ভালোবাসি তাই ২ পর্ব -২৫

#ভালোবাসি তাই ২
#পর্বঃ২৫
#তানিশা সুলতানা

কেটে গেছে বারো দিন। টেনেটুনে যাচ্ছে দিনকাল। স্মৃতি বাড়ি ফিরে এসেছে। আট তারিখ বিয়ে স্মৃতির। আবিরের মা বাবাও মেনে নিয়েছে। শুধু মানতে পারছে না মোহনা। কিন্তু কিছুই করার নেই। কারণ আবির বলে দিয়েছে স্মৃতির সাথে বিয়ে না হলে আবির সুইসাইড করবে। তাই বাধ্য হয়েই মেনে নিয়েছে সবাই। অভিকে খবরটা দিয়েছে রাফিদ।
মনে মনে খুব খুশি হয়েছে অভি। এতোদিন বোনটার মুখে হাসি ফুটবে।
মন দিয়ে পড়ালেখা করছে তানহা। প্রাইভেট, পড়াশোনা, পরিহ্মার প্রস্তুতি সব কিছু মিলিয়ে অভির কথা খুব ভাবে না তানহা। ভাবার তো কিছু নেই। অভি তো এখন শুধুমাত্র তানহা। অভিকে হারানোর ভয়টা আর নেই। কিন্তু এক্সামের ভালো রেজাল্ট তো করতেই হবে। না হলে তো সারাজীবনের জন্য অভির সাথে থাকতে পারবে না।

এদিকে অভির জীবনটা কাটছে খুব কষ্টে। সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও মনটা পরে থাকে তানহা নামের রমনীটার কাছে। কিন্তু সে তো সেই খবর রাখছে না। তানহা চলে গেছে আজ বারো দিন। এই বারোদিনে তানহার সাথে একটুও কথায় হয় নি। অসংখ্য বার কল করেছে তানহাকে কিন্তু নো রেসপন্স।
ভীষণ খারাপ লাগছে অভির। মেয়েটা এতো অবুঝ কেনো? কেনো বুঝতে পারছে না ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য একটা ছেলে কতোটা ছটফট করছে?
আচ্ছা এটা কি ভালোবাসা? তানহাও কি আগে এমনই ছটফট করতো? তাই নিশ্চয় অভির এতো অবহেলার পরেও ওর আশেপাশে পরে থাকতো।
মেয়েটা কি রিভেঞ্জ নিচ্ছে?
এক বার হাতের কাছে পাই কান টেনে ছিঁড়ে দেবো। খুব বড় হয়ে গেছে নাহহহ?
আর তো মাএ কিছুসময়। সুধে আসলে হিসেব নেবে এই বারো দিনের।
রাতের বসে থালা একটু জোরেই রাখে অভি৷ কাচের থালা হলে ভেঙে যেতো। প্লাস্টিকের থালা বলে ভাঙলো না৷ তবে অনেকটা শব্দ হয়েছে।
অভি চমকে উঠেছিলো।

প্রাইভেট শেষে কলেজের পাশে কড়ই গাছের নিচে বসে পেয়ারা মাখা খাচ্ছে তানহা। কাসন্দি লংকা গুড়ো আর বিট লবন দিয়ে মাখা পেয়ারা খেতে বরাবরই তানহা ভীষণ ভালোবাসে। আজকে কলেজের পাশে দেখে খাওয়ার লোভ সামলাতে পারলো না। তাই তো ভর দুপুরে একা একা খাচ্ছে। তবে এখন তানহা অভিকে ভীষণ মিস করছে। পাশে অভি থাকলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতো।
“যে নিরামিষ। উনি না থাকাতেই ভালো হয়েছে। নাহলে বলতো এসব মানুষ খায়? অথচ করলা মাখা হলে হামলে পরে খেতো। রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকাতো না। ভালোবেসে খাইয়েও দিতো না। থাক দুরে তাতেই ভালো।
মুখ বাঁকায় তানহা।
তবে হ্যাঁ এক বার কাছে আসুক তারপর কড়াই কড়াই হিসেব নেবো দুরে দুরে থাকার৷ বলে দিলাম।

