ভালোবাসা তুই পর্ব ৭

#ভালোবাসা_তুই
#পর্বঃ৭
#লেখিকা_সাদিয়া_আক্তার

____________________________
হসপিটালের সামনে গাড়ি থামলো। আমির এক সেকেন্ডও দেরি করলো না,ইরাকে দ্রুত কোলে তুলে হসপিটালের বেডে শুয়ে দিলেন।ডক্টরকে আগে দিয়েই কল করে জানিয়ে দিয়েছিল আমির।তাই ডক্টরও দেরি করলেন না।ব্লিডিং বন্ধ করার জন্যে সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে।আমির ততক্ষণে ইরার ফ্যামিলি মেম্বারদেরও খবর দিয়ে দিয়েছেন।দুইঘন্টা হতে চলল কিন্তু ইরার জ্ঞান ফিরেনি।

তূর্য বেশ আহত হয়েছে।রিয়াদেরও এমনি অবস্থা।তূর্য ইরাকে একবার দেখার জন্যে ছটফট করছে কিন্তু সেও বের হতে পারছে না কারণ ডক্টর তার আহত স্থানগুলোতে ড্রেসিং করতে ব্যস্ত।এবার তূর্য রেগে চড়া হয়ে ডক্টরকে বলে,

—–আর কতক্ষন ডক্টর?আমাকে প্লিজ এবার যেতে দিন।অনেক ড্রেসিং হয়েছে।
তূর্যের কথা শুনে ডক্টর কিছুটা ঝাটকা খেল।একটু অবাক হয়েই বলে,
—-আচ্ছা আপনি মাথায়ও আঘাত পেয়েছেন নাকি যে এমন উটকো কথা বলছেন?অবস্থা দেখেছেন নিজের?আপনার শরীরের জাগায় জাগায় ক্ষতের স্থান স্পষ্ট।আপনার আপতত দুইদিন বেড রেস্টে থাকতে হবে।
—–কি দুইদিন?আপনি ডক্টর তো নাকি পাগল হয়ে গেসেছেন ডক্টরই বেশি পড়ে?
ডক্টর তূর্যের কথায় একটু হেসেই বলে,
—–আমি ঠিকি বলছি।বাট আপনি এসব জেদ করে নিজের শরীরের উপর যেভাবে টর্চার দিচ্ছেন তাতে আপনি নির্ঘাত পাগল হয়ে যেতে পারেন।
এবার তূর্য বেশ রেগেই গেলো।ডক্টর ড্রেসিং করে চলে যায়।

🍁

ডক্টর যেতেই তূর্য কোনো মতে হসপিটালের নার্সদের চোখে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে যায়।তাকে যে ইরারকে এক নজর হলেও দেখতে হবে।ইরার আঘাতপ্রাপ্ত রক্তাক্ত হাত,ব্যাথায় কুকড়ে উঠা সবই ভেসে উঠছে বার বার তূর্যের চোখে সামনে।ইরার কেবিনে মা,বাবা,ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে।তাই তূর্য ইরাকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে না।বাইরে এককোণে আমির দাঁড়িয়ে আছে।তূর্য আমিরের কাছে গিয়ে বলে,
—–থ্যাংক্স আপনাকে, ইরাকে সময়মতো হসপিটালে নিয়ে আসার জন্যে।
—–তার জন্যে থ্যাংক্স দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।হাজার কিছু হলেও ইরাকে আমি কিছু হতে দিতাম না।আমার জান দিয়ে হলেও রক্ষা করতাম।(একটু হেসে)

আমিরের মুখে এসব কথা শুনে যে তূর্যের মাথার রগ গুলো ফুলে উঠছে।ইচ্ছা করছে এখনি দুই-তিনটা ঘুষি দিয়ে দিতে,তাহলে হয়তো তূর্যের মনটা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতো।নিজের রাগ কন্ট্রোল করার জন্যে হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে তার উপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে।আমিরের ফোনে কল আসে।আমিরের বাবা তাকে এখনি ডেকেছেন আর্জেন্ট তাই বেরিয়ে পরে।তূর্য এখনো ইরার কেবিনের বাইরে পাইচারি করছে।কবে দেখবে ইরাকে এক নজর হলেও ।কিছুক্ষন পর ইরার ফ্যামিলির সবাই বেরিয়ে যায় লাঞ্চের জন্যে তা দেখতে পেয়েই তূর্য এক মিনিটও লেট করলো না ইরাকে দেখার জন্যে কেবিনে ঢুকতে।ইরা এখনো চোখ বন্ধ করে আছে।তূর্য ইরার পাশে এসে বসে।ইরার হাতটা আস্তে করে ধরে ক্ষত স্থানটা ভালো করে দেখছে।তূর্যর চোখ জলে ছলছল করছে।ইরার অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

