বেলা_শেষে_ফেরা পর্ব ১৬+১৭

#বেলা_শেষে_ফেরা

#পর্ব_১৬ (শুভ_বিবাহ_পর্ব)

#লেখনীতে_Suchona_Islam

আজ তূর্ণার গায়ে হলুদ। এভাবে হঠাৎ করে তার বিয়ের আয়োজন চলবে সে তো বুঝতে’ই পারেনি। অফিস থেকে এম.ডি. এর বিয়ের জন্যে এক সপ্তাহ ছুটি দিয়েছে। তাই বেশ আরামে দিন কেটে যাচ্ছে তার। অবশ্য মুনিয়ার সাথে একদিন দেখা হয়েছিলো তূর্ণার। তবে এখন আর দেখা হয় না। মুনিয়া এখন জামাই বাড়িতে বেশ ভালো আছে। তাই তূর্ণার’ও এখন আর কোথা’ও যাওয়া হয়ে উঠে না।

এখন বাবা-মা’র সাথে তূর্ণা কথা বলে। কয়েকদিন আগে বেতন পেয়ে পরিবারের সবাই’কে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলো এবং আসাদ-মুনিয়াকে নিজের বেতন দিয়ে গিফট পাঠিয়ে দিয়েছিলো। তূর্ণা মুনিয়ার বিয়েতে কোনো উপহার দিতে পারে নি বলে একটু আপসেট হয়েছিলো, তবে পরবর্তীতে বেতনের টাকা দিয়ে গিফট করেছে।

আজ বৃহস্পতিবার অফিস নেই বলে একটু দেড়ি করে ঘুম থেকে উঠে তূর্ণা। তূর্ণার বাবা-মা’ও তেমন কিছু বলে না তূর্ণাকে। কারণ কাজ করলে ক্লান্তি আসবে এটা’ই স্বাভাবিক।

তূর্ণা সকালে নামাজ পরে আবার বিছানায় একটু ‘গা’ এলিয়ে দেয় কিন্তু শরীর এলিয়ে দিতে’ই তার ঘুম চলে আসে। তাই সে ঘুম থেকে উঠে ৯’টার দিকে। এক্কেবারে ফ্রেশ হয়ে রুমের বাইরে প্রবেশ করতে’ই তূর্ণা হতবাক। তাদের বাসাটা অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চারিদিকে ফুল আর রংবে-রঙের ছোট ছোট লাইটের আলোয় ঝলমল করছে তূর্ণাদের বাসা। অনেক পরিচিত মেহমান’ও এসেছে। যারা কিনা তূর্ণাদের বিপদের সময় ‘থু থু’ করেছে, তারা’ও এসেছে। হঠাৎ মুনিয়া এসে তূর্ণার সাথে আলিঙ্গন করলো। তূর্ণা তো এসবের কিছু’ই বুঝতে পারছে না। কি হচ্ছে কি তার সাথে এখন।

“তৃর্ণ ঘাস, আমি আজ খুব খুশি। আমার বিয়ের ১৫ দিন পার হলো। অবশেষে তোর’ও বিয়ে হচ্ছে। আমি তো আসাদকে আগে’ই বলে নিয়েছি তোর বিয়েতে উরাধুরা ডান্স না করলে আমি শান্ত হবো না। আর আজ তো গায়ে হলুদ। অনেক ‘ঠুমকা’ লাগাবো আমি তুই দেখিস।”
খুশিতে তূর্ণাকে নিয়ে লাফিয়ে চলছে মুনিয়া। তূর্ণা এখন’ও কিছু বুঝতে পারছে না বলে জিজ্ঞেস করলো মুনিয়াকে, “কি বিয়ে বিয়ে লাগায় দিছিস। আর বাসা এভাবে কে সাজিয়েছে!”
“তোর বিয়ে হবে আর আমি কি ‘বিয়ে’ ছাড়া তোর মাথা বলবো নাকি গোবেট।” তূর্ণার মাথা ছোট্ট একটা চাপড় মারলো মুনিয়া।
“বিয়ে…..” তূর্ণার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে বিয়ের কথা শুনে। তা’ও আবার কিনা তার নিজের বিয়ে। কিন্তু সে তো বর’কে এখন’ও চোখে দেখে নি। আর হঠাৎ করে তাকে কে’ই বা বিয়ে করতে চায়লো, কিচ্ছু মাথায় যাচ্ছে না তূর্ণার। এই বিয়ে’টা তাকে ভাবিয়ে তুলছে বলে সে রুমে গিয়ে চুপটি করে বসে রইলো। তূর্ণা ভাবছে এটি হয়তো কোনো স্বপ্ন হবে।

