মারিয়া,পর্ব:১৫

0
391

“মারিয়া”
পর্ব:- ১৫
কলমে:- সায়ীদা নুহা।
~~~~~~~~~~~~~~~

স্টোররুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পুলিশ ফোর্সের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। ছেলেটা কেমন মূর্তির মতো শক্ত হয়ে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে বসে আছে। তড়িঘড়ি করে তাদের দু’জনকেই উঠানো হয়। মারিয়া ইতোমধ্যে বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে অজ্ঞান। স্ট্রেচারে করে তাকে বাড়ি থেকে বের করা হয়।
বের হওয়ার সময় দারোয়ান আর তার স্ত্রীকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় দেখতে পায় ইয়াসির। মর্গান ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে গাড়িতে উঠানো হয়। ধস্তাধস্তি করেও পার পায় না সে।
চার পাঁচজন পুলিশ অফিসার পুরো বাড়িতে চক্কর কাটছেন। প্রমাণ জড়ো করার উদ্দেশ্যে বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা হন্য হয়ে ঘুরছেন!
দারোয়ান আর তার স্ত্রী নিজেদের চোখেই সামনের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। টাকার মায়া আর নেই তাদের! এই টাকার লোভই তাদের জীবন ধ্বংস করলো। অনুতাপের আগুনে জ্বলে তারাও কাতরাচ্ছে। মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে বসে তারা।

~•~

মারিয়াকে শহরের হাসপাতালে ইমিডিয়েটলি ভর্তি করানো হয়। দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায় তাকে। হার্টবিট স্লো! যে কোনো মুহূর্তে এট্যাক আসতে পারে। তাড়াহুড়ো করছেন ডাক্তাররা। একজন ভিকটিম সে। যে করেই হোক, তাকে বাঁচাতে হবে। সিবিআইয়ের কড়া নির্দেশ!

মারিয়ার কোমরে আর হাতের বাহুতে প্লাস্টার করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা সেরে যখন তার শরীরের স্ক্যান করা হয়, রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যায় তার কোমর আর বাঁ হাতের হাড় ভেঙে গেছে। ঘাড়ের ডান দিকে মচকে গেছে। এছাড়াও হাতে পায়ে গলায় মুখে হাজারটা কালশিটে র্যাশ!

হাসপাতালে এসেই রাফিকে ফোন দিয়ে সবকিছু জানায় ইয়াসির। “আমি আসছি” বলে রাফি ফোন রেখে দেয়।

~•~

রিমি তখন বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। রাফির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস তার নেই। আবেগে বশীভূত হয়ে সে কত বড়ো ভুল করে ফেলল? এখন নিজেই অনুতাপের অনলে জ্বলছে! বিরাট বোকামি করে ফেলল সে!
তবুও, এভাবে কতদিন লুকোচুরি চলতো? রাফি কোনোদিন বুঝতে পারেনি, এটা কি তার দোষ? সে তো শুরু থেকে ইয়াসিরকে ভালোবেসে এসেছে। কিন্তু বলতে পারতো না। শেষে মারিয়ার সাথে ইয়াসিরের ঘনিষ্ঠতা দেখে তার মাথায় রাগ চাপে। ওদিকে রাফিও তাকে প্রপোজ করে। জেদের বশে সে রাফির কথায় সাড়া দেয়। কী করতো সে? রাফির সাথে থাকলেই তো যখন ইচ্ছে ইয়াসিরকে কাছ থেকে দেখতে পারতো!
শক্ত করে চোখ বুজে রিমি। এখন কী করবে সে? রাফি কি সবকিছু মেনেও তার সাথে সংসার করবে? কিছুই মাথায় আসছে না তার!

দরজায় খুট করে আওয়াজ হয়। রিমি দরজার দিকে তাকালো।
রাফি!