—–তুমি তো ঘুমের দেশে তলিয়ে আছো ইরা। আমার কষ্টটা তুমি কি করে বুঝবে?তোমাকে সেই গুন্ডাগুলোর আক্রমণ থেকে বাচাঁতে আমি কিভাবে ব্যর্থ হলাম?নিজের প্রতি নিজের রাগ লাগছে তাই হয়তো তোমার চেয়ে আমারই বেশি ব্যাথা হচ্ছে বুকের বা পাশের দিকটাই।ঠিক সেদিনও আমি তোমার পাশে এভাবেই বসে ছিলাম যেদিন তুমি পাহাড়ের চূড়া থেকে পরার ভয়ে আমার বুকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে।তোমার সেই মিষ্টি নিষ্পাপ মুখটা আমি দেখেই যাচ্ছিলাম।কারণ আমার #ভালোবাসা_তুই যে তাই।
বলতেই বলতেই তূর্যের চোখ থেকে এক ফোটা জল ইরার গাল স্পর্শ করতে দেরি করলো না।তা দেখে তূর্য ইরার আরেকটু কাছে চলে আসে জলটা মুছার জন্যে।কাছে এসে হাত দিয়ে মুছলো।কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর ইরার কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুয়ে চলে যায় তূর্য।

🍁**নতুন নতুন রোমান্টিক গল্প পেজে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ “নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”**

তূর্য যাওয়ার কিছুক্ষন পরই ইরার জ্ঞান ফিরে আসে।নার্স তা দেখে ডক্টরকে ডাকতে চলে যায়।আমির ইরার রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো ইরা হালকা করে চোখ খুলার ট্রাই করছে। ইরার কেনো যেনো মনে হচ্ছে একটু আগেকেউ ওর পাশে এসে বসেছিলো আর কিছু ওকে বলেছে।বাট কি বলেছে তা কিছুতেই মনে করতে পারছে না।মাথাটা ভার ভার লাগছে।আমির দৌড়ে ইরার পাশে এসে বলে,
—-এখন কেমন লাগছে ইরা?ঠিক লাগছে শরীরটা?
—-জানি না তবে মাথাটা হালকা ভার ভার লাগছে।আচ্ছা আমির আমার রুমে একটু আগে কেউ এসেছিলো?
—-যতটুকু জানি কেউ আসে নি।আমি বাইরে গিয়েছিলাম একটু আগে।তোমার কেবিন থেকে কাউকে ঢুকতে বা আসতে দেখি নি।
—-ওহ আচ্ছা।(মন খারাপ করে)
তূর্য কি তাহলে আমাকে একবারও দেখতে আসেনি?বাট কেনো যেনো মনে হচ্ছে তূর্য এসেছিল।কিন্তু আমির তো বলেছে যে ও কাউকে আসতে দেখি নি।আমারই ভ্রান্তি হবে হয়তো।ওই তূর্য ব্যাটার কাছে কিছু আসা করাই ভুল।তবু কেন যে করি! (মনে মনে বলছে নিজের সাথে ইরা)