১০ মিনিট পরে মেহেদী পড়ানোর জন্যে মেয়েরা এসেছে তূর্ণার রুমে। তারা এসে’ই কাজ শুরু করে দেয়। তূর্ণা গভীর ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছে, সে তো কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ হাতে ঠান্ডা অনুভব হওয়ায় ভানার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এসে মেহেন্দি’ওয়ালীদের বলে, “আপনারা কি করছেন কি আমার হাতের সাথে। তা’ও আমাকে না জানিয়ে!”
“ম্যাম! আমাদের অর্ডার করা হয়েছে আপনাকে মেহেদী পড়ানোর। তাই আমরা আমাদের কাজ শুরু করে দিয়েছি।”
“ওহ!”
“জ্বী এবার আপনার হাত দু’টো দিন।”
তূর্ণা হাত সামনে আগিয়ে দিলো। মেহেদী চট-জলদি পড়িয়ে দিলো তারা, এরপর চলে গেলো। মুনিয়া’ও তাদের দিয়ে মেহেদী পড়িয়ে নেয়। তূর্ণা সেই মেহেদী দেওয়া শুরু থেকে হাতে মেহেদী’র দিকে তাকিয়ে আছে। মুনিয়ার হাতে’ও তো মেহেদী। তাই কনুই দিয়ে তূর্ণাকে হাল্কা ধাক্কা দিলো। তূর্ণা ফিরে তাকালো মুনিয়ার দিকে এবং বললো, “আচ্ছা মুনিয়া কে আমাকে বিয়ে করছে তুই তো জানিস নাকি!”
“সেটা সারপ্রাইজ। তবে তুই কি জানিস এখন মেহেদী তোকে কেনো পড়ানো হলো।” মুনিয়া কথা ঘুরিয়ে ফেললো যাতে তূর্ণা না জানে কার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে।
“না তো, কেনো?”
“কারণ আর কিছুক্ষণ পরে তোকে আমি সাজিয়ে দিবো। তাই আগে মেহেদী পড়ানো হলো। আরেকটু পরে হাত ধুয়ে খেয়ে নিবি। কারণ এই বিয়েতে বসে থাকতে থাকতে টায়ার্ড হয়ে যাওয়া লাগে।”
তূর্ণা শুধু’ই মুনিয়ার কথা শুনলো। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেড়োলো না তার। কি বলবে আর সে।

………………………..

“ভাই তুই এটা কি করলি বল। কনে’র বাসায় আজ আমাদের কেনো যেতে দিলি না। আমরা না হয় একটু হলুদ মেখে আসতাম নতুন ভাবীকে।” তূর্জয় কিছু’টা মন খারাপ করে তন্ময়কে কথাগুলো বললো।
“হ্যা ভাইয়া! যেতে দিতা। কেনো সব মজা’য় পানি ঢেলে দিছো, এটা কোনো কথা!” তানিয়ার মন’টাও বেশ খারাপ। বউকে হলুদ মাখাতে যেতে পারে নি বলে।
“আমি কেনো করি নি সেটা অন্যদিন বলবো। তবে আমাকে তো হলুদ দিয়ে তোরা দু’জনেই ভুত বানিয়েছিস। এতে একটু হলে’ও খুশি হো তোরা।” তন্ময় ঠোঁটে ফুলিয়ে দুই ভাই-বোনকে কথাগুলো বললো। তারা দু’জনেই এবার হেসে তাদের বড় ভাইয়ের সাথে আলিঙ্গন করে চলে গেলো। তন্ময়ের’ও যে বেশ মন খারাপ হচ্ছে। সে’ও তো নিরুপায়।

তূর্ণার শ্বশুর বাড়ি থেকে কোনো লোক আসে নি। তারা জানিয়ে দিয়েছে বিয়ের সময় তারা দু’জন দু’জনকে দেখে নিবে। তূর্ণার তো বেশ আগ্রহ ছিলো তার শ্বশুর বাড়ির লোকগুলো’কে দেখার। কিন্তু তা হবে না শুনে চুপচাপ নিজের মতো করে বসে রইলো। এবারে’ও মান-সম্মানের ভয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে নিলো। তা না হলে কলোনির মানুষ তো বেশ ভাল, কোথায়, কার কিছু না জেনে’ই উঁড়ে এসে জুড়ে বসা পাখির মতো কাজ করবে।

