ভালোবাসি প্রিয় পর্ব ৫৩

#ভালোবাসি_প্রিয়
#বোনাস_পার্ট
#সুলতানা_সিমা

অভিমান হচ্ছে খুব খারাপ একটা জিনিস। না স্বাভাবিক হতে দেয় না কঠিন হয়ে থাকতে দেয়। হাজারো অভিযোগ মনের মধ্যে চেপে রেখে ধুকে ধুকে মেরে ফেলে। অভিমানের সবথেকে খারাপ দিক হলো চুপ থাকা। আমরা যখন কারো উপর রেগে যাই, তখন রাগটা খুব সহজেই ঝেড়ে ফেলতে পারি। গালি দিয়ে হোক চিল্লাচিল্লি করে হোক ভাংচুর করে হোক অথবা মারামারি করে হোক। রাগ ঝেড়ে ফেলাটা খুব সহজ। কিন্তু অভিমান? অভিমান এমন একটা বিষাক্ত কাটা যেটা গলায় আটকে থাকে। গলা থেকে কলিজা পর্যন্ত। কলিজা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় কিন্তু গলা দিয়ে তাঁর আর্তনাদ বের হয় না। ভিতরে ভিতরে শেষ করে দেয় নিজেকে। খুঁড়ে খুঁড়ে খায় কলিজাটা। কিন্তু প্রকাশ পায় না কিছুই। মন বলে পোড়ে যাই তবুও কোনো অভিযোগ করবো না আমি চুপ থাকবো। চুপ থাকেও সে।

ছাদের রেলিং ধরে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে অরিন। অভিমানের পাহাড়কে বার বার প্রশ্ন করে যাচ্ছে “তুমি এতো শক্ত কেন? কেন তোয়ায় ভাংতে পারিনা আমি? কেন পারিনা তোমার সাথে লড়ে জিততে? কেন বার বার তোমার জিত হয়।”

আজ লুপার বিয়ে। সবাই কত আনন্দ করছে সবাই। চারদিকে হৈ চৈ উল্লাস, কিন্তু অরিনের মনে কোনো আনন্দ নেই। ভিতরটা পোড়ে যাচ্ছে তাঁর। মন বলে একবার লুপাকে জড়িয়ে ধরে ইচ্ছে মতো পিঠিয়ে বলতে” শয়তান তুই কেন আমার সাথে বেইমানি করেছিলি।” কিন্তু পরক্ষণে মনে হয়, না! লুপা আমার কেউ না, কেন আমি অভিযোগ করবো তাঁর কাছে?

অরিন।” চির চেনা কন্ঠস্বর কানে আসতেই তৎক্ষণাৎ পিছন ঘুরে তাকাল অরিন। লাল রংয়ের একটা লেহেঙ্গা পরে আছে লুপা। কোনো সাঁজগোঁজ নেই। ওড়নাটা একপাশে রেখে আছে। কোঁকড়ানো চুল গুলা খুলা। অতিরিক্ত কান্না করার ফলে চোখ ফুলে আছে। চোখগুলা রক্তলাল। গাল বেয়ে তাঁর চোখের পানি পড়ছে। মূর্তির মতো চেয়ে আছে অরিনের দিকে। অরিন চোখ ফিরিয়ে নিলো। লুপা চট করে বসে অরিনের পা জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। অরিন পা ছাড়াতে চেষ্টা করে কিন্তু লুপা ছাড়েনা। “আমাকে ক্ষমা করে দে অরিন প্লিজ। আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবো নারে যদি তুই আমাকে ক্ষমা না করিস। তোর দুটি পায়ে ধরি প্লিজ ক্ষমা করে দে। তোর সাথে অন্যায় করেছি আমি। যা শাস্তি দিতে হয় দে আমি মাথা পেতে নিবো, তবুও ক্ষমা করে দে প্লিজ।” কাঁদতে কাঁদতে লুপার হেঁচকি ওঠে গেছে। অরিনের কান্না থামাতেই পারছে না। কোনো রকম লুপার থেকে পা ছাড়িয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়।

লুপা বসে বসে কান্না করে যাচ্ছে। অরিন ছাদ থেকে চলে যেতে লাগলে, লুপা আবার পা আঁকড়ে ধরে। লুপা কাঁদতে কাঁদতে বলে “বন্ধুত্বের দাবীতে ক্ষমা চাইনা অরিন। বন্ধু নামের কলঙ্ক আমি। শুধু একজন অপরাধী হিসাবে ক্ষমা চাইছি প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দে। প্লিজ অরিন।” লুপার থেকে পা ছাড়িয়ে নেয় অরিন। কথা বলতে চাচ্ছে সে,কিন্তু পারছে না। অদৃশ্য একটা হাত তাঁর গলা টিপে ধরে আছে। কান্না আটকাতে চেষ্টা করেও পারছেনা আটকাতে। চোখের পানি মুছে লুপা কান্নাজড়িত গলায় বলল”