উঠে বসে সে। রাফি ভেতরে আসলো না। দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“হাসপাতালে যাচ্ছি আমি। ইয়াসির আর মারিয়া ওখানেই। তুমি যাবে?”
তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায় রিমি। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। রাফি তখনও দরজায় মাথা নিচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে। রিমি মুখ ফুটে বলল,
“আসছি!”

খানিক বাদেই হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রিমি ও রাফি রওনা দিলো। রিমির বুক ধুকপুক করছিল, ইয়াসির ঠিক আছে তো? রাফিকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। গাড়িতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তার।
রাফি চুপচাপ! কিন্তু রিমির অবস্থা সে খেয়াল করে। হাজার হোক, ভালোবাসার মানুষের সবকিছুই জানা হয়ে যায়। আর সে তো অর্ধাঙ্গিনী ছিল রাফির। রাফি তার অস্বস্তি বুঝবে না তো কে বুঝবে? গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাফি বলল,
“এত টেনশন করতে হবে না। ইয়াসির ঠিক আছে। শুধু মারিয়াকে ভর্তি করানো হয়েছে।”

রাফির কথার রিমি যেমন অবাক হয় তেমনই লজ্জারা তাকে কুড়ে খাচ্ছে…
রাফির ভেতরে কেমন উত্তাল ঝড় বইছে সেটা কি সে আদৌও বুঝতে সক্ষম?

~•~

সিবিআইয়ের হেড এসে ইয়াসিরের সামনে দাঁড়ালেন। পুরো বিস্তারিত ঘটনা তিনি জানতে চাচ্ছেন। এছাড়াও তার সাথে কিছু আলোচনা করবেন তিনি।
বয়ান নিবে শুনে ইয়াসির তাদের সাথেই গেল। শুরু থেকে শেষ অবধি সব বলল, সব। এরকম লোমহর্ষক ঘটনা শুনে লোকটিরও বুক ধড়ফড় করে! তাজ্জব বনে যান তিনি। কী মারাত্মক! কী নিসৃংশ কান্ড!
ইয়াসিরের গলা ধরে আসে। ধীর গলায় বলল,
“মারিয়া মারা যায় কীভাবে আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি মারিয়া আর তার মা হুট করে নিখোঁজ হয়। তাদের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেই সব বলে দিবে!”
হেড অফিসার ইয়াসিরের মনোভাব বুঝতে পারেন। তার কাঁধ চাপড়ে বললেন,
“আমি অবশ্যই দেখছি। আমরা আশা করছি, এই মারিয়া খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে!”
ইয়াসির কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ আগের মতোই বসে রইলো। অফিসার চলে গেলেন। খানিকপরই ইয়াসিরের বাবার বন্ধু আসলেন।
ইয়াসিরকে কোম্পানি দিতে এসেছেন তিনি। এসেই বললেন,
“হেই ইয়াং ম্যান, বি স্ট্রং! নাথিং হেপেন্ড!”
ইয়াসির তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে সামনে তাকায়। লোকটি বসা থেকেই আরেকটু কাছে এসে বললেন,
“টেনশন করো না। মারিয়া ঠিক হয়ে যাবে!”

~•~

ইয়াসিরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওয়েটিং করিডোরে অপেক্ষা করে সে। একবার হাতঘড়ি দেখে নিল সে, রাফির আসতে দেরি হচ্ছে কেন?

ঐ তো, ওদেরকে দেখা যাচ্ছে। আপাতত কাছের মানুষ পেয়ে সে ভেতরে ভেতরে শান্ত হয়। এতক্ষণ একা একা… কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সে।রাফি কাছে আসতেই ইয়াসির তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে। রাফির তার পিঠ চাপড়ে বলে,
“টেনশন নিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে!”
রাফিকে ছাড়তেই ইয়াসির লক্ষ করে, ছেলেটার চোখ মুখ ফোলা। মুখে হাসি নেই সবসময়ের মতো। কেমন গুমোট ভাব! রাফিকে ধরে অন্যপাশে গিয়ে বলল,
“কিছু হয়েছে তোর? এমন শুকনো লাগছে কেন তোকে?”