বিয়ের আর খুব বেশি দিন দেরি নেই। আবার পরিহ্মারও খুব বেশি দেরি নেই। তানহা বই পএ গুছিয়ে নিয়েছে। বিয়েতে মজাও করবে আর পড়বেও। এটা নিয়ে অবশ্যই তানহার বাবা মাও খুব বেশি আপত্তি করে নি। কারণ ওদের বাড়ি থেকেই কলজেটা বেশি কাছে।

আবিরের সাথেই যে স্মৃতির বিয়ে ঠিক হয়েছে এটা জেনে তমা বেগমের কিছুটা খারাপ লাগছে। কেনোনা কতো কিছুই না বলেছে মেয়েটাকে ওই ছেলের। এমন একটা ছেলের সাথে স্মৃতির মতো এতো ভালো একটা মেয়ের বিয়ে কেনো দিচ্ছে বুঝতে পারছে না তমা বেগম।
রাব্বি এসে নিয়ে যায় তানহা আর তাজকে।

এখন রাত নয়টা বাজে। স্মৃতি কেমন চুপচাপ হয়ে আছে। স্মৃতির পায়ের ব্যান্ডেস খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও ভালো করে হাঁটতে পারে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। বেশিখন হাঁটতে পারে না।
রাতের খাবার খেয়ে বই পড়ছে তানহা। বাইরে ভীষণ চেচামেচি হচ্ছে। আপাতত সেদিকে খেয়াল করছে না তানহা। কাল থেকে ডেকোরেশনের লোকজন চলে আসবে। পৌরসুদিন গায়ে হলুদ। কাল থেকে তো আর খুব বেশি পড়া হবে না।

রাত এগারোটা বেজে গেলো এখনো হালিজা স্মৃতি কেউ রুমে আসছে না। এতখন তানহা ভেবেছিলো পড়ছি তাই আসছে না। কিন্তু এতোখনেও আসছে না দেখে বেশ অবাক হয়েছে তানহা।
বই বন্ধ করে বিছানা ঠিকঠাক করে রুম থেকে বেরতে নেয় ওদের ডাকার উদ্দেশ্য। কিন্তু হঠাৎ কেউ রুমের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। বেশ ঘাবড়ে যায় তানহা। পুরো রুমটা অন্ধকার হয়ে আছে। বেলকনির দরজা দিয়ে চাঁদের আলোতে কিছুটা আলোকিত। কিন্তু সেই আলোতে কারো মুখ দেখার উপায় নেই। শুধু ছায়াটাই দেখা যাচ্ছে।
আর ছায়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো একটা ছেলে এসেছে৷ কিন্তু এই বাড়িতে তো এমন কোনো ছেলে নেই যে এভাবে তানহার রুমে ঢুকবে।
তাহলে কি চোর টোর এসেছে।
ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তানহার। ঢোক চিপে গলা ভেজানোর চেষ্টা করছে তানহা।
প্রচন্ড ভায়ে গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না৷ লোকটা এতোখন দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু এখন এক পা এক পা করে এগোচ্ছে তানহার দিকে।
তানহা জমে শক্ত হয়ে গেছে। সরে দাঁড়ানোর শক্তিটাও নেই নিজের মধ্যে।
“এখন কে বাঁচাবে তানহাকে?

🥀🥀🥀
বাড়ি ফেরার পর থেকে আবিরের সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে৷ কথা হয় না। আবিরও আগের মতো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে না। ভীষণ মিস করছে স্মৃতি আবিরকে। কিন্তু সেই মানুষটাকে আদোও বুঝতে পারে স্মৃতিকে?
মাঝ রাতেই ঘুম ভেঙে গিয়েছে স্মৃতির। তানহা সাথে থাকলে গল্প করতে পারতো। কিন্তু রাফিদ বললো তানহার না কি পড়াশোনায় হ্মতি হবে।
ভীষণ একা লাগছে স্মৃতির। অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় ভুগছে। বেহায়া মনটা বারবার বলছে আবিরকে কল করতে৷ কিন্তু বিবেক বাঁধা দিচ্ছে।
মাথায় হাত চেপে বসে পরে স্মৃতি। আবাধ্য চুল গুলো ক্লিপ দিয়ে আটকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেলকনিতে চলে যায়। আকাশে আজ থালার মতো চাঁদ উঠেছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই স্মৃতি আবিষ্কার করে ফেলে চাঁদের ভেতরে পাহাড় আছে বা সাদা একটা বুড়ি ছোট একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে চাঁদের মধ্যে বসে আছে। বাচ্চাটাও সাদা।
কপাল কুচকে ফেলে স্মৃতি। এসব কিসব ভাবনা? তবে হ্যাঁ চাঁদের গায়ে দাগ থাকলেও চাঁদের সৌন্দর্য কখনোই কমাতে পারে নি। বরং দাগের জন্যই চাঁদটা আরও বেশি সুন্দর।