আমি ক্ষমা যোগ্য নই অরিন৷ ক্ষমা না করাটাই স্বাভাবিক। তোকে টর্চার করা,তোর উপর এট্যাক করা। কী না করেছি বল? সব করেছি আমি। আমি শুধু অপরাধী নয় রে। আমি পাপী। নিকৃষ্ট একটা মানুষ। জানিস আমার বোকা মা টাও মাঝে মাঝে আমায় কুকুরের সাথে তুলনা করে। আমার থেকে নাকি কেউ কোনোদিন ভালো শিক্ষা পাবেনা। সত্যিই তো বলে, আমি আবার কাকে কী শিক্ষা দেবো রে। আমি যে নিজেই খারাপ। জানিস অরিন, যখন এটা জানতে পারলাম তুই আর ভাইয়া একজন আরেকজনকে ভালোবেসে ফেলছিস,তখন আমি আর মুখোশধারী হয়ে তোর সামনে আসলাম না। আমি চাইলাম তুই থাক ভাইয়ার কাছে। ভাইয়ার সাথে সুখী হ এটার জন্য খোদার কাছে প্রার্থনা করতাম। আমি ধুকে ধুকে মরতাম তোর সাথে হওয়া অন্যায়ের জন্য। আমি শান্তি পেতাম না। নীলকে কতবার বলতে চাইলাম কিন্তু নীল শুনলো না। আমার কথা এড়িয়ে যেতো। কাউকে বলতে পারতাম না মনের কথাগুলা। জানিস অরিন,মনের চাপা কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা থেকে কঠিন যন্ত্রণা দ্বিতীয় নেই। তোর সামনে যেতে লজ্জা করতো। ঘরের এতো অশান্তি ভালো লাগতো না। দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইলাম,কিন্তু আব্বু দেয়নি। জানিস, ওইদিন তোকে এটা বলতে ডেকেছিলাম, যে তুই মুক্তি আজ থেকে। তোর শেষদিন মানে এটা বুঝিয়েছিলাম, যে তোকে আর ব্ল্যাকমেইল করবো না। ”

এইটুকু বলে চোখের পানি মুছে লুপা। তারপর ছোট এক টুকরো কাপড়ে মোড়ানো কী একটা বের করলো। অরিনের দিকে বারিয়ে দিয়ে বলল”তোর ভালোবাসা অরিন। গত ছ’বছর ধরে আগলে রেখেছি।” লুপার কথায় কোনো ভাবান্তর ঘটেনা অরিনের। সে আগের মতোই আছে। লুপা অরিনের হাত ধরে হাতে এটা দিলো। অরিন হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়। লুপা আরো আঁকড়ে ধরে। লুপার চোখ তাঁর কোনো বাধা মানছে না। মুছার সাথে সাথে আবার ভিজে যাচ্ছে।

চোখের পানিটা মুছে একটা ঢোক গিলে লুপা বলল,” বন্ধুর যোগ্য নই আমি। বন্ধু বলে নিজেকে কখনো পরিচয় দিবোনা। দিহান ভাইয়ের একজন চাচাতো বোন হিসাবে অনুরোধ করছি,আমার বিয়ের সাঁজ টা সাজিয়ে দিবি? সরি আমার তো তুই বলারও অধিকার নাই রে৷ সাজিয়ে দেওয়া যাবে আমায়? রিকুয়েষ্ট করছি আমি প্লিজ।”

অরিন কিছু বলতে পারছে না। কান্নাটাও যেন আজ না থামার প্রতিক্ষা করেছে। অরিনের হাতে একটা চুমু খেলো লুপা। লুপার চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে এসে অরিনের হাতে পড়লো। অরিনের কান্নাটা আরো বেড়ে গেলো তাঁরও ইচ্ছে লুপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে, কিন্তু পারছে না। নিষ্ঠুর অভিমানের কঠিন পাহাড় তাকে বাধা দিচ্ছে। লুপা বলল,”আমি অপেক্ষায় থাকবো। অন্যকারো হাতে সাজবো না আমি।”

চোখের পানি মুছতে মুছতে লুপা চলে গেলো। লুপা যেতেই অরিন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। লুপা যেটা হাতে দিয়ে গেছিলো ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ছুঁড়ে ফেলতেই কাপড়ের পেচ থেকে বেরিয়ে এলো একজোড়া দুল। দুইটা দুইদিকে ছিটকে পড়েছে৷ অরিন দৌঁড়ে গিয়ে দুলজোড়া হাতে নেয়। এগুলা তো তাঁর মায়ের দুল বিক্রি করে দিয়েছিলো সে। তাহলে কী লুপা এগুলা আবার কিনে আনছে?

দুলজোড়া হাতে নিয়ে খুশিতে কেঁদে দেয় অরিন। বেদনাশ্রুর সাথে আনন্দশ্রু মিশে যায়। দুলজোড়ায় অনেকগুলা চুমু খায় অরিন। মায়ের একটা স্মৃতিও ধরে রাখতে পারিনি বলে কতো কাঁদতো সে। এতো এতো টাকা পয়সা কামাই করেও সে গরিব ছিলো শুধুমাত্র মায়ের এই দুলজোড়া নেই বলে। টাকা দেখলেই কান্না আসে তাঁর। ভাবে এইটাকার জন্যই সে দুলজোড়া বিক্রি করে দিয়েছিলো আজ এত টাকার মালিক সে কিন্তু মায়ের দুল আর নাই।

চোখের পানি মুছে দৌঁড়ে নিচে যায় অরিন। এভাবে দৌঁড়াতে দেখে দিহান বলে “আরে আরে এভাবে দৌঁড়াচ্ছো কেন? পড়ে টড়ে হাত পায়ে ব্যথা পাবা তো।” অরিন শুনেনি দৌঁড়ে গিয়ে কনেদের রুমে ঢুকে। দিহান আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকে। রুমে ঢুকে অরিন লুপাকে পায়না। দিশাকে বিউটিশিয়ানরা সাজাচ্ছিলো। অরিন বারান্দায় যায়। লুপা বারান্দায় ছিলো। কান্নাজড়িত গলায় ডাক দেয়।

