন এলাম? রঙ্গন! আমার দিকে তাকাও। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”

রঙ্গন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“আচ্ছা। ছাদে চলো।”
-“কেন?”
-“ওখানে বসে থাকব।”
-“এখানে থাকতে সমস্যা কী?”
-“তুমি কি আদতেই বুঝতে পারছ না, মোহ?”
-“কী বুঝব?”

মোহ এক কদম এগিয়ে রঙ্গনের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। রঙ্গন মোহর মুখটা দু’হাতে আঁজলা করে ধরে বলল,
-“বদ্ধরুমে তোমাকে নিয়ে থাকতে চাই না, সোনা।”
-“থাকলে কী হবে?”
-“ভুল হবে, বড়ো একটা ভুল হয়ে যাবে। তুমি নিজেও জানো না—তুমি আমাকে কীভাবে টানো, তোমার প্রতিটা অঙ্গের প্রতি আমার কত লোভ!”
-“তোমার প্রতি বিশ্বাস আছে আমার। এর আগে কি এমন হয়নি, বলো? প্রতিবার আমি এগোলেও, তুমি পিছিয়েছ। বিশ্বাস করি তো, রঙ্গন!”
-“পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন আর সেই কন্ট্রোলটা আমার মধ্যে নেই। এখন তুমি আমার জন্য হারাম নও।”
-“তবে ভুল বলছ কেন?”
-“কারণ তুমি প্রস্তুত নও। আমি চাই না, এ-নিয়ে তুমি কখনও আফসোস করো।”

মোহর চোখ চকচক করছে। সে সরে দাঁড়িয়ে গায়ে ওড়না ভালোমতো জড়িয়ে বলল,
-“চলো, ছাদে যাই।”

______
ছাদের উলটো দিকে রেলিং নেই, পা ঝুলিয়ে বসে আছে দুজন। সামনে সাতনোহারা আর ঠিক তার ওপরে চাঁদ। বাতাসে গমগমে ভাব। মোহ জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার কাছে এত শান্তি পাই কেন, রঙ্গন? মনে হয় আমার আর কিচ্ছু প্রয়োজন নেই, তুমি ছাড়া আর কিচ্ছু লাগবে না।”

রঙ্গন মুচকি হাসল। অকস্মাৎ কিনারা ঘেঁষে মোহর কোলে মাথা রেখে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। রেলিং ছাড়া ছাদ, মোহর পা দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। আতঙ্কিত ভঙ্গিমায় বলে উঠল,
-“পড়ে যাবে!”

রঙ্গন মোহর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ধরে রাখো। ছেড়ে দিলেই পড়ে যাব। ট্রাস্ট মি, মরে যাব।”

মোহ আরও একবার কেঁপে উঠল। রঙ্গন মুচকি হেসে মোহর পেটে মুখ ঘষে জড়িয়ে যাওয়া আওয়াজে বলল,
-“আমার সুখ, আমার মোহিনী!”

মোহ নিজেকে স্বাভাবিক করল, আনমনেই হেসে উঠল। রঙ্গনের চুলের মাঝে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
-“আমরা সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম কবে যেন?”
-“যখন আমরা সম্পর্ক হিসেবে কেবল শব্দটাকেই চিনতাম, অর্থ বুঝতাম না—ঠিক তখন থেকেই।”
-“আনুমানিক কত বছর?”
-“হিসেবে ধরতে গেলে তোমার জন্মের তিনমাস আগে যখন জানতে পারি—মামনির ওই ফুলো পেটটাতে একটা জীবন্ত পুতুল আছে। জানো, মোহ? আমি অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। বুঝে আসতে শুধিয়েছিলাম—আমাকে দেবে, মামনি?”

-“আম্মু কী বলেছিল তখন?”

রঙ্গন খুবই আহ্লাদ করে বলল,
-“শাশুড়ি আম্মু প্রমিস করেছিল, দেবে। অ্যান্ড শি হ্যাড মেড হার প্রমিস!”

মোহ হেসে বলল,
-“তুমি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছ?”
-“লুকোতে আর পারি কই?”
-“কী করেছ?”
-“নাথিং স্পেশ্যাল!”
-“সোজা বলো।”
-“উম.. ঘুম পাচ্ছে। ঘুমোতে দাও তো!”

রঙ্গন মোহর পেটে মুখ গুঁজে নিলে মোহ বলল,
-“রুমে গিয়ে ঘুমোও, রঙ্গন।”
-“রুমে তো তুমি থাকতে পারবে না।”
-“তবে দোলনায় এসো, এভাবে ভয় লাগে।”
-“মোহ তো ভয় পেত না আগে! ছাদের কিনারা দিয়ে হাঁটার অভ্যেস আছে তোমার।”
-“আছে না, ছিল। অভ্যেস পালটাতে সময় লাগে না।”

রঙ্গন মোহর দিকে তাকিয়ে উঠে বসে পড়ল। মুখভাব গম্ভীর করে বলল,
-“আমি কি তোমার অভ্যেস নই, মোহ? পালটে যাব?”

মোহ কিছুক্ষণ ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলল,
-“তুমি আমার মনুষ্যরূপী জলজ্যান্ত অভ্যেস। এটা মারাত্মক। কালভদ্রে পরিবর্তন হতেও পারে। তুমি হতে দিয়ো না, কেমন?”