ফোনের টুংটাং শব্দে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় স্মৃতি। খুব পরিচিত একটা নামটা ভেসে ওঠে ফোনের স্কিনে। মনে মনে ভীষণ খুশি হলেও খুশি টাকে প্রকাশ করে না স্মৃতি। গম্ভীর হয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করে। কোনো কথা বলে না।
ওপাশের মানুষটা নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না স্মৃতি। তবে এই নিশ্বাসের শব্দটাই খুব ভালো লাগছে।
“এতো রাতে বেলকনিতে কেনো? আর গায়ে চাদর দাও নি কেনো?
গম্ভীর গলায় এরকম কথা শুনে বেশ খানিকটা চমকে ওঠে স্মৃতি। লোকটা জানলো কিরে স্মৃতি এখন বেলকনিতে আছে।
কিন্তু প্রশ্নটা করে না স্মৃতি। কেনো জানি কথা বলতে ভালো লাগছে না।
” ভাবছো আমি কি করে জানলাম?
এক ঝলক হাসির শব্দ আসে স্মৃতির কানে।
“সামনের বেলকনিতে তাকাও
স্মৃতি আবিরের কথা অনুসরণ করে তাকায়। তাকাতেই চমকে ওঠে। কেনোনা আবির চেয়ারায় আয়েশ করে বসে বেলকনির রেলিং এর ওপর পা তুলে কফি খাচ্ছে।
কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে স্মৃতি।
” নতুন উঠেছি এই বাসায়। এখন থেকে এখানেই থাকবো। সকাল বিকাল দুপুর তোমাকেই দেখবো। কি দারুণ হবে ব্যাপারটা বলো?
বুকে হাত গুঁজে হাসি মুখে বলে আবির।
স্মৃতি ফোনটা কেটে দেয়। মুখ বাঁকিয়ে রুমে চলে আসে। আর বেলকনির দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
“যতই লুকাও না কেনো? আমি বুঝে গেছি তুমি আমায় কতোটা মিস করছিলে😘

🥀🥀🥀
অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে দুই বার কাশি দিয়ে গলা ঠিক করে তানহা চেঁচানোর প্রস্তুতি নেয়। কানে দুই হাত গুঁজে যেই না চেঁচিয়ে উঠবে তখনই এক জোরা শক্ত হাত তানহার মুখ চেপে ধরে।
অন্ধকারের লোকটার চোখের দিকে তাকায় তানহা। কুচকুচে কালো মনি দুটো দেখে থমকে যায়। এই ছোঁয়া এই চোখ খুব চেনা তানহার৷ কিন্তু সে এখানে আসবে কি করে?
চোরের মধ্যেও কি নিজের প্রিয় মানুষটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তানহা।
নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত তানহা। কপাল কুচকে লোকটার হাত ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পরে তানহা। কিন্তু কিছুতেই পারছে না।
” এতো ছটফট করলে একদম ছাঁদে নিয়ে ফেলে দেবো।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
এবার তানহা ছটফট করা বন্ধ করে দেয়। বেশ বুঝতে পারছে লোকটা কোনো চোরটর না। তানহার অতি প্রিয় করলার জুস।
কিন্তু এখন তো তাকে চিনলে চলবে না। শাস্তি তো দিতেই হবে। আমাকে কাঁদানো না? এবার মজা বুঝবেন।
তানহা মনে মনে বলে।
দুইজনই দুজনের জন্য শাস্তি প্রস্তুত করছে।
অভির হাতটা আলগা হতেই তানহার চোর বলে চেঁচিয়ে ওঠে। অভি চেয়েও থামাতে পারে।
“এবার আর একটা মারও মাটিতে পরবে না।

তানহার চিৎকারে যে যা হাতের কাছে পেয়েছে তাই নিয়েই তানহার রুমের দিকে ছুঁটে আসছে।

চলবে
রেসপন্স আর রিভিউ এর ওপর ভিত্তি করে বোনাস পর্ব দেবো😊😊

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here