“লুপা।” অরিনের ডাকে লুপা পিছনে থাকায়। অরিনকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠে সে। অরিনও কান্না করছে। অরিন লুপাকে একটা থাপ্পড় দেয়। গালে হাত দিয়ে কেঁদে কেঁদে লুপা তাকায় অরিনের দিকে। অরিন আবার অন্যগালে থাপ্পড় দেয়। লুপা কাঁদছে অরিনও কাঁদছে। আবার আরেকটা থাপ্পড় দেয় অরিন। দিয়েই লুপাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে বসে। লুপা কাঁদতে কাঁদতে বলে “আমায় মেরে দে অরিন প্লিজ। আমায় মুক্তি দে এমন জীবন থেকে।

কান্না শুনে দিশা আর শামু দৌঁড়ে আসে বারান্দায়। দুই বন্ধুর মিল দেখে খুশিতে তাঁরাও কেঁদে দেয়। দিশার মনে পড়ে গেলো ইশির কথা। সে চলে আসলো রুমে। আজ ইশি থাকলে কতো মজা হতো। বুকে জড়িয়ে হয়তো সেও কাঁদতো। তবে ইশির কান্নাটা হতো দিশার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এই কষ্টে। চোখের পানি মুছে দিশা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো।

অরিন দুলজোড়া বের করে লুপাকে বলল,”এগুলা কই পেলি তুই।” লুপা কিঞ্চিৎ হেসে বলল,”যার কাছে বিক্রি করেছিলি তাঁর কাছ থেকে কিনেছি।” অরিন লুপাকে জড়িয়ে ধরে বলল” থেনক্স। এটা আমার জীবনের কতো মূল্যবান তা বলে বুঝাতে পারবো না। এত টাকা এত কিছু আমার হওয়ার পরেও আমি শূন্য ছিলাম, কারণ আমার কাছে আমার মায়ের কিছুই ছিলোনা। আজ নিজেকে পরিপূর্ণ লাগছে আজ আমি সত্যিই পরিপূর্ণ। কারণ আজ আমার মায়ের স্মৃতি ফিরে পেয়েছি। এটা শুধো আমার মায়ের স্মৃতি নয় এটা আমার বাবারও স্মৃতি। কারণ এটা আমার বাবা আমার মাকে দিয়েছিলো।

_______________________

রুহান দিয়ার উপর প্রচন্ডরকম রেগে আছে। দিয়া একটা শাড়ি পড়েছে খুব পাতলা। কালো শাড়ির নিচে তাঁর ফর্সা পেট আগলে আছে। রুহানের ইচ্ছে করছে দিয়াকে মাথার উপর তুলে আছাড় মারতে। রুহান ভাবলো দিহানকে বলে গিয়ে দিহানকে দিয়ে দিয়াকে বকা শুনাতে। দিহানের খোঁজে যাচ্ছিলো তখন দেখলো দিয়ার দিকে একটা ছেলে কীভাবে যেন তাকিয়ে আছে। রুহান তো এবার মাথা আরো বিগড়ে যায়।

রুহান দিয়াকে ডাক দেয়। দিয়া শুনেনা। দিয়া কয়েকটা মেয়ের সাথে গল্প করছে। দিয়ার পাশে গিয়ে বলে,”দিয়া তোকে বড় ভাইয়া ডাকছে। আমার সাথে আয়।” দিয়া রুহানের পিছে পিছে যায়। দিয়া এখনো বুঝেনি রুহান তাঁকে এমনি বলছে জিহান ডাকছে। একটা রুমের সামনে এসে রুহান থামে। দিয়া চারদিকে তাকিয়ে বলে,”কই বড় ভাইয়া? এখানে তো কেউ-ই নেই।
_আছে ভিতরে যা।” দিয়া ভেতরে যায়। সাথে সাথে রুহান রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। দিয়া কপাল কুঁচকে তাকাল।
_দরজা বন্ধ করলি কেন?
_কারণ তোকে আদর করবো তাই।
_তুই থাক তোর আদর নিয়ে। আমি যাচ্ছি। “দিয়া যেতে চাইলে রিহান হেচকা টানে দিয়াকে তাঁর দিকে ঘুরিয়ে আনে। দিয়া নিজেকে ছাড়াতে চাইলে রুহান ছাড়েনা। দিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। প্রথম দিকে দিয়া ছটফট করলেও পরে তাঁর ছটফটানি বন্ধ হয়ে যায়। রুহানের সাথে যখন দিয়াও ডুব দেয় গভীরে, তখন রুহান দিয়ার শাড়ীর আঁচল টান দিয়ে ফেলে দেয়। দিয়ার হুস নেই। রুহান দিয়ার কোমর থেকে শাড়ী খুলে পুরো শাড়ীটা খুলে হাতে নিয়ে নেয়। তারপর দিয়াকে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দেয়। ধাক্কা খেয়ে দিয়ার হুস আসে। তাকিয়ে গায়ে শাড়ী না দেখে হাত দিয়ে বুক ঢাকে। রুহান বলে “তুই থাক আমি যাচ্ছি আমার কাজ আছে।” দিয়া চেঁচিয়ে বলে”তুই আমার শাড়ী নিয়ে যাচ্ছিস কেন আমার শাড়ী দে।
_শাড়ী পড়বি কেন? শাড়ী পড়লে তোর শরীরের সুন্দর সুন্দর কার্ভ গুলা ছেলেরা দেখবে কেমনে? যা এভাবেই যা গিয়ে দেখা,তুই কতটা সেক্সি।
_ছিঃ রুহান। তোর মুখের ভাষা এতো খারাপ? দে, আমার শাড়ী দে।” রুহান কিছু না বলে চলে গেলো। দিয়া দরজা খুলতে চাইলে দেখে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। রাগে দিয়ার মাথা ফেটে যাচ্ছে। অনেক্ষণপরে একটা মেয়ে একটা ব্যাগ এনে দিয়ে গেলো। মেয়েটা যাওয়ার পরে দিয়া ব্যাগের ভিতরে থাকিয়ে দেখলো কাপড় দেখা যাচ্ছে। খুশিতে তাঁর মন নেচে উঠে। ব্যাগের ভেতর থেকে কাপড় হাতে নিয়েই সে চোখ কপালে তুলে ফেললো। একটা সুতির সেলোয়ার কামিজ। ব্যাগের ভেতর একটা চিরকুট আছে। দিয়া সেটা বের করে পড়লো। “এইটা পড়ে বের হ। আর কোনো ছেলের সামনে যেন না দেখি। যদি ভুল করেও কারো কথায় ড্রেস চেঞ্জ করবি। তাহলে তোর খবর আছে।” লেখাটা পড়ে রাগে দিয়া কাগজ মুড়িয়ে ছুঁড়ে ফেলে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে “আমার একমাত্র বোনের বিয়েতে আমি এমন সেলোয়ার কামিজ পড়বো? লাইক সিরিয়াসলি?”
#ভালোবাসি_প্রিয়
#পর্ব_৫৩
#সুলতানা_সিমা