হলুদের আয়েজন পর্ব আজ শেষ হলো। কিন্তু তূর্ণার মনের ভীতি কমছে না। কে তার হাজব্যান্ড হবে, যাকে সে একবার দেখে পর্যন্ত নি। অন্তত ফোনে কথা হয়, এমন কি কথা’ও হয়নি তাদের মাঝে। অপরিচিত একটা লোকের সাথে সে কিভাবে থাকবে।
আসাদ তার বাসায় চলে গিয়েছে তবে মুনিয়াকে সাথে করে নিয়ে যায় নি। তূর্ণার কাছে রেখে গিয়েছে। তূর্ণা যেমন তার বিয়েতে সব করেছে, তেমনি ভাবে মুনিয়া’ও চায় সে তূর্ণার বিয়ের সব কিছু মেইন-টেইন করতে।

তূর্ণা মন খারাপ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো। তার পাশে এসে মুনিয়া দাঁড়িয়ে এবং কাঁধে হাত রাখে। তূর্ণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুনিয়া তূর্ণার মন ভালো করার জন্যে বললো, “জানিস তূর্ণা তোর বিয়ের সব খরচ তোর হাসব্যান্ড বহন করছে। আঙ্কেলের দোকান তো সে কবে’ই দেউলিয়া হয়েছে বলে’ই সে বিয়ের জন্যে একটুও খরচাদি করতে পারছিলেন না। তোর হাজব্যান্ড অনেক ভালো, তাই তো সব’টা জেনেও সে তোকে বিয়ে করতে চায়ছে।”
“এগুলো’র সুদে-আসল তুলবে পরবর্তীতে। যৌতুক চাইবে আমার বিয়ে হয়ে গেলে। আমাকে অনেক কষ্ট দিবে। কেনো কেউ আমায় বুঝে না কেনো?” তূর্ণা অন্যমনস্ক হয়ে কথাগুলো বলছিলো। কিন্তু মুনিয়া মনে মনে’ই বললো, “তন্ময় ভাইয়া এমনটা মরে গেলে’ও করবে না তূর্ণা। তুই ভাল থাকবি, সুখে’ই থাকবি।”
বড় একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুনিয়া তূর্ণাকে রুমে নিয়ে ঘুমোতে চললো।

……………………….

সন্ধ্যার দিকে তূর্ণাকে পার্লারে থেকে নিয়ে আসা হয়েছে বাসায়। তেমন জাঁকজমক আয়োজন না হলে’ও মোটামুটি আয়োজন করে বিয়ে’টা সেরে ফেলতে চায় বরপক্ষ তাই-ই শুনেছে তূর্ণা। তবে তন্ময়ের অফিসের একটা প্রজেক্টে ইনভেস্টমেন্ট করা’য় নিজের খরচ বহনের সাথে’ই তূর্ণা খরচ’ও বহন করে চলেছে। তাই জাঁকজমক ভাবে অনুষ্ঠান আর করা হয়নি। তবু’ও তন্ময় খুব’ই খুশি তূর্ণাকে স্ত্রী’য়ের রূপে পাবে বলে। অনুষ্ঠান তো পরেও করা যাবে।

তূর্ণাকে মুনিয়া তার রুমে নিয়ে বসিয়ে রাখছে। তন্ময়ের কিছু আত্নীয় তূর্ণাকে দেখে উপহার দিচ্ছে। তানিয়া’ও পাশে বসা তূর্ণার। তবে তূর্ণা তূর্জয়’কে ছাড়া আর কাউ’কেই চিনে না। তূর্ণা তানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কি মিষ্টি চেহারা। ধূসর রঙের একটি লং গাউন পরেছে। আবার কিছুটা তন্ময়ের ছাপ’ও আছে চেহারায়। তৎক্ষণাৎ তূর্ণা তানিয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। সে কেনো তন্ময়ের কথা ভাবছে। এই বিয়ে হয়তো হয়েই যাবে। সে কি আর কখনো তন্ময়ের দেখা পাবে। মাথা নিচু করে নিঃশব্দে এক ফোটা চোখের পানি ফেলে নিলো তূর্ণা।

১ ঘন্টা পর তূর্ণাকে রুম থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ছাদে। সেখানে ছোট্ট করে ডেকোরেশন করা হয়েছে। তূর্ণা মাথা নিচু করেই রেখেছে, ছেলেকে দেখলে যদি তন্ময়ের কথা মনে পরে যায় তাই।