রাফি হাত দিয়ে ইশারা করে, কথা উড়িয়ে দিলো সে। রিমির দিকে তাকাতে সেও চোখ সরিয়ে নিল। ইয়াসির জিজ্ঞেস করতে যেয়েও আর কিছু বলল না। এই সময়ে থাক! এমনই ঝামেলা চলছে। হতেও পারে ওদের কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে মন কষাকষি হয়েছে! সে আর কিছু বলল না।

আধঘন্টা পর একজন নার্স আসে। ইয়াসিরকে দেখে বলল,
“আপনি কি পেশেন্টের অভিভাবক হিসেবে আছেন?”
ইয়াসির মাথা নাড়ায়। নার্স বলল,
“আপনি চাইলে তাকে দেখতে পারেন। তবে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। আর দয়া করে এমন কিছু করবেন না যাতে পেশেন্টের হার্টবিট প্রবলবেগে বাড়ে!”
রাফির দিকে একনজর তাকিয়ে ইয়াসির মাথা দোলায়। তার নিজেরই এখন উত্তেজনা বাড়ছে।

মহিলা নার্সটি পাতলা ফিনফিনে নীল রঙের কাপড়, হেড স্কার্ফ আর মাস্ক পরিয়ে ইয়াসিরকে ভেতরে পাঠায়। বাহিরে নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার অপেক্ষা করে সে।

দুরুদুরু বুকে ইয়াসির আইসিইউ কেবিনে প্রবেশ করে। মারিয়ার হুঁশ নেই। নিঃশ্বাস যেন বন্ধই হয়ে গেছে এমন লাগছে। তাকে দেখেই ইয়াসিরের বুকে ধক করে উঠে। ইশ, মেয়েটাকে কীভাবে কষ্ট দিয়েছে কে জানে! কতটা ব্যথা, যন্ত্রণা নিয়ে সে বেডে পড়ে আছে তাও তো কারও জানা নেই! বসার প্লেস নেই। বেডের পাশ ঘেঁষে ইয়াসির দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখ ভরে মেয়েটাকে দেখে নেয়। ধীরে ধীরে তার নিঃশ্বাস উঠানামা করছে। সে মারিয়ার মুখের উপর ঝুঁকে আসে ক্রমশ! বিড়বিড় করে মারিয়ার মুখপানে চেয়ে বলে,
“ফিরে আসো মারিয়া! প্লিজ! আমার দম বন্ধ লাগছে। তোমার সাথে ঝগড়া করি না কতদিন… সে হিসেব আছে?” বলার পরপরই ইয়াসিরের চোখের কোনা বেয়ে টপ করে পানি ঝরে। উপুড় হওয়ার দরুণ তার চোখের পানি সরাসরি মারিয়ার মুখের উপর পড়ে। একদম গাল বরাবর!

আরও কত কথা বলে ইয়াসির। একা একাই! একসময় সময় শেষ হয়। ইয়াসিরের সেদিকে খেয়াল নেই! নার্স এসে পিছনে দাঁড়ালো। ইয়াসির কে বিনীত কণ্ঠে বলল,
“সময় শেষ হয়ে গেছে মিস্টার ইয়াসির। আপনাকে এখন যেতে হবে!”
কিছু না বলে ইয়াসির চলে যেতে উদ্যত হয়। যাওয়ার আগে মারিয়ার কপালে হালকা করে চুমু দিয়ে যায়। নার্স অবাক হয়ে তাদেরকে দেখে।
কত কেয়ার, কত ভালোবাসা!
সে মুচকি হেসে উঠে। বের হওয়ার পর দরজা লাগিয়ে বলল,
“বি স্ট্রং মিস্টার। সুস্থ হয়ে যাবেন উনি। সৃষ্টিকর্তা এত সহজেই কি আপনার ভালোবাসার মানুষটাকে ছিনে নিবেন নাকি? ভরসা রাখুন!”
