বিকেলে ভোরের ফুল পর্ব ৩

#বিকেলে_ভোরের_ফুল

#পর্ব_৩

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

স্পর্শ এখনও চোখ বন্ধ করে আছে মুখে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে ওর। এই প্রথম কোন মেয়ে ওর গায়ে হাত তুলল। রাগে ওর পুরো শরীর কাঁপছে ফুল সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। ফুল ভাবছে স্পর্শ বোধহয় এখন ওকে কেলানি দেবে।কিন্তু না,স্পর্শ সেটা করলো না।
ফুলের চড়টা সে হজম করে নিল। ফুলের দিকে না তাকিয়েই স্পর্শ চেয়ারটা সামান্য উঁচু করে লুঙ্গিটা ছাড়িয়ে নিল। আসলে ফুলের পরনের লুঙ্গিটা চেয়ারের পায়ার তলায় চাপা পড়েছিল ফুল হাঁটতে নিলেই পড়ে যেত সেই জন্যই স্পর্শ ফুলের পরনের লুঙ্গিতে হাত দিয়েছিল কোন বাজে মতলব ছিল না ওর। কিন্তু ফুল ভাবলো তার সম্পূর্ণ উল্টো। স্পর্শের এহেম কান্ডে ফুল কিছুটা অবাক হল। স্পর্শ ফুলের সামনে থেকে সরে আসল।

তখনই ফুল পেছন থেকে দৌড়ে দরজার ছিটকিনি খুলে সবেমাত্র এক পা বাইরে দিয়েছে অমনি একটা হাত এসে ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে। ফুল একটা চিৎকার দিলো,

–“বাঁচাও বাঁচাও,,,,,বাচা,,,,উমমমমমমম”

আর কিছু বলার আগেই স্পর্শ ওর মুখ চেপে ধরে ভেতরে নিয়ে আসে। ফুল রিতিমত হাত পা ছোড়াছুড়ি করতেছে। স্পর্শ এক ঝটকায় ফুলকে নিচে বিছানো তোশকের উপর ফেলে দিলো তারপর দরজাটা আটকে দিয়ে এসে ফুলের পাশে বসে ওর গাল চেপে ধরল।

–“খুব সাহস বেড়েছে তোর তাইনা। তোকে কতবার বলেছি যে তুই এখান থেকে পালাতে পারবি না। যতদিন না পর্যন্ত আমি তোকে ছাড়ছি ততদিন পর্যন্ত তুই এখান থেকে এক পা ও নাড়াতে পারবি না। আর একবার পালানোর চেষ্টা করবি তো ঠ্যাং ভেঙে ফেলব।”

বলেই স্পর্শ ফুলের গাল ছেড়ে দেয়। ফুল হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

–“ছেড়ে দিন আমাকে। আমি বাড়িতে যাব এখানে থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। প্লিজ আমাকে বাড়ি যেতে দিন।”

স্পর্শ একটা চেয়ার টেনে ফুলের সামনে বসে বলল,
–“আমি এর আগেও বলেছি আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না চাইব ততক্ষন পর্যন্ত তুমি কোথাও যেতে পারবে না। তাই এখন চুপচাপ খেয়ে নাও।”

ফুল এবার কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–“আমি খাবো না আমি বাড়ি যাব। আপনি আমাকে যেতে না দিলে আমি কিছু খাব না। না খেয়ে মরে যাব। আপনি খুব খারাপ লোক আপনার কাছে আমি থাকব না।”

স্পর্শ রেগে গিয়ে বলল,

–“আমি খারাপ তাইনা?? তাহলে দেখ এবার এই খারাপ লোক কি করে??”

স্পর্শ চেয়ার থেকে উঠে ফুলের দিকে এগোতে লাগলো। ফুল একটা চিৎকার দিয়ে পেছনে চেপে গেল।

–“খবরদার আমার কাছে এগোবেন না। আর আগাবেন না বলছি তো!!”

–“কেন?? তুমিই তো বলছিলে আমি খুব খারাপ লোক। তাই তো খারাপ কিছু করছি।”

–“আপনি কেন এমন করছেন আমার সাথে?? আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি। তারপরও আমাকে কেন আটকে রেখেছেন?”