ডক্টর এসে ইরাকে চেকাপ করে ডিসচার্জ দিয়ে দিলো।ইরার ফ্যামিলি এসে তাকে নিয়ে যায়।চৈতী আসে ইরাকে দেখতে তার বাসায়।চৈতী ইরার রুমে ঢুকেই ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
—-দোস্ত কেমন আছিস?তুই সেদিন কেনো শুধু শুধু আমার জন্যে এতো বড় রিস্ক নিলে?
—-কি বলিস তুই?তুই আর আমি শুধু বেস্টু না সেই ছোট্ট কালের ফ্রেন্ড আমরা।তুই আমার বোন।তোকে আমি আমার বোনের মতোই লাভ করি।আর সেই আমার বোন বিপদে পরবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো তা হতে পারে?
তা শুনে চৈতীর চোখ জলে ভিজে যায়।ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
—-উফফ!তুইও না।
—-আচ্ছা দোস্ত তোরা এভাবে একটা বিপদে কিভাবে পরলি আর ওই গুন্ডাগুলোর তোরা এমন কি ক্ষতি করলি যে ওরা তোদেরকে আক্রমণ করলো এভাবে?
—-আমি নিজেও জানি না তবে যতটুকু তখন রিয়াদের মুখে শুনলাম তাদের সাথে নাকি কি পুরোনা শত্রুতা ছিল রিয়াদের বেচের সাথে, তূর্য ভাইয়ার সাথেও।যার কারণে সেদিন রিয়াদকে একা পেয়ে এভাবে অ্যাট্রাক্ট করলো।

—–রিয়াদ ভাইয়া এখন কেমন আছে এইটা আগে বল?
—-হ্যা ভালো আছে।আজকে সকালে ডিসচার্জ পেয়েছে।তূর্য ভাইয়ার খবর জানিস কিছু?উনিও অনেক আহত হয়েছে শুনলাম!
তা শুনে ইরা কিছুটা গাবড়ে যায় আর বলে,
—-কি হয়েছে দোস্ত আমি তো কিছুই জানি না।আচ্ছা দাঁড়া আমি ওর একটা ফ্রেন্ডকে কল দিয়ে দেখছি।
ইরা মোবাইলটা দ্রুত হাতে নিয়ে তূর্যেরই আরেক ফ্রেন্ড রনিকে কল দেই।কল বাজছে।কিছুক্ষনপর রিসিভ করতেই ইরা বলা শুরু করে,
—-হ্যালো!রনি ভাই।
—-হ্যাঁ বল ইরা?
—-ভাইয়া তূর্য ভাইয়া কোথায় আছেন?আর উনার কি কিছু হয়েছে?বলেন না!
—-আস্তে আস্তে এতো গুলো প্রশ্ন একসাথে করলে কোনটার আনসার দিবো বলতো?তূর্য বেশ ইনজুরিড।তাই ডক্টর ওকে বেড রেস্টে থাকতে বলেছে।আমরা সবাই এখন ওর বাসায় এসেছি দেখতে।আর কিছু বলার আগেই ইরা বলে
—-উনার বাসার এড্রেসটা কি ভাইয়া আমাকে এসএমএস করে দিতে পারবেন?
—-হুম।সিউর।
এই বলেই ইরা কলটা রেখে রেডি হতে লাগলো। চৈতী তা দেখেই বলে,
—-কোথাও যাচ্ছিস?আর রনি ভাই কি বলল?
—-তূর্যের বাসায় যাচ্ছি উনাকে দেখতে।
—-আচ্ছা আমিও যাবো।
—-অকে চল।