বিয়ের আসনে আসার পর থেকে কেউ’ই কাউ’কে দেখেনি এখন’ও। দু’জনেই একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে তবে কেউ-ই কাউ’কে দেখতে পারছে না। কারণ সামনে একটি ওড়না দিয়ে রাখা হয়েছে। যেন বর কনে’কে না দেখতে পারে এবং কনে বর’কে। কাজী সাহেব এদের বিয়ে পড়ানো শেষ করে প্রথমে কনে’কে বললেন ‘কবুল’ বলতে। তূর্ণার শুধু তন্ময়ের কথা মনে পরছে। মুনিয়াকে তূর্ণার বাবা বারবার বলে দিয়েছে, তূর্ণা যেনো ‘কবুল’ বলে তাই মুনিয়া তূর্ণাকে বারবার ‘কবুল’ বলতে বলছে। সবাই অনেকবার রিকুয়েস্ট করার পর তূর্ণা বুকে পাথর চাপা দিয়ে ‘কবুল’ বললে কাজী সাহেব ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠেন। তূর্ণা এবার মাথা নিচু করে কেঁদে’ই দিলো। তন্ময়কে কাজী ‘কবুল’ বলতে বললে তন্ময় ‘কবুল’ বলে দিলো উপস্থিত সবাই একসাথে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠে।

কাজী এবার বললেন, “বর ও কনে’কে মুখামুখি করান। তাদের দু’জনের প্রথম বিবাহের দৃষ্টিতে আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ভালোবাসার বর্ষণ দিয়ে দিবে।”

সামনে থেকে ওড়না সরিয়ে দিলে তন্ময় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তূর্ণা’তে। কিন্তু তূর্ণা এখন’ও দৃষ্টি নিক্ষেপ করেনি। মুনিয়া তূর্ণাকে বললো, “তূর্ণা একবার দেখ তোর হাজব্যান্ড’কে কি হ্যান্ডসাম। সব মেয়েকে পাগল করতে পারবে।” তবু’ও তূর্ণা মাথা তুলে তাকাচ্ছে না। সবাই ভাবছে বউ হয়তো লজ্জা পাচ্ছে, কিন্তু তূর্ণা জানে তার মনের পরিস্থিতি। এর’ই মাঝে তূর্জয় বলে উঠলো, “ভাই কি বিয়ে করলি তোর বউ এতো লজ্জা পাচ্ছে যে তার হ্যান্ডসাম দেবর’কেও দেখতে পারছে না।”
তূর্ণা তূর্জয়ের কথায় মুখ তুলে তাকালে বড় ধরণের একটা শক খায়। এ যে তন্ময়। তাহলে কি তার সাথে তন্ময়ের বিয়ে হচ্ছে। তূর্ণা হতবাক হয়ে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্জয় পাশে থেকে বলে উঠলো, “এবার তো ভাইয়ের থেকে ভাবীর নজর’ই পরছে না। জামাই দেখে’ই ক্রাশড।” তূর্জয় এ কথা বলায় তূর্ণা এবার লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে হাসছে, যেন কেউ তার হাসি না দেখতে পারে। আর সবাই ভাবছে তূর্জয়ের কথা শুনে বউ লজ্জা পেয়েছে বলে হাসিতে মশগুল।