–“সেকথা বলার প্রয়োজন বোধ করি না আমি। এখন খেয়ে নাও।”

–“আমি খাব নাআআআআ”

ফুল খাবারের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ছুড়ে মারতে নিলে স্পর্শ ওর হাত চেপে ধরে প্যাকেটটা নিয়ে নিলো। তারপর নিজেই ভাতের লোকমা বানিয়ে ফুলের গাল চেপে ধরে জোর করে ওর মুখে খাবার ঢুকিয়ে দিল। সাথে সাথেই ফুল থু মেরে সব খাবার ফেলে দিলো। এবার স্পর্শের রাগ চরম সীমানায় পৌঁছে গেছে। রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে ফুলের গালে ঠাস করে চড় মেরে দিল। ফুল গালে হাত দিয়ে অবুঝের মতো স্পর্শের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে। স্পর্শ ফুলের দিকে এক নজর তাকিয়ে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিলো।

ফুলের মায়াভরা মুখের দিকে তাকালে ওর সব রাগ দমে যায়।কিন্তু স্পর্শ ওর রাগ দমাতে চায় না।ও চায় ওর সমস্ত রাগ ফুলকে দেখাতে যাতে ফুল স্পর্শকে ভয় পায়। কিন্তু ফুল স্পর্শকে প্রথম দিন ভয় পেলেও এখন একটু কম ভয় পাচ্ছে। তাই স্পর্শ চাচ্ছে ফুলকে আরও ভয় দেখাতে। ফুল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এটা দেখে স্পর্শ জোরে ধমক দিয়ে বলল,

–“শাট আপ। আর একবার যদি কাঁদতে দেখেছি তাহলে মেরে এখানেই পুঁতে ফেলব তোমার বাবা তোমার লাশও খুঁজে পাবে না।”

স্পর্শর ধমকে ফুল কেঁপে উঠলো। কান্নার বেগ কমিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো। স্পর্শ কঠোর গলায় বলল,

–“খাবার রেখে গেলাম আমি এসে যদি দেখি খাবার খাওনি তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। মাইন্ড ইট।”

স্পর্শ বাইরে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে এসে রাগে নিজের চুল খামচে ধরলো স্পর্শ। ভাবতে লাগলো ফুলকে কিভাবে আটকে রাখবে ও যেমন করছে তাতে ফুলকে খুব কড়া নজরে রাখতে হবে না হলে একটু ফাঁক পেলেই পালাবে। গার্ড দুজন স্পর্শর সামনে এসে দাড়ালো। একজন বলল,

–“বস এখানে এতজনের থাকা ঠিক হবে না। যেকোন সময় আজমল চৌধুরীর লোকজন এখানে পৌঁছে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং আপনি এখান থেকে চলে যান। আমরাই মেয়েটাকে দেখে রাখব। আপনিও বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন।”

–“না,এখানে আমি থাকব তোরা দুজন চলে যাবি। আজমল চৌধুরীর সব খবর আমাকে এনে দিবি। আজমল চৌধুরী কখন কি করছে সব ডিটেলস আমার চাই। আর আমার যখন দরকার হবে তোদের কল করে নিব।”

–“কিন্তু বস,,,,,”

স্পর্শ হাত উঠিয়ে ওদের থামিয়ে দিল। লোক দুজন চলে যায়। স্পর্শ কিছুতেই ফুলকে নিজের চোখের আড়াল করবে না তাই ও নিজেই থেকে গেছে। স্পর্শ আবার রুমে ফিরে যায়। দেখল ফুল খাবার নাড়ছে আর কাঁদছে স্পর্শকে দেখেই গপাগপ করে দুই তিন লোকমা ভাত একসাথে মুখে পুরে নিল। ফলে গালদুটো ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ভালোভাবে চিবোতেও পারছে না। খাবার মুখে নিয়েই ফুল জোরে জোরে কাশতে লাগলো। স্পর্শ এগিয়ে এসে পানির বোতল এগিয়ে দিলো ফুল কাঁপা কাঁপা হাতে বোতল নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেল।কয়েক লোকমা খেয়ে আর খেতে পারল না ফুল। খাবারের প্রতি ওর অনিহা তৈরি হয়ে গেছে। তাই ফুল হাত ধুয়ে নিল। স্পর্শও কিছু বলল না। ফুলকে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসাল তারপর দড়ি দিয়ে ওর হাত বাঁধতে লাগলো। ফুল চেয়ে চেয়ে শুধু স্পর্শকে দেখতেছে। স্পর্শ কেন ওকে ধরে এনেছে তা ফুল বুঝতে পারছে না। শত্রুতা যদি ওর বাবার সাথে হয় তাহলে ওর বাবাকে না ধরে ফুলকে ধরলো কেন??