রুমের ভেতর থেকে রাগে অনেক চিল্লাচিল্লি করলো দিয়া। কিন্তু বাহিরে অনেক জোরে মিউজিক চলায় তাঁর এমন গলা ফাটানো চিল্লানি কারো কান পর্যন্ত গেলো না। অসয্য হয়ে ড্রেসটা পরে বের হলো সে। কতো বড় একটা আয়োজনে তাঁর মতো একটা ফক্কিনিকে তাঁর কাছে রানু মন্ডলের মতো লাগছে। ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো মুখ বানিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। দিহান তাঁকে ডাক দেয়।” দিয়া।” ভাইয়ের ডাকে দাঁড়ায় দিয়া। দিহান ভ্রুযোগল কুঁচকে তাকাল। তারপর বলল”

তুই একাই কয় হাজার টাকার শপিং করছিলি মনে আছে?” দিয়া কিছু বলল না। দিহান ধমক দিয়ে বলে “কী পরছিস এটা? দেখতে একদম পেত্নীদের মতো লাগতাছে। যা চেঞ্জ কর গিয়ে।” দিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। লারা এসে বলল” আরে দিয়া এটা কী পরছো তুমি? তোমার বোনের বিয়েতে তুমি এইটা কী পড়ছো? সার্ভেন্টরাও ভালো জামা পরেছে। আর তুমি কিনা এইটা পরেছো?” দিয়া ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। আচমকা এভাবে কেঁদে উঠায় কিছুটা ঘাবড়ে যায় দিহান। রুহান দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে।

দিয়ার কান্না দেখে তাঁর পরিবারের সবাই এদিকে আসলো। সবাই দিয়াকে জিজ্ঞেস করছে কান্না করছে কেন, কিন্তু দিয়া বলছেনা। সে কেঁদেই যাচ্ছে। অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কান্না দেখছে। একজন মহিলা বললেন “আহারে বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে দেখে ছোট বোন কীভাবে কান্না করছে দেখো। এটাকেই বলে বোনের জন্য ভালোবাসা।” দিয়া রাগি লুকে উনার দিকে তাকাল। তারপর আবার ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল।

দিয়াকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়ে গেছে। তাই রুহান আসলো। এসে বলল “কিরে তুই এভাবে কাঁদছিস কেন? যা ভালো দেখে একটা ড্রেস পর গিয়ে।” কথাটা বলেই রুহান চলে গেলো। তৎক্ষণাৎ দিয়া কান্নাটা থামিয়ে দিলো। চোখ মুছে ভেটকাইতে ভেটকাইতে চলে গেলো ড্রেস চেঞ্জ করতে। ব্যাপারটা দিহান স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলো না। এতোক্ষণ ধরে সবাই দিয়াকে জিজ্ঞেস করছে কেনো কাঁদছে, অথচ দিয়া কিছুই বলল না। আর এখন কিনা রুহান এসে বলাতেই সে কান্না থামিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো? আপাতত ব্যাপারটা নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো ভাবলো দিহান। অজনিকে নিয়ে চলে গেলো নিচে। পরে সব জেনে নেওয়া যাবে, এখন এতো গোয়েন্দাগিরি করে লাভ নাই।

লুপা আর দিশাকে এনে স্টেজে বসানো হলো। লাল রংয়ের লেহেঙ্গা পরেছে দুবোন। দেখতে তাদেরকে পরীর মতো লাগছে। লুপাকে নিজ হাতে বউ সাজিয়েছে অরিন। এই রিসোর্ট ভর্তি মানুষদের মধ্যে সব থেকে সুখী মানুষটি হচ্ছে লুপা। আজ সে ভালোবাসা পেয়েছে। বন্ধু পেয়েছে। ক্ষমা পেয়েছে। তাঁর থেকে সুখী আর কে হতে পারে। শাওন আর নীলও সেইম রংয়ের শেরওয়ানি পরেছে। স্টেজে আনা হলো তাদের। নীল লুপার পাশে এসে লুপার ঘা ঘেঁষে দাঁড়ালো। লুপা কিঞ্চিৎ সরতে চায়,নীল পিছনে এক হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে। মাথা কিঞ্চিৎ ঝুকিয়ে বলে,”মাশাআল্লাহ পরীর মতো লাগছে।” লুপা লজ্জার সাথে হাসলো। মৃদু স্বরে বলল “আপনাকেও অনেক সুন্দর লাগছে।” নীল হাসলো। কিছুই বলল না।