এখানে তন্ময়-তূর্ণার গায়ে হলুদ ও বিয়ের পরিচর্যা নিয়ে বিস্তারিত বলা হলো…

তন্ময়ের গায়ে হলুদের পরিচর্যা____
তন্ময় তার হলুদে ক্রীম কালারের একটি পাঞ্জাবী পরেছিলো। চুল নিজের মতো স্টাইল করেছে। বাসাতেই ছিলো বলে তেমন আউটস্ট্যান্ডিং লুক দেয় নি। বাটা হলুদ দিয়ে তন্ময়কে ভুত বানিয়ে দিয়েছিলো তন্ময়ের বেস্টফ্রেন্ড অভ্র ও তন্ময়ের ভাই তূর্জয়। অভ্র আর তূর্জয় দুষ্টুমিতে পুরো কার্বন কপি।
তন্ময়ের বিয়ের পরিচর্যা____
বিয়েতে তন্ময় হাল্কা মেরুন রঙের শেরওয়ানী পরিধান করেছে, তবে লাল পরেনি। কারণ লাল, হলুদ, কমলা এই তিন রঙ ছেলেদের জন্যে হারাম তাই। হাতে ব্র্যান্ডেড ঘড়ি, পছন্দের চকলেট পারফিউম। শেরওয়ানী’র সাথে ম্যাচিং জুতা পরেছে, সাথে এক্সট্রা জুতােও নিয়েছে। জামাইয়ের জুতা চুরি না হলে বিয়ের আনন্দ কমে যাবে তাই। তবে তন্ময়ের দুই জুতোজোড়া চুরি হয়েছে। তবে বিয়েতে’ও তার প্রিয় কালো মাস্ক পরে এসেছে। তূর্ণার কিছু কাজিনরা আছে যারা তূর্ণাকে দেখে ঈর্ষা করতো। কারণ তূর্ণা দেখতে খুব মিষ্টি এবং সুন্দর বলে। আজ তূর্ণার জামাই দেখে’ও তারা ঈর্ষা করছে।

তূর্ণার গায়ে হলুদের পরিচর্যা____
‘কাচ হলদে’ আটপৌরের মতো শাড়ি পরেছিলো তূর্ণা। দুই হাতে দু’মুঠো কাচের হলুদ চুড়ি পরেছিলো, কোমড়ে চেইনের মতো বিছা (একধরণের কোমড় অলঙ্কার) পরেছিলো। তন্ময় তূর্ণার হলুদের জন্যে শাড়ি এবং প্রয়োজনীয় জিনিস দিতে চেয়েছিলো। তবে আকিদ তালুকদার আপত্তি করলেন এতে। সে তার মেয়ের গায়ে হলুদের জন্যে অন্তত নিজের জমানো টাকা থেকে শাড়ি এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কিন্তে চেয়েছেন। তাই তন্ময় আর কিছু বলে নি। কিন্তু ফুলের গহনা তন্ময় অর্ডার দিয়ে আগে’ই বানিয়ে নিয়েছে। রজনীগন্ধা ও গোলাপের মিশ্র ফুলের অলঙ্কার অর্ডার করে বানিয়েছে তন্ময়। টিকলি, চুড়ি, পায়েল। ঠিক যেন প্লাস্টিকের ফুলের গহনার মতো। তূর্ণা হাল্কা করে সেজেছিলো তার গায়ে হলুদে। সিল্ক চুলগুলো খোলা ছিলো। অনেক মিষ্টি লাগছিলো দেখতে। মুনিয়া তন্ময়ের কাছে তূর্ণার গায়ে হলুদের ছবি পাঠিয়ে দিয়েছিলো। তন্ময় সারারাত তূর্ণার ছবি দেখে’ই কাটিয়েছে না ঘুমিয়ে।
তূর্ণার বিয়ের পরিচর্যা____
তূর্ণা বিয়েতে লাল রঙের লেহেঙ্গা সাথে গহনা পরিধান করেছে। বিয়ের কনে’র সাজের ডিটেইল’স আর কি দিবো। জাস্ট ইমেজিং করে নিন সবাই। মুনিয়া আজকে কোনো ছবি পাঠায়নি তন্ময়কে। কারণ আজ তো বিয়ে তাই বর নিজে এসে তার বউকে দেখে নিবে। তন্ময় তো তূর্ণাকে দেখে সেখানেই পাগল হয়ে গিয়েছে। চোখের পলক তো পরছেই না। তূর্ণা সকলের কথায় লজ্জা পেয়েছিলো বলো, লজ্জায় আর মাথা তুলে নি। #বেলা_শেষে_ফেরা

#পর্ব_১৭

#লেখনীতে_Suchona_Islam

তূর্ণাকে তন্ময়দের বাসায় নিয়ে আসা হয়। মুনিয়াকে আসাদ তাদের বাসায় নিয়ে যাওয়ায় তারা আসে নি তূর্ণার সাথে। তবে তামিম এসেছে। বিয়েতে খুব মজা করায় বেশ ক্লান্ত ছিলো বলে সোফাতে’ই ঘুমিয়ে পরেছে তানিয়ার রুমে তামিম। তামিমকে দেখে তানিয়া বললো, “ভাবী তোমার ভাইটা যদি বড় হতো তাহলে আমি ওকে’ই বিয়ে করে নিতাম। ইশ কিউটের একটা ডিব্বা। মন চাচ্ছে ওর টমেটোর মতো গাল আমি খেয়ে ফেলি।”
তানিয়ার কথায় তূর্ণা হাল্কা হাসলো শুধু।