ফুলের হাত পা বেঁধে স্পর্শ ওর মুখে কস্টস্টেপ লাগিয়ে দিল। ফুলের গালের দিকে তাকিয়ে দেখল ওর গালটা লাল হয়ে গেছে। থাপ্পর টা জোরেই মারা হয়ে গেছে। থাপ্পড়টা না মারলে আরও ত্যাড়ামি করত ফুল সেজন্যই বাধ্য হয়ে থাপ্পড়টা মেরেছে। স্পর্শ চুপচাপ বেরিয়ে এসে রুমে তালা মেরে চলে যায়।

🍁🍁🍁

বিকেল বেলা,,,,,,,,,,,

স্পর্শ শপিং মলে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কিছু কিনতে পারছে না। কারণ মেয়েদের জামাকাপড় কখনো কেনেনি ও। তাই মহাবিপদে পড়েছে। এখন কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। শুধু এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির করতেছে। শেষে অনেক কষ্টে একটা মেয়ের সাহায্যে দুটো কুর্তি আর দুটো ঘাগড়া আর ওড়না কিনল। শপিং শেষে বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো স্পর্শ। ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে। স্পর্শ তাড়াতাড়ি রাতের খাবার আর পানি কিনে বাড়ির দিকে রওনা হল। দেড় ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল পুরো রুম অন্ধকার। লাইট অন করতেই দেখল ফুল ভয়ে কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। স্পর্শ এগিয়ে ওর মুখের টেপ খুলে দিতেই ফুল বলে উঠলো,

–“কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?? আপনি জানেন আমার খুব ভয় করছিল??কিডন্যাপ করে এনেছেন বলে কি কোন রেসপন্সিবিলিটি নেই নাকি??”

স্পর্শ বিছানায় প্যাকেটগুলো রাখতে রাখতে বলল,

–“তোমার সেবা করার জন্য তোমাকে কিডন্যাপ করা হয়নি বুঝেছ??”

–“বুঝেছি!!!আমারই ভাবতে ভুল হয়েছে।একজন কিডন্যাপারের তো কোন মায়াদয়া থাকে না।”

–“বুঝেছ এখন চুপ থাকো। যতসব মাথা খারাপ করে দিলো।”

–“ওহ আচ্ছা আমি আপনার মাথা খারাপ করে দেই তাহলে আমাকে ছেড়ে দিন না তাহলে আপনিও বেঁচে গেলেন আর আমিও বেঁচে যাব।”

স্পর্শ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফুলের দিকে উঠিয়ে বলল,

–“আরেকটা কথা বললে এক ঘুসিতে নাক ফাটিয়ে দেব বেয়াদব মেয়ে। সকালে থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দিয়েছি আর এখন ঘুসি মেরে নাক দিয়ে রক্ত বের করে দেব।”

–“মারুন না মারুন কে বারণ করেছে??”

স্পর্শ অনেক কষ্টে রাগ দমিয়ে ফুলের বাঁধন খুলে দিল। তারপর একটা প্যাকেট ওর হাতে দিলো।

–“এতে কি আছে??”

–“তোমার পোশাক। লুঙ্গি আর গেঞ্জি তে বোঝা যাচ্ছে না তুমি আদৌ মেয়ে কি না?তাড়াতাড়ি পড়ে আসো গো,,,,”

ফুল স্পর্শকে ভেংচি কেটে বাথরুমে চলে যায়। লুঙ্গি গেঞ্জি ছেড়ে ঘাগড়া পড়ল। বাথরুমে থাকা ছোট্ট আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো। ওড়নাটা মাথায় দিয়ে বের হলো।

হাত পা গুটিয়ে স্পর্শর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফুল। স্পর্শ ফুলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করলো। তারপর বলল,

–“আমার গেঞ্জি আর লুঙ্গিটা কালকে ধুয়ে দেবে বুঝেছ।”

–“কেন??”