দিশা শাওনকে অনেক্ষণ থেকে কনুই দিয়ে গুতা দিয়ে তাঁর দিকে তাকাতে ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু শাওন তাকাচ্ছেনা। অজনি দিহানের সাথে দুষ্টুমি করছে সেগুলা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। অসয্য হয়ে দিশা সোজাসাপ্টা ভাবেই ডাক দিলো “শাওন শুনো।” ডাক শুনে শাওন তাকালো। দিশা জিজ্ঞেস করলো, “আমায় কেমন লাগছে?” শাওন কিছুই বলল না। দিশা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। শাওনের জবাব না পেয়ে দিশা আবার বলল, “কিছু বললে না যে?” শাওন গম্ভীর গলায় বলল”

_ভালো লাগছে।
_শুধুই ভালো?” দিশার এপ্রশ্নের জবাব দিলোনা শাওন। দিশা বলল,”তুমি কি বিয়েতে খুশি নয় শাওন?” দিশার প্রশ্নে এবারও কোনো জবাব নেই শাওনের মুখে। রুহান তার ফ্রেন্ডদের নিয়ে স্টেজে আসলো ছবি তুলতে। শুরু হলো ছবি তুলার পালা। দিশার প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া হলোনা। নীল আর লুপা কত রকমের পোজ নিয়ে ফটো তোলছে। এদিকে শাওন আর দিশা সোজাসাপ্টা দাঁড়িয়ে আছে সেভাবেই ছবি নেওয়া হচ্ছে। একই স্টেজে দুই যুগল কপোত-কপোতীর বিয়ে হচ্ছে। অথচ দিশার কাছে তা বিয়ে বলে মনে হচ্ছে না।

লারার সাথে অরিনের সম্পর্কটা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। দুজনই পরেছে সিলভার কালার শাড়ী। খুলা চুল,হাত ভর্তি চুড়ি,সাজগোজ সবই একই রকম। দুজন নিচে এসে নামতেই দিহানের চোখে পরলো অরিনকে। এতো এতো সুন্দরীর ভীড়ে তার এই শ্যামবতী হচ্ছে সব থেকে বেশি আকর্ষণীয় নারী। দিহান অজনিকে নীলের মায়ের কাছে দিয়ে অরিনের কাছে গেলো। অরিন লারা কয়েকটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। অরিন দিহানকে দেখে বলল,”অজনি কই?
_আছে আন্টির কাছে। একটু আসো তো কিছু কথা ছিলো।” অরিন সবাইকে আসছি বলে দিহানের সাথে গেল।

একটা রুমে ঢুকে দিহান দরজা বন্ধ করে নেয়। অরিন বলে, “কী এমন কথা যেটা দরজা বন্ধ করে বলা লাগবে?” দিহান কিছু না বলে অরিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। অরিন বলল,”পাগল হয়েছেন? ছাড়ুন। কী বলবেন তারাতাড়ি বলেন।” দিহান অরিনের ঘাড়ে নাক ঘষতে ঘষতে বলে,”এতো সেক্সি কেন তুমি?”
_ছিইইইইই। ছাড়ুন আমায়।” দিহান অরিনকে সামনে ঘুরালো তারপর বলল “ছেড়ে তো দিবো, তবে আমার পাওনাটা আদায় করে নেওয়ার পরে।” অরিন কিছু বলতে যায়, তার আগেই দিহান অরিনের ঠোঁট যুগল দখল করে নেয়। ডুবে যায় অরিনের মাঝে। কিছুক্ষণ পরে দিহানের চুল আঁকড়ে ধরে অরিনও ডুব দেয় দিহানের সাথে। অনেক্ষণ পরে দিহান অরিনকে ছাড়ে, কিন্তু তাঁর নেশা এখনো কাটেনি। আবার ঠোঁটের দিকে এগুলে অরিন বাধা দিয়ে বলে,”আমার মনে হয় আমাদের এখন যাওয়া উচিত কেউ আমাদের খুঁজবে।” দিহান শুনলো না অরিনের কথা। অরিনের মাঝে আবারও ডুব দেয়। অরিনকে দিহানকে বলে,”দে দেখুন অজনি কাঁদবে আমাদের কাউকে না দেখলে।” দিহান অরিনের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,”আর পাঁচ মিনিট থাকি। তারপর চলে যাবো। প্রমিজ।

মেরুন কালার একটা গাউন পরে আসলো দিয়া। লম্বা চুলগুলা খুলে কিছুটা সামনে এনে রাখছে। ডার্ক রেড লিপস্টিক সাথে ম্যাচিং একটা নেকলেস পরা। ঘন লম্বা চোখের পাপড়িগুলা তাঁর সৌন্দর্য দুই গুন বাড়িয়ে তুলছে। দিয়া এসে তাঁর বোনের সাথে অনেকগুলা পিক নিলো। কয়েকটা ছেলে চোখ দিয়ে দিয়াকে গিলে খাচ্ছে। দিয়ার সেদিকে খেয়াল নাই সে তাঁর মতো ছবি তোলেই যাচ্ছে। কয়েকটা ছবি তোলার পরে, স্টেজ থেকে এসে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি গুলা দেখতে লাগলো দিয়া। রুহান দিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালো,দিয়া এখনো টের পায়নি। রুহান চারদিকে তাকিয়ে যখন দেখলো কারো চোখ এদিকে নাই। তখন সে দিয়ার হাতে হেঁচকা টান দিয়ে একটু সাইডে নিয়ে আসলো। ভয় পেয়ে দিয়া একটা চিৎকার দেয়, কিন্তু এতো বাজনা হৈ চৈ এর মাঝে কারো কানে গিয়ে পৌঁছায় নি সে চিৎকার। ঘটনাটি সব মানুষের চোখের আড়ালে হলেও কিন্তু দিহানের চোখ এড়ানি। উপর থেকে সে ব্যাপারটা ঠিকই লক্ষ্য করেছে। রুহান যেদিকে গেছে সেদিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো দিহান।