আমেনা বিনতে তো নাত’বউকে পেয়ে খুব খুশি। তন্ময়ের পরিবারের সবাই তূর্ণাকে তন্ময়ের বউ হিসেবে পেয়ে খুশি হলে’ও, খুশি হতে পারে নি তন্ময়ের মা আফরোজা জান্নাত। সে তো তূর্ণার মুখ পর্যন্ত দেখতে চায় না। তার মনে পুষে রয়েছে ছেলের অপমানিত রাগ। সে এ বিয়েতে মত দেয় নি বললে’ই চলে।

“ও আমার সতীন লো (গো)। তা তোমার এহানে (এখানে) আইতে (আসতে) কুনু (কোনো) কষ্ট হয় নাই তো!”
তূর্ণা তো আমেনা বিনতের কথা শুনে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, যেন সে কিচ্ছুটি বুঝতে পারছে না। তন্ময় পাশেই ছিলো তবে তূর্ণার এমন তার দাদীর দিকে তাকানো দেখে মিটিমিটি হাসছে।

“হুনো (শুনো) নাত বউ। তুমি যদি গেরামের (গ্রামের) বাষা (ভাষা) কইতে (বলতে) না পারো তায়লে (তাহলে) আমার নাতির কাছ থেইক্কা (থেকে) এক সপ্তার (সপ্তাহের) মইধ্যে (মধ্যে) হিগ্গা (শিক্ষা) লইয়ো (নিয়ো)। আর যদি হিগতে (শিখতে) না পারো তয় (তবে) তুমি আমার লগে (সাথে) কতাই (কথাই) কইবা (বলবা) না।” আমেনা বিনতে একটু শক্ত গলায় তূর্ণাকে কথা গুলো বললো। তূর্ণা তো ভয়ে একঢোক গিললো। তারপর তূর্ণা মুখ নিচু করে বলতে শুরু করলো, “আমার নানু তো গ্রামের মানুষ ছিলো। আপনে’গোর (আপনাদের) মতো ও ভাবে কথা বলতে না পারলে’ও কিছু কিছু কইতে (বলতে) পারি। তবে আমি আপনের (আপনার) সাথে থাকলেই সব শিক্ষা লইতে (নিতে) পারুম (পারব)। আমি আপনের (আপনার) কাছ থাইক্কাই (থেকেই) গ্রামের কতা (কথা) শিকমু (শিখব) দাদী।”

পাশে তন্ময় ছিলো সে তূর্ণাকে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে। আমেনা বিনতে তো খুব খুশি। সে তূর্ণার কপালে চুমু কেটে বুকে জড়িয়ে নিলো।
“তায় (তবে) তোমার ভাইডা (ভাই’টা) কি আইজ (আজ) আমার লগে (সাথে) শুইবো (শুবে) নি (নাকি)। এডা’ও (এটাও) তো নাতি হয়। তাইলে এহন (এখন) থেইক্কা (থেকে) এর’ও বউয়ের ভাগ নিলাম আমি।” আমেনা বিনতের এমন কথা শুনে সকলেই হেসে কুপোকাত। তামিমকে তন্ময় কোলে করে আমেনা বিনতের রুমে নিয়ে রেখে আসতে লাগলো।