–“ওগুলো কি এখন আমার পরার মতো অবস্থায় আছে??”

–“ওহহ আপনি পরবেন?? আচ্ছা আমি ধুয়ে দেব।”

–“এখন এখানে এসে বসো।”

–“কেন??”

–“সবকিছুতে এতো প্রশ্ন কর কেন??”

ফুল ঝটপট স্পর্শর পাশে গিয়ে বসে। স্পর্শ একটা খাবারের প্যাকেট ওর হাতে ধরিয়ে দিলো।‌ ফুল প্যাকেট খুলে দেখল বিরিয়ানী সাথে সাথেই নাক কুঁচকে ফেলল। কারণ বিরিয়ানী ওর একদম পছন্দ নয়। ফুলের নাক কুঁচকানো দেখে স্পর্শ জিজ্ঞেস করল,

–“কি হয়েছে???”

–“আমি বিরিয়ানী খাইনা।”

–“তাহলে কি খাও তুমি ভাত আর ভর্তা??”

–“সেটা হলে খুব ভালো হতো।”

–“দেখ এখন এর থেকে বেশী কিছু এক্সেপ্ট আমার থেকে করবে না। তোমাকে এখানে তোমার পছন্দ মতো খাবার খাওয়ানোর জন্য আনা হয়নি।”

ফুল মুখটা গোমড়া করে বলল,”জানি জানি।”

–“কি বললে???”

–“ন না,,,,মানে কিছু না।”

–“হুম তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো।”

বলেই স্পর্শ নিজের খাওয়ায় মন দিলো। স্পর্শ গপাগপ খেয়ে যাচ্ছে আর ফুল তা দেখছে আর ছোট ছোট লোকমা মুখে দিচ্ছে। ফুল মনে মনে বলছে,

–“কি রাক্ষস রে বাবা??কিভাবে খাচ্ছে দেখ??আমার তো একটুও খেতে ইচ্ছে করছে না।”

স্পর্শ একনজর ফুলের দিকে তাকাতেই ফুল একটা মেকি হাসি দিয়ে খেতে লাগল। অর্ধেক খেয়ে আর খেল না। খাওয়া শেষে ফুল জিজ্ঞেস করল,

–“আমি কোথায় ঘুমাবো??”

–“কালকে কোথায় ঘুমিয়েছিলে??”

–“ওই চেয়ারে?চেয়ারে বসে বসে ঘুমাতে আমার খুব কষ্ট হয় প্লিজ আমি চেয়ারে ঘুমাব না।”

–“তাহলে কি আমার সাথে এক বিছানায় ঘুমাবে??”

–“না না। আমি চেয়ারেই ঘুমাব। বলছি কি খুব গরম পরেছে এখানে তো ফ্যানও নেই কিভাবে ঘুমাব??”

–“শাট আপ। তখন থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই যাচ্ছো। চেয়ারে ঘুমাতে পারব না ফ্যান ছাড়া ঘুমাতে পারব না। আরাম আয়েশে থাকার জন্য তোমাকে এখানে আনা হয়নি কতবার বলব।”

–“ওহ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আপনি তো আমাকে কিডন্যাপ করে এনেছেন বিয়ে করে নয়।”

–“হুম। নেক্সট টাইম এটা যেন বারবার মনে করিয়ে দিতে না হয়??”

–“ওকে”

স্পর্শ আবার ফুলকে চেয়ারের সাথে বেঁধে দিয়ে মেঝেতে পাতা বিছানায় শুয়ে পড়লো। মাথার উপরের লাইটটা নিভিয়ে দিলো আর দূরের লাইটটা জ্বালিয়ে রাখল যাতে ফুল ভয় না পায়। স্পর্শ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। হঠাৎ করেই একটা শব্দে ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাকিয়ে দেখে ফুল,,,,,,,,,,,,,,,,

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here