মোহর সেই পুরোনো রকমের কথাগুলো শুনতে পেয়ে রঙ্গন শান্ত থেকেও ভারি অশান্ত হয়ে উঠল, অধৈর্য গলায় বলল,
-“আই মাইট লস মাই কন্ট্রোল, মোহ। তুমি কি নিজের রুমে যাবে?”

মোহকে আর কিছু বলা লাগল না, সে দ্রুত পায়ে প্রস্থান ঘটাল।

_____
সকালে রঙ্গন ঘুম থেকে উঠেই মোহকে বিছানার ওপর পাশে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে দেখল। কপাল কুঁচকে বলল,
-“এখানে কী, হুঁ?”

মোহ হেসে বলল,
-“উঠে পড়েছ?”
-“না, ঘুমিয়েই আছি।”
-“সকাল সকাল রাগ করছ কেন?”
-“সকাল সকাল আমার রুমে তোমার পদধূলি পড়ল কেন?”

মোহ হাসি গিলে নিয়ে বলল,
-“ভাব এমন ধরছে মশাই, যেন এটা তার একার ঘর।”
-“আজ্ঞে, আমার একারই। এভাবে সকাল সকাল আমার রুমে আসবে না, আমার খারাপ লাগে।”
-“খারাপ লাগে?”
-“হুম, হুম।”
-“কেন লাগে?”
-“মহিলা মানুষ তুমি, বুঝবে না। সকাল সকাল প্রিয় নারীকে কাছে পেলে কী কী যে করতে ইচ্ছে করে, তুমি সত্যিই বুঝবে না।”
-“ওহ-হো! বোঝাও!”
-“ন্যাকা সাজছ? বোঝাব? সিরিয়াসলি?”
-“ইয়েস, স্যার! আমি স্টুডেন্ট হিসেবে বড়ো কদর্য মস্তিষ্কের।”

রঙ্গন শ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠে গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে নিতে নিতে বলল,
-“আর কিচ্ছু বলব না, তোমাকে কিছু বলা মানে নিজের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া।”

রঙ্গন ফ্রেশ হয়ে রুমে এলেই মোহকে খাটে বসে পা ঝোলাতে দেখল। মোহ তখন তাকে নিজ থেকে জানাল,
-“আমি সামাজিক স্বীকৃতি চাই।”

রঙ্গন হাসি চেপে বলল,
-“মাস খানেক আগে আমিও তাই চেয়েছিলাম, তুমি কী বলেছিলে মনে আছে?”
-“আছে।”
-“কী যেন বলেছিলে?”
-“মজা ওড়াচ্ছ কেন?”

রঙ্গন হো হো করে হেসে বলল,
-“ভুলে গেছ? মনে করিয়ে দিই? তুমি অল্প ক’টা শব্দে আমাকে বলেছিলে—বয়স সবে উনিশ, এখনই সংসারী হতে চাই না, আর ক’বছর যাক!”

মোহ মলিন হাসল। সোজা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে জানাল,
-“তখন আম্মু ছিল, তখন আমার আব্বু ছিল। তারা আমাকে তোমার চেয়েও বেশি ভালোবাসত। এখন আমার দুনিয়াতে ভালোবাসা বলতে তুমি ছাড়া কেউ নেই।”

রঙ্গন প্রসঙ্গক্রমে বলল,
-“সিলেটের মিটিংয়ের ডেট এগিয়েছে।”
-“কবে?”
-“কাল বিকেলে।”
-“শোনো!”
-“হু-উম?”
-“আমি চাই না, রূশী সাথে যাক। আমি দুজনের পার্সোনাল স্পেস চাই।”
-“তোমার বাবা একা ছাড়বে না তোমাকে।”
-“সে ছাড়া না-ছাড়ার কেউ নয়। আমি এডাল্ট।”
-“সম্পর্ক খারাপ করবে?”
-“ভালো আছে কি?”

মোহ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। রঙ্গন মোহর কাছে গিয়ে বসল। মাথায় হাত রেখে বলল,
-“রাতে ঘুমোওনি তুমি। চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এখন খানিকটা ঘুমোও। আমি ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই অফিস থেকে ফিরব।”
-“রঙ্গন, শোনো!”
-“হু-উম?”
-“মোহিনী লাভস ইউ।”

রঙ্গন হেসে দিলো। মোহর মুখ ভারি উজ্জ্বল। সে সবকটা দাঁত বের করে হাসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা নব ঘুরিয়ে নক না করেই রুমের ভেতর প্রবেশ করল রুমা বেগম। রঙ্গন থতমত খেয়ে মায়ের দিকে তাকাল। বিলি কাটতে থাকা হাত তার এখনও মোহর চুলের ভাঁজে স্থির।

চলবে…

[লেখার ইচ্ছে মরে যাচ্ছিল। ক’জন ইনবক্সে খুব বোঝাল। তারপর আবার লেখা শুরু করলাম। এমতাবস্থায় আমার আপনাদের ভারি ভারি মন্তব্যের প্রয়োজন। নতুবা হতাশায় আর লেখা এগোতে পারব না। সহায়তা করুন। ভালোবাসা❤️]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here