তানিয়া তূর্ণাকে আফরোজা জান্নাতের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আফরোজা জান্নাত নিজের রুমে বসে আছে। তূর্ণা বাসায় আসার পর থেকে সে রুমে আছে, তূর্ণার সামনে যায় নি। তাই তূর্ণা তানিয়া’কে বলে আফরোজা জান্নাতের রুমে আসে। সেখানে তারিকুল চৌধুরী’ও ছিলো। তূর্ণা দেখে তার শাশুড়ি এক হাত কপালে দিয়ে শুয়ে আছে। তূর্ণা তার কাছে যায় এবং সালাম করে নেয়।
আফরোজা জান্নাত পা’য়ে কিছুর স্পর্শ পাওয়া’য় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে বিছানায়। সে তূর্ণাকে তার পাশে বসতে দেখে রাগ গিজগিজ করে বললো, “ফাজিজ, অসভ্য মেয়ে। তুমি আমার সামনে আসলে কেনো। আর আমার পা ধরে কি করছিলে!” তখন’ই তারিকুল চৌধুরী তার স্ত্রীকে বললেন, “বউমা তোমাকে সালাম করতে এসেছে। তুমি তো সেই কখন থেকে ঘরে বসে আছো, বের হওনি তাই।”
“কি ‘বউমা বউমা’ লাগিয়ে দিচ্ছো। আমি ওকে আমার ছেলের বউ হিসেবে মানি না। ওর মতো বেয়াদব মেয়ে যে কিনা আমার ছেলেকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, ওকে আমি আমার ছেলের বউ মানবো, কখনোই না। তানিয়া ওকে এখুনি এখান থেকে নিয়ে যা। আমি ওর মুখ দেখতে চাই না। আর ওকে বলে দে আমার সামনে যেন না পরে, আদিখ্যেতা না করে।” ঝাঁজালো কন্ঠে তূর্ণাকে অনেক কথা শুনে দিয়ে ফের শুয়ে পরে আফরোজা জান্নাত। তূর্ণা তার শাশুড়ির কথা বেশ কষ্ট পায়। তাই নিরবে কান্না সহ্য করে তানিয়াকে নিয়ে চলে গেলো রুম ত্যাগ করে।

তারিকুল চৌধুরী তার স্ত্রীয়ের পাশে বসে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, “দেখো আফরোজা! ও তো নতুন এসেছে। আর আগের সব ভুলে গিয়ে কেনো ওকে আপন করে নিচ্ছো না তুমি। আমার বিশ্বাস আমার বউমা তোমার মন জয় করে নিবে’ই। তন্ময় আমার’ও ছেলে। আমি এতটুকু বিশ্বাস রাখি তাকে দিয়ে। ও এমন কাউ’কে আমার পরিবারে আনবে না, যে শুধু তাকে এবং টাকা’কে ব্যবহার করবে। আর বউমা তো আমার ঘরের লক্ষী। সব ভুলে ওকে তুমি আপন করে নাও আফরোজা।”
“আমি তোমায় বলছি না। আমার সামনে ‘বউমা বউমা’ করবে না। আর ওকে আমি আপন করতে পারবো না। আমার ভালো লাগছে না, মাথা ঘুরাচ্ছে। ঘুমোতে দাও আমায়।” বিরক্তি নিয়ে কথাগুলো স্বামীকে শোনালেন আফরোজা জান্নাত। তারিকুল চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

“বউমা, তুমি কিছু মনে করো না। ও আগের কথা ভুলতে পারে নি এখনো। এটাও ঠিক যে আমার ছেলেটা অনেক কষ্ট পেয়েছিলো তখন। ওকে স্বাভাবিক করতে অনেকটা সময় লেগে যায়। যাই হোক, আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো। তার পক্ষ থেকে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।” তারিকুল চৌধুরী তূর্ণার সামনে মাথা নিচু করে রইলেন।
তূর্ণা তার শ্বশুর’কে বললেন, “বাবা এ আপনি কি বলছেন। আপনি কেনো ক্ষমা চাইবেন আমার কাছে। আপনি এবং মা আমার নতুন পিতা-মাতা। আমি আপনাদের নতুন সন্তান। আমার ননদী’কে আপনারা যেভাবে আদর-যত্ন করেন, আমাকে’ও সেই ভাগটুকু দিয়েন আমি তাতেই ধন্য হবো। আমি জানি মা রেগে আছেন এবং কতদিন থাকবে সেটা আমার জানা নেই। তবে রাগ চলে গেলে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিবেন। আমি’ও তো ভুল করেছি বাবা। আপনাদের কাছে ক্ষমা’ও চাই নি উল্টো। আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।” তূর্ণা তার শ্বশুরের পা ধরে কান্না করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। তারিকুল চৌধুরী তূর্ণাকে পা থেকে তুলে ঠিক মতো দাঁড় করিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

……………………….