একটা সাইডে এনে রুহান দিয়াকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। দিয়া চেঁচিয়ে বলে উঠে “ওই আমি তো তোর বলার পরে এটা পরছি। তাহলে এখন রাগ ঝাড়ছিস কেন?
_আমি তোকে বলছি তুই ভালো দেখে একটা ড্রেস পরবি। সাথে সাজার কথা কি বলছিলাম তোকে?
_দেখ তুই যদি আমাকে এবার এটা বলিস আমি সব সাজ ধুয়ে দিবো, তাহলে কিন্তু তোর সাথে আমার ব্রেকআপ।
_ব্রেকআপ? আমার সাথে? তাহলে দিচ্ছি তোকে ব্রেকআপ।” কথাটা বলেই রুহান দিয়ার চোখের এক্সট্রা পাপড়িগুলো টেনে খুলে দিলো। দিয়া রাগে গিজগিজ করতে করতে বলল” এটা তুই কী করেছিস? এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস রুহান।” দিয়ার কথায় কিছু বলল না রুহান। পকেট থেকে টিস্যু বের করে দিয়ার লিপস্টিক মুছে নিলো। দিয়ার এবার ইচ্ছে করছে রুহানকে ইচ্ছেমতো কয়েকটা কথা শুনাতে। দিয়ার ওড়নাটা এক সাইডে রাখা ছিলো, এক সাইডে চুল। রুহান চুলগুলা পিছনে দিয়ে ওড়নাটা বুক জুড়ে ছড়িয়ে রাখলো। তারপর বলল “তুই তো এবার ব্রেকআপ করে নিবি। তাহলে নে। আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ রাখবি না।”

বলেই রুহান চলে গেলো। আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছুই দেখলো দিহান। যতটা বুঝার সে বুঝে নিয়েছে। তাহলে অরিনের ওই কথার মাঝে কিছু লুকিয়ে ছিলো? অরিনকে জিজ্ঞেস করতে হবে। অরিনের খুঁজে স্টেজে আসলো দিহান। এসে দেখলো অরিন কয়েকটা মেয়ের সাথে খুব হেসে হেসে কথা বলছে। দিহানের সব খারাপ লাগা দূর হয়ে গেলো। অরিনের হাসিতে অদ্ভুত একটা জাদু আছে, যেটা দিহানের সব খারাপ লাগা, দুশ্চিন্তা সব দূর করে দেয়। রুহান দিয়ার বিষয়টা আবারও দমিয়ে নিলো দিহান। সবকিছু পরে দেখা যাবে ভেবে অরিনকে আর ডাক দিলো না সে।

অজনি স্টেজে দিশার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দিশার কাছ থেকে আনা যাচ্ছে না। সে তাঁর ফুপিনের সামনে থাকবে। দিহানের মা বাবা দূর থেকে অজনিকে চকলেট দেখিয়ে ডাকছেন। ছেলের ভয়ে পাশে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না উনারা। অজনি বার বার মাথা নাড়িয়ে না বলছে। মানে সে যাবেনা। দিহান কয়েকজনের সাথে কথা বলছিলো। হঠাৎ খেয়াল করলো অজনি ডান পাশে তাকিয়ে বার বার না সূচক মাথা নাড়াচ্ছে। দিহান সবাইকে আসছি বলে স্টেজে এসে ডান দিকে তাকাতেই তাঁর বাবা মা দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে গেলেন। লুকিয়েও লাভ হলোনা, উনাদের দিহান দেখে নিয়েছে। অজনিকে কোলে নিয়ে চলে আসলো স্টেজ থেকে। ওর সন্তান এবোরশন করতে চাওয়ার কথাটা মনেই হলেই তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পরে শুরু হলো বিয়ে পড়ানো। সবাই স্টেজ ঘিরে আছে কিন্তু দিয়াকে দেখা যাচ্ছেনা। রুহানের বুকটা ধুক করে উঠল। দিয়ার সাথে কি সত্যিই সে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? রুহান স্টেজ থেকে নেমে দিয়াকে খুঁজতে লাগলো। দিয়াকে কোথাও খুঁজে পেলোনা। যেখানে দিয়াকে নিয়ে গেছিলো একটু আগে সেখানে গেলো রুহান। দিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করছে। যেভাবেই রেখে গিয়েছিলো এখনো ওভাবেই আছে। রুহান দিয়ার চোখের পানিটা মুছে দিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল” সরি দিয়া।” দিয়া রুহানকে ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে চলে যেতে চায়। রুহান দিয়ার দুহাত ধরে আটকায়। তারপর অপরাধী স্বরে বলে” প্লিজ রাগ করিস না। আমি কী করবো বল? তোর দিকে কেউ তাকালে আমার খুব খারাপ লাগে। আমি চাই তোর সবকিছুতে শুধু আমি মুগ্ধ হবো, অন্যকেউ না। এমনটা করার জন্য সরি রে। তোর সবকিছুর উপর শুধু আমার অধিকার রাখতে চাই। প্লিজ রাগ করিস না।”

দিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে রুহানকে জড়িয়ে ধরলো। রুহান যখন বলেছিলো আর আমার সাথে যোগাযোগ রাখবিনা, তখন তাঁর দম আটকে গেছিলো। রুহানকে সে অনেক ভালোবাসে, রুহানকে ছাড়া থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। রুহান দিয়ার চোখের পানিটা মুছে দিয়ে কপালে চুমু এঁকে বলল” কান্না থামা। এখন চল বিয়া পড়ানো হচ্ছে।” রুহানের কথা শেষ হতেই স্টেজ থেকে তালির শব্দ ভেসে এলো। দিয়া রুহানকে বলল”তারমানে বিয়ে পড়ানো শেষ।” রুহান বলল”তাতে কী হয়েছে? অনুষ্ঠান তো আর শেষ হয়নি। চল তারাতাড়ি যাই।” দিয়া আর একমূহুর্ত দেরি করলো না। রুহানের আগে আগে দৌঁড়ে চলে গেলো স্টেজে।

সব নিয়ম কানুন পালন করে বিয়ের পরানো শেষ হলো। নীল লুপার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। লুপা হাত ছাড়াতে চাইলে নীল ছাড়েনা ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। লুপা নীলকে ক্ষীণ স্বরে বলল,”আমার বিরক্ত লাগছে সবকিছু,এরা এতো ছবি তোলছে কেন?” নীল মাথা ঝুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,”তুমি এসবে বিরক্ত হচ্ছো, আমি তো অপেক্ষার প্রহর গুনছি কবে রাত হবে আর কবে বাসর হবে।” লুপা রাগি লুকে তাকালো নীলের দিকে। নীল ঠোঁট কামড়ে দুষ্টুমির সাথে হাসলো। ঠিক তখন এই সুন্দর দৃশ্যটা ফেমে বন্দি করে নিলো রুহান।

দিশা একটা জিনিস খেয়াল করছে শাওন বন্ধুদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু দিশার দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। ছবি নেওয়ার জন্য ফটোগ্রাফার যেভাবে দিশাকে ধরতে বলছে, সে ধরছে। মুখেও হাসি লেগে আছে, কিন্তু দিশার দিকে না একবার নিজে থেকে থাকাচ্ছে। না একবার নিজে থেকে ধরছে। দিশা শাওনের হাত ধরলো। হাতটা ধরতেই শাওন হাত কিঞ্চিৎ ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে নীলের পাশে দাঁড়িয়ে গিয়ে দিহানকে ডেকে এনে ছবি নিতে লাগলো। এমন অবহেলাটা ঠিক হজম করতে পারলো না দিশা। বুক চোখে ফেটে কান্না বেড়িয়ে আসলো।

অবশেষে বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলো। দিহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কান্না পাচ্ছে তাঁর। মনে হচ্ছে যেন শাওন তাঁর বোন নয়, কলিজা ছিঁড়ে নিচ্ছে। লুপা তাঁর পরিবারের সবার থেকে বিদায় নিলো। দিহানকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল দুজনেই। কাঁদতে কাঁদতে লুপা বলে” আমাকে ক্ষমা করে দিও ভাইয়া।” দিহান মাথায় হাত বুলিয়ে বলে “কাঁদিস না। দোয়া করি সুখী হ। আর শুন, কখনো যেন নীল কোনো অভিযোগ নিয়ে আসতে না পারে। এমন ভাবে চলবি, যেন কেউ আমাদের বংশ তুলে কিছু বলতে না পারে।” দিহানের থেকে বিদায় নিয়ে লুপা রুহানকে খুঁজলো। রুহানকে দেখা যাচ্ছেনা।

দিশার কান্না থামানো যাচ্ছে না। বার বার দিহান কই বলছে আর কাঁদছে। দিয়া এসে দিহানকে নিয়ে গেলো। দিহানকে দেখেই দিশা কান্নার বেগ বেড়ে গেলো। দিহানকে জড়িয়ে ধরে দিশা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। ভালোবাসার মানুষের ঘরে যাচ্ছে সে। যাকে নিয়ে এতোদিন স্বপ্ন দেখেছে তাঁর ঘরে যাচ্ছে। তবুও কেন তাঁর এতো কষ্ট হচ্ছে? তবুও কেন মন বলছে যাবেনা সে তাঁর আপন মানুষগুলা ছেড়ে। দুইভাই বোন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে কাঁদছে। আর তাঁদের কান্না দেখে কাঁদছে সবাই। দিহানের কান্না দেখে অরিনের বুক ফেটে যাচ্ছে। তাঁর স্বামীর কান্না সে সয্য কর‍তে পারেনা।

লুপাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সে লারাকে বলল” ভাবী রুহান কই?” লারা ইশারায় সামনের দিকে দেখালো। রুহান দূরে দাঁড়িয়ে লুপার দিকে তাকিয়ে কান্না করছে। লুপা রুহানকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠে। রুহান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। এসে লুপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,”আপ্পি আমি থাকবো কেমনে রে? খুব একা হয়ে যাবো আমি। আমার এখনি দম বন্ধ হয়ে আসছে এটা ভেবে,যে আমি বাসায় গিয়ে তোকে পাবো না।” লুপা কান্নার জন্য কিছুই বলতে পারছে না। রুহান আবার বলল,”আপ্পি তুই আমায় ভুলে যাবি তাইনা?
_আমি দুইদিন পর পর আসবো কাঁদিস না ভাই।
_আপ্পি আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে।”