🍁

ইরা আর চৈতী তূর্যের বাসায় পৌঁছে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে।তূর্যের আম্মু তো ওকে চিনে না কি ভাব্বে।এভাবে বিনা দাওয়াতে চলে এসেছে?এইসব ভাবতে ভাবতেই তূর্যের আম্মু এসে বলে,
—-তুমি ইরা?
ইরা কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই কিভাবে চিনলো তাকে?সে তো এই প্রথম এসেছে তূর্যের বাসায়।বাট তা জিজ্ঞেস করার আগেই চৈতী বলে উঠে,
—–আন্টি ভাইয়া কোথায় আর উনার শরীর কেমন আছে এখন?
—–হুম বেড রেস্টে আছে।ওর সব ফ্রেন্ডরা ভিতরে আছে।তোমরা যাও গিয়ে দেখে আসো।
তা শুনেই ইরা ঢুকেই দেখে তূর্যের সব ফ্রেন্ডরা লিভিং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে।তূর্যের সব ফ্রেন্ডরা এমনি।ছোট বেলার ফ্রেন্ড সার্কেল তাই তূর্যের আম্মু তাদের আন্টি না মায়ের মত।তূর্যের বাসাকে তারা নিজের বাসার মত মনে করে ফ্রিলি চলাফেরা করে।রনি ইরাকে দেখে বলে,
—-আমার এড্রেস দিতে দেরি আর তোমার আসতে দেরি নাই।বাহ! এভাবে বলেই সবাই হাসা শুরু করলো।তা দেখে ইরা বেশ লজ্জাবোধ করতে লাগলো।কিছুক্ষনপর ইরা তূর্যের রুমের দিকে যাচ্ছে।কিছু হাসির শব্দ ভেসে আসসে তূর্যের রুম থেকে।ইরা আরেকটু দৌড়ে ছুটে যায়।গিয়ে দেখতেই ইরার মুখটা যেনো চুপসে যায়।চোখে সাগরের ঢেউ আঁচড়ে আসার আগমন।তিথি হাতে ওষুধ আর পানি নিয়ে খাওয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে তূর্যকে।তূর্য খেতে চাচ্ছে না।তবুও তিথি জোর করেই যাচ্ছে।কিচ্ছুক্ষণ পর ইরার চোখ যায় তূর্যের হাতে সাদা ব্যান্ডেজের উপর যেখানে কেউ সাইনপেন দিয়ে লিখে রেখেছিলো “আই লাভ ইউ…..বাকিটা ইরা দেখতে পারলো না।ইরা দেখছে, তিথি তূর্যের সেই ব্যান্ডেজে লিখাটা দেখে হাসসে আরও।আর সহ্য করতে পারছে না ইরা তাই কিছু না বলেই চলে যায় নিজের বাসায়।বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক কিছু ভেবে ফেলল ইতিমধ্যে। হয়তো তিথিকেই ভালোবাসে তূর্য তাই ওদের মাঝে সে আর বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না।ফোনে রিং বেজে উঠতেই ইরার ভাবনার ছেদ ঘটলো।স্কিনে আমিরের নাম্বারটি ভেসে উঠতেই ইরার কলটি রিসিভ করে বলে,

—-হ্যালো।
—-হেই ইরা কেমন আছো?এখন কেমন শরীরের অবস্থা? আর তোমার কন্ঠ এমন ভার ভার লাগছে কেন?কি হয়েছে বলবে?টেনশন হচ্ছে।
—-আরে না কিছুই হয়নি।ঘুমিয়েছি তো অনেক্ষন তাই হয়তো এমন ভার লাগছে কন্ঠস্বরটা।আমার শরীর এখন ঠিক আছে।টেনশন করার কিছুই নেই।
—-বাট কিছু তো একটা হয়েছে মনে হচ্ছে।আচ্ছা কাল আমার সাথে দেখে করতে পারবে যদি তোমার শরীরটা ভালো লাগে।
ইরা কিচ্ছুক্ষণ ভাবলো।দেখা করবে কিনা?কিছুক্ষণ ভেবেই বলে,— আচ্ছা অকে আসবো।
আমির খুশিই হয়ে গেলো শুনে যেনো,
—-অকে।তাহলে ভার্সিটির পাশে যে কেফে টা আছে ওইটাতে এসো।

🍁

ইরার মন কালকে থেকেই কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে আছে।আমিরকে যেহেতু কথা দিয়েই দিয়েছে তাই যেতেই হবে তাকে।আমির বসে আছে কেফেতে ইরার অপেক্ষায়।ইরা কিচ্ছুক্ষন পর ঢুকলো।আমির আর ইরা কথা বলছে।ইরাকে কিছু বলার ট্রাই করতে চাচ্ছে আমির বাট কেনো যেনো পারছে না।লজ্জা পাচ্ছে।আমির নিজেও বুঝতে পারছে না সে ইরাকে ” আই লাভ ইউ” বলতে এত গাবড়াচ্ছে কেন? হঠাৎ ইরা ফিল করতে পারলো কোনো রক্তিম চোখ ওর দিকেই যেনো তাকিয়ে আছে।যেনো এখনি গিলে খেয়ে ফেলবে।তাই পাশে তাকাতেই দেখলো তূর্য দাঁড়িয়ে আছে তাও রেগে।চোখে আগুনের লার্ভা স্পষ্ট।ইরা তূর্যের চোখে তাকিয়েই কিছুটা ভয় পেয়ে যায়।”এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন আমার দিকে?আর সবচেয়ে বড় কথা উনি এখানে কিভাবে করে এলেন?উনাকে না ডক্টর বেড রেস্টে থাকতে বলে দিয়েছিলো?”এরকম হাজারো প্রশ্ন ইরার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

__________________

চলবে🌿

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here