তূর্ণা তন্ময়ের বিছানায় বসে আছে। এখুনি তন্ময় চলে আসবে। তূর্ণার মনে কিছুটা ভীতি কাজ করছে। ভয়ে পেয়ে সে রুমের মাঝে পায়চারী করতে লাগলো। রুমের মাঝে হাটতে হাটতে তার পা’য়ে মোমের ছোঁয়া লাগলে, তূর্ণা চমকে যায়। তারপর পুরো রুম সে পরোখ করে দেখতে থাকে। কি সুন্দর করে সাজানো তন্ময়ের রুমটা, বেশ বড় বলে সাজানোটা অনেক সুন্দর হয়েছে। এটা তার বাসরঘর ভাবতেই আবার একটু লজ্জা পেলো তূর্ণা। হঠাৎ পিছন থেকে তন্ময় তূর্ণাকে জড়িয়ে ধরলে তূর্ণা একটু ভয় পেয়ে সামনে ঘুরে তাকায়। তাকিয়ে দেখে তন্ময় মিষ্টি হাসি দিয়ে তাকে দেখছে আর তূর্ণা তন্ময়কে নিবিড় চোখে তাকিয়ে দেখছে।

“আর লজ্জা পেতে হবেনা। তবে তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?”
“হু!”
“তুমি কি কোনো ম্যাজিক জানো নাকি। প্রতিবার’ই আমাকে ঘায়েল করো তোমার রূপে।”
“তোমার কাছে’ই শুধু আমাকে ম্যাজিশিয়ান লাগে। আমি কোনো ম্যাজিক পারি না।”
“হয়তো। তবে আমার কাছে তুমি একটা ম্যাজিশিয়ান’ই হও।”
হঠাৎ তূর্ণা তন্ময়ের পা ধরে কেঁদে উঠলো। এরপর কান্না করে’ই বলতে লাগলো, “আমি কতোটা স্বার্থপর তন্ময়। তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু একবারো তোমার কাছে আমি ক্ষমা চায়তে আসি নি। আমি কি করতাম বলো। আমার কাছে যে কোনো উপায় ছিলো না। সেদিনই বাবার অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। যদি সঠিক সময়ে ডক্টরের কাছে না নিতাম তবে আমি বাবাকে….!” তূর্ণা কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পরে। তন্ময় তূর্ণা দাঁড় করিয়ে তার বুকে টেনে নিলো এবং বলতে লাগলো, “আমি তো সব জানি। তুমি এভাবে কেঁদো না প্লিজ। আমার ভালো লাগে না তুমি কাঁদলে।”
তূর্ণা কান্না থামিয়ে দিলো। কান্না করে হেচকি তুলে ফেলেছে তূর্ণা। তা দেখে তন্ময় দুষ্টুমি করে বললো, “কি চুরি করে খেয়েছো বউ!” তন্ময়ের কথা শুনে তূর্ণা তন্ময়ের দিকে তাকালে ওর হেচকি চলে যায়। তন্ময় জোরে হেসে দেয়। তন্ময়ের হাসি দেখে তূর্ণা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। কিছুক্ষণ পরে দু’জনে শুকরিয়া’র নামাজ আদায় করে নেয়।

“এই কয়েকদিন তুমি অফিসে যাও নি বলে আমার উপর খুব প্রেশার গিয়েছে। স্টাফ পেয়েছি নাকি মগেরমুলুক পেয়েছি কে জানে। তা’ও বেশিরভাগই মেয়ে স্টাফ। আমাকে দেখলেই হলো একবার। তখন মনে হয় অফিস থেকে ওদের বের করে দেই। খুব’ই ক্লান্ত আমি। আমার রেস্টের প্রয়োজন।” বিছানায় শুয়ে আছে দু’জনে। তূর্ণা কিছু বললো না মনে মনে একটু খুশি হলো। তা তন্ময় বুঝতে পেরে বললো, “হেহেহে। কি, কেমন দিলাম। তোমার সাথে প্র্যাঙ্ক করে কিন্তু মজা’ই আছে।” তন্ময়ের কাছ থেকে এমন কথা শুনে তূর্ণা ঘাবড়ে যায়। তন্ময় দুষ্টু হাসি দিয়ে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে থাকে।

#ক্রমশ…

(পবিত্র মাহে রজমানে সবাইকে শুভেচ্ছা। গল্পটির পর্ব আজ ছোট হয়ে গিয়েছে। তবে গল্পটি কেমন হলো আপনার মতামত জানাবেন।
স্ববিনয়ে পড়ুন এবং ধন্যবাদ সবাইকে।)

#ক্রমশ…

(গল্পটি কেমন হলো মতামত জানাবেন। ভুল-ত্রুটি ক্ষমাপার্থী।
স্ববিনয়ে পড়ুন এবং ধন্যবাদ সকলকে।)
কাল থেকে রোজা শুরু। তাই আজ সারাদিনে প্রচুর ব্যস্ততায় গিয়েছে আমার। কাল হয়তো আমি দেড়ি করে গল্প দিবো, তাই দুঃখিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here