ইয়াসির অবাক হয়। মারিয়া কি তার ভালোবাসার মানুষ? নিজেকে নিজে এই প্রশ্ন করতেই তার ভেতরে অন্যরকম এক সত্তা জেগে উঠে। মারিয়ার সাথে কদিন হয়েছে সে থেকেছে? এর মধ্যেই এত মায়া? আর একটু আগে সে এসব কী করছিল?

চোখের সামনে তুড়ি বাজতেই তার ভ্রম কাটে। নার্স হেসে বলছে,
“বাহ্ বা, বলতে না বলতেই পুরনো স্মৃতিতে চলে গেলেন?”

পরনের ড্রেস খুলে নার্সের হাতে দিয়ে দ্রুত সরে যায় ইয়াসির। নার্স অবাক হলো ভীষণ! সে এমন কী বলেছে? এভাবে চলে যাওয়ার কারণ কী?
সোজা রাফির সামনে এসে দাঁড়ায় ইয়াসির। ফিসফিস করে বলল,
“চাবিটা দে। আমি বাসায় যাব!”
“এখন? তাহলে থাকবে কে এখানে? কী হয়েছে, কোনো সমস্যা?”
“জানি না। দে চাবি দে। এসে পড়ব আমি।”
রাফি চাবি দিতেই ইয়াসির দৌড়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়। রাফিও পিছন পিছন ছুটে আসে। ইয়াসিরের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাকে দাঁড় করায়।
রাগের সাথে বলল,
“এরকম এবনরমাল বিহেভ করার কারণ কী? বলবি কিছু? বিরক্ত লাগছে আমার!”
“আমি নিজেও জানি না। আমি ওর দিকে তাকাতে পারছি না। একটু আগে আমি আমার নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি জানি না আমি কী করছি! আমাকে প্লিজ আপাতত একা থাকতে দে রাফি?”
“আচ্ছা, আমাকে বল। কেন, কেন এমন লাগছে তোর?”
এক মুহূর্ত চুপ থেকে ইয়াসির জবাব দেয়,
“আমি ওর জন্য কিছু ফিল করছি। আসার সময় ওকে আমি কিস করে ফেলেছি। ওর প্রতি আমার অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে!”
“ওহ্!” বলে রাফি ইয়াসিরকে ছেড়ে দেয়। থাকুক সে কিছুক্ষণ একা!

~•~

ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বাজে। গভীর রাত। ব্যালকনিতে চিৎ হয়ে শুয়ে ইয়াসির আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ছে উপরে। ভাবনায় সে। হচ্ছে কী তার? ভালোবাসা এতই সস্তা? আজ একে ভালোবাসলাম তো কাল অন্যজনের প্রতি একই ফিলিংস? নাকি আজকের মারিয়ার প্রতি তার শুধু মায়া…? মায়াতেই এরকম লাগছে। আর যদি সে ভালোবাসতো? তখন!

উঠে এসে রুমের বাতি জ্বালায় সে। বিছানার দিকে চোখ পড়তেই মারিয়ার ফোন দেখতে পায়। এখনও ওটা চার্জে। এক নজর ফোনটা দেখে ইয়াসির আলমারি খুলে। মারিয়ার ব্যাগ থেকে তার প্রেয়সীর শাড়িটা বের করে আনে। নাকের কাছে এনে চেপে ধরে। বিব্রত লাগছে তার! শাড়ীটা আলমারির ভেতর ফেলে রেখে বিছানায় এসে বসে। মারিয়ার ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনে তার হাসিমুখটা ভেসে উঠে। ফিক করে হেসে দেয় ইয়াসির। স্ক্রিনের মারিয়াকে সে প্রাণভরে দেখে। চোখ জুড়ে তার!
ভেতরটা প্রাণোচ্ছল হয়…

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here