লারা এসে রুহানের থেকে লুপাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলো। অরিন দিহানের থেকে দিশাকে। দুইভাইয়ের বুক থেকে দুই বোনকে কেড়ে নিয়ে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। রুহান সায়রা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। সুমনা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। অরিন এসে দিহানকে জড়িয়ে ধরে। ছোট অজনিও কী বুঝে যেন হাত পা ছুঁড়ে ফুপিন ফুপিন ডেকে কান্না করে যাচ্ছে।

____________________________________

ফুলে ফুলে সাজানো একটা রুমে বসে আছে লুপা। চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল দেখা যাচ্ছে। সব ফুল হচ্ছে সাদা রংয়ের। লুপা রুমের চারদিকটা হেঁটে হেঁটে দেখছিলো। তখন দরজা খুলে এসে নীল ঢুকলো। দরজাটা বন্ধ করে নীল এসে লুপার সামনে দাঁড়ালো। নীল কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই লুপা বসে নীলকে সালাম করতে লাগলো। নীল লুপাকে ধরে তুলে বলল”মাত্রই বলতে চাইলাম এসব সালাম টালাম করার দরকার নাই।”লুপা কিঞ্চিৎ হাসলো। কিছুই বলল না। নীল বলল”আজকেই প্রথম এবং আজকেই শেষ। আর কখনো এভাবে সালাম করবে না। মুখে সালাম দিবে।” লুপা সম্মতি সূচক মাথা নাড়াল। নীল লুপাকে জড়িয়ে ধরে। চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা দম ছেড়ে বলল,”ন’বছরের অপূর্ণ ভালোবাসা আজ পূর্ণতা পেলো।” লুপা মুখ তুলে বলল,”ন’বছর?” নীল মাথা নেড়ে বলল” হুম নয় বছর। জানো প্রথমে তুমি যখন আমায় অবহেলা করতে খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু তোমার সব অবহেলা গুলাকেও আমি ভালোবাসতাম। কারণ অবহেলাটা ছিলো তোমার দেওয়া।” লুপা কিছু বলল না। স্বামীর বুকে মাথা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেলো। কালো অতীতগুলা তাকে খুব পোড়ায় আবার মাঝে মাঝে হাসায়ও।

কিছুক্ষণ পরে নীল লুপাকে বললো,”এতো ভারি ভারি গয়নাগুলা খুলো। লুপা খুলতে লাগে। নীল লুপার নেকলেস, চুড়ি সব গুলা খুলে দেয়। তারপর লুপার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে পাগলের মতো কিস করতে লাগে। কিছুক্ষণ পরে নীল লুপার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে লুপা বাধা দেয়। নীল কপাল কুঁচকে বলে”কী হলো?” লুপা বলে “নামাজটা পড়ে নিলে ভালো হতো।
_ওকে, চলো। নামাজ শেষে কিন্তু কোনো বাধা মানবো না। আর মনে আছে তো ভোর বেলার কথাটা?” লুপা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। নীল লুপার কপালে চুমু এঁকে বলল”যাও চেঞ্জ করে অজু করে আসো।” লুপা লাগেজ থেকে একটা ড্রেস নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো।

ঘরির কাঁটায় রাত ১২:৩০ বাজে। শাওন এখনো রুমে আসেনি। দিশার খুব কান্না পাচ্ছে। বার বার বার মনে পড়ছে শাওনে বলা সেই কথাটা ” এর শাস্তি তুমি পাবে দিশা। বিয়ে পাঁচ বছর তুমি কোনো বাচ্চা পাবেনা। শুধু বাচ্চা নয়, আমাকেও কাছে পাবেনা।” দিশার কান্না আর আটকে রাখতে পারলো না। শাওন কী তাহলে সত্যি বলেছিলো কথাটা? অপেক্ষা করতে করতে রাত একটায় শাওন রুমে আসলো। শাওন আসতেই দিশা শাওনকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে। শাওনের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দিশা শাওনকে ছেড়ে অভিযোগের গলায় বলে “ইচ্ছে করে এতোক্ষণ আসোনি তাইনা? ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিচ্ছো?” শাওন কিছুই বলল না। খাটে বসে দুহাতে মাথা চেপে ধরলো। নিজেকে স্বাভাবিক কর‍তে শত চেষ্টা করেও নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছে না।

দিশা শাওনের সামনে বসে শাওনকে সালাম করলো। সালাম করে শাওনের পা জড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। শাওনের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। দিশাকে তুলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল” তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমার ঘুমাতে লেট হবে।”

কথাটা বলেই শাওন বারান্দায় চলে গেলো। তাঁর সব রাগ হচ্ছে দিহানের মায়ের উপর। সেদিন যদি তিনি প্রস্তাব মেনে নিতেন তাহলে আজ তাঁর বাচ্চাটা তাঁর কোলেই থাকতো, যেমন দিহানের কোলে অজনি। হ্যাঁ বাচ্চাটা তাঁর অবৈধ মেলামেশার ফসল। কিন্তু তাঁরই তো বাচ্চা। সে পারেনা এটা মেনে নিতে যে তাঁর প্রথম বাচ্চাটা নেই। শাওনের খুব ইচ্ছে করছে দিশার মাকে বলতে,মেয়েকে তো ঠিক বিয়ে দিলেন,তাহলে আগে না বলছিলেন কেন? লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দু’হাতে চুল মুঠো করে ধরলো শাওন। মুখ আকাশের দিকে রেখে চোখ খিঁচে দাঁড়িয়ে থাকল। হঠাৎ রুম থেকে কিছু পরার শব্দ হতেই দৌঁড়ে রুমে আসলো শাওন। রুমে এসে দেখলো,,,,,,,,,,।

চলবে,,,,,।
চলবে,,,,,